নষ্ট মেয়ে

– রামিসা এবার থার্ড হয়েছে। ওকে আরেকটু গাইড করলেই ও ফার্স্ট হতে পারবে। তুমি ওর ইংরেজী আর অংকের সাইডটা একটু দেখো মাঝে মাঝে।
– আমার আবার সময় কোথায়? অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা ন’টা। বেটার একজন টিচার রেখে দাও।
– হুমমম… সেটা একদিক দিয়ে ভাল। রামিসা টিচারকে ভয় পাবে, কথাও শুনবে। কিন্তু এখনকার টিচারগুলো ছোট ছেলেমেয়ে পড়াতে চায় না। ভাল টিচার পাওয়া মুশকিল।
– দেখো খুঁজে। না পেলে অন্য ব্যবস্থা করা যাবে।

– মোহিত, আজকে রাবেয়া খালা এসেছিল। মারুফ নাকি প্রাইভেট পড়ায়। ও তো পড়ালেখায়ও ভাল। ওকে বললে কেমন হয়? সামনেই বাসা। যেকোন সময় টুপ করে এসে পড়াতে পারবে।

– রামিসা এবার থার্ড হয়েছে। ওকে আরেকটু গাইড করলেই ও ফার্স্ট হতে পারবে। তুমি ওর ইংরেজী আর অংকের সাইডটা একটু দেখো মাঝে মাঝে।
– আমার আবার সময় কোথায়? অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা ন’টা। বেটার একজন টিচার রেখে দাও।
– হুমমম… সেটা একদিক দিয়ে ভাল। রামিসা টিচারকে ভয় পাবে, কথাও শুনবে। কিন্তু এখনকার টিচারগুলো ছোট ছেলেমেয়ে পড়াতে চায় না। ভাল টিচার পাওয়া মুশকিল।
– দেখো খুঁজে। না পেলে অন্য ব্যবস্থা করা যাবে।

– মোহিত, আজকে রাবেয়া খালা এসেছিল। মারুফ নাকি প্রাইভেট পড়ায়। ও তো পড়ালেখায়ও ভাল। ওকে বললে কেমন হয়? সামনেই বাসা। যেকোন সময় টুপ করে এসে পড়াতে পারবে।
– ইহ্যাঁ, রাজি হলে তো ভালই। তবে মৌরী, তুমি টাকার ব্যাপারে আগেই কথা বলে নিও। প্রতিবেশী বলে ভদ্রতা করতে পারে। কিন্তু তুমি খোলাখুলি আলাপ সেরে রেখ। এসব ঝামেলা ভাল না।
– হুমম… তা তো বটেই।

– রামিসা, মারুফ কালকে থেকে পড়াতে আসবে। মিডটার্ম-এ অনেক পড়া। এখন আর ভাইয়ার সাথে গল্প , খেলা, লাফালাফি করা যাবে না। ভাইয়া আসলে সালাম দিয়ে চুপচাপ পড়তে বসবে। ভাইয়া কিন্তু পড়ার ব্যাপারে খুব সিরিয়াস।
– মারুফ ভাইয়া পড়াতে আসবে?
রামিসা গালভরা হাসি নিয়ে মৌরীকে প্রশ্ন করল। মৌরী কড়া চোখে তাকিয়ে আছে।
– হ্যাঁ, কিন্তু এত খুশি হবার কিছু নেই। একটু আগে কি বললাম? এখন আর দুষ্টুমি চলবে না। এখন শুধু পড়ালেখা। গ্রেড টু-তে অনেক পড়া। এত সোজা না যে লাফালাফি করে পড়া শেষ করবে।
মারুফ, হামিদ, আসিফ তিন ভাই। রামিসা ছোটবেলা থেকে রাবেয়া দাদীর বাসা আসা-যাওয়া করে। সেই চার বছর বয়স থেকে রামিসা মারুফ হামিদদের সাথে কচি হাতে ক্যারাম খেলার চেষ্টা করত। মাঝে মাঝে রাবেয়া দাদীর সাথে লুডু খেলে। রাবেয়া খাতুনের কোন মেয়ে না থাকায় রামিসাকে তিনি খুব আদর করেন। হামিদ, মারুফ, আসিফের ছোটবেলার বিভিন্ন খেলনা খুঁজে বের করে রাখতেন রামিসার জন্য। রামিসা সেসব খেলনা নিয়ে ঘুটঘুট করায় ওস্তাদ ছিল। ছোট ছোট গাড়িগুলোর প্রত্যেকটা অংশ আলাদা করে আবার জোড়া লাগাত রামিসা। মাঝে মাঝে দু’একটা খেলনা নষ্টও করত। কিন্তু এ নিয়ে তাকে কেউ কিছু বলত না। মন খারাপ থাকলে হামিদদের বাসায় গিয়ে হামিদ আর রাবেয়া দাদীর কাছে গল্পের ঝুড়ি খুলে বসত। মারুফও মাঝে মাঝে তাকে সঙ্গ দিত। মারুফদের সাথে খুব ভাল সম্পর্ক থাকায় মারুফ পড়াতে আসবে শুনে রামিসা ভয় পেল না। উলটো খুশিই হল। মনে মনে ভাবল এখন কিছু হলেই মায়ের নামে মারুফ ভাইয়ার কাছে নালিশ ঠুকে দেওয়া যাবে। মারুফ ভাইয়া মাকে বলে দিলে মা আর বকবে না। মাঝে মাঝে ভাইয়ার সাথে ওদের বাসায় চলে যাবে। মায়ের কাছে সাধতে হবে না। আবার ভাইয়া মায়ের মত করে মেরে বকে পড়াবে না। সব দিক দিয়ে রামিসার জন্য ভালই হয়েছে।

– রামিসা, নেক্সট উইক থেকে তো স্কুল শুরু। আজকে থেকে গ্রেড থ্রি-এর পড়া শুরু করে দিতে হবে।
– এখন কেন? স্কুল শুরু হলে পড়া শুরু করব। এখন তো কোন হোমওয়ার্ক নেই। কোন পড়াও নেই।
– ফার্স্ট গার্লের এ কেমন কথা? ফার্স্ট গার্ল কি অন্যদের মত পরে পড়া শুরু করে? ফার্স্ট গার্ল থাকে সবার থেকে এগিয়ে। তাছাড়া দেখো, গ্রেড থ্রিতে পাজেল মিলাতে হবে। খুবই মজা লাগবে।
– পাজেল?!? ( রামিসার চোখ খুশিতে জ্বলজ্বল করছে )
– জি বুড়ি। পাজেল। সো?! আজকে থেকেই পড়া স্টার্ট।
বলে মারুফ রামিসার পেটে কাতুকুতি দেয়। রামিসা হাসতে হাসতে চেয়ারে গড়াগড়ি দেয়।

কিছুক্ষণ পর ______
– রামিসা, আম্মু কোথায়?
– আম্মু তো বিল দিতে গেছে।
– কখন গেছে?
– তুমি আসার কিছুক্ষণ আগে।
– আসবে কখন জানো?
– না জানি না। দুপুরে হয়ত।
– বাসায় কে আছে?
– শিউলিবু ছাড়া আর কেউ নেই।
– শিউলিকে ডাক তো।
রামিসা শিউলিকে ডাকতে যায়। মারুফ পুরো ঘরটাতে চোখ বুলাতে থাকে। বিছানায় কমলা রঙের প্রিন্টের চাদর বিছানো। দু’টো বালিশ, একটা কোল বালিশ। জানালায় সাদা রঙের পর্দা ফাক করে রাখা। এ ঘরে রামিসা ঘুমায়। সিটিসানের একটা বড় দেওয়াল ঘড়ি টিকটিক শব্দ করে এগিয়ে চলেছে। দেওয়ালে রামিসার আঁকা কিছু ছবি ঝুলছে। মারুফ চেয়ার থেকে উঠে পর্দা টেনে দেয়। আবার চেয়ারে এসে বসে। রামিসার পড়ার টেবিলটা দেখতে থাকে।
রামিসা ঘরে ফিরে আসে।
– শিউলিবু আসছে।
– হুমম… তুমি পাজেলটা কমপ্লিট কর।
কিছুক্ষণ পর শিউলি আসে।
– জি, মারুফ ভাইজান?
– শিউলি সামনে দোকান থেকে একটা স্টিলের স্কেল আর দু’টো ট্রেসিং পেপার নিয়ে আসত।
– কি পেপার?
– ট্রেসিং পেপার। আমি লিখে দিচ্ছি।
রামিসা- ভাইয়া, প্লাস্টিকের স্কেল আছে। আমি স্টিলের স্কেল কিনতে চেয়েছিলাম। আম্মু কিনে দেয় নি। বলেছে স্টিলের স্কেল দিয়ে হাত কেটে যায়।
– গ্রেড থ্রিতে স্টিলের স্কেল দরকার হবে। আমি আম্মুকে বলে দিব। এখন তো তুমি বড়ো হয়েছ। যাও শিউলি, তুমি নিয়ে আস।
শিউলি চলে যায়। মারুফ দরজা ভাল জকরে আটকে দেয়। ফিরে এসে দেখে রামিসা মনযোগ দিয়ে পাজেল মিলানোর চেষ্টা করছে। মারুফ রামিসার পাশে দাঁড়ায়।
– ওয়ান্ডারফুল রামিসা বুড়ি।
বলে মারুফ আবার রামিসাকে কাতুকুতি দিয়ে কোলে তুলে নেয়। রামিসা খিলখিল আওয়াজ করে হাসছে। হাত পা ছুড়ে নিজেকে মুক্ত করার হালকা কসরতও চালাচ্ছে। মারুফ রামিসার পেটে মুখ গুঁজে নাক ঘষে কাতুকুতি দিচ্ছে। ধীরে ধীরে মুখ উপরে তুলতে থাকে। রামিসাকে কোলে রেখে বিছানায় বসে। রামিসার ঠোঁটে চুমু খায়। রামিসার পড়নে থাকা ফ্রকটার চেনে টান দেয়। রামিসার খেলার ছলে কিছু বোঝার আগেই মারুফ তাকে বিছানায় শুইয়ে পাশবিক অত্যাচার শুরু করে। রামিসা চিতকার দিতে চাইলে মারুফ মুখ চেপে ধরে। মাঝে মাঝে ঠোঁটে ঠোঁট চাপিয়ে ঠেকিয়ে রাখে। রামিসা হাত পা ছোঁড়রও চেষ্টা করে। কিন্তু মারুফের শক্তি কাছে সে হেরে যায়। মারুফ তার পৈশাচিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

শিউলি আর কিছুক্ষণ পর চলে আসবে। এ এরিয়ায় ট্রেসিং পেপার পাওয়া যায়। মারুফ ঘড়ির দিকে তাকাল। ঘড়িটাকে বেশ স্বার্থপর মনে হচ্ছে মারুফের। এত তাড়াহুরার কি আছে? ধুর! মারুফ শেষবারের মত তার পৈশাচিক খেলার আনন্দ নেয়। রামিসার শরীরে হাত বুলিয়ে নেয়। এরপর আদর করে তাকে ফ্রক আর প্যান্ট পরিয়ে দেয়। কমলার চাদরে লাল ছাপগুলো মারুফের চোখে পড়ে কিন্তু সে সেদিকে নজর দেয় না। রামিসার দিকে তাকায়। রামিসা নড়ছে না। এই মুহূর্তে রামিসা সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। রামিসাকে দোকানে সাজিয়ে রাখা পুতুলগুলোর মত মনে হতে লাগল মারুফের। এরকম একটা পুতুলকে সে কিভাবে হাতছাড়া করত তাই ভাবছে। আপন খেলার পুতুলের মত রামিসার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়, ভুঁরু আঁচড়ে চোখ মুছে দেয়। মারুফের খেলা শেষ করে মারুফ এবার রামিসাকে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। রামিসাকে পাজেল মিলাতে বলে আবার। রামিসা অসাড় হয়ে বসে আছে। চোখের পলকও পড়ছেনা। মারুফ তার গালে চুমু খেয়ে হাতে পেন্সিল ধরিয়ে দেয়। পেন্সিল ধরা হাতটা নড়োছে না। মারুফ নিজেই রামিসার হাত ধরে পাজেল সলভ করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর কলিং বেলের শব্দ শুনে দরজা খুলে দেয় মারুফ।
– ভাইজান, টেরেসিং পেপার নাইক্কা। আস্তার মাথত থাইকা খুঁইজা আসচি। খালের পাড়েও গিসলাম। নাইক্কা।
– ও! স্টিলের স্কেল পাইসো?
– হ।
মারুফের হাতে স্টিলের স্কেল ধরিয়ে দিয়ে শিউলি নিজের কাজে চলে যায়। মারুফ রামিসার ঘরে ফিরে আসে।

আধাঘন্টা পর মারুফ চলে যায়। রামিসা এখনো অসার হয়ে বসে আছে। শুণ্য মাথায় রামিসা কিছু ভাবতে পারছে না। কেমন জানি এলোমেলো ছবি ভাসছে চোখের সামনে। শিউলি রান্নাঘরের কাজের ফাঁকে বুঝতে পারেনা কিছু। হঠাত খেয়াল করে রামিসার কোন সাড়া নেই। সে রামিসার ঘরে উঁকি মারে। রামিসাকে শক্ত হয়ে বসে থাকতে দেখে সে ঘরে ঢুকে।
– কি মণি! এমনে তবদা মাইরা বয়্যা আস ক্যালায়?
রামিসা কোন কথা বলছে না। মমির মথ নিথর হয়ে আছে।
– কিছহু কইবার নও? খাইবা কিছহু?
কি হইসে আম্মা?

শিউলি আদর করে রামিসার মাথায় হাত বুলায়। হঠা তার চোখ যায় রামিসার ফ্রকে। রক্তের দাগ। প্রথমে সে হাল্কা ভাবে নেয়। কিন্তু বিছানায় দাগ দেখে শিউলির বুক ঢিপঢিপ করে ওঠে।
– আম্মু? মারুফ ভাইজান কিছহু করসে নি?
রামিসা আগের মতই শক্ত হয়ে বসে আছে।
– আম্মু, কও আমারে। এম্বার খাম্বা মাইরা গেস ক্যাঁ? কও।
অনেকক্ষণ ধরে রামিসাকে এভাবে জিজ্ঞেস করতে থাকে শিউলি। একসময় রামিসা শিউলিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। শিউলির চোখ টলটল করছে। মুখ শুকিয়ে গেছে। সে বুঝতে পেরেছে ঘটনা কি। জন্ম থেকে রামিসাকে দেখে আসছে সে। নিজের মেয়ের মত করে আদর করে বড় করেছে। রামিসার সব দায়িত্ব সবসময় শিউলির উপরই ছিল। একই গ্রামের মানিজার বাবুর নাতনী বলে রামিসাকে কখনো অবহেলা করেনি শিউলি। সবসময় আগলে রেখেছে। আজকে শুধু কিছু সময়ের অসাবধানতা আর অন্ধ বিশ্বাস রামিসার জীবনে অন্ধকার নামিয়ে এনেছে।

রামিসা অনেকক্ষণ কাঁদার পর একসময় নিজেই বলে উঠল
– শিউলিবু, আমি কিচ্ছু করিনি। আমি তোমারে ডাকতে গিয়েছিলাম। মারুফ ভাইয়া…… মারুফ ভাইয়া…… মারুফ ভাইয়া দেয় নাই……
আর বলতে পারেনা। কাঁদতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর আবার বলতে শুরু করে।
– শিউলিবু আম্মুরে বইল না। আমি কিচ্ছু করিনি বু। বু, আমি দুষ্টামি করিনি। বু……
আবার কাঁদতে থাকে। শিউলি কিছু বলে না। কিন্তু শিউলি ঠিক করে ফেলে সে আর কাউকে জানাবে না। কিছুক্ষণ পর সে আবার ভাবে , না জানাবে। না জানালে ঐ জানোয়ার আবার পড়াতে আসবে। আবার রামিসার কোন ক্ষতি করবে। না, রামিসার ত্রিসীমানার মধ্যে আর ঐ জানোয়ারকে আসতে দিবেনা সে। রামিসার কাছ থেকে সব শুনে মৌরী আপাকে জানাবে।

রামিসার মা বিকেল করে ফেরে। শিউলি সন্ধ্যায় মৌরীর মাথায় তেল দিতে দিতে ঘটনা বলে। মৌরী চুপচাপ শুনে ঘটনাটা। কিছুক্ষণ পর শিউলিকে চলে যেতে বলে আর রামিসাকে ডাকে। দরজা এঁটে দেয়। হঠাত ঠাস করে রামিসার গালে একটা চড় বসিয়ে দেয়।
– নষ্ট মেয়ে, তুই আমাকে না বলে শিউলিকে বলেছিস? শিউলি তোর কে? তুই কিছু জানিস? বেজন্মা! নিজে মানুষের সাথে গলে গলে গল্প করতি বলেই তো এই অবস্থা।নষ্টা একটা! আবার ঢোল পিটিয়ে বলে বেড়ায়। শিউলি কাউকে বললে কি হবে জানিস? নষ্ট হয়ে গেছিস সেটা মুখে মুখে রটবে। তোকে বের করে দিবে। বল শয়তান, কি হয়েছে বল!
রামিসা কিছু বলতে চায় না। কাঁদতে থাকে। ঘরে যেতে চায়। মৌরী তাকে ছাড়ে না। আরো কয়েকবার মেরে মৌরীর কাছ থেকে কথা আদায় করে। রামিসা আর কারো সাথে কথা বলে না। চুপচাপ নিজের ঘরে বসে থাকে। এই ঘরটাতে থাকতে রামিসার ঘৃণা হয়। নিজেকে নষ্টা মনে হয়। গা থেকে পঁচা গন্ধ নাকে লাগে। বিছানায় বসলে গা ছমছম করে। রাতের বেলায় বিছানায় গা দিতে ভয় লাগে। মনে হয় লতাপাতা ঘিরে ধরছে, কেউ হাত বুলাচ্ছে তার শরীরে। চিতকার করে উঠে যেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু পারেনা। তার নিথর দেহ পড়ে থাকে। মাঝে মাঝে গাল বেয়ে দু’ফোটা পানি পড়ে। আবার মিলিয়ে যায়। কখনো কখনো রাতে শোবার সময় শিউলি মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কিন্তু রামিসা দিতে দেয় না। শিউলির প্রতিও তার বিশ্বাস উবে গেছে। শিউলিও তার কথা রাখেনি। রামিসা আর কাউকে বিশ্বাস করে না। নিজেকেও না।

– রামিসা, ক্যাপ্টেন হবে?
রামিসা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
– কি হল রামিসা? ক্যাপ্টেন হবে?
– না। কেন? যে ফার্স্ট হয় তাকে ক্যাপ্টেন হতে হয়।

রামিসা কিছু না বলে দাঁড়িয়ে আছে। মিসের কথাগুলো ঠিকমত সে বুঝতে পারছে না। কেমন যেন এলোমেলো হয়ে মাথায় ঘুরছে।
– ক্যাপ্টেন হিসেবে রামিসাকে কার কার পছন্দ?
প্রায় সবাই হাত তুলে সম্মতি জানাল।
– রামিসা তুমি ফার্স্ট ক্যাপ্টেন। ওকে?
রামিসা এখনো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
– রামিসা?
– জি।
– তুমি ফার্স্ট গার্ল। এখন ক্যাপ্টেন। তুমি এখানে সবার চেয়ে বেস্ট। তুমি এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে হবে? তোমাকে চটপট হতে হবে। বিদ্যুতের বেগে ছুটতে হবে, উত্তর দিতে হবে বুঝলে?

রামিসা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মিসের চোখে এটাকে রামিসার হ্যাসুচক উত্তর মনে হল। তিনি রামিসাকে বসতে বললেন।
পরের ক্লাসে আনিস স্যার পড়াতে শুরু করলেন। রামিসাকে স্যার উত্তর দেবার জন্য দাঁড় করালেন। পড়া ধরতে কাছে এলেন। রামিসার কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে। তার গা শিউরে উঠে। চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে আচ্ছে না। মারুফের কথা মনে হচ্ছে। ঘৃণা লাগছে। নিজেকে নষ্ট মনে হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আনি স্যার রামিসাকে ডায়রী আনতে যেতে বলে। ক্লাস মিস রামিসাকে দেখে প্রশ্ন করে
– রামিসা, মন খারাপ কেন?
– মন খারাপ না, মিস।
– এত আসতে কতা বলছ কেন?
রামিসা কিছু বলে না।
– ফার্স্ট গার্ল না তুমি? তুমি সবার চেয়ে ভাল করেছ না? তুমি সবার উপরে। তুমি জোরে কথা বলবে। মিনমিন ভাল লাগে না।
– হুমমম…
– যাও।
রামিসা চলে আসে। ক্লাসে ফিরতে ফিরতে দু’একজনের কথা শুনে।
– এই মেয়েটা বি এর ফার্স্ট গার্ল। কি মুড। কারো সাথে কথা বলে না। ক্যাপ্টেন হয়ে হাসে না। নিজেকে কি যে মনে করে।
– ও ইশিতাদের ক্লাসমেট। ফার্স্ট ক্যাপ্টেন তো, ভাব ই আলাদা।

এরকম আরো দু’একটা কথা শোনে। পিছনের দরজা দিয়ে ক্লাসে ঢোকে রামিসা। আনিস স্যার ক্লাসে নেই। মেয়েরা যে যার মত খেলছে। কেউ পেন দিয়ে ঠোকাঠুকি, কেউ এসি পেপ্সি, কেউ ওমিলো খেলছে, কেউ কম্পাস দিয়ে বোতল ফুটো করে পানি আনন্দে পানি খাচ্ছে। রামিসা তাকিয়ে আছে উতফুল্ল মেয়েগুলোর দিকে। ওর নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে। “না, মিস কথাগুলো ঠিক বলেনি। আমি সবার চেয়ে বেস্ট না। ওরা আমার চেয়ে অনেক ভাল। ওরা নস্ট না। আমার কথা মিস জানেনা। জানলে আমাকে নষ্ট বলবে। ছি ছি করবে। বের করে দিবে।”
রামিসা ভাবতে থাকে। ওর কান্না পায়। কিন্তু সবার সামনে কাঁদে না। কর্নারের জানালার পাশে গিয়ে বসে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকে।

গত এক সপ্তাহ থেকে রামিসার খুব জ্বর। ১০৩/১০৪ এর নিচে জ্বর নামছেই না। ডাক্তার দেখানো হয়েছে। কিছু টেস্ট করানো হয়েছে। নিয়মিত বিভিন্ন ঔষধ দেওয়া হচ্ছে। কোন কাজ হয়নি। কাল রাত থেকে জ্বর ১০৫। অনেকগুলো ঔষধ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জ্বর একটুও নামেনি। রামিসা প্রলাপ বকা শুরু করেছে। রামিসা উলটা পালটা কি সব বলছিল মৌরী বুঝতে পারেনি। পরে রামিসার গলা শিথীল হয়ে আসে। কথাগুলো ক্ষীণ হয়ে আসে। আস্তে আস্তে প্রলাপ বকছে রামিসা। মৌরী এবার বুঝতে পারে মেয়ের কথা।
– নষ্ট মেয়ে, নষ্ট ঘর, নষ্ট পাজেল, নষ্ট আমি, নষ্ট মেয়ে, নষ্ট ঘর, নষ্ট পাজেল……
– রামিসা, আম্মু, কি বলছিস এসব? আমু ঠিকমত কথা বল। চোখ খোল।

রামিসা বলেই চলেছে। মৌরী বুঝতে পারছে না কি করবে। মোহিতকে ডাকতে চলে গেলেন। রামিসার গলার স্বর এখন খাদে নেমে গেছে। কথাগুলো জড়ানো। তেমন কিছুই স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে না। শিউলি বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আয়াতুল কুরসি, দুরুদ পড়ে রামিসার মাথায় ফুকে দিচ্ছে। মোহিত ছুটে এলেন মেয়ের ঘরে।
– আম্মু, কি হয়েছে তোর? খারাপ লাগছে? সুপ খাবে? জ্বর বেশি লাগছে?
– ওকে হাসপাতালে নিয়ে চল না।
– মোহিত অ্যাম্বুলেন্সে খবর দিলেন। অ্যাম্বুলেন্স আসা মাত্র রামিসাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা দিলেন। রামিসার মুখ দিয়ে এখনো বিড়বিড় আওয়াজ বের হচ্ছে। ‘নষ্ট মেয়ে, নষ্ট ঘর, নষ্ট পাজেল, নষ্ট আমি, নষ্ট মেয়ে, নষ্ট ঘর, নষ্ট পাজেল……’
– রামিসার মুখ দিয়ে আর কোন কথা বের হচ্ছে না। মোহিত এখনো শক্ত করে মেয়ের হাত ধরে আছে। হাতটা কেমন যেন ঠান্দা লাগছে। মোহিত রামিসার কচি হাত তার দু’হাতের তালুতে নিয়ে ঘষছেন। কিছুটা উত্তপ্ত হচ্ছে। মোহিত রামিসার মুখের দিকে তাকাচ্ছে না। পথের দিকে তাকিয়ে আছেন। হাসপাতালে তাড়াতাড়ি পৌঁছোতে হবে। মোহিতের কানে তখনো রামিসার প্রলাপ ভাসছে, ‘নষ্ট মেয়ে, নষ্ট ঘর, নষ্ট পাজেল, নষ্ট আমি, নষ্ট মেয়ে, নষ্ট ঘর, নষ্ট পাজেল……’

২৬ thoughts on “নষ্ট মেয়ে

  1. চমৎকার… ভাল লাগল!!
    নষ্ট

    চমৎকার… ভাল লাগল!!
    নষ্ট সমাজ, নষ্ট সংস্কার, নষ্ট পুরুষতন্ত্র, নষ্ট মানুষ, নষ্ট মানবতা,নষ্ট ‘মা’…
    নষ্ট ‘মা’ এর পর এই সভ্যতার কিছু বাকি থাকে?

  2. চমৎকার চমৎকার চমৎকার চমৎকার
    চমৎকার চমৎকার চমৎকার চমৎকার লাগলো। তবে কস্ট পেয়েছি অনেক লেখা পড়ে। মন খারাপ হয়ে গেছে

    1. কষ্ট পেয়েছেন শুনে খারাপ লাগল।
      কষ্ট পেয়েছেন শুনে খারাপ লাগল। কিছু করার নেই আসলে। বাস্তবতাই মন খারাপ করা।

      অসংখ্য অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

  3. গল্পটা খুব সুন্দর হয়েছে ।আর
    গল্পটা খুব সুন্দর হয়েছে ।আর কিছু মানুষের বিকৃত মানষিকতার কথাও এখানে ফুটে উঠেছে

  4. পরিবর্তন এর আশা এখন শুধুই
    পরিবর্তন এর আশা এখন শুধুই স্বপ্ন বেতিরেকে কিছু নয় – আর এটা একটা ট্র্যাডিশন এ পরিনত হয়েছে / এটা ভাঙ্গা আদৌ সম্ভব কিনা – সে সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেও আছে /।

  5. লেখকের লেখা হৃদয় স্পর্শ
    লেখকের লেখা হৃদয় স্পর্শ করেছে । শেষের দিকটা পড়ে অনেক কষ্ট লাগলো । ভাল লিখেছেন ।

    আপনার জন্য শুভ কামনা রইল ।

  6. আমি তো লেট করে ফেললাম!
    অনেক

    আমি তো লেট করে ফেললাম! :মাথানষ্ট:

    অনেক কিছুই উপলব্ধি করলাম এই লেখা পড়ে,আর লেখা সেইরম ভাল্লাগছে :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *