অবিশ্বাসী হোন, হিংস্র আচরণ থেকে মুক্ত থাকুন

বিশ্বাসের সাথে মিথ্যের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্বাস করতে হবে তাকেই যা মিথ্যে অথব সত্য নয়। মিথ্যেকে বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। সত্যকে বিশ্বাস করলেও সত্য, বিশ্বাস না করলেও সত্য।

ধরেন, মঙ্গল গ্রহের কথা। মঙ্গল গ্রহ আছে কি নেই, তা আপনার বিশ্বাসে কিছু যায় আসে না। মঙ্গল গ্রহ আমরা কেউ নিজের চোখে দেখিনি। ফলে মঙ্গল গ্রহ আছে কি নেই, তা নিয়ে বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্ন তুললে মঙ্গলের অস্তিত্বের কিছু যায় আসে না। অবিশ্বাসের কারণে মঙ্গলের অস্তিত্ব হুমকীর মুখে পড়বে না। মঙ্গল যে আছে, তাই সত্য, তাই বাস্তব। এর অস্তিত্ব বিশ্বাসের ধার ধারে না।

একইভাবে কৈলাশে ভগবান শিব থাকেন, এই মিথ্যেটাকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে একে বিশ্বাস করতে হবে। সারা হিমালয় চষে বেড়িয়ে শিবের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না, কোনোভাবেই না। কারণ সত্য হলো, শিব বলে কিছু নেই। শিবের অস্তিত্বকে সত্য বলে মেনে নিতে হলে বিশ্বাসের দ্বারস্থ হতে হবে। বিশ্বাস ছাড়া শিব অস্তিত্বহীন মানে বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে মিথ্যেকে প্রতিষ্ঠা করতে হচ্ছে। এরকম মেঘ বৃষ্টির জন্য মিকাইল ফেরেশতার গল্পও একটা বিশ্বাস। মেঘ বৃষ্টির সাথে সম্পর্ক রয়েছে পানিচক্রের, আবহাওয়ার মিকাইলের নয়।

আরেকটা উদাহরণ টানা যেতে পারে। আমাদের মানুষ মানুষীর সম্পর্ক বিষয়ে। ধরেন, আপনার সঙ্গিকে আপনি খুব বিশ্বাস করেন যে তিনি বহুগামী নন অথবা বিবাহিত হলে তিনি পরিকিয়া করেন না। এই বিশ্বাস কিন্তু উনার সত্যিই একগামীতা কিংবা পরকিয়ায় লিপ্ত নন তা প্রমান করে না। এটা স্রেফ আপনার বিশ্বাস। উনি বহুগামী হতেও পারেন, আবার নাও হতে পারেন। যদি সন্দেহ করেন, তাহলে হয়ত আপনি সত্যটাকে জানতে পারবেন। সন্দেহের মধ্য দিয়ে আপনি সঙ্গীর একগামীতা অথবা বহুগামীতার সত্যটাকে আবিষ্কার করতে পারবেন। কিন্তু আগেই যদি বিশ্বাস করে বসে থাকেন, তাহলে সত্যটা জানার কোনো উপায়ই নাই। এখন দেখা গেলো সঙ্গি সত্যি সত্যিই একগামী। আপনার বিশ্বাস সত্য হলো। সঙ্গীর এই একগামীতা কিন্তু আপনার বিশ্বাসের উপরে নির্ভরশীল ছিলো না। আপনি বিশ্বাস করলেও একগামী, না করলেও তিনি একগামী। বরং আপনার অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে সত্যটা বের হয়ে আসলো। অবিশ্বাস সত্যকে বের করে নিয়ে আসলো।

আমাদের ধার্মিকগণ এই বলে আবদার করেন যে বিশ্বাসে আঘাত দেবেন না। এ এক উদ্ভট আবদার কারণ, বিশ্বাস বিষয়টাই তো মিথ্যে। মিথ্যেকে সমাজ থেকে দূরীভূত করেই তো মানুষ সভ্যতার দিকে এগিয়েছে, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা তড়ান্বিত হয়েছে। আগুন পূজারী মানুষগুলোর মধ্যে যদি অবিশ্বাসী কেউ না থাকতো, তাহলে আগুনের ব্যবহার করার সাহস মানুষ পেতো কিনা সন্দেহ আছে কারণ, মানুষ ভগবানকে ব্যবহার করছে সেটা কি ভাবা যায়!

এখন ধার্মিকদের মতো করে যদি কেউ দাবী করে যে সে মঙ্গল গ্রহ ঘুরে এসেছে। প্রমাণ চাইলে বলে এটা তাঁর বিশ্বাস। তাহলে, আমরা হেসে উড়িয়ে দেবো। আমরা তখন ভাববো না যে এটা তাঁর বিশ্বাস। অথচ, ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে এই বিশ্বাসের মৌলিক কোনো পার্থক্য নাই। ধর্ম বিশ্বাস সমাজে প্রতিষ্ঠিত আর এই লোকটার বিশ্বাস প্রতিষ্ঠত নয়, পার্থক্য এতটুকুনই। যেমন, ইসলামের নবী মোহাম্মদ দাবী করেছে সে মেরাজ গমন করেছে। মেরাজের মধ্য দিয়ে আল্লাহর সাথে দেন দরবার করে নামাজ রোজার পরিমান কমিয়ে এসেছে। মঙ্গল ভ্রমন করেছে দাবীকারী লোকটা আর মোহাম্মদের মেরাজ তথা উর্ধাকাশ গমনের দাবীর মধ্যে আদতে কী কোনো পার্থক্য আছে? মোহাম্মাদের দাবীটা লোকে বিশ্বাস করে, সমাজে তা সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। পার্থক্য এটুকুনই।

সাম্প্রতিক একটা গবেষণায় জানা গিয়েছে, বিশ্বাস শুধু মিথ্যেকেই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে না, এটি মানুষের মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে মানুষের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্স অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ফলে মানুষের যুক্তি বুঝার এবং প্রয়োগ করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং মানুষ হিংস্র হয়ে উঠছে। ফ্রন্টাল কর্টেক্সের ক্ষতির কারণে মানুষ অল্পতেই রেগে যায়, সহিংস আচরণ করে। কেউ তাঁর বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাঁকে তেড়ে আসতে চায়, তাঁকে আক্রমণ করতে চায়।

তাই বলি, বিশ্বাসের কারাগার থেকে বের হয়ে আসুন, অবিশ্বাস করতে শিখুন, শিখুন সন্দেহ করতে। বের করে নিয়ে আসুন সত্যকে। সত্যকে বের করতে পারুন বা না পারুন, অন্তত হিংস্র আচরণ থেকে তো মুক্ত থাকতে পারবেন!।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *