একটি প্রেম অথবা প্রতিশোধের গল্প

সময় : বর্তমান কাল

সুব্রত চৌধুরী হাফাচ্ছেন। জগিং করাটা অনেক পরিশ্রমের কাজ। প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে আধা ঘণ্টা ধানমন্ডি লেকের পাশের রাস্তাটায় দৌড়ানো তাঁর অভ্যাস। দৌড়ানো শেষ হলে ১০ মিনিট বসে বিশ্রাম নেন এবং সাথে করে আনা বোতল থেকে স্যালাইন খান। ৪২ চলছে কিন্তু এখনও ৩০ বছরের বেশি বয়স্ক তাঁকে মনেই হয় না। নিয়মিত শরীরের যত্ন নেওয়াই এর প্রধান কারণ।


সময় : বর্তমান কাল

সুব্রত চৌধুরী হাফাচ্ছেন। জগিং করাটা অনেক পরিশ্রমের কাজ। প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে আধা ঘণ্টা ধানমন্ডি লেকের পাশের রাস্তাটায় দৌড়ানো তাঁর অভ্যাস। দৌড়ানো শেষ হলে ১০ মিনিট বসে বিশ্রাম নেন এবং সাথে করে আনা বোতল থেকে স্যালাইন খান। ৪২ চলছে কিন্তু এখনও ৩০ বছরের বেশি বয়স্ক তাঁকে মনেই হয় না। নিয়মিত শরীরের যত্ন নেওয়াই এর প্রধান কারণ।

একটা বহুজাতিক কোম্পানির GM এর পদ অলঙ্কৃত করে আছেন তিনি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, অনেক কৌশল অবলম্বন করে এই পর্যায়ে এসেছেন তিনি। সব কৌশল যে ভাল ছিল তা নয়। ক্যারিয়ার গড়তে হলে অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছুই করতে হয়। এইসব নিয়ে তাই তাঁর কোন অনুশোচনা নেই। Survival of the fittest নীতিতে তিনি বিশ্বাস করেন। প্রাইভেট সেক্টরে সারভাইভ করতে হলে কৌশল অবলম্বন ছাড়া কোন গতি নেই।

এক ঢোকে হাফ লিটার স্যালাইনের বোতলটা খালি করে বোতলটা লেকের পানিতে ছুড়ে ফেলবেন এই মুহূর্তে মেয়েটার দিকে তাঁর চোখ পড়ল। গত এক সপ্তাহ ধরেই মেয়েটাকে তিনি দেখছেন। প্রতিদিন সকালে হাঁটাহাঁটি করে লেকের ধারে। সাথে একটা কুকুর। কুকুরটার গলায় চেইন আটকানো দেখেই বোঝা যায় যে পোষা। কুকুরটা বেশ সুন্দর। তবে কুকুরের মালিকের দিকে তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। যদিও কুকুরের সৌন্দর্যের সাথে মানুষের সৌন্দর্যের তুলনা করাটাই ফালতু একটা কাজ, তারপরেও স্বীকার করতেই হবে অদ্ভুত এক সৌন্দর্য মেয়েটার চারপাশে অবিরাম ঘুরপাক খায়। মেয়েটার কাজল কালো মায়াবী চোখগুলোতে সবসময় যে কেন বিষাদ খেলে যায় সেটা অবশ্য তাঁর মাথায় ঢুঁকে না। মেয়েটাকে সুব্রত সাহেবের পছন্দ হয়েছে। একে বিছানায় না নেওয়া পর্যন্ত তিনি মনে শান্তি পাবেন না। মেয়েরা একটু বয়স্ক আর প্রতিষ্ঠিত পুরুষ পছন্দ করে সেটা তিনি জানেন। কম মেয়ের সাথে তো ঘনিষ্ঠ হন নি জীবনে। তবে তাঁর আগে মেয়েটার সাথে পরিচয় হওয়া দরকার। নিজে থেকেই মেয়েটার সাথে পরিচিত হবেন সিদ্ধান্তটা খুব দ্রুতই নিয়ে ফেললেন তিনি।

মেয়েটা তাঁর মনের কথাগুলো মনে হয় ধরতে পেরেছে। সুব্রত অবাক এবং আনন্দিত হয়ে লক্ষ্য করলেন মেয়েটা তাঁর দিকেই তাকিয়ে হাঁটা শুরু করেছে। মনের গহীনে অদ্ভুত এক পুলক অনুভব করলেন তিনি। প্রথমে কি বলে কথা শুরু করবেন সেটাই ভাবতে শুরু করলেন সুব্রত চৌধুরী।

সময় : তিন বছর তিন দিন আগে

“কোন মেয়ে অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে অথচ প্রেম করে না এর পিছনে তিনটা কারণ থাকতে পারে। আপনার এখনও প্রেম না করাটা কোন কারণের মাঝে পড়ে?”

এমনিতেই মুড অফ। কথাটা শোনার পর নীল এর মেজাজটা আরও খারাপ হয়ে গেল। বক্তার দিকে ফিরে তাকাল সে। উফ, আবারও সেই ছেলেটা? ব্লু জিন্স আর ব্ল্যাক শার্ট পড়া ছেলেটা তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসছে। ভালো করে খেয়াল করল নীল। নাহ, হাসিতে কোন বিদ্রূপ মিশে নেই। সরলতা আর প্রশংসার মিথস্ক্রিয়ায় ছেলেটার মুখ উদ্ভাসিত। রিমলেস চশমার আড়ালে ঢেকে যাওয়া চোখগুলোতে কিছুটা দুষ্টামির আভাস খেলা করলেও সব মিলিয়ে খারাপ মনে হচ্ছে না।

নীল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়ছে। রোকেয়া হলে থাকে। বন্ধুদের সাথে বের হয়েছে টাকা কালেকশন করার জন্য। তাঁদের এক ক্লাসমেটের বাবার ক্যানসার হয়েছে। ক্লাসের সবাই মিলে টাকা তুলছে বিভিন্ন স্পটে। তাঁর দায়িত্ব পড়েছে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকায়। টিএসসি-তেই কালেকশন করার কথা ছিল কিন্তু এই ছেলেটার সাথে দেখা হবে এই ভয়ে সে টিএসসি-তে যায় নি আর ছেলেটা কি না এখানেই চলে আসল?

ছেলেটার নাম মারুফ। কোন একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে ফার্মাসিস্টের চাকরি করে। নীলের ছোটবেলার বন্ধু রাফেনের ডিপার্টমেন্টের সিনিওর ভাই। রাফেনের মাধ্যমেই পরিচয়। ফেসবুকে নীলের ছবি দেখেই নাকি প্রেমে পড়ে গেছে। কি সব ফালতু ব্যাপার। ফেসবুকের ছবি দেখেই কি প্রেম হয় নাকি? সবই মোহ, কয়দিন পর মোহ কেটে গেলেই সব ভুলে যাবে। কিন্তু মারুফ তাঁর পিছু ছাড়ছে না। নীল একবার ভেবেছিল ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে মারুফকে বাদ দিবে। কি মনে করে যেন রিমুভ করে নি। গতকাল চ্যাট করবার সময় সে ভুল করে বলে ফেলেছিল যা আজ টাকা তুলবে টিএসসি-তে। আর যায় কোথায়? মারুফ বলল চলে আসবে। সত্যিই চলে আসল আর প্রথমবারের মত দুজনের দেখাটাও হয়ে গেল।

“কি বলতে চাইছেন আর কি বোঝাতে চাইছেন দয়া করে পরিষ্কার করে বলুন এবং বোঝান।“

“না মানে কোন মেয়ে যদি অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়া সত্ত্বেও প্রেম না করে তাহলে বুঝতে হবে তিন কারণের যে কোন এক কারণে সে কারও সাথে প্রেম করছে না। প্রথম কারণ, সে কারও কাছ থেকে বড় ধরণের ছ্যাকা খেয়েছে তাই প্রেম নামক বস্তুটির উপর থেকে তাঁর মন উঠে গেছে। দ্বিতীয় কারণ, সে কাউকে অনেক ভালবাসে কিন্তু প্রকাশ করতে পারছে না। সেই ভালোবাসার মানুষটির বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত সে নিজে প্রেম বা বিয়ে করতে পারবে না। অথবা শেষ কারণ, মেয়েটির সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগার রোগ আছে। তাঁর জীবনে যেই আসুক না কেন সে ভাবে এর থেকেও বেটার অপশন তাঁর জীবনে আসবে। আমার ভালোবাসার প্রস্তাব গ্রহণ না করবার পিছনে আপনার মনের ভিতর কোন কারণটা কাজ করছে?”

“উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আপনাকে কেন ভালবাসব না জানেন? আমি যাকে ভালবাসব এবং বিয়ে করব তাঁর অবশ্যই তিনটা জিনিস থাকতে হবে। প্রথমত তাঁকে কমপক্ষে ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি লম্বা হতে হবে। দ্বিতীয়ত তাঁর দেশের বাড়ি আমার এলাকায় মানে বগুড়া অথবা তাঁর আশেপাশে হতে হবে। আর তৃতীয়ত তাঁকে অবশ্যই বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হতে হবে। আপনার সাথে শুধু তিন নম্বর অপশনটা মিলে। বাকি দুইটা যেহেতু মিলছে না, তাই আমার কিছুই করার নেই।“

“এটা কোন কথা হল। আপনি জানেন আমি কত্ত ভাল একটা ছেলে? ৪ ইঞ্চি উচ্চতার জন্য আপনাকে বিয়ে করার স্বপ্নটা কি আমার অধরাই থেকে যাবে? একটু কি সেক্রিফাইস করা যায় না?”

“দুই নাম্বার অপশনটা করতে পারি কিন্তু ১ নাম্বারটা পারব না। তাই মিঃ মারুফ, আপনার কোন চান্স নাই।“

“আচ্ছা, ৪ ইঞ্চি উচ্চতার ব্যাপারটা কেন সেক্রিফাইস করতে পারবেন না বলবেন?”

“আমার বান্ধবি নিশি’র বয়ফ্রেন্ড এর হাইট ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি। এর থেকে কম হাইটের কাউকে বিয়ে করলে সে আমাকে খেপাবে। আমি তাঁর কাছে হারতে চাই না।“

কথাগুলো বলেই নীল হোস্টেলের দিকে হাঁটা দিল। মারুফ ছেলেটার মাঝে কেমন যেন অদ্ভুত এক আকর্ষণী ক্ষমতা আছে। বেশিক্ষণ সামনে থাকলে তাঁর নিজের সমস্যা হতে পারে।

“আহা, তাহলে তো আজ থেকেই হাইট বাড়ানোর জন্য কবিরাজি থেরাপি নেওয়া শুরু করতে হবে। আচ্ছা, আপনার বাবা-মা’র কি নীল রঙ খুব পছন্দ নাকি? মেয়েদের নাম নীলা হয় শুনেছি কিন্তু নীল হয় সেটা এই প্রথম দেখলাম।“

নীল কোন উত্তর না দিয়ে দ্রুত পা বাড়াল। ছেলেটা তো আচ্ছা ফাজিল। নাম নিয়ে মস্করা করে। ইশশ, আবার হাসছেও। ফাজিল কোথাকার।

হাসতে হাসতেই মারুফ নীলকে চলে যেতে দেখল। নাহ, এই মেয়েটাকে না পেলে তাঁর জীবনটাই অর্থহীন হয়ে যাবে।

সময় : বর্তমান কাল

“এক্সকিউজ মি, আমার যদি ভুল না হয় আপনি নিশ্চই সুব্রত চৌধুরী?”

সুব্রত চৌধুরী নিজের সৌভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। মেয়েটা ঠিক তাঁর পাশেই এসে বসেছে এবং নিজে থেকেই কথা শুরু করেছে। খুব সুন্দর একটা ঘ্রাণ ভেসে আসছে মেয়েটার শরীর থেকে। পারফিউমটা বেশ দামী বোঝাই যাচ্ছে। তবে গন্ধটা খুব পরিচিত লাগছে। কোথায় যেন পেয়েছিলেন? ধুর, এসব চিন্তা করার এখন কোন সময় নাই।

“জী, আমিই সুব্রত চৌধুরী। কিন্তু আপনি সেটা জানলেন কিভাবে?”

“সেটা কি খুব কঠিন নাকি। সেদিন আপনার সাক্ষাৎকার দেখলাম তো একটা বিজনেস ম্যাগাজিনে। অল্প সময়ে যারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সফল তাঁদের ৫ জনের সাক্ষাৎকার ছাপিয়েছিল। আপনিও তাঁদের মাঝে ছিলেন।“

সুব্রতর মনে পড়ল। এইতো মাসখানেক আগেই সাক্ষাৎকারটা প্রকাশিত হয়েছে একটা নামকরা বিজনেস ম্যাগাজিনে। অবশ্য সেটার জন্য সাংবাদিক ব্যাটাকে ২ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। কর্পোরেট লাইফে সফল হতে হলে মাঝে মাঝে এমন টাকা ঢালতে হয়। সামনে প্রমোশন এর সময়। তাঁর কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী কায়সার’কে টপকে CEO-র পদটা নিতে হলে MD স্যার এর সামনে নিজেকে হাইলাইট করা ছাড়া তো আর কোন উপায় নেই।

“হ্যাঁ, ওই আর কি। আসলে ডেডিকেশন নিয়ে কাজ করলে আপনি উপরে উঠবেনই। কেউ আপনাকে ঠেকাতে পারবে না। তো, আপনি কি করেন জানতে পারি?”

“এইতো মাস্টার্স শেষ করলাম মাত্রই। এখন চাকরি খুঁজছি।“

নিজের সৌভাগ্য দেখে আবারও অবাক হয়ে গেলেন সুব্রত। এও কি সম্ভব? এ যে দেখছি মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। বোঝাই যাচ্ছে মেয়েটা তাঁর কাছে চাকরির ব্যাপারে সাহায্য চাইবে। হ্যাঁ, সেই সুযোগটাই তিনি নিবেন। একবার যদি মেয়েটাকে নিজের মহানুভবতায় পটাতে পারেন তাহলে বিছানায় নেওয়া কোন সমস্যাই হবে না। এর আগেও অনেক মেয়েকেই তিনি এইভাবেই ভোগ করেছেন। বেশিরভাগই স্বেচ্ছায় বিছানায় এসেছিল। একটা মেয়েই একটু ঝামেলা করেছিল এই যা। এই মেয়েটার মৃদু হাসি তাঁকে চরম উত্তেজিত করে দিচ্ছে। নাহ, এই সুযোগ মিস করা যাবে না।

“আমি কি আপনাকে কোনভাবে সাহায্য করতে পারি?”

সময় : দুই বছর দুই দিন আগে

ফেসবুকে ঢুঁকেই নীল দেখল একটা মেসেজ এসেছে। নিশ্চই মারুফ পাঠিয়েছে। হুম, মারুফই মেসেজ পাঠিয়েছে। অস্বীকার করা যাবে না, মারুফের মেসেজগুলো পড়তে তাঁর দারুন লাগে। ছেলেটা এত অসাধারণ কিভাবে লিখে? একটু পাগলও বটে। তাঁকে ডাকে কচিপাতার আম্মু বলে। বলে কি না তাঁদের বিয়ের পর ছেলে হলে নাম রাখবে কচি আর মেয়ে হলে পাতা। কত্ত খারাপ। তাঁর জন্মদিনের দিন হোস্টেলের ঠিকানায় কেক পাঠিয়েছিল। সেই কেক খেতে খেতে রুমমেটরা কি পচানোটাই না পচিয়েছে তাঁকে। মারুফ পারেও।

“প্রিয় কচিপাতার আম্মু,

গত একবছর ধরে আমি তোমার পিছনে ঘুরছি। মেয়েদের সিক্সথ সেন্স অসাধারণ। স্রষ্টা তোমাদেরকে সুরক্ষিত করার জন্যই তোমাদের সিক্সথ সেন্স অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমি তোমাকে ভালোবাসি কি না সেটা তোমার থেকে ভাল কেউ বুঝবে না। এতদিনেও যদি তোমাকে আমার ভালোবাসার মাত্রা বোঝাতে না পারি তাহলে আর কোনদিনও পারব না। আজ শেষবারের মত তোমাকে বিরক্ত করতে আসব। যেই মানসিক যন্ত্রনায় আমি আছি সেটা থেকে মুক্তি আমাকে পেতেই হবে। রাত ৮ টা থেকে ৯ টা পর্যন্ত আমি তোমার হোস্টেলের সামনে অপেক্ষা করব। যদি আমার প্রতি সামান্য পরিমান ভালোবাসা তোমার মনে জন্ম নেয় তাহলে তুমি দেখা করতে এসো। আর যদি তা না হয়, তাহলে এটাই তোমাকে লেখা আমার শেষ মেসেজ। আর কোনদিন তোমার সাথে আমার যোগাযোগ হবে না। বিদায় নেওয়ার আগে তোমাকে একটা কবিতা ডেডিকেট করলাম। অনেক ভাল থেকো প্রিয়তমা।

আমি সিদ্ধার্থ হতে চাই
চাই লুম্বিনির জঙ্গলে গভীর রাত্রিতে নিশাচর পাখি হয়ে উড়ে যেতে
দেখতে চাই গৃহত্যাগী জ্যোৎস্নার উথালপাতাল রূপ।

আমি নীলকণ্ঠ পাখি হতে চাই
চাই অরণ্যের উপাখ্যানে এঁকে দিতে মায়াবি কল্পনার বিমূর্ত স্বাক্ষর
গাইতে চাই অতল সমুদ্রের ঢেউ দোলানো অবিনাশী গান।

আমি নির্বাক কবি হতে চাই
চাই চুমুতে ভরিয়ে দিতে মনের ক্যানভাসে আঁকা তোমার প্রতিবিম্বের প্রতিচ্ছবি
লিখতে চাই দুনিয়া কাঁপানো আর একটা প্রেমের কবিতা।

কেবল, তোমাকেই চাই না হে সহচরী
চাই না তোমার নরম হাতের আলতো পরশ
চাই না তোমার শ্যাম্পু সুবাসিত চুলের ঘ্রান
চাই না তোমার শুষ্ক ঠোঁটের কঠোর শাসন

চাইছি কেবল শুন্যতা।

ইতি
কচিপাতার আব্বু”

হোস্টেলের বাইরে বের হবে না এই ব্যাপারে রাত সাড়ে ৮ টা পর্যন্ত নীল নিশ্চিত ছিল। কিন্তু এরপরই তাঁর মনের ভেতরটা কেমন জানি উলটপালট হয়ে গেল। নীল জানে যে মারুফ তাঁকে অনেক ভালোবাসে। এটাও সে বুঝতে পারে মারুফের মত করে এমনভাবে আর হয়ত কেউ তাঁকে ভালবাসতে পারবে না। কিন্তু কেন জানি সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এই সিদ্ধান্তহীনতার অভ্যাসের জন্য জীবনে তাঁকে অনেক কিছু হারাতে হয়েছে। আর কত?

৯ টা বাজতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল নীল। তাড়াহুড়া করে তৈরি হয়ে নিল সে। বাইরে বের হতে গিয়ে দেখল বৃষ্টি হচ্ছে। ইশশ, মারুফ কি ভিজছে নাকি বৃষ্টিতে? ৯ টা বাজার পর চলে যায় নি তো? ছাতা নিয়ে বের হয়ে হোস্টেলের গেটে আসতে আসতে ৯ টা ১০ বেজে গেল। হোস্টেলের গেটে এসে চারপাশে তাকাল নীল। কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি দেখে সবাই চলে গেছে। মারুফও কি চলে গেছে নাকি? তাই তো মনে হচ্ছে। হঠাত করেই নিজেকে কেমন নিঃস্ব মনে হতে লাগল নীলের। সব কিছুই কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। নীল নিজেও জানে না কখন তাঁর চোখ অশ্রুতে ভরে উঠেছে। ধীরে ধীরে অশ্রুগুলো গাল বেয়ে নিচে নামা শুরু করল।

নীল এটাও জানে না তাঁর চোখের বাঁধভাঙা প্লাবন আর কেউ না দেখলেও মারুফ ঠিকই দেখছে। বৃষ্টি হচ্ছিল দেখে সে ভাষা ইন্সটিটিউটের বারান্দায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। জায়গাটা কিছুটা অন্ধকার তাই হোস্টেলের গেট থেকে দেখা যায় না। নীল তাঁকে না দেখলেও নীলের অশ্রুমাখা মুখ দেখে মারুফ ঠিকই বুঝতে পেরেছে তাঁর এতদিনের পরিশ্রম অবশেষে সার্থক হয়েছে।

সময় : বর্তমান কাল

“হ্যাঁ, পারেন। আসলে আপনার সাহায্যই আমার প্রয়োজন।“

“কোন ধরণের চাকরি করতে চান?”

“আসলে আমার চাকরির প্রয়োজন সেটা ঠিক, কিন্তু আপনার কাছে আমি চাকরি চাইব না। আমি পার্টটাইম সাংবাদিকতা করি। একটা বিষয় নিয়ে আপনার সাথে আলাপ করতে চাই যদি আপনার আপত্তি না থাকে।“

কিছুটা হতাশ হলেন সুব্রত চৌধুরী। অনেক বেশি এডভান্স চিন্তা করা শুরু করে দিয়েছিলেন তিনি। সাংবাদিকদের খুব একটা পছন্দ করেন না তিনি। তবে এটাও ঠিক এদেরকে একবার কিনে ফেলতে পারলে অনেক ফায়দা পাওয়া যায়। এই মেয়েটাকেও না হয় কিনেই নিবেন। কতই বা আর চাইবে এই মেয়ে। একটা চাকরির অফার আর একটা বড় অংকের টাকা দিলেই বশ হয়ে যাবে। আর একবার বশ হয়ে গেলে, ভাবতে গিয়ে আবারো উত্তেজনা পেয়ে বসল তাঁকে। কন্ট্রোল সুব্রত, কন্ট্রোল। অনেক সময় আছে হাতে। ধীরে ধীরে এগুতে হবে বাছা।

“না না, আপত্তি থাকবে কেন? বরং আপনার উপকারে আসতে পারলে আমার ভালই লাগবে। বলুন কি জানতে চান?“

“একবছর আগে আপনার অফিসের একজন কলিগ খুন হন। অনেকেই বলেন খুনের সাথে আপনারও নাকি সম্পৃক্ততা আছে। কথাটা কি ঠিক?”

সময় : এক বছর এক দিন আগে

“আর কতক্ষণ লাগবে তোমার সিনেপ্লেক্সে আসতে? বেশি দেরী করলে কিন্তু আমি চলে যাব বলে দিলাম।“

“আর মাত্র আধা ঘন্টা অপেক্ষা কর কচিপাতার আম্মু। আমি অফিস থেকে বের হয়ে গেছি।“

“আমি কিন্তু টিকেট কেটে ফেলেছি। সাড়ে ৭ টায় সিনেমা শুরু হবে। এর মাঝে না আসতে পারলে তোমার সাথে সম্পর্ক খতম। আর শোন, তোমার গিফট পছন্দ হয়েছে। ওই গিফট আরেকটা দিবে বলেছিলে। সেটা আনছ তো সাথে করে?“

“না আনলে কি আমাকে তুমি আস্ত রাখবে বান্দরী, সরি সুন্দরী?”

“কি? আবার আমাকে বান্দরী বলস? তোমার সাথে কথা নাই। যাও, দূরে গিয়ে মর।“

লাইনটা কেটে গেছে। হেসে ফেলল মারুফ। মেয়েটা এত্ত পাগলী সেটা আগে বোঝা যায় নি। নীলে’র এই পাগলামিটুকু মারুফ খুব এনজয় করে। হুট করে রাগ করে, আবার রাগ ভাঙতেও সময় লাগে না। নীলকে রাগাতে তাঁর ভালই লাগে। রাগলে নীলকে অদ্ভুত সুন্দর লাগে। সেই রাগ ভাঙানোর মজাই অন্যরকম। তাঁদের সম্পর্কের বয়স একবছর হতে চলল। দেখতে দেখতে একটা বছর কেটে গেল। মারুফের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় এই একটা বছর। সামনের মাসেই তাঁরা বিয়ে করতে চলেছে। দুজনেরই পরিবারের লোকজন জানে তাঁদের সম্পর্কের বিষয়টা এবং সবাই মেনেও নিয়েছে। আম্মা তো ইতোমধ্যে বিয়ের অলংকারের অর্ডারও দিয়ে ফেলেছে। একমাত্র ছেলের বউ বলে কথা।

পকেটে হাত দিয়েই চমকে গেল মারুফ। শিট, পেন ড্রাইভটা ফেলে এসেছে অফিসে। নীল শুনলে রেগে আগুন হয়ে যাবে। নীলের জন্য দুইটা মুভি ডাউনলোড করে পেনড্রাইভে রেখেছে আজ বিকেলে। কিন্তু ড্রয়ার থেকে পেন ড্রাইভটা আর পকেটে রাখা হয় নি। কি করা যায়? সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আজ বৃহস্পতিবার বলে কাজের চাপ একটু বেশিই ছিল তাই অফিস থেকে বের হতে বেশ দেরী হয়ে গেছে মারুফের। সবার শেষে অফিস থেকে বের হয়েছে সে। পিওন তালা দিয়ে চলে গেলে তো বিপদ।

মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আবারো অফিসে ফিরে চলল মারুফ। ৭/৮ মিনিট লাগবে অফিসে পৌঁছাতে। সেখান থেকে পেনড্রাইভটা নিয়ে যদি সিএনজি নেওয়া যায় তাহলে সময়মতই সিনেপ্লেক্সে পৌঁছাতে পারবে সে। না পারলে কপালে খারাপি আছে আজ।

অফিসে ঢুঁকেই নিজের ডেস্কে চলে আসল মারুফ। ২ নম্বর ড্রয়ারটা খুলে জায়গামতই পেল পেনড্রাইভটা। যাক বাবা বাঁচা গেল। এখন রকেটের গতিতে সিনেপ্লেক্সে পৌঁছাতে হবে। অফিসে কেউ নেই। লাইটগুলোও অফ করা। বের হওয়ার জন্য রওনা দিবে এমন সময় শব্দটা কানে আসল তাঁর। কান খাঁড়া করে আবারো শোনার চেষ্টা করল সে। ওইতো আবারও শোনা যাচ্ছে শব্দটা। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? এই সময়ে অফিসে কোন নারীকন্ঠের কান্নার আওয়াজ কেন শোনা যাবে?

সময় : বর্তমান কাল

বেশ ভালই চমকে গেছেন সুব্রত চৌধুরী। মেয়েটার অভিব্যক্তি হঠাত করেই পাল্টে গেছে। মুখের মৃদু হাসিটাও উধাও। সাংবাদিকের স্বাভাবিক গাম্ভীর্য আর মৌনতা ভর করেছে মেয়েটার চোখেমুখে। মেয়েটা এই প্রসঙ্গ তুলবে সেটা তাঁর কল্পনাতেও আসে নি। সাবধানে কথা বলতে হবে। তিনিও তাঁর চেহারায় মৌনতা আর গাম্ভীর্যের একটা প্রলেপ লাগানোর চেষ্টা করলেন।

“আপনি এমন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছেন যেটা অনেক আগেই মিটে গেছে। আমার ব্যাপারে যে সব কানাঘুষা চলে সেগুলো নিতান্তই কর্পোরেট অপপ্রচার। আমি GM থেকে CEO হতে যাচ্ছি যেটা অনেকেরই পছন্দ না। নির্দিষ্ট করে বললে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী কায়সার সাহেব তো একদমই চান না যে আমি CEO হই। তাই এইসব অপপ্রচার চালিয়েছিলেন তিনি আমার নামে।“

“তাঁর মানে আপনি বলতে চাইছেন ওই লোকটার খুনের ব্যাপারে আপনার কোনই সম্পৃক্ততা নেই?”

“অবশ্যই নেই। ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে থানা-পুলিশ সবাই তদন্ত করে দেখেছে ব্যাপারটা একটা ছিনতাই এর ঘটনা ছাড়া আর কিছুই না। আমাদের অফিসটা খুব নিরিবিলি জায়গায়। বেচারা অফিস থেকে বের হয়ে বাসায় যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে। কপাল নেহাতই মন্দ ছিল তাই হয়ত বাঁধা দিতে গিয়েছিলো। আমি বুঝি না, ছিনতাইকারীর সাথে কেন যে লোকে বীরত্ব দেখাতে যায়। সম্পদ ফিরে পাওয়া যায়, জীবন কি আর ফেরত আসে?”

“আপনার ওই কলিগের নামটা জানি কি ছিল?”

“দাঁড়ান মনে করে নেই। অনেক দিন আগের ঘটনা তো। হ্যাঁ মনে পড়েছে। মারুফ নাম। ফার্মাসিস্ট হিসাবে কাজ করত আমাদের কোম্পানিতে। খুব ক্রিয়েটিভ একটা ছেলে ছিল। আহা, একটা মূল্যবান জীবনের কি নিদারুণ অপচয়।“

“আমি যদি বলি আমার কাছে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আছে যে আপনিই খুন করেছেন মারুফকে তাহলে আপনি কি বলবেন?”

“কি সব উল্টাপাল্টা বকছেন আপনি? অনেক সময় দিয়েছি আপনাকে। এখন যেতে পারেন। আপনার সাথে কথা বলাই ভুল হয়েছে।“

“শান্ত হোন মিঃ সুব্রত। প্রমাণটা তো দেখুন আগে। একবার ভাবুন তো এই ব্যাপারটা ফাঁস হলে আপনার অবস্থা কি দাঁড়াবে?”

উঠে দাঁড়িয়েছিলেন সুব্রত চৌধুরী। আবার বসলেন তিনি। মেয়েটা তাঁর পার্স থেকে কি জানি বের করছে। সুব্রত চৌধুরী অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন তিনি ঘামতে শুরু করছেন। হার্টবিটও বেড়ে গেছে। মেয়েটা কি বের করবে কে জানে? ব্যাপারটা দেখা যাচ্ছে খুব খারাপ দিকে মোড় নিচ্ছে। এ কি ফ্যাসাদে পড়লেন তিনি?”

সময় : এক বছর এক দিন আগে

শব্দের উৎসের দিকে এগিয়ে চলল মারুফ। GM স্যারের রুমের দিক থেকেই শব্দটা আসছে বলে মনে হচ্ছে। হুম, তাঁর ধারণা সঠিক। স্যারের রুমে আলো জ্বলছে। আচ্ছা এই কারণেই পিওন অফিসে তালা দিয়ে যায় নি। স্যার মাঝে মাঝেই অনেক রাত করে অফিস থেকে বের হন। লোকটা কাজের কিন্তু তাঁর নামে অনেক মুখরোচক কাহিনী শোনা যায়।

মোবাইলটা ভাইব্রেশন মুডে দেওয়া ছিল। পকেটটা কেঁপে উঠায় কিছুটা বিরক্তই হল মারুফ। মোবাইলটা হাতে নিয়েই চিন্তায় পড়ে গেল। নীল ফোন দিয়েছে। রিসিভ না করলে তো কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিবে।

“তুমি কতদূর আসলে?”

“নীল, চুপ করে শোন। আমি অফিসে এসেছি। কিছু একটা ঘটছে অফিসে। এখন কথা বলা সম্ভব না প্লিজ রাগ করো না। এসে ডিটেইলস বলব।“

কলটা কেটে দিয়ে GM স্যারের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল মারুফ। কোন সন্দেহ নেই আওয়াজটা স্যারের রুম থেকেই আসছে। একবার ইতস্তত করে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে ফেলল সে।

যা দেখল তাঁর জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না মারুফ। লিজা নামে যেই মেয়েটা স্যারের পিএ হিসাবে নতুন নিয়োগ পেয়েছে তাঁকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় আবিষ্কার করল মারুফ। স্যারের অবস্থাও সুবিধার না। বোঝাই যাচ্ছে প্যান্টটা এইমাত্র পড়লেন। একনজর তাকিয়েই মারুফ নিশ্চিত হয়ে গেল ধর্ষণের ঘটনাটা ঘটেই গেছে। তারমানে স্যারের নামে যেইসব মুখরোচক কথাগুলো শোনা যায় সেগুলো মিথ্যা নয়। ছিঃ, যেই মানুষটাকে সে এত শ্রদ্ধা করে সেই মানুষটার ভিতরটা এত্ত নোংরা? কি করবে কিছুই বুঝতে না পেরে হতম্ভব হয়ে তাকিয়ে রইল মারুফ।

সুব্রত চৌধুরীর ক্যারিয়ার জীবনে সাফল্যের পিছনে সবথেকে বড় যেই গুনটা কাজ করেছে সেটা হচ্ছে মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিতে পারার ক্ষমতা। এবারো তাঁর ব্যাতিক্রম হল না। ড্রয়ার থেকে পিস্তলটা বের করে মারুফের দিকে তাক করলেন তিনি।

“সরি মারুফ, তোমাকে বাঁচিয়ে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব না। তুমি খুব ভাল একটা ছেলে কিন্তু তোমার দুর্ভাগ্য যে ভুল জায়গায় ভুল সময়ে তুমি উপস্থিত হয়েছ। I’m extremely sorry.”

গুলির ধাক্কাটা খুব জোরেই অনুভব করল মারুফ। ফ্লোরে পড়ে যাবার সময় কাচ ভাঙার আওয়াজটা কানে খুব বেশিই বাজল। আহা, নীলকে একটা পারফিউফ কিনে দিয়েছিল কিছুদিন আগে। এত পছন্দ করেছিল বেচারি। তাই আরেকটা পারফিউম নিয়ে যাচ্ছিল নীলকে দিবে বলে। আর দেওয়া হল না। এই আফসোসটা সঙ্গে নিয়েই মারুফ মারা গেল।

সময় : বর্তমান কাল

সাংবাদিক মেয়েটা পার্স থেকে একটা মোবাইল বের করল। কিছুক্ষণ টিপাটিপির পরই শোনা গেল,

সরি মারুফ, তোমাকে বাঁচিয়ে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব না। তুমি খুব ভাল একটা ছেলে কিন্তু তোমার দুর্ভাগ্য যে ভুল জায়গায় ভুল সময়ে তুমি উপস্থিত হয়েছ। I’m extremely sorry.

“এই হচ্ছে আমার প্রমাণ মিঃ সুব্রত। কি এখন বিশ্বাস হচ্ছে যে আপনি ফেঁসে গেছেন?”

মেয়েটার মুখে আবারও সেই স্মিত হাসিটা ফেরত এসেছে। সুব্রত চৌধুরী পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছলেন। তাঁর মাথা কাজ করছে না এই মুহূর্তে। মেয়েটা আবার বলে উঠল –

“আমি জানি আপনার মাথা এই মুহূর্তে কাজ করছে না। ভাবছেন এই জিনিস আমি কোথায় পেলাম, কিভাবে পেলাম, তাই না? সেদিন অফিসে আপনার রুমে ঢোকার আগে মারুফের কাছে একটা ফোন আসে। ফোনটা করেছিল তাঁর প্রেমিকা এবং হবু স্ত্রী নীল। মারুফ তাড়াহুড়া করতে গিয়ে কল কাটতে গিয়ে লাউডস্পিকারের সুইচ অন করে দেয়। নীলের কেন জানি সন্দেহ হয়। তাই সে রেকর্ডার অন করে সাথে সাথেই। আপনার কথাগুলো রেকর্ড হয়ে যায়। এখন বলুন মিঃ সুব্রত, আর কোনও প্রমাণ কি দরকার আছে?”

সুব্রত তাঁর নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছেন। তিনি বুঝতে পারছেন তাঁকে কি করতে হবে। খুব শান্ত ভঙ্গিতে তিনি কথা বলা শুরু করলেন,

“দেখুন, অনেকদিন পার হয়ে গেছে। এখন চাইলেও আমাকে ফাঁসাতে পারবেন না কিছুতেই। সফটওয়ার দিয়ে সহজেই ভয়েস পরিবর্তন করা যায় আজকাল। আপনি বড়জোর আমাকে থানা-পুলিশের ঝামেলায় ফেলে কিছুটা হেনস্থা করতে পারেন। সেটা যেন না করেন তাঁর জন্য আপনাকে কত দিতে হবে বলুন? দ্রুত বলুন। আমার অফিসের তাড়া আছে।“

খুব মজার কোন কথা শুনছে এমন ভঙ্গিতে হেসে উঠল মেয়েটা।

“আমি তো আপনার কাছে টাকা চাই না মিঃ সুব্রত।“

“তাহলে কি চান?”

“আপনার জীবন।“

“হোয়াট, কি বলছেন আপনি? হু আর ইউ?”

মেয়েটার মুখ থেকে নিমেষেই সমস্ত কোমলতা বিদায় নিল। তাঁর স্থানে ভর করল রাজ্যের হিংস্রতা। এই রূপ দেখে ঘাবড়ে যাবে যে কেউ। সুব্রতও ঘাবড়ালেন। ধীরে ধীরে পিছু হটা শুরু করলেন তিনি।

“আমি কে জানতে চাও সুব্রত? আমি হচ্ছি নীল। মারুফের প্রানের থেকেও প্রিয় নীল। আর একমাস পর আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। তুমি আমাকে বিয়ের আগেই বিধবা করেছ। তুমি ভাবলে কি করে তোমাকে আমি ছেড়ে দিব? কেন এতদিন তোমার সামনে আসি নি জান? কারণ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। জানতাম থানা-পুলিশে দৌড়াদৌড়ি করে কিছুই হবে না, কারণ তোমার হাত অনেক লম্বা। তাই ওদিকে যাই নি। এত সহজ শাস্তি তোমার জন্য না। তোমার জন্য তৈরি করেছি আমি ভয়ঙ্কর শাস্তি। তৈরি হও সেই শাস্তি গ্রহণ করবার জন্য।“

সুব্রত চৌধুরী সত্যিই ভয় পেয়েছেন এবং সেটা লুকানোর কোন চেষ্টাই তিনি করছেন না। তাঁর ভয়ের কারণ যতটা না নীল তাঁর থেকেও বেশি নীলের সাথের কুকুরটা। ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে কুকুরটা তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। নীলের হাতে বাঁধা চেইনটা খুলে তাঁর দিকে প্রবল আক্রোশে ঝাপিয়ে পড়তে চাইছে যেন। এমন সময় হঠাত করেই শান্ত হয়ে গেল নীল।

“এই যে কুকুরটা দেখছেন, এর নাম রকি। রকিকে আমি ৬ মাস আগে কিনেছি। এই ৬ মাস আমি তাঁকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। কি প্রশিক্ষণ জানেন? একটা ৫ ফুট লম্বা কাঠের পুতুলের মুখটা আপনার ছবি দিয়ে ঢেকে পুতুলটার গলায় খাবার ঝুলিয়ে প্রতিদিন খাইয়েছি রকিকে। রকি লাফ দিয়ে পুতুলটার গলায় কামড় দিয়ে সেই খাবার নিয়ে আসত। এই যে দেখুন, রকি এখন আপনার গলার দিকে তাকিয়ে আছে। সে ভাবছে আপনার গলায় কামড় দিয়ে খাবার সংগ্রহ করবে। আমি ছাড়লেই সে আপনাকে চিবিয়ে খাবে। কি, বাঁচতে চান। তাহলে দৌড়ান।“

নীল কথা শেষ করবার আগেই সুব্রত চৌধুরী দৌড় শুরু করে দিয়েছেন। নীল কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চেইনটা ছেড়ে দিল। সাথে সাথেই গর্জন করে রকি ছুটল তাঁর টার্গেটের পানে।

প্রথম কামড়টা লাগলো পায়ে। পড়ে গেলেন সুব্রত চৌধুরী। এই সুযোগে তাঁর উপর চেপে বসল রকির ভারী দেহ। গলা খুঁজে পেতে রকির কোন সমস্যাই হল না। গলায় প্রথম কামড়টা লাগার সাথে সাথেই তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলেন সুব্রত চৌধুরী। তাঁর চিৎকারে লেকের কাকগুলো কা কা শব্দ করে উড়ে গেল। সকালে হাটতে বের হওয়া লোকজনও আতঙ্কের সাথে চেঁচাতে শুরু করে দিল। ঠিক এই সময়েই তাঁর মনে পড়ল মেয়েটার শরীরে থেকে যেই ঘ্রান আসছিল তাঁর উৎস কোথায়? মারুফকে গুলি করার পর সে যখন পড়ে যায় তখন পকেট থেকে একটা পারফিউমের শিশি ফ্লোরে পড়ে ভেঙে যায়। সেই সুবাস আর এই সুবাসের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। যেমন পার্থক্য নেই মারুফের গুলি খেয়ে মৃত্যু আর তাঁর কুকুরের কামড় খেয়ে মৃত্যুর মাঝে। মৃত্যু তো মৃত্যুই।

১০ thoughts on “একটি প্রেম অথবা প্রতিশোধের গল্প

    1. অনেক অনেক
      অনেক অনেক :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: 😀

  1. খুব ভালো লাগল। বেশ গোছান
    খুব ভালো লাগল। বেশ গোছান লেখা। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  2. এজন পরিপক্ক গল্পকারের গল্প
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    এজন পরিপক্ক গল্পকারের গল্প পড়লাম।

  3. কেমন লিখেছেন, সে সম্পর্কে
    কেমন লিখেছেন, সে সম্পর্কে কিছুই বলবো না… শুধু জানিয়ে রাখছি, এক বছরের একটু বেশি ব্লগ জীবনে এই প্রথম কোন পোস্ট প্রিয় তে নিলাম…………

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *