আনকোরা লেখকের আসা যাওয়ার খেলা

একটা সময় ছিলো ফেসবুকে মানুষ সময় নষ্ট করে গল্প লেখতো। গল্প বলতে কি, পুরো লেখা জুড়ে দুটো মানুষের কথোপকথন আর সস্তা প্রেমের কাহিনী যেগুলো বাংলা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। এসব গল্পে কেবল আবেগ, প্রেম আর একটি ভিলেন। রেডিওমুন্না, রেডিও বাংলাদেশ এসব পেজ খুব বিখ্যাত হয়ে গেল ফেসবুকে গল্প প্রকাশের ক্ষেত্রে। পুরো পেজ জুড়ে কেবল গল্প আর গল্প। যদিওবা এসব গল্পের লেখকেরা কেউ কেউ প্যাটার্ন পাল্টে অন্য রঙ ধারণ করেছেন আবার কেউ কেউ হারিয়ে গেছেন সময়ের সাথে।

আমার বেলায় প্যাটার্ন পাল্টেছে। হুট করে একদিন মনে হলো সময় নষ্ট করে যে সস্তা গল্পগুলো লেখছি দিনদিন এগুলো জঘন্য থেকে আরো বেশি জঘন্যতম হচ্ছে। এর চেয়ে অন্য কিছুর দিকে মন দেওয়া যাক। এসব পেজেই পরবর্তীতে মোটিভেশনাল লেখালেখি শুরু করে দেই। পাশাপাশি নিজের আইডি থেকেও। প্রথম প্রথম লোকমুখে হাসাহাসি শোনা গেলেও কয়েকদিন পরেই দেখলাম এসব জিনিসপত্র মার্কেটে খুুব খাচ্ছে। শুরু হলো লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের খেলা। বাড়ছে ফলোয়ার। তবে মজার ব্যাপার হলো একইসাথে জন্ম নিলো আমার বেশ কিছু হ্যাটার্স। দশজন প্রশংসা করলে দুজন গালাগালি করতো। সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে এসব শুরু করেছি, কেউ কেউ আবার জীবন দিয়ে হলেও আমাকে কপিবাজ প্রমাণ করার চেষ্টা করতো। কিন্তু দিনশেষে ব্যর্থতা তাদের ঘিরে ধরেছে।

একটা সুযোগ আসলো সবার সামনে নিজেকে একজন লেখক হিসেবে তুলে ধরার। কিছুতেই এমন সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। অমর একুশে বইমেলার মত বড় একটি প্ল্যাটফর্মে গল্প প্রকাশ করলাম। প্রথমবার বলে অনেকেই শুভকামনা জানিয়েছে, পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তখনো মনে হলো ফেসবুকের সেই সস্তা প্রেমের গল্প থেকে বের হতে পারি নি। প্রকাশ হওয়া গল্পে সেই প্রেমের কাহিনীটাই ঘুরে ফিরে চলে এসেছে। পরের বছর প্রেম-টেম বাদ দিয়ে একদম ইমোশনাল জায়গায় হিট করে বসলাম। রেল স্টেশনের একটি ভিখারি ছেলেকে নিয়ে গল্প বানিয়ে ফেললাম। এবার অবশ্য আগের থেকে একটু বেশিই সাড়া পাওয়া গেল। আগের বছর যারা খুব কষ্ট করে ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ভালো বলেছিলো এবারের গল্পে এরা অবশ্য কিছুটা হলেও খুশি। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার ঘটেছে এর পরের বছর। এবার আর গল্প নয়, একদম লেখক থেকে কবি হয়ে উঠার আপ্রাণ চেষ্টা। বইমেলার জন্য একটি কবিতা জমা দিয়েছিলাম এবং সেটাই প্রকাশ হলো। বেশ কিছু মানুষ আগ্রহ নিয়ে আমার কবিতা পড়েছে। আবার অনেকেই নাক ছিটকে পাশ দিয়ে চলে গেছে।

যাই হোক এসব নিয়ে আমার কখনোই মাথা ব্যথা ছিলো না। কেউ প্রশংসা করলে ভালো লাগতো আবার খারাপ বললে তখন কিছু করার ইচ্ছে থাকলেও করার নেই। সত্যটা সবসময়ই তেঁতো। এভাবে চলতে চলতে একটা সময় হুট করে মাথা থেকে গল্প কবিতার ভূত উধাও। এবার ভর করেছে সম্মানীর লোভ। অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে লেখা। সব ছেড়ে কনটেন্ট লেখার ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়া আমিকে দেখে আমি নিজেই অবাক। আস্তে আস্তে পকেটে কিছু টাকা আসতে দেখে ভালোই লাগছে।

এরপর হলো আগের থেকেও ভয়ংকর অবস্থা। দেশের সুনামধন্য একটি ওয়েবসাইটে শুরু করলাম সিনেমার রিভিউ লেখা। একবার একটি জাতীয় পত্রিকায় আমার রিভিউ নিয়ে আলোচনা দেখে নিজেই হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না। রিভিউ লেখেও কিছু টাকা কামিয়েছি। এরপর মনে হলো এবার একজন ব্লগার হিসেবে নিজেকে পরিচিত করা যাক। কিন্তু এখানে ভালো করে শুরু করার আগেই হারিয়ে গিয়েছি।

এরপর শুরু হলো দেশ এবং দেশের বাইরের ব্যান্ড মিউজিক নিয়ে লেখা। এ দিকটায় আমি সবচেয়ে বেশি কমফোর্টেবল। কারণ এদের নিয়েই দিন রাত চলাফেরা। এবার সবচেয়ে বেশি সফলতা এবং জনপ্রিয়তা পাওয়া গেল। কিন্তু এই প্যাটার্নেও বেশিদিন না। হুট করে একদিন সবকিছুর বাইরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। মনে হলো এসব বাদ দিয়ে নিজেকে অন্য কিছুতে ব্যস্ত রাখতে হবে। কিন্তু কতদিন? এই প্রশ্নের উত্তরটা যে জানা নেই।

আজও ফেসবুকে মাঝেমধ্যে কিছু মানুষের ম্যাসেজ পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। কেউ কেউ বড্ড আফসোস নিয়ে আবদার করে আবার শুরু করতে। কিন্তু কিভাবে? না লেখতে লেখতে যে ল্যাপটপ কিংবা ফোনের কি-বোর্ডও আমার আঙুলের ছাপ ভুলে গিয়েছে। কেউ কেউ বলে একেবারে শূন্য থেকে পুরনো দিনের সস্তা প্রেমের গল্পগুলোও বেশ ভালো ছিলো। তখনই মনে হয় আবার ফিরতে হবে পুরনো রাস্তায়। তাইতো একটু একটু আবার শুরু করার চেষ্টা। ল্যাপটপ কিংবা ফোনের কি-বোর্ডে আবারো পুরনো আঙুলের ছাপ বসালে পারলেই হয়ে যাবে এ বিশ্বাসটা আছে।

কিন্তু একজন লেখক কিংবা কবি কখনোই জনপ্রিয়তা কিংবা সম্মানীর আশায় লেখে না। হয়তো অনেক সময় লোভ এসে কাঁধে ভর করে কিন্তু সেটা কখনোই চালিয়ে যাওয়া উচিত না। কেউ রাত জেগে লোডশেডিংয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে আমার লেখা পড়বে এমনটা আশা করলে লেখাই উচিত না। যদি ভেতর থেকে একটা গল্প বের করা যায় তবে বাকি রাস্তাটুকু সে নিজেই বের করে নিবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *