কৃষ্ণচূড়া

ফাহিম , একটি বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক । অনেক নামকরা লেখকের গল্প, কবিতা ওর হাত দিয়ে প্রকাশিত হয় । তাছাড়া ফাহিম নিজেও মাঝেমাঝে গল্প লেখে । সেগুলোও বেশ জনপ্রিয় পাঠকমহলে । ওর ভক্তের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয় । ফাহিম কিছুটা অহংকারী, মানুষের সাথে আলাদা ফর্মালিটি রেখে কথা বলে । কাউকে অপছন্দ হলে তাকে অপমান করতেও ছাড়ে না ।
সুস্মি , একটি সাধারণ মেয়ে । প্রেমের গল্প লিখতে ভালোবাসে । প্রেম, ভালোবাসা ইত্যাদি নিয়ে ওর অনেক আগ্রহ । ভবিষ্যতে অনেক বড় লেখক হবার স্বপ্ন দেখে সুস্মি । স্বভাবের দিক থেকে একদমই নরম, কারো সাথে উঁচু গলায় কথা পর্যন্ত বলে না ।

সেই সুস্মি চায় ফাহিমের সম্পাদনায় ওর গল্প এবারের ভালোবাসা দিবসের বিশেষ ক্রোড়পত্রে ছাপা হোক । ভাবতে ভাবতে একদিন সুস্মি পত্রিকা অফিসে হাজির, ফাহিমের সাথে দেখা করবে । কোনো এক ফাঁকে দেখা হওয়ার সুযোগ মিললো । সুস্মি দুরুদুরু বুকে ফাহিমের রুমের দরজা খুললো ।
– May I come in?
– Yes, come.
সুস্মি রুমে ঢুকলো । ওপাশে একজন তরুণ বসে আছে । চোখে ভারী চশমা, মুখে ব্যস্ততার ছাপ স্পষ্ট । মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা পড়ছে । সুস্মি যা ভেবেছিলো তারচেয়েও গম্ভীর একজনকে দেখছে । ফাহিম চোখ উপরে না তুলেই গম্ভীর গলায় বললো, ‘বসুন । বলুন, আমি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’
সুস্মি বসতে বসতে মনের উত্তেজনা যথাসম্ভব চেপে রেখে শান্তস্বরে জবাব দিলো, ‘এবারের ভালোবাসা দিবসের সংখ্যার জন্য আমি গল্প লিখে জমা দিতে চাই ।’
-ম্মম, কোনো অভিজ্ঞতা আছে?
-জী, স্কুল-কলেজের ম্যাগাজিনে এডিটিঙের কাজ করেছি । আর টুকটাক লেখালেখি করি ।
-(একটু তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে)না, আমি বলতে চাচ্ছি জীবনে প্রেম-ভালবাসার অভিজ্ঞতা আছে আপনার?
-না মানে…
-আরে, অভিজ্ঞতা ছাড়া গল্প লিখবেন কীভাবে?
-কিছুটা আছে ।
-ঠিকাছে । এত সহজে তো আপনার গল্প ছাপাতে পারিনা । আপনি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আমাকে ছয়টা গল্প দেবেন । ওগুলোর মধ্যে বেস্টটা ছাপা হবে । রাজি?

এমন কথায় সুস্মি অবাক না হয়ে পারলো না । কিছুটা হতাশও হলো । এটা কেমন শর্ত ? কিন্তু নিজের প্রতিভা তো প্রমাণ করতেই হবে ওকে । রাজি হয়ে গেলো সুস্মি ।
এদিকে ফাহিম সুস্মিকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে মনেমনে মজাই পাচ্ছিলো, ওর মুচকি হাসিতে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো ।
সুস্মি চলে যাবার সময় ফাহিম বলে উঠলো, ‘শুনুন, একটা করে গল্প লিখা শেষ হবে আর আমাকে দিয়ে যাবেন ।’
সুস্মি কয়েক সেকেন্ড থ বনে রইলো, তারপর বুঝতে পারলো ফাহিম ওকে ইচ্ছেমতো খাটানোর পায়তারা করছে । ছেলেরা পারে বটে!

সেদিন রাতেই সুস্মির একটা গল্প লিখা শেষ হয়ে গেলো । পরদিন ও গল্পটা ফাহিমকে দিতে গেলো । ওকে দেখেই ফাহিম একগাল হেসে বললো, ‘বাহ! আপনি গল্প নিয়েও এসেছেন! আপনাকে সাধুবাদ না জানিয়ে পারছি না ।
সুস্মি কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি কীভাবে জানলেন যে আমি গল্প লিখে এনেছি?’
-এতদিন ধরে কাজ করছি আর এই ছোট্ট ব্যাপারটা বুঝব না? আর আপনি যে অন্যকাজে আসবেন না সেটা আমি জানি ।
-(একটু হেসে)আপনার আইকিউ তো দারুণ! এইযে, কাল রাতে লিখেছি ।
ফাহিম সুস্মির গল্পটা উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলো আর ওর মুখে কৌতুকের হাসি ফুটে উঠলো । চোখ তুলে বললো, ‘আপনার এতো ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা? এতটুকু নিয়েও গল্প লিখা সম্ভব?’
সুস্মি কিছুটা আঘাত পেলো ফাহিমের কথায় । কিন্তু স্বাভাবিক স্মরেই প্রশ্ন করলো, ‘কেনো, আপনার কি অনেক অভিজ্ঞতা? কয়টা প্রেম করেছেন জানতে পারি?’
-আমি তো মিনিটে মিনিটে প্রেম করি, প্রেমে পড়ি । আমার ফিলোসফি সবার থেকে আলাদা ।
-বেশি প্রেম করলেই যে ফিলোসফি উন্নতমানের হবে…
-(কঠিন স্বরে)তর্ক করা আমি পছন্দ করি না । আপনি এখন আসতে পারেন । আর হ্যাঁ, যদি চান আপনার গল্প ছাপা হোক তাহলে টাইম টু টাইম আমাকে গল্প দিয়ে যাবেন । আসুন ।
ফাহিমের এরকম ব্যাবহারে সুস্মি অপমানিত বোধ করলেও নিজেকে প্রমাণ করার জেদের কাছে অপমানকে হারিয়ে দিলো । দাঁতে দাঁত চেপে সে ফাহিমের রুম ত্যাগ করলো, পেছনে ফিরে তাকালো না পর্যন্ত । কিছু গোপন করতে চাইলো মনে হয়!

এভাবে বাকি দিনগুলোতেও ফাহিম সুস্মিকে সমানে অপমান করে যাচ্ছিলো আর ইচ্ছেমতো খাটাচ্ছিলো । সুস্মি সব সহ্য করে একটা একটা করে পাঁচটা গল্প জমা দিলো । ষষ্ঠ গল্প জমা দেবার দিন ফাহিমকে কিছুটা উৎফুল্ল দেখাচ্ছিলো । সুস্মির গল্প হাতে নিয়ে বললো, ‘আমি আপনার সব গল্পই পড়েছি । আজ এটা পড়বো । আপনাকে কাল আরেকবার আসতে হবে । আপনাকে জানিয়েই দিবো কোন গল্পটা ছাপানো হবে ।’
সুস্মি সাথে সাথেই আচ্ছা বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে হনহন করে চলে গেলো । বুঝতেও পারলো না যে ফাহিম একদৃষ্টিতে ওর চলে যাওয়া দেখছিলো ।

রাতে ফাহিম সুস্মির ষষ্ঠ গল্পটা পড়লো এবং আগের পাঁচবারের মতই সুস্মির প্রতিভার প্রশংসা না করে পারলো না । মনে মনে ভাবলো, ‘মেয়েটা আসলেই খুব ভালো লিখে । ওকে অনেক খাটিয়েছি, অপমান করেছি, মজা নিয়েছি । আরে ধুর! আমিতো এমনই । কিন্তু মেয়েটা এমন কেনো? এতো কথা বললাম, কোনো প্রতিবাদ করলো না । এমন মেয়ে আর দেখিনি । আসলেই, অদ্ভুত!’
পরদিন যথারীতি সুস্মি হাজির । ফাহিমকে একটু কাঁচুমাচু করে বলতে শুরু করলো, ‘আসলে ভালোবাসা দিবসের জন্য গল্প জমা নেয়ার দায়িত্বে আমি নেই । যিনি আছেন তিনি পাশের রুমে বসেন । আপনার ছটা গল্পই ভালো হয়েছে । আপনি বলুন কোনটা ছাপাতে চান, আমি উনাকে বলে দেবো ।’
সুস্মি চুপ করে ফাহিমের কথা শুনলো । এরপর চিরপরিচিত স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো, ‘আচ্ছা ঠিকাছে, আপনাকে বলতে হবেনা । আমি নিজে উনাকে গল্প জমা দিয়ে যাবো । আমি আসি । ভালো থাকবেন ।’
সুস্মি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বেরিয়ে গেলো, ফাহিমকে কিছু বলার সুযোগই দিলো না । সুস্মি এবারো বুঝলনা যে একজন একদৃষ্টিতে তার প্রস্থান দেখছে ।

১৪ ফেব্রুয়ারি, সকালবেলা । ফাহিমকে ওর বন্ধু ফোন করলো । সে ফাহিমের সবকিছু জানে, সুস্মির সাথে পরিচয়ের কথাও বাদ যায়নি । ফাহিম ফোন ধরলো । ওপাশ থেকে বন্ধুটি জোরে জোরে বললো, ‘দোস্ত! তোদের পেপারের স্পেশাল পাতাটা দেখ । সব তো ফাঁস হইয়া গেলো রে! দেখ দেখ । আমার টাইম নাই, বাই ।’
ফাহিম পাতাটা খুললো । এবং প্রথমেই সুস্মির গল্প । ‘আরে, একী! মেয়েটাতো আমার ওর পরিচয়ের পুরো ঘটনা লিখেছে!’
পড়তে পড়তে ফাহিম শেষ প্যারায় পৌঁছালো । সেখানে লেখা,
‘‘রাজকুমারী স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে,তার চেয়ে ভালোবাসে স্বপ্ন দেখাতে । ভালবাসার মানুষকে দুহাতে আঁকড়ে ধুয়ে দিবে তার পুরনো যত দুঃসহ স্মৃতি। সিদ্ধান্ত নিতে আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। ভালোবাসা দিবসের ভোরে লাল শাড়ি পরে আর কপালে লাল টিপ দিয়ে চলে যায় শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে। অপেক্ষা করতে থাকে যুবরাজের জন্য। লাল গোলাপ নিয়ে আসুক বা না আসুক, ব্যাপার না । আসলেই জড়িয়ে ধরে বলবে ভালোবাসি ।’
ফাহিম হাসলো । ‘মেয়েটা আসলেই এমন কেনো? বুঝতেই পারলাম না, বোঝাতেও পারলাম না! কতো মেয়ের সাথেই তো সময় পার করলাম । কিন্তু এ কোন সৃষ্টি?’
সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে না ফাহিম । চলে যায় নদীর পাড়ে । এদিক ওদিক খুঁজে যখন ক্লান্ত, তখন একটু দূরে দেখে সুস্মির লাল শাড়ির আঁচল উড়ছে । দৌড়ে গিয়ে ওর খোঁপায় গুঁজে দেয় কৃষ্ণচূড়া আর বলে, ‘কৃষ্ণচূড়া ফুলেই আমার বউকে বেশি মানাবে ।’
সুস্মি হঠাৎ ঘটা ঘটনায় অবাক হয়ে বলে উঠে, ‘বউ?’
ফাহিমের উত্তর, ‘বিয়ে করব তোমাকে। কারণ ভালোবাসি অনেক ।’
সুস্মি তখন হেসে বললো, ‘এইযে জনাব! আমার সাথে কিন্তু মিনিটের প্রেম করা যাবেনা । সারাজীবনের প্রেম করতে হবে ।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *