শহরের ফুটফুটে এক তরুণের সফলতার গল্প

১৯৬৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস শহর পরিচিত হয় এক ফুটফুটে তরুণের গানের গলার সাথে। কলেজের গণ্ডি পেরোনোর আগেই এই শহরে পাড়ি জমানো এই তরুণ মাতিয়ে রাখে পুরো শহরের মানুষকে। মূলত পুরোদমে সঙ্গীতে ডুব দিতেই এই শহরে ছুটে আসা। শহরের নামীদামী বিভিন্ন ক্লাবে প্রায়ই গান গাইতে দেখা যায় তাকে। কিন্তু স্টেজ শো’য়ের জন্য একটি ভালো নামের প্রয়োজন। তখনই “ডেনভার” নামের ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু কে জানতো এই নামটাই ছড়িয়ে পড়বে এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে এবং সবশেষে পুরো বিশ্বে।

কানট্রি রোডস, টেক মি হোম

এ গানটি শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়, তা সে জন ডেনভারের ভক্ত হোক আর না-ই হোক। জন ডেনভার সত্তরের দশকের সবচেয়ে সফল কান্ট্রি পপশিল্পী। ১২টি গোল্ড ও ৪টি প্লাটিনাম অ্যালবামের স্বীকৃতি অর্জনকারী ডেনভারের জন্ম নিউ মেক্সিকো শহরে এক আর্মি পরিবারে। বাবার চাকরির সুবাদে ছোটবেলা কেটেছে বিভিন্ন শহর ঘুরে ঘুরে। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আগ্রহের কারণে দাদি তার হাতে তুলেছিলেন গিবসনের একটি অ্যাকুইস্টিক গিটার। সেই থেকে পথচলা। এর পর বিশ্বব্যাপী অ্যাকুইস্টিক গিটারের সবচেয়ে সফল শিল্পী ধরা হয় অসংখ্য সফল গানের স্রষ্টা এ শিল্পীকে।

‘ইউ ফিল আপ মাই সেন্সেস, লাইক আ নাইট ইন দ্য ফরেস্ট
লাইক দ্য মাউন্টেন ইন স্প্রিং টাইম, লাইক এ ওয়াক ইন দ্য রেইন’
“অ্যানি’স সং” নামেই সবার কাছে পরিচিত গানটি। প্রেমের এই গান জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে কে না তার প্রেমিকাকে শুনিয়েছে? প্রিয়তমা স্ত্রী অ্যানি মার্টেলের প্রতি তিনি গানটি উৎসর্গ করেছিলেন।

১৯৪৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন জন ডেনভার। ১৯৬৬ সালে বিখ্যাত ট্রিয়ো কনসার্টের সময়ই দেখা হয় তার প্রথম প্রেম অ্যান মাটওয়েলের সঙ্গে। পরবর্তী বছরই অ্যান ও ডেনভার বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন, যদিও দীর্ঘদিন সংসারের পর ১৯৮৩ সালে তা ভেঙে যায়।

শুরুতে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের ক্লাবে ক্লাবে গান করলেও তার সফলতা আসে ১৯৬৯ সালে ‘লিভিং অন এ জেট প্লেন’ মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। এর দুই বছর পরই ডেনভার প্রকাশ করেন পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সফল কান্ট্রি অ্যালবাম ‘টেক মি হোম’। এর পর আর কখনই পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি কিংবদন্তী এই শিল্পীকে। গানের ক্ষেত্রে প্রকৃতি বরাবরই তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। খুব সহজ কথায় গভীর ভাব প্রকাশে যথেষ্টই পারদর্শী ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল এ শিল্পী। আর তাই হয়তো ডেনভারের গানগুলো খুব সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
তার কালোত্তীর্ণ প্রেমের গান ‘অ্যানি’স সং’ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি বিয়ের অনুষ্ঠানে বাজানো গান। ডেনভারের জন্য সবচেয়ে ভালো সময় ছিল ১৯৭৪-১৯৭৫। এই সময়ে তার সব অ্যালবামই ছিল বিলবোর্ড টপচার্টে প্রথম অবস্থানে। জন ডেনভারকে ধরা হয় পৃথিবীর অন্যতম বেস্ট সেলিং কান্ট্রি মিউজিশিয়ান হিসেবে। সত্তর থেকে নব্বই— এ তিন দশক যেন একদমই নিজের করে নিয়েছিলেন ডেনভার। সাফল্য যেন ছাড় ছিলই না তাকে। পৃথিবীব্যাপী প্রায় ৩৩ মিলিয়নের ওপর বিক্রি হয়েছে তার অ্যালবাম। সত্তর-আশির দশকে বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানেও নিয়মিত ছিলেন তিনি।
জীবনের শেষ দিকে যখন দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায় ১৯৯১ সালে, তখন জীবনটা নিজের মতো করেই উপভোগ করেছেন তিনি। মানবতাবাদী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কারও পেয়েছেন। এ সময়ে প্লেনে করে ঘুরে বেড়াতে বেশ পছন্দ করতেন জন। কিন্তু সেই প্লেনই শেষ পর্যন্ত জীবনে কাল হয়ে এল তার। ১৯৯৭ সালের ১২ অক্টোবর ডেনভারের পছন্দের জায়গা ‘মনটেরে বে’তে এক প্লেন দুর্ঘটনায় জীবনাবসান হয় এ কালোত্তীর্ণ শিল্পীর।

জন ডেনভার একটি ইন্টার্ভিউতে বলেছিলেন, ‘আমি কখনো হিট গান লিখতে চাইনি। সব সময় ভালো গান লিখতে চেয়েছি, চেয়েছি সেখান থেকে কিছু বার্তা উঠে আসুক। এটা আমার পরম সৌভাগ্য যে, আমি জনপ্রিয় হয়েছি।’ এজন্যই হয়তো পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার প্রায় ২২ বছর পরেও পুরো বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশে আজও গিটারের সুরে জেগে উঠে ডেনভার আর তার অনবদ্য সৃষ্টি। বিষণ্ণতা কিংবা প্রেম যা কিছুই একটি মনকে ছুঁয়ে উঠার সাথে সাথে আবারো এই সুন্দর পৃথিবীতে ফিরে আসেন একজন জন ডেনভার। ‘টেক মি হোম কান্ট্রি রোড’, ‘লাভিং অন আ জেট প্লেন’, ‘পারহ্যাপস লাভ’, ‘রকি মাউন্টেন হাই’, ‘পোয়েমস, প্রেয়ারস অ্যান্ড প্রমিজেস’, ‘হোয়াটস অন ইউর মাইন্ড’, ‘গ্র্যান্ডমা’স ফেদার বেড’, ‘সানসাইন অন মাই শোল্ডারস’, ‘ইফ এভার’, ‘ফলো মি’, ‘টু দ্য ওয়াইল্ড কান্ট্রি’, ‘ফ্লাই অ্যাওয়ে’, ‘সিজনস অব দ্য হার্ট’, ‘ইজ ইট লাভ’ গানগুলো বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়। জন ডেনভার চেয়েছিলেন গানের মাধ্যমে মানুষকে কেবল বিনোদন না দিয়ে তাদের ছুঁয়ে দেখতে এবং তিনি তা করতে পেরেছেন। পেরেছেন বলেই প্রতি শহরেই কিছু কিছু গান পাগল ছেলে আজও স্বপ্ন দেখে একজন ডেনভারের। জন ডেনভার আপনি একজন সফল মিউজিক যোদ্ধা হয়ে বেঁচে থাকবেন যতদিন এই পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব আছে। আপনি বেঁচে থাকবেন যতদিন পর্যন্ত এই পৃথিবীর মানুষ প্রেম কিংবা বিষণ্ণতা রোগে আক্রান্ত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *