স্বাধীনতা তৈরির সূত্র!

প্রখর সূর্যতাপে জ্বলে পুড়ে কাঠ হয়ে গেছে মাটি,রাস্তার পাশে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মুখ নিষ্প্রাণ,চোখ স্থির,হাতের গোলাপগুলো মুশড়ে পড়েছে,গা বেয়ে ঘামের মতো করে এলো মেলো পথ করে করে নেমে যাচ্ছে মেয়েটির ছিটিয়ে দেয়া জলের কণা।ঢাকা শহর কখনো অদ্ভুত সুন্দর,কখনো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উত্তাল,কখনো ধোঁয়ায় ঢাকা আকাশে একটু একটু করে জড়ো হয় মেঘেরা,হাঁকডাক করে,কখনো ছুঁটে পালিয়ে যায় পাহাড়ের দেশে।ওরা বোধহয় শহুরে মেঘ নয়!শহুরে মেঘেরা মাঝে মাঝে হাঁক ডাক করেই ভিজিয়ে দিয়ে যায় হুট করে।জ্বলে পুড়ে যাওয়া শালিকের দল,ইটের দেয়ালে বাসা বাঁধা চড়ুই,আর জল শিকারী কাকেরা ঝড়ো বাতাসে উড়ে উড়ে বেড়ায় এক দালান থেকে অন্য দালানে।ফোটা ফোটা ঘামও আজকাল স্বপ্ন দেখায় বৃষ্টির!!এতটা আক্ষেপ প্রকৃতি মেনে নেয় না কখনো,প্রকৃতি ভারসাম্য চায়,মিথ্যে বলে প্রকৃতি কিছুই চেনে না,যা চেনে তা কেবলই সত্য!তাই আজকের বিকেলের ঝড়ো বৃষ্টিটাও ঢাকা শহরের রোদে পুড়া মানুষগুলোর জন্য প্রকৃতির সূত্রমতে সত্য!

আজকের এমনি মাতালি সমীরণে মহাজাগতিক হাজারো সমীকরণের বেড়াজালে নিজেকে অনেক কিছুই বলা হয়ে উঠেনি,অস্বীকৃত কিছু বাক্য যা বলা হয়ে উঠবে কি না সে নিয়ে আমি এখনো কিছু ভাবিনি,তবে অনুভূতিকে শব্দজালে আটকানোর খেলাতে মগ্ন হয়ে আছি বেশ,যা লিখছি তা কেবল কিছু উড়ো ভাবনার জমাট স্তুপ।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার স্বপ্ন যেমন ছিলো আমার, ঠিক তেমনি ভাবে আমি অনেকখানিই আমার স্ববিরোধী, বিজ্ঞজনের ভাষ্যমতে!ওরা বলে ইঞ্জিনিয়াররা কবি হতে পারে না,বেসিক জগতের থেকে তাদের এপ্লাইড জগতেই পড়ে থাকা ভালো!কবিরা ইঞ্জিনিয়ারিং বুঝবে না,জানবে না, শিখবে না,কবিরা শুধু নারী বুঝবে,ফুল বুঝবে,পাখি বুঝবে,প্রেমের ছন্দ বুঝবে,কিন্তু কোন যন্ত্র বুঝবে না,জীবন জগতের সূত্র বুঝবে না!ইঞ্জিনিয়ারদের কবিত্ব বরণ,সাহিত্যে গমনকে সকলে বড় চোখ করে দেখে!

আমি বলি,আমার কাছে ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প,কবিতাও শিল্প।স্ট্রিং থিয়োরির গীটারের তারের কম্পন গুলোকেও আমি যেমনি করে কবিতায় অনুভব করি,ইঞ্জিনিয়ারিং এ ও তেমনি করেই!কবিতার ছন্দ যেমন আমার প্রিয়,ইঞ্জিনিয়ারিং কে ছন্দ ভাবতেও আমি ততটুকুই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

আমি উড়ন্ত কিছু হবার আশা রাখি নাই কখনো,আমাকে কেউ দেখতে পাবে না, ধরতে পাবে না ছুঁতে পাবে না,এমন কিছু কখনো আমি হতে চাইনি,কিন্তু আমি পোষ্য হতেও নারাজ!

তবে মহাবিশ্বের ছোট্ট এক পাথরের বুকে এমনভাবে আমরা ভাসছি যে মাঝে মাঝে নিজেদেরকে বেশ স্বার্থপর মনে হয়!কারো বুকে হেঁটে তার বুকে লাঙ্গল ফেলে খুঁড়ে খুঁড়ে ফসল ফলিয়ে পেট পুরে খেয়ে দেয়ে সেই বুককে যখন আমরা করে দেই নানা ভাগে বিভক্ত,সেই বিভক্ত ছোট্ট বুককে ফেলে আরো বহু ভাসমান পাথরের বুকে হয়ত কোনদিন আমরা পৌঁছে যাব কিন্তু আদৌ তারা আমাদের গ্রহণ করবে কি না সে কথা ভবিষ্যত জানে!

কিন্তু আজকে এখনই যখন এই ছোট্ট একটি ভাসমান বৃত্তাকার বুকে আমি এই শব্দজাল বুনে যাচ্ছি,তখন মনুষ্য প্রজাতির নিজের ছোট্ট বুকে প্রেমিকা আর প্রেমিকে্র চিরন্তন রোমান্টিসিজমের ছবিটা মনে পড়ায় খুবই অট্টহাস্য করে উঠলো মস্তিষ্কের নিউরনগুলো!ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ পাশে নেই,নইলে কয়েকটা পিঠে চাপড় দিয়ে দিতেন বটে!আমার লিখাটা ধীরে ধীরে রাবিন্দ্রিক আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত হয়ে একজন ইঞ্জিনিয়ারের মস্তিষ্কের যান্ত্রিক নিউরনের থেকে চলে যাচ্ছে একটি কাব্যিক নিউরনের দিকে যে এক কালে প্রেম বুঝেছিল!সেখানে যা জমা আছে সেগুলো গুছিয়ে এনেছি অনেকখানি,এবার সেগুলো নিয়ে নেবার সময়।

একদা এক রূপসীকে ভালোবেসে বলেছিলাম,”ধর্মের বেড়ি তুমি খুলতে পারবে না জানি, আর আমিও তো তোমার দেয়া প্রেমের বেড়ি ছিড়তে পারবো না।তারচেয়ে তুমি বরং ষাট বছরের এক বুড়ি হোও আর আমিও বাষট্টি বছরের এক বুড়ো হই, তারপর একদিন না হয় দুজন পালিয়ে যাবো গহীনে।”
রূপসী হেসেছিলো আর হাতে হাত রেখে বলেছিল, “দুটি সমান্তরাল রেখার মিলন হয় অসীমে সেই আশা নিয়েই তোমার সমান্তরালে আমি।” আমি তখন ভাঙ্গা রেললাইনে শুয়ে পড়ে বলেছিলাম,” চলো এবার তবে সরলরেখা হই?”

বলেছিলাম ঠিকই,তবে সমান্তরাল রেললাইন কখনোই সরলরেখা হবে না।এই রুপসী হতে পারে যে কেউ,যেকোন কিছু!প্রকৃতপক্ষে ,এই পৃথিবীর চেয়ে মহাপ্রেমিক আর কে আছে ?আমরা তো সেই প্রেমিক প্রেমিকা যারা অন্যের বুকে বসে চুমু খাই ঠোঁটে আর চলে আসার আগে খোদাই করে লিখে আসি ভালবাসার স্মৃতিশব্দগুলো! কিন্তু সেই শব্দগুলো নিজের বুকে ধারন করি কয়জন?তেমনি আমরা পড়ালেখা করি,শিক্ষিত হই কিন্তু সেই শিক্ষাকে ধারন করি কতজন?

আমি সূত্র শিখেছি,যন্ত্র বুঝেছি,তাপগতিবিদ্যার সকল সূত্রে ছন্দ এপ্লাই করে কবিতাও লিখেছি।ধারন করে নিতে চেষ্টা করে গেছি যন্ত্রের যান্ত্রিকতার ছন্দ!সহজ নয়,তবে অসম্ভব নয়।এটা আমার নিজস্ব স্বাধীনতা!আমি তা তৈরি করে নিয়েছি।

কারন আমি আমার নিজের ইচ্ছায় জন্ম নিই নি,আর এ জন্ম নয় আমার কোন জন্মের কৃতকর্মের ফল,আমি প্রকৃতির এক সাধারন নিয়মের আওতাভুক্ত বিচরণ করা প্রাণীমাত্র,আমার মৃত্যুর পরে কিছু হবে কিনা তা নিয়ে আমি কখনো ভাবি না কারন জন্মের আগে লক্ষ লক্ষ বছর মৃত থাকতে আমার কোন সমস্যা হয়নি,তাই জন্ম যখন নিয়েই নিয়েছি তাহলে বাকিটা জীবন আমি আমার মতো করে বেঁচে থাকার ইচ্ছে পোষন করে চলি,আমি কারো ইচ্ছা পূরণে বাধ্য নই।

তেমনি করে বেঁধে দেয়া গন্ডির ভিতরে থেকে কোন কিছুকে সংগায়িত করা কতটা যৌক্তিক?আমাদের প্রচলিত আশপাশের সমাজই কি চিরন্তন সত্য?নাকি আরো কোন সত্য আছে আমাদের চেনা সীমানার বাইরে,যেখানে পৌঁছাতে হলে আকাশকে একটি ছাঁদ ভাবার চেয়ে চোখের সীমানা বলে মেনে নেয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে,আর উলটো পথে গন্ডি পেরোলেই আঘাতের পরে আঘাত আর বাঁধা আসবে।

কিন্তু কারো কথায় কারো চাপিয়ে দেয়া ইচ্ছা পূরণে আমরা কেউ বাধ্য নই,বাধ্য নই আমাদের চিন্তার জগতে বদ্ধ হয়ে থাকতে,অন্ধভাবে বিচরণ করতে।আমাদেরকে বেছে নিতে হবে আমাদের নিজেদের ইচ্ছা।আমাদের ইচ্ছার জগতে জাগাতে হবে পরিশ্রমের সামর্থ্য!

এপ্লাইড জগত কে আমি চিনব বুঝব এপ্লাই করব বাস্তবে,আমিও ভাববো জগত জীবন নিয়ে,মহাবিশ্বের মহাশূন্য নিয়ে আপেক্ষিকতার সূত্র ভেবে ভেবে ঘুমিয়ে যাবো।সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ বিকেল এলে সেই সূত্রে ছন্দে যন্ত্রে তন্ত্রে এপ্লাই করে যাবো কাব্যিক রসতত্ত্ব।এতে বিজ্ঞজনেরা যে যাই বলুক এটাই আমার স্বাধীনতা তৈরির সূত্র!

৮ thoughts on “স্বাধীনতা তৈরির সূত্র!

  1. এমন মানব জনম আর কি হবে
    মন যা

    এমন মানব জনম আর কি হবে
    মন যা চাই তড়াই করো এই ভবে

    সেইইই কবে বলে গেছেন সাঁইজি।
    খুব ভালো লাগল আপনার ভাবনা। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  2. সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ বিকেল এলে

    সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ বিকেল এলে সেই সূত্রে ছন্দে যন্ত্রে তন্ত্রে এপ্লাই করে যাবো কাব্যিক রসতত্ত্ব।এতে বিজ্ঞজনেরা যে যাই বলুক এটাই আমার স্বাধীনতা তৈরির সূত্র!


    বিরল দ্রোহ… চলতে থাকুক আপনার লিখনি… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  3. বাধ্য নই আমাদের চিন্তার জগতে

    বাধ্য নই আমাদের চিন্তার জগতে বদ্ধ হয়ে থাকতে

    তৃপ্তি সহকারে ভালো লাগলো ……

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *