সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন: উভয় দলের রাজনীতির সাবধান বাণী ।

সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেছে আওয়ামী লীগ। ভোটাররা শান্তিপূর্ণভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যে দল পরাজিত হয়েছেন তাদের জন্য এ নির্বাচন সতর্ক বার্তা । এই ফলাফলের মাধ্যমে ভুল স্বীকার, ভুল থেকে শিক্ষা নেয়া এবং ভুল সংশোধনের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা কাজে লাগানোর উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য নির্বাচন । উভয় দল ই খুশি, বিএনপি খুশি তাদের অনন্য জয়ের ভিক্তি স্থাপনে এবং আওয়ামিলীগ খুশি একটি সচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে । কার কতটুকু উল্লসিত হওয়ার জায়গা আছে । একটু সমীকরণ আকা যাক ।

বিএনপি র খুশি হওয়া কি যুক্তিযুক্ত ?

২০০০ সালে বিএনপি তার পূর্ববর্তী সকল অপরাধের কথা স্বীকার করে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহন করে । বিপুল ভোট জয়লাভও করে । কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের সেই পূর্বের রক্তচোষা চেহারায় ফিরে আসে এবং যে কোন সময়ের রেকর্ড ছাড়িয়ে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতি গ্রস্ত সরকারে পরিণত হয়। হাওয়া ভবনের মাতাল হাওয়ায় একের পর এক দম্ভ নিশ্চিহ্ন হতে থাকে। বেগম জিয়ার বেসামাল পুত্রদ্বয় এবং তাঁর বাহিনী দেশের দুর্নীতিকে এক নতুন মাত্রার রূপ দেয়, রাজনীতিকে মানি-মেশিনে পরিণত করে। ফলে দেশ সর্বকালের শ্রেষ্ঠ দুর্নীতি-গ্রস্ত মডেল হিসেবে পৃথিবীতে পরিচিতি পেয়ে থাকে।

বাধ্য হয়েই কেয়ারটেকার গভারমেন্ট কিছু কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাতে খুব একটা ভালো ফল হয়নি । বর্হিবিশ্বের চাপে তড়িঘড়ি করে নির্বাচন দিয়ে নিজেদের ভারমুক্ত করে, আসে নতুন বোতলে পুরোনো মদের মতোই আওয়ামিলীগ সরকার । স্বাধীনতার নির্মানের স্থম্ভের মতোই নিজেদের সবসময় স্বাধীনতার পক্ষের একমাত্র দাবিদার বললেও তা দেশ নির্মানের পক্ষে খুব একটা বড় কাজ করতে পারেনি বর্তমান সরকার । বিএনপির মতো সীমাহীন দুর্নীতি না করলেও হাতে গোনা কিছু খুব বড় মাপের দুর্নীতি তাদের অবস্থানকে দুর্বল করে দেয় । চার সিটিকর্পোরেশন নির্বাচনে এর পরও ৪০ শতাংশ ভোট অর্জন শুধুমাত্র আওয়ামিলীগের কট্টর সমর্থক দের জন্যই সম্ভব হয়েছে । সুতরাং বিএনপির খুশিতে বাকবাকুম হবার জো নাই । ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ ভোট নিজেদের দিকে ফেরাতে পারলেই জাতীয় নির্বাচনে আবার ক্ষমতায় আসার পথ পরিষ্কার করতে পারবে বর্তমান সরকার । বিএনপির আনন্দে অস্থির হবার কোনো অনন্য কারণ আছে বলে মনে হয়না । আওয়ামীলীগের সন্ত্রাস, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে বিএনপি কি কোন কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছে? না পারেনি , ইসুর পর ইসু পাওয়ার পরও পারেনি জনগনকে মুক্ত করার মতো বাস্তবধর্মী কোনো আন্দোলন করতে । স্বীকৃত দুর্নীতিবাজ দের সামনে রেখে আর জামাতের মতো স্বাধীনতা বিরোধীদের পাশে নিয়ে নিজেদের অবস্থান নিজেরাই বারবার প্রশ্ন বিদ্ধ করেছে । সহি বুজ নিয়ে দেখেন বিএনপি কে পছন্দ করে নয়, বরং আওয়ামীলীগের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। সামান্য বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত না হয়ে, বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে কর্ম্পরিকল্পনা গ্রহণ করলে বিএনপির জন্য কল্যাণ হবে ।

আওয়ামীলীগের খুশি হওয়ার কোনো কারণ আছে ?

আওয়ামিলীগ , স্বাধীনতার স্বপক্ষের দাবিদার , তাতে কি ? দিন আনতে পান্তা ফুরায় যাদের তারা বেচে থাকার নিত্যনৈমাত্তিক রসদের সহজ প্রাপ্তির আশাই করে সর্বাগ্রে । একটি সুষ্ঠ ও অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন সব দোষ ঢাকবেনা। তৌফিক এলাহীর ৫ মিলিয়ন ডলার ঘুষকেলেঙ্কারী, সুরঞ্জিতের বস্তা ভর্তি টাকা, কুইক রেন্টাল দুর্নীতি, জ্বালানি খাতের দুর্নীতি, পদ্মা সেতু দুর্নীতি, এমপি শাওনের হাতে ইব্রাহীম হত্যাকান্ড, ডেস্টিনির অর্থ দুর্নীতি, শেয়ার বাজার দুর্নীতি, নাটোরে ক্যামেরার সামনে চেয়ারম্যানসানাউল্লাহ বাবুরহত্যা, হলমার্ক দুর্নীতি, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, সীমান্ত হত্যাকাণ্ডে নীরবতা, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, চৌধুরী আলম, নাজমুল হাসান ও ইলিয়াস আলী গুম, বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড, বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি, গ্যাস- বিদ্যুৎ- পানি সংকট, টিপাইমুখ বাঁধ, ছাত্রলীগের ভর্তি-টেন্ডার-দখল-চাপাতি বাণিজ্যর মতো অগণতান্ত্রিক আচার আচরণ আওয়ামীলিগকে তার ভরা ডুবিতে সাহায্য করে । একমাত্র গণতান্ত্রিক দল বলে বিবেচিত এবং একমাত্র স্বাধীনতার স্বপক্ষের দল হিসেবে দাবী করা সরকার বাংলাদেশের যে কোন সরকারের (গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক) চেয়ে নেতিবাচক কাজে প্রমাণিত হয়ে উঠে।

জনগণ সবসময় সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিদের খুঁজে বেড়ায়, অগণতান্ত্রিক কোনো প্রক্রিয়া কেউ কখনই সমর্থন করেনা আর করবেনা । সরকার কে বুঝতে হবে কোনটা রাজনৈতিক দাবি আর কোনটা জনগনের দাবি । সাধারণ মানুষের দাবীকে নিজেদের ইচ্ছার কাছে তুচ্ছ করা আত্মহত্যার সামিল । যখনি রাজনৈতিক ইস্যু আর জনতার একান্ত দাবীর পার্থক্য যেকোনো সরকার বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে তখনি সৃষ্টি হয়েছে কানসাট, ফুলবাড়িসহ নানা ঘটনা। বাদ দিবোনা হালের শাহবাগ আর হেফাজত আন্দোলন । শাহবাগের আন্দোলন বিপর্যস্ত হয়েছে কিছু নাস্তিক আর আওয়ামিলীগ ক্যাডারদের জন্য । পক্ষান্তরে হেফাজতের আন্দোলন বিপর্যস্ত হয়েছে বিএনপি আর জামাতের কুক্ষিগত করার জন্য । সরকারের উচিত ছিলো দুই পক্ষে যুক্তিযুক্ত দাবি গুলোর প্রতি সন্মান জানানো । তা না করে দুই দলকে সরকারের তরফ থেকে পরিস্কার কোনো বার্তা দেয়া হয়নি , বরং ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে । হেফাজতিদের তুষ্ট করতে গিয়ে সরকার না পেরেছে তাদের তুষ্ট করতে, না পেরেছে তার প্রকৃত শক্তির ঘাঁটিকে সুরক্ষা করতে। হেফাজতিরা শাপলা চত্বরের বিপর্যয়ের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে। তারা করেছ ও তাই , অরাজনৈতিক লেবাস ধারণ করেও নির্বাচন প্রচার কাজে অংশগ্রহন করেছে ।

সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে পরাজিত আওয়ামী লীগ নেতাদের উচিত আতঙ্কে দিশেহারা না হয়ে পরাজয়ের আসল কারণ নির্ণয় করে সেগুলো দূর করুন এবং সাহসের সঙ্গে ঐকব্যদ্ধ হোন। এটা চূড়ান্ত পরাজয় নয় । এই মুহুর্তে নিজেদের দুর্বলতা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সাবধান হওয়া প্রয়োজন। মহাজোটে শরিকদের ও প্রকৃত মিত্রদের সংঘবদ্ধ ও সক্রিয় করা উচিত । গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে আওয়ামী লীগের বর্তমান ভূমিকা সম্পর্কে জনগণের মন থেকে সব সংশয় দূর করে দলটিকে নীতিগত অবস্থানে ফিরিয়ে আনা। এই সব কথা বুঝতে বা বলতে রাষ্ট্র বিজ্ঞান পড়ার দরকার নাই , সচেতন সাধারণ মানুষ মাত্রই বুঝতে পারার কথা । সুতরাং নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিয়ে আওয়ামিলীগের খুশি হবার অবকাশ নাই ।

বাংলাদেশের দ্বিখন্ডিত রাজনৈতিক পটভুমিতে শুধুমার নিজের অনুগত ভোটারদের ভোট ব্যাংক আওয়ামী লীগকে ভড়াডুবি থেকে রক্ষা করতে পারবে না, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে ভাবতে হবে তারা কিভাবে তাদের উপরে বিতৃষ্ণ এই ২৫% ভাসমান ভোটারদের মনোরঞ্জন করে তাদের পরবর্তী নির্বাচনে নিজের দিকে টানবে। হাতছাড়া হওয়া ভোট ফিরে পাওয়ার চেষ্টা এখন একমাত্র উপায় ।

জনগণ সব ক্ষমতার উত্স । দলীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শ দেশ গঠনের সহায়ক ভুমিকা রাখে । ইতিহাস সবসময় জিয়াউর রাহমান আর বঙ্গবন্ধুকে মহান আদর্শের জন্য শ্রদ্ধা আর সন্মান জানাবে । এই মহান ব্যক্তিদের বর্তমান সৈনিকদের উচিত পরস্পরের প্রতি দোষারোপ না করে নিজ নিজ মহান নেতাদের আদর্শ বাস্তবায়নই মুক্তির সোপান রচনা করবে ।

২ thoughts on “সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন: উভয় দলের রাজনীতির সাবধান বাণী ।

  1. ইতিহাস সবসময় জিয়াউর রাহমান
    ইতিহাস সবসময় জিয়াউর রাহমান আর বঙ্গবন্ধুকে মহান আদর্শের জন্য শ্রদ্ধা আর সন্মান জানাবে ।

    সবই ঠিক ছিল কিন্তু এই লাইন টা খুব আপত্তিকর…
    কখনই জিয়া আর বঙ্গবন্ধুকে এক কাতারে মাপার কোন যৌক্তিক কারণ থাকে না!
    জিয়ার গুমর ফাঁক হচ্ছে দিন দিন!! শুধু জনপ্রিয়তার কারণে বা ভোটের দোহায় দিয়ে তাকে সমান মর্যাদা দেয়ারও কোন ভিত্তি নায়! জিয়া ছিল হঠকারী এক সেনা নায়ক যে ৭১ এ স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করেও ৭৫ পরবর্তীতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বহুলাংশে ধ্বংস করেছেন…

    1. আপনাকে ধন্যবাদ । সত্য প্রকাশ
      আপনাকে ধন্যবাদ । সত্য প্রকাশ পায় আর পেয়েই যায় । তবে কখনো সময় নেয় একটু বেশি । কিছুটা হলেও সহমত জানালাম ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *