মজুর বইছে জ্ঞানের ভার, শিক্ষিতরা চুলোয় যাক!

লেখাটা শুরু কিভাবে করা উচিত বুঝতে পারছিনা৷ মনটা আজ সত্যিই ভারাক্রান্ত। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, আমি সদ্য মাধ্যমিক পাস করে ক্লাস ১১এ উঠেছি৷ গত এগারো বছর একই বিদ্যালয়ে সব চেনা মুখের মধ্যে দিন কাটিয়ে, শিক্ষা গ্রহণ করার পর আজ প্রথম এক নতুন, অচেনা অজানা ‘বিল্ডিং’ এ ঢুকলাম যা কিনা আমার বর্তমান স্কুল৷ নাহ! আমি কিন্তু এখানে আমার ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করছি না। আজ যে স্কুলে ঢুকলাম, সেখানে যে সবই অচেনা তা নয়৷ আমার কিছু অত্যন্ত প্রিয় বন্ধুও আমার সাথেই ছিল৷ সকালে ঘর থােক বেরোনাের সময় উদ্দীপ্ত সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলাম নতুন স্কুলের প্রথম দিনটা বোধহয় ভালোই কাটবে; আশা করেছিলাম পরিচয় হবে কিছু প্রেরণাদায়ী মানুষের সাথে যারা আমার মনে শিক্ষকদের প্ৰতি শ্রদ্ধার আসনটা আরো উচ্চতর স্থানে নিয়ে যাবে। তবে বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে প্রবেশ করার পর থেকেই যেন ধীরে ধীরে সকল ভাবনা চিন্তাগুলি গুলিয়ে যেতে থাকে৷ সকলে মিলে চটপট প্রার্থনা সঙ্গীত শেষ করার পরই একটা কড়া আওয়াজ, “তাড়াতাড়ি যে যার ঘরে ঢুকে যাও, চুপচাপ৷ কোন কথা হবেনা এখানে।” বুঝলাম, আমাদের নিয়মানুবর্তিতা শেখাচ্ছেন, যাকে আমরা বলি DISCIPLINE। তা শিক্ষক মহাশয়ের এই প্রথম দিনেই আমাদের প্রদান করা বিশাল নিয়মানুবর্তিতার জ্ঞানে বিমুগ্ধ হয়ে আমরা সকলে যে যার রুমে ঢুকে পড়লাম। প্রচন্ড গরমের জন্য আমরা মাঝে কিছু বেঞ্চ ফাঁকা রেখে ফ্যানের নিচের বেঞ্চগুলিতে বসলাম৷ বলা হয়নি, আমাদের এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকা এবং বাকি কর্মচারীরা তীব্র ব্যাস্ততার কারণে রুমগুলো পরিষ্কার করার ব্যবস্থাই করে উঠতে পারেননি। তাই আমরাও অনুগত শিষ্যের মতো বসার জয়গাগুলি পরিষ্কার করে বসে পড়লাম৷

কিছুক্ষন পরেই আমাদেরকে রুটিন দিয়ে দেওয়া হল। প্রথম দিন গল্প, আড্ডা, শিক্ষক-শিক্ষিকার নাম-পরিচয় জেনেই কাটবে এই ভাবনাটা প্রায় সাথে সাথেই ভুল প্রমাণ হল। প্রথম ক্লাসেই এলেন এক অসাধারণ এবং UNIQUE মাস্টারমশাই৷ যেখানে আমরা সবাই আশা করেছিলাম উনি আমাদের সাথে আলাপ করে আমাদের নাম, পছন্দের বিষয় সম্বন্ধে জানতে চাইবেন, সেখানে উনি আমাদের কিছুজনকে শুধুমাত্র একটাই প্রশ্ন করলেন, “জীবনবিজ্ঞানে প্রাপ্ত নম্বর কত?” যে কোন কারণেই হোক তাদের মধ্যে সকলেই ৯০ এর ওপর নম্বর পেয়েছিল৷ এই উত্তর শুনে তার মুখের ভাব কিছুটা পাল্টাল বটে, কিন্ত তা খুশির ভাব বলে মনে হলােনা৷ যাইহোক, এরপরে বেশি কথা না বাড়িয়ে তিনি পড়ানো তে মনোযোগ দিলেন। কিন্তু এই পরম পরিশ্রমী শিক্ষক পড়ার মধ্যে এতটাই ডুবে যান যে, আমরা যে তার ওই দ্রুত রেগে বলে যাওয়া অর্ধেক কথাই ধরতে পারছিলাম না তা তিনি একেবারেই বুঝছিলেন না, আর প্রথম দিনে যে কেউ কোন কথা তাকে বলতে সাহসও পাচ্ছিল না তাও তিনি বুঝতে পারেননি৷ এভাবেই কয়েকটা ক্লাস চলতে থাকে। মাঝে হঠাৎ এক সময় দুজন শিক্ষক মহাশয় ক্লাসে ঢুকেই হুঙ্কার দেন “তোমরা এত ছড়িয়ে বসে আছ কেন? মাঝে এত বেঞ্চ ফাঁকা কেন? খালি গল্প করার ফাঁক চাই এই মেয়েগুলাের৷ যাও সব এগিয়ে এসে বসো!” প্রথমে বড্ডো রাগ হচ্ছিল এই ভেবে যে এনারা নিজেদের কথা ছাড়া ছাত্র ছাত্রীদের সমস্যা শোনার প্ৰয়োজনই মনে করেননা। কিন্তু তারপরেই মনে পড়লো, “অনুশাসন, নিয়মানুবর্তিতা!! এসবই তো শিক্ষাগ্রহণের মূলমন্ত্র!” বুঝলাম, এটা অমোদের DISCIPLINED মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দ্বিতীয় অধ্যায়৷ ক্রমে আরো কিছু এরকম প্রচন্ড জ্ঞানী, পরিশ্রমী মানুষদের সাথে দেখা হল এবং ক্লাস চলতে থাকলো৷

সবই তো হল, তবু যেন মনের দুঃখ ক্রমশ বেড়ে চলল। মনে মনে ভাবলাম, “এত জ্ঞান এনাদের, এত জানেন সবাই। তাহলে এনাদের দেওয়া এত শিক্ষা এবং জ্ঞান আমার অবধি এসে পৌছাচ্ছেনা কেন?” আর সব থােক বেশি অভিমান হচ্ছিল রবি ঠাকুরের ওপর! উনিই তো বলতেন “শিক্ষাকে বাহন করিও, বহন করিওনা”। আমিও তো তাই মানতাম৷ আমিও তাে মানতাম এতদিন “school is our second home”। তাহলে কেন আজ এই সকল জানা কথাগুলো, বিশ্বাসগুলোর ওপর একটা প্ৰশ্নচিহ্ন বসে যাচ্ছে!! কেন আজ এই জ্ঞানী-গুণী মানুষদের দেওয়া জ্ঞানগুলো শুনে মনে পড়ে যাচ্ছে গগণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা “The University Machine”-এর কথা? কেন মনে হচ্ছে এই জ্ঞানগুলােকে সারাজীবন বহনই করে যাবো, বাহন করতে পারবাে না?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *