লোকসভা নির্বাচনের অভিমুখ কোন দিকে?

বর্তমান ভারতবর্ষ অর্থাৎ ‘পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রে’ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অর্থাৎ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে! নির্বাচনে দেশের সাধারণ থেকে সমস্ত প্রভাবশালী মানুষ সকলেই উৎকন্ঠিত চিত্তে প্রশ্ন করছে এবারের নির্বাচনে কোন দল শাসনক্ষমতা দখল করবে? রাজ্য রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বলতে হয় সমস্ত মিডিয়া রিপোর্টে এটা ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে যে এবারের নির্বাচনে বামেরা কোন ও আসনই পাবে না, অথচ রাজ্য সরকারের গোয়েন্দা রিপোর্টে এটা প্রকাশিত হয়েছে এবারের নির্বাচনে বামেরাই নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হয়েছে! আসলে বামেদের এই শক্তিবৃদ্ধির যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ আছে, দালাল মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের বিকিয়ে দিলেও সাধারণ মানুষকে এত সহজে বোকা বানানো যায় না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যদি সঠিকভাবে ভোট হয় তাহলে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির ভাগ্যে কষ্ট আছে এটা বলা অসঙ্গত হবে না! কারণ শুধু রাজ্যে 1-2 কোটি বেকার আছে যারা দিদির চপ শিল্প ও অন্যদিকে দেশে প্রায় কম করে 10-15 কোটি বেকার আছে (প্রতি বছর 2 কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি অর্থাৎ দেশে পাঁচ বছরে প্রায় 10 কোটি চাকরি সৃষ্টি না হওয়া) যারা মোদীর পকোড়া ভাঁজার তত্ত্বে নিজেদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন বলে মনে করছে; এছাড়া গণতন্ত্র ধ্বংস, ফ্যাসিস্ট চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ ও বিষাক্ত ধর্ম রাজনীতির ফলে দেশের জনগণ আজ বিপর্যস্ত!

রাজ্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় গোয়েন্দা রিপোর্টে এটা উঠে এসেছে এরাজ্যে তৃণমূল 25-26, বামফ্রন্ট 8-10, বিজেপি 3 ও কংগ্রেস 3 টি আসন পেতে পারে। ভোটের শতাংশের বিচারে তৃণমূল 34-35 শতাংশ, বামফ্রন্ট 28-30 শতাংশ, বিজেপি 19-20 শতাংশ, কংগ্রেস 7-8 শতাংশ ভোট পেতে পারে। তাহলে এই রিপোর্টেই স্পষ্ট যে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে বামেদের ভোটব্যাঙ্ক 4-5% কম। তাই এটা স্পষ্টত বোঝা যায় বাস্তবের মাটিতে এই রিপোর্ট পরিবর্তিত হতে বেশি সময় লাগবে না বরং বলা ভালো বামেরা এর থেকে অনেক ভালো ফল করতে সক্ষম। কিছুদিন আগে সংগঠিত হওয়া পাঁচরাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে সমস্ত মিডিয়া রিপোর্টে ছত্রিশগড়ের রমন সিং এর বিজেপি সরকারকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রদানের কথা বললেও বাস্তবের মাটিতে আমরা দেখি ছত্রিশগড় রাজ্য থেকে কার্যত বিজেপি মুছে যাওয়ার জোগাড়, তাই মিডিয়ার সার্ভে নিয়ে অত চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই। আসলে এই তীব্র ক্ষোভের ফলহেতু জনগণ সুযোগ পেলেই যে শাসকদলকে ছেড়ে কথা বলবে না এটা বলাই যায়। তাই সমস্ত দিক বিচার বিশ্লেষণ করে এটা বলা অসঙ্গত হবে না যে- এই নির্বাচনে বামেরা অভাবনীয় ফল করবে!

এখন প্রশ্ন হল মিডিয়া কেন এভাবে বিজেপি ও তৃণমূলের পক্ষে প্রচার করছে? এক সময় মিডিয়াকে খুব সন্মানজনক পেশা মনে করা হত এর গুরুত্ব এত বেশি যে মিডিয়াকে ‘গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ’ ও বলা হয়। কিন্তু এই মিডিয়া ও কর্পোরেট হাউসের থেকে কোন অংশে কম নয়; কারণ- মিডিয়া হাউস চালাতে বহুল অর্থের প্রয়োজন। তাই বর্তমান দিনের সাংবাদিকরা সত্যের পক্ষে না থেকে অর্থের পিছনে ছুটছে! এটা দুঃখজনক হলেও সত্য বর্তমান দিনে বরুণ সেনগুপ্তের মত সাংবাদিদের বড়ই অভাব, যাঁরা নির্দ্বিধায় সরকারের সমালোচনা করে লিখতে পারতেন! তবে এটাও সত্য সেই সময়ের সরকার যদি এখনের মত এত প্রতিহিংসা পরায়ণ মনোবৃত্তির হত; তাহলে কি তাঁরা নিজেদের স্বাধীন সাংবাদিকতা চালিয়ে যেতে পারতেন, সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন?

মমতার শাসনামলে সারের দাম বাড়ছে কেন প্রশ্ন করলেই মাওবাদী (শিলাদিত্য চৌধুরি) বলে জেলে পোরা হয়, একটি কার্টুন আঁকলে ও জেলে পোরা হয় (অম্বিকেশ মহাপাত্র), একটি সংবাদ মাধ্যমে পার্কস্ট্রীট গণধর্ষণ কান্ডে তানিয়া ভরদ্বাজ নামে এক ছাত্রী মমতাকে প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রীটি হয়ে যান সিপিএম ক্যাডার। হুমকি, ধামকি সবই চলতে থাকে এবং শেষে মাননীয়া সেই সভাটি পরিত্যাগ করেন! যিনি সামান্য সারের দাম বাড়ছে কেন শুনে মানুষকে জেলে পোরেন, তিনি নাকি আবার গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা? সুপ্রিম কোর্টের রায়ে 66 A ধারা বাতিল করা হয়েছে, এই ধারাই অম্বিকেশ মহাপাত্রকে জেলে পোরা হয় অথচ সেই ধারায় অম্বিকেশ বাবুর কেস এখনও চলছে এটাই মমতার গণতন্ত্র! আইন মানব না, সংবিধান মানব না, কোর্টের রায়ের পরোয়া করেন না, তিনি নাকি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন? আমাদের ভাগ্য ভালো যে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে 66 A ধারা বাতিল করা হয়েছে, তা না হলে তিনি এই ‘কালা আইন’ দ্বারা তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে অনলাইনে বিরোধীতা কারি যে কাউকে জেলে আটক করতে পারতেন। ভারতীয় সংবিধানের 19 নম্বর ধারায় বাকস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত করা হয়েছে। তাই সমস্ত বিবেকবান মানুষ নির্দ্বিধায় নিজের মনের ভাব প্রকাশ করবেন এটাই গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত, অথচ মমতা ব্যানার্জির সরকার মানুষের ‘বাক স্বাধীনতা’ কেড়ে নিতে চাইছে। অন্যদিকে মোদী সরকারও সমস্ত মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ‘বাক স্বাধীনতা’ কেড়ে নিতে একই রকম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে! আসলে ফ্যাসিস্ট চিন্তা চেতনায় মমতা মোদী কেউ কারোর থেকে কম যান না!

তাই বর্তমান দিনে মিডিয়া তার কর্মকান্ড সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারছে না। মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ও আজ বড়সড় প্রশ্নচিন্হের সম্মুখীন হচ্ছে। অন্যদিকে আমরা দেখি দেশের প্রথম সারির মিডিয়াগুলি যেন সরকারের মুখপাত্রের মত কাজ করছে, এরূপ হওয়ার কারণ কি? নিন্দুকেরা বলেন তৃণমূল কংগ্রেস সারদা নারদার মত চিটফান্ডের টাকায় ও মোদী কর্পোরেট হাউসদের কাছ থেকে বিভিন্ন ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে গোপনে অর্থ আদায় করে (95% বন্ড শুধুমাত্র বিজেপির তহবিলে যায়)। এখন এই টাকার দ্বারা বিজেপি ও তৃণমূল মিডিয়া কিনে নিয়েছে। তাই প্রকৃতপক্ষে মিডিয়াগুলি আজ দলদাসে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় মিডিয়াগুলি বিজেপির সপক্ষে কথা বলে, অন্যদিকে রাজ্যের মিডিয়াগুলি তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে কথা বলে। অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই মিডিয়া হাউসগুলি শাসকদলের দলদাসে পরিণত হয়েছে, তাই মানুষ আজ বিভ্রান্ত। বাংলার মিডিয়াগুলি নির্লজ্জ ভাবে প্রচার করছে বাংলার মাটিতে লড়াই মমতা ও মোদীর মধ্যে, এরফলে মমতা ব্যানার্জির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সুবিধা হবে। অর্থাৎ মমতা ব্যানার্জি আরও বেশি করে ‘মুসলমান ভোট’ ব্যাঙ্ক সংগঠিত করার চেষ্টা করবে; অন্যদিকে, এর পাল্টা হিসাবে বিজেপির রাজনীতির মূল ভিত্তি হবে সমস্ত ‘হিন্দুভোট’ একত্রিত করা! তাই এই ঘৃণার রাজনীতির ফলে রাজ্য তথা দেশ আজ বিভক্ত! প্রকৃতপক্ষে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি ঘৃণা, সাম্প্রদায়িকতা ও রক্তের রাজনীতি করে। অথচ তাঁদের এই বিভাজনের রাজনীতির ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মত বিষয়গুলি উপেক্ষিত থেকে যায়। আজ চারিদিকে হাহাকার, মানুষের পেটে ভাত নেই, যুবকদের হাতে কাজ নেই, মানুষের মনে শান্তি নেই এমন ঘনঘোর অন্ধকার দিনে বামপন্থায় মানুষকে সাহস জোগাচ্ছে- বামপন্থীরাই আজ খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের লক্ষ্যে নির্বাচনে লড়াই করছে। তাই বিগ্রেডের ময়দান থেকে সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন আমাদের দাবী- ‘দুই হাতে কাজ চাই, পেটে ভাত চাই’! তাই প্রশ্ন হল মানুষের জীবন ধারণের জন্য নূন্যতম প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে বামপন্থীরা ছাড়া আর কোন দল লড়াই করছে?

বামপন্থীদের বহু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও এটা বলাইবাহুল্য বামপন্থীরা ছাড়া দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া, কৃষক, শ্রমিক, গরীব, মজদুর, মানুষদের পক্ষে আজ আর কেউ নেই। সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে বামপন্থার থেকে কার্যকর বড় শক্তি ভূভারতে আর একটিও নেই। বামপন্থীদের বিরুদ্ধে মুসলমান তোষণের অভিযোগ আছে; যা অনেকাংশেই সত্য, তবুও বলা যায় ভারতের প্রেক্ষাপটে বামেদের বিকল্প কিছুই নেই। কারণ ভারতের বাম নেতৃবৃন্দ মনে করেন সংখ্যালঘু মৌলবাদের চেয়ে সংখ্যাগুরু মৌলবাদ অনেক বেশি ভয়ংকর। এই চেতনাহেতু বিজেপি, আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদী চিন্তা চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে, বামচিন্তা চেতনার অবস্থান। ভারত আজও যে ‘হিন্দু রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়নি তার পিছনে বাম চিন্তা চেতনার বিরাট অবদান রয়েছে। রাজনৈতিক দিক থেকে দেখতে গেলে বলতে হয় বামেরা হয়ত ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনে খুব একটা সফল হয়নি কিন্তু বৌদ্ধিক ক্ষেত্রে বামেদের প্রভাব অবিসংবাদিত!

কারণ আজও দেশের ধর্মনিরপেক্ষ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ছাত্র, যুব শক্তির বেশিরভাগই বাম মতাদর্শের মানুষরাই নিয়ন্ত্রণ করে। তাই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির একটাই উদ্দেশ্য দেশের বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এগুলি বামচেতনা মুক্ত করতে হবে। এই লক্ষ্যে তাঁরা বেশকিছুটা সফল ও বটে! ভারতবর্ষের পেক্ষাপটে এটা বলা যায় যেদিন দেশের সমস্ত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বুদ্ধিজীবী বামচেতনা মুক্ত হয়ে যাবে, সেদিন দেশ হিন্দু রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হবে! তাই দেশের ধর্মনিরপক্ষেতা ও সংহতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে বামেদের অবদান অনস্বীকার্য, আজ দেশ তথা রাজ্যে কেন এত অস্থিরতা? কারণ বাম শক্তি আজ এত দুর্বল। তাই বামেদের শাসন ক্ষমতায় প্রেরণ করা মানে দেশের ধর্মনিরপক্ষেতা ও জনগণের অধিকার সুরক্ষিত রাখা।

এখন অনেক বুদ্ধিজীবীরা বলবেন চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনে গণতন্ত্র কি সুরক্ষিত ছিল? রাজ্যে তখন ছাপ্পা, রিগিং ইত্যাদির উপস্থিতি ছিল, তখন গণতন্ত্র ছিল মৃতপ্রায়! তাঁরা এর সপক্ষে বলেন 10/15/20 বছরের পুরানো সংবাদপত্র পড়লেই একথা বোঝা যায়। এই সমস্ত বিদ্বজ্জনদের শ্রদ্ধা জানিয়েই বলতে হয় অবশ্যই চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনে অনেক জায়গায় গণতন্ত্র হত্যার মত জঘন্য ঘটনা ঘটেছে; এটা অস্বীকার করার উপায় নেই কিন্তু প্রশ্ন হল এগুলি আমরা জানলাম কিভাবে? তার উত্তর হল তৎকালীন সংবাদপত্রের মাধ্যমেই এই খবরগুলি প্রকাশিত হয়েছে। বহু বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন দেশে গণতন্ত্র আছে কি না, তা বোঝা যায় মিডিয়া ও বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা দেখে। যদি দেখা যায় সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত সরকারের সমালোচনা করে রিপোর্ট প্রকাশিত করছে ও কোর্ট নিয়মিত সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিচ্ছে তাহলে বুঝতে হবে সেদেশে গণতন্ত্র সুরক্ষিত আছে।

ঠিক এই যুক্তিতেই বলা যায় তৎকালীন সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার মত সামাজিক মাধ্যম উপস্থিত না থাকলেও সংবাদপত্রের মাধ্যমে সরকারের তীব্র সমালোচনা করা হত, এথেকেই বোঝা যায় পূর্বতন বাম আমলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল বলেই কথায় কথায় ‘বাংলা বন্ধ করা যেত, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল বলেই মমতা ব্যানার্জি 26 দিন রাস্তা বন্ধ করে অনশন করতে পেরেছিলেন’। অথচ আজ মা, মাটি, মানুষের সরকারের বিরুদ্ধে এই দীর্ঘ আটবছরে কটা সমালোচনা মূলক লেখা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে সেটাই বড় প্রশ্ন! সেইসঙ্গে আদালতের রায় না মানা ও আদালতের বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার হীন প্রচেষ্টা এই তৃণমূল কংগ্রেসের আমলেই দেখা যায়, এথেকেই বোঝা যায় রাজ্যে গণতন্ত্র কতটা প্রতিষ্ঠিত আছে? অন্যদিকে, একই ঘটনা বহুল পরিমাণে সংগঠিত করছেন কেন্দ্রের বিজেপি শাসিত মোদী সরকার। মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়াও, ইতিহাসে এই প্রথম সুপ্রিম কোর্টের প্রধান চারজন বিচারপতি একসঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন সুপ্রিম কোর্টের কাজ সঠিক ভাবে চলছে না, সুপ্রিম কোর্টকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা চলছে! যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর!

তাই মোদীর আমলে সিবিআইকে নিয়ন্ত্রণ, ইলেকশন কমিশন তথা বিভিন্ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করার ভয়ংকর প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিজেপি সাংসদ সাক্ষী মহারাজ বলেন 2019 এ মোদী জিতলে দেশে আর নির্বাচনের দরকার পড়বে না অর্থাৎ ‘চরম হিন্দুত্ববাদী ও ফ্যাসিস্ট শাসন’ ব্যবস্থার দিকে দেশ ধাবিত হবে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মাননীয়া মমতা বন্দোপাধ্যায় কর্কশ কন্ঠে ঘোষণা করছেন ’42 এ 42 চাই’ অর্থাৎ বিরোধী শূন্য রাজনীতির প্রয়াস। অর্থাৎ রাজ্যে ও ‘চরম ফ্যাসিস্ট ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির’ বহিঃপ্রকাশ।
তাই যারা ভাবছেন মোদীকে রুখতে গেলে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিতে হবে তাঁরা বোকার স্বর্গরাজ্যে বাস করছেন। প্রকৃতপক্ষে তুল্যমূল্য বিচার করলে এটা বলাই যথার্থ হবে যে ফ্যাসিস্ট চিন্তা চেতনা ও হিংস্র ধর্ম রাজনীতির ক্ষেত্রে মোদী, মমতা কেউ কারোর থেকে কোন অংশে কম নয়। বরং বলা ভালো মোদী ও মমতা একই মুদ্রার এপিঠ, ওপিঠ!

এখন অনেক বিজেপি সমর্থক বলবেন লোকসভা ভোটে অন্যকোন দলকে ভোট দেওয়া মানে ভোটের অপচয়, কারণ মোদী ছাড়া অন্য কেউ কেন্দ্রে ক্ষমতা দখল করতে পারবে না। যদিও এখন তাঁরা পরিস্থিতি প্রতিকূল বুঝে সুর কিছুটা নরম করে বলেন এনডিএ ক্ষমতায় আসবে। তাদের উদ্দেশ্যে বলি বিষয়টি অতটা সহজ নয়! রাজ্যে রাজ্যে মোদীর ফ্যাসিস্ট চিন্তা চেতনা, সাম্প্রদায়িক হিংস্রতা বৃদ্ধি, রাফাল দুর্নীতি, চাকরি প্রদান করতে না পারার জন্য, মানুষের মনে যথেষ্ট ক্ষোভ আছে তাই তার নেতিবাচক প্রভাব বিজেপির উপর পড়তে বাধ্য। যদিও বিজেপি বিষয়টি উগ্র দেশপ্রেম ও হিন্দুত্ববাদ দিয়ে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে। সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রাজ্যে রাজ্যে বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা এবং যুব সমাজের ভিতর থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত হচ্ছে। ভুললে চলবে না 2004 সালের লোকসভা নির্বাচনে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের ওপিনিয়ন পোলে ‘অটলবিহারী বাজপেয়ীর’ নেতৃত্বে ও ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’ শ্লোগানে, বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠা করবে এরকম আভাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে দেখা যায় বাজপেয়ীর মত নেতার উপস্থিতি সত্ত্বেও ও বিজেপি ওই নির্বাচনে পরাজিত হয়!

বিজেপির এটা সর্বাগ্রে মনে রাখতে হবে 2014 সালের ভোট ছিল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোট ওই ভোটে মানুষ কংগ্রেস সরকারের উপর তিতিবিরক্ত হয়ে বিজেপির পক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে 2014 সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদী ছিলেন ‘স্বপ্নের সওদাগর’ তিনি ‘সবকা সাথ, সাবকা বিকাশ’ শ্লোগান দেন। তাঁর এই ‘বিকাশ বা উন্নয়নের’ কথায় আসমুদ্রহিমাচল ব্যাপী হিন্দু, মুসলমান, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ বিশ্বাস করেছিল এবং বিজেপিকে ঝুলি ভরে ভোট দিয়েছিল, তাই বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে দেশে সংখ্যালঘু মুসলমান জনগোষ্ঠীর বাস প্রায় 18 কোটি। যার এক বৃহৎ অংশ গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে ভোট দেয়, সেই ভোট এক বিরাট সংখ্যক লোকসভার আসনকে প্রভাবিত করেছিল এবং বহুক্ষেত্রে বিজেপির জয়লাভ সুনিশ্চিত করেছিল। যেমন- উওরপ্রদেশের মত বহু রাজ্যে এই ভোট নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। এবারের নির্বাচনে এই বৃহৎ অংশের ভোট না পেলে তা বহু আসনেরই ফল পরিবর্তনে সক্ষম হবে। যদিও বিজেপি নেতারা অনেকে এই মুসলমান ভোট ব্যাঙ্ককে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না কিন্তু ভারতের মত এত বিশাল একটা দেশে এত বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভোটের এক বৃহৎ অংশ না পেলে নির্বাচনে জেতা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। এটা অবশ্যই বিজেপির জন্য চিন্তার বিষয়! অন্যদিকে জনগণ এর ফলে কি পেল?

জনগণ এর ফলে কর্পোরেট বান্ধব, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিনষ্টিকরণ, অর্থনীতির হ্রাস, জুমলাবাজির সরকার পেল। মোদীর আমলে 45 বছরে সর্বাধিক বেকারত্ব লক্ষ্য করা যায়, বছরে নতুন 2 কোটি চাকরির বদলে 54,000 বিএসএনএল কর্মচারীদের বরখাস্তের চিন্তা ভাবনা চলছে। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থা গুলিকে দুর্বল করে প্রাইভেট কোম্পানি গুলিকে মুনাফার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে, এটাই মোদীর উন্নয়নের নমুনা। মোদীর উন্নয়ন মানে আদিবাসী, কৃষকদের জল, জঙ্গল, ভূমি থেকে উৎখাত কর ও তা বড় বড় পুঁজিপতিদের নামমাত্র মূল্যে প্রদান কর। দেশের কৃষক এক কেজি পেঁয়াজের দাম পায় 1-3 টাকা আর অনিল আম্বানিকে 30,000 কোটি টাকা সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে (রাফাল কান্ড)। দেশের অনাদায়ী ঋণ খেলাপি বর্তমানে প্রায় 9,50,000 কোটি টাকার কাছাকাছি; এটাই মোদীর উন্নয়নের মূল লক্ষ্য! যেভাবে বিজয় মালিয়া, মেহুলা চাকোসি, নীরব মোদী এরা সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায় তার ফল ভুগতে হয় দেশের আপামর জনসাধারণকে! ইহাই মোদীর ‘বিকাশ বা উন্নয়নের’ মূল মন্ত্র।

অন্যদিকে, মমতা ব্যানার্জি সরকারের আমলে রাজ্যে নতুন কোন শিল্প নেই চপ শিল্প, ঢপ শিল্প, তোলাবাজি শিল্পই সম্বল। দিদির উন্নয়ন মানেই সারদা নারদার উন্নয়ন, ভাইপোর উন্নয়ন, সোনা ভর্তি ব্যাগের উন্নয়ন! বিরোধীরা কটাক্ষ করে বলেন- ‘দিদির পায়ে হাওয়ায় চটি, ভাইয়েরা সব কোটিপতি’। কুনাল ঘোষের মত তৃণমূলের বহিষ্কৃত সাংসদ বলেন- ‘সারদা, নারদার প্রকৃত সুবিধাভোগীর নাম মমতা ব্যানার্জি। তাই আগে মমতাকে গ্রেফতার করে বিচার হওয়া উচিত’। নিন্দুকেরা বলেন ‘আগের সরকার মাছ চুরি করলে , এরা পুকুর চুরি করে’, এটাই নাকি দিদির উন্নয়নের ফিরিস্তি। তাই প্রকৃতপক্ষে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি একই মুদ্রার দুই পিঠ।

রাজ্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় বিভিন্ন মিডিয়া প্রচার করছে মোদী ও মমতার লড়াই কিন্তু বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে বলা যায় এবারের নির্বাচনে নির্নায়ক শক্তি হবে বাম শক্তি। তাই আর যাইহোক এদের দ্বারা সাধারণ, শ্রমজীবী, খেটে খাওয়া মজদুর মানুষের কোন উন্নয়ন সংগঠিত হবে না। তাই চমকের রাজনীতিতে বিভ্রান্ত না হয়ে মানুষ শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে সরকার গঠন করুক, তবেই বেকাররা চাকরি পাবে, শ্রমিকরা কাজের নিশ্চয়তা পাবে, চাষী ন্যায্য ফসলের দাম পাবে, দেশে গণতন্ত্র ও বিজ্ঞান চেতনার বিকাশ ঘটবে! তাই দেশের স্বার্থে বাম ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক শক্তির বৃদ্ধি খুবই প্রয়োজন। আশার কথা হল এই বৃদ্ধি চোখে পড়ছে কারণ এই প্রথম বামেদের ব্রিগেডে এত স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে যুব সমাজ অংশগ্রহণ করেছিল। যারা প্রভাব হিসাবে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে বামেদের স্বপক্ষে ব্যাপক প্রচার, যা আগে কখনও দেখা যায় নি। এথেকেই বোঝা যায় যুব সমাজের এক বিরাট অংশ বামেদের স্বপক্ষে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

নিন্দুকেরা বলেন ঠিক এই কারণেই বামেদের ব্রিগেডের বার্তাটি সঠিকভাবে পৌঁছাতে না পারার জন্য মমতা ব্যানার্জি, রাজীব কুমার ও সিবিআই এর কুনাট্যটি সম্পন্ন করলেন। অনেকে মনে করেন এটি মোদীও মমতার সেটিং। রাজ্যে এবছর প্রথমবার ভোট দাতার সংখ্যা প্রায় 20 লক্ষ, এছাড়া গোটা দেশে প্রথমবার ভোট দাতার সংখ্যা প্রায় 8.4 কোটি অর্থাৎ (8 কোটি 40 লক্ষ) এই বিপুল সংখ্যক নতুন ভোটার যে কোন নির্বাচনী ছক বানচাল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট! তাই দেশের রাজনীতিতে এই কর্মপ্রার্থী ভোটার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই রাজ্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় কিছু দালাল মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা বলছে বামেরা কিছুই নয় কিন্তু বাস্তব সত্য হল এবারের রাজ্য রাজনীতিতে বামেরা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে যা রাজ্য সরকারের গোয়েন্দা রিপোর্টে ও প্রকাশিত হয়েছে। আর রাজ্য রাজনীতিতে বামেরা ভালো ফল করলে দেশের সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বামেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, তখন বাস্তুত বামেদের সমর্থন ছাড়া কেন্দ্রে কোন সরকার গঠন সম্ভব হবে না। এই সরকার অনেক বেশি জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। তাই চমকের রাজনীতিতে প্রতারিত না হয়ে শ্রমজীবী মানুষের সরকার গঠন করুন। তবেই দেশের কৃষক, মজদুর, বেকার যুবক যুবতীদের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে। সেইসঙ্গে সর্বাগ্রে মনে রাখা প্রয়োজন দেশ ও রাজ্য বাঁচাতে বিজেমূল (বিজেপি+তৃণমূল) কে হাঁটাতে হবে। তবেই ‘দেশ তথা রাজ্য বাঁচবে, সংবিধান বাঁচবে, গণতন্ত্র বাঁচবে ও মানুষের বাঁচার অধিকার সুরক্ষিত হবে’!

তথ্যসূত্র:-
1. India Today.
2. CNN-IBN.
3. এই সময়।
4. আনন্দবাজার পত্রিকা।
5. The Xplorateur.
(গোয়েন্দা রিপোর্টের লিংক)
https://www.thexplorateur.in/2019/04/ib-report-states-cpim-as-black-horse-in-bengal-election.html?m=1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *