আমার ছাত্র তৌহিদ

কেউ হজ্জ্বে গেলে ফেরার সময় কম করে হলেও তিনটি জিনিস সাথে করে নিয়ে আসে- ১) জায়নামাজ ২) আরবের খেজুর (কিংবা খোরমা) এবং ৩) এক বোতল জমজম কুপের পানি। তৌহিদের নানা হজ্জ্ব থেকে ফেরার সময় এনছেন চারটি জিনিস। অতিরিক্ত যেটা এনেছেন তা হল- সব কথায় “আলহামদুল্লিাহ্!” বলার (সু)অভ্যাস। তার এই অভ্যাস এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে কথা বলার সময় প্রায় প্রতি লাইনেই একবার করে বলেন- আলহামদুল্লিাহ্!
কাজেই আজকে আমি তৌহিদকে পড়াতে আসার ঠিক দশ মিনিটের মাথায় যখন কারেন্ট চলে গেল তখনও তৌহিদের নানাজান নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন- আলহামদুল্লিাহ্! তৌহিদের মা! কারেন্ট চলে গেছে, একটা মোম দিস তো।

কেউ হজ্জ্বে গেলে ফেরার সময় কম করে হলেও তিনটি জিনিস সাথে করে নিয়ে আসে- ১) জায়নামাজ ২) আরবের খেজুর (কিংবা খোরমা) এবং ৩) এক বোতল জমজম কুপের পানি। তৌহিদের নানা হজ্জ্ব থেকে ফেরার সময় এনছেন চারটি জিনিস। অতিরিক্ত যেটা এনেছেন তা হল- সব কথায় “আলহামদুল্লিাহ্!” বলার (সু)অভ্যাস। তার এই অভ্যাস এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে কথা বলার সময় প্রায় প্রতি লাইনেই একবার করে বলেন- আলহামদুল্লিাহ্!
কাজেই আজকে আমি তৌহিদকে পড়াতে আসার ঠিক দশ মিনিটের মাথায় যখন কারেন্ট চলে গেল তখনও তৌহিদের নানাজান নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন- আলহামদুল্লিাহ্! তৌহিদের মা! কারেন্ট চলে গেছে, একটা মোম দিস তো।
আমি ভাবলাম- এই গরমে কারেন্ট চলে যাওয়ার সকল ক্রেডিটও আল্লাহর! ঘোর আস্তিক বোধহয় একেই বলে!
তৌহিদের পড়ার ঘরটা জানালাবিহীন। ফ্যান চালালেও রিতিমত গরম লাগে। তার ওপড় এই ভ্যাঁপসা গরমে কারেন্ট চলে যাওয়ায় আমি রিতিমত ঘামে গোসল দিয়ে ফেললাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মোমবাতি চলে এলো। সঙ্গে একটা ট্রে। ট্রেতে একটা পিরিচে চারটা প্রমান সাইজের শুকনো খেজুর (কিংবা খোরমাও হতে পারে। এই দু’টো ফলের মধ্যে পার্থক্যটা আমি ভাল বুঝি না!) এবং দু’ গ্লাস পানি। পানির গ্লাস দু’টা দেখে কিছুটা অবাক হলাম।
তৌহিদের মা জবাবের সুরে বললেনঃ বড় গ্লাসেরটা সাধারণ পানি। আর ছোট গ্লাসেরটা জমজমের পানি। আব্বা হজ্জ্ব থেকে ফেরার সময় নিয়ে এসেছেন। নিয়ত করে খাও, অশেষ রহমতের পানি।
আমি মনে মনে নিয়ত করলামঃ হে আল্লাহ্ এই পানি পান করার পর যেন গরমটা একটু কম লাগে!
আমি পানি পান করা শেষ করতেই তৌহিদ বললঃ ভাইয়া, আপনি জানেন- জমজমের পানি রহমতের কেন?
আমি সংক্ষেপে বললাম- জানি।
তৌহিদের প্রশ্ন করার বাতিক আছে। মাঝে মধ্যেই সে পড়া বাদ দিয়ে আজব আজব সব প্রশ্ন করে। সেই প্রশ্ন আবার একটা দুইটা না, একটার লেজ ধরে আরেকটা আসে। সব প্রশ্নের সদুত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তাকে আর পড়ানো যায় না। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলে না। প্রথম প্রশ্নের উত্তর পাওয়া মাত্র দ্বিতীয় প্রশ্ন- জমজমের পানি নাকি কখনও শেষ হয় না? একটা গ্লাসে একটুখানি জমজমের পানি নিয়ে বাকিটুকুতে নরম্যাল পানি ঢেলে দিলে নাকি পুরোটাই জমজমের পানি হয়ে যায়?
: আমিও তো সেরকমই শুনেছি।
: আচ্ছা ভাইয়া- আমি যদি এক বলতি পানিতে একটুখানি জমজমের পানি মিশাই তাহলে কি পুরো বালতিই জমজমের পানি হয়ে যাবে?
: হবার তো কথা!
: তাহলে এক কাজ করলে কেমন হয়! আমাদের ছাদের পানির ট্যাঙ্কে যদি এক গ্লাস জমজমের পানি ঢালি? তাহলে পুরো বাড়ির সব পানিই রহমতের পানি হয়ে যাবে! আর ট্যাঙ্কের পানি তো কখনও ফুরায় না, নিচে একটু জমা থেকেই যায়; তাহলে সারা বছরই জমজমের পানি পাওয়া যাবে!
: বুদ্ধিটাতো খারাপ না!
আগ্রহ পেয়ে তৌহিদ এবার আরও একধাপ বাড়িয়ে বললঃ আচ্ছা ভাইয়া- সাগরের সাথে তো সব নদীর পানি মিশেছে। তাহলে যদি একটু পানি সাগরে ঢেলে দিই, তাহলে সারা পৃথিবীর সব নদী-সাগরের পানি কি জমজমের হয়ে যাবে?
আমি পড়লাম মহা ধান্দায়। তাই তো! এটা করলে তো সারা পৃথিবীর মানুষ ঘরের কাছেই জমজমের পানি পেতে পারে। কষ্ট করে আর আরব যেতে হবে না। তাহলে এটা করা হয় না কেন। তৌহিদের আগে কি পৃথিবীর কোন জ্ঞানী ব্যক্তির মাথায় এই বুদ্ধি আসেনি?
আমাকে চুপ থাকতে দেখে তৌহিদ বললঃ কী ভাইয়া, বললেন না?
এটা আরেক বিপদ। তৌহিদের প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পর্যন্ত সে পড়বে না। “জানি না” বলে যে কাটিয়ে দেব তা হবে না। তাহলে “না জানার অপরাধে” আরও দশটা প্রশ্ন শুনতে হবে।
আমি একটু গলা খাকারি দিয়ে বললামঃ সেটা বোধহয় ঠিক হবে না। কারণ, নদীতে বা সমুদ্রে তো আমরা অনেক ময়লা-আবর্জনা ফেলি। যদি নদীর পানিকে জমজম বানিয়ে ফেলি তা হলে তো পবিত্র পানিতে ময়লা ফেলার জন্য অনেক গুনাহ্ হবে।
তৌহিদ বিজ্ঞের মত মাথা দুলিয়ে বললঃ ওঁ…
আমি উৎসাহ পেয়ে বললামঃ ছাদের ট্যাঙ্কেও বোধহয় ঢালা ঠিক হবে না। কারণ, ট্যাঙ্কের পানিতো আমরা টয়লেটেও ব্যবহার করি। রহমতের পানি দিয়ে কি “শুচু” করা ঠিক হবে?
: ওঁ… তাইতো!
আমি বললামঃ জমজম কুপের পানি সমস্যা সমাধান হলো। এবার তাড়াতাড়ি “দি কাউ” রচনাটা মুকস্ত করে ফেল। আমি দশ মিনিট পর ধরবো।
তৌহিদ জোরে জোরে পড়তে লাগলো “দি কাউ ইজ এ ফোর ফুটেড ডমেস্টিক এনিম্যাল…”
আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। সময় মতো যুতসই একটা জবাব দেয়া গেছে। এই ছেলেকে নিয়ে আমি আছি মহাবিপদে। প্রথম দিন পড়াতে এসে আমিই ওকে বলেছিলাম- কিছু না বুঝলে দ্বিধা না করে সরাসরি প্রশ্ন করতে। কারণ, একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী বলেছেন- যদি কিছু শিখতে চাও তবে প্রশ্ন করে যাও!
এই প্রথম শিক্ষাই আমার কাল হয়েছে। এখন রোজই আমাকে একগাদা আজগুবি প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। কোনটার ভুল উত্তর দিলে আরও যন্ত্রণা। সেদিন বাংলা ২য় পত্রে গরু রচনা পড়াতে গিয়ে দেখলাম “উপকারীতা”তে লেখা আছে- “বলদ গরু লাঙ্গল টানে।”
সাথে সাথে তৌহিদের প্রশ্নঃ ভাইয়া বলদ গরু কী?
একটা ফোরের বাচ্চাকে আমি কিভাবে বুঝাই বলদ গরু কী? যদি কষ্টে-শিষ্টে বোঝানো যায়ও তখন পশ্ন করতে পারে- কেন? এর কী উত্তর দেব? নিজেই তো ভাল করে বুঝি না! ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি গল্প “বলদ”-এ লিখেছেন- একটি প্রাণির পুরুষত্ব কেড়ে নেয়ার মত নির্মম কাজ নাকি আর কিছু হতে পারে না। তবু মানুষই একমাত্র প্রাণি যারা এই নির্মম কাজটি নিজ স্বার্থে করে থাকে। কিন্তু এই গুরুগম্ভীর বক্তব্য তো আর তৌহিদকে বলা যায় না।
তাই এড়িয়ে গিয়ে বললাম- বলদ হচ্ছে পুরুষ গরু।
কিন্তু পরের লাইনেই লেখা- ষাড় গরু দিয়ে গরুর গাড়ি টানা হয়। যথারিতি আবার প্রশ্ন- তাহলে ষাড় গরু কী?
আমি আমতা আমতা করে বললাম- ষাড় গরুই পুরুষ গরু আর বলদ হচ্ছে…
আমার কথা শেষ হবার আগেই তৌহিদ বললঃ তাহলে গাভি?
আমি ঢোক গিলে বললামঃ ষাড় আর বলদ দু’টোই পুরুষ গরু। কোনটাকে ষাড় বলে, কোনটাকে বলদ বলে। কোনটাকে কী বলে তা বড় হলে বুঝতে পারবে।
: কেন! এখন বুঝবো না কেন?
আমি বিরক্ত হয়ে বললামঃ আরে বাবারে তুমি তো পাঠা আর খাসির তফাৎই বুঝো না, ষাড় আর বলদের তফাৎ কিভাবে বুঝবো? বোঝ? তুমি খাসি আর পাঠার তফাৎ বোঝ?
তৌহিদ মাথা ঝাকালো- সে বোঝে না।
আমি বললামঃ অতো বোঝার দরকারও নেই- পড়।
তৌহিদ কিছুটা আশাহত হয়ে পড়তে লাগলো। কিন্তু দুই লাইন পড়েরই আবার বললঃ ভাইয়া! আমার মনে হয়- কালো গরুকে ষাড় আর লাল গরুকে বলদ বলে, তাই না?
আমি কথা কাটানোর জন্য বললামঃ অনেকটা ঐরকমই। তাড়াতাড়ি পড়। ঘড়ি ধরে দশ মিনিট পর লিখতে দেব।
উত্তরে যথার্থতার জন্যই হোক আর লিখার ভয়েই হোক তৌহিদ দ্রুত পড়তে লাগলো। আমি মনে মনে ভাবলাম- শিশু দিবসে যে সব বুদ্ধিজীবিরা টেবিল চাপড়ে “শিশুর জন্য হ্যাঁ বলুন”, “শিশুকে ভুল শিখাবেন না” কিংবা “শাষণ না করে আদর দিয়ে বুঝিয়ে বলুন” এই জাতীয় কথা বলেন তাদের একজনকে ধরে এনে তৌহিদকে পড়ানোর দায়িত্ব দেয়া দরকার। তাহলে বোঝা যেত- শিশুদের কত প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বলে দেখাতে পারে!
তৌহিদের ধারনা আমি সবজান্তা সমশের। কোন প্রশ্নের উত্তরে “জানি না” বলা যায় না। টিচার কিছু একটা জানে না এটা যেন তার মাথাতেই আসে না! তার ওপর প্রশ্ন করার পরামর্শ স্বয়ং আমিই তাকে দিয়েছি!
তৌহিদের “দি কাউ” মুকস্ত হয়ে গেছে। আমি ওকে লিখতে দিয়ে একটা খাতা নিয়ে বাতাস খেতে লাগলাম। কারেন্ট কখন আসবে কে জানে? গরমটাও পড়েছে মারাত্মক! নিয়ত করে জমজমের পানি খেয়েও কোন কাজ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। সারা শরীর থেকে চিরবির করে ঘাম বেরুচ্ছে। ইচ্ছে করছে একটা পুকুরে গিয়ে ঢুব দিয়ে থাকতে। এর মধ্যে আছে আবার মশা। ঢাকা শহরের মশাগুলোর প্রাণশক্তি অসাধারণ। কয়েল আজকাল এদের কাবু করতে পারে না। তবে গত কয়েকদিন মশা একটু কম ছিল। তৌহিদের বাবা গুলিস্তান থেকে মশা মারার একটা ব্যাট কিনে এনেছেন। জিনিসটা বাজারে নতুন এসেছে। চীনাদের আবিষ্কার! রেকেট খেলার ব্যাটের মত দেখতে এই চার্জেবল ইলেক্ট্রিক ব্যাট-এর সুইচ অন করে মশাকে বাড়ি দিলে টাস টাস আওয়াজে দারুণ স্পার্ক হয়। সেই স্পার্কে মশা পুড়ে ছাই হয়ে যায়! তৌহিদের মা প্রতি সন্ধ্যায় তার ব্যাট দিয়ে পড়ার টেবিলের নিচে টাস টাস করে কিছুক্ষণ মশা মেরে দিয়ে যায়। তাতে বেশ কাজ হয়। মশা কম লাগে।
কিন্তু গত দু’দিন ধরে এ বাসায় ব্যাট দিয়ে মশা মারা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তৌহিদের নানার কঠিন ফতোয়া- কোন প্রাণিকে পানিতে চুবিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে- এই দুইভাবে মারা ইসলামে নিষিদ্ধ। ব্যাট দিয়ে মারলে যেহেতু মশা শক খেয়ে পুড়ে ছাই হয়ে যায় তাই এটা ব্যবহার করা যাবে না।
বুড়ো ভদ্রলোকের ফতোয়া শুনে আমি বিমোহিত হলাম। একহাতে বাতাস করা ও অন্য হাতে মশা মারার মত বিরক্তিকর কাজে যখন ব্যস্ত তখন ওঘর থেকে তৌহিদের নানাজান এ ঘরে এলেন। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সালাম দিলাম।
তিনি সালামের জবাব না দিয়ে বললেনঃ আমি পান খাইতেছি। কাউকে খাওয়ার সময় সালাম দিতে নাই।
আমি বিব্রত হেসে বললামঃ ও, সরি। আপনি ভাল আছেন?
: আলহামদুল্লিাহ্!
বলে উনি খাটের ওপর গম্ভীর হয়ে বসে বললেনঃ মাস্টার সাব কয় কেলাস লেখাপড়া করছেন?
আমি বিনীত হেসে বললামঃ জ্বি আমি এখনও ছাত্র। ডিপ্লোমা পাশ করে এখন ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বি.এস.সি করছি।
: ওঁ, আলহামদুল্লিাহ্! তা জমজমের পানি নিয়া কী জানি কইতেছিলেন?
আমি বিব্রত বোধ করলাম। আমার কথাবার্তা যে ও ঘর থেকে উনি শুনেছেন তা স্পষ্ট। তাই আমতা আমতা করে বললামঃ না মানে, তেমন কিছু না। এই, পবিত্র পানি, বিশেষ রহমত…
: না জেনে কোন কিছু বলা ঠিক না। অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্কর জিনিস।
আমি ধমক খেয়ে চুপ করে গেলাম। উনি বিজ্ঞের মত বললেনঃ আমাদের স্বভাব হচ্ছে যে যত কম জানি সে তত বেশি বলি।
আমি মনে মনে বললাম- অতি সত্য কথা!
তিনি জ্ঞানীর মত বলতে লাগলেনঃ আল্লাহ তাআলা আমাদের দুইটা কান দিছে, দুইটা চোখ দিছে আলহামদুল্লিাহ্! কিন্তু মুখ দিছে মাত্র একটা। যাতে আমরা দেখি বেশি, শুনি বেশি কিন্তু বলি কম আলহামদুল্লিাহ্! পবিত্র কোরআনে আছে… ভাল কথা- আপনি কোরআন পড়তে পারেন?
আমি লজ্জিত হেসে বললামঃ জ্বি না। ছোট বেলায় কায়দা-সিপারা পর্যন্ত পড়েছিলাম। তবে ঘরে বাংলা কোরআন শরীফ আছে…
আমার কথা শেষ হবার আগেই তিনি হুঙ্কার দিলেনঃ আরে রাখেন আপনের বাংলা। আরবীর মত মধুর কোন ভাষা আলহামদুল্লিাহ্! আর আছে? আরবী হচ্ছে রাসুল (সঃ) এর ভাষা আলহামদুল্লিাহ্! কবরে তো সব প্রশ্ন হবে আরবীতে। আরবী না জানলে উপায় আছে!
আমি আমতা আমতা করে বললামঃ তা তো বুঝলাম, কিন্তু অর্থ না বুঝে আরবী পড়ার চেয়ে অর্থ বুঝে বাংলায় কোরআন পড়ে তা আমল করাই বেশি ভাল না?
এবার তিনি রিতিমত রেগেই গেলেন। বাংলা কোন ইসলামের ভাষা হল। উর্দু বা ফারসি জানলেও একটা কথা ছিল। বাংলা তো হিন্দুদের ভাষা! আপনে জানেন কোরআন শরীফ প্রথম বাংলায় তরজমা করেছেন একজন হিন্দু লোক? সেই হিন্দুর ভাষায় আপনে কোরআন পড়বেন!
আমি এতোক্ষণ এই মুরুব্বির কথা বিনীতভাবে শুনছিলাম। এবার কেন জানি একটু গায়ে লাগলো। আমি হেসে বললামঃ বাংলা ভাষা যে হিন্দু একথা কে বলল? আমি তো দেখি বাংলার মত ধর্ম প্রাণ মুসলমান ভাষা আর নেই! দেখেন মুসলমানদের দাড়ি রাখা সুন্নত, অথচ পৃথিবীর কোন ভাষাতে কি দাড়ি আছে? শুধুমাত্র বাংলা ভাষাতেই প্রত্যেক লাইনে লাইনে দাড়ি! এক্কেবারে খাটি মুসল্লি!
নানাজান এবার ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেনঃ তারমানে! আপনে আমার সাথে ইয়ার্কি করেন?
আমি বিনীতভাবে বললামঃ জ্বিনা, ইয়ার্কি করতে চাচ্ছে না। তবে আল্লাহ যে বাংলা বুঝেন না তা জানতাম না। বরং আমি শুনেছিলাম আল্লাহ বলেছেন- “কোরআনকে আমি আপনার ভাষায় নাজিল করেছি যেন আপনি তা বুঝতে পারেন।” তাহলে বোঝার সুবিধার্থে কি কোরআন আমার নিজের ভাষা- বাংলায় পড়া উচিৎ না? আর আপনি বললেন- কোরআন প্রথম বাংলা তরজমা করেছেন একজন হিন্দু লোক। এটা আমিও জানি। কিন্তু আল্লাহ তো নিজেই বলেছেন যে- আল্লাহ নিজেই কোরআনের হেফাজতকারী। তাহলে তার কালাম অনুবাদই হোক আর তরজমাই করা হোক “তাতে ভুল আছে” এই সন্দেহ করার আবশ্যকতা আছে কি?
নানাজান উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বিরবির করে বললেনঃ বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। যে লোক তর্ক করে তারে জ্ঞানের কথা বলা মানে উলু বনে মুক্তা ছড়ানো।
আমি আবারও বিনয়ের সাথে বললামঃ নানাজান! আমি কোরআন-হাদিস বেশি পড়িনি। মুরুব্বিদের মুখে শুনেছি একটা হাদিস আছে- বোখারী শরীফের প্রথম হাদিস: “প্রত্যেক কর্মের ফল তার নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” আমি এই একটা হাদিসই শুধু আমল করতে চেষ্টা করি। সেই নিয়তও আবার নাকি মুখে বলতে হয় না, কলবে আসা মাত্র আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়। কাজেই নিয়ত আরবীতে করলাম না হিন্দী করলাম তাতে কিছু এসে যায় না।
নানাজান রাগে গজ গজ করতে করতে বাইরে চলে গেলেন। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তৌহিদের দিকে তাকালাম। দেখি সে মুখ লুকিয়ে হাসছে।
: হাসছো কেন?
ও হাসি থামিয়ে বললঃ ভাইয়া, একটা প্রশ্ন- ধরেন কেউ সিগারেট খাচ্ছে, তখন কি তাকে সালাম দেয়া যাবে? কারণ, সিগারেট তো কেউ গিলে খেয়ে ফেলে না- ধোঁয়া আবার ছেড়েই দেয়।
আমি বিরক্ত ভঙ্গিতে বললামঃ জানি না! কোরআন-হাদিস ঘেঁটে বের করতে হবে! তোমার নানাজানকে জিজ্ঞেস করো।
এই প্রথমবারের মত তৌহিদ “জানি না” এর জবাবে কোন পাল্টা প্রশ্ন না করে চুপচাপ লিখতে লাগলো।

———- ০ ———-

– সফিক এহসান
(১ সেপ্টেম্বর ২০০৯ইং)

৮ thoughts on “আমার ছাত্র তৌহিদ

  1. চমৎকার লাগলো…টেক্সটবুকের
    চমৎকার লাগলো…টেক্সটবুকের বাইরে বই টই তেমন একটা পড়ি না। একমাত্র আপনার লিখায়ই কেন যেন আনন্দ পাই!! :S

    1. সর্বনাশ! বলে কি???

      রিতিমত
      সর্বনাশ! বলে কি???
      :খাইছে:

      রিতিমত লজ্জা পাইছি… :লইজ্জালাগে:
      শুকরিয়া + :ধইন্যাপাতা:

  2. পড়ে মজা পেলুম।
    পড়ে মজা পেলুম। 😀 😀 😀 😀 😀
    আপনার লেখায় সাবলীলতা জিনিসটা আছে। ওইটা ভালো লাগে। চালিয়ে যান। :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:

  3. আমি ও এক জনের মুখে এই কথা
    আমি ও এক জনের মুখে এই কথা শুনেছি বাংলা হিন্দুর ভাষা তাই পরিহার কর্। উত্তর দেবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু পারলাম। । । ।

    পরে অনেক মজা পেয়েছি ।

    1. আপনি সম্ভবতঃ (২য় লাইনে)বলতে
      :নৃত্য:

      আপনি সম্ভবতঃ (২য় লাইনে)বলতে চেয়েছেন-

      “উত্তর দেবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু পারলাম না।
      পড়ে অনেক মজা পেয়েছি ।

      যা-ই হোক… ধন্যবাদ। সাথেই থাকুন…

  4. পড়ে খুব মজা পেলাম, সত্যিই খুব
    পড়ে খুব মজা পেলাম, সত্যিই খুব মজা করে লিখেছেন| :থাম্বসআপ: 😀 :হাহাপগে:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *