কবি

প্রায়শই লোকমুখে আমরা একটা কথা শুনি- “বাংলাদেশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি।”
কবিদের সম্পর্কে এরূপ সংকীর্ণ মনভাব সম্পন্ন একটি মন্তব্যের স্বপক্ষে বিজ্ঞজনদের যুক্তি হল- “বাঙালীরা সবাই কবি। জীবনে অন্তত দুইটা কবিতা তারা লিখবেই। একটা, প্রথম প্রেমে পড়ার পর। আরেকটা, প্রেমে ছ্যাঁকা খাওয়ার পর।”
উল্লেখ্য, উক্ত যুক্তিতে বাঙালী বলতে বিশেষতঃ বাঙালী পুরুষদেরকেই বুঝানো হয়। সুতরাং একটা দেশের সব পুরুষই যদি কবি হয়ে যায় তাহলে (মহিলা কবিদের কথা বাদ দিলেও) সে দেশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি হওয়াটা অসম্ভব নয়। অন্ততঃ কথার কথা বলার জন্য তো নয়ই।

প্রায়শই লোকমুখে আমরা একটা কথা শুনি- “বাংলাদেশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি।”
কবিদের সম্পর্কে এরূপ সংকীর্ণ মনভাব সম্পন্ন একটি মন্তব্যের স্বপক্ষে বিজ্ঞজনদের যুক্তি হল- “বাঙালীরা সবাই কবি। জীবনে অন্তত দুইটা কবিতা তারা লিখবেই। একটা, প্রথম প্রেমে পড়ার পর। আরেকটা, প্রেমে ছ্যাঁকা খাওয়ার পর।”
উল্লেখ্য, উক্ত যুক্তিতে বাঙালী বলতে বিশেষতঃ বাঙালী পুরুষদেরকেই বুঝানো হয়। সুতরাং একটা দেশের সব পুরুষই যদি কবি হয়ে যায় তাহলে (মহিলা কবিদের কথা বাদ দিলেও) সে দেশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি হওয়াটা অসম্ভব নয়। অন্ততঃ কথার কথা বলার জন্য তো নয়ই।
তবে একথা বলাই বাহুল্য যে, কবি বলতে ‘কবিতার লেখক’ দেরকেই বুঝানো হচ্ছে। তা হলে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে- কবিতা কী?
এক্ষেত্রে আগেই যথাযথ বিনয়ের সাথে হাতজোড় করে জানাচ্ছি যে, কবিতা সম্পর্কে আমার জ্ঞান দুধের শিশুর মত। তাই ‘কবিতা কী?’ এর উত্তরের জন্য আমি প্রথমেই স্মরণাপন্ন হই বাংলা অভিধানের। অভিধানের ভাষাটা এরূপঃ কবিতা- পদ্য রচনা, শ্লোক, কাব্য, শায়ের; সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা।
স্পষ্টতই অভিধানের এই উত্তর খুব একটা তথ্যবহুল নয়। কাজেই আমি এবার গেলাম গুরুজনদের কাছে। তারা আমাকে যা শোনালেন তার তাৎপর্য রিতিমত ব্যাপক এবং ভয়াবহ! কেউ কেউ বললেন: কবিতা হচ্ছে ছন্দ, মাত্রা, তাল, লয় ইত্যাদি সমৃদ্ধ এক মহৎ সাহিত্য কর্ম যার সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হচ্ছে অন্তমিল।
অনেকে আবার অন্তমিলের ছায়াও মাড়ালেন না। তাদের মতামত: রূপক, অলঙ্কার ও সাবলীল শব্দ সমৃদ্ধ প্রাঞ্জল এক সাহিত্যরূপই হচ্ছে কবিতা।
দু’ চারজন আবার চতুরতার সাথে দুই পক্ষের সজ্ঞাকে একত্র করে বললেন: কবিতায় অন্তমিল থাকতেই হবে এমন কোন কথা নেই তবে রূপক, অলঙ্কার আর শব্দ ঝংকার থাকতেই হবে। সেই সাথে ছন্দ ও মাত্রা একে আরও সমৃদ্ধ করে।
কোন কোন অতি চতুর বিজ্ঞজন নির্লিপ্তে ঘোষণা করলেন: কবিতা হচ্ছে কবিতা। কবি যা লিখবেন তা-ই কবিতা।
তাদের এহেন উত্তরে আমি আরও তালগোল পাকিয়ে ফেলে বললাম: তাহলে কবি কারা? এরা কি কবিদের কোন বিশেষ স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘কবি ডিগ্রী’ পাওয়া নির্দিষ্ট এক শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ?
আমার শিশুসুলভ প্রশ্ন শুনে বিজ্ঞজনেরা ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে বললেন: দূর বোকা! তা হবে কেন? কবি হচ্ছেন তারাই, যারা সত্যিকারের কবিতা লিখতে জানেন!
সুতরাং বুঝতেই পারছেন আমার এই ক্ষুদ্র জ্ঞানে আমি আদৌ কবিতার সর্বজন স্বীকৃত কোন সুনির্দিষ্ট সজ্ঞা খুঁজে পাইনি। শুধু এটুকু বুঝেছি, কবিতার পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। বলা যায়, সাহিত্যের সকল শাখার মধ্যে এটিই সবচেয়ে জটিলতম। তাই কবিতাকে এক কথায় সজ্ঞায়িত করা অন্তত আমার পক্ষে অসম্ভব। তাতে অবশ্য আমার খুব বেশি দুঃখ নেই। কারণ, আমি আজ কবিতার সজ্ঞা দিতে বি.সি.এস পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসিনি। আমি শুধু ‘কবি’ শব্দটা নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতে চাচ্ছি।
কবিতার সজ্ঞা যাই হোক না কেন একটা ব্যাপারে সবাই মোটামুটি একমত যে, যে ব্যক্তি কবিতা লিখেন সে একজন কবি। অবশ্য আমার এক ফাজিল টাইপের বন্ধুর ধারনা জীবনে একটা কবিতাও না লিখে কেবল মাত্র ভেষজ ঔষধের চিকিৎসা করেই নাকি কবি হওয়া যায়। যে সে কবি নয়, আমরা তাকে রিতিমত “কবিরাজ” বলে ডাকি!
দুঃখিত; অসংলগ্ন কথার জন্য মাফ করবেন। প্রসঙ্গে ফিরে আসছি- কবিতার সজ্ঞা যাই হোক আর কবিতার ধরণ, আকৃতি বা প্রকৃতি যেমনই হোক না কেন, সত্যিকারের কবিতার লেখককেই আমরা কবি বলি।
[বিঃদ্রঃ- এখানে ‘মিথ্যাকারের’ কবিতা বলতে বুঝাচ্ছি-
“আহা কী সুন্দর নিশুতি রাতি,
আকাশে উড়ে যায় একঝাক হাতি।”
কিংবা-
“আমরা সবাই মান-মুসল
নদীতে নেমে করি গোসল।”
– এজাতীয় লেখাকে।]
সুতরাং সত্যিকারের সাহিত্য হিসেবে গন্য হবার যোগ্য যে সব কবিতা রচিত হয় সেগুলোর লেখকগণই হচ্ছেন কবি।
এখন কথা হল, এই কবি নামক জীবটি দেখতে কেমন? অনিরুদ্ধ দিলওয়ার নামক এক ভদ্রলোক তার ‘কবি’ শিরোনামের কবিতার প্রথম অনুচ্ছেদে বলেছিলেন-
“কবি হলে কিরকম হতে হয়? // ইঁদুর, বিড়াল, অক্টোপাস না মানুষের মত কিছুটা // শুনেছি কবিদের ঘর থাকতে নেই, বউ থাকতে নেই // ঘুম থাকতে নেই, জামার সব ক’টা বোতাম থাকতে নেই // মানুষগুলো যা খায় কবিদের তাও খেতে নেই।…”
একথা আমরাও জানি। কবি বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে কাঁধে পাটের ব্যাগ ঝোলানো, খদ্দরের কাপড়ের পাঞ্জাবি পরা, পায়ে তলা ক্ষয়ে যাওয়া চটি পরা এক ময়লা-ঝাকরা চুলের আগোছালো মাঝবয়েসি এক লোকের ছবি। নিজের প্রতি যে ভীষণ বেখেয়াল। দাড়ি গোফে ঢাকা মুখ আর সরু ফ্রেমের কাঁচের চশমার পেছনে কৌতুহলী এক জোড়া চোখ নিয়ে সেই লোক উদাসি ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়ায় পথে ঘাটে।
কিন্তু এটাও আমরা সবাই জানি যে, সেই যুগ এখন নেই। এখন কবিরা অনেক আধুনিক, অনেক বেশি স্মার্ট। তারা নিয়মিত শেভ করে, সুন্দর করে চুল আঁচড়ায়, স্ত্রি করা পরিষ্কার জামা-কাপড় পরে। কোট-টাই পরা অফিসের বড় সাহেব কিংবা মাথায় টুপি, পরনে পাঞ্জাবি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী- আল্লাহ ওয়ালা কবিও অনেক আছেন। এমনকি, জিনস্ প্যান্ট- মোবাইল শার্ট, মাথায় জেল দেয়া স্পাইক কাটিং চুলের কবিদেরও অভাব নেই। সোজা বাংলায়- আজকাল কবি তথা সাহিত্যিক হওয়ার জন্য কোন বিশেষ পোষাক কিংবা সাজসজ্জার প্রয়োজন হয় না। মান সম্পন্ন কবিতা লেখার প্রতিভা থাকলেই সে নিঃসন্দেহে একজন কবি।
কিন্তু এখানে আমার একটু আপত্তি আছে। যুগে যুগে যে সকল কবিদের আমরা দেখে এসেছি, তাদের অধিকাংশের মধ্যে কবিতা লেখার ক্ষমতা ছাড়াও আরেকটি গুণ ছিল। তা হচ্ছে মনুষত্ব। একজন কবিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে শুধুই একজন ‘কবিতা-লেখক’ হিসেবে নয় বরং একজন সত্যিকারের ভাল মানুষ হিসেবে কল্পনা করি। যে মানুষটি হবে মহৎ, নির্লোভ, দেশ প্রেমিক। স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি যার অসীম মমতা। যে শুধু কলম দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কৌশলই লিপিবদ্ধ করে না; নিজে স্বশরীরে অসহায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। যে এই জগৎ সংসারের, এই বিশ্ব-মানবতার কল্যাণের জন্য স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রেরিত। যে বিশ্বকে ভালোবাসা দিয়ে জয় করার সাহস ও সামর্থ রাখে। আমি বিশ্বাস করি, এবং দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি, একজন কবি হতে হলে তাকে অবশ্যই এই মহামানব সত্তাকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে হবে। অন্তত ধারণ করার চেষ্টা করতে হবে।
কিন্তু হায়! সমাজে এরকম কবি কতজন আছে? একটি চরম সত্য হচ্ছে, এই মহামানব সত্তাকে নিজের মধ্যে ধারণ করার দুঃসাহস আমার নেই বলেই আমি কখনও কবি হবার স্বপ্ন দেখি না। কিন্তু সমাজে যারা প্রতিষ্ঠিত বা অর্ধপ্রতিষ্ঠিত কিংবা অপ্রতিষ্ঠিত লেখক আছেন, যারা নিজেকে একজন কবি হিসেবে লোক-সমাজে পরিচয় দেন, যারা সত্যিকার অর্থেই একজন ভাল মানের সাহিত্যিক, একজন খাঁটি ‘কবিতা-লেখক’ তাদের কাছে আমার বিনীত নিবেদন- আসুন আমরা শুধুমাত্র একজন নিরেট সাহিত্যিক বা ‘কবিতা-লেখক’ না হয়ে একজন সত্যিকারের কবি হই। নিজের ভেতর সেই মহামানব সত্তাকে ধারণ করার চেষ্টা করি। তার জন্য যদি সারা জীবনে দু’টি চরণও না লিখতে পারি, কোন ক্ষতি নেই।
কারণ, “যে দেশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি” সে দেশে আর নতুন করে কোন ‘কবিতা-লেখক’-এর প্রয়োজন নেই। আমাদের চারপাশে আজ এতো দুঃখ-কষ্ট, অভাব-হাহাকার, এতো এতো সমস্যা; যা কেবল কবিতা লিখেই সমাধান করা যাবে না। সমাজকে বদলাতে হাতিয়ার হিসেবে এখন কেবল কলমই যথেষ্ট নয়। কলমের কথাকে আমাদের হাতে কলমে করে দেখাতে হবে। তাই শুধুমাত্র একজন ‘কবিতা-লেখক’ কিংবা সাহিত্যের যে কোন শাখার লেখক তথা একজন সাহিত্যিক না হয়ে বরং একজন মুক্তমনের মানুষ হই; একজন মহৎ ব্যক্তি হই; একজন সত্যিকারের ‘কবি’ হই। আমাদের মহামূল্যবান প্রতিভা ও ক্ষমতাকে জাগতিক কাজে ব্যয় করি; তাতে সমাজের একটু হলেও উপকার হবে।

———- ০ ———-

[আমার মত যারা অ-কবি আছেন- সবাইকে উৎসর্গকৃত…]

– সফিক এহসান
(৬ জুন ২০০৮ইং)

৬ thoughts on “কবি

  1. এতো হুড়াহুড়ি কেন রে ভাই? আমরা
    এতো হুড়াহুড়ি কেন রে ভাই? আমরা পাঠকরা তো পালায়ে যাচ্ছি না। প্রথম পাতায় তিনটা পোস্ট হয়ে গেলো। ইস্টিশনবিধি লঙ্ঘন করে ফেললেন।

  2. ভাই এটা গল্প হইল কেমনে?
    ভাই এটা গল্প হইল কেমনে? বুঝলাম না? :কনফিউজড: :কনফিউজড: :কনফিউজড: :কনফিউজড: :কনফিউজড:

  3. ইহা কি অর্থে গল্প???? একদিনে
    ইহা কি অর্থে গল্প???? একদিনে এতো পোস্ট দেওয়ার কি আছে। রয়ে সয়ে দেন। :আমারকুনোদোষনাই:

  4. তিনটা হয়ে গেছে নাকি???
    সরি

    :খাইছে:

    তিনটা হয়ে গেছে নাকি???

    সরি খেয়াল করিনি একদম! তাছাড়া এটা আসলে অন্য একজনকে লিঙ্ক দেয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে আপলোড করে ফেলেছি! এতো কিছু খেয়ালই করিনি!
    সবার কাছে সরি…

    আর এটা ঠিক গল্প না। ঠিক করে দিচ্ছি…

    আবারও ক্ষমা প্রার্থি।
    :লইজ্জালাগে:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *