পোকা সব মরে যাক (৩)

তার পরের দিন ভোরে, ও’র ছোট বোনটা এসে নাকের কাছে হাত দিয়ে বলে, ‘ঘুমায়’। লোকটা চোখ মেলে দেখে ও’জানালায় উঁকি দিয়ে বলে ‘উঠাসনে, চলে আয়।’
পরে গতকালের ন্যায় ঝাড়ু নিয়ে সামনের রুমে ঝাড়ু দেয়া শুরু করে। লোকটা বলে, ‘সকালে ঝাড়ু দেয়া ভালো নাকি বিকালে?’
সবাই তো সকালে দেয়।

পোকা সব মরে যাক(২)

‘যা হোক তুমি, আমাকে একটু পানি খাওয়াও।’
ও’ গ্লাসে করে পানি নিয়ে এসে দাড়িয়ে থাকে।
‘তোমার কাছে কোনটা ভালো, সকালের পরিচ্ছন্ন বাতাস নাকি ঝাড়ু দেয়া ধুলা? ধুলাময়লা ঘরে রেখে ঘুমানো নাকি পরিষ্কার ঘরে ঘুমানো?’
অত ভালো লাগবে না, পানি খাবেন অারো?
‘না।’
বাদাম ভাজা?
‘মানে?’
খাইলে বলেন ভেজে আনি।
‘তোমার মা বকবে না?’
এহ, আমার বাদাম।
‘ভাজতে হবে না, নিয়ে আসো। শোনো, তোমাকে কি দিতে হবে?’
আমাকে আবার কি দিবেন, কিছুনা।
‘তা হবে না, কিছু নিতে হবে। কি নিবে বল?’
কি আবার, কিছুনা।
‘তোমার কি পছন্দ বল। চকলেট, আইসক্রীম, আচার…’
কিচ্ছুনা।
‘তাহলে কিন্তু খাবো না।’
খাইলেন দেখি।
‘তাই তো! এখন?’
এখন কি, কিছু দিতে হবে না, অামি সেই রকম না বুঝলেন?
‘কিরকম? বল’
এর মধ্যে ও’র ছোটবোনটা এক গামলা গরম ভাজা বাদাম নিয়ে আসে…
ও’ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ‘খান স্যার।’
তুমি খাও।
‘না।’
কেন?
‘আমার আছে।’
তাহলে তোমারটা নিয়ে আসো।
‘আপু নে।’
‘তুই কই পাইছো?’
‘ক্যান, চাচী দিছে।’
‘চাচী তোরে এতগুলা বাদাম দেছে! আমার তা নিছো, না?’
সর।
ও’উঠে দ্রুত ঘরে যায়, সাথে সাথেই আবার ফিরে এসে বলে, ‘তোরে চোপরাইয়া?’
কি হয়েছে?
‘কিছু না স্যার, আপনি খান।’
তুমি না খেলে খাব না।
‘আমি তো খাবই’, বলে কয়েকা বাদাম হাতে নেয়, আর একটা পাত্র এনে বলতে গেলে সব বাদাম ঢেলে লোকটার সামনে রেখে বলে ‘খান’।
ছোটবোনটা হাতপা ছুড়ে কান্না শুরু করতে গিয়ে লোকটার দিকে তাকায়, কাঁদো কাঁদো কন্ঠে ‘মায়ের কাছে বলতেছি’ বলে চলে যেতে চায়।
‘বাদাম তোর? তোকে দিছি যে, সেটাই তো বেশী, যা বল যাইয়া।’
‘বোকা কথা না বলে বেশী বেশী খাও, খাওয়া শেষ করে আবার এখান থেকে নাও, না দিলে তখন বলবে তোমার সব বাদাম তোমার আপু আমাকে দিয়ে দিছে।’
ছোট বোনটা থাবা দিয়ে কিছু বাদাম নিয়ে নেয়।
ও’র কথা কেমন যেন থেমে থেমে যায়। ‘স্যার, মুড়ি খাবেন?’
না, তুমি তো বললে না, তুমি কি নিবে?
‘কেন?’
পানি খাওয়ালে, বদাম খাওয়ালে যে,
বাদাম খাওয়ালে যে?
‘ও’কে জিজ্ঞাস করেন, বাদাম তো ওই দিল।’
ওরটা ওর কাছে, আগে তুমি বল।
কিচ্ছু না, আচ্ছা আপনি দিয়েন, যা মন চায়।
ছোটবোন বলে, ‘কুলফি।’
‘এই লোব্ভাটা।’
ওকে বকা দিচ্ছ কেন, ও তো ঠিকই বলেছে, যদীও বাদাম মনে হয় তোমারটাই চুরি করে এনেছে, তাই না?
‘না স্যার, মায় দিছে, বিশ্বাস করেন, বলছে চাচীর কাছে যা, ভেজে আপনারে দেতে বলেছে।’
‘ও’ একটু হেসে বলে, স্যার আপনি গাঙ্গ পাড়ে হাটার সময় কি দেখেন?’
তার মানে?
‘ফুল দেখছেন? জঙ্গলের পাশে পাশে কত ফুল ছিল!’
হ্যা এখনো তো আছে।
‘আনতে পারেন না।’
কেন? এনে কি করব?
‘দিবেন। সবাইকে দিবেন।’
তাই? তুমি নিবে?
‘যখন ছোট ছিলাম, তখন তো রোজ আনতাম।’
তাই? আনতে কি ভাবে? ওখানে তো অনেক কাটা!
থাক অানতে হবে না।
কেন, নিয়ে আসব আনে তোমার জন্য, ফুল দিয়ে কি করবে? কয়টা ফুল লাগবে?
দু’হাত নাকের কাছে নিয়ে বলে, ‘লাগবে না, এমনিতেই আনতাম।’
তোমার কোন ফুল পছন্দ?
‘সাদা ফুল।’
রজনীগন্ধা?
‘না, ছোট ছোট, মধ্যে একটু লাল লাল, সুন্দর ঘ্রাণ।
সাদা গোলাপ?
‘না, ঐখানে গোলাপ পেলেন কোথায়?’
কেন ঐখানে ফুলের বাগানে। তুমি দেখ নাই?
‘ঐ ফুল তো বিক্রি করে।’
তোমার পছন্দ কিনা বল?
‘না। আপনি তাহলে আসল ফুল দেখেন নাই, আপনার মনেহয় গোলাপ পছন্দ?’
হ্যা। লালগোলাপ। আসল ফুল কোনটা অাবার?
‘সাদা সাদা থোকায় থোকায় হয়, রাস্তার পাশেও থাকে।’
আচ্ছা, তাই বল, খুব সুন্দর, কাটাও থাকে না। তাই না? তোমাকে তো এখনি এনে দিতে পারি।
‘আমিও আনতে পারি।’
তুমি যাবে গাঙ্গ পাড়ে।
‘গাঙ্গপাড়ে যাব কেন, এখানেই এক জায়গায় আছে।’
ছোটবোনটা এবার বড় ওয়ানে উঠেছে। মায়ের কাছে বলে দেবার হুমকী দিয়ে হঠাৎ দৌড় শুরু করে।
কিন্তু ও’ থামিয়ে দেয়, ‘এই তুই কি বলবি?’
ও’র মা ডেকে বলে, ‘ঘরে বুঝলাম ছ্যামরা ঘুমায়, পিছনের রুমটা তো এতক্ষণে ঝাড় দিতে পারতি’। চাপিয়ে রাখা দরজার কাছেই ও’ বসা ছিল। তিনি ভিতরদিক থেকে দরজা খুলে একনজর তাকিয়ে আবার দরজা চেপে রান্না ঘরে চলে যান। ও’ ঝাড়ু নিয়ে ভিতরে যায় কিন্তু পিছনের রুম পর্যন্ত যেতে পারেনি, কেউ খপ করে ধরে রেখেছে। লোকটা ও’কে ডাকে কিন্তু কোন জবাব নেই, ওর ছোটবোনকে বলে যেন ডেকে আনে। সে ভিতরে না গিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে বলে, ‘আপুকে স্যারে ডাকে’। কিছুক্ষণ পরে এসে বলে, ‘আপুকে ডাকেন কেন?’
পানি খাব বলে, ও’র নাম ধরে ডাকে। ভিতর দিয়ে তখন দরজাটা কেউ চেপে ধরে। ছোটবোনটা দ্রুত আবার রান্নাঘরে মায়ের কাছে যায়। তারপরে এসে বলে, ‘অাপু দাদির ঘরে গেছে।’
লোকটা বলে, ‘ভিতরের রুমে কে ঘুমায়? পানির জগ আনা যাবে?’
উপরে রাখাল ঘুমাচ্ছিল। ‘পানির জগ আনা যাবে না কেন, কি হইছে? আপনাকে প্রথম দিনই তো বলছি পুরো বাড়ি আপনার।’
‘তা ঠিক। তবে নিজের বাড়ি হলেও আমি বিনা অনুমতিতে অন্যের রুমে ঢোকা, বিরক্ত করা বা জোড়করে কিছু ধরার পক্ষে না।’
তখন স্পষ্টই কেউ দ্রুত ভিতরের রুম থেকে পিছন দিকে বের হয়ে যায় আর খালাত ভাই উঠে ধীরে ধীরে পিছনের দরজায় যায়। গতদু’রাতেই তারা ওয়াজ মাহফিল শুনতে শুনতে ঘুমায় কিন্তু ফজরের সময় কারো উঠার আলাপ পাওয়া যায় না। ও’র মা এসে বলে, ‘তুই আজকেই বাড়ি ছাড়বি। ঘরে মানুষজন বসা, এখানে বসে তানিবানি শুরু করছ!’ রাখাল বলে, ‘জুই কতবড় হইছে?’
‘কতবড় আবার, ওরা দু’জন একই বয়সের!’
‘নিয়া আসলেন না কেন?’
‘অত ঠেকা পরে নাই।’
‘ঠ্যাক সব অাপনার, না? তয় আপনি থাকেন, আমি যাবো আনে!’
ঐদিন সারাদিন ও’র কোন দেখা পাওয়া যায়নি। ও’র মা বলেছিল দাদির কাছে।
সফি ও’র বাবার সাথে কাজে গিয়েছিল। বাড়িতে পুরুষ মানুষ কেউ নেই। দু’দিন পরে দুপরের পরে ও’র মেঝ বোন বলে, ‘স্যার আমার একটা ছবি তোলেন’। ও’র ছোট দু’টা বোনই ছবি তোলার জন্য দাড়ায়। লোকটা ছবি তোলার পরে ও’র কথা জানতে চায়। দু’জনে লোকটার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়, ‘ঐ তো বাড়ির পিছনে’। ওখানে কাজলীসহ আরো কয়েকজন। লোকটা দূর থেকে একটা ছবি তোলার চেষ্টা করে কিন্তু ও দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। সন্ধার পরে ও’র মায়ের কাছে জানতে চায়, ও ঘরে আসছে না কেন। ‘ও ও’র দাদির কাছেই থাকে, দাদি ছাড়তে চায় না।’
পড়াশুনা করে ঠিকমত?
‘পড়াশুনাই তো করে, ও’র বাপ বাড়ি থাকলে ঘরে একটু থাকে, না হলে তো সারাদিন স্কুলে আর দাদির কাছেই।’
আমি কিন্তু একদিনও পড়তে দেখলাম না, দাদির কাছে কি পড়ে?
‘তা আমি কি বলব, মাষ্টার একজন রাখছিলাম। এইখানে বসাইয়া পড়াইত, কিন্তু একছের ভুল পড়ায়, ও’র ছোট চাচীর কাছেই পড়তে দিছে। এত কথাকথির থেকে তাদের মে তারাই দেখুক।’
এটা কি বলছেন, আপনার মে!
‘আমি কি বলব, ওর বাপ বাড়ি থাকলে কিছু বলতে পারতাম, আবার কোথায় কি দোষ ধরবে তারথেকে দাদির কাছেই থাক।’
কাজলী আর মুক্তি হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকেই ‘স্যার কেমন আছেন?’
তোমাদের এত হাসাহাসি করার অনুমতি দিল কে?
‘তা তো ঠিকই- আপনি অাছেন যে তা তো জানতাম না।’
লোকটা ও’র কথা জানতে চেলে বলে, ‘আমরা তো বুবুর কিছুই হইনা, গেলেই তাড়াইয়া দেয়, নাতনি তো শুধু একজনই, একেবারে লোহার সিন্দুকে রাখে, যদি আবার কেউ চুরি করে নেয়, সুন্দর তো তাই। ডাকলাম, মনেহয় আমাদের সাথে এলে, রূপ নষ্ট হয়ে যাবে। না, বদনাম করব না, ভাই। ও অহংকার করে না। ঠিকই তো, এখন বাইরে আসবে কেন, যদি আমার বিয়া ঠিক করত আমিও আসতাম না, কারো সাথে কথাই বলতাম না।
কি-ই?
‘বুবু কোথায় যেন বিয়া ঠিক করছে -যদি ভেঙ্গে যায় -আম ছালা সব যাবে।’
ও’দের এসব কথা লোকটার কাছে শুধু দুষ্টামি মনে হত না, কারণ ও’র অন্তরের খবর অনেকটাই লোকটার কাছে প্রকাশ পেয়ে যেত। কিন্তু সে ব্যাপারে মেয়েটা একেবারেই একরোখা- লোকটার প্রতি যে তার ভালবাসা তা কেবলই তার অন্তরের মধ্যে, কখনোই তা কারো কাছে প্রকাশ করতে চায়না, এমনকি লোকটার কাছেও না, তার ইচ্ছে যেন সবাই নিজেরাই তা বুঝতে পারে আর তিরস্কারের পরিবর্তে তাকে বাধ্য করে সেই সম্পর্কের জন্য যে সম্পর্কের পথে তারা কাটা বিছিয়ে রেখেছে। সে তার ভালবাসার কথা প্রকাশ করে না কিন্তু তার সবথেকে কষ্টের মুহূর্ত তখনই যখন সে লোকটাকে অন্যকোন মেয়ের সাথে কথা বলতে দেখে, আর বেপরওয়া জেদ তখনই যখন কেউ লোকটাকে উপহাস করে আর তাকে নিরুৎসাহিত করে লোকটার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে। কেউ তাকে বয়স্ক বললে অারো বেশী বয়স্ক, গরীব বললে একবারেই খয়রাতি, ধর্ম-কর্মহীন বললে একেবারেই কোন বিধর্মীর সাথে সে জেদ করে হলেও ঘনিষ্ঠতার মাত্রা অতিক্রম করে ফেলে শুধু মাত্র কাটা বিছানো লোকগুলোকে লজ্জিত করতে। কিন্তু তারা যে লজ্জাহীন আর তারা যে ওসবের সুযোগে দুজনের দূরত্ব বাড়িয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চায় তা বুঝবার মত শক্তি ও’র মধ্যে তৈর হয়নি। শুধু দুষ্টামি মনে করত না -তা ঠিক, কিন্তু এতটা সহজ ভাবেনি! আজ বৃষ্টির তাড়া খেয়ে লোকটা দ্রুত গাঙ্গ পাড় থেকে ফিরে আসছিল, জান্নাতির দোকান পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি, একজন জেলে কাছেই একটা একচালা ঘরের দিকে নিয়ে যায়। পুরুষ মানুষের অাগমন দেখে দরজার কাছে এক মহিলা তার পোশাক ঠিক করতে করতে পর্দার আড়ালে যাবে করে। কিন্তু লোকটাকে দেখে একেবারেই স্থির হয়ে যায়। দরজার কাছে পৌছানোর পরেও সে স্থির হয়ে আছে- এতটুকু নড়ছে না। জেলে লোকটা ঘরে প্রবেশ করে পিছনের দিকে তাকায়। কিন্তু মহিলাটা শরীর ছেড়ে দিয়ে এমন ভাবে দাড়িয়ে যেন লোকটাকে মোটেও পরপুরুষ মনে করছে না। চৌকাঠে দাড়িয়ে বলে, ‘ঢোকেন দাড়িয়ে অাছেন কেন?’
লোকটা তারপরেও দাড়িয়ে থাকে।
‘আপনি আমাকে চেনতে পারেন নাই?’
কে আপনি?
‘আপনার কম্পিউটারের দোকান ছিল, আমরা যেতাম প্রতিদিন।’
লোকটা চোখের দিকে তাকিয়ে চিনতে পারে, ‘আচ্ছা, তোমরা এতবড় হয়েগেছ!’
হইনাই, বানাইছে।
‘মানে?’
আপনি আগে ভিতরে বসেন, আপনি মনে হয় এখনো আমাকে চেনেন নাই, আমি পলি।
‘চিনতে পেরেছি, তোমার আরেকটি বোন -অর্থাৎ তোমরা দু’জন একত্রে যেতে- তাই না?’
হ্যা।
‘তোমরা কেমন আছো?’
ঐ তো?
‘মানে?’
পিছনে ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চাটিকে দেখিয়ে বলে, ‘এই তো, কয়েকদিন পরেই স্কুলে যাবে। আপনি এত কয় বছর কোথায় ছিলেন?’
তুমি বিয়ে করেছ কবে? তোমার কতইবা বয়স!
‘করি নাই, করাইছে।’
জামাই কোথায়?
‘ঢাকায়।’
কি করে?
‘লেদার কোম্পানির ম্যানেজার, আমার সাথে কাইজ্জা তাই এসে পরেছি?’
পলিরা ও’র থেকে স্কুলে দু’বছরের বড় ছিল, ও’ যখন টু ক্লাশে পলিরা তখন ফোর ক্লাশে ছিল। সেই সময় পলি যতটুকু ছিল ঠিক ততটুকু আরেকটা মেয়ে ঘোমটা মাথায় ভিতরে বসা। লোকটা জানতে চায়, ‘ও কি তোমার বোন?’
না, ভাবী।
‘কত বছর বয়সে তোমরা বিয়ে করেছ?’
কেউ করে নাই, জোড় করে করে করে। এখন বাপ মা বুঝে। ঐ যে আপনি দেখেছিলেন না, ছবি তোলতে গেছিলাম যে, তখনই আমারে প্রথম ঢাকা নিয়ে গেছিল, তারপরে বাপ-মা’রে নিয়া যায়, কত সুন্দর কাম কাইজ করে, সংসার পাতে। তখনি আমার বিয়ে হয়।
ছয় বছর আগের কথা। ও’রা দুজন গলা ধরে একটা ছবি তোলে। তারপর তাদের দাবী, চেহারাটা ফর্সা করে দিতে হবে, সেই সাথে সুন্দর পোশাকের রং দিতে হবে। স্কুলের প্রধান শিক্ষকও চলার পথে কাছে এসে দাড়ায়, ‘কত কিছুই না সম্ভব এখন কম্পিউটারে, টিপ, গলার মালা, হাতে -কানে সবই তো হয়েগেছে, কিছুই তো কেনা লাগে না, এখন কত টাকা দিবে উনাকে?’
টাকা কি এখন দিব? ছবি যখন নিব তখন দিব?
‘তা তো দিবি কিন্তু গহনা, স্নো পাউডারের দাম দিবি না?’
‘তা উনি আরো কম রাখবে, উনার স্টুডিওতে স্নো-পাউডার তো কেনেই না।’
এর মধ্য আরো কয়েকজন চলে আসে, প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘তা না কিনে একবাঁচা বাচছেন, কিনলে থাকত নাকি! তোদের বলে যাই, তোরা উনার সাথে কেউ শয়তানি বান্দরামি করিস না, উনাকে নাজিগাইয়া কিছু ধরবি না, কিছু নষ্ট হইলে কিন্তু সবগুলাকে…’
শান মাষ্টারের খাদেম নবীর ছেলে বলেছিল, ‘উনি কেমন যেন, ঐদিকে দেখি একচাপে, এক ঘষায় কালা মানুষ ফর্সা করে দেয়, তোরা ঐ দিকে বাজারে যেয়ে তোলতে পারো না, উনার সাথে ঘ্যান ঘ্যান না করে?’
হ হ, এক্কেবারে ফর্সা করে দিতে হবে।
প্রধান শিক্ষক ঘুরে বলে, ‘তোরা দুইটাইতো কাল, ফর্সা করবে ক্যান, ঐটাই দেখতে সুন্দর হয়েছে।’
‘একেবারে ফর্সা করা বা রং পরিবর্তন করা ঠিক না, তাহলে ছবি দেখে তো মানুষটা কালো না ফর্সা বুঝাযাবে না, তবে লাইট বাড়িয়ে কমিয়ে সুন্দর করলে চেহারা বুঝা যায়।’
ছোটবোনটা বলে, ‘না ফর্সা করে দিতে হবে।’
‘আচ্ছা, সবাই করলেও, আমি সেরকম করব না, তাতে চেহারা চেনা কঠিন, চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। সেরকম ছবি নিয়ে তোমার মাকে দেখালেও তিনি চেনতে পারবে বলে মনেহয় না যে ওটা তোমার ছবি। কিন্তু এই ছবি দেখে ঠিকই চেনতে পারবে, তোমার পরনে সুন্দর পোশাক, গহনা না থাকলেও তোমাকে চেনতে পারবে।’
‘এত সুন্দর ছবি, আমরাও তোলব, তোরা যা, যখন নিবি তখন আসিস’ বলে আরো কয়েকজন ছবি তোলতে ঢোকে।
দুপুরের দিকে পাশেই অবস্থিত আবাসিক হোটেলের লেবার টাইপের এক ছেলে ‘এসে লোকটার হাতের পেপার টেনে বলে ‘পড়তে পারেন? একটু পড়ে শুনান তো!’
লোকটা কাটার হাতে নেয়, কিছু জিজ্ঞাস করার আগেই বলে, ‘দেন যারটা তাকে দিয়ে আসি’ বলে পেপারটা ধরে।
তুই কে রে, কই থাক?
এর মধ্য সে দ্রুত বা’দিকের গলিতে ঢুকে যায়।
লোকটা দ্রুত বের হয়ে ঘর মালিক আর প্রতিবেশীদের ডাকবে করে, কিন্তু নবী বলে, ‘ঐ হোটেলের, আপনারে চেনতে পারে নাই।’
কোন হোটেলের?
‘যে আপনাকে চা খাওয়াইল!’
আমাকে চা খাওয়াইছে, কি বলছেন এসব?
‘আপনি ভুলে গেছেন? আমি দেখলাম দেখি, আপনি চায়ের ওর্ডার করার পরে, হে নিজে হাতে করে দু’কাপ চা নিয়ে ঢুকেছিল।’
তাই বলেন, কিন্তু ঐ ছেলে এত বেয়াদবি করে কি ভাবে?
‘আপনার চেহারা দেখে নাই, চেনতে পারে নাই!’
তাকে অথবা তার উৎসাহদাতাকে মেরে ফেলা উচিত, চেনার প্রয়োজন নাই, আমার দোকানে যেই হোক না কেন পেপার পড়া অবস্থায় পেপার টেনে চেহারা দেখার অধিকার কেবলই আমার ঘনিষ্ঠজনরা রাখতে পারেন, আপনিও পারতেন না।
‘ওরা লেবার, ওদের কি সেই জ্ঞান আছে?’
উৎসাহদাতাদের থাকতে পারে, বাড়ি আলার কাছে চিনায়ে দিবেন।
তার কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল, পলিকে হাত ধরে স্টুডিওর সামনে থেকে বাজারের দিকে নিয়ে যায়।
ও’র জীবনের শুরুটা এখানেই হয়েছিল আজ পলিরা যেখানে বসত গড়েছে। পুরুষরা ব্যবসায় বাণিজ্যে, দোকানদারি আর মাছ ধরার কাজ করত, কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী সরকারি গেষ্ট হাউজে ফরমাশ খাটত। বিগত দশ বছরে ব্যাপক উন্নয়ন এখানে অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে। বেরী বাঁধের বাইরের এই মানুষগুলোর কাছে দিগন্তজোড়া জলরাশির মতই দুনিয়াটা অনেক বড়। বাহির পাড়ের শিশুরা সাহস করে যখন বেরী বাঁধে উঠে উকি দেয় তখন জগৎটাকে জলরজশির মতই বিশাল মনে করে। একটু বড়ে হলে তারা বড়দের কাছ থেকে শিক্ষা পায় যে জলরাশির কোন শেষ নেই, যত যাবে ততই ঐ রকম বিস্তৃত। মহিলারা অনেকেই শিশুদের মত, দেশ বলতে স্থলভাগে যতটা চোখ যায় তার থেকে অনেক অনেক বড় হবে, তবে সেই বড়ত্বটা জেলা উপজেলা, দেশ মহাদেশের ধারণা অনুধাবন করতে পারে না। একদিকে মগাদের দেশ আরেকদিকে আকাটাদের দেশ আর উত্তরে ঘরকূলের মানুষদের পরে সাদাচামড়ার দেশ। তবে শিশুরা সবাই স্কুলে যায়। মাস্টাররা, মেম্বাররা খোঁজ রাখে, স্কুলে না দিলে বাপ-মা’কে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে।
দশ বছর আগে এসব জায়গায় যাদের বসতি ছিল তারা সবাই নাকি ভূমিহীন হিসাবে সরকারি জমি পেয়ে অন্যত্র স্থায়ী বসতি স্থাপন করেছে। তারপরেও কিছু মানুষ শখ করে অথবা মাছ ধরার সুবিধার্থে এসব জায়গায় বাস করে। আবার অনেকে কপাল দোষে জমি বিক্রি করে এখানে অাশ্রয় নেয়। শিশুদের তারা স্কুলে পাঠায় ঠিকই কিন্তু জীবন আর অাখিরাতের প্রয়োজনে ইসলাম শিক্ষাটাই জরুরী মনে করে। তবে মেয়ে শিশুদের জন্য ‘যারটা খায় যারটা পরে তারাই মালিক’ আর ছেলে শিশুরা জলের কিনারে কিনারে মাছপোনা ধরে যা উপার্জন করে তাতে বারো থেকে বিশ বছরের মধ্যেই বউ পালন অার সংসারপাতার কাজটা সেরে ফেলতে পারে। সেরকম মানুষরা অবশ্য নিজেদের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ করতেও প্রস্তুত। তবে যারা স্কুল ছেড়ে সংসার পালনে ব্যস্ত তারা সবসমই শিক্ষিত সহযোদ্ধাদের সব থেকে বোকা মনে করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করাবার মত নগদ অর্থের যোগান দেবার ক্ষমতা অনেকেরই নেই, তাতে হয়ত জমি বিক্রি করতে হয় অথবা সহোদরদের মিন্নাতের অর্থে পড়াশোনা করতে হয়। দশ বছর পূর্বে যে জমির শতাংশ দশ হাজার টাকা ছিল তা অনেক ক্ষেত্রে এখন নাকি দু’চার লক্ষ টাকা দাম। তারপরেও, তারা যতই উপহাস করুক না কেন নিজের সন্তানকে উচ্চ শিক্ষিত করতে অনেক চেষ্টা চালিয়ে যায়। তবে মহিলারা অনেকই মনে করে কন্যা সন্তান তো বিয়ে দিতেই হবে, তবে যৌতুকের পরিবর্তে এককালীন কিছু নগদ টাকা পাওয়াটাই যেন সৌভাগ্য। কেউ কেউ অবশ্য সেই আশায় অপেক্ষা করতে থাকে, তবে বলা যায় না যে সবাই, অপেক্ষা করতে করতে সন্তানদের পাপ পূণ্যের বিষয়ে একেবারেই বেহিসাবি, ফলে যৌতুকের ঘানি টানা বা ঘর ভাঙ্গা মেয়েদের অাশ্রয় কিংবা পাপ পূণ্যের বিচার হারিয়ে দূরের শহরে উপার্জনে সায় দেয়া, অথাবা বোরখার সুযোগ। ছোট ছোট শিশুদের স্বপ্ন থাকে – অপেক্ষার প্রহর গোনে, টুরিষ্টদের মত সঙ্গীর হাত ধরে সময় কাটানোর, স্নান করার। তাই সুযোগের অপেক্ষা। মেয়েদের জন্য সুযোগটা কাজে লাগানো অনেক সহজ, তবে এমনটা বলা যায় না যে, তারা সবাই চাইলেই বোরকা পরে খুব সহজে পরিচিত জনের মাঝে একেক সময় একেকজন সঙ্গীর সাথে ঘুরে বেড়াতে পারে। পাপের মেলা মেশা শুরুর আগেই তারা বিয়ে করতে চায়, কিন্তু লাইসেন্সাসরা সবসময়ই চরিত্রবানদের শত্রু। নিজের অায়ত্বের বাইরে চলে যাবার সম্ভবনা থাকলে তারা যেকোন বিয়ের প্রস্তাবেই বিরোধিতা করে, অনধিকার দাবী নয়ত পুলিশি ভয় দেখিয়ে বিয়ে বাতিল করে দেয়া। যারা সেরকম লাইসেরন্সাস আত্মীয় বা প্রভাবশালীদের প্রভাব মুক্ত থাকতে পারে তাদের সন্তানদের কথা ভিন্ন, তাছাড়া, সন্তানদের শেষ চেষ্টা ভিনদেশে বিয়ে করা অন্যথা পাপের মেলা মেশায় অভ্যস্ত থাকা।

সেদিন ও’র কথা মত সন্ধার অনেকটা অাগেই লোকটা পৌঁছে যেত। কিন্তু বাস থেকে নামা মাত্র ভোলা দা তার পিছু নেয়া। লোকজনের মধ্যে জানতে চায় কোথায় যাবেন? তখন লোকটার পক্ষে সত্য কথা বলার উপায় ছিল না, বলে ‘সামনে যাব, আপনি কোথায় থাকবেন? সন্ধার পরে আপনার সাথে কথা হবে।’
অনেকদিন পরে আপনার সাথে দেখা হল, একটু বসে যান।
‘আপনি থাকেন, আমি কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসব।’
কিন্তু সে পিছন পিছন হাটতে শুরু করে।
ও যখন ৬ষ্ট শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল তার কিছুদিন পরে মাদ্রাসার গেটে লোকটার সাথে ও’র দেখা হয়। তার আগে বেশ কিছুদিন দেখা সাক্ষাৎ ছিল না। ওরা কয়েকজন মেয়ে, বাড়ি থেকে হেটে হেটে মাদ্রাসায় আসছিল। মাদ্রাসার গেটে ঢোকার একটু আগেই লোকটাকে হেটে আসতে দেখে ও’ রাস্তার ওপাশ থেকে এ পাশে এসে বলে ‘খুব সুন্দর লাগছে’।
কিছুটা দূরে বাদিকে তিনজন হুজুর দাড়িয়ে ছিল। তাদের একজন হুট করে ইউ টার্ন নিয়ে লোকটার নাক ঘেষে বাদিকে দুজনের মাঝ থেকে হেটে গিয়ে মাদ্রাসার গেটে গিয়ে এমন জায়গায় দাড়ায় যে সেই শয়তানের ছায়া ভেদ করেই ও’কে মাদ্রাসায় ঢুকতে হয়েছিল। দুপুরে লোকটা ওদের বাড়ি যায়।
ও’র মা বলে, ‘স্যার কেমন আছেন? অনেকদিন পরে আসলেন।’
আমার তো অাসা নিষেধ, তাও তো আসলাম।
‘কে নিষেধ করেছে? আপনি তো নিজের ইচ্ছাতেই চলে গিয়েছিলেন। আপনাকে তো কেউ মারেও নাই, ধরেও নাই।’
কিন্তু বলেছিল, যারা বলেছিল তারা পরে কিন্তু বলেনি। বরং পূর্বের ন্যায় সম্মানই করে। আপনারা এতদিন ছিলেন না, কিন্তু আমি প্রায় প্রতিদিনই দিনে রাতে এইদিকে আসা যাওয়া করি।
‘আসেন তাহলে বাড়ি আসেন না কেন?’
আজকে তো এসেই পরলাম, আপনারা কবে এলেন?
‘ওদের নানা বাড়ি গেছিলাম। আসছি অনেকদিন হয়ে গেছে, এতদিন বলে নাই কেউ?’
না, কে বলবে?
‘ক্যান বাজারে, খায়ের রাখালের সাথেও দেখা সাক্ষাৎ হয়না!’
তা তো হয়ই।
ও’মাদ্রাসা থেকে ফিরে বলে, ‘স্যারে বাড়িতে, মা, স্যারে কখন আসছে?’
‘কখন আসছে তা জেনে কি হবে, স্যারেরে কি খাওয়াবি, কেমন আছে অাগে সেই খোঁজ নে।’
‘স্যার, আপনি কেমন আছেন? মা, আজকে না স্যারকে মাদ্রাসার কাছে দেখছিলাম।’
‘ও হেইতেই ছারে আসছে।’
মুহূর্তেই ও’র হাসি বন্ধ হয়ে যায়। ‘ক্যান? আসছে তো কি হয়েছে?’
‘ছারে দেখ কি খাবে, বসতে ক, ভাত খেয়ে যাবে অানে।’
‘আমি খাব না কিছু, তুমি কেমন আছো বল।’
‘আপনি বাড়ি আসেন না কেন?’
লোকটা কোন উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। ও’র মা রান্নাঘরে চলে গেছে। ও কাছে এসে বলে, ‘স্যার আপনি নাকি বাসায় ছাত্রীদের পড়ান?’
আবারো চুপ করে থাকে, তারপরে হেসে দিয়ে বলে, ‘আমি তোমার সাথে কথাই বলব না, তুমি সেদিন কি করেছিল, ভুলে গেছ?’
কি করছি?
‘আমার বাসার সামনে?’
‘ও’হাত বাড়িয়ে বলে, দশ টাকা দেন।’
আবার?
দেন বলে হাতটা আরেকটু এগিয়ে দেয়। লোকটা শুন্য হাত এগিয়ে দিয়ে বলে ‘নেও, কিন্তু ও’ দরজার আড়ালে চলে যায়।’
রাখাল এসেই বলে, ‘কাল থেকে স্কুলে যাবি, হেড স্যারের সাথে কথা হইছে।’
‘তোর কথায়?’
রাখাল বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকে, রাগ করে বলে, ‘তাইলে পড়বি কোথায়, শুনি?’
‘মাদ্রাসাই ভাল।’
‘গতকাল কি বলছিলি? চোপরাইয়া…’
‘মাদ্রাসায় কি আমি ভর্তি হইছি তোরাই তো ভর্তি করছ! স্কুলে যাওয়ার গাড়ী ভাড়া তুই দিবি?’
‘এক্কারে চোপার দিমু। মাদ্রাসা কাছে দেখ! দুইদিন পরে বৃষ্টিতে তো হাটুসমান কাদা থাকবে, সেই কথা ভুলে গেছ?’
রখাল ঘরে চলে যায়, লোকটার চোখ রাখালের দিকে, ও দরজার আড়ালে দাড়িয়ে যে হাত বাড়িয়ে রেখেছে তা খেয়াল করেনি, উঁকি দিয়ে বলে, ‘দেন’। ‘নেও’ বলে লোকটা হাত বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু ও’ আবার হাত সরিয়ে নেয়। ‘তাইলে ৫টাকা দেন।’
‘তোমার গেউদ্দা বোনও তো মনেহয় কারোকাছে ৫টাকা চায়না, দাড়াও। এইটা কিন্তু শোনার আংটি, তোমাকে দিয়েছিলাম, নিলা না, নিলে নাও; তোমাকে দিলাম, এটা তোমার, যখন ইচ্ছা, নিও। এটাও নিতে পারো।’

ঐদিন রাতেই লোকটাকে ইসলাম বিরোধী বলে এক লোভি রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্বে কিছু লোক হামলা করে। লোকটাকে মৃতপ্রায় ভেবে রাস্তায় ফেলে রাখে। তখন এই ভোলানাথ তাকে তুলে হসপিটালে নিয়ে যেতে পুলিশের সাথে সহযোগিতা করছিল। সে পিছন দিয়ে ডেকে বলে, ‘দাদা আমি কিন্তু খুব সমস্যায় আছি, দোকানপাট খুলতে পারছিনা, এলাকায় থাকাটাই মুশকিল।’ তাকে উপেক্ষা না করে তার সাথে কিছু সময় ব্যয় করে। আর ও’র খবর জানতে মোবাইলে চেষ্টা চালায়। ও’র মোবাইল সেই দুপুর থেকে বন্ধ। ও’র মা ফোন ধরছে না, রাখাল ফোন ধরে বলেছিল, ‘ও শশুড় বাড়ি চলে গেছে’। যেখানে বিয়েই হয়নি, সেখানে শশুড় বাড়ি! – লোকটা কিছু বলেতে চেয়েছিল, কিন্তু অধিকার কোথায়? জানতে চায়, ‘বিয়ে হয়েছে কবে?’
তা প্রায় দু’বছর আগে।
‘কাবিন হয়েছে?’
না, জামাই বিদেশে, দেশে এলে কাবিন হবে।
‘শশুড় বাড়ি কোথায়?’
আপনাদের ঐদিকে, কোথায় জানি?
‘তোমরা চেননা?’
চিনি, যাইনাই।
‘কে গেছে? তোমার বাবা-মা?’
সেরকম কেই যায় নাই, কিন্তু বাড়িতে লোক আছে, তারা চেনে জানে।
‘তোমার চাচী বা বুবুরা নিশ্চই?’
আপনি জানলেন কিভাবে?
‘সেটা বড় কথা নয়। কাবিনের আগেই বোনকে শশুড় বাড়ি পাঠানো ঠিক হয়নি, তার উপর যার সাথে বিয়ের কথা সে বিদেশে, তার উপর তোমরা কেউ সে বাড়ি দেখওনি!’
সমস্যা কি? তাতে সমস্যা নাই।
কথা হয় সগীরের সাথে। সগীর বলে, ‘তাদের কথা আমরা কিছু বুঝি না। কয়েকটা ছেলে আসছিল – কলেজে পড়ে, আলেকান্দা থাকে নাকি, এসে অাংটি পড়াইয়া গেছে।’
আমি শোনলাম, সে বিদেশে থাকে?
‘হ বিদেশে থাকে। তার ভাই, চাচাত ভাই আর বন্ধুরা এসেছিল।’
কোথায় নিয়েগেছে?
‘বাড়িতেই তো অাছে!
এখন কোথায়?
‘বাড়িতে’
কেন, শশুড় বাড়ি যায়নি?
‘নেতে চাইছিল, যায় নাই।’
তুমি নিশ্চিত যে ও বাড়িতে আছে?
‘হ এই মাত্র দেখে আসছি।’
আংটি পড়াইছে কবে?
‘তা এক দেড় মাস আগে।’
আচ্ছা ও’র খোঁজ খবর নিও, আমার সাথে কথা বলতে বল, আর খেয়াল রেখ যেন জোড় করে কোথাও না পাঠায়।
কিছুক্ষণ পরে, আবার ফোন করে বলে, ও’ তো ফোন ধরছে না, তুমি একটু ওদের ঘরে যাও আর মোবাইলটা ও’কে দাও।
‘ও কাজলীর সাথে আমাদের ঘরে এই মাত্র এলো।’
আমার সাথে কথা বলতে বল।
কিছুক্ষণ পরে বলে, ও’র শশুড় বাড়ির মেহমানরা সাথে অাছে, তাই কথা বলতে পারছে না, পরে ফোন করবে অানে।
পরেরদিন ভোরে অন্য একটি নম্বর থেকে ফোন করে বলে, ‘আসতে পারেন নাই, আসেন নাই, এখন এত ফোন করেন কেন?’
কেন-এর জবাব দেয়ার সুযোগ না দিয়েই আবার ফোন বন্ধ করে রাখে।
লোকটাও আর ফোন করার প্রয়োজন মনে করেনি। শুধু ও’র মাকে ফোন করে জানতে চায় কেমন আছে, বাড়িতে না শশুড় বাড়িতে?
‘আপনি কোথায়?’
আমি তো এখানেই, গতরাতে এসেছি।
‘বাড়িতে আসেননি কেন?’
আপনাদের বাড়িতে যাবার জন্যই এসেছিলাম, কিন্তু শুনলাম ঘরে মেহমান, আপনার মেয়ে শশুড় বাড়ি চলে যাচ্ছে।
‘তা কি মুখের কথা? তারা তো কবে থেকেই নিয়ে যেতে চায়, আত্মীয়সজন সবাইরে দিয়া বলাচ্ছে, আমি নিষেধ করছি, ওর বাপেও ফোন করে বকাঝকা করছে। আপনি বাড়ি আসেন।’
আচ্ছা আমি আসছি।
এর মধ্যে গাঙ্গ পাড়ে লোকটা ওর কন্ঠ শোনতে পায়। ও’র মায়ের কাছে আবার জানতে চায়, ও কোথায়।
বলে, ও’র বুবুর ঘরে।
লোকটা দূর থেকে দেখল, অনেক মানুষজন। একটা চটপটির দোকানে চার পাঁচজন ছেলের সাথে একটা মেয়ে ফুচকা খাচ্ছে। বেশ হাসি খুশী।
লোকটা মোবাইলে ফোন করে, রিং হচ্ছে কিন্তু মেয়েটাকে দেখে কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। লোকটা সামনে যেতে শুরু করে। স্বঘোষিত সুফি সাধক ফকির বলে, ‘অন্তরের মানুষ মালিক চোখের সীমায় এনেছে, হাতের সীমায় আনতে কতক্ষণ?’
কি বললেন বুঝলাম না।
‘আপনি বিদ্বান মানুষ, ঐদিকে গুড়াগাড়ারা মুক্তবিহঙ্গের মত – ওসব জায়গায় কি আমাদের যাওয়া ঠিক?’
আপনি থাকেন, আমার একটু কাজ আছে। ‘যান, অাপনি যা ভাল মনেকরেন, আমি আসছিলাম আপনার সাথে একটু কথাবার্তা বলব করে। টুরিষ্টদের কোন কাজে বিরক্ত করা কিন্তু সম্পন্ন নিষেধ।’
আমি শতভাগ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, কিন্তু স্বাধীনতা নাকি কোন কারণে কাউকে স্বাধীনতার শিকার হতে বাধ্য করা তা জানা দরকার।
এর মধ্যে ছোট একটা মেয়ে, কন্ঠ স্পষ্টই শোনা গেল, আপু তোকে মা বাড়ি ডাকে। লোকটা যেতে যেতে ও’রা দোকানের অাড়ালে, ছাতার আড়ালে মানুষজনের সাথে মিশে যায়।
ও’র মা বলে, বুবুর সাথে তালোই বাড়ি গেছিল তা আমি জানতামই না। লোক পাঠাইছি, চলে আসতেছে।
লোকটা বাড়িতে যায়, কিন্তু ওদের বেগম বুয়াসহ বেশ কয়েকজন প্রতিবেশী। বেশী কথা বলার সুযোগ নেই। জিজ্ঞাস করে, ‘ঈদ কেমন কাটল, কোথায় কোথায় বেরাতে গিযেছিলে?’
আমি কোথায় যাব, আমাকে কারো সাথে কথাই বলতে দেয় না। স্যারের বাসায় সবাই পড়তে যায় আমাকে তাও যেতে দেয় না।
‘তাই? মনে হযেছিল গাঙ্গ পাড়ে গিয়েছিলে, কাকে দেখলাম তাহলে?’
ওর মা বলে, স্যারে গাঙ্গ পাড়েও যান? ও ওসব জায়গায় যাবে কিভাবে! ওর বুবু চাচীরা তো আমার কাছেই আসতে দেয় না। বুবু নিয়া টিয়া গেছে কিনা কে জানে?
‘চাচীর বোন, বোনের ছেলে মে আসছিল, তারা জোড়াজোড়ি করে নিয়ে গেছিল।’
‘তাই?’ ও’ দরজায় পর্দা ধরে দাড়ানো ছিল আর লোকটা বারান্দায়। কন্ঠের স্বর বন্ধ করে জানতে চায়, মোবাইল বন্ধ কেন, কোন সমস্যার মধ্যে আছে কিনা, থাকলে যেন বাইরে এসে কথা বলে।
ও হাত জাগিয়ে ইশারায় বলে, চুপ করে বসে থাকেন। তারপরে বলে, ‘বুবু তোমার মোবাইলটা একটু দাও, তোমাগো জামাইর সাথে একটু কথা বলব।’
‘এই ছ্যামরি বলছিনা, ফোন করলে জানামু আনে। আর এইটা কোন ব্যাটার নম্বর, এত ফোন করে ক্যান?’
তা আমি কি জানি, তোমার কাছে কে ফোন করে!
‘তোরা দেখত এইটা কার নম্বর, সেই দিন স্যার স্যার বললি দেখি, স্যারের সাথে ঐরকম কথে বলে? উনি কোন স্যার? না উনি তো ভাল লোক, আগেও কযেক বছর এখানে থেকে গেছে।’
‘তোমাদের ঐ জামাইকে আমি জীবনেও বিয়ে করব না, গলায় দড়ি দিয়ে মরব, দেইখ্য। বিদেশ দিয়ে কয়টা টাকা পাঠাইছে আর একেবারে….. রাখাল যে কিস্তির জন্য কয়টা টাকা চাইল তা তো দিতে পারলা না।’
ও’র মা ছাড়া অন্যরা একযোগে বলে যে ও বোকার মত কথা বলছে। সেই ছেলে কেন কিস্তির টাকা দিবে! বিয়েই তো হয়নি, বাপ-মা মরলেও কি মে’রা টাকা চাইতে পারে! তাছাড়া ও’র বাপ-মাওবা জামাইকে কি দিয়েছে!
‘আমাকে কারো বিয়ে করার দরকার নাই, যেমন আছি তেমনই ভাল’ বলে উপরে উঠে যায়।
লোকটা উঠনে গিয়ে দাড়ায়, কিন্তু জানালায়ও ও’র কোন সাড়াশব্দ নেই।
লোকটা ও’র মাকে ডেকে বলে, ‘আমি চলে যাচ্ছি।’
ও’ উপর থেকে নেমে এসে বলে, ‘স্যার আপনি আবার যাবেন কেন, থাকেন।’
‘উনি গেলে যাবে, তাতে তোর কি?’
ও মাকে বলে, ‘ও মা, স্যারকে থাকতে বল। স্যারে থাকলেই তো হয়।’
‘ল, ল’ বলে দু’একজন মহিলা উঠে রওনা দেয়, আর বলে, ‘তোরা নিজেদের দোষে জামাইটাকে আবার হারাইস না। একজন হাফেজের বৌ হওয়া অত সহজ না, কত কিছু করে সবাইকে রাজি করাইছিল পোলাটা।’
‘এহন আবার কি হইল? এহন আবার সব উইঠা যাও কেন?’ – দাদি।
‘যাই কি স্বাদে, এত আস্তিক কিসের, ভালমন্দ দুগ্গা খাওয়াইয়া দেলেই তো হয়, যেখানের তা সেখানে যাবে, কুটুম বাড়ির মানুষরে কি আস্তিক করছে তা তো নিজের চোখেই দেখলেন।’
ও’ বাইরে এসে ইশারা করে, থাকার জন্য। বলে, ‘স্যার বাবা না আসা পর্যন্ত কিন্তু আপনি যাবেন না, বাবা ফোন করছিল, চলে আসবে, আপনার কথা বলছি।’
যখন আসবে তখন না হয় এসে দেথা করব।
‘যাইতে হবে কেন? আপনার তো কাজ নাই। আপনি ভাল ভাল খান জানি, আমাদের মত ধুইয়া….। যাইয়া হোটেলেই খাইয়েন।’
‘ও’র মা বলে, আপনি অসুস্থ মানুষ, ঘুমাইয়া থাকেন কোথাও যেতে হবে না।’
লোকটা বিস্মিত হয়ে যায়, এত সব কথার পরেও ও’র মধ্যে তার প্রতি সম্মান টিকে আছে, কিন্তু তা টিকে না থাকাই স্বাভাবিক। লোকটা ও’র ভালবাসা আর আস্থার সামান্যতম প্রতিদান দিতেও ব্যর্থ।
‘তোমরা তাহলে ধুয়ে খাও, বলার সাথে মনেহয়েছিল বিরক্ত হয়ে ও’ ভাতের পাতিলটা চুলা থেকে ফেলে দিচ্ছে, ‘সর এখান থেকে, সবাই…..’
‘কি? সবাই কি? বল।’
‘তোরে আমি ধুইয়া খাওয়াবো মনে করছ, লোভা একটা।’
তোমার এত বড় সাহস, তুমি আমাকে…
ও দৌড় দিয়ে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে রেখেছিল।
তামান্না বলেছিল, ‘যান, আপনিও যান, দু’জনের একজনও আসবেন না।’
কাজলী বলে, ‘তোরা দু’জনের একটাকেও কিছু ধরতে দিবিনা, খাইতেও দিব না।’
প্রতিদিনের মত সেদিনও স্কুল থেকে ফেরার পথে লোকটার সাথে অনেক মজা, অনেক কথা। শরু রাস্তায় হাটার সময় ও প্রায়ই পিছনে পরত, আবার দ্রুত হেটে ডানদিক থেকে সামনে গিয়ে আবার বাদিক থেকে পিছনে গিয়ে আটকে রাখতে। মনেপরে সেদিনও লোকটা যখন বারান্দায় ঘুমাচ্ছিল ও সামনের দরজা থেকে বের হয়ে বাদিকে ঘুরে পিছনের দরজা থেকে ঢুকে আবার সমানের দরজা থেকে বের হচ্ছে। খুব দ্রুত না, নানা অছিলায় ধীরে ধীরে আবার হঠাৎ করে একটু দ্রুত গুনে গুনে প্রায় পাঁচবার কাজটা করে ফেলেছে। হঠাৎ করে মুক্তি ও’কে ধাক্কা দিয়ে বলে, ‘তুই চুপে চুপে সাতপাক দিতেছে, সর সর’ বলে ঢুকে পরে। ‘স্যারে ঘুমায়, আর তুই সাতপাকে আটকাও, স্যার আপনাকে কিন্তু…!’
আমি ঘুমাচ্ছিলাম না।
ও’র কথা বলা একেবারে বন্ধ, চোখ বড় বড় করে রাখে, হঠাৎ শ্বাস ছেড়ে মুক্তিকে বলে, ‘তুই কি নোম?’ কেঁদে ফেলবে মনে হচ্ছিল, লোকটা ও’কে কাছে ডাকে কিন্তু ও’ কোন কথা না বলে ঘর থেকে বের হয়ে তামান্নাদের ঘরে চলে যায়।
মুক্তির জন্য এর আগেও ও’কে বিপত্তিতে পরেতে হয়।
ও’ যে কাগজটায় লোকটার নাম লিখেছিল, কয়েকদিন বাদে, সেরকম একটা কাগজ মুক্তি হাতের মুঠায় নিয়ে দাদার দোকানের সামনে দাড়িয়েছিল। খুব সকাল, বেঞ্চিতে কেউ ঘুমাচ্ছে। লোকটাকে দূর থেকে দেখে, ও’ মুক্তিকে অনুরোধ করছিল, ‘এখনি দে; দে, দ্যাখ ভাই।’ লোকটা হেটে সামনে চলে যায়, এমন সময় ও’র দাদা এসে ধমক দেয়, ‘তোরা এখানে কি কর?’ তড়িঘড়ি করে মেয়েটা কাগজটা ঘুমান্ত লোকটার মাথার কাছে ফেলে দেয়। দুপুরে ঘরে তোলপাড়। সবাই ও’কে বকাঝকা করছে, লোকটা আসা মাত্র ও’ ঘর থেকে বের হয়ে যায়,কেউ একজন বলে ‘এতবড় সাহস, এ কিরকম মেয়ে! কোন লজ্জা শরম নাই! আবার কোন সাহসে ঘর থেকে বের হয়!’
ও’র মা বলে, ও’ লেখে নাই, ও’র হাতের লেখা আমি চিনি।
‘তুই চোপ’ বলে ও’র বাবা ও’র মা’কে বকা দেয়। ‘এ মাইয়া ঘরে রাখা যাবে না, যেখানে খুশি সেখানে যাক, মহিলা মাদ্রাসায় দিলেই ভাল হত। স্যার দেখেন, আপনি কোথাও নিয়ে দিতে পারেন নাকি?’
লোকটা কি হয়েছে জানতে চায় আর মেয়েটাকেও ডাক দেয়।
ও’র মা বলে, ডাইকেন না, কই যাবে আর, দাদির কাছে যায়।
রাখালের একটা বন্ধু ছিল, কিছুদিন দু’জনের মধ্যে বেশ ঝগড়া মারামারি হয়। বেঞ্চিতে ঘুমানো চাচাত ভাই আজ একটা চিঠি নিয়ে, রাথাল কে দেখায়। তাই নিয়ে হৈচৈ। তেমন খারাপ কিছুনা। টানাটানিতে চিঠি ছিড়ে যায়, তবে দু’জনের নাম লেখা ছিল, ভালবাসার চিহ্ন ছিল, এত ভাল কেন? তোমরা সবাই কি ভাল? -এসব কথা। রাখাল খুবই ক্ষেপে গেছে, তার বন্ধুর কাছে তার ছোটবোন এসব লিখেছে, সে যেন ও’কে মেরেই ফেলবে। ও’র মা বলে, ‘এটা তার মে লেখতেই পারে না, অন্য কেউ অন্য কলম দিয়ে ও’র নাম লিখেছে।’ লোকটা পরে অনেকভাবে চেষ্টা করে, ও’র কাছ থেকে কিছু জানার, কিন্তু সে কিছুই বলে না।
হেটে আসার পথেও ও সেরকম পাক খেতে খেতে আসত। একটা জায়গা পার হবার সময় প্রতিদান দু’একটা কাশির আওয়াজ আগেও শোনা যেত। ইদানিং সাথে কিছু কথা, তা তাদের অাগমনের আগে চলমানছিল বলে মনে হত না। হামদার্দ-এর সাইন বোর্ড নিয়ে একটা লোক দোকান খুলে বসে থাকে, কখনো সেখানে কোন ক্রেতা দেখা যায় না, তবে শান মাষ্টার আর ঐ রাজাকার প্রেমী অফিসের দু’চারজন চেয়ার পেতে সেদিন দোকানের সামনে অাড্ডা দিয়েছিল। যে খানটায় দাড়িয়ে লোকটা সামনের গার্মেন্টসের দোকান দেখিয়ে ও’কে বলেছিল, ‘তোমার কোন জামাটা পছন্দ? ও’টা আমার পরিচিত দোকান, তোমার যেটা পছন্দ সেটাই নিতে পারো।’
তারপরে সে দোকানটা মালিকানা আর নাম বদলে ‘স্বপ্নশুধু’ হয়ে যায়। কেউ একজন বলে, ‘আগে খয়রাত করত, ওরাও তো সেই পদই।…’ ‘কয়েকটা দিন যাক, ভাইজানরে দেখাবো, কোটি কোটি টাকার মালিক কিন্তু কোন মেয়ে পছন্দই হয়না’। ‘তোর ভাইজানের বয়স কত?’ ‘কত আর, উনার ছেলের বয়সী হবে!’ ‘তোরা মাইর টাইর খাসনে, কতদিন যাবৎ লেগে অাছে জানো?’ ‘কিসের সাথে কি মিলান, প্রয়োজনে কিছু টাকাকড়ি দিয়ে দিবে, সে যেরকম, সেরকম বিয়ে করবে, উনার সাথে ঐ.. তা মেলতে দেয়া যায় না। মাইর দেয়া দরকার বুইড়ারে।’ ‘আর কিছু কিছু মানুষও আছে খাইসলত এরকমই যে বউ দশটা থাকলেও গুড়াগাড়া হাতায়।’
ও’সেদিনও লোকটাকে বলে, ‘স্যার উনাকে একটা থাপ্পর দেন।’
কেন?
‘আপনাকে দেতে বলাম।’
কি হয়েছে, বল।
‘আপনি দিবেন কিনা?’
দেখ, উনি বয়সে আমার অনেক বড়, উনি দু’দুটা মেয়ের বাপ।
‘আমি জানি, আপনাকে থাপ্পর দিতে বলছি, আপনি দিবেন কিনা?’
তুমি কাছে আসো, কি হয়েছে বল, দিতে হলে অবশ্যই দিব।
‘তাইলে দেন, এখনি দেন।’
কারণ না যেনে এটা করা যায়না।
‘করতে হবে না, আমাকে জীবনেও পাবি না তুই।’
টেক্সট

 টেক্সট

টেক্সট
থাম তুমি, আমি কিন্তু উনাকে থাপ্পর না, মেরেই ফেলব।
ও থমকে দাড়ায়, লোকটা একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে অাস্তে করে আবার জিজ্ঞাস করে।
বলে, ‘আপনি কিছু বুঝেন না, কিরকম করে রাস্তা অাটকে রাখে, মনে হইছে দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া সামনে আসছে, তারপর….। সেদিন আমার সাথেও ঐ রকম করছে।’ বলতে বলতে অনেকটা কেঁদে ফেলার মত অবস্থা। লোকটার বুকও কেপে উঠে। কিন্তু বলে, ‘উনি বয়স্ক মানুষ, উনার মে একটা নবম শ্রণীতে আরেকটা তোমার সমান, ও’রা কিন্তু ভাল, ও’রা তোমাকে কিছু বলেছে? কিছুক্ষণ আগেও ও’রা আমার কাছে গিয়েছিল। সবার সামনে উনার গায়ে হাত দিলে উনার মেয়েদের কেমন লাগবে! তোমার বাবাকে কেউ যদি….’
থাক দিতে হবে না, বলে হেটে চলে যায়। ও যখন দ্রুত হাটে লোকটা ও’র অনেক পিছনে পরে যায়। বাড়ি এসে দেখে গুড়াগাড়া সবাই চলে এসেছে। কাজলী ভাতের হাড়ি ধরে দাড়িয়ে আছে ও’ চুলা বানাচ্ছে। ‘চড়ুইভাতির দাওয়াত দিয়েছ? অামি তো ভাবছিলাম তুমি ঘরে রান্না করে খাওয়াবে।’
কি ভাতি, আমারা তো পিকনিক খাব।
ও কতক্ষণ রাগ করে চেয়ে থেকে বলে, ‘তোরা খা, আমি খাব না।’
তুই কই যাও, রান্না করে দিয়ে যা। তোর রান্না করার জবান।
ও আবার ফিরে এসে রান্না বসায়। কতগুলে ডিম ধবধবে পরিস্কার করে ধুয়ে ভাতের মধ্যে সিদ্ধ করার জন্য ঢাকনাটা সরায়।
লোকটা বলে, ‘তোমরা এত নোংরা, ছি!’
ও’ একনজর তাকিয়ে একটি ডিম হাতে নিয়ে বসে থাকে।
তামান্না জিজ্ঞাস করে, ‘কি হয়েছে স্যার?’
ডিমগুলো ভাতের মধ্যে দিবে?
‘তয়? সিদ্ধ করবে তো’!
এর মধ্যে কাজলী আরেকটা ডিম নিয়ে আসে।
লোকটা বলে দেখেছ ডিমে কি থাকে?
ছোট চাচাত বোনটা বলে উঠে…
কাজলী বলে, ‘না ধুয়ে কি আর দিবে, ধো এইটা।’
‘তুই ধুইয়া আন।’
ও ‘আচ্ছা তোমরা তাহলে ধুয়ে খাও?’
আবারো কিছুক্ষণ ঝিম মেরে ও’ বলে ‘এই মিয়া আপনি যান তো; নিষেধ করছি তারপরেও আসছে!’
‘ছি ছি মিথ্যা বলছ কেন? সেই সকাল থেকে দাওয়াত করতেছ, নিষেধ করলা কখন?’ সবারই কথা বন্ধ হয়ে যায়। পিচ্চিটা বলে, আমি আগেই বলেছিলাম ভাইজ্জ খাব।
এই, এতগুলো ডিম ভাজবে কে?
আমারটা আমি ভাইজ্জা খাব, ভাই।
গুড়াগাড়ারা বলে, ‘ও স্যার যাইয়েন না। আপনি ভাজা ডিম খাইয়েন।’
ও তামান্নাকে আস্তে করে বলে, ‘উনাকে যাইতে ক,উনার সোনা, স্বপ্নার বাড়িতে যাইতে ক।’
ও স্যার, বলে কি শুনছেন? এ আমি কি শোনলাম, ঘটনা কি?
তোমরা … ধুয়ে ধুয়ে খাও জানলে আমি আসতামই না। সবাইকে বলব তোমারা… ধুয়ে খাও।
‘ধুইলে দোষ না? আয়, আয় ধুয়া দিব না আনে।’
লোকটা আবার ফিরে আসে। গুড়াগাড়ারা বলে, স্যারের ডিম ঘর থেকে ভাইজ্জা আন।
‘আমি পারব না, উনাকে ভাইজ্জা নিতে বল’ বলে অন্যদিকে তাকিয়ে একটা ডিম হাতে জাগিয়ে ধরে।
‘দেও, কাঁচাই খাই, কিন্তু ঐ ভাত খাব না। কিন্তু’
তামান্না বলে, দে তো দেখি, খায় কেমনে?
মিট মিট করে হেসে বলে ‘ধোয়াটা ধরতে পারবে, খাইতে পারবে না! না ধুয়েই খাইস…’ বলে দৌড় দেয়।

(অসমাপ্ত পান্ডুলিপি)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *