মানুষের মৃত্যুতে কুলখানি ব্যবসা

অনেকদিন পর আমাদের মায়ের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম যে তিনি প্রায়ই মৃত্যু নিয়ে ভেবে থাকেন। বয়স অনেক হয়ে গেছে তাঁর, শরীরে আগের মতন আর শক্তি নেই। গলায় অনেক ভাঁজ পড়েছে। বাহু ঝুলে পড়েছে। দেখলে মনে হয়, কোন এক ঝুলন্ত ব্রিজ দেখতে পাচ্ছি। কোন নিশ্চয়তা নেই যে অনির্দিষ্টকালের জন্যে ঝুলে থাকতে পারবে! হয়তো কোন এক সময়ে বেইমানি করে নিচে পড়ে যাবে। বয়স হলে এমনই হয়। শুধু মায়ের না, সকল প্রাণীকুলের হয়।

আমাদের ভারতবর্ষে শত শত বছর ধরে ধর্মের নামে কয়েকটি কুৎসিত রীতি চলে আসছে। এই রীতি বা প্রথা কোথা থেকে এলো ও কেনো এলো- তা নিয়ে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করে না। ধর্মের বিষয়ে বিশ্বাসীর মনে প্রশ্ন থাকলেও তা করতে ভয় পায়। কারণ আমাদের এই অঞ্চলে প্রশ্ন করা আরাম নয় বরং হারাম। প্রতিটি মানুষই যথেষ্ট পরিমাণ স্বার্থপর। কিন্তু কতোটা স্বার্থপর ও নিষ্ঠুর এবং অমানবিক হলে আমরা আমাদের আপন মানুষের মৃত্যুতে আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধবের জন্যে কুলখানি-তিনদিনা, চারদিনা, চেহলাম, ত্রিশা, চল্লিশা ইত্যাদির নামে খানাপিনার ব্যবস্থা করে উৎযাপন করার মানসিকতা রাখি!

আমাদের মা বলেন যে, এই রীতিগুলো মানুষের মানসিকতাকে শুধু হিংসাত্মকই করে তোলে না বরং আমাদের চিন্তা, অনুভূতিকে অশ্রদ্ধা করতে শেখায় এবং ধর্মব্যবসা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে আমরাও পরোক্ষভাবে ভূমিকা পালন করে থাকি। কোরআন ও হাদিসের কোথাও পাওয়া যাবে না যে মৃত্যুর পরে বনভোজনের মতো করে সবাইকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতে হবে। কিন্তু আমাদের এই উপমহাদেশে এই রীতিটি খুবই প্রচলিত।

Image result for কুলখানি

 

 

যারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে থাকে, যাদের উপার্জনের মাধ্যমই হল ধর্ম, যারা ধর্মের অপব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ পূরণ করে থাকে, যারা ধর্মের প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে মানুষকে আতংকের ভেতর রাখে -তারাই ধর্মের নামে নানাধরনের অশ্লীল রীতিনীতি, নিয়মকানুন চালু করে নিজেদের লাভজনক স্থানে নিয়ে যায়।

যে দিন আমার সবচে’ প্রিয় বন্ধুটির বাবা মারা যায়, সে দিন আমার তাকে খুব যান্ত্রিক মনে হয়। আমি অবাক দৃষ্টিতে তার কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করি। তার মস্তিষ্কে বাবা হারানোর যেই যন্ত্রণা বয়ে চলছিলো তা শুধু ঘণ্টাখানিকের জন্যে ছিল। সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে কখন মাটির নিচে চাপা দেওয়া হবে! কারণ মাটির নিচে চাপা দেওয়ার সাথেই কাহিনী শেষ নয়।

বরং পরবর্তীতে অমানবিক ও অশ্লীল এক যন্ত্রণার শুরু হয়। কবর দিয়ে বাসায় আসার সাথে সাথে বন্ধুটি খাতা ও কলম নিয়ে বসে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই নাকি বিয়ে বাড়ির মত করে দাওয়াত দিয়ে মানুষজনকে খাওয়াতে হবে! না খাওয়ালে এলাকাতে থাকা নাকি কষ্টকর হয়ে যাবে! কী কী খাওয়ালে মানুষ খুশি হবে, কতো পদের খাবার দিলে ভালো হবে, কাকে কাকে দাওয়াত দিতে হবে, কারো নাম ভুলে গেলে সে/তিনি গোস্বা করতে পারে ইত্যাদি কুৎসিত সব চিন্তায় বাবা মারা যাওয়ার শোকের থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল ধর্মের নামে কুৎসিত ও জঘন্য রীতিটি।

কুলখানি-তিনদিনা, চারদিনা, চেহলাম, ত্রিশা, চল্লিশা ইত্যাদির ধর্মের সাথে কোন সম্পর্ক নেই, অথচ অধিকাংশ মানুষ ভেবে থাকে যে ধর্মের সাথেই এর যোগসূত্র। ইতিহাস পড়লে জানা যাবে যে এই রীতিগুলি হিন্দুদের থেকে এসেছে এবং এই সকল ধর্মব্যবসাকে অস্বীকার করা সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *