নারীশিক্ষা ষড়যন্ত্র

সাম্প্রতিককালে নারীজাগরণ ও নারীশিক্ষায় বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়। অন্যান্য দেশও এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে নির্দ্বিধায় সম্মতি জানায়। বলা হয় এই শতকে দক্ষিণ এশিয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে নারী উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। হ্যাঁ, কথা সত্য। বাংলাদেশ ‘নারীশিক্ষা’-য় প্রকৃত অর্থেই এগিয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের নারীরা কি শিক্ষায় এগিয়েছে? তা হয়ত না। আর বাংলাদেশে ‘নারীজাগরণ’ ঘটেছে ঠিকই কিন্তু বাংলাদেশের নারীদের জাগরণ ঘটেনি। নারীজাগরণের অগ্রদূত হিসেবে আমরা বেগম রোকেয়াকে প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করি। নতশিরে তাকে সালাম জানাই। কিন্তু বেগম রোকেয়া নারীর যে জাগরণ দেখতে চেয়েছিলেন তা কি আমরা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি? না, তা হয়ত পারিনি। তার ভাবাদর্শকে আমরা প্রতিভোরে প্রণাম জানিয়ে প্রচলিত সমাজের ভাবাদর্শেই চলেছি। বেগম রোকেয়া নারীকে শিক্ষিত হতে বলেছিলেন। শিক্ষার দ্বারা স্বাধীন হবার কথা বলেছিলেন। আর স্বাধীনতার অর্থ বলেছিলেন পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থা। আর আমরা তার কথার উলটো জ্ঞান করে ‘শিক্ষিত নারী’ হয়েছি, শিক্ষা দ্বারা নিজেকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের জন্য উন্নত দাসী, উত্তম সঙ্গী করেছি। এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটা বাস্তব উদাহারণ দিয়ে বিষয়টাকে পরিস্কার করি। আমার ফুপুর বাসায় একবার মাধ্যমিক পড়ুয়া মেয়ে পরিচারিকা হিসেবে কাজ করতে এসেছিল। তো ফুপি খুব গর্ব করে বলত। মেয়েটা ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছে। অনেক কিছু পারে। হিসাব-নিকাশ-মাপে একদম পটু। বাড়িওয়ালা প্রায়ই বলে ওকে কিভাবে জোগাড় করলাম, একেবারে কড়ায়-গন্ডায় হিসাব নেয়। মাঝে মাঝে আরেফিনকে(ফুফাতো ভাই) হাল্কা পড়া দেখায়ও। মেয়েটা আবার খুবই ভদ্র। পড়ালেখা জানে তো! আমার অনেক সুবিধা হয়েছে। – আমাদের দেশের নারী শিক্ষার ফলও অনেকটা এরকমই। আমরা শিক্ষা অর্জন করে শিক্ষিতা হই না ‘নারীশিক্ষা’ অর্জন করে ‘শিক্ষিত নারী’ হই। আমাদের সমাজ নারীদের পড়ালেখাও অনেকটা এরকমই করে দিয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বলে কথা! এখানে পুরুষের জন্য একরকম শিক্ষা, নারীর জন্য অন্যরকম। এখানে নারীকে শিক্ষিত করে তোলা হয়ও পুরুষের জন্য, নারীর নিজের জন্য নয়। শিক্ষিত পুরুষের জন্য নারীকে শিক্ষিত করা হয়, যেন নারী স্বামীর সংসারে পশুত্বের শিকার না হয়, নারী রাত-দিন অত্যাচারের মুখোমুখি না হয়, যেন নারীদাসত্ব ব্যবস্থা আফ্রিকানদের মত বর্বর না হয়ে সভ্যদের মত হয়। নারীকে ত্বাত্তিক জ্ঞানের চেয়ে বেশি সামাজিকীকরণের জ্ঞান দেওয়া হয়। এখনো নারীকে মৌলিক শিক্ষা হিসেবে সংসার ধর্ম শেখানো হয়। নারীকে নারীত্বের নামে দাসত্ব শেখানো হয়। কোন নারী যদি এর বাইরে মুক্তজ্ঞান চর্চা করে পুরুষের মত উন্নত হতে চায়। তখনই সমাজ তাকে ঘরছাড়া, সমাজছাড়া করে। আরেকটা প্রচলিত উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিস্কার হতে পারে। একটা সময় মফস্বল শহরগুলোতে বাল্যবিবাহের খুব চল ছিল। এখন কোন বালককে শিশুকালেই বিয়ে দিয়ে পরে শিক্ষার জন্য বিলেতে পাঠানো হলে বিলেতি শিক্ষার বলে বালক জানতে পারে বাল্যবিবাহ অপরাধ, অযৌক্তিক। তখন সে বাল্যবিবাহ অস্বীকার করে, সমাজকে বোঝাতে চেষ্টা করে। কিন্তু সমাজ তা মেনে নেয় না। সমাজ তার শিক্ষার দোষ দিয়ে তাকে গোত্র থেকে পৃথক করে দেয়, অসহ্য নির্যাতন চালায়, প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করায় শাস্তি দেয়, দোররা মারে। আমাদের সমাজে প্রকৃত শিক্ষিতাদের অবস্থা ঠিক এমনই। এখানে নারী মূল অর্থে শিক্ষা অর্জন করলে তার শিক্ষাকেও দোষ দেওয়া হয়। এখানে তার বিরোধী হিসেবে মুখ্য ভূমিকা পালন করে শিক্ষিত মুর্খ নারীর দল। তারা কথায় কথায় বলে; ‘আমরাও বিদ্যার্জন করেছি, কিন্তু বিদ্যার ঢোল পিটিয়ে তো পুরুষকে নাচাতে চাই নি, বিদ্যা মানুষকে মৌন করে, নম্র করে। কিন্তু তোমাদের উদ্ধত করেছে।’ হুমায়ূন আজাদ স্যার অনেক আগেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই ষড়যন্ত্রের কথা বলেছিলেন। তার মতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটী নিঁখত ষড়যন্ত্র হল এক শ্রেণির নারীর বিরুদ্ধে আরেক শ্রেণিকে ঈর্ষায় জড়ীয়ে রাখা। বেশ্যার বিরুদ্ধে সতীকে, স্বাধীনের বিপরীতে পরাধীনকে। ঠিক তেমনি এখনো শিক্ষিতার বিপরীতে মুর্খদের অবস্থান। নারীশিক্ষার আরেকটা ব্যাপার হল এই শিক্ষাদাত্রীরা সকলেই মূলত নারী থাকেন। তারা অন্যান্য নারীদের তাদের চেয়ে অধিক নারীত্বের শিক্ষা দিয়ে পটু করে তুলতে ব্যস্ত। আমরা আধুনিক সময়ের নারীরাও এর ব্যতিক্রম নই। আমরা এখনো পুরুষশাসিত থাকতেই পছন্দ করি। যতই আমরা সমঅধিকার করে আর্তনাদ চালাই না কেন অধিকাংশই সঙ্গী হিসেবে নিজের চেয়ে বেশি শিক্ষিত, বেশি বিত্তবান, উন্নতশ্রেণির ছেলে চাই। একটু ঘেঁটে দেখলে বোঝা যাবে এর কারণ আমরা এখনো নিজেদের পরিচিতি হিসেবে স্বামীর পরিচয়ের একাংশের উপর নির্ভর করি। আধুনিক যুগের মেয়েরা এডুকেটেড, ওপেনমাইন্ডেড, স্মার্ট বয়ফ্রেন্ড রাখতে চায় কেননা তা তাদেরকে অন্যান্য মেয়েদের কাছে ঈর্ষনীয় করে। ব্যক্তিত্বের মেয়েলি বৈশিষ্ট্যগুলোকে কাজে লাগিয়ে ছেলেদের কাছ থেকে কাজ হাসিল করে নেয় এবং তা নিয়ে গর্বও করে। তাছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের অধিকারের জন্য আধুনিক উচ্চশিক্ষিত মেয়েরা আওয়াজও তুলে না। তারা এমন ভাব করে যে, তারা শিক্ষা নিয়ে এমন এক সমাজে থাকে যে সমাজে এমন কিছু ঘটতে পারে তা কল্পনাও করা যায় না। এগুলো সব নিম্নশ্রেণির অশিক্ষিতদের ব্যাপার। এগুলোতে জড়িয়ে যাওয়াও নিজের ক্লাসকে ছোট করা। তাছাড়া শিক্ষিতরা শুধু শুধু জেনেশুনে ঝামেলায় জড়ায়না। তাই সমঅধিকার, ইভটিজিং, ধর্ষন শব্দগুলো শুনলে তারা নাক কুঁচকায়। এসবই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নারীশিক্ষার ফল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমরা এই ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করতে পারিনা। তাই বেগম রোকেয়ার সুরে আবার বলি, ‘আমাদের নিমিত্তে জ্ঞানরূপ সুধাভান্ডারে দ্বার সম্পূর্ণরুপে উন্মুক্ত করিতে হইবে। স্বাধীনতা অর্থে পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থা বুঝিতে হইবে। পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদের যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব।’

১২ thoughts on “নারীশিক্ষা ষড়যন্ত্র

  1. ভালো লিখেছেন। তবে একটু প্যারা
    ভালো লিখেছেন। তবে একটু প্যারা দিয়ে দিয়ে লিখলে দেখতেও ভালো লাগে, পড়তেও আরাম। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  2. নেপোলিয়ন বোনাপার্ট একটা কথা
    নেপোলিয়ন বোনাপার্ট একটা কথা বলেছিলেন।খুব সম্ভবত এমন ছিল ঃ ‘ তোমার আমায় শিক্ষিত মা দাও,আমি তোমাদের একটা উন্নত জাতী উপহার দেবো ।’এখন,এখানে নেপোলিয় ‘ শিক্ষিত মা ‘ বলতে কি বুঝিয়েছেন তা আজ-ও আমার বোধগম্য হয় নাই। সে যাই হোক।আপনি আমার কিছুটা চিন্তার সাথে একমত হয়েছেন বা বলা যায় আমি আপনার সাথে একটি বিষয়ে এসে মিলেছি।নারীরা তাদের কাছেই স্বাধীনতা চায় যাদের কাছে তারা পরাধীন।এখন স্বাধীনতাতো আর মামার বাড়ির আবদার না যে চাইলেই দিয়ে দেয়া হবে। এর জন্য লড়তে হয়.…আর এটা তখনই সম্ভব যখন সর্বস্তরের নারীরা স্বতস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে…নিজেদের স্থান নিজেদেরই তৈরি করে নিতে হবে… ‘ চাই ‘ ‘ চাই ‘ বলে চেঁচালে হবে না… সাহস,শক্তি,ধৈর্য্য, যোগ্যতা দিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।খুবই আফসোস হয় যখন শুনি ‘ নারীরাই নারীদের শত্রু ।’

    1. আমাদের সমাজের নারীদের মধ্যে
      আমাদের সমাজের নারীদের মধ্যে একটি প্রবনতা দেখা যায়- পুরুষের, কাধে ভর করে উবে যাওয়া। সেই প্রবনতা থেকেই এক নারী অন্য নারীর শত্রু হয়। আর পুরুষতন্ত্রের অধীনে থেকে পুরুষতন্ত্রের কাছে স্বাধীনতা চায় যেন অন্য নারীর চেয়ে উন্নত হতে পারে। সমমনা আরেকজনকে পেয়ে ভাল লাগল

  3. গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যু তুলে
    গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যু তুলে ধরেছেন । এসব বিষয়ে অন লাইন অফ লাইন সর্বত্র আলোচনা চালাতে হবে । প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক মিথ ভেঙ্গে ফেলতে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে ।

    1. হ্যা, সেটাই আবশ্যক। কিন্তু এ
      হ্যা, সেটাই আবশ্যক। কিন্তু এ বিষয়ে জানার বা এগিয়ে আসার মানুষের অনেক অভাব

  4. লেখাটা আবারও পড়লাম কু ঝিক
    লেখাটা আবারও পড়লাম কু ঝিক ঝিকে পেয়ে। দারুন লিখেছেন। আমি মনে করি নারী স্বাধীনতায় পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার সাথে সাথে নারীদের মানসিকতায়ও পরিবর্তন দরকার। নারী এখনও নিজেকে পুরুষের অধীনে দেখতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করে অনেক ক্ষেত্রেই। অনেক শিক্ষিত কর্মজীবি নারীরাও এর বাইরে চিন্তা করতে শেখেন নি। নিজেই যদি নিজের মুক্তির পথ না বোঝে তাহলে গোড়াতেই গলদ থেকে যায়। আমার এই মন্তব্য দেখে আবার কেউ ঝাঁপায়ে পইড়েন না, যে নারীর বর্তমান অবস্থার জন্য আমি শুধুমাত্র নারীকেই দায়ী করছি। আমি একটা দিক মাত্র তুলে ধরেছি যেখানে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন গুরুতর।

    1. সেটাই আতিক ভাই। আমি এভাবেই
      সেটাই আতিক ভাই। আমি এভাবেই বলতে চাচ্ছি আমরা সবাই যেন সব বিষয়ে নজর দেই। একটা দু’টো বিষয় নিয়ে আদা জল খেয়ে লাগলে তো আর নারী উঠবে না। নারীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে হবে, নারীকে বাড়ানো হাত ধরতে হবে।
      আবারো ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *