সমাধি

আজ সকাল থেকেই টিপ টিপ বৃষ্টি ছিল। এখন বৃষ্টিটা আরও জোরালো হয়েছে। ইংরেজিতে যাকে বলে Cats & Dogs। এক অর্থে সেটা ভালই হয়েছে আমার জন্য। আমি এখন মন ভরে কাঁদতে পারছি। চোখের পানি আড়াল করতে হচ্ছে না কষ্ট করে। আড়াল করার মত কেউ নেইও আশপাশে। বেশির ভাগই অনেক আগেই চলে গেছে। খুব ঘনিষ্ঠ চার-পাঁচজন যাও ছিল তারাও বৃষ্টি বাড়ার কারণে পাশের মসজিদটার বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছে। কবরস্থানে এই মুহূর্তে আমি একা। কাজেই হাউ মাউ করে কাঁদলেও দেখার বা শোনার কেউ নেই। বরং সেটাই হয়তো খুব স্বাভাবিক হবে। কাছের আত্মীয়ের মৃত্যুতে কেউ একজন স্বদ্য দেয়া কবরের পাশে বসে কাঁদছে- এটা আমাদের সংস্কৃতির অতি সাধারণ দৃশ্য এবং খুব সম্ভবতঃ দৃষ্টিনন্দনও! কিন্তু কোন এক অজানা কারণে আমি কখনো কোন শোকেই কাঁদতে পারি না। সে তুলনায় অনেক তুচ্ছ ঘটনায় আমার চোখে পানি এসে যায়! সেটা অবশ্য আবেগ; কান্না নয় কখনোই! তার মানে কী? আমি কি সত্যি মনে করি- পুরুষের কাঁদতে নেই? আমার অবচেতন মন কি সত্যি কাঁদতে ভুলে গেছে? এজন্যই কি মায়ের মৃত্যুর সময়ও আমি দিব্যি চোখের জল না ফেলে সবার ভ্রুকুটির কারণ হয়েছিলাম? তাই যদি হয়- তবে আজ কাঁদছি কেন? আজ কেন তবে চোখের জল আড়াল করতে হচ্ছে বৃষ্টির পানিতে?
বৃষ্টি আরও বেড়েছে। এই দিনে এমন মুষল ধারায় বৃষ্টি কখনও হয় না। অসময়ে বৃষ্টিতে ভিজে অসুখ বাধানোর সম্ভাবনা প্রবল। এই নাটকীয়তার কোন দরকার নেই। আমার উচিৎ এখনই উঠে গিয়ে গরম পানি দিয়ে গোসল করে দুইটা প্যারাসিটামল খেয়ে একটা লম্বা ঘুম দেয়া। কারণ, আমি বরাবরই বাস্তববাদী। আবেগকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করাটাকে কেন যেন ন্যাকামো মনে হয়। তবে আজ আমার কি হলো? আমি কেন উঠে যেতে পারছি না? এমন কি বৃষ্টির ঠাণ্ডা পানিতে শরীরে যে কাঁপুনি ধরে যাচ্ছে সেটা পর্যন্ত টের পাচ্ছি না! সকল অনুভূতি যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। কোন শোক বা শূন্যতা যে অনুভব করছি তাও যেন নয়। কেমন একটা অদ্ভুত ভোতা অনুভূতি। যেন একটা অনেক বড় দায়িত্ব পালন শেষে হঠাৎ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাওয়া! শুধু ভেতর থেকে কি এক অদ্ভুত শিহরনে চোখ ফেটে জল এসে বৃষ্টির পানিতে মিশে যাচ্ছে!
তবে কি আমি স্বপ্নাকে সত্যিই ভালবাসতাম?
কই নাতো! হাসপাতালে প্রথম যেদিন ভাইয়া ভাবির সাথে ওকে দেখতে গেলাম, সেদিন বেডের ওপর শীর্ণ-রোগা বিবর্ণ শরীরটা দেখে ভীষণ চমকে উঠেছিলাম। কেন জানিনা- বুকের ভেতরটা প্রচণ্ড মুচড়ে উঠলো। আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। তক্ষুণি বের হয়ে গিয়েছিলাম কেবিন থেকে। হাসপাতালের বারান্দায় গিয়েও মনে হচ্ছিল শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তাই কাউকে কিছু না বলে চলে এসেছিলাম। সোজা বাসায় না গিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম পার্কের বেঞ্চিতে। বিকেলের পার্কে সে সময় অনেকেই বুক ভরে মুক্ত বাতাস নিতে এসেছিল। অথচ সেই চমৎকার খোলা হাওয়ায়ও আমি বুক ভরে নিশ্বাস নিতে পারিনি! মনে হচ্ছিল বমি হবে। দারুণ অস্বস্তি নিয়ে বাসায় ফিরে ঘরের লাইট বন্ধ করে শুয়ে ছিলাম। রাতের খাবার পর্যন্ত খেতে পারিনি। তবে সেটা ঠিক ভালোবাসা থেকে তো নয়! বীভৎস কিছু দেখলে যেমন স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে অনেকটা সেরকম!
ভাবি বাসায় ফিরে আমার সাথে প্রথমে সেকি রাগ! কাউকে কিছু না বলে চলে এসেছো। রোগী দেখতে গিয়ে রোগীর সাথে দেখা সাক্ষাত না করেই কেউ এভাবে চলে আসে! ওরা কি ভাববে? একটু বলেও তো আসা যায়! তোমার ভাইয়া আর আমি এতবার কল করলাম- ফোন পর্যন্ত ধরলে না! বিদেশে গিয়ে এতো লেখাপড়া করে এই কাণ্ডজ্ঞান হয়েছে? রাস্তায় কোন বিপদ-আপদ হলো কিনা এই চিন্তায় আমরা অস্থির! আর তুমি এসে দিব্যি বাসায় ঘুমাচ্ছো!
কিন্তু হঠাৎ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে একদম চুপ হয়ে গিয়েছিল। কি দেখেছিল আমার সেই শূন্য দৃষ্টির মধ্যে তা সেই জানে। একটি কথাও আর বলেনি। চুপচাপ চলে গিয়েছিল ঘর থেকে। এমন কি রাতে যখন বললামঃ “খাব না।” তখনও কোন জোরাজুরি করেনি; জানতে চায়নি কেন খাব না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে বেশ ঝরঝরে লাগছিল। শুধু স্বপ্নার কথা মনে পড়তেই খারাপ লাগতো। অমন সুন্দর স্বাস্থ্যবান প্রাণবন্ত একটা মেয়ে নিথর হয়ে পড়ে আছে হাসপাতালের বেডে- ভাবতেই শরীরটা গুলিয়ে উঠতো। মনে পড়তো স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে যাবার আগের দিনগুলোর কথা। স্বপ্না আমার চেয়ে বছর দু’একের ছোট। খালাতো বোনকে ঠিক পিঠাপিঠি বলা যায় কিনা জানি না, তবে ছোট বেলা থেকেই ওর সাথে আমার ছিলো আজন্ম শত্রুতা। বয়সে ছোট এবং মেয়ে হওয়ার কারণে বরাবরই ও বড়দের ফেবার পেত। আমার হাতে-পিঠে-গালে ওর কত যে খামচি-আঁচড়-কামড় এর চিহ্ন ছোট বেলা থেকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। অথচ, প্রতিবারই ঝগড়া-মারামারি শেষে আমাকে চড়-থাপ্পড়-খামচি মেরে শেষমেশ এমন কান্না জুড়ে দিত যে বড়রাও আবার ওর পক্ষ নিয়ে আমাকেই ধমকাতো! ছোট বেলা থেকেই তাই “স্বপ্না” ছিল আমার জন্য একটা বিভীষিকার নাম! কারণ, ও আর আমি একসাথে মানেই অবধারিত ঝগড়া। আর ঝগড়া মানেই ওর কাছে খামচি-কামড়-থাপ্পড় খাওয়া এবং তারও পরে ওরই কান্না থামাতে সেই আমার ওপরই বড়দের আরেক দফা গালমন্দ!
এই অত্যাচার থেকে রেহাই পাওয়ার কোন উপায় আমার ছিল না। কারণ ঝগড়া শেষ হবার আধ ঘণ্টার মধ্যেই ওই আবার আমার সাথে ভাব করতে আসতো। আমি রাগ করে কথা না বললে বা পাত্তা না দিলে সেই অপরাধে আরেক দফা মারামারি শুরু হতো যার ফলাফল পূর্বানুরূপ! আর বড়রা যথারীতি আমাকেই ধমক দিয়ে বলতোঃ তোরও দোষ আছে- যাস কেন স্বপ্নার সাথে!
এই স্বপ্না যখন আরেকটু বড় হলো তখন আর আগের মত খামচি-কামড় দিত না বটে কিন্তু সব সময় লেগে থাকতো কটু কথা দিয়ে। আমার সকল কাজ কর্মেই তার কোন না কোন দ্বিমত থাকবেই। আমিও তাই কখনও ছাড় দিতাম না। ছোটবেলা থেকেই ও ছিল রোগা পাতলা। আমি ওকে ‘শুটকি’ বলে খেপাতাম! আমার খেপানোর কারণেই কিনা জানি না কলেজে উঠে হঠাৎ করে কিভাবে যেন স্বাস্থ্যটা ভালো হয়ে গেল। ঠিক মোটা বলা যায় না। মাঝারি গড়ন যাকে বলে। কিন্তু আগের শুকনো শরীরের তুলনায় সেটা বলন সই স্বাস্থ্য। এজন্য ওকে আমি “শুটকি”র বদলে “মুটকি” বলে ডাকতে শুরু করলাম। প্রচণ্ড বিরক্ত হতো ও মুটকি ডাকলে। কিন্তু ছোটবেলার মত স্বভাব সুলভ ঝাঁপিয়ে পড়ে আঁচড়ে-কামড়ে দিত না। বরং অভিমানে মুখ গোমড়া করে বসে থাকতো। আমি কোনদিন ওর সেই অভিমান ভাঙ্গানোর চেষ্টা করতাম না। বরং আরও কিছু গা জ্বলুনি কথা বলে রাগ বাড়িয়ে দিতাম। কতদিন সেই রাগ চোখের পানি হয়ে ঝরেছে! ছোটবেলার অত্যাচারের কিছুটা প্রতিশোধ নেয়া হলো ভেবে তৃপ্তি পেতাম তখন!
স্কলারশিপ পেয়ে যেদিন বিদেশে চলে যাচ্ছিলাম, সেদিন স্বপ্নাও এয়ারপোর্টে গিয়েছিল সী-অফ করতে। সবার কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় হঠাৎ ‘একটু শোন’ বলে আমার হাত ধরে একপাশে টেনে নিয়ে গেল।
আমি অবাক হয়ে বললামঃ কী!
ও কিছু একটা বলতে গিয়ে বার দুয়েক ঠোট নেড়ে তারপর অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। আমি বিরক্ত স্বরে বললামঃ আরে কী? বলবি তো!
ও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। তারপর অন্য দিকে তাকিয়ে বললঃ ওখানে গিয়ে আমাকে ভুলে যাবি নাতো?
আমি হেসে বললামঃ তোর মত শয়তানকে এই জীবনে ভুলতে পারবো? তাহলে তো বেঁচেই যেতাম!
ও রাগ না হয়ে লাজুক হেসে বললঃ আমাকে রোজ ফোন দিবি?
আমি ভ্রু কুচকে বললামঃ তোকে কেন ফোন দেব রোজ রোজ? আজিব তো! রোজ তো বাসায়ই ফোন দেয়া হবে না!
আচ্ছা রোজ না, মাঝে মধ্যে দিলেই চলবে।
মাঝে মধ্যেই বা দিতে যাব কোন দুঃখে? তুই কতটা মোটা হয়েছিস এটা জানার জন্য ফোন করে টাকা নষ্ট করবো নাকি?
স্বপ্না একটু আহত স্বরে বললঃ আচ্ছা ফোন করতে হবে না- আমি তোকে চিঠি লিখব। তুই শুধু কষ্ট করে জবাবটা দিস।
আমি চোখ কপালে তুলে বললামঃ এই যুগে চিঠি! কী আশ্চর্য! আমি ওখানে লেখাপড়া করতে যাচ্ছিরে বাপ, চিঠি লেখার জন্য না। তা তোকে এতো খাতির কেন করতে হবে বুঝলাম নাতো!
স্বপ্না মুখ বাকিয়ে বললঃ তুই বুঝবি না। মাথায় কিছু থাকলে তো বুঝবি!
তারপর পার্স খুলে একটা ভাজ করা কাগজ আমার হাতে দিয়ে বললঃ এটা প্লেনে উঠে পড়িস।
বলেই চলে যাচ্ছিল। আমি ওকে থামিয়ে বললামঃ কি এটা? স্লীম হওয়ার বিদেশী ঔষধ? তোর জন্য পাঠাতে হবে?
স্বপ্না আমার চোখের দিকে প্রচণ্ড অভিমান নিয়ে তাকালো। তারপর আমার হাত থেকে কাগজটা ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে কুচি কুচি করে ছিড়ে ফেলতে ফেলতে বললঃ তুই একটা কুত্তা! তোর কিচ্ছু করা লাগবে না। তুই মর। তোর প্লেন যেন ক্র্যাশ করে। জীবনে যেন তোর মুখ আমার দেখতে না হয়…
বলতে বলতে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। আমি পেছন থেকে বললামঃ শকুনের দোয়ায় গরু মরে না। ঐ শোন। স্বপ্না! সরি বাবা… প্লীজ! এই স্বপ্না!
ও আর ফিরেও তাকায় নি। গট গট করে হেঁটে গাড়িতে গিয়ে বসে ছিল। আমারও ফ্লাইটের সময় হয়ে যাচ্ছিলো। আমি সবার কাছ থেকে শেষবারের মত বিদায় নিয়ে চলে গেলাম।
বিদেশে তিন বছর ছিলাম। এর মাঝে অনেকবার দেশে ফোন করেছি। আন্টিদের বাসায়ও ফোন করেছি বেশ কয়েকবার। কিন্তু স্বপ্নার সাথে কথা হতো না। কেন জানি ও কথা বলতে চাইতো না। অনেক সময় এমন হয়েছে যে ও বাসায় নেই বা ঘুমাচ্ছে। ওর মোবাইলে ফোন করলেও বেশির ভাগ সময়ই ধরতো না। প্রথম প্রথম খুব মিস করতাম। পরের দিকে পড়াশোনার চাপ বেড়ে যাওয়ায় আর তেমন খোঁজ খবরও নিতে পারিনি। একবার শুধু ঈদের দিন সবার সাথে কথা হয়েছিল। সেদিন স্বপ্নার সাথেও ফরমাল দু’ একটা কথা বার্তা হয়।
তারপর একদিন শুনলাম ও অসুস্থ। অসুস্থ মানে ঠাণ্ডা জ্বর না- ভালোই অসুস্থ। কী কী সব টেস্ট যেনো করাচ্ছে! আমার তখন লাস্ট সেমিস্টার চলছে। থিসিস-টিসিস নিয়ে খুব ব্যস্ত। দেশের কারো সাথে তেমন যোগাযোগ করার সময় পাই না। তাছাড়া তেমন জোরালো ভাবে কেউ কিছু বলেও নি। ভেবেছিলাম দেশে ফিরেই ভালো করে শুনবো সব। কিন্তু তখনও জানতাম না ও হাসপাতালে ভর্তি! এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় আসতে আসতে জানলাম বেশ বড় ধরনের অসুখ করেছে… আমি খামোখা চিন্তা করবো বলে কেউ কিছু জানায়নি! আর সেদিন সকালে জানতে পারলাম ওর অসুখটা মরন ব্যাধি। ডাক্তাররা খুব চেষ্টা করছেন… কিন্তু মনে হয় না কিছু হবে!
শুনে আর থাকতে পারিনি। বিকেলে ভিজিটিং আওয়ার শুরু হতেই চলে গেলাম হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতালের বেডে ঐ শুকনো জীর্ণ কঙ্কাল সর্বস্ব শরীরটা দেখে আমার চেতনা লোপ পেয়ে গেল। এক মুহূর্তও আর দাঁড়াতে পারিনি ওখানে। উচিৎ অনুচিত সব ভুলে গিয়ে কোন রকমে পালিয়ে এসেছি। দ্বিতীয়বার আর যাবার সাহস হয়নি আমার। হয়তো এভাবেই থাকতাম। কিন্তু দুই দিন পর স্বপ্নার ছোট বোন রত্না এলো আমাদের বাসায়। রত্না স্বপ্নার চেয়ে প্রায় আট বছরের ছোট। আমার ঘরে এসে ও ঘরের দরজার ছিটকিনি দিয়ে বললঃ দাদা ভাই, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
আমি ওর গম্ভীর মুখ দেখে গালে আলতো আদর করে দিয়ে বললামঃ কিরে বুড়ি কি হয়েছে বলতো?
রত্না সেই আগের ছোটটি নেই। সে এবার এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়েছে। সে এখন সব বোঝে। আমার চোখের দিকে স্থির তাকিয়ে বললঃ প্লীজ দাদা ভাই, সারা জীবনতো হাসি তামাশাই করলে। আজ একটু সিরিয়াস হও।
আমি হঠাৎ চুপ হয়ে গেলাম। রত্না একটা ভাঁজ করা ডায়েরীর পাতা আমার হাতে দিয়ে বললঃ এটা খুব ভাল করে পড়ো। খুবই ব্যক্তিগত চিঠি। বুবু দিয়েছে। তবু আমার সামনেই পড়। কারন চিটিটা আমার হাতেই লেখা। বুবুর এখন চিটি লেখার মত অবস্থা নাই। কথা বলতেই কষ্ট হয়। তবু অনেক কষ্টে এই চিটিটা আমাকে দিয়ে লিখিয়েছে।
আমি কাগজটা ওর হাত থেকে নিলাম। কোনো সম্মোধন বা ভূমিকা ছাড়া চিটি। সারা জীবন ও আমাকে তুই তুকারি করেছে। কিন্তু এই চিঠিটাতে ‘তুমি’ করে লেখা। কে জানে, হয়তো চিঠিটা রত্নার হাতে লেখা তাই। আমি পড়তে লাগলামঃ
“তুমি ওভাবে চলে গেলে কেন? আমাকে দেখে খারাপ লেগেছিল? তোমার তো খুশি হবার কথা! আমাকে তুমি সারাক্ষণ মুটকি মুটকি করে ক্ষেপাতে। দেখ, আজ আমি একদম ‘মুটি’ নেই। একেবারে শুকিয়ে গেছি! তোমার দেশে ফেরার খবর শুনেছি। আমি জানতাম তুমি আমাকে দেখতে আসবেই। আমি ভেবেছিলাম তুমি এসে আমার মাথায় হাত রাখবে। তোমার মুখে মুটকি ডাক শোনার জন্যই তো আমি এখনও বেঁচে আছি। নইলে ডাক্তাররা সেই কবে হাল ছেড়ে দিয়েছে! অবশ্য আমি এখন আর মুটকি তো নেই… তাতে কি? ‘শুটকি’ই না হয় ডাকতে! আমাকে যারা দেখতে আসে তারা সবাই আমার সামনে আহা-উহু করে, সান্তনার সুরে কথা বলে। কারো কারো ভাবখানা এমন যে স্বর্দি-জ্বর; সপ্তাহখানেক পরেই সেরে যাবে! আমি মরে যাব এই সত্যি কথাটা লুকোছাপ করতে কেন যে এরা এতো বাহানা করে! আমার ভালো লাগে না। তারচেয়ে তুমিই ভালো। তোমার মুখে তো কোন কিছুই আটকায়নি কোনদিন। তাই ভেবেছিলাম তুমি এসে হাসি মুখে আমার পাশে বসবে। আর সবার মত গদ গদ স্বরে ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’, ‘ভালো হয়ে যাবি’ এসব ন্যাক ন্যাকা কথা বলবে না। হয়তো বলেই ফেলবে- কিরে! তুই দেখি শুটকি লেগে গেছিস! মরতে দেখি আর বেশি বাকি নাই। এখনও বেচে আছিস কিভাবে সেটাইতো এক রহস্য! মেয়েদের যে কই মাছের প্রাণ তা দেখি তুই আরেকবার প্রমান করলি! তা আর ক’দিন এভাবে ঝুলে থাকবি? হাসপাতালে তোর পেছনে কত খরচ হচ্ছে রোজ জানিস? ভাল কথা, দুপুর বা বিকেলের দিকে মরবি না কিন্তু খবরদার! মরলে শেষ রাতে মরবি। যাতে বেলা বারটার আগেই রিলিজ-টিলিজ দিয়ে দেয়। বারটার ওপার গেলেই পুরো একদিনের বিল বেশি কাটবে জানিস?
এধরনের কথা কেবল তোমার পক্ষেই বলা সম্ভব। ভাবছো আমি পাগল হয়ে গেছি- তাই না? কি সব আজে বাজে বকছি! হবে হয়তো… কি করবো বল? আমার ইদানিং খুব সত্য কথা শুনতে ইচ্ছা হয়। সবাই শুধু আমার সাথে মিথ্যা ছলনা করে। আমার একদমই ভালো লাগে না। আমি তোমার মত সোজা সাপ্টা সত্য কথা শুনতে চাই…
অথচ সেই তুমি এলে। মাত্র এক মুহূর্ত আমাকে দেখলে। তারপর কিছু না বলেই চট করে বের হয়ে গেলে! কী ভেবেছো? কেউ দেখেনি। আমি কিন্তু ঠিকই খেয়াল করেছি। বারান্দায় গিয়ে তুমি কিছুক্ষণ খাবি খেলে যেন। তারপর কাউকে কিছু না বলেই চলে গেলে! তুমি না বরাবরই এমন। মনে আছে- এয়ারপোর্টে তোমার হাতে একটা কাগজ দিয়েছিলাম। ওটা কোন সাধারন কাগজ ছিল না। ওটা ছিল আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ প্রেম পত্র! ভাগ্যিস আমি সেটা কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলেছিলাম! নইলে আজ আরো বেশি কষ্ট হতো তোমার। তুমি তো আমাকে কখনোই ভালোবাসনি। ভালোবাসার কোন কারণও নেই। জীবনে তো কম জ্বালাইনি তোমায়। তবে আমি কিন্তু জীবনে শুধু একজনকেই ভালোবেসেছি। সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম- কোনদিন আর মুখ ফুটে বলব না তোমাকে কথাটা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে- মরেই তো যাব, শুধু শুধু তোমার ওপর অভিমান করে বসে থেকে কি লাভ? তুমি তো ওমনই! তাই বলে ফেললাম। জানি কোন লাভ নেই। এতো লাভ ক্ষতির হিসেব করেই বা কি হবে? আমি সত্যিই তোমাকে খুব খুব খুব ভালবাসি।
সবাই আজকাল আমার শেষ ইচ্ছা পুরণ করায় ব্যস্ত। তুমিই বা বাদ থাকবে কেন? আমার একটা শেষ ইচ্ছা পুরণ করবে? মরার আগে তোমার মুখটা খুব ভাল করে একবার দেখতে ইচ্ছা করছে। কতদিন তোমার খোঁচামারা কথা শুনি না! আসবে একবার আমাকে দেখতে? সারাজীবন তো শুধু যন্ত্রণাই দিলাম। শেষ এই যন্ত্রণাটা দিব। নেবে না? জানি আমাকে কষ্ট দেয়াতেই তোমার আনন্দ। তবুও তোমার প্রতীক্ষায় রইলাম…”
যেমন হঠাৎ শুরু, তেমনি হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল চিঠিটা। আমি চিঠি শেষ করে রত্নার দিকে তাকালাম। দেখি সে নিরবে কাঁদছে। আমি ওর মাথায় একটা হাত রাখতেই ও আমার কোলে ঝাপিয়ে পড়ে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলল। ফোপাতে ফোপাতে বললঃ দাদা ভাই, প্লীজ তুমি একবার চল। বুবু আর বাঁচবে না। ডাক্তার বলে দিয়েছে। মাঝে মাঝে ওর এমন কষ্ট হয় যে দেখে আর সহ্য হয় না। ইচ্ছা করে গলা টিপে মেরে ফেলি। সব যন্ত্রণা একবারে শেষ হয়ে যাক। ও এখনও ধুঁকে ধুঁকে বেচে আছে… বোধহয় তোমার জন্যেই! প্লীজ দাদা, তুমি চল… প্লীজ…!
আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ২/১টা সান্ত্বনার কথা বলতে চাইলাম। মুখে কোন কথা এলো না। সান্ত্বনার ভাষা কেন যেন কখনোই আমার মুখে আসে না!
সেদিনই রত্নার সাথে হাসপাতালে গেলাম। তখন ভিজিটিং আওয়ার ছিল না। অসময়ে মহিলা রোগীর কেবিনে ঢুকতে নানান ঝামেলা। রত্না কিভাবে কিভাবে যেন সব ম্যানেজ করলো। আমি কেবিনে ঢুকে দেখলাম- আন্টি বাটিতে করে স্যুপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। আমাকে দেখে ওর চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। প্রথম দিনের মত ছুটে বের হয়ে যাবার তীব্র ইচ্ছাটা অনেক কষ্টে দমন করে বেডের দিকে এগিয়ে গেলাম। নিজেকে ধমকালাম এই বলে যে- কী স্বার্থপরের মত শুধু নিজের দিকটা ভাবছি। নিজের কষ্টটাকেই কেবল বড় করে দেখছি। মৃত্যু পথযাত্রি একটা মানুষের কষ্টটাকেও তো মূল্য দেয়া উচিৎ!
আমি গিয়ে আন্টির হাত থেকে স্যুপের বাটিটা নিলাম। আন্টি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে বসতে ইঙ্গিত করলো। তারপর রত্নার সাথে সোফায় গিয়ে বসলো। আমি বাটিটা টেবিলে নামিয়ে রেখে একটা হাত স্বপ্নার মাথায় রাখলাম। অসুখের কারণে চুল পড়ে একদম পাতলা হয়ে গেছে। চোখ দুটো গর্তে পড়ে গেছে। গাল বসে গিয়ে চিবুকের হাড় বিচ্ছিরি ভাবে বের হয়ে এসেছে। শীর্ণ হাতটায় ইঞ্জেকশন ও সেলাইন দেবার জন্য টেপ দিয়ে একটা ”বাটারফ্লাই” লাগানো। ফ্যাকাশে ও রক্তশুন্য চেহারা। চোখটা বন্ধ করলেই একটা দুর্ভিক্ষের লাশ মনে হবে।
আমি তবু আনেক কষ্টে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে বললামঃ কেমন আছিস?
প্রশ্নটা নিজের কানেই বেমানান শোনালো। স্বপ্না হেসে ফেলল। শোনা যায় না এমন ভাবে বললঃ মরিনি এখনও!
আমি আপ্রস্তুতভাবে আন্টির দিকে তাকালাম। আন্টি আলগোছে চোখ মুছলো। রত্নার দিকে তাকাতেই রত্না আন্টিকে নিয়ে বাইরে চলে গেল।
আমি আবার তাকালাম স্বপ্নার দিকে। ও অবাক তিক্ষ্ণ চোখে আমাকে দেখছে। প্রায় মৃত একটা শরীর অথচ কি উজ্জ্বল সেই চোখ! পুরো শরীরের প্রাণটুকু যেন ভর করেছে সেই দৃষ্টিতে… অসুখ তার সমস্ত শরীর গ্রাস করলেও চোখে বাসা বাঁধতে পারেনি! আমি সেই চোখের দিকে তাকিয়ে বললামঃ মরে যখন যাসনি এখনও তাহলে স্যুপ খা!
ও আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে না বলল। আমি বললামঃ তোর জন্য একটা গুড নিউজ আছে। আমি ঠিক করেছি এখন থেকে হাসপাতালেই থাকবো। সব সময়! ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র নার্স হিসেবে থাকতে দিবে কিনা কে জানে!
স্বপ্নার চোখ দু’টো আবার জ্বল জ্বল করে উঠলো। খুব আস্তে কিন্তু তিক্ষ্ণ ভাবে বললঃ সত্যি!
আমি মাথা ঝাকালাম। ও হঠাৎ মুখ কালো করে চোখ বন্ধ করে বললঃ মিথ্যা কথা। আমি জানি।
আমি ওর শীর্ণ হাতটা আমার হাতের ওপর নিয়ে শক্ত করে ধরলাম। ও কি বুঝলো কে জানে। চোখ বন্ধ রেখেই মৃদু হাসলো।
সে দিন থেকে আমি হাসপাতালে রয়ে গেছি। রাতে মহিলা কেবিনে বাইরের পুরুষ মানুষ থাকতে দেবার নিয়ম নেই। কিভাবে যেন সেগুলো ম্যানেজ করা হলো। আমি হয়ে গেলাম ২৪ ঘণ্টার নার্স! স্বপ্নার পাশে বসে থাকি। আন্টি আর রত্না পালা করে একজন রাতে থাকে আরেকজন দিনে। মাঝে একদিন ও একটু সুস্থ বোধ করলো। ডাক্তারের কাছে হুইল চেয়ারে করে বারান্দায় ঘুরার বায়না ধরলো। ডাক্তার চোখ কপালে তুলে বললেনঃ মাথা খারাপ! অসম্ভব! তোমাকে কিছুতেই বেড থেকে নামানো যাবে না।
স্বপ্না ডাক্তারকে বললঃ বেডে শুয়ে থাকলে কি আর মরবো না?
ডাক্তার আর কিছু বলল না। গম্ভির মুখে বের হয়ে গেলেন। অসম্ভব সম্ভব হলো। একজন নার্সকে দিয়ে হুইল চেয়ার পাঠিয়ে দিলেন। ধরাধরি করে ওকে হুইল চেয়ারে বসানো হলো। আমি হুইল চেয়ার ঠেলে ওকে বারান্দায় ঘুড়ালাম। আন্টি সেদিন আমার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললঃ বাবারে, তুই আমার মেয়েটার জন্য যা করছিস… তুই থাকাতে ও একটু ভাল আছে। নইলে এই এতোদিনে কোন দিন ও হুইল চেয়ারে ঘুরতে চায়নি। ওকে যদি কোন ভাবে বাঁচানো যেতো… বড়’পা তো নাই। আমি দুলাভাইয়ের পায়ে ধরে তোকে আমার মেয়ের জন্য ভিক্ষা চাইতাম… কিন্তু কোন রাস্তাই আর খোলা নাই! তুই এই শেষ ক’টা দিন ওর সাথে থাক।
আমি আন্টিকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। কিছু হয়তো বলা দরকার ছিল। বলতে পারলাম না। কখনোই পারিনি।
বারান্দায় সেদিন স্বপ্নাকে অনেক প্রানবন্ত লাগছিল। কথা বলতে কষ্ট হয় তবু অনেক কথা বলল। আমাকে ডেকে বললঃ আজকে আমাকে দেখতে কেমন লাগছে?
আমি আবেগ সামলে অনেক কষ্টে মুচকি হাসির অভিনয় করে বললামঃ ডাইনির মত!
আমার কথা শুনে স্বপ্না খিল খিল করে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে ওর চোখে পানি এসে গেল। আনন্দ অশ্রু! কিন্তু অসুস্থ শরীর; হাফিয়ে গেল অল্পতেই। আমি ওর সামনে হাটু গেড়ে বসলাম। চোখের পানি মুছে দিয়ে বললামঃ অনেক হয়েছে এবার থাম। কষ্ট হচ্ছে?
ও মাথা নেড়ে না বলল। বারান্দায় তখন আমি ছাড়াও রত্না ছিল। স্বপ্না ঘুড়ে রত্নার দিকে তাকালো। চোখে চোখে কী বলল জানি না। রত্নার বারান্দা ছেড়ে চলে গেল। স্বপ্নার চোখের ভাষা রত্নাই সবচেয়ে ভালো বোঝে! ও চলে গেলে স্বপ্না আমার দিকে তাকিয়ে বললঃ তুই আমাকে ভালবাসবি?
আমি এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বললামঃ একটা ডাইনিকে ভালবাসতে যাব কোন দুঃখে? আমি কি ডায়না নাকি?
ও আবার খিল খিল করে হাসতে লাগলো। ওর রোগা হাতটা টেনে এনে হাতের উল্টো পিঠে আলতো চুমু খেলাম আমি। স্বপ্না হাফ ছেড়ে বললঃ আমার খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে! ইচ্ছে করে পহেলা বৈশাখে জোর করে তোর সাথে ঘুরতে যাবার বায়না ধরতে। তোর সাথে খুব ঝগড়া করতে। টেনে টেনে তোর চুল ছিঁড়তে…
স্বপ্না হাপাতে লাগলো। আমি ওর হাত দু’টো সরিয়ে ওর কোলের ওপর মাথা রাখলাম। স্বপ্না ওর দুর্বল হাত আমার মাথায় বুলিয়ে দিতে লাগলো। আর আমার মাথা ভিজে যেতে লাগলো ওর চোখের ফোটা ফোটা জলে।
সেদিন রাতেই স্বপ্না হঠাৎ প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়লো। ডাক্তার নার্সের ছুটাছুটি শুরু হয়ে গেল। কেবিন থেকে আমাদের সবাইকে বের করে দেয়া হলো। মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে কী কী যেন ইঞ্জেকশন দিল। বারান্দার জানালা দিয়ে আমি দেখলাম- শীর্ণ শরীরটা যন্ত্রনায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। গলা কাটা মুরগীর মত ছটফট করছে। আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম। কষ্টে বুকটা মুচড়ে উঠলো। মনে হচ্ছিল কেউ একজন আমার হৃদপিণ্ডে হাতুরি দিয়ে পিটিয়ে একটা গজাল গেঁথে দিচ্ছে!
স্বপ্না তার পরেও আরও এক সপ্তাহ বেঁচে ছিল। আমি ওর পাশে সারাক্ষণ বসে কথা বলতাম। কখনও কখনও গল্পের বই পড়ে শোনাতাম। ও কখনও হাসত কখনও কাঁদত কখনও ঘুমিয়ে পড়তো।
গতকাল রাতে আমি আর রত্না ছিলাম কেবিনে। আমি ছিলাম স্বপ্নার বেডের পাশে চেয়ারে। পাশের খাটে রত্না সারাদিনের পরিশ্রমের পর প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। স্বপ্নাও কবিতা শুনতে শুনতে একটু আগে ঘুমিয়েছে। আমিও ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। হঠাৎ স্বপ্না জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। আমি ওর পাশে বসে হাত ধরলাম।
ঃ কি হয়েছে। কষ্ট হচ্ছে? সিস্টারকে ডাকবো?
স্বপ্না আমার হাত শক্ত করে ধরার চেষ্টা করলো। কিন্তু এতোটুকু শক্তি নেই শরীরে। মাথা নেড়ে শুধু না বলল। আমি আরেকটা হাত মাথায় রাখতেই বার দুই হেচকি তুলল। আমি তাড়াতাড়ি গ্লাসে পানি ঢাললাম। ওকে খাওয়ানোর জন্য মাথা তুললাম। ও সামান্য একটু খেয়ে মুখ সরিয়ে নিলো। তারপর ফিসফিস করে কী যেন বলল। আমি ভাল করে শোনার জন্য মুখের কাছে ঝুঁকলাম। অনেক কষ্টে ও বললঃ আমি মরে যাচ্ছিরে!
আমি ওর হাতটা শক্ত করে ধরলামঃ না, তুই মরবি না!
ও অনেক কষ্টে একটু হাসলো। তার পর বড় বড় করে শ্বাস নিতে নিতে বললঃ আমাকে একটু আদর করে দে।
আমি গভীর মমতায় ওর পলকা শরীরটা বুকে চেপে ধরলাম। তারপর কপালে চুমু খেলাম। আর তখনই আমার গলায় ওর নিষ্প্রাণ শুষ্ক ঠোঁটের ছোঁয়া পেলাম। এক হলকা গরম বাতাস আমার বুকে পরশ বুলিয়ে ওর শরীরটা নিথর হয়ে গেল। আমার হাতের ওপর থেকে ওর হাতটা আলগোছে খসে পড়ে গেল। আমি কয়েক সেকেন্ডেই সব বুঝে গেলাম। তবুও অনেকক্ষণ ওভাবেই ধরে রইলাম। তারপর আস্তে আস্তে ওর শরীরটা বেডে শুইয়ে দিয়ে প্রথমে রত্না ও পরে নার্সকে ডাকলাম।
তারপর থেকে কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। সবকিছু কিভাবে কিভাবে হলো কিছুই খেয়াল নেই। মানুষ জনের ছুটাছুটি, কান্না-চিৎকার-চেঁচামেচি কিছুই আমাকে স্পর্শ করেনি। কারও সাথে তেমন কথা বলিনি। যাও দু’-একটা বলেছি, কী বলেছি মনে নেই। যখন ঘোর কাটলো তখন নিজেকে আবিষ্কার করলাম এই কবরস্থানে। স্বপ্নার সমাধির সামনে। একটা স্বপ্নের সমাধির সামনে! যখন আকাশও আমার ব্যথায় কাঁদছে…

———-০———-

সফিক এহসান
(২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ইং)

৮ thoughts on “সমাধি

  1. সফিক ভাই, আসলেই আপনি একটা
    সফিক ভাই, আসলেই আপনি একটা ডায়না… :salute: :salute: :salute:
    অনেকদিন পর… থাক! হাস্যকর শুনাবে!!
    ভাল থাকবেন… আপানর পরের গল্পের অপেক্ষায় থাকলাম… :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি:

    আপনার গল্পের শুরুতে একটা অংশ দুইবার এসেছে! এডিট করে দেন!!
    আর এইবার গল্পে ডুকতে একটু সময় লেগেছে, প্রথমে টানেনি তবে পরে পোষায় দিয়েছেন… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    1. ধন্যবাদ… কিন্তু “ডায়না…”
      ধন্যবাদ… কিন্তু “ডায়না…” জিনিসটা কী? :খাইছে:

      অপেক্ষা করেন… সবুরে মেওয়া ফলে! :হাসি:

      এডিট করে দিলাম…

      শুকরিয়া… আপনাদের মত একনিষ্ঠ খরিদ্দার আছে বলেই না (আমার মত) ইস্টিশনের ফেরিওয়ালারা সওদা করতে আসে…
      :ফুল: :ভালাপাইছি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *