“নিতু’র আব্বু এবং লাল ক্যান্ডি পুতুল”

আনিসের মন ভাল নেই। মাত্র কিছুক্ষন আগে সে জানতে পেরেছে তাকে আর চাকুরীতে রাখতে চাচ্ছেনা তাদের অফিস কর্তৃপক্ষ। এ অফিসটা তে গত ৩ বছর ধরে কাজ করছে আনিস। ১২ হাজার টাকা বেতন পায় মাসের শেষে। এ দিয়ে কোনোমতে সে তার স্ত্রী ওয়াদিয়া আর একমাত্র মেয়ে নিতুকে নিয়ে সাগরদিঘীর পাড় একটি ২



আনিসের মন ভাল নেই। মাত্র কিছুক্ষন আগে সে জানতে পেরেছে তাকে আর চাকুরীতে রাখতে চাচ্ছেনা তাদের অফিস কর্তৃপক্ষ। এ অফিসটা তে গত ৩ বছর ধরে কাজ করছে আনিস। ১২ হাজার টাকা বেতন পায় মাসের শেষে। এ দিয়ে কোনোমতে সে তার স্ত্রী ওয়াদিয়া আর একমাত্র মেয়ে নিতুকে নিয়ে সাগরদিঘীর পাড় একটি ২ রুমের বাসা ভাড়া করে থাকে। আজকে নিতুর জন্মদিন কিন্তু মাসের শেষভাগ হওয়ায় আনিসের হাতেও বিশেষ টাকা-পয়সা নেই। আজকের দিনে নিতু’র ৫ বছর হবে। একজন বাবা হিসেবে নিজের মেয়ের জন্মদিনে কিছু একটা কিনে দিয়ে মেয়ের মুখে হাসি ফোটাতে না পারার যন্ত্রণার সাথে যোগ হয়েছে চাকুরী হারানোর হতাশা আর দুশ্চিন্তা। অফিসের ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছিলো আর নিকট ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছিলো সে, হঠাত তার ফোনে বেজে উঠলো-“বঁধুয়া আমার চোখে জল এনেছে হায়…” সম্বিত ফিরে পেলো, আনিস। ফোন বের করে দেখলো ওয়াদিয়ার ফোন। ফোন ধরে ক্লান্ত গলায় বলল-
-হ্যালো!
-এই তুমি অফিস থেকে ফিরবে কয়টায়? তোমার মেয়ে কান্না জুড়ে দিয়েছে তার জন্য নাকি ক্যান্ডি পুতুল না নিয়ে আসলে সে কিছু খাবেনা। এখনো কিছু খায়নি দুপুরের পর।
মনটা খারাপ হয়ে যায় আনিসের। প্রচন্ড খারাপ হয়ে যায়। কোনোমতে বলে-
-আমার আম্মুর কাছে ফোনটা দাও তো, ওর সাথে কথা বলি।
নিতুর কাছে ফোন দেয় ওয়াদিয়া। ফোন ধরে ফোপাতে ফোপাতে নিতু তার আব্বুকে বলে-
-আব্বু, আব্বু…রাহী’র না ৩ টা নতুন পুতুল। তুমি আমার জন্য আনবেনা আব্বু? প্লিজ আমার জন্য একটা পুতুল নিয়ে আইসো…
-হ্যাঁ, আম্মু। অবশ্যই আনবো। এইতো আমি চলে আসবো এক্ষুনি…বলে হাসার ভঙ্গি করে আনিস।
-আব্বু তুমি খুব ভালো…উম্মা।
-উম্মা, আম্মু তোমার মা’র কাছে ফোন দাও।

ওয়াদিয়ার হাতে ফোন দেয় নিতু। ওয়াদিয়া কানে ফোন লাগিয়ে বলে-
-তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো, আমি একটু ক্ষীর আর একটু পোলাও রান্না করেছি। বেশি দেরি করোনা।আর আসার সময় পারলে তোমার মেয়ের জন্যে কিছু নিয়ে এসো হাতে করে।
-আচ্ছা চলে আসবো…বাই…বলে ফোন রেখে দেয়।

পকেটে হাত দিয়ে প্রায় তিনশো টাকার মত পায় আনিস। এ টাকা দিয়ে তো নিশ্চই ক্যান্ডি পুতুল পাওয়া যাবেনা…তাই আনিস যায় তার ক্যাশিয়ার রহমান সাহেবের কাছে। রহমান সাহেব ভাল ও উদার মনের মানুষ, সব কিছু খুলে বলার পর রহমান সাহেব তাকে ৫০০ টাকার একটা নোট দিয়ে বলেন-“ভাই, আমারও হাত খালি। থাকলে আরও কিছু দিতাম ভাই।” আনিস মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে যায় জিন্দাবাজার। অনেক খুজে পেতে ৭৪০ টাকা দিয়ে নিতুর জন্য একটা লাল রঙের টুকটুকে পুতুল কিনে যখন মার্কেট থেকে বের হয় আনিস তখন রাত প্রায় সাড়ে নয়টা। রাস্তায় নামতেই তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়…রিকশা না পেয়ে জিন্দাবাজার থেকেই ছাতামাথায় হাঁটতে শুরু করে সে। তার শার্ট, প্যান্ট সব ভিজে একাকার হয়ে যায়, তবুও প্যাকেটে মোড়ানো নিতুর পুতুলটা সে তার বুকে চেপে ধরে রাখে। এ যে তার মেয়ের ভালোবাসা…এ যে তার পরম আদরের ধনের মুখে হাসি ফোটানোর চাবিকাঠি…

ব্রিস্টির তোড় বাড়তেই থাকে। বাসা থেকে কিছুদুর থাকতে হঠাত দমকা হাওয়ায় তার ছাতাটা উড়ে যায়…খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কাক হয়ে হাঁটতে থাকে সে…রাস্তায় হাটু সমান জল হয়ে গেছে। হঠাত একটা গর্তে পা দিয়ে ফেলে আনিস, আর তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় রাস্তার নোংরা পানিতে। হাত থেকে ছুটে যায় নিতুর জন্য কিনে আনা লাল ক্যান্ডি পুতুলটা। মুহূর্তের মধ্যে সেটি পানির ধাক্কায় চলে যায় একেবারে পাশের নালায়…এ দৃশ্য দেখে প্রচন্ড দুঃখে এবং রাগে জল চলে আসে আনিসের চোখে।

বৃষ্টির জল তার চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে আসা অশ্রুর সাথে মিশে গড়িয়ে গেলো, কেউ দেখতে পেলোনা। সাক্ষী হয়ে রইলো শুধু রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো…নিতুকে সে কি জবাব দেবে, নিতুর কান্নাভরা মুখ সে কি দিয়ে হাসাবে, নিতুর অভিমান সে কি করে ভাঙ্গাবে…ভাবতে ভাবতে টলতে টলতে বাসার গেটের দিকে এগোয় আনিস।

আব্বু এসেছে-আব্বু এসেছে বলে হই হই করে উঠে ছোট্ট নিতু…ভিজে কাক হয়ে থাকা আনিসকে দেখিয়ে তার ওয়াদিয়া কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে নিতু-“আম্মু আম্মু দেখো, আব্বুকে না ভেজা কাকের মত লাগছে…” এই বলে এক লাফে আনিসের কোলে ঝাপিয়ে পড়ে নিতু…আনিস বুকের ভেতর দুঃখ চেপে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে-“শুভ জন্মদিন মামনি, শুভ জন্মদিন”
পুতুলের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে ওয়াদিয়াকে বলে নিতু-” আম্মু তুমি খাবার দাও আমাদের, আব্বু ফ্রেশ হয়ে এলে আমরা একসাথে খাবো” এই বলে আনিসকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে নিতু-“আই লাভ ইউ আব্বু, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল আব্বু”
আনিসের চোখে জল চলে আসে আবার, ভাগ্যিস মেয়ে তার বুকে মাথা দিয়ে আছে তাই তার চোখের জল দেখতে পায়নি..

৮ thoughts on ““নিতু’র আব্বু এবং লাল ক্যান্ডি পুতুল”

  1. গল্পের মানের বিচারে তেমন ভালো
    গল্পের মানের বিচারে তেমন ভালো হয় নি। তবে এমন কাহিনী বাস্তবে অহরহ আছে যা মন খারাপ করে দেয়।

Leave a Reply to আনাম-পার্থ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *