অমাবস্যার রাতে এগিয়ে চলা

– অমিত, তুমি তো বাক্য রচনা করা শিখে গেছ। আজকে একটা মজার লেখা লিখতে দিব।
– কি লেখা?
– আজকে তুমি বাবা-মাকে নিয়ে লিখবে। তোমার যা লিখতে ইচ্ছে করবে লিখবে।
– কি লিখব?
– যা ইচ্ছা। বাবা-মার কি নাম, কি করে, কোথায় কোথায় ঘুরেছ বাবা-মার সাথে, বাবা কখন আদর করে, কখন বকা দেয়, মা কখন আদর করে, মা রাতে কি কি গল্প শোনায়, জন্মদিনে মা-বাবা কি গিফট দেয় আর যা যা মনে পরে সবই লিখবে। তুমি ঠিকমত লিখতে পার কিনা সেটা দেখব। সুন্দরভাবে লিখতে পারলে কালকে চকলেট দিব।
আমিত ভাবতে থাকে। চার-পাঁচ মিনিট খাতা-পেন্সিল হাতে ভাবতে থাকে কি লিখবে।
– অমিত, তুমি কিছু লিখছ না কিন্তু।
– পারি না আপু।

– অমিত, তুমি তো বাক্য রচনা করা শিখে গেছ। আজকে একটা মজার লেখা লিখতে দিব।
– কি লেখা?
– আজকে তুমি বাবা-মাকে নিয়ে লিখবে। তোমার যা লিখতে ইচ্ছে করবে লিখবে।
– কি লিখব?
– যা ইচ্ছা। বাবা-মার কি নাম, কি করে, কোথায় কোথায় ঘুরেছ বাবা-মার সাথে, বাবা কখন আদর করে, কখন বকা দেয়, মা কখন আদর করে, মা রাতে কি কি গল্প শোনায়, জন্মদিনে মা-বাবা কি গিফট দেয় আর যা যা মনে পরে সবই লিখবে। তুমি ঠিকমত লিখতে পার কিনা সেটা দেখব। সুন্দরভাবে লিখতে পারলে কালকে চকলেট দিব।
আমিত ভাবতে থাকে। চার-পাঁচ মিনিট খাতা-পেন্সিল হাতে ভাবতে থাকে কি লিখবে।
– অমিত, তুমি কিছু লিখছ না কিন্তু।
– পারি না আপু।
– পারবে। যা মনে পড়ছে সেগুলো কালকে যেভাবে লিখেছ সেভাবে লিখবে। চেষ্টা কর। ভুল হলে আমি বলে দিব। লেখা শুরু কর। দেখ ভাল লাগবে। আনন্দ পাবে।
অমিত লেখা শুরু করতে আরো কিছুক্ষণ সময় নেয়। এরপর লিখতে শুরু করে। আনাড়ি হাতের গোটা গোটা লেখা। থেমে থেমে কাঁপা কাঁপা হাতে লিখছে সে। লিখতে তার বুকটাও দুরুদুরু কাঁপছিল। এগুলো দিপালীর চোখ এড়িয়ে যায়। বেশ সময় নিয়ে লিখছে বলে দিপালী অমিতকে তাড়া দিতে থাকে। অমিত দিপালীর বকা শুনে কিছুক্ষণ দ্রুত লেখে এরপর আবার আগের মত। প্রায় পৌনে এক ঘন্টা পর অমিত খাতা এগিয়ে দেয়। দিপালী পড়া শুরু করে।

“ আমার বাবার নাম সায়ন আহমেদ। মায়ের নাম প্রিয়ন্তি জাহান। আমার বাবা একজন ব্যবসায়ী, মা একজন গৃহিনী। আমার বাবা খুব রাগী। আমার বাবা কখনো আদর করে না। আমার বাবা বকা দেয়। আমার বাবা আমাকে, মাকে মারে। আমার মা খুব আদর করে। মা বাবাকে আমাকে মারতে দেয় না। আমার বাবা মাকে মারে। আমার বাবা-মা ঘুরতে যায় না। সুমন, হাসান শিশুমেলা ঘুরতে যায়। আমি শিশুমেলা যেতে চাই। কিন্তু আমার বাবা-মা নিয়ে যায় না। আমার মা আমাকে রাতে গল্প বলে না। আমার মা রাতে কাদে। আমার জন্মদিনে মা রান্না করে। আমার জন্মদিনে আমার বাবা বাসায় থাকে না।”

আনাড়ি হাতের গোটা গোটা লেখাগুলোর দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছে দিপালী। ভুলগুলো ছাপিয়ে দিপালীর চোখে ভেসে উঠে অমিতের কষ্টগুলো। একটা শিশুর হাস্যজ্জ্বল মুখের আড়ালে চাপা পরা দুঃখগুলো। অমিত আপনমনে পেন্সিল হাতে টেবিলে এঁকে যাচ্ছে। তখনও দিপালী অসাড় হাতে খাতাটা ধরে আছে। বেশ কিছুক্ষণ পর দিপালী চোখ তুলে অমিতের দিকে তাকাল।
– অমিত, আব্বু জন্মদিনে গিফট দেয় না?
– না।
– ঈদে কি কর?
– টিভি দেখি। পায়েস খাই।
– দাদুবাড়ী, নানুবাড়ী বেড়াতে যাও না?
– না।
– ওরা আসে না?
– আসে।
– আমি তোমার আম্মু-আব্বুকে বলে দিব তোমাকে শিশুমেলা নিয়ে যেতে। তুমি মন খারাপ কর না।
– না আপু, প্লিজ। আব্বুকে বল না। আমি ভুলে লিখেছি। আব্বুকে বল না। আব্বু মারবে।
অমিত টলটল চোখে হাতজোড় করে দিপালীকে অনুরোধ করছে। ভয়ে কাঁপছে। দিপালী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, কিছুক্ষণের জন্য তার মাথা পুরো খালি হয়ে গেল। কি বলবে বুঝতে পারছিল না দিপালী।
– আচ্ছা বলব না। কিচ্ছু বলব না। তুমি ভয় পেয় না।
– থ্যাঙ্কইউ।
– আমি তোমাকে একদিন নিয়ে যাব। কেঁদ না।
– সত্যি?
– হুমমম…
অমিতের চোখ মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সেই মুখে দিকে তাকিয়ে দিপালীর ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটে উঠেছে। দিপালী নিজেকে স্বাভাবিক করে অমিতের পড়ায় মন দেয়।

সেদিন থেকে দিপালীর মাথায় অমিতের লেখাটা ঘুরপাক খাচ্ছে। অমিতকে সে কথা দিয়েছে শিশুমেলা নিয়ে যাবে। তাছাড়া অমিতের মায়ের সাথে একটু কথা বলা দরকার। তিনিও নিশ্চয়ই ভুগছেন। কিন্তু বাইরের মানুষের কাছ থেকে এরকম কথা তিনি ভালভাবে নিবেন না। অন্য কোন প্রসঙ্গ দিয়ে তাকে সাহায্য করতে হবে। দিপালী ভাবতে থাকে। একটা সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

দু’দিন পর দিপালী অমিতের মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে এরকম একটি প্রসঙ্গ তুলে আনে।
– আমাদের পাশের ফ্লাটে নতুন এক মহিলা এসেছে। স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে এখন একাই থাকেন। বাবা মারা যাবার পর থেকে মাও তো একা ছিল। এখন ঐ মহিলার সাথে দিব্যি আড্ডা জমে মায়ের। আগে মাকে সময় দিতে না পেরে খারাপ লাগত। এখন মায়ের সময় বেশ কাটছে দেখে ভালই লাগে। তাই এখানে বেশি সময় দেওয়া যায়।
– হ্যাঁ, তোমার মায়ের জন্য তো ভালই হয়েছে। ঐ মহিলার ডিভোর্স হল কেন?
– হাসবেন্ড নাকি খুব মারত। আন্ডারেস্টিমেট করত। মহিলা বাধ্য হয়েই ডিভোর্স দেন।
– আজকালকার মহিলারা যা হয়েছে। সামান্য মারামারিতেই ডিভোর্স, কথা নেই বার্তা নেই ডিভোর্স। সংসারের প্রতি এদের কোন মায়াই নেই।
– না আন্টি, এটা ভুল ধারনা। মায়া আছে ঠিকই। কিন্তু আত্মসম্মান বলেও একটা কথা আছে।
– কিসের আত্মসম্মান? এখন যে সমাজের ছি ছি শুনছে এই বুঝি আত্মসম্মান? তোমরা আজকালকার মেয়ে তো, তাই স্বামী সামান্য গায়ে হাত তুললেই তোমাদের গা জ্বলে যায়। ইসলামে অবাধ্য স্ত্রীকে মারার নির্দেশ আছে। কোরআনে এমনো আছে যে , ‘নারী পুরুষের আনুগত্যকারী, পুরুষ নারীর রক্ষাকারী।’ তুমি তোমার স্বামীর কথা শুনবে, না শুনলে স্বামী শাসন করবে।
– আন্টি, পরে এ নিয়ে কথা হবে। আজ উঠি।
দিপালী বিদায় নিয়ে চলে আসে। বুঝতে পারে এখানে ওর করার কিছু নেই। অমিতের মা নিজেই এ বিষয়কে সমর্থন করছেন। তিনি এটাকে বৈধ ভেবে বসে আছেন। না, দিপালী কিছু করতে পারবে না। কিন্তু অমিতকে নিয়ে একবার শিশুমেলা যেতে হবে। দিপালীর চোখের সামনে অমিতের হাসি মুখটা ভেসে উঠল। শিশুমেলায় গিয়ে অমিত খুব ছোটাছুটি করবে, অবাক চোখে রাইডগুলো দেখেবে, একের পর এক রাইডে চড়ার বায়না ধরবে, কত খুশি হবে!- ভাবতে ভাবতে বাড়ির পথে এগিয়ে চলল দিপালী।

কিছুদিন পর দিপালী অমিতের মাকে অমিতকে নিয়ে ঘুরতে যাবার প্রস্তাব দিল। কিন্তু অমিতের মা-বাবা কেউই রাজি হল না। উলটো অমিতের মায়ের মনে সন্দেহ জেগে উঠল। দিপালী তার ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যাবার কথা ভাবছে না তো? তার ছেলের প্রতি কারো নজর পড়েনি ত? দিপালীকে কয়েকদিন থেকে সুবিধার মনে হচ্ছেনা অমিতের মায়ের। অমিতের মা নির্ভর করতে পারছে না দিপালীর উপর। অমিতকে একটু বেশিই আদর করে দিপালী। মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি? না দিপালীর নিশ্চয়ই কোন মতলব আছে। দিন কে দিন তার সন্দেহ বেড়েই চলল। একদিন সুযোগ বুঝে তিনি দিপালীকে অমিতকে পড়ানো ছেড়ে দেবার কথা বললেন। দিপালী বেশ অবাক হল। মানতে পারছিল না। কিন্তু তার কিছু করার নেই। বিদায়ের দিন অমিত খুব কাঁদল। দিপালীরও খুব কান্না পাচ্ছিল। কিন্তু অমিতের সামনে কাঁদল না। অমিত ছোট ছোট হাত দিয়ে দিপালীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। কামড়ে ধরেছে দিপালীর জামা। যেতে দিবেনা দিপালীকে। অমিতের মা অমিতকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। তবু অমিত দিপালীকে ছাড়ছিল না। দিপালী আদর করে অমিতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। কপালে চুমু খেল। এরপর শক্ত হাতে অমিতকে নিজের গা থেকে ছাড়িয়ে সামনে দাঁড় করাল। অমিতের চোখের পানি মুছে দিয়ে, কাঁধে দুটো হাত রেখে বলল, ‘ অমিত, কাঁদে না। আমি চলে যাচ্ছি না। আমার সাথে আবার দেখা হবে। তুমি একদিন বড় হবে। অনেক বড়। সেদিন তুমি আম্মুকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। আমাদের বাসায় যাবে। তুমি আমার সাথে দেখা করতে আসবে। একাই শিশুমেলা যাবে। যখন আব্বু আর তোমাকে বকবে না। অনেক বড় হয়ে যাবে তুমি।’ শিশুমেলায় যাবার কথা শুনে অমিতের চোখ জ্বলে উঠল। দিপালী আরেকবার অমিতের কপালে চুমু খেল। অমিতের মা অমিতকে কোলে তুলে নিল। অমিতের টলটল চোখের দিকে তাকিয়ে দিপালীর চোখও ঝাপ্সা হয়ে উঠল।

আমিতের বাবা আজকে গ্রামের বাড়ির সবার সামনে অমিতের মাকে থাপ্পর মেরেছে। মাকে মারতে দেখে অমিতের মাথায় রাগ চেপে যায়। কিন্তু সবার সামনে মা-বাবাকে আরো ছোট করতে চায়না। তাই কিছু না বলে ওখানে চুপ করে থাকে। বাসায় ফিরে অমিত রাগস্বরে বাবার মুখোমুখি হয়
– আম্মুকে সবার সামনে মারলে কেন?
– মারার দরকার ছিল।
– কি দরকার ছিল?
– ওখানে তোমার মা যে কথা বলেছে তাতে ওকে না মারলে সবাই ভাবত আমি ওকে আস্কারা দিচ্ছি।
– সবাই কি ভাবত না ভাবত তার জন্য আম্মুকে মারবে? নিজেকে safe side-এ রাখতে, নির্দোষ সাজতে, দাম্ভিকতা দেখাতে আম্মুর গায়ে হাত তুলবে?
– আমি তোর মাকে মারব না আদর করব সেটা আমার ব্যাপার। তুই বলার কে?
– আমি বলার কে মানে? আম্মুকে উলটো পালটা বুঝিয়ে হাত করে ফেলেছ। তাই আম্মু এখন প্রতিবাদ করে না। তার মানে আমিও প্রতিবাদ করতে পারব না? তুমি ভন্ড, যোচ্চর, স্বার্থপর। উলটো পালটা কোরআন হাদীস বুঝিয়ে মায়ের মাথা খেয়েছ, দাসী করে রেখেছ।
– অমিত! তোকে কিন্তু আমি জ্যন্ত কবর দিব।
বলে এগিয়ে যেতে লাগলেন অমিতের বাবা। এমন সময় অমিতের মা এসে স্বামীকে আটকালেন।
– আহা! অমিত এগুলো কি ধরনের বেয়াদবি? আব্বুকে কেউ এভাবে বলে?
অমিতের বাবা স্ত্রীর হাত ঠেলে অমিতের শার্টের কলার চেপে ধরেন।
– এই! তুই কে রে? নিজেই তো তোর মায়ের মত মারধোর খেয়ে এখানে পড়ে আছিস। আমার টাকার উপর থাকিস। আবার কথা বলিস! শালার মোনাফেক! আমার এখানে থাকলে আমার উপর একটা কথাও বলা যাবে না।

অমিতের মাথায় চেপে থাকা রাগটা এবার থাবা দিয়ে উঠে। উনিশ বছরের ক্রোধ আজকে বিস্ফোরিত হয়। ধাক্কা মেরে অমিত নিজের বাবাকে মেঝেতে ফেলে দেয়। নিজেকে পাষণ্ড বাবার হাত থেকে মুক্ত করে নেয়। উনিশ বছর থেকে সময়ের অপেক্ষা করেছে অমিত। আজকের দিনের অপেক্ষা। বড় হবার অপেক্ষা। অনেক বড় হবার। কাপড় আর বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে অমিত বের হয়ে আসে। পিছন থেকে মা ডাকে। অমিত সে ডাক ফিরিয়ে দেয়। আজকে আর সে মায়ের দিকে তাকিয়ে পিছিয়ে যাবে না। অমিত এগিয়ে চলেছে। অমাবস্যার রাত। অমিত অনেক বড় আজকে। আজকে সে নিজেই শিশুমেলা যেতে পারবে। আজকে থেকে আর আব্বু আর বকবে না। আমিত আজকে ঘুরতে বেড়িয়েছে। দিপালীর বাড়ির পথে। আজকে নিজেই দেখা করতে যাবে দিপালীর সাথে, কিন্তু মাকে ছাড়া।

১৪ thoughts on “অমাবস্যার রাতে এগিয়ে চলা

  1. অনেক ভালো লিখেছেন। সাবলীল
    অনেক ভালো লিখেছেন। সাবলীল ভাষায় কি চমৎকার ভাবে এক শিশুর বেড়ে ওঠা দেখালেন একরাশ কষ্ট নিয়ে। মুক্ত হোক সকল শিশু এই ছেলেবেলা থেকে, মুক্ত হোক সে সকল বাবা মা তাদের বিকারগ্রস্ততা থেকে। :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন:

  2. চমৎকার বর্ননা। গল্প ভালো
    চমৎকার বর্ননা। গল্প ভালো লাগল। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  3. পড়ে বেশ ভালো লাগলো। কিন্তু
    পড়ে বেশ ভালো লাগলো। কিন্তু শিশু অমিত যখন বাবা-মার সম্পর্কে লিখছিল তখন লেখাতে কিছু শিশু সুলভ বানান ভুল থাকলে বিষয়টা আরও Realistic হতো। এটা সমালোচনা না, কেবলই আমার ব্যক্তিগত মতামত।

    1. না ঠিক আছে। আমিও ভেবেছিলাম।
      না ঠিক আছে। আমিও ভেবেছিলাম। কিন্তু শিশুসুলভ ভুলগুলো সম্পর্কে আমার পরিস্কার ধারনা ছিলনা। তাই লিখতে পারিনি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *