তিব্বত স্নো অথবা মাটির গন্ধ (গল্প-৫০)

বাষট্টি বছরের বিজয়া যখন স্নানের পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে উঠোনের তারে ভেজা কাপড় আর বাঁশের আড়ে ভেজা সায়া-ব্লাউজ ও মাথায় জড়ানো গামছাখানা খুলে মেলে দিয়ে ঘরে গিয়ে দেয়ালে লাগানো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পাশের টেবিলের ওপর থেকে হাতে নিয়ে তিব্বত স্নো’র কৌটোর মুখ খোলেন; তখন তিব্বত স্নো’র স্নিগ্ধ গন্ধটা ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে পৌঁছা মাত্র তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ক্ষীণকায়া চন্দনা নদীর পাড়ের সবুজ গাছপালা বেষ্টিত ডোয়া ও মেঝে পাকা একটি টিনের বাড়ি, প্রশস্ত বর্গাকৃতি উঠোন, উঠোনের পূর্বদিকে পাকা করা থাক কাটা তুলসীমঞ্চ, সামান্য দূরে একটা রক্তজবা ফুলের গাছ আর কলাবতী ফুলগাছের ঝোপ, উঠোনের দক্ষিণদিকে একটা শিউলি ফুলের গাছ, উত্তরদিকে খড়ের গাদা, আরো উত্তরে অল্প দূরে গোড়ায় বাঁধা দুটো বলদ এবং একটা গাভী আর তেঁতুলের বিচির রঙের বন্ধনহীন একটি বকনা বাছুর; তিব্বত স্নো’র গন্ধ ম্লান করে তার নাকে যেন অনুভূত হয় বসন্তের প্রথম বৃষ্টিমাখা ধুলো আর আমের মুকুলের গন্ধ, বাড়ির গাছের মৌচাক ভাঙা মধুর গন্ধ, শরতের শিউলি ফুলের সুমিষ্ট সুঘ্রাণ!

প্রায় প্রতিদিনই স্নানের পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিব্বত স্নো’র কৌটোটা খোলার পর তার চোখের সামনে ওই একই দৃশ্য ভেসে ওঠে, ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে একইরকম ঘ্রাণ অনুভূত! একটা দুটো বছর নয়, ত্রিশ বছর যাবৎ স্নানের পর একই রকম দৃশ্য ও গন্ধের ঘোরে আচ্ছন্ন হন তিনি; আর এভাবেই তিনি কৌটো থেকে ডান হাতের তর্জনীর ডগায় তিব্বত স্নো নিয়ে কপালে, দুই গালে, নাকে এবং চিবুকে পাঁচটা ফোঁটা দেন, তারপর চারটে আঙুল এক জায়গা করে আলতো ভাবে ঘষে মুখের ত্বকে ম্লান করে ফেলেন স্নো। এরপর যখন স্নো’র কৌটোর মুখটি আঁটেন তখন তার বুক থেকে প্রায় রোজই একই ধরনের একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়!

ত্রিশ বছর আগে মনের ক্যানভাসে ওই ছবিটা নিয়ে তিনি বর, শ্বশুর আর চার বছরের ছেলের সঙ্গে শ্বশুরের পৈত্রিক ভিটে ছাড়েন। বাড়িটা বিক্রি করার কথা পাকা হতেই বলদ দুটো, গাভী আর বাছুরটা বালিয়াকান্দী হাটে নিয়ে বিক্রি করেন তার বর। কাঁসার বাসনসহ সংসারের টুকিটাকি কিছু জিনিস বিক্রি করেন। কিছু পড়শিদের দান করেন; যেমন-বাটনা বাটা পাটা আর পুতাটা দেন পাড়াতো জা বিলাসীকে, মুড়ি রাখার মাটির দুটো কোলা দেন বাসন্তী ঠাকুরঝিকে, ইস্টিলের কয়েকখানা থালা দেন ভজনের মাকে, দুটো কড়াই দেন মিনতি কাকিমাকে, দুটো ধামা দেন প্রতিমা পিসিকে; আর আসার কয়েকদিন আগে যখন শেষবারের মতো বাপের ভিটেয় বেড়াতে যান তখন পাথরের একটা থালা আর একটা বাটি, পিতলের একটা কলস, কয়েকখানা শাড়িসহ সংসারের কিছু জিনিস ভাই-ভাইবউকে উপহার দিয়ে আসেন। যেদিন ভোরবেলায় শ্বশুরের ভিটে ছেড়ে হিমাংসু দালালের সঙ্গে যাত্রা করেন পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার পাটুলী গ্রামের উদ্দেশ্যে; সেদিন সঙ্গে আনেন কেবল দুটো ব্যাগ বোঝাই পরিধেয় কিছু কাপড়, সোনার গহনা, ভাইয়ের দেওয়া কিছু উপহার সামগ্রী আর নগদ কিছু টাকা। সাজানো সোনার সংসার বাংলাদেশে ফেলে অজানা-অচেনা পাটুলীতে এসে নতুন করে হাঁড়ি-পাতিল, হাতা-খুন্তি ইত্যাদি নানান ধরনের সাংসারিক জিনিসপত্র কিনে আবার নতুন করে সংসার শুরু করতে হয় তাকে। বাবার বাড়ি ছিল সাজানো গোছানো গৃহস্থবাড়ি, বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে এসেও পেয়েছিলেন শাশুড়ির সাজানো সংসার। বিয়ের পাঁচ বছর পর শাশুড়ি মারা গেলে তিনিই হন সংসারের কত্রী। এর বছর তিনেক পরই চলে আসেন পাটুলীতে, আসতে বাধ্য হন; সে অন্য কথা, অন্য গল্প, পশ্চিমবঙ্গে চলে আসা আরো অনেক বাঙাল পরিবারের মতোই পুরোনো এবং বেদনাদায়ক সে গল্পকথা! পাটুলীতে এসে বিজয়া বুঝতে পারেন যে নতুন করে সংসার পাতার কতো ঝামেলা, পুরনো সংসারে বাড়ি কি ঘরের আনাচে-কানাচে কতো জিনিসপত্র অবহেলায় পড়ে থাকে, সময়ে সময়ে সে-সব কাজে লাগে। কিন্তু নতুন সংসারে সুই থেকে শাবল, সবই নতুন করে কিনতে হয়; তখন পুরোনো সংসারে অবহেলায় পড়ে থাকা জিনিসগুলোর কথা মনে পড়ে।

তারা যেদিন ভোরে দেশ ছেড়ে চলে আসেন তার আগের দিন বিকেলে তাদের বাড়িতে এসেছিল তার একমাত্র ভাই আর ভাইয়ের বউ, রাতে ছিল ওরা, অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করেছিল সবাই, তবু যেন কারো গল্প ফুরোচ্ছিল না, শেষে অনেক গল্প না বলেই গভীররাতে শুতে যান সবাই। ভাই আর ভাইয়ের বউ তার বরের জন্য নিয়ে এসেছিল দু-খানা লুঙ্গি আর দুটো নতুন শার্ট; ছেলের জন্য দু-সেট জামা-প্যান্ট; আর তার জন্য দুটো জামদানি শাড়ি, ছয়টা ব্লাউজের পিস, এক ডজন সাবান আর ছয়টা তিব্বত স্নো।

বাংলাদেশ থেকে চলে আসা, পাটুলীতে নতুন সংসার পাতা, সে-সব কথা এখন মনে পড়লে বিজয়ার মনে হয় তা যেন গত জন্মের কথা! পাটুলীতে আসার পর তার বর ছোট্ট একটা হোটেল খোলেন বাদকুল্লা বাজারে, তাতেই কোনোভাবে সংসার চলে যেতো। একটু একটু করে আবার যখন সংসার গুছিয়ে ওঠেন তখন শ্বশুরমশাই মারা যান।

এখানে আসার পর প্রায় বছর দশেক আর বাংলাদেশে বেড়াতে যাওয়া হয়নি তার। তবে তিনি না গেলেও দূর্গাপূজা আর পহেলা বৈশাখের সময় ভাই আর ভাইয়ের বউ তার জন্য উপহার পাঠাতো হিমাংসু দালালের কাছে। হিমাংসু দালাল তখন মাসে দু-তিনবার এপারের মানুষ ওপারে আর ওপারের মানুষ এপারে পারাপার করতো। ভাই প্রত্যেকবারই যে জিনিসটি পাঠাতো তা হলো তার দিদির প্রিয় তিব্বত স্নো।

তারপর গঙ্গায়-পদ্মায় অনেক জল গড়িয়ে গেছে, বিজয়া বৃদ্ধ হয়েছেন, মাথার অর্ধেকের বেশি চুল সাদা হয়ে গেছে, বাংলাদেশে থাকা তার ভাইও মাস্টারির চাকরির শেষ সময়ে চলে এসেছেন। বর্ডারের নিরাপত্তা কঠোর হওয়ায় হিমাংসু দালালও সেই কবেই দালালি ছেড়ে দিয়ে বাদকুল্লাতেই স্থায়ী হয়েছে। এখন বিজয়া ভারতের নাগরিক হয়েছেন, পাসপোর্ট করিয়েছেন। দু-তিন বছর পরপরই বাংলাদেশে ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান, ভাইও আসেন বেড়াতে। ভাই এখনো ভারতে বেড়াতে এলে দিদির জন্য তিব্বত স্নো আনতে ভোলেন না, বাংলাদেশ থেকে কেউ ভারতে বেড়াতে এলে ভাই তার দিদির জন্য আর কিছু না হোক অন্তত কয়েকটা তিব্বত স্নো পাঠাবেনই।

বাংলাদেশের মানুষ প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার শপিং করে ভারত থেকে, পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে কসমেটিকস, বাদ যায় না কোনো কিছুই। ভারতের বাজারে লঞ্চ করেছে উন্নতমানের কতো ধরনের স্নো কিংবা ফেয়ারনেস ক্রিম, কিন্তু বিজয়া এখনো অপেক্ষায় থাকেন তার ভাই কবে কার কাছে বাংলাদেশের তিব্বত স্নো পাঠাবেন। ভাই ফোন করে যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘দিদি, তোর জন্য কী পাঠাবো?’

‘আর কিছু লাগবে না, দুটো স্নো পাঠিয়ে দিস। এই দেশের স্নো-টোনো কেমন আটার গোলার মতো লাগে!’

বিজয়ার ছেলে সুদীপ্ত, দেশত্যাগের সময় যার বয়স ছিল চার বছর, এখন তার বয়স চৌত্রিশ, প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করে, বিয়ে করেছে, দু-বছরের একটা মেয়ে আছে। সুদীপ্ত’র বউ উমা শাশুড়ির কথা শুনে মিটি মিটি হাসে আর সুদীপ্ত মনে মনে বলে-‘মা একটা পাগলী, এদেশের স্নো নাকি আটার গোলার মতো লাগে! এদেশের বাজারে কতো ভাল ফেয়ারনেস ক্রিম পাওয়া যায়, অথচ মা আমার এখনো বাংলাদেশের তিব্বত স্নো নিয়েই আছে!’

এই তো গেল শীতে একটা ট্যুরিজম কোম্পানীর সঙ্গে আঠারো দিনের লম্বা ভ্রমণে সুদীপ্ত মাকে ঘুরিয়ে আনে দিল্লী, বৃন্দাবন, অযোধ্যা আর বিহার; গঙ্গা, যমুনা, কোশীর মতো বড়ো বড়ো নদী দেখায় মাকে। তার আগের বছর যায় জলপাইগুড়ি-শিলং-আসাম; তিস্তা, ব্র‏হ্মপুত্র-উমাংগটের মতো নদী দেখায়; অথচ তার মা বলেন, ‘যতো কথাই বলিস, আমাদের চন্দনার মতো অমন মায়াভরা নদী কোথাও নেই, চন্দনার দু-পাশে চোখ জুড়োনো সবুজ!’

চার বছর আগেও মাকে নিয়ে বাংলাদেশের মামাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল সুদীপ্ত, মায়ের কথায় তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রায় খালের মতো মৃতপ্রায় চন্দনা নদীর দৃশ্য। সে ভাবে, কোথায় গঙ্গা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র আর কোথায় চন্দনা! মা একটা পাগলী!

কয়েক বছর পর পর বিজয়া বাংলাদেশে বেড়াতে যান। সুদীপ্ত ভারতবর্ষের এতো রাজ্যের এতো জায়গায় মাকে ঘুরিয়ে আনে, তবু পর পর কয়েক বছর বাংলাদেশে যেতে না পারলেই তার মা আফসোস করে বলেন, ‘কতো বছর বাংলাদেশে যাইনে!’

এবছরও বিজয়ার ভাই তার জন্য চারটে তিব্বত স্নো পাঠিয়েছেন। স্নান সেরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তারই একটার মুখ খোলেন বিজয়া, ঘ্রাণ নেন। আঙুলের ডগায় স্নো নিয়ে তার ঈষৎ কুঞ্চিত ত্বকে ঘষেন, তার চোখে ভেসে ওঠে চন্দনা নদী, সবুজ গাছপালায় বেষ্টিত একটি বাড়ি, প্রশস্ত উঠোন, উঠোনের পূর্বদিকে পাকা করা থাক কাটা তুলসীমঞ্চ, তার পাশে একটা রক্তজবা ফুলের গাছ, উঠোনের উত্তরদিকে একটা শিউলি ফুলের গাছ! আয়নার তার নিজের প্রতিচ্ছায় যেন ফুটে ওঠে এক টুকরো বাংলাদেশ!

ঢাকা।
ফেব্রুয়ারি, ২০১৯।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *