আমার দেশভাবনা ও গনজাগরণ মঞ্চ (০১)

২৬ মার্চ ১৯৯৩,
তখন আমি ক্লাশ থ্রিতে পড়ি। অজপাড়া গায়ের স্কুলে ২৬ মার্চ উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। আমি অংশ নেই নির্ধারিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায়। বক্তৃতার বিষয় “মুক্তিযুদ্ধ-১৯৭১” । এর সুবাদে আগের রাতে পরিবেশ পরিচিতি সমাজ বইয়ের ইতিহাস অংশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটুকু একের পর ঘটনা বর্ণনাসহ ধারনা নিই। প্রতিযোগিতায় বরাদ্ধ তিন মিনিটের জায়গায় পাচ মিনিট সময় নিলেও ফার্স্ট হয়ে যাই। সেই থেকে শুর হয়ে যায়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের চর্চা ও দেশের প্রতি ভালবাসার।

প্রতিদিনের এসেম্বলিতে জাতীয় সঙ্গীত গাইতাম খুব মনযোগ দিয়ে। যখন গাওয়া হতো “ও মা তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মত” , মনে মনে একটা তৃপ্তির ভাব নিয়ে আসতাম। যখন গাওয়া হতো, ” ওমা তোর বদনখানি মলিন হলে, আমি নয়ন, ওমা আমি নয়ন জলে ভাসি … ” , তখন মুখে একটা বিষন্নতার ভাব চলে আসতো। মনে হতো এই বুঝি কেদে ফেলবো।

যখন শপথ বাক্য পাঠ করা হতো তখন স্বপ্ন দেখতাম দিগবিদিক ছুটে চলছি দেশের জন্য, বিশ্বের দরবারে দেশকে একটি আদর্শ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। কখনো চোখের সামনে ভেসে উঠতো বঙ্গবন্ধুর ছবি, কখনো দেখতাম আমিই যেনো অস্থায়ী সরকারের তাজ উদ্দীন আহমেদ। প্রতিটা শপথ বাক্য আমার শিশু শরীরে এক অদ্ভুত শিহরন এনে দিতো।

যখন বীরশ্রেষ্ঠদের গল্প পড়তাম, নিজেকে মনে হতো ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। মনে হতো আমিই বুঝি আস্ত একটা বিমান উড়িয়ে নিয়ে আসছি দেশের জন্য। মনে হতো, আমি বুঝি মুন্সী আব্দুর রউফ। ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের সময় চোখের সামনে ভেসে উঠতো সালাম, বরকত, রফিকের কল্পিত মুখ। নিজেকে দেখতাম ঢাকার রাজপথে জাতীয় কোন দাবিতে প্লেকার্ড, ফেস্টুন হাতে এগিয়ে যাওয়া কোন এক যুবক।

১৬ ডিসেম্বর পালনের সময়, আমাদের গ্রামে একটা রেওয়াজ ছিল। আমরা সেদিন পার্শ্ববর্তী বাজারে স্কুল থেকে মিছিল নিয়ে যেতাম “বিজয় দিবস অমর হোক” শ্লোগান দিতে দিতে। বাজারে সবগুলো দোকানে গিয়ে দেখতাম জাতীয় পতাকা টাঙ্গানো আছে কি না। যেসব দোকানে পেতাম না, তাদেরকে কঠোর কথা শুনিয়ে আসতাম, একদল পিচ্চি পিচ্চি বালকেরা। নিজেদেরকে দেখতাম একদল মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, যেনো বিপক্ষদলকে হটিয়ে দিচ্ছি আমাদের সীমানা থেকে।

তারপর, ধীরে ধীরে সময় এগিয়ে যায়।
পঞ্চম শ্রেণি শেষে ৯৬ সালে ভর্তি হই শহরের স্কুলে। সেখানে দেখি ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর আরও বড় পরিসরে পালিত হয়। স্টেডিয়ামে প্যারেড আর ডিস্প্লে দেখে অভিভূত হয়ে পড়ি প্রথমবার। আর, সেখানেই প্রথম রাজাকার শব্দের স্বরূপ চিনতে পারি একটা নাটিকার মাধ্যমে। এর আগে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী এদেশের মানুষদের চিনতাম ” হানাদারদের দোসর” হিসেবে। জানি না এখনকার বইগুলোতে “রাজাকার” শব্দটা আছে কি না। আমাদের সময় “দোসর” শব্দটা ছিল। তখন থেকেই মূলত রাজাকারদের ঘৃণা করার শুরু। সেদিন একটা নাটিকায় দেখলাম, রাজাকাররা এদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তানাগুলো পাকিস্তানি বাহিনীকে চিনিয়ে দিচ্ছে, দেখলাম কার কার বাড়িতে মেয়ে মানুষ আছে, তা দেখিয়ে দিচ্ছে। এরপর থেকে এদের প্রতি ঘৃণা ভিন্ন অন্য কোন অনুভূতি কাজ করেনি।

তারপর,
আস্তে আস্তে দেশকে আরও জানার চেষ্টা করি। কলেজ পর্যায়ে দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকে জড়িয়ে পড়ি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে। কারণ তখন দেখি, অন্যান্য দলগুলোতে সন্ত্রাসের রাজত্ব। আর শিবিরের কথা না হয় নাই বললাম। কিন্তু অদ্ভুত বৈরী পরিবেশ (যারা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনেন, তারা জানবেন) আমাকে ছিন্ন করেছে কলেজ জীবনের এই সংগঠন থেকে। এরপর একা একা দেশ, জাতি নিয়ে ভাবনা আর কিছু কিছু পড়াশুনা।

কাদের মোল্লার যাবজ্জীবনের রায়কে কেন্দ্র করে যে গণজাগরণের সূচনা হয়েছে, তা মূলত রাজাকারদের প্রতি তরুণ প্রজন্মের প্রচণ্ড ঘৃণা থেকেই এবং দেশের বিরাট একটা অংশ সে আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। সারাদেশ হটাত করে যেনো জেগে উঠে বুঝতে পেরেছ- হায়! আমরা কেন এতদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনিনি? কেন আমরা এদেরকে প্রশ্রয় দিয়েছি? ফলে সারাদেশ গণজাগরণ মঞ্চের সকল কার্যক্রমের সাথে একযোগে অংশ নিয়েছে। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন গণজোয়ারের আর কোন নজির পাওয়া যায় না। একের পর এক দাবি আমরা আদায় করতে থাকি সরকারের কাছ থেকে।

আমাদের বিজয় দেখে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী নানান অজুহাতে গণগাজরণ মঞ্চকে কলুষিত করার চেষ্টা করেছে। প্রথম প্রথম বলতে শুনা গেছে, গণজাগরণ কেন সাগর-রুনি হত্যার বিচার চায় না, কেন হলমার্ক কেলেংকারির বিচার চায় না ও কেন বিশ্বজিত হত্যার বিচার চায় না? কিন্তু যখন প্রজন্ম উত্তর দিয়েছে এই বলে যে, তোমরা কেন যুদ্ধাপরাধের বিচার চাও না? তখন আমতা আমতা করে দূরে চলে গেছে। আবার ফিরে এসেছে, একের পর পর এক অভিযোগের তীর ছুড়েছে নতুন প্রজন্মের দিকে।

কিন্তু কোন কিছুতেই যখন পেরে উঠতে পারছিল না, তখন নিয়ে আসলো তাদের শেষ এবং চিরাচরিত অস্ত্র ধর্ম। ধর্মের দোহাই দিয়ে যেমন একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করাটাকে বৈধ দাবি করেছিল, তেমনি করেই গণজাগরণ মঞ্চের বিরোধিতা করাটাও ধর্মের দোহাই দিয়ে বৈধ করার চেষ্টা করে।

কেউ কি এমন কোন প্রমাণ দিতে পারেন যে গণজাগরণ মঞ্চ থেকে কোন দিন ধর্মকে নিয়ে কোন প্রকার নেতিবাচক বিবৃতি দেয়া হয়েছে? রাজীব হায়দারের মৃত্যু নিয়ে যে নাস্তিকতা বিতর্কের তৈরি হয়, তা কতটূকু সত্য, সেটা যুক্তিসঙ্গত বিবেচনার দাবি রাখে। ধরা যাক , একজন রাজীব নাস্তিকই ছিলেন, তাই বলে কি তার যুদ্ধাপরাধের বিচার চাইবার কোন অধিকার থাকবে না? না কি নাস্তিকদের জন্য ভাল কাজ করার কোন অধিকার নেই? যদি তাই হয়, তাহলে তো দেশ থেকে যত বৌদ্ধ আছে তাদের বের করে দিতে হবে। কারণ , বৌদ্ধ ধর্মমতে স্রষ্টা নামক কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে কটূক্তির যে অভিযোগ, তা অবশ্যই প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়। আর যদি প্রমাণিতও হয়, তাহলেও কি হাজার হাজার মানুষের প্রাণের দাবি মিথ্যে হয়ে যায়? এক রাজীবের জন্য তো আর এতবড় আন্দোলন গড়ে উঠেনি।

— চলবে ।

(গণজাগরণ সম্পর্কে কারো কোন অভিযোগ থাকলে কমেন্টে লিখুন। আমি যুক্তিসঙ্গত উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো।)

৪ thoughts on “আমার দেশভাবনা ও গনজাগরণ মঞ্চ (০১)

  1. অসাধারন একটা পোস্ট । চমৎকার
    অসাধারন একটা পোস্ট । চমৎকার কিছু মিশ্র অনুভুতি , আত্মপলব্ধি আর চেতনার সমন্বয়ে অসাধারন হয়ে উঠেছে লেখা টা । :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *