পরকাল সম্পর্কে খ্রীস্টধর্মের কতিপয় জটিল প্রপঞ্চ !

পরকাল সম্পর্কে খ্রীস্টধর্মের কতিপয় জটিল প্রপঞ্চ
:
জিহোভাস উইটনেসেস
————————————-
ওল্ড টেস্টামেন্টে গডকে জিহোভা বলা হয়েছে। জিহোভাস উটনেসেস প্রায়ই “পরকাল” শব্দটিকে মৃতদের আশা বোঝাতে ব্যবহার করে কিন্তু তারা অমর আত্মায় বিশ্বাস না করার যুক্তি হিসেবে একলেসিয়াসতেস ৯:৫ ব্যবহার করেন। ঈশ্বর কর্তৃক বিচারকৃত হওয়া কোন পাপী ব্যক্তিকেই পরকালের আশা দেয়া হয় না। যাই হোক, তারা বিশ্বাস করেন যে, আরমাগেডনের পর সৎ ও অসৎ উভয়েরই মৃতদেহের পুনরুত্থান ঘটবে, কিন্তু পাপী বা বিদ্বেষপূর্ণ ব্যক্তির পুনরুত্থান ঘটবে না। আরমাগেডনে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি এবং পুনরুত্থিত ব্যক্তিগণ ধীরে ধীরে স্বর্গপ্রাপ্ত হবেন। আরমাগেডনের পর যেসব পাপী অনুতপ্ত হবেনা, তাদেরকে চিরমৃত্যুর (অস্তিত্বহীনতা) শাস্তি দেয়া হবে।
:
ক্যাথলিক চার্চ
—————–
পরকাল সংক্রান্ত ক্যাথলিক ধারণা অনুসারে দেহের মৃত্যুর পর আত্মার বিচার হয়। ন্যয়নিষ্ঠ এবং পাপমুক্তগণ স্বর্গে গমন করেন, কিন্তু যারা পাপ করে অনুশোচনা না করেই মারা গেছেন তারা নরকে গমন করেন। ১৯৯০ এর দশকে ক্যাথলিক চার্চের নীতি বা ক্যাটেকিজম অনুসারে নরককে পাপীদের উপর বর্ষিত শাস্তি হিসেবে নয়, বরং ঈশ্বরের কাছ থেকে আত্মবর্জন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অন্যান্য খ্রিস্টীয় ধারার সাথে ক্যাথলিক চার্চের একটি পার্থক্য হল, ক্যাথলিক চার্চ অনুসারে যারা ঈশ্বরের করুণায় মারা যান কিন্তু তারপরও জন্মগত পাপ বহন করেন (অভিসিঞ্চন না হওয়ার কারণে) তারা পারগেটরি নামক একটি স্থানে গমন করেন এবং স্বর্গে গমনের জন্য শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান।
:
অর্থোডক্স খ্রিষ্টধর্ম
——————
অর্থোডক্স চার্চগুলো ঐচ্ছিকভাবেই পরকালের বিষয়ে কম কথা বলে, কারণ তারা সকল বিষয়েই, বিশেষ করে যেসব ঘটনা এখনও পর্যন্ত ঘটেনি সেসব বিষয়ে রহস্যের স্বীকৃতি দেয়। যিশুর প্রত্যাবর্তন, দেহের পুনরুত্থান এবং শেষ বিচার সহ যেসব বিষয় নাইসিন ক্রিড (৩২৫ খ্রিষ্টাব্দ) কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়, তার বাইরে গিয়ে অর্থোডক্সি স্পষ্ট করে তেমন কিছু শেখায় না। পশ্চিম দিকের খ্রিষ্টধর্মের মত না হয়ে এরা ঐতিহ্যগতভাবেই নন-ডুয়েলিস্ট এবং এরা স্বর্গ ও নরক নামের দুটো আলাদা স্থানকে আক্ষরিক অর্থে স্বীকার না করে একটি চূড়ান্ত নিয়তিকে স্বীকার করেন, যেখানে স্বর্গ নরক শব্দদুটো আক্ষরিক নয়, বরং আলঙ্কারিক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থোডক্সিতে শেখানো হয়, শেষ বিচার কেবলই ব্যক্তির স্বর্গীয় ভালবাসা ও করুণার সম্মুখীন হওয়া, কিন্তু ব্যক্তি কতটুকু রূপান্তরিত হয়েছেন বা কতটুকু স্বর্গীয়তা লাভ করেছেন তার উপরে নির্ভর করবে তিনি কেমন বা কতটুকু স্বর্গীয় ভালবাসা এবং করুণার সম্মুখীন হবেন। “তাই পরকালে যে অপরিবর্তনীয় এবং বিরামহীন বিষয়ের সম্মুখীন হতে হবে তা কেবলই ঈশ্বরের ভালবাসা, করুণা এবং মহিমা যা স্বর্গীয় পীঠস্থানগুলোতেও অনুপ্রবিষ্ট হয়ে আছে। আর মানুষের বিভিন্ন ধরণের প্রতিক্রিয়াই তাদের বিভিন্ন ধরণের অভিজ্ঞতার বহুরূপতার জন্ম দেয়।” যেমন সেইন্ট আইজাক দ্য সিরিয়ান বলেন, “যাদেরকে গেহেনায় (নরকে) শাস্তি লাভ করেন, তাদেরকে ভালবাসার চাবুক মারা হয়… ভালবাসার শক্তি দুইভাবে কাজ করে: পাপীদেরকে এটা যন্ত্রণা দেয়… তিক্ত অনুশোচনার মাধ্যমে। কিন্তু স্বর্গের পুত্রদেরকে আত্মাকে ভালবাসা তার আনন্দের মাধ্যমে উল্লসিত করে।”
:
এক্ষেত্রে, স্বর্গীয় ক্রিয়া সবসময়ই অপরিবর্তনীয় এবং সকলের জন্যই সমান ভালবাসা এবং কেউ যদি এই ভালবাসা নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে, তাহলে এই অভিজ্ঞতাটি ঈশ্বরপ্রদত্ত দণ্ড নয়, বরং তা ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছার কারণে একধরণের আত্মদণ্ড। অর্থোডক্সি তাই তাদের পরকালের মডেলের জন্য জন ৩:১৯-২১ এ বর্ণিত যীশুর বিচারের বর্ণনাকে ব্যবহার করে: “১৯- এবং এটাই বিচার: বিশ্বে আলো এসেছে, এবং মানুষ আলোর বদলে অন্ধকারকে ভালবাসে কারণ তাদের কৃতকার্যসমূহ মন্দ। ২০- যারা মন্দ কাজ করে, তাদের প্রত্যেকেই আলোকে ঘৃণা করে এবং আলোর সামনে তারা আসে না, যদি না তাদের কৃতকার্যসমূহকে প্রকাশ করা হয়। ২১- কিন্তু যে সৎ কাজ করে, সে আলোর পথে আসে, যাতে এটা স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে তার কৃতকার্যসমূহ ঈশ্বরের উদ্দেশ্যেই পালিত।” পরকাল সম্পর্কিত অর্থোডক্স চিন্তাধারাকে ফাদার থমাস হপকো এভাবে তুলে ধরেছেন, “এটা সঠিকভাবেই ঈশ্বরের করুণা এবং ভালবাসা যা পাপীকে পীড়িত করে। ঈশ্বর শাস্তি দেন মা; তিনি ক্ষমা করেন… এক কথায়, ঈশ্বরের করুণা সকলের উপরেই বর্ষিত হয়, তা ব্যক্তি পছন্দ করুক বা নাই করুক। আমরা যদি তা পছন্দ করি এটা স্বর্গ; আর যদি না করি, তবে এটা নরক। ঈশ্বরের সামনে প্রত্যেকেই নতজানু হয়। সবকিছুই তারই উদ্দেশ্যে কৃত। ঈশ্বর তাই পরিণামে সকলের কাছেই অসীম করুণা এবং নিঃশর্ত ক্ষমা নিয়ে আসবেন। কিন্তু ঈশ্বরের এই ক্ষমার দানে সকলে উল্লসিত হবে না, আর তাদের এই পছন্দই হবে তাদের বিচার, আর এটাই হবে তাদের দুঃখ এবং বেদনার স্বেচ্ছানির্বাচিত উৎস্য।”
:
অর্থোডক্সিতে এপোকাস্টাসিসও শেখানো হয়, যা বলে একসময় সকলকেই উদ্ধার করা হবে বা কষ্ট থেকে পরিত্রাণ দেয়া হবে। এটা খুব সম্ভব ওরিগেন এর দেয়া ধারণা, কিন্তু অনেক চার্চ ফাদার এবং সেইন্টও এটা মেনে নেয় যাদের মধ্যে নিসার গ্রেগরিও আছে, যাকে ম্যাক্সিমস দ্য কনফেসর ‘ইউনিভার্সাল ডক্টর’ বলেছিলেন এবং সেকন্ড কাউনসিল অব কনস্ট্যান্টিনোপল (৫৫৩ খ্রিষ্টাব্দ) যাকে কেবল “ফাদারদের ফাদার” হিসেবেই আখ্যায়িত করে নি, সাথে তার অর্থোডক্সিকে যথার্থ বলে নিশ্চিত করেছে, যেখানে ওরিগেনের ইউনিভার্সালিজমকে এটা মেনে নেয় নি কারণ ওরিগেন এর মত সেই উদ্ধারে আমাদের অস্তিত্বের পূর্ব অবস্থাতেই নিয়ে যাওয়া হয়, যা অর্থোডক্সি শেখায় না। ইউনিভারসালিজম বলতে ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষকেই (নরক থেকে) উদ্ধার করার ধারণাকে বোঝায়। বিভিন্ন বিশিষ্ট অর্থোডক্স ধর্মতাত্ত্বিক যেমন অলিভার ক্লেমেন্ট, মেট্রোপলিটান ক্যালিস্টোস ওয়ার এবং বিশপ হিলারিটন আলফেয়েভও এটা শেখান। যদিও এপোকাটাস্টাসিস অর্থোডক্স চার্চের কোন ডগমা বা নীতি নয়, এটা বরং একটি থিওলগুমেনা, তবুও এটা অর্থোডক্স চার্চগুলোর দেয়া শিক্ষাগুলোর চেয়ে কম গুরুত্বহীন নয়। মেট্রোপলিটান ক্যালিস্টস অয়ার বলেছেন, “সকলে অবশ্যই পরিত্রাণ পাবেন এটা বলা ধর্মবিরোধী, কারণ এটা স্বাধীন ইচ্ছা বা ফ্রি উইলের বিরুদ্ধে, কিন্তু সকলেই পরিত্রাণ পাবেন এই আশা করাটি বৈধ,” ঠিক যেমন চিরকালের জন্য শাস্তি পাওয়াও স্বাধীন ইচ্ছার বিরুদ্ধে।
:
সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্টস
——————————
সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্টস চার্চ শেখায়, পৃথিবীতে জীবিত থাকা অবস্থায় যে মৃত্যু হয় তা হল প্রথম মৃত্যু এবং এই মৃত্যু বিভিন্ন পাপী অবস্থার কারণে ঘটে, যেমন অসুস্থতা, বার্ধক্য, দুর্ঘটনা ইত্যাদি। এই মৃত্যু কেবলই আত্মার নিদ্রা। এডভেন্টিস্টগণ বিশ্বাস করেন যে, ব্যক্তির শরীর + ঈশ্বরের শ্বাসপ্রশ্বাস = একটি জীবন্ত আত্মা। জিওভাস উইটনেসেস এর মত এডভেন্টিস্টগণও বাইবেল থেকে নেয়া কিছু মূল অংশ ব্যবহার করেন যেমন, “জীবিতদের বেলায় জেনে রেখো তারা মরবে: কিন্তু মৃতরা কিছুই জানবে না, তারা আর কোন পুরস্কারও পাবে না; তাদের স্মৃতি বিস্মৃত হবে” (একলেসিয়াসতেস ৯:৫ কেজেভি)। এডভেন্টস্টগণ এও বলেন যে পাপের পরিণাম হল মৃত্যু এবং কেবল ঈশ্বরই অমর। এডভেন্টস্টগণ এও বিশ্বাস করেন যে, ঈশ্বর তাদেরকেই শুধু সেইসব উদ্ধারকৃতদেরকেই অমরত্বের অনুমোদন দেবেন যারা যিশুর দ্বিতীয় আগমনে পুনরুত্থিত হবেন। ততক্ষণ পর্যন্ত সকল মৃতই ঘুমন্ত অবস্থায় থাকবে। যখন যিশু দ্বিতীয়বারের মত আসবেন, সৎ ব্যক্তিগণ অক্ষত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবেন এবং তাদেরকে ঈশ্বরের সাথে সাক্ষাতের জন্য মেঘে নিয়ে যাওয়া হবে।
:
সৎ ব্যক্তিগণ এক হাজার বছর যাবৎ স্বর্গে জীবন যাপন করবেন, যেখানে তারা উদ্ধার হয় নি এমন ব্যক্তি এবং পতিত দেবদূতদের বিচারকার্য ঈশ্বরের সাথে বসে দেখবেন। যখন উদ্ধারকৃতগণ স্বর্গে থাকবেন তখন পৃথিবীতে মানুষ ও পশুপাখি বসবাস করবে না। কেবল পতিত দেবদূতরাই সেখানে জীবিত বসবাস করবে। দ্বিতীয় পুনরুত্থান হবে অসৎ ব্যক্তিদের যখন যিশু নতুন জেরুজালেমকে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে এনে স্থাপন করবে। যিশু সকল অসৎ ব্যক্তিকে জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন। শয়তান ও তার দেবদূতগণ অসৎ ব্যক্তিদেরকে নতুন জেরুজালেম শহরকে ঘিরে ফেলতে প্ররোচিত করবে। কিন্তু স্বর্গ থেকে নরকের আগুন ও এর জ্বালানিকে পৃথিবীতে ফেলা হবে। এতে জগৎ চিরকালের জন্য পাপ হতে মুক্ত হয়ে যাবে। একে বলা হয় দ্বিতীয় মৃত্যু। নতুন পৃথিবীতে ঈশ্বর উদ্ধারকৃতদের জন্য একটি চিরস্থায়ী আবাস এবং চিরকাল বাঁচার জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ দান করবেন যেখানে ইডেন পুনস্থাপিত হবে। এর ফলে মহাম বাদানুবাদের নিষ্পত্তি ঘটবে এবং আর পাপ থাকবে না। ঈশ্বর তখন যথার্থ ঐকতানে চিরকাল জুড়ে শাসন করবেন। (সূত্র : রোমানস ৬:২৩; ১ টিমোথি ৬:১৫,১৬; একলেসিয়াসতেস ৯:৫,৬; সালম ১৪৬:৩,৪; জন ১১:১১-১৪; কলোসিয়ানস ৩:৪; ১ কোরিন্থিয়ানস ১৫:৫১-৫৪; ১ থেসালোনিয়ানস ৪:১৩-১৭; জন ৫:২৮,২৯; রেভেলেশন ২০:১-১০; রেভেলেশন ২০; জেরেমিয়াহ ৪:২৩-২৬;রেভেলেশন ২১:১-৫; মালাচি ৪:১; এজেকিয়েল ২৮:১৮, ১৯; ২ পিটার ৩:১৩; ইসাইয়া ৩৫; ৬৫:১৭-২৫; ম্যাথিউ ৫:৫; রেভেলশন ২১:১-৭; ২২:১-৫; ১১:১৫)!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *