ইশ

১১ই জানুয়ারী, ১৯৫৯। স্থান পারসি ইন্সটিটিউট গ্রাউন্ড। কায়দে আজম ট্রফির সেমি ফাইনাল। করাচি এবং বাহাওয়ালপুরের প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ চলছে। আজ তৃতীয় দিন। গতকাল ছিল বিশ্রামের দিন। বড় ভাই ওয়াজির মোহাম্মাদ এসেছিলেন হানিফ মোহাম্মাদের কাছে, ডন ব্র্যাডম্যানের রেকর্ড কিন্তু ৪৫২রানের, ছোট ভাইয়ের গায়ে অলিভ অয়েল মাখিয়ে দিতে দিতে কথাটা জানিয়েছিলেন। । হানিফের রান তখন ২৫৫ নট আউট। নিজের পূর্বতন সর্বোচ্চ ২২৮ রান টপকে গেছেন। হানিফ মনে মনে হাসলেন, ৩০০ হয় কিনা দেখি পরের টা পরে।

১১ই জানুয়ারী, ১৯৫৯। স্থান পারসি ইন্সটিটিউট গ্রাউন্ড। কায়দে আজম ট্রফির সেমি ফাইনাল। করাচি এবং বাহাওয়ালপুরের প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ চলছে। আজ তৃতীয় দিন। গতকাল ছিল বিশ্রামের দিন। বড় ভাই ওয়াজির মোহাম্মাদ এসেছিলেন হানিফ মোহাম্মাদের কাছে, ডন ব্র্যাডম্যানের রেকর্ড কিন্তু ৪৫২রানের, ছোট ভাইয়ের গায়ে অলিভ অয়েল মাখিয়ে দিতে দিতে কথাটা জানিয়েছিলেন। । হানিফের রান তখন ২৫৫ নট আউট। নিজের পূর্বতন সর্বোচ্চ ২২৮ রান টপকে গেছেন। হানিফ মনে মনে হাসলেন, ৩০০ হয় কিনা দেখি পরের টা পরে।
সারাদিন ব্যাট করলেন। ডন ব্র্যাডম্যানের রেকর্ড ভাঙলেন। এখনও নট আউট। দিনের শেষ ওভার, বাকী আর মাত্র ২ বল, এর পরই তৃতীয় দিনের খেলা শেষ। হানিফের মাথায় তখন ঘুরছে, ৭০০ এর ওপর রান হয়ে গেছে, প্রথম ইনিংসে ১৮৫ রানে আউট হয়েছে বাহাওয়ালপুর। দ্রুত ডিক্লেয়ার করা দরকার, নয়তো ম্যাচ যেতা যাবে না। ওদিকে স্কোর বোর্ড দেখাচ্ছে তাঁর ব্যক্তিগত রান ৪৯৬। ২ বলে ৪ রান, করতে পারলে প্রথম বারের মত প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ৫০০ রানের স্কোর হবে।
ওভারের ৫ম বল হল। পয়েন্টে ঠেলে দিলেন। মিস ফিল্ড দেখে ভাবলেন ২ রান নেয়া যাবে,ওপারে যেতে পারলে আরেকটা বল খেলতে পারা যাবে। সেই বলে ২ রান নিতে পারলেই ৫০০, বড় ভাই ডিক্লেয়ার করতে পারবেন। হল না। রান আউট হয়ে গেলেন। ভাবলেন ৪৯৭ এ আউট হয়েছেন। তাকিয়ে দেখেন স্কোর বোর্ডে ৪৯৯। যে স্কোর বসাচ্ছিল সে একটু ধীরে চলছিল। যখন স্কোর বোর্ড দেখাচ্ছিল ৪৯৬ তখন আসলে তাঁর ৪৯৮। ‘ইশ, আমি প্রথম যখন স্কোর বোর্ডের দিকে তাকিয়েছিলাম তখন যদি জানতাম আমার স্কোর ৪৯৮, তাহলে আমি রানই নিতাম না—শেষ বলে হয়তো চেষ্টা করতাম ২ রানের।‘
৩৫ বছর পর, ১৯৯৪ এর ৬ই জুন, ব্রায়ান লারা ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে ইংলিশ কাউন্টি তে খেলতে গিয়ে ডারাহামের বিরুদ্ধে করলেন ৫০১। ক্রিকেট জগত সেই ‘ইশ’ থেকে মুক্তি পেল। প্রথমবারের মত কোন ব্যাটসম্যান এর ৫০০ রান।
ক্রিকেটের ইতিহাস ঘাটলে এমন অনেক ‘ইশ’ এর দেখা পাওয়া যাবে। ৪০ টেস্ট খেলা ভারতীয় ওপেনার চেতান চৌহান হচ্ছেন প্রথম এমন ব্যাটসম্যান যিনি ২০০০ এর ওপর রান করেছিলেন অথচ একবারও সেঞ্চুরির দেখা পান নি। দুবার আউট হয়েছিলেন ৯০ এর ঘরে, ৫ বার ৮০র ঘরে। একবার বলতে ইচ্ছে করছে না? ‘ইশ’
৩১সে জুলাই ১৯৫৬। ওল্ড ট্র্যাফর্ড টেস্টের ৫ম দিন। জিম লেকার পেলেন অস্ট্রেলিয়ার ১০ টি উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস গুড়িয়ে দিলেন ৮৪ রানে। টেস্ট ইতিহাসের প্রথম ‘পারফেক্ট টেন’। প্রথম ইনিংসে নিয়েছিলেন ৯টা। একটি উইকেট পান টনি লক। ‘ইশ’ ওটাও যদি লেকার পেতেন?
এই ‘ইস’ এখনও ‘ইশ’ রয়ে গেছে। হয়তো পূরণ হবে কোন একদিন।
বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের আমার দেখা সবচেয়ে বড় ‘ইশ’ ঘটে গেল কিছুদিন আগে। দিনটি ছিল ২২শে মার্চ ২০১২। শেরে বাংলা ন্যাশনাল স্টেডিয়াম মিরপুর। এশিয়া কাপ ফাইনাল। দুই প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। পাকিস্তান নির্ধারিত ৫০ ওভারে করেছে ৯ উইকেটে ২৩৬ রান। বাংলাদেশের প্রয়োজন ২৩৭।
শেষ ওভার। শেষ দুই বলে বাংলাদেশের প্রয়োজন বাংলাদেশের ৪ রান। ৫ম বলে আউট হয়ে গেলেন আব্দুর রাজ্জাক। ‘বোল্ড’ হয়ে আউট হলেন। ফলে অপর দিকে থাকা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ‘স্ট্রাইকিং এন্ড’ এ যেতে পারলেন না। শেষ বল খেলতে হল সাহাদাত হোসেনকে। দরকার ৪ রান। নিতে পারলেন একটি ‘লেগ বাই’। বাংলাদেশ হেরে গেল ২ রানে। ‘ইশ’
পৃথিবীর বহু ‘ইশ’ এর সমাপ্তি হয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড কখনও ৪০০ ছুঁতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ জেগেছিল। আন্টিগুয়া টেস্টের তৃতীয় দিন। তখন ব্রায়ান লারা স্যার গ্যারী সোবার্সের ৩৬৫ রানের রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলেছেন। এগিয়ে যাচ্ছিলেন ৪০০ এর দিকে। কিন্তু আউট হয়ে গেলেন ৩৭৫ এ। এরপর আবার আশা জেগেছিল পার্থে, ২০০৩এ। এবার ম্যাথু হেডেন।জিম্বাবের বিরুদ্ধে ৩৮০ করে আউট হলেন।
আর কেউ কি পারবে? প্রশ্নটা বেশী দিন স্থায়ী হয়নি।২০০৪ এর ১২ই এপ্রিল প্রথম ৪০০ রানের মাইলফলক ছোঁয়া দেখল টেস্ট ক্রিকেট। নায়ক ব্রায়ান লারা। আরেকটা ‘ইশ’ এর সমাপ্তি।
বাংলাদেশ ও পারবে তাঁর ‘ইশ’ এর সমাপ্তি টানতে। অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকি—ভাবি, এবার হয়তো খেলা শেষে বলতে হবে না ‘ইশ, একটুর জন্য’।

১১ thoughts on “ইশ

  1. ভাই আমি মুগ্ধ !!!!!!!! ছোট্ট
    ভাই আমি মুগ্ধ !!!!!!!! ছোট্ট একটা শব্দ ”ইশ !!” এই বিষয় টা নিয়ে পুরা ক্রিকেট এর ইতিহাস আর বর্তমান বিশ্লেষণ করলেন , কিন্তু প্রেক্ষাপট সেই ”ইশ !! ” থেকে গেল । লেখা টা পড়ে নিজের থেকে একটা শব্দ বের হল অস্ফুটে ”ইশ !! যদি আপনার মত লিখতে পারতাম !!””
    :salute: ব্রো…

  2. আপনি তো ভাই ভয়ঙ্কর লোক, যাকে
    আপনি তো ভাই ভয়ঙ্কর লোক, যাকে বলে Multi dimensional talent!!!! আরেক ভাবে বলতে গেলে “প্রতিভাবান খুনি” 😀 আমি একেবারেই খেলাধুলা ভক্ত না, বরং বলা চলে কোন খবরই রাখি না। খেলা বিষয়ক কোন লেখা কোনদিন পড়ে দেখেছি বলে মনে হয় না। কিন্তু আপনারটা কখন যে পড়ে শেষ করে ফেললাম, বুঝতেই পারলাম না!!! দারুন লিখেছেন, দারুন। লেখার শিরোনামটাও আলাদা প্রশংসার দাবীদার “ইশ”, অসাধারন। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম :মুগ্ধৈছি: :তালিয়া: চালিয়ে যান………

      1. অসুবিধা নাই, খালি প্রতিদিন
        অসুবিধা নাই, খালি প্রতিদিন খুন খারাবি না করলেই হয়। দিন-কাল খারাপ তো। লিখতে থাকুন। পাঠক তো সেটাই চায়, নাকি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *