পোকা সব মরে যাক(২য়)

“বলেছিলাম, ভীষণ কষ্ট পাবো, অনেক ঘৃণা করবো, কিন্তু দেখা হলে কি করতে পারি তা বলিনি। দু’দুবার চোখে পলক ফেলি, কতগুলো মানুষের মধ্যে থেমে যাই কিন্তু জানানোর সুযোগ পেলাম না।”
“তোমার শেষ চিঠি পেয়ে জানতে চেয়েছিলাম আবার দেখা হলে কি করবে। সে করানেই হয়ত সন্ধার অন্ধোকারে চৌরাস্তার ঠিক সেখানে অতগুলো কালো বোরখার মাঝে তোমার চোখেই চোখ পরে। বিশ্বাস কর তোমাকে চিনতে ব্যর্থ হইনি, কিন্তু চিঠিতে লিখেছিলে আর দেখা হবে না, তাই চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। শীতের সন্ধায়, কাপা কাপা শরীরে তোমার হাসিখুশি পথচলায় বিরক্ত হতে চাইনি।”
এটা ঠিক সেখানটায়, যেখানে অনেক বছর অাগে মেয়েটা লোকটাকে ডাক দিয়ে বলেছিল, “কোথায় যান? দাড়ান। বাড়ি আসেন না কেন? বাড়ি আসবেন কিন্তু”। তখন ও’র পরনে বোরখা ছিল না। দুপুরবেলা একা একা মাথা নিচু করে হেটে আসছিল, চারদিকে অনেক পরিচিত মানুষ। লোকটাকে দেখে আচমকা দাড়িয়ে যায়, এক হাতে ধরে রাখা বক্সটা যেন ছেড়ে দিচ্ছিল, আর ওড়নাটা মাথা থেকে আরেক হাতে নামিয়ে গলায় দিল। লোকটা কোন উত্তর না দিয়েই চলে যেতে চাচ্ছিল, কিন্তু মেয়েটা দাড়িয়ে থাকে। লোকটা একটু সামনে গিয়ে পিছন ফিরে বলে, আসছি এখনি, ঐ দিকেই যাব, তবে তোমার বাড়িতে না। লোকটা ও’র এই অাচমকা পরিবর্তনের কারণটা বুঝার চেষ্টা করতে থাকে।
মনে পরে মাত্র একটা দিন আগেও, ও’ নির্জন রাস্তায় লোকটাকে দেখে মাথা নিচু করে এড়িয়ে যায়। বেশ কয়েকবার ডাকলেও কথা না বলে ওড়না দিয়ে মুখ আড়াল করে চলে যায়। অথচ তার কয়েকদিন আগেও স্কুলে যাবার পথে সেখানটায় ও’ অপেক্ষা করত, লোকটাকে দেখে আনন্দে ছুটে আসত, কিছুটা পথ একত্রে হেটে চলাই যেন ও’র দাবী। পরীক্ষা শেষে নানা বাড়ি বেরাতে গিয়েছিল, কয়েক দিনের জন্য। আসার পর থেকেই কেমন যেন অচেনা, বেশ কয়েকবার দেখা হয়, কিন্তু ফিরেও তাকায় না। যাবার মোটেও ইচ্ছে ছিল না। পরীক্ষা শেষে, চলেন বলে দু’হাত তুলে সামনে দাড়িয়েছিল। নাছোড়বান্দার মত অাবদারও করছিল। লোকটাও রাজি, শুধু বলে, ‘গেলে কিন্তু আর আসতে পারবে না, আমি সাগরে ভেসে গেলে তোমাকেও ভাসতে হবে’। ও’র এক হাত লোকটার দিকে আরেক হাত তামান্না টেনে নিয়ে যাচ্ছে। লোকটার পিছনে দেয়াল আর ও’ রাস্তায় দাড়িয়ে। দুজনের মাঝ থেকে একটা মটর সাইকেল হয়ত যেতে পারত, কিন্তু তা ও’র পিছন দিয়ে চলে যায়। সেই সুবাধা কিছুটা সামনে এগিয়ে আসে। আরো কাছে টেনে নিতে লোকটা হাত বাড়ায়, ‘কাছে আসো, পিছনে গাড়ি তো’। ওমনি আরেকটা মটর সাইকেল এসে ব্রেক করে দাড়িয়ে থাকে। মেয়েটার বাড়ির কাছের বেশ পরিচিত মানুষ, বয়সে লোকটার সমান সমান। ও’র দিকে তাকিয়ে ঘার কাত করে ইশারা দেয়, যেন লোকটার কাছে আসে, পিকাপ বাড়িয়ে যেন বলতে চায় ‘কথা শুননা কেন?’ ও’ তখন চাকার সামনে, তবে অনেকটা এ পাশে। কিন্তু ঐ পাশে চলে গেল। https://youtu.be/1qK-wSpw-js তামান্না টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, ও’ আরেক হাতে পাঁচ আঙ্গুল ঘুরিয়ে ইশারা করছিল, আর বলছিল, ‘কাল থেকে কিন্তু আর পাবেন না’। লোকটা ‘দাড়াও’ বলে পা বাড়াতেই ও’ তামান্নার হাত ঝেড়ে দ্রুত হাটা শুরু করে, পিছন ফিরে আর চেয়েও দেখেনি। বিরক্তিতে দু’হাত ছেড়ে আবার একটা ঝাকি দিয়ে মানুষটা বাইক নিয়ে চলে যায়। প্রতিকূল রাজনীতির ধারায় হওয়া সত্বেও পরবর্তীতে এলাকার মানুষজন তাকেই কাউন্সিলর নির্বাচিত করেছিল। আর ও’র কাকা হেরে যায়। এটা মেয়েটারও জানা ছিল, শুধু নিজেদের না, বরং যারাই দু’জনকে একত্রে দেখত, তাদেরই মন ভাল হয়ে যেত। কিন্তু, সত্যিই কয়েকদিন পরে তামান্না লোকটাকে বলে, ‘হেই মিয়া, আপনি কোথায় ছিলেন, ও’ নানা বাড়ি চলে গেছে, যেতে চাচ্ছিল না, কত কান্না করছে’। লোকটা সেখানে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়, কিন্তু কিছু কিছু পথের কুকুর যেমন বীনা অনুমিতেই বিরক্ত করে, গা ঘেঁষে দাড়ায় তেমনি কিছু বখাটে লোকটার জীবনে ঢুকে পরে, নানা বাড়ি যাবার বদলে ঘটনাক্রমে উল্টো তাকে হাজতবাসী হতে হয়।

সেদিন বেরাতে নিয়ে না যাওয়া, নাকি ওভাবে চলে আসতে দেয়ায় ও’ রাগ করেছিল; নাকি অন্যকোন কারণ! যা হোক ও’র সেই আচমকা পরিবর্তনের কারণ বুঝার দরকার নেই। ও’র আমন্ত্রনে সাড়া দেয়াটাই জরুরী। ও’সেই মানুষ যে জীবনে সব থেকে বেশিবার আমন্ত্রণ করছে – চিন্তা করতে করতে লোকটা দ্রুত ফিরে চলে আসে।

তবে, এবারে অবশ্য একদিন নয় অনেক দিন অনেক কথা বলে আসা। রাস্তায় দাড়িয়ে আচমকা যখন বাড়ি যেতে বলে, তখন বেশি কথা বলা যায় না। এবার ফোনে, অালাপ, তাই অনেক কথা, অনেক অভিযোগ। সব বিচারেই লোকটা একাই দায়ী, তাকে কোন ভাবেই দায়ী করা যায় না। ‘তিন চার বছর একটা মেয়ে একা থাকে কিভাবে, আপনি কোন খোঁজ না নিয়ে পরলেন কিভাবে?’ ‘আমি কত জায়গায় কতজনকে জিজ্ঞাস করেছি? অনেক বলেছে মরে ভুত….. ‘ ‘মোাবাইলও করেছি, বলে, ‘চিনিনা”। ‘আপনি সত্যি ভাল অাছেন স্যার।… ‘ ‘আমি আংটি নিতে চাই না, ও’রা দু’একদিনে নাকি চলে আসবে।’ ‘আপনি কিছু বলেন। আজকেই চলে আসেন’। ‘আমার আঠারো বছর এখনো হয়নি, কাকা নির্বাচন করছিল তাই বয়স বাড়িয়ে ভোটার করেছে’। ‘আপনি এখনো বিয়ে করছেন না কেন?’ ‘আমি উনাদের আংটি নেব না, আমি কোনদিন বিয়েই করব না’। ‘আপনি আসেন….’। ও’র একেকটা কথা, একেকটা অভিযোগ শুনে লোকটা প্রথম দিনই বলেছিল, ‘আমার এখন কি করতে হবে? তুমি যা বলবে আমি তাই করব, আগেও বলেছিলাম, তুমি আমার মালিক, তুমি যা বলবে আমি তাই করব।’ তারপরে অনেক ফোন, অনেক কথা, অনেক অভিযোগ।

লোকটা দ্রুতই চৌরাস্তায় ফিরে এসেছিল, কিন্তু ও’ ততক্ষণে চৌরাস্তা থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিল, ডাক দিয়ে পৌঁছানো সম্ভব হত না। লোকটা যখন ও’দের বাড়ি পৌঁছে, দেখে ও’দের ঘর তালাবদ্ধ। কিছুক্ষণ বসে থাকে, আশেপাশে কেউ নেই। বেড়ার ওপাশে ফিসফিস কথা। একটু সামনে গিয়ে দেখে তামান্নাদের উঠানে তামান্না আর ও’ মোবাইলে কিছু একটা দেখছে। ছি ছি বলে ও’চলে আসতে চায়। কিন্তু তামান্না আটকে রাখে। লোকটা দূর থেকে ডেকে বলে, দাওয়াত করে ঘরে তালা ঝুলিয়ে রেখেছ কেন?
কে দাওয়াত করেছে? তামান্নার দিকে তাকিয়ে বলে, আমি নাকি উনাকে দাওয়াত করেছি! যান যান, আপনাকে লাগবে না।
আগে এদিকে আসো, সামনে এসে কথা বল।
ও’ চুপ করে থাকে, দেখি দেখি বলে মোবাইলটা হাতে নিতে চায়। কিন্তু তামান্না মোবাইল বন্ধ করে, ‘তুই যা। মোবাইল ধরছি জানলে আব্বু একদম….’
ও’ তামান্নাকে আস্তে করে বলে, দেখ বলদটা দাড়াইয়া আছে, ঘরে যাইয়া চুপকরে বসতে পারে, তা না। লোকটার দিক তাকিয়ে বলে, আপনি আসছেন কেন? যান।
লোকটা প্রচন্ড ক্ষেপে যায়, না পারছে অন্য বাড়ির উঠনে পা রাখতে, না পারছে চলে যেতে।
তামান্না বলে, স্যার, আপনি ওদের বাড়ির সামনে যান, ও’ চাবি নিয়া যাচ্ছে, দরজা খুলবেনে।
লোকটা সামনে গিয়ে আবার সিঁড়িতে বসে।
ওড়নার ঘোমটায় মাথা মুড়িয়ে স্যা স্যা করে এসে তালাটা খুলে আবার চলে যায়। লোকটার মন চায়, থাবা দিয়ে ও’কে ধরে একটু জব্দ করতে, কিন্তু চুপ করে বসে থাকে। এক মিনিট যেতে না যেতেই ও’ আবার আসে, একনজর তাকিয়ে ঘরের পিছনে চলে যায়। মোবাইল হাতে তামান্না পিছন পিছন এসে লোকটার সামনে অনেকটা দূরে দাড়িয়ে থাকে। অনেকক্ষণ কোন সাড়াশব্দ নেই। লোকটা গম্ভীর গলায় বল, ‘ও’ কোথায় গেল? দেখ তো কি করছে?’
ও’র কাছে আপনার এত কি?
এইপ, ও’র কাছে কী, তা তোমাকে বলব কেন? ও’কে ডাক।
আসবে আনে।
এতক্ষণ কি করছে বলে, দরজাটা ধরতে যায়।
তামান্না জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বলে, স্যারে কপাট খুলল কিন্তু।
এরি মধ্যে ভিতর থেকে দরজায় খিল দেবার আওয়াজ।
ও’ এখানে? দরজা খুলছ না কেন, তুমি একা একা কি করছ ভিতরে?
তামান্না বলে, আসতেছে একটা লাল জামা পরে, ঠোটের কাছে হাত নিয়ে ইশারায় বলে, ঠোটে লিপিস্টিক লাগাচ্ছে।
তাই? লোকটা দ্রুত দরজায় ধাক্কা দিবে করে, কিন্তু,
এই এই বলে তামান্না ও’কে সতর্ক করে, ‘জামা এখনো….’
ভিতর থেকে দরজা চেপে ধরে। খিল দেয়া তবে একটু জোড়ে চাপ দিলেই খুলে যেত।
এর মধ্যে হর্ণ দিয়ে একটি বাইক থামে, স্যার, চলেন বাজারে যাই।
যাবো, একটু পরে।
পরে আবার হেটে আসবেন কেন? আমার সাথেই চলেন।
সমস্যা নেই, ওদের সাথে একটু কথা বলছি। রোদ কমলে দেখি হেটে হেটে আসব।
সাইজ্জা ভাবি ঘরে? স্যারে বাইরে বসে আছে, দুয়ার খুলতে বল, বলে ও’র কাকা চলে যায়।
লোকটার কাছে মনে হয়, তিন জনেই হয়ত অন্যকোন জগতে সময় কাটাচ্ছিল। সব ভেঙ্গে আবার রৌদ্র, রাস্তাঘাট, লোকজন।
পিছনের দরজা থেকেই বের হয়ে এলো। ভাজ করা জামা পরতে সময় বেশি, তাই হয়ত পুরনো জামাটাই গায়ে, লিপিস্টিকও মুছে ফেলেছে কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।
কাছে এসো,
আপনি এখনো যাননা কেন?
কোথায়?
কোথায় যাচ্ছিলেন- ঐ দিকে, ঐ দিকে, ঐ দিকে, যান…
তুমি আমাকে পাগোলের মত ভালবাস? তাই না?
বড় বড় চোখে, এক হাত থাপ্পরের ভঙ্গিতে, কিছু না বলেই ঘুরে যাচ্ছিল, একটু থেমে যা-আন বলছি…
‘দাড়াও’ বলে লোকটা উঠে দাড়ায় আর বলে, মানুষজন আমাকে সম্মান করে, তাই; নইলে তোমাকে দৌড়ে ধরতাম।
ইস, উনি নাকি আমাকে ধরতে পারবে।
তামান্না বলে, ধরেন তো।
ইস, তুমি ও’কে ধরে নিয়ে আসো।
ইস, আমার ঠেকা পরছে বুঝি?
তোমার মোবাইলটা দেখি।
কি করবেন?
তোমরা কি করতেছিলে।
‘তামান্না’ দিস না।
‘তোর মোবাইল?’ বলে তামান্না লোকটার কাছে এগিয়ে আসে। কিন্তু মোবাইল না, দিয়ে বলে, আপনার মোবাইলে নাটক আছে, স্যার?
ও’ দূরে দাড়িয়ে বলে, নাটক না, নাটক না, সাপের ছবি।
তোমার সাথে আড়ি, তোমার কথা আমরা শুনব না।
ও’ মন খারাপ করে একা দূরে দাড়িয়ে থাকে।
কিছুক্ষণ পরে তামান্না বলে, ঠিকই তো। স্যার তো ঠিকই বলছে, তুই পাক্কা মেরে কথা বল কেন? তোর সাথে, স্যারের আড়ি। মোবাইলটাও লোকটার হাতে দিচ্ছে। এবার সত্যি কেঁদে ফেলবে বুঝি। হঠাৎ ফন ফন করে হেটে পিছনের দরজা দিয়ে ঘরে চলে যায়। ড্রয়রের মধ্যে কিছু একটা খোঁজ করছে। কিছুক্ষণ পর লোকটা তামান্নাকে বলে, দেখ তো কি করে।
এই, তুই আবার গলায় দড়ি দিস না।
লোকটা ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্ত হয়ে, এক থাপ্পর দিব বলে তামান্নাকে বকা দেয়, ‘আর কখনো এরকম দুষ্টামি করবে না’।
ও’ ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণ চুপ করে দাড়িয়ে থাকে। তারপরে, এসে বলে, স্যার আমার কাছে একটা মেমোরি কার্ড আছে, একটু দেখবেন ভাল কিনা? – কোন হাসিও নেই, চোখের দিকেও নজর নেই -যেন স্কুলের কোন রাগি শিক্ষকের সামনে দাড়িয়ে।
লোকটাও আবারো কাছে ডাকতে গিয়ে ডাকল না, বলল, ‘কার?’
পরে পাইছি।
তাহলে ওটা ভাল না।
একটু দেখেন।
নষ্ট তাই কেউ, ফেলে দিয়েছে। ওটা আমি দেখব না, ফেলে দাও।

মনে হল শেষ চেষ্টাটাও ব্যর্থ। খুব অপমানিত হয়েছে, এতটাই কষ্ট পেয়েছে যে রাগ পর্যন্ত করল না। আস্তে করে কার্ডটা মাটিতে ছেড়ে দিল। লোকটা চোখ তুলে একনজর তাকাল। কিছুটা ভয় পেয়ে যায় লোকটা, খুব বেশি আঘাত পেয়েছে। কিন্তু ও’র যে ভালবাসা তা কখনো হার মানবার নয়। কিছুক্ষণ পরে বলে, স্যার তাহলে, আপনার মেমোরিতে একটা সাপের ছবি নিয়ে আসবেন।
ছোট মানুষ সাপের ছবি দেখবে কেন, ঠোকর দিবে।
না, আমি না।
তাহলে?
মা, চাচি উনারা দেখবে।
আচ্ছা।
কি? আনবেন?
উনারা বললে আনব। এখন তুমি বল তোমার কি লাগবে।
অনেক্ষণ পর, একটু হাসি দিয়ে বলে, কিছু না। মিটমিট করে হেসে বলে, আচ্ছা, তখন দরজা ধাক্কা দিচ্ছিলেন কেন?
কখন?
এই যে, সে সময়?
ভিতরে যাবার জন্য।
তাইলে এখন যাচ্ছেন না কেন?
এখন গিয়ে কি করব, এখন তো তুমি বাইরে?
তাইলে তখন যাচ্ছিলেন কেন।
লোকটা এবার চোখ তুলে তাকিয়ে বলে, তুমি কাছে আসো তো।
কেন?
আসো বলছি।
কাছেই তো আছি।
ও’ সামনের সিড়িতে বসা, লোকটা দাড়াতেই ও’ উঠে হাসতে হাসতে একটু দূরে সরে সরে যায়।
আমি কিন্তু এবার সত্যি সত্যি দৌড়ে ধরব।
তামান্না ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু, ও’রা দু’জনেই চলে যায়।
কিছুক্ষণ পরে, পিছন দিয়ে এসে হঠাৎ করে ও’ পাশে বসে। হয়ত সেই রাজ্যেই রওনা করেছিল। কিন্তু হঠাৎ যেনে রাস্তা থেকে ছিটকে পরে। এক হাত ও’র কাধের উপরে অাগলে দিতে লোকটা হাত জাগায়, আর বলে, এবার বল তো, তুমি আমাকে….. এরি মধ্যে আরেকটি বাইক এসে পরে – ও’র আরেক কাকা; ‘চলেন বাজারে চলেন। সন্ধার সময় একা একা কি করবেন? ও’র মা’ কখন আসে ঠিক নাই’।
লোকটা দাড়িয়ে ও’কে ‘মা কখন আসবে’ জিজ্ঞাস করতেই, ‘ওই তো ঐ বাড়ি গেছিল, এখনি আসবে। আপনি বসেন’।
হেই! সন্ধার সময় ঘরে বসে থাকবে কেন? খাওয়াইছ কিছু?, এতক্ষণ বসাইয়া রাখছ যে?
মা’য় আসুক।
তার দরকার নাই, তুই তোর বুবুর ঘরে যা। স্যারে যাবেন নাকি থাকবেন?
ও’ পিছন ফিরে হেটে যায়। আসলেই কি খুব ধীরজ। হাস-মুরগি তো না, মানুষ; কিছুটা সময় তো লাগবেই। তবে, সেই রাজ্যে একবার পরিচয় ঘটলে হয়ত ভিন্ন কথা, কিন্তু ভালবাসা নিয়ে সেই রাজ্যের সাথে পরিচিত হতে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু পথ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল দু’জনেই। লোকটাও, বাজারে রওনা দেয়।
রাত তখন ১০টা, বাজারে রাখালের সাথে দেখা হয়েছিল। বাড়ি যাচ্ছে। বলেছিল, মা তো বাড়ি নেই, সকালে পশ্চিম কান্দা আত্মীয় বাড়ি গেছে, রাতে আসতে পারে, নাও আসতে পারে।

সেদিন, সেদিন আঙ্গুলটা জাগিয়ে যখন শক্তকরে বেঁধে দেবার জন্য বলছিল, তখনও লোকটার কাছে এটা স্পট ছিল যে, আদর না বরং একটূ বেশি ব্যথার অনুভুতিই যেন ক্ষুধা। লোকটাও হয়ত বুকের খা খা ভাবটা ও’র অাঙ্গুলের উপর কষে দিতে পারত, কিন্তু তাতে হয়ত ও’ নিশ্চিত বুকের উপর ঢলে পরত। বুকে বুকের অাকুতি অনুভব করে কিন্তু তারপরেও একেবারেই আলত করে বেঁধে দেয়। সেদিন মাঝরাতে হঠাৎ করে সত্য কিছু বলতে গিয়ে মিথ্যা কেন বলেছিল? বাড়িতে আসার পরেও, অভিযোগের বিষয়টা কেন ভুলে যায়, তা তো ভুলে যাওয়া সম্ভব না। ভালবাসার ঘাটতি, অবিশ্বাস নাকি এখনো সেই অাস্থার অভাব? লোকটা তার আপন জনের কাছে যে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়, তাতে অন্যদের কিছু যায় আসে না, কিন্তু মেয়েটার কাছে হয়ত চিরকাল অাস্থাহীন হয়ে থাকবে।
এতরাতে ফোন করেছ কেন?
খুব খারাপ লাগছে।
কেন কি হয়েছে?
তুমি আসবে কবে?
কি হয়েছে তা তো বল।
বললাম তো।
তুমি এরকম করছ কেন, বল তো কি হয়েছে? ঘুম আসছে না?
ঘুমাচ্ছিলামই তো।
তাহলে, স্বপ্ন দেখেছ?
না। ভাল লাগছে না, তুমি আসতে পারবে?
মাথাটাতা ঠিক অাছে?
না সব নষ্টা, বাড়ি থেকেই বের হয়ে যাব, দেখবেন।
তাহলে চলে আসো।
হাসি দিয়ে বলে, কিভাবে আসব?
সকালে বাসস্টান্ড গিয়ে টিকিট করে, বাসে উঠবে, চার-পাঁচ ঘন্টার মধ্যে চলে আসবে। এবার বল কি হয়েছে? মন খারাপ কেন?
মনখারাপ না। কপালই খারাপ।
কি অাজেবাজে কথা বলছ।
স্যার, সত্যি বলছি। আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।
আবার বললে? আচ্ছা ঠিক আছে, বিয়ের পরে তো যেতেই হবে।
কোথায়?
শশুড়বাড়ি যাবে না?
আমার কোন শশুড়বাড়ি নাই, আর হবেও….। আচ্ছা ঠিক আছে আপনি ঘুমান।
রাগ করছ? কি হয়েছে বল, ঘুম ভাঙ্গল কিভাবে?
আপনাকে বললে কি হবে?
আমি আসবো?
আসেন তো দেখি, আসতে পারবেন?
এই তো, এখন বল ঘুম ভাঙ্গল কিভাবে?
নিচে ঘুমাচ্ছিলাম…….., স্যার অামার ভালোই লাগছে না, মনেহয় এখনই ঘর থেকে বের হয়ে যাই – বলতে বলতে ও’ মোবাইল হাতে দু’এক পা হেটে গেল।
কি পাগলামী কথা বলছ, তুমি এখন কোথায়?
বাড়িতে।
বুবুর ঘরে নাকি তোমাদের ঘরে?
আমাদের ঘরে।
আর কে অাছে?
সবাই।
তুমি যে কথা বলছ, তোমাকে বকবে না?
বকুক।
তোমার মা’ কোথায়?
নীচে, ঘুমায়।
তুমি কি উপরে একা?
হুঁ।
একা একা ভয় করে না? মায়ের সাথে ঘুমাতে পারো না?
নীচেই ঘুমাইছিলাম, কিন্তু ভাইয়া এসে ঘুম ভাঙ্গানো শুরু করছিল।
ভাইয়া ঘুম ভাঙ্গাইছে? এখন কোথায় ভাইয়া?
জানিনা।
ভাইয়ার সাথে রাগ করছ? ঘুমাচ্ছে? আমি কথা বলব?
আমি নিচের খবর জানি না।
আচ্ছা বেশ ভাল। তুমি কি প্রতিদিন উপরে একা ঘুমাও?
না, বুবুর ঘরেই তো থাকি।
আজকে ঘরে ঘুমাচ্ছো?
আজকে ভাইয়া……..থাক স্যার আপনি ঘুমান। আপনার ঘুম নষ্ট করলাম।
একদম বকা দিব কিন্তু, আমি রাতে ঘুমাবো না, তুমি বল, কি হয়েছে।
কি?
ভয় করে?
করছিল, এখন করে না।
কেন?
এখন তো তুমি আছো!
তাই? আচ্ছা ঘুমাও।
না।
কী না?
আচ্ছা, তুমি আসবে কখন, বল?
আমি তো সাথেই আছি।
কথায় কথায় ঘুমিয়ে কাটায়, সকাল হয়ে যায়, ফোন কেটে মেসেজ পাঠায়, গুড মর্নিং।
সকাল এখনো হয়নি, আবার ঘুমাও – কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে ও’র মোবাইল বন্ধ হয়ে যায়।
কিছু সময় পরে লোকটা রাখালকে ফোন করে বিস্মিত হয়। আমি তো বাড়ি নেই, গতকাল দুপুরে, ঢাকা এসেছি।
বাড়িতে কে আছে?
সবাই?
মানে তোমার বাবাও?
না, উনি তো বাড়ি থাকে না।
তাহলে, তোমার মা’ আর বোনদের ভয় করে না?
না। লোক অাছে তো।
কে?
আছে চেনবেন না, আপনি।
চিনব না কেন, তোমার আত্মীয় না বন্ধু? তোমার সব অাত্মীওদেরকেই তো চিনি।
ও’কে চেনবেন না। আমার অফিসে কাজ করে।
এরকম অপরিচিত লোকের উপর ভরসা করা কি ঠিক?
অসুবিধা নেই। পরিচিত, কেন, কিছু শুনছেন নাকি?
হ্যা, কিন্তু তাতে তো তোমার বাড়ি থাকার কথা, জেনে ছিলাম তুমি বাড়ি আছ।
লোকটা আবার মেয়েটাকে ফোন করে, কিন্তু মোবাইল বন্ধ। বিকেল পেরিয়ে রাত পেরিয়ে পরেরদিন সকালে মোবাইল খুলে কিন্তু কল রিসিভ করে না। সন্ধার দিকে ফোন রিসিভ করে শুধু এতটুকুই বলে, আপনি আর আমাকে ফোন করবেন না, আমিও আপনার ঘুম নষ্ট করব না। মনে থাকে যেন।
লোকটা রাখাল আর ও’র মায়ের সাথে কথা বলে কয়েক বার, ও’র কথা জানতে চায়, ‘ এখন কোথায়?’ বলেছিল, ও’ বুবুর ঘরে থাকে।

লোকটা নিজেই চেয়েছিল, প্রশ্ন তুলবে, সবার সামনে ও’কে বিব্রত করাটা ঠিক হবে না। তাই চেপে যায়। তাছাড়া ও’দের দু’জনের কথাবার্তায় বৈরীতা নয় বরং ঘনিষ্ঠতাই স্পষ্ট হতে থাকে।
লোকটা তারপরেও কাছে ডাকে, ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি পরছে, এসো শক্ত করে বেঁধে দেই। মেয়েটাও কাছে আসে কিন্তু, কিন্তু কিছুক্ষণের স্বর্গীয় আনন্দের লোভে লোকটা ঘৃণিত পশু কিংবা ণড়কবাসিদের সাথে মিলে যেতে চায় না। সবাই জানে, বিচারে যখন মানুষ মরে তা মহৎ দায়িত্ব পালন, কিন্ত হত্যাকান্ড অত্যন্ত ঘৃণিত। কিন্তু ও’ মিথ্যে কেন বলল? সেডিউসমেন্টের অভিযোগ তুলে কোন নারি যদি আবার সেই সেডিউসরের সাথে ঘনিষ্ঠ থাকে, তা সবাই মেনে নিতে পারে না। অাসলেই কি সেডিউসমেন্টর অভিযোগ ছিল? নাকি অন্যকিছু? ধর্ম অধর্মের নানা প্রশ্ন লোকটাকে আটকে ফেলে। তাছাড়া, ও’ মানুষের হাতে ভয়ংকর জখম দেখেছে, ইমোনও বেঁচে নেই, মা’য়ের পছন্দের সেই জামাইয়ের কথাও ভোলেনি – একারণে কি ভালবাসার অাগুনে মুছে দিতে চায় সোহাগরূপী ছায়াগুলো? কিন্তু, ভালবাসা তো পাওয়ার ষ্টেশনে গাড়িতে তেল ভরার মত বিষয় না। ধর্ম-অধর্ম – সবথেকে বড় কথা ভালবাসা থাকে; বিরামহীন ঝর্ণা ধারার মত।
তার বয়স বেশি না। কথাই বলেনি, প্রথম প্রথম। ঘুম থেকে উঠেই নামাজ, গোসল, গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে-সবকিছু নিয়ম মাফিক। বারান্দাতেই ঘুমায়। ঘরে মহিলারা থাকলে অনন্যোপায় একা একা বৃষ্টিভেজা মাটিতে সিজদা দিয়ে নামাজ পড়ে।
মা’বলে, বারান্দায় আরেকটা বিছানা আর ফ্যান কিনতে হবে, রাখালকে বলেছি।
কেন?
ও’ই ছেলেটার জন্য।
এতদিন কোথায় ছিল?
এতদিন তো এই বিছানায় রাখাল আর ও থাকত।
আপনারা কি উপরে থাকতেন?
না, মধ্যের রূমে, আর উনি উপরে। কেন?
আগে তো সবাই উপরে থাকতেন, রাখাল আর ‘সফি’ ভিতরে থাকত।
‘সফি’ আছে নাকি? কবে চলে গেছে। কয়েক মুহূর্ত বিরাম নিয়ে বলে, উপরে একদম গরম থাকা যায় না।
হ্যা, তা তো হবেই। কিন্তু ও’ থাকে কিভাবে?
কিছু কিছু মানুষ বুঝি মায়েরও হিসাবের বাইরে থেকে যায়। ও’র মা মেহমানের কথা চিন্তুা করছে, কাজের ছেলের জন্য ফ্যান কিনছে অথচ নিজের বড় মে অসহ্য গরমে দিন কাটাচ্ছে। সোজা হয়ে দাড়ালে হয়ত মাথার উপরে একফুট, তারপরেই উত্তপ্ত টিন।
হঠাৎ করে মনে হল মহিলা কেঁপে উঠল, মাথা আর চোখে একটু ঝাকুনি। একটু শান্ত হয়ে ছটফট করে বলে, উনার গরম লাগে না, গরম লাগলে এততদিন বলত না, কখনো ছ্যামরি বলেই নাই…।
রাখালরা এখানে থাকুক, আপনি বরং ও’কে একটা ফ্যান কিনে দিন। আমি তো আগে জানতাম না, অামি বরং আজ থেকে বাইরে … বলতেই পর্দার আড়ালে ও’র চোখে চোখ পরে যায়। এই মাত্র ঘরে ঢুকেছে। বলে, ‘আপনি কিন্তু কোথাও যাবেন না, স্যার’। ও’র মা ও’র কথা শুনে ভিতরে চলে যায়, যাবার অাগে পিছন ফিরে বলে, ‘আপনি কি বাড়িতে যোগাযোগ রাখেন? আপনার মা’ কেমন অাছে, আসতে বলেন একদিন’।
এবার যখন ফোনে বারবার করে ও’ অাসতে বলছিল, তখন লোকটা বলেছিল, আমি কিন্তু তোমাদের বাড়ি থাকব না।
কেন?
মনে নেই? কি করতে?
কি?
আমাকে বারান্দায় রেখে, দরজা বন্ধ করে দিতে।
আমি কি করব, তখন তো ছোট ছিলাম।
জানতাম, ছোট ছিলে। মিথ্যা বলবে না, তুমি ছোট ছিলে ঠিকই, কিন্তু অামি শুনেছি, আমাকে বুড়া বুড়া বলতে অথচ আমার থেকে কম বয়সের, আমার থেকে বুড়াদের সাথেও একবিছানায়…….
আমার দোষ দিবা না, অামার কি দোষ? তুমি আসো। আর সেরকমটা হবে না।
কি হবে?
ভুলে গেছ?
কী?
বললাম দেখি?
কি বলেছ? আবার বল।
গতকাল কোথায় ঘুমাইছিলে?
কোথায় আবার, এইখানে।
পাশে কে ছিল?
পাশে আবার কে? আমি তো একা থাকি?
তুমি স-অব ভুলে গেছ? তোমাকে ঘরে ঢুকতেই দেব না।
কেন?
আমার পাশে এইখানে একজন ছিল।
তুমি কোথায়?
তোমার বুকের মধ্যে।
ও, আচ্ছা সেই কথা? ছিল বলছ কেন? এখনও তো আছি!
স্যার আমার কেমন যেন লাগে, খুব অস্থির লাগে, আপনি না এলে, বলেন আপনাকে আর কোনদিন ফোন করব না।
এলে তো আবার সেই বারান্দায়…..
আপনি উপরে ঘুমাবেন,
কোথায়?
আমার বিছানায়, কতবার বলেছি আর কি বলব।
কিন্তু,…. https://youtu.be/HD4IBjdohjM

৭/১২/২০১৮

আসার পরে কয়েকটা দিন কেটে যায়, একই সময় ঢাকা থেকে তিন চারটে ছেলে বেরাতে আসে। সুযোগ করে কথা বলতে পারত হয়ত, কিন্তু মুখে কোন কথা না বলে শুধু ইশারা। চলে যেতে চাইলে নিষেধ করে কিন্তু অন্য কেউ উপস্থিত হলে, যেন কিছুই জানেনা। সেই নামাজি লোকটাও চুপচাপ, মেহমান গেলে দু’একটা কথা বলে। ‘স্যার, ফজরের নামাজের সময় ডাক দিয়েন।’
আমি? আমি তো নামাজ পড়ি না।
এটা কেমন কথা? মুসলমান না?
মুসলমানের ঘরে জন্ম, কিন্তু নামাজ পড়ি না, আমার ধর্মীয় বিশ্বাস ভিন্ন।
মানে?
আচ্ছা, এসবের মানে বুঝতে হবে না। তুমি কি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়?
হ্যা, নামাজই তো আসল। এসব কিছুই সাথে যাবে না, কিন্তু নামাজ যাবে। আপনি নামাজ পড়েন না, এটা তো মানা যায় না।
মানার কথা বলছি না, প্রতিদিন নামাজ পড়লে, আজ আমাকে কেন ডাকতে বললে?
বললাম যদি আপনি উঠেন, আপনি না পড়তে পারলেও আমাকে জাগিয়ে দিয়েন। তাতেও সোয়াব অাছে। একটু সময় নিয়ে বলে, আমারই উঠতে কষ্ট হয়, অনেক সময় দেরী হয়ে যায়।
তেমনটা আমি করিনা, আমার সোয়াবের কথা চিন্তা করতে হবে না, তুমি তো বললে, শুধু নামাজই সাথে যাবে, তোমার নামাজ তুমি প্রতিদিন যেভাবে কষ্ট করে পড়, সেভাবেই পড়।
কিন্তু আপনি নামাজ পড়েন না, এটা মানা যায় না, সমস্যা কি?
মানতে হবে না। রাখাল কি নামাজ পড়ে?
উনারে আমি কি বলব, কাকিই ডাক নেয় না।
বুঝলাম।
কি?
সবাইকে সবাই বেশি ডাক নিতে পারে না, তাই না?
স্যারে কি যে বলেন। আপনি কোন জায়গার বয়াত হয়েছেন যে নামাজই ছেড়ে দিছেন?
কোন জায়গার বয়াত না, এটা আমার নিজের ব্যাপার।
আপনি শিক্ষিত মানুষ ডাক নেয়া যায় না, কিন্তু ‘বেনামাজি’ কেউ মানবে না।
সবারই ধর্মের দাওয়াত দেবার অধিকার আছে কিন্তু বাধ্য করার অধিকার নাই।
এটা ঠিক না, নামাজ পড়তেই হবে, আপনি বড় বড় আলেমদের জিজ্ঞাস করে দেখেন।
বেশি ডাক নেয়া ঠিক না, সবাইকে তো আর জান্নাত/বেহেশতে নিতে পারবে না, সর্গেও যাবে, নরকেও যাবে। মন্দ কজা, ভুল কাজ, অন্যের অনিষ্ঠ, অন্যায় পাপ না করলেই হয়।
নামাজ না পড়াটাই সব থেকে বড় পাপ, এর থেকে বড় আর পাপ হয়?…. বলে নামাজি লোকটা উঠে যায়।
এই গ্রামে এরকমই একজন মাদ্রাসা ছাত্রকে মাত্র দশ বছর আগেও লোকটা বলেছিল, আমার দৃষ্টিতে পাপ দু’প্রকার। একটা শুধুমাত্র বিধাতার সাথে আর আরেকটা অন্যদেরও ক্ষতি করতে পারে। প্রথমটা দয়াবান আল্লাহ্ চাইলেই মাপ করতে পারেন, কিন্তু দ্বিতীয়টা করবে বলে মনে হয় না, যতক্ষণ ক্ষতি পূরণে যথাযথ ভাবে ত্যাগ না করা হয়। পরীক্ষা কে ভাল দিল সেটা হচ্ছে বিষয়। পরীক্ষার সময় কেউ ভুল লিখতে থাকলে, তাকে বলা ঠিক না যে তুমি ভুল লিখছ, ভুল লিখতে পারবে না। দাওয়াত দেয়া ভাল, কিন্তু জ্ঞান-বুদ্ধি সবারই থাকে, নিজ নিজ জ্ঞান বুদ্ধি আর চেষ্টায় যে যেমন করবে তেমন ফল পাবে। পরীক্ষার হলে ভুল শুদ্ধ করে সঠিকটা লিখতে বললে শিক্ষকের কি হতে পারে, বুঝ? আবার নিয়মিত স্কুলে গেলেই যে সবাই পাশ করবে, তেমনটাও ঠিক না।
লোকটা নামাজি লোকটাকে বলে, দুনিয়াতে অনেক ধর্ম আছে, সব ধর্মের কথা জানিনা, কিন্তু তোমাদের অনেক কিছুই অামার কাছে ভুল মনে হয়।
কয়েকটা দিন যেতেই একটা বিষয় লোকটার নজরে আসে, নামাজী খেতে বসে চামচ দিয়েই ভাত নেয়, কিন্তু প্রতিবারই প্লেটে ভাত নিয়ে নিজের প্লেট থেকে হাতে করে একমুঠো ভাত উঠিয়ে আবার বড় ডিসে রাখে, যেখানে পরিবারের অন্য সবার অন্নও থাকে। লোকটার কাছে মনে হয় অবশ্যই তার কোন বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। সে যে ছুঁত না বুঝে, না মেনে, হারাম-হালাল বিবেচনা করা দলের লোক তা তো স্পষ্ট। কিন্তু ছুঁত লাগাচ্ছে কেন? হঠাৎ করে তার উদ্দেশ্যটা কি? নাকি সে সেই দলের লোক, নাকি সেই কিছিমের যারা অনেকে একত্রে একই প্লেটে খাওয়া পূণ্যের কাজ বা মিলমহব্বতের কাজ মনে করেন। মিলমিশ তো অবশ্যই, তা মানতেই হয়। কুকুরগুলো যখন একত্রে কোন মরা প্রাণী খায় তখন প্রায়ই ঝগড়া করে। কিন্তু তাদের মধ্যে অবশ্যই সেই পাশবিক অাচরন হয়ত নেই।

পরে একদিন, কাক্কু কি খেয়েছেন? – সুরেলা কন্ঠে জানতে চায়, বলে, আপনি তো দেখি পরেজগার মানুষ, সবই ঠিক অাছে, নবীর সুন্নতও মেনে চলেন, কিন্তু নামাজটা পড়েন না – এটাই তো খারাপ। শিক্ষা দীক্ষাও ভাল, তবে নামাজ না পড়লে কিছুই মানা যায় না।
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। সে নিশ্চিত বেয়াদবি করছে। তারপরেও লোকটা কিছু বলছে না, উত্তর গুলো বাড়ির লোকদের জানা আছে, তাই অপেক্ষা করে ও’দের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য। সে আবার জানতে চায়, খেয়েছে কিনা।
লোকটা বলে, আমি তো তোমার কাক্কু না।
তাহলে?
কিছুই না। ‘কাক্কু’ বলে কেন ডাকছ? কেউ ডাকতে বলেছে?
তাহলে কি ডাকবো?
কিছুই ডাকতে হবে না। তোমার মালিকরা তো সেরকম কিছু ডাকে না, তাই না?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, তাদের কথা আমি কি বলব। আমি মানতে পারি না, যেই হোক, যত শিক্ষিত হোক বেনামাজির সাথে থাকা যায় না।
এর মধ্যে রাখালও আসে, কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, স্যারে কি খেয়েছেন?
না।
ততক্ণণে, নামাজি টা একমুঠো ভাত তুলে রাখল।
রাখাল বলে, স্যার আসেন খেতে বসি।
খাওয়া কি ঠিক হবে?
কেন?
ইচ্ছে করছে না।
লোকটা নামাজীকে জিজ্ঞাস করে, তুমি কোন দল সমর্থন কর?
স্যার, এটা কেন জিজ্ঞাস করলেন?
কারণ তো অবশ্যই আছে, কিন্তু তোমার জানাতে কি সমস্যা আছে।

আসলে আগের কয়েকজন প্রকাশ্যেই বলত, ‘আমি কিন্তু রাজনীতি করতাম, এখন পরিস্থিতির কারণে চাকরামি করি’।

সে উত্তর দেয়, ‘সবাই তো নৌকা’।
রাখাল, রাখালের চাচা, ভাই-বোন, বলতে গেলে সবাই নৌকার ভক্ত, তা আমি জানি, কিন্তু তোমার কথা জানতে চাচ্ছি।
আমিও নৌকা।
তুমি কি বঙ্গবন্ধুকে মানো না।
মানবো না কেন? উনিই তো নৌকার মালিক। রাখালও হেসে দিয়ে বলে, বঙ্গবন্ধুই তো আসল।
লোকটা তাকে জিজ্ঞাস করে, বঙ্গবন্ধু কি জীবনে কোন ভুল করেছেন?
তা আমি জানবো কিভাবে?
তোমার জানা মতে কোন ভুল?
রাখাল বলে, তা আমরা জানবো কিভাবে, আপনারা বড়রা যারা দেখেছেন তারা বলতে পারেন।
উনার মৃত্যুর পরে আমার জন্ম, কাজেই সেই সৌভাগ্য আমার হয়নি।
আপনিই জানেন না, আমরা জানবো কিভাবে?
আমার জানা মতে তিনি কোন ভুল করেননি। তিনি নির্যাতন বন্ধের জন্য, মানুষের স্বাধীনতা, অধিকারের জন্য যা করেছেন ঠিক করেছেন, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
তা তো সবাই জানে, সবাই মানে।
উনার অনেক ছবি তোমরা দেখেছ, কিন্তু তিনি নামাজ পড়ছেন – এরকম কোন ছবি দেখেছ?
তারা একে অপরের চোখের দিকে তাকায়, নামাজি লোকটা বলে উঠে, নামাজ না পড়লে উনাকেও মানা যায়….
লোকটা থামিয়ে দিয়ে বলে, তিনি এই দেশের স্থাপিত, জাতির পিতা- তিনি ভুল করেননি। নামাজ না পড়ে থাকলেও ভুল করেননি। বিধাতা কি মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল? নির্যাতনের পক্ষে ছিল? এইদেশ-মাটিকে আমি মানি বলেই উনার প্রতি কৃতজ্ঞ এবং উনাকে মেনে চলি।
রাখাল চুপ করে থাকে।
লোকটা আবার বলে, অামি কিন্তু নিশ্চিত জানিনা, তবে বঙ্গবন্ধুর বইতে এক জায়গায় যেমনটা লেখা আছে তাতে কোন এক নামাজের ওয়াক্তে কয়েকজন সঙ্গীর নামাজে যাবার কথা লিখেছেন কিন্তু তিনি নিজেসহ অন্যরা নামাজ পড়েছিলেন কিনা তা স্পষ্ট না। তাছাড়া সেরকম কোন ছবিও আমার চোখে পরেনি কোথাও। তুমি ঠিকই বলেছ বড়রা হয়ত বলতে পারবেন। কিন্তু আমি ব্যক্তিগত ভাবে উনাকেই মানি, নামাজ না পড়লেও মানি, তিনি ভুল করননি। নামাজে তোমরা যে সুরা পাঠ কর তার অর্থ জানো?
কেন?
তাহলে আমার ধরনা অনেকেই ভিন্ন কিছু বলতে। রাখালের দিকে তাকিয়ে বলে, ৮/১০ বছর আগে নিজেই বলেছিলাম, কেউ ইজ্জত রক্ষার জন্য বাড়ি বিক্রি করে আবার কেউ ইজ্জত বিক্রি করে বাড়ি করে। সঠিক ধর্ম যারা ইজ্জত রক্ষা করে চলে তাদের সাথে তা তারা নোমো (তেমাদের ভাষায়) হলেও, আর যারা সতীত্ব টিকাতে পারে না, তারা নামাজী হোক আর হাজ্বি হোক আমি তাদের ধর্মকে নোংরা মনে করি।
রাখাল উঠে ভিতরের রুমে যায় আর নামাজি লোকটা বলে, যত যাই বলেন, আমার মনে সায় দেয় না। পাপের শাস্তি অাল্লাহ দিবে, কিন্তু সব মাখলুকেরই কলেমা পড়তে হবে, নামাজ আদায় করতে হবে -এটাই ইসলামের কথা, নবীর খেলাফত।
অন্যধর্মের মানুষরা কেন কলেমা পড়বে?
বুঝলে তো অবশ্যই পড়ত, তারা তো শয়তানের প্রলোভনে ভুলে আছে, তাই বুঝে না। ইসলামের উপর কোন ধর্ম নাই। হিন্দুরা তো মুর্তি পুঁজা করে, যা একেবারে শিরক -যার কোন ক্ষমাই নেই।
যারা শয়তানের প্রলোভনে ভুলে অাছে তারা শয়তানি করে, অন্যের অনিষ্ট করে, কুৎসা রটায়, দুর্বলদের উপর জোড় খাটায়। আবার তারা শক্তিশালীদের বশে থাকে – এমনকি অন্যায় বা পাপে লিপ্ত থাকলেও – সেটাও একরকম শিরক মনে করি। যাহোক তোমাদের সাথে এসব নিয়ে বেশি কথা বলতে চাই না।
নামাজি লোকটা বলে উঠে, তা ঠিক, কথায় কাজ হয় না। কপাল দোষে অনেকে মরেও, ইহকাল পরকাল সব হারায়। আবার, বিধর্মীরাও ঈমান এনে নবীর খেলাফত পায়।
কিছুক্ষণের জন্য, ঈমান, খেলাফত, নবী, নামাজ,… এ সমস্থ কথা রেখে, চিন্তা করে দেখ, কারা অন্যায় করছে, মিথ্যা, দুর্নীতি, ছলনা, ধর্ষণ, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, ব্যাভিচার, বেয়াদবি, কুৎসা রটানো, দুর্বলের হক নষ্ট, নির্যাতন … তারা যারাই হোক তারা এবং তাদের ধর্ম খারাপ। আমি মনে করি মানুষদের সঠিক পথে সঠিক রাখার জন্যই ধর্ম, পাপ-মুক্ত থাকা আর পাপ মুক্ত করার জন্যই ধর্ম। কেউ অন্যায় করলে শুধু প্রশ্ন না শাস্তি দেয়াটাও ধর্ম। আমি যদি চুরি করি, তবে আমার নবী চোরের নবী। কাজেই নিজেকে সঠিক রাখাটাই ধর্মের কাজ। আবার নিজেকে ঠিক রাখলেই চলে না, ছোটদের – যেমন ছোট ভাই-বোন, সন্তানদের অপকর্মের দায়ভারও নিজেদের কাধে আসে। তবে, আমার অজ্ঞতা বা উদাসীনতার কারণে অন্য একজনের অন্যায় পথে, পাপের পথে চলাটা গ্রহনযোগ্য হয়ে যায় না। আমি দায়ী হতাম যদি অামি অভিভাবক হতাম বা তার দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হত। মনেকর, তুমি দরজা খুলে ঘুমিয়ে আছ, তাই বলে অন্যের জন্য চুরি করাটা যায়েজ হয়ে যায় না আর চোরদেরও মাপ করা যায় না। চোরের চুরির পক্ষে নয় বরং চুরি বন্ধের চেষ্টা করা প্রয়োজন।
‘আসলে অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়।’
‘হতে পারে, অনেকে নিয়তির কথাও রলে, কিন্তু সে জন্য অন্যায়কারিদের ক্ষমা বা প্রশ্রয় দেয়া ঠিক না।’
লোকটা ভাবে, যারা অশিক্ষা, অজ্ঞতা বা অসহায়ত্বকে দায়ী করেন মেয়ে সন্তানদের পাপের পথে যাবার জন্য, তাদের অবশ্যই চিন্তা করা প্রয়োজন তারা সেই নোংরা অভিভাবক আর সুবিধাভোগী পাপীদের অাড়াল করে পাপের পথকে সুগম করছে কিনা? নির্যাতিতাদের অনিষ্ঠ করছে কিনা? আর নির্যাতনকারীদের পক্ষে থাকছে কিনা? নিয়তির কথা অনেকে বলে, তাই মরা মানুষ জেতা করার দাবি করিনা, তাই বলে খুনিদের আড়াল করা নয় বরং ফাঁসি দাবি করি, আবার ক্ষতিগ্রস্তদের পুনরুদ্ধার।
‘স্যার কি তাহলে নামাজ ছেড়ে দিতে বলেন?’
আমি তোমাকে কিছুই বলছি না, যার ধর্ম তার কাছে, আমার ক্ষমতা থাকলে কে কি করছে তা বিচার করতাম।
রাখাল আবার এসে বসে।
নামাজি লোকটা বলে, কোরআন এর উপর কোন সত্য নাই, ইসলামের উপর কোন ধর্ম নাই।
তা তোমাদের বিশ্বাস, আমি মানতে বাধ্য নই। তারপরেও বলি, ধান চাষ করতে শুরুতেই লুঙ্গি গুটিয়ে বাঁধে মানুষ, কিন্তু শুধু তাতেই ফসল ফলবে না। সূরা আল-মুমিনুন অর্থ বাংলায় যেভাবে লেখা আছে তাতে
সূরা আল-মুমিনুন আয়াত ১
মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে
সূরা আল-মুমিনুন আয়াত ২
যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-নম্র;সূরা আল-মুমিনুন আয়াত ৩
যারা অনর্থক কথা-বার্তায় নির্লিপ্ত,সূরা আল-মুমিনুন আয়াত ৪
যারা যাকাত দান করে থাকে
সূরা আল-মুমিনুন আয়াত ৫
এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে।
৬……….
-এসব কোরআনের আয়াত, আমার কথা নয়। কিন্তু এটা বুঝি শুধু নিজের সেই অঙ্গের পর্দা রক্ষা নয়, অন্যের পর্দা হরণ না করা হরণ করতে বাধ্য করা বন্ধ করা, এবং যারা হরণ করে বা করতে বাধ্য করে তাদের শাস্তি দানও সঠিক ধর্মীয় দায়িত্ব। যারা প্রথম কাজকেই বড় মনে করে সেখানেই আবদ্ধ তারা মূলত: সকল নোংরামিতে ডুবন্ত। হাজি হোক বা নামাজি হোক বিয়ে ছাড়া সতীত্ব হারানো নারী ও তা গোপনে মেনে নেয়া অভিভাবকদের থেকে সতীত্ব সম্পন্ন মেথর নোমো পরিবারের নারীর ধর্মও শ্রেয় মনিকরি। কুকুর বা সেরকম পশুর সাথে সমাজের মানুষের অনেক পার্থক্য – তাদের পরস্পর সম্পর্কের জন্য হয়ত বিয়ে, সম্মতি, সামাজিক মতামত, কাবিন, সাতপাক – এসবের প্রয়োজন হয় না, কিন্তু মানুষের???? নামাজিদের কথা হয়ত ভিন্ন, কিন্তু জ্ঞাতসারে কেহ সেরকম নির্যাতনের শিকার হলে বা শিকার হয়ে পাপের পথে থাকলে, সত্য ধার্মিকদের অনেক কিছুই করণীয় থাকতে পারে, তারা অন্তত লুঙ্গি গুটিয়ে ফসল অাসা করতে পারে না। তোমরা তো তেমন কিছু বলনি, কিছু নামাজি ও জামাতিদের মুখে এমনও শুনেছিলাম যে, পুজামন্ডব বন্ধ করতে হবে, মুর্তি, স্টাচু ভেঙ্গে ফেলতে হবে, নইলে নামাজ হয় না। কিন্তু, সনাতন ধর্ম সম্পর্কে যেরকমটা শুনেছি তাতে, দুর্গা পুজায়, সেরকম কোন নির্যাতিত নারীর বাড়ি থেকে মাটি সংগ্রহ করা নাকি অাবশ্যক। এর অর্থ এমনটাই মনে হয়, যে পাপ বন্ধ করার জন্যই ধর্ম। যদি তেমনটা সত্যই হয়, তবে বলা যায় যদি পাপ না হত বা পাপ বন্ধ করা যেত তবে অশুর নিধনে দুর্গা মায়ের প্রতিমূর্তি গড়তে পারত না আর দুর্গা মা’কেও আসতে হত না।
সমাজে অনেক ধর্মের মানুষ থাকতে পারে, নাস্তিকও থাকতে পারে, কে ভাল কাজ করে, কে খারাপ সেটা হচ্ছে বিষয়। কিন্তু, মুসলমানের সাথে বেনামাজি, নাস্তিক হিন্দুরাও থাকতে পারে, আবার হিন্দুর ঘরেও নামাজী থাকে। কিন্তু আমার অন্যায়কারী, পাপী, কুৎসাকারীদের সাথে থাকতে অস্বস্তি লাগে।
রাখাল না খেয়ে উঠে যায়। আর লোকটা সগিরের একটা সাইকেল নিয়ে বাজারে যায়, ফেরবার পথে সেই রেষ্টুরেন্টে খেতে বসে।
ও’ফোন করে বলে, আমারা বসে আছি তোমার জন্য।
মাত্র তিন দিন হল, ও আর কাজলী ফেল করা বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেবার জন্য লোকটার কাছে পড়তে বসছে।
এসে কি হবে, তোমরা তো আবার ফেল করবে। টেক্সট
তাইলে তুমি আসো না কেন?
এসে কি হবে?
পাশ করায়ে দিবা।
ইস, তুমি তো আলরেডি ফেল করেছ….

১৫/১২/২০১৮

ভাল হয়েছে, অাসতে কতক্ষণ লাগবে তাই, বল।
মোটেও ভাল হয়নি।
কি?
ফেল করলে কেন?
কোথায় ফেল করলাম? আমি নাকি ফেল করছি, পরিক্ষার এখনো অনেক দেরি আছে। আপনি না পড়াইলে বুঝি পাশ করব না, দেখবেন ঠিকই পাশ করব। আসতে কতক্ষণ লাগবে, বলেন?
দশ মিনিটে আসতে পারবে।
মানে?
এবার কিন্তু গতবারের থেকে কঠিন হবে, সামনে আরো কঠিন।
তা জানি? তুমি দশ মিনিটে আসবা কিনা, বল।
আমি আসব কেন? তুমি কি জানো, তাই বল।
ভয় দেখাবেন না, বুঝলেন।
ভয় না, সত্যি বলছি পড়াশুনা কর, নইলে কিন্তু ১০০% পাশের হারের চিন্তার সুবাধে তোমার পাশের সুযোগ নেই।
মানে?
আমাদের সময় ২৫ – ৩০ ভাগ পাশ করত। সবাই পাশের যোগ্য না। শতভাগ পাশের যোগ্য করার চিন্তা না করে যেভাবে পাশের হার বেড়েছে তাতে পাশ করার যোগ্যতা অনেকই হারিয়েছে। আমি যোগ্যতা নিশ্চিত করার পক্ষে, তাই পাশের হার অনেক কমতে পারে।
আপনি বেশি কথা বলতেছেন। আসবেন কখন বলেন।
ঠিক বলেছ। পাশের হার ১০০% হোক বা কমে ১০% হোক, তুমি পরিক্ষায় ফেল করলে আমি খুব খুব খুশি।
কেন স্যার, আপনি এরকম বলছেন কেন?
তুমি তো খালি ফেল কর, পরিক্ষায় ফেল করলে যদি সত্যি সত্যি পাশ করতে পারতে!

সেই ছোটবেলাতেও পড়তে বসেছিল লোকটার কাছে, অনেক অাগ্রহ নিয়ে। কিন্তু মাত্র তিন দিন পরেই পড়া বন্ধ। বিদ্যুৎ তখনো ওদের বাড়ি পৌঁছয়নি। হ্যারিকেনের টিম টিমে আলো। সোলার বাতি ছিল, কিন্তু তা জ্বালায়নি। ও’র মা প্রদীপ হাতে এসে বলে, ও’রে রেখে গেলাম, বেশি আস্কারা দিবেন না, একদম পড়তে চায় না। লাঠি আছে? নাকি একটা দিয়ে যাব?
আপনি চিন্তা করবেন না, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
সবাই তো কয়, কিন্তু আমি তো দেখি, দিন দিন…।
‘কি হইছে দিন দিন, আমি বুঝি পড়ি না?’
শুনছেন, ও’র কথা শুনছেন? -এক থাবর দিব বেহাংরা!

লোকটা কিছু বলার সুযোগ পায়নি, মেয়েটা ও’র মায়ের আচল ধরে দাড়ানো ছিল। রাগ করে ভিতরে চলে যায়। প্রদীপ হাতে ও’কে ধাওয়া করতে এক পা এগিয়ে যায়, কিন্ত না গিয়ে পিছন ফিরে লোকটাকে বলে, থাক স্যার ও’রে পড়ান লাগবে না, আপনি যান, কোথায় যাইতে ছিলেন!
লোকটা ও’র নাম ধরে ডাকে, ‘বই নিয়ে, তাড়াতাড়ি এসো’।
মা’ কোন কথা না বলে বাইরে চলে যায়। ঘরের মধ্যে প্রদীপটা জ্বলছে, তবে নিভু নিভু। খুট খুট শব্দ। কিছুক্ষণের মধ্যে অন্ধকার -প্রদীপ নিভে যায়। লোকটা বলে, ‘কি হল? না পড়লে না পড়বে অন্ধোকারে কি করছ? প্রদীপ নিয়ে এসো, জ্বালিয়ে দেই’।
টেবিলের উপর হ্যারিকেনটা। ভিতরের ঘর থেকে টেবিলের দূরত্ব মাত্র এক কদম। হাত বাড়ালেই পেতে পারে। লোকটা আলো একটু বাড়িয়ে দিতে লাগল, এমন সময় হুট করে পিছন দিয়ে এসে ছোবল মেরে হ্যারিকেনটা ভিতরে নিয়ে যাচ্ছে।
‘দাড়াও, এটা নিয়ে যাচ্ছ কেন?’
কোন কথায়ই শুনলো না।
‘আমি কি অন্ধকারে বসে থাকব? আমি বাজারে চলে গেলাম কিন্তু; চলে যাবো? ভুতে ধরবে কিন্তু।’
অত সোজা না।
‘তাহলে আমি চলে গেলাম’ বলে লোকটা উঠে দাড়ায়।
এক হাতে হ্যারিকেনটা ঝুলিয়ে বেশ বড় মানুষী মুড নিয়ে পাশে এসে দাড়ায়। টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কানটা যেন লোকটার দিকে। ‘আপনি কি চোখে দেখেন না?’
লোকটা বলে, ‘আলো নিভে যাবে তো, আলোটা বাড়াও।’
কোন কথা না বলে আরো একটু সোজা হয়ে দাড়িয়ে হ্যারিকেনটায় দোল খাওয়াচ্ছে। বুক জুড়ে ও’র ওড়না ঝুলানো – এই মাত্রই প্রথম পরেছে। ‘আপনি কি অন্ধ? বই তো এখানেই’ -বলে হ্যারিকেনটা ধপ করে টেবিলে রাখে। যতটা জোড়ে রাখে তাতে আলোটা নিভে যাওয়াই স্বাভাবিক ছিল।
‘সরি, আমি তো দেখতে পাচ্ছি না, আলোটা একটু বাড়িয়ে দিবেন?’
এক নজর তাকিয়ে একটু হেসে উঠবে বুঝি, কিন্তু চোখে চোখ পরে যায়; আর ওমনি আলোটা ধপ করে বাড়িয়ে দিল – কালো ধোয়ায় ঢেকে যাচ্ছে চিমনি।
‘তুমি কি বই খোঁজ করছিলে নাকি ওড়নাটা?’
মানে?
ওড়নাটা তোমার?
তা দিয়ে আপনার দরকার কি? কি পড়াবেন পড়ান।
আজকে আমি পড়াব না।
কেন?
তুমি পড়াবে।
মানে?
প্রথম দিন তো, তাই। আজ তুমি আমাকে পড়াও।
মানে?
এত মানে মানে কারছ কেন!, মানে, তুমি পড়াও, মনে কর আমি তোমার ছোট, তোমার কাছে পড়তে এসেছি।
পড়্…
কি?
হেসে দিয়ে বলে, আমি কি পড়াব, স্যার?
তোমার যা ইচ্ছে তাই।
দেখছো! কেমন লাগে, আপনি পড়াবেন তা না।
পড়াব তো, কিন্তু এখন তুমি পড়াবে। বল কি পড়ব?
পড়েন তো এখানে কি লেখা?
আমি কি এত খারাপ ছাত্র, আমাকে বই-এর নাম পড়তে বলছ কেন?
বড় গাইড বইটা খুলে বলে, বলেন তো ‘দুখু মিয়া’ কে ছিলেন?
আমি জানি, তুমি বলত, বঙ্গবন্ধু বড় নাকি শেখ হাসিনা বড়?
মানে?
কার বয়স বেশি?
বঙ্গবন্ধু’র।
তুমি জানলে কিভাবে? লেখা আছে?
সবাই তো জানে, বঙ্গবন্ধু তো প্রধানমন্ত্রীর পিতা।
তুমি এত কিছু জান! বইতে পড়েছ নাকি শুনেছ?
বইতে অাছে, স্যাররা স্কুলে পড়াইছে.., বঙ্গবন্ধু’কে যুদ্ধের সময় মেরে ফেলেছে।
কি? কোন যুদ্ধের সময়?
হ্যা। দেশ স্বাধীনের সময় বঙ্গবন্ধু, তারপর উনার পরিবারের লোকজনসহ ব্যামালা মানুষ মেরে ফেলেছে।
কারা মেরে ফেলেছে?
পাকিস্তানিরা।
তুমি যা বলেছ, তার মধ্যে একটা বড় ভুল আছে। আগামীকাল তা পড়ে আমাকে সঠিকটা বলবে। দেশ স্বাধীনের সময় পাকিস্তানি আর এদেশের রাজাকাররা অনেক মানুষ হত্যা করেছে -অনেক মানুষ শহীদ হয়েছেন; বঙ্গবন্ধু’র নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু স্বাধীনের কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্বাসঘাতক খুনিরা উনাকে এবং উনার পরিবারের লোকদের হত্যা করেছিল। আচ্ছা এবার অংক আর ইংরেজী শিখাও।
আপনি তো সব জানেন।
কোথায় সব জানি, তুমি আরো শিখাও।
কি শিখাব?
বললাম তো, তোমার যা ইচ্ছে।
বলেন তো এটা কি লিখেছি?
কৈ? ঢেকে রেখেছ কেন? দেখি কি লিখেছ।
খাতাটা হ্যারিকেনের আলোর একটু দূরে ধরেই আবার কেটে দেয়।
তোমার সাহস তো কম না?
কেন?
কি লিখেছ?
পড়েন?
এভাবে কেটেছ কেন? এটা কি পড়া যায়? আই, ওয়ান নাকি এল লিখেছ?
খাতাটা টান দিয়ে ঘরের মধ্য চলে যায়।
তোমার কিন্তু শাস্তি প্রাপ্য হয়ে গেছে, প্রথম দিন মাপ করলাম। কাল থেকে কিন্তু।
আমি মাপ চাইছি নাকি?
তাইলে শাস্তি চাও?
কেন, শাস্তি দিবেন কেন, আমি কি করছি? আচ্ছা দিলে দেন।
এদিকে আসো।
না।
কেন?
ভয় করে।
‘আমাকে ভয় করে? ভয় নেই আমি তোমাকে মারবও না, ধরবও না।’
‘সত্যি, ঐ খানে ভুতের মত কি যেন।’
‘কাছে আসো।’
কাছে এসে টেবিলের ওপ্রান্তে গিয়ে লেখা শব্দটা একেবারে কেটে কেটে কাগজটাই যেন ছিড়ে ফেলেছে।
‘তুমি কি করছ, এসব?’
কেন?
তুমি ছাত্রীও না, শিক্ষকও হতে পারোনি।
শিক্ষক না তো, শিক্ষিকা।
হতে পারনি তো, হও আগে।
হয়েছিই তো।
তোমাদের শিক্ষিকারা বুঝি এভাবে পড়ায়?
ও’ খাতাটা মুড়িয়ে বলে, ‘এই প…’।
অনেক হয়েছে, এবার এসে বের কর- সবথেকে কঠিন অংকটা।
চোখ টোক খিচলে বলে উঠে, ‘আপনিই তো..’
লোকটা বলে, ‘কি? বসে কথা বল।’ কিন্তু, ও’ ছটফট করছে, প্লাস্টিকের চেয়ারটা তুলছে, আবার রাখছে – পিছনে, সামনে, পাশে। তারপরে বসে বলে, ‘আপনি স্যারও না, ছাত্রও না।’
তাহলে?
আবার চেয়ার ছেড়ে দাড়িয়ে গেল।
‘কি হল আবার? বস।’
…..
‘কথা শুনছ না, কেন? বস বলছি।’

‘অাচ্ছা, বল, আমি তোমার ছাত্র হলে খুশি নাকি শিক্ষক হলে খুশি?’
‘ছাত্র হলে তো এতক্ষণে……’ বলে, চেয়ারে ধপ করে বসে, লোকটার দিকে ফিরে গলা চেপে ধরার ভঙ্গিমায় দুহাত জাগিয়ে মুহূর্তেই দু’হাতে বইটা নিয়ে নিজের কোলের উপর চাপিয়ে রাখে।
লোকটা খোলা দরজা-জানালায় তাকিয়ে আবার ও’র দিকে চোখ ফিরিয়ে এনে বলে,
‘কি করছ এসব, এটা কি পড়াশুনা।’
‘কি? আপনি আসলে বেশি কথা বলেন।’
‘হু, ঠিক বলেছে, তুমি আসল কথা বলনা তো, তাই।’
‘কি? বলিনা? বলে চেয়ার থেকে আবার দাড়িয়ে যায়।’
কয়েক সেকেন্ড হবে হয়ত, দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু ততক্ষণে, ও’র দু’হাত বইয়ের মলাট খামচে ধরেছে।
‘তুমি অস্থির হয়ে যেও না, মারতে চাইলে মারতে পারো, ধরতে চাইলে ধর।’
এবার অনেকটা ভেঙ্গে পরার মত অবস্থা। লোকটা হাত বাড়িয়ে বলে, ‘বসো’।
কিন্ত ও’ ভিতরের রূমে যেতে চায়, লোকটা আবারো হাত বাড়িয়ে বলে, ‘বসো, তুমি -শান্ত হয়ে বস।’
চেয়ারে বসে, আস্তে করে বলে, ‘মায়ের কাছে বলবেন না তো!’
কি?
দুষ্টামি করছি যে!
এখন তো আমি তোমার ছাত্র, তুমি নির্দেশ করলে বলব না।
বলবেন না, দেখেন তাহলে আমাকে মারবে।
আচ্ছা ঠিক আছে, কিন্তু মনে রেখো, শিক্ষকের সব নির্দেশ কিন্ত ছাত্র-ছাত্রীরা শুনতে বাধ্য না।
মানে?
কোন শিক্ষক যদি তোমাকে অন্যায় কিছু করতে বলে, তুমি কি মানবে?
হ, হ, অনেক মাষ্টাররা বদমাইশ একছের- ছাত্রীদের সাথে নাকি খারাপ ব্যবহার করে।
হ হ বললে কেন? হ হ মানে? তুমি কি মানবে?
‘না, মানবো কেন? একেবারে থাবর মারবো, কোথায় যেন মাইরও খেয়েছে’ – বলতে বলতে উঠে পিছনের দরজা খুলে বাইরে চলে যায়। লোকটা চুপকরে বসে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসে, ‘বাইরে কি অন্ধকার।’ বাইরে যাবার কারণটা লোকটার জানা, তাই আর কারণ জানতে না চেয়ে বলে, ‘ভয় করে না – একা যেতে।’
লোকটা তখনই ও’র গোসল করার জন্য ছুটাছুটি দেখে, ও’র বাবা, মা আর ভাইকে বলেছিল যেন একটা বাথরুম বানায়- কাছেই। এটা তেমন কোন খরচের বিষয় না যা ওদের অায়ত্বের বাইরে। অাসলে অনেক পরিবারেই পুরুষরা মেয়েদের চাহিদার কথা অনুধাবন করে না। কয়েকদিন পরে, ও’র বাবার পিছন পিছনে একজন এসেই বলে, ‘স্যারে এইখানে ঘুমান, মশায় কামড়ায় না! আ জানলে তো বাড়ি থেকে মশারি নিয়ে আসতাম।’
আপনি?
‘আপনার বাথরুম দরকার নাকি, বাথরুম বানাইতে আইছি’ বলে বিছানার দিকে আসে।
লোকটা নিজের চাদর হাতে নিয়ে উঠে চেয়ারে বসে।
রাতেই বানাবেন?
না। সকালে, দু’তিনদিন লাগবে। এখন একটু ঘুমাই।
লোকটা হতবাক হয়ে য়ায়, কারণ সে অন্যদের সাথে বিছানায় ঘুমায় না।
ও’র বাবা কিছুক্ষণ পরে, তাকে ডাকতে আসে ভিতরের রুম ঘুমাতে দেবার জন্য। লোকটা বাঁধা দেয়, যা হবার তো হয়ে গেছে; বলে, আমার সমস্যা নেই, আমি চেয়ারে বসে রাত পার করতে পারবো। কিন্তু তিনি তা মানতে রাজি না, ভিতরের রুমে ওরা ঘুমাচ্ছিল। তিনি ও’কে ডেকে তুলছেন, বুবুর ঘরে পাঠাবে, আর তাকে ভিতরের রুমে। লোকটা বলে, ‘আমার কথা চিন্তা করে, এখন আর উনার ঘুম না ভাঙ্ানোই ভাল, উনি অলরেডি তো বিছানায় শুয়ে পড়েছে। ও’দেরকেও এত রাতে আর দাদির ঘরে পাঠাতে হবে না।’
‘পাঠাই কি স্বাধে? আপনি তো কারো বিছানায় ঘুমান না, তাই। নইলে তো, বড় বিছানা, গুড়াগাড়া আপনার পাশেও ঘুমাইতে পারতে।’
‘আপনি অন্যদের কাছে শুনেছেন, আমার কাছ থেকে কিন্তু সরাসরি শুনেননি।’
ভিতরের রুমে ও’ ঘুমান্ত চোখে উঠে আবার বিছানার এক কোনায় শুয়ে পড়ে।
বাবা বলে, এটাও অনেক বড় বিছানা, আরো কয়েকজন ঘুমাতে পারে। আপনি তো ঘুমাবেন না।
এর মধ্য সেই মিস্ত্রী জেগে উঠে, ‘তা বুঝলে তো এখানে ঘুমাইতাম না’ বলে ভিতরের রুমে যায়।
ততক্ষণে ও’ ঝট করে উঠে, কারো দিকে না তাকিয়ে, পিছনের দরজা দিয়ে দাদির ঘরে চলে যায়।
লোকটা সারারাত চেয়ারে বসে আর পায়চারী করে পার করে- পিছনের অচেনা রাস্তার মাথা আর উঠান। সকালে সেই ছোটবেলার রূপ। কয়েক দিনের জন্য কথা নাবলে, না তাকিয়ে এড়িয়ে চলার মত। জানতে চেয়েছিল, এগুলো দিয়ে কি বানাবে? ও’ কোন উত্তর দেয় না, ছোট বোনটা বলে বাথরুম। লোকটা বলে, বাথরুম মানে গোসলখানা, এবার বল কি বানাচ্ছে?
ও’ একটু তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে লোকটার দিকে তাকায়, ছোট বোন বলে, ‘…. খানা’। ও’ কষে থাপ্পর মারার দেখায়। বেশ মজবুত একটা লেট্রিন বানাচ্ছে, তা আবার আগের স্থানেই। লোকটা মিস্ত্রিকে বলে, ‘আসলে একটা বাথরুম প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সবাই যে ২/৩ ফুটের লেট্রিনকে বাথরুম বলে তা জানা ছিল না’। মিস্তি বলে, ‘গোসলখানা? – তা বানাইতে কতক্ষণ! বানাইয়া দেব আনে।’ ও’র মা এসে বলে, ‘তা লাগবে কেন?’
সেদিনের সেই বাইরে যাবার আতঙ্ক, বিড়ম্বনা ও’দের এখনও আছে। ভয় করে কিনা জানতে চেলে সেদিন ও’ বলেছিল, করে তো।’
লোকটা বলেছিল, ‘আমাকে বলতে পারতে?’
‘স্যার আপনি যে কি না?’ মাথা নিচু করে একটু হেসে বলেছিল, ‘আমি কিন্তু এমনিতেই বাইরে গেছিলাম।’
‘জানি, এখন কষ্ট করে আমার জন্য পানি নিয়ে এসো তিন গ্লাস।’
চোখ বড় বড় করে, খুশিতে লাফ দিয়ে উঠে, ঘর থেকে দু’হাতে দু’টা গ্লাস এনে রাখে, আর টিবিলে একটা গ্লাস অাগেই ছিল।
বসো।
চুপ করে দাড়িয়ে থাকে।
লোকটা কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ়।
চেয়ারটা একটু টেনে দেয় আর হাতটা বাড়িয়ে বলে, ‘কিছু বলতে চাচ্ছো?’
চেয়ারে বসে, দু’হাতে নিজের দু’ই ডানা শক্ত করে ধরে, যেন শীত শীত ভাব, বলে ‘কি অন্ধকার, মনে হয় অমাবস্যা’।
‘তাই? আচ্ছা তুমি আমাকে কিছু বলছ না কেন?’
কি বলব?
আমাকে মারছ না কেন- তোমাকে না পড়িয়ে তো আমি তোমার সাথে দুষ্টামি করছি?
এবার অাস্তে করে দাড়িয়ে দু’হাত এমন ভঙ্গিমায়, যেন লোকটাকে আলত করে কোলে নিতে চায়, আর মুখে বলে, ‘স্যার আপনি এরকম কেন, আপনি তো কোন অন্যায়ই করেননি!’
এরকম মানে?
‘কেমন যেন’ বলে বসে টেবিলের উপর হাতটা বাড়িয়ে দেয়, ততখানি যতটুকু লোকটা হাত বাড়িয়েছিল।
I’ve fallen for you
লোকটা একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে, ‘আজকেই শেষ না, প্রতিদিন সুযোগ পাবে’।
ছাত্ররা কিছু বলে না?
কোন ছাত্ররা?
আপনি যাদেরকে পড়ান তারা যদি সত্যি সত্যি মারে?
‘বোকা, আমি কি সবাইকে সে সুযোগ দিব নাকি, শুধু তোমাকে, তাছাড়া আমি তো শুধু তোমাকেই পড়াচ্ছি, সবাইকে না।’
ও’ চুপ করে থাকে। লোকটা বলে, এবার একটা অংক কর।
বললেন দেখি আজ পড়াবেন না।
তাহলে তুমি পড়াচ্ছ না কেন।
আমার ইচ্ছা।
তাহলে ছুটি?
মা’ না আসা পর্যন্ত বসে থাকেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, ‘রোজ?’
কি?
স্যার, আপনি কি সত্যিই রোজ পড়বেন আমার কাছে?
হুঁ, আমি ওয়াদা করলাম, তুমি আজ থেকে প্রতিদিনই আমার টিচার হতে পারবে, তোমার যখন মন চায় তুমি আমাকে ছাত্র বানাইও। কিন্তু মনে রাখবে, আমি কিন্তু বড়, ছোটদের সাথে সবাই অন্যায় করে না, আমি কোন অন্যায় করব না। আমি অন্যায় দাবি করলে তুমি ঠেকাতে পারবে না; কিন্ত তুমি এখন আমার সাথে যা ইচ্ছে তাই করতে পারো, কারণ, অন্যায় বা ভুল করতে চাইলে আমি ঠেকাতে পারব, যদি দোষ হয়, অন্যায় হয় আমার হবে, তোমার কোন দোষ বা অন্যায় হবে না। এবার বল, কোন অংকটা কঠিন।
স্যার সব অংকই কঠিন, অংক থাক আপনার শিখতে হবে না, স্যার বলেন তো, ইংরেজীতে কয়টা অক্ষর?
জানি, তুমি বাংলাদেশ লেখ তো ইংরেজীতে।
পারিনা।
তোমার স্কুলের নাম লেখ তো।
খাতাটা নিয়ে লিখতে শুরু করে, ‘কি যেন স্যারেরা বলেছিল ভুলে গেছি’।
ক্লাশ ফাইভ লেখ।

আমার মনে হচ্ছে, তুমি ক্লাশ ওয়ান আর টু পর্যন্ত পড়েছ, তারপরে আর পড়াশুনা করনি।
মানে?
পড়াশুনা লিখতে ‘র’ নাকি ‘ড়’।
সব ‘র’ আর ‘ই’ কার।
মানে?
হুঁ, স্যারেরা বলছে।
Who, When, Where মানে কি?
হোয়াট মানে কি, ওসব জানিনা।
তাই, আচ্ছা বল তো, পরে, পড়ে, পড়া এবং পড়ি আর পরী -এর মধ্যে পার্থক্য কি?
জানিনা।
পরের দিনও বেশ উৎসাহ নিয়ে পড়তে বসেছিল। মেয়েটা’র মা ঘরেই ছিল। পড়াশুনায় ও’র বেশ মনযোগ। কিন্তু তারপরেও মনে হচ্ছিল, কোন কিছুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। আজ ও’ লোকটার চেয়ার আগে থেকেই দখল করে রাখে। বেশ বেশ মেধাবী, দিনে এক ঘন্টা পড়াশুনা করলেও অনেক ভাল করত। স্কুল, কোচিং- এ অনেক সময় কাটিয়েছে, কিন্তু নিজের মেধাটা কখনো ব্যবহার করেছে বলে মনে হয়নি। গণিতটাও ভাল বুঝে, কিন্তু নিজে বুদ্ধি খাটিয়ে কোন অংক করেছে বলে মনে হয়নি। অনেক্ষণ পরে লোকটা পানি খেতে চায়। ও অানন্দে লাফিয়ে, সশব্দে চেয়ার সরিয়ে পানি আনতে যাবে, এক হাত পিছনে- প্যারেডের ভঙ্গীতে, ঘুরে তাকিয়ে বলে, ‘তিন গ্লাস?’ লোকটা হেসে দিয়ে বলে, ‘তুমি যা পা…..তোমার ইচ্ছে, তবে তিনটা গ্লাস না আনলেও চলবে, একটা থেকেই অনেক গ্লাস খাওয়া যাবে।’ দৌড়ে গিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে টিউবয়েলে যায় আর একগ্লাস জল এনে দাড়িয়ে থাকে। ও’র মা ভয়ংকর রাগে কিছু একটা বলতে গিয়ে, দেখে কলসে পানি নেই। তিনি পানি আনতে চলে যান। লোকটা দু’হাত আলিঙ্গনের জন্য বাড়িয়ে দেয়। ও’ ধরেন বলে জলটা বাড়িয়ে দেয়। গ্লাসটা ধরতেই, ও’ কাছে এসে বলে, ‘আপনি আমার চেয়ারে বসছেন কেন? আপনার চেয়ারে যান।’ ততক্ষণে দু’জনেই দাড়ানো। সামনের দরজা খোলা, একটু দূরে অন্ধকারে কাশির শব্দ। মিরাজদের ঘরের সামনে কেউ দাড়ানো। ও’গা ঘেঁষে লোকটার চেয়ারে বসে পড়ে। লোকটা চেয়ারে গিয়ে বসতে বসতে ও’ দুবার চেয়ার ছেড়ে উঠে আবার বসে, কথাও যেন সব চিৎকার করে করে বলতে চায়। ‘পানি খাচ্ছেন না কেন?’ এর মধ্যে ও’র মা’ চলে আসে, সামনের দরজা দিয়েই ঢুকল। লোকটা পানির গ্লাস হাতে নিয়ে ও’র দিকে তাকিয়ে থাকে – খুব ছটফট করছে। উঠে দাড়িয়ে একটু জোড়েই বলেফেলে, ‘পানি খাচ্ছেন না কেন?’ ও’ বার বার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল। লোকটা বলে, দরজাটা বন্ধ করে দাও, বাইরে কোন দুষ্ট লোক আছে। ও’ দরজা বন্ধ করতে গেলে, মা’ ক্ষেপে যায়, দরজা বন্ধ করে পড়া লাগবে না। ও’ ঘরের ভিতরে চলে যায়। অনেক্ষণ পরে এসে সবগুলো বই গুছিয়ে, ভিতরে চলে যায়। তারপরে ঠাস করে পিছনের দরজা খুলে ও’র চলে যাবার শব্দ। ও’র ছোট বোন দু’জনে মাত্র ঘরে ঢুকল। ঢুকেই লোকটাকে কয়েকটা ঘুষি মেরে ভিতরে চলে যায়। ও’দেরকে ডেকে অনেক অাদর করে, মেয়েটা কোথায় জানতে চায়। খুঁজে এসে বলে, ঘরে নাই। এর মধ্যে দু’টা লোক এসে, ‘লোকজন কেথায়, বউ কোথায়’ বলতে বলতে ঘরে ঢুকে যায়। লোকটা কিছু বলতে চাইলে, না দেখার ভান করে, ‘কোথায়, সফির বউ কোথায়’ বলে ভিতরের রুমে যায়। ও’র মা উচ্ছ্বসিত হাসিতে সশব্দে বলে, ‘বিয়ে হইছে নাকি, আগেই বউ বউ বল তোরা?’ আর আস্তে আস্তে বলে, ‘স্যারে বসা, উনারে গ্রাহ্য করিস।’ ও’দেরও একজন অাস্তে করে বলে, ‘আমরা চিনি’। এর মধ্য তাদের একজন, লোকটার কাছে এসে, ঠিকানা জানতে চায়। তারা এতটাই কাছে আসতে চায় যতটা ও’ এসেছিল। লোকটা দূরের চেয়ার দেখিয় বসতে বলে আর সেই সাথে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, আগমনের হেতু আর তাকে কিভাবে, কবেথেকে চেনে তা জানতে চায়। সন্দেহ ভুল নয় – তারা সেই রাজাকার প্রেমী সংগঠনের লোক যারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে এতটাই ঘৃণিত যে পুরো পৌর এলাকায় দৃশ্যমান কোন স্থানে তাদের অফিস নেই। একটাই মাত্র অফিস গ্রাম্য বাড়ির রান্নাঘরের পিছনে, ওদের ঘরের সামনেই – রাজনীতির নামে তাদের লক্ষ যেন পেটুয়া কলেজ শিক্ষিত অনামন্ত্রীত লাইসেন্সাস সেই বাতিল পুরুষদের মত লোকগুলো সমাজে টিকিয়ে রাখা। ‘তয় তো ভালই হয়েছে, মুরুব্বী মানুষ আছে, বিয়া তো স্যারেই পড়াইতে পারবে।’ আরেক জনে বলে, ‘স্যারে, সফির সাথে বিয়ে পড়াবে? স্যারের বাড়িতে পোলা নাযেন কে আছে, কবে যেন সফির বউরে নিয়ে যায়!’ ‘আপনারা যেভাবে কথা বলছেন, তাতে অনেকে ভাবতে পারে আপনারা অনেক কিছু জানেন, কিন্তু সত্যটাও তো অাপনাদের জানা আছে। আমি অন্যকারো বিয়ে দেয়া বা ভাঙ্গার জন্য অাসিনি আর চুরি করতেও না, যেমনটা ঐ অফিসের লোকরা করেছে।’
এ কথা কেন বললেন?
কোন কথা।
ঐ অফিসের কথা।
‘ভালো করে চিন্তা করে দেখেন, যা হোক অাপনারা ওনাদের গেষ্ট হলে আমার সম্পর্কে অবান্তর কথা না বলাই ভাল আর যদি আমার সাথে প্রয়োজন থাকে, তাহলে ভিতরে না এসে বাইরে আমার সাথে কথা বলবেন।’
স্যারে কেমন কেমন যেন কথা বলে।
‘ঠিক বলেছেন। আপনারা যে ভাবে আমার সাথে কথা বলেছেন, সেরকমটা আসলে স্বাভাবিক না।’
ও’র মা বারান্দায় এসে বলে, ‘স্যারকে মনে হয় ওরা চেনে নাই’।
‘তা ঠিক, কিন্তু একেবারে অপরিচিত হলে এরকমটা করে না, সব মানুষই – এমনকি আপনারাও তো অামার অপরিচিত ছিলেন। আসলে উনারা যার মাধ্যমে আমাকে চিনেছ সেই দায়ী। যা হোক, আপনাদের কি হয়?’
উনারা ফেলনা না, আত্মীয় স্বজন।
ও অাচ্ছা তাই।
‘রাখালের বন্ধু সফি’কে বাড়ির সবাই পছন্দ করে। বুবু শাশুরি তাই, মাইয়াটার সাথে বিয়ে ঠিক করছে। ওরা সফির অাত্মীয় – কি যেন হও তোরা?’
তাদের একজনে ‘আর লাগেনা’ বলে অন্যজনের হাত ধরে টানে -চলে যাবার জন্য, ‘ল, ল’। অন্যজন ‘দাড়া’ বলে থেমে বলে, ‘আমরা যাই মামানি, স্যারে মনে হয় রাগ করছে। স্যারের, কিছু আনাইয়া টানাইয়া খাওয়ান’। লোকটার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘খালাত ভাই’, ‘চাচাত ভাই’।
লোকটা উনাদের দিকে না তাকিয়ে, ও’র মাকে বলে, ‘কি বলছেন? সত্যি?’
‘হ্যা’। উনারা একটু দূরে গেলে বলে, ‘এখনো কথা পাকা হয়নি, রাখালের বাপ রাজি না’।
বুবু শাশুড়ি মানে কি ও’র দাদি?
হ্যা দাদি, তারপর বেগম বুবুও।
আপনার মেয়ে রাজি?
‘ও’র আবার রাজি আর নারাজি কি? আপনিই শুধু…… মাইয়া বড় হয়েছে, বুঝেন না, আর ঘরে রাখা যায়না, ও’র বাপ বাড়ি থাকলে চিন্তা হইত না’।
লোকটা মোটেও হতবাক হয়না, শুধু বিধাতার উপর আস্থাটা বেড়ে যায়, কিন্তু করণীয় কি তাই নিয়ে চিন্তা।
এর মধ্য উনারা আবার ফিরে আসে, ‘বউরে একটু ডাকেন, একনজর দেখে যাই, নাইলে সফি রাগ হবে’।
‘হেয়া ক্যা।’
‘বুঝেন না, কামের ফ্যান্নে অাইতে পারে না, আমাগো খোঁজখবর রাখতে কইছে, আর যদি শোনে দেখি-ই নাই!’
ছোট মেয়েটাকে বলে, ‘ডেকে আন তো’। যাইয়া বল, ‘দেবরে আইছে’।
উনারা মা’কে ডেকে ভিতরে নিয়ে যায়, ‘মামানির সাথে একটু কথার কাম আছে।’
তারা আস্তে আস্তে কিছু বলছে। কিন্তু যখন বলে উঠে, ‘উনি পড়াইতে পাড়ে?’ – মনে হয় তারা বুঝি কানে একটু কম শুনে।
‘ভাল পড়ায়!’
‘আগেকার দিনের পড়াশুনা, ভাল তো পারবেই। তয় এখন ঐ… কলেজ দিয়া এমএ পাশ কইরাও কিন্তু অনেকে গুড়াগাড়ার পড়া বুঝে না’।
‘উনি বুঝে, সবাই কইছে।’
কিছুটা আস্তে বলে, ‘বুঝে বুঝুক, উনি তো ভিনদেশি, নামাজও পড়ে না, গ্রামে কি মাষ্টার নাই! টাকা লাগে সফি দিবে, একটা ভাল মাষ্টার লাগান। সফি’র কামাই রোজগার তো কম না, ভাল ছেলে, কইদিন পরে রাজ মিস্ত্রি হয়ে যাবে। আমাগো হাফিজ সাহেবও তো ভাল, লাগে হেরে পাঠাব অানে।’ কন্ঠের সরটা উচু করে বলে, ‘স্যারে মুরুব্বী মানুষ, উনার গুড়াগাড়া পড়ান লাগে? উনি তো হ্যা্ব্বি শিক্ষিত, বড় বড় ব্যাডারাও স্যার বলে। যে পড়াশুনা জানা লোক ভাল বেতনে চাকরি পায়, জিগান ত চাকরি করবে কিনা, করলে, যে কোন গদিতে বসানো যায়, ভাল বেতনে।’
মা’ বলে উঠে ‘তা তো ঠিকই, ও-স্যার আপনি একটা চাকুরী করেন তয়।’
এর মধ্যে, ‘ও’র ছোট বোন, এসে বলে, বুবুর ঘরে, ঘুমায়।’
ডেকে আনলি না কেন!
ডাকছিলাম, আসবে না।
উনারা আস্তে করে বলে, ‘যতই ভাল হউক, সফিকে না জিগাইয়া এখানে পড়তে দেয়া ঠিক হয় নাই। যদি জানে, কি হবে বুঝেন?’
‘হে চিন্তা করতে হবে না। ভাল মানুষ।’
‘এতই যখন দরদ, নামাজ টামাজ শিখাইয়া, লাইনে আনতে পারেন কিনা দেখেন। আমাগো সফি’র মাইয়ার অভাব হবে না, এই বয়সে প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছে, দল ক্ষমতায় আইলে তো কথাই নাই।’
‘ওসব কি কও, কপাল পোড়া কথা!’
‘তয়, আমরা তো বুঝিনা, হের কাছে পড়াইতে হবে কেন, গ্রামে কি পড়ানোর মানুষ নাই?’
তারপরেই উনারা বের হয়ে যায়, যাবার সময় বলে, ‘স্যারকে কাল আমাদের বাড়ি পাঠাইয়া দিয়েন’। লোকটার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমাদের বাড়ি আপনি চেনবেন, একেবারে সহজ…. আধা-কিলো হবে, মেম্বারের শালার বাড়ির কাছেই বাড়ি। আমার ছোট বোনরে পড়াবেন আনে, টাকা পয়সা যা লাগে দিব, কত করে নেন? – যা নেবেন, দিব; কম না, বেশি দিব আনে।’
লোকটা মা’য়ের দিকে তাকিয়ে সামনে ঈশারা করে বলে, ‘ঐ দলটার ম্যানেজমেন্ট খুবই দুর্বল এবং সমর্থকরা অনেকেই খুব দুর্বল চেতার। সমাজের দুষ্ট লোকরা অন্যায় করার জন্য, বাহাদুরি দেখাবার জন্য খুব সহজেই ঐ দলের পরিচয়ে, ঐদলের দুষ্ট, লোভী অথবা বোকাদের ব্যবহার করে। তারা নিরীহদের অনিষ্ঠ করে, পাড়াপড়শির উপর জুলুম করে- তারা মূলত ভালোর শত্রু আর খারাপের উৎসাহদাতা।’ ঐ লোকদের বলে ‘অন্যদের সব বিষয়ে চিন্তা না করাই ভাল, বিশেষ করে অপরিচিত মানুষের। আপনাদের হয়ত মনে কষ্ট লাগবে, কিন্তু, খালেদার রাজনৈতিক পেটে কিছু গো-সাইদির বাচ্চা আছে যারা শুধু আমার না, অনেকেরই শত্রু। তাদের কারনে হয়ত অনেকে ট্যানেল ভিশন নিয়ে অবান্তর কথা বলে, মানসম্মান জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, না বুঝে আহাম্মকের মত অন্যের অনিষ্ঠ করে – সেরকম কেউ থাকলে আমার সাথে বাইরে সরাসরি কথা বলতে পারত। কিন্তু তা না, তারা ঐ বোকা আর লোভীদের দলটাকে ঘৃণার বিষয় বানিয়ে ফেলেছে।’
মানে?
‘যা হোক, এখানে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না, আপনি যদি আপনার বোনের পড়াশুনার কথা চিন্তা করতেন, তাহলে আমাকে বলতেন না, আপনাদের তো হাফিজ সাহেবই আছেন। ভিন্ন কোন উদ্দেশ্য থাকলে বলেন।’
মানে?
‘আমি যে, যেকোন বাড়ি গিয়ে যে কাউকে পড়াব, সে রকম ভুল ধারনাটা কে দিল? আমি তো শুধু এবাড়িতেই পড়াচ্ছি।’
‘এখানে পড়ালে, আমাদের বাড়ি কি সমস্যা?’
‘আমার এত জবাব দিতে ভাল লাগছে না, আপনার বাড়ি বা গ্রামের কোন ভাল শিক্ষিত মানুষের কাছ থেকে জেনে বুঝার চেষ্টা করতে পারেন’।
‘আমার বোন কিন্তু পড়াশুনায় ভাল। কোন বিষয়ে ফেল করেনি। আপনাকে পাইলে আরো ভাল করবে।’
‘আপনার কাছে যা ভাল, অন্যের কাছে তা অত্যন্ত খারাপ হতে পারে। যাহোক, আমি ও’র সাথে কথা বলব, যদি বুঝতে পারি ও’ আপনাদের বাড়ির বউ হতে চায় তবে, আমি ও’কে পড়াব না, নাহলে সবাইকেই বলছি এই বয়সে ও’র বিয়ে নিয়ে কোন কথা বলবেন না।’
এটা কেমন কথা?
‘ও’র বাবা-মা’র মত আমিও ও’র অভিভাবক, ভাল-মন্দ দেখার দায়িত্ব, আবার অধিকার আমারও আছে।’
ও’র মা কথা না বলে, ভিতরে চলে যায়। আর উনারাও একে অন্যের হাতে চিমটি কেটে আস্তে করে ‘আসলেই তো’ বলে চলে যায়।
কিছুক্ষণ পরে সগির আর মিরাজ আসে। সগির ঘরে ঢুকে আর মিরাজ পিছনের বাড়ি অর্থাৎ বুবুর ঘরের দিকে যায়। ‘সালামা…., স্যার। কাল থেকে আমি আর কাজলীও আপনার সাথে পড়ব। মুক্তিও আসতে চায়।’ ‘বেশ ভাল, এসো।’
পরের দিন সকালে, সফি আসে। সন্ধায় সবাই পড়তে বসে, ও’র মধ্যেও বেশ উৎসাহ ছিল। কিন্তু, ও’ যেন সবাইকে জানাতে চায়, স্যার সব পারে, খুব ভাল পারে, সব থেকে ভাল পারে। অন্যদিকে সগিরের উদ্দেশ্য ছিল ঠিক জ্ঞান অর্জন নয় বরং লোকটা পারে কিনা, ভুল করে কিনা তা যাচাই করা। লোকটা প্রথমেই বলে ‘তোমরা শিখতে এসেছ এটাই বিশ্বাস করি, কিন্তু অন্যদের শিখাবে না, পড়ার কৌশলও বলবে না, যেমন অন্যদের সম্পর্কে এখানে বলেছ।’
কি স্যার?
যেমন তোমরা বলেছ, ‘তাইলে স্কুলের স্যারে ভুল পড়াইছে’, বলছে, ‘এখানে’। কিন্তু তিনি হয়ত ভুল পাড়াননি। উচ্চারণ একই রকম হলেও বানান ভিন্ন, আবার বানান একই রকম হলেও অর্থ ভিন্ন হতে পারে, here মানে এখানে কিন্তু এখানে hear লেখা। আবার এখানে then না than লেখা। আরেকটা বিষয় তোমরা বলেছ, ‘ইংরেজী শব্দের অর্থ জানার দরকার নেই – স্যাররা বলছে’। কিন্তু পড়াশুনা করলে, অবশ্যই জানার দরকার আছে। পরিক্ষায় শব্দের অর্থ লিখতে না দিলেও, শব্দের অর্থ জানতে হয়। তা না হলে, প্রশ্নও বুঝবে না, সব উত্তরও লিখতে পারবে না। আর উপরের ক্লাশে উঠে তো কিছুই পারবে না।
পরের দিন দুপুরে, ও’র মা বলে, ‘ফাইনাল পরিক্ষার পর থেকে ও’কে আপনার কাছে দিয়ে দিব, আপনি পড়াবেন। ও’র বাপেও বলছে, দরকার হয় আপনি আলাদা একটা ঘর নেন, ও’ আপনার কাছে থেকে পড়বে, আমি রান্না করে খাবার পাঠাইয়া দিব। কোচিং-এর স্যার ফোন করছে, পরিক্ষার আগে ছাড়তে চায় না।’
‘আমি চিনি উনাকে, আমি দেখেছি অনেক স্টুডেন্টরা উনার কাছে পড়ে। কিন্ত ও’ কিন্ত পড়াশুনা করে নাই, যদিও মেধা অনেকের থেকেই ভাল।’
আমি দেখি আবার কথা বলে।
‘সবার সাথে কোচিং করলে খারাপ না, কিন্তু পড়াশুনা ঠিকমত করে কিনা, খেয়াল নিতে হবে।’
কিছুক্ষণ চিন্তা করে উনি বলেন, ‘না’ কইয়া দিব আজকে, আপনার কাছেই পড়বে আনে।
‘তা কেন? আমার কাছে তো সারাদিনই পড়তে পারবে, কোচিং -ও করুক।’
‘কোচিং- এ আনা নেয়া করবে কে? সন্ধা থেকে রাত ১০টা/১১টা, স্কুল কি এখানে, কোথায়!’
আমি চিনি।
‘আপনি যদি আনা-নেয়া করেন তাইলে তো হয়ই, কিন্তু ও’রা মানবে কিনা! সেদিন বলে গেছিল, অত রাত পর্যন্ত পড়াশুনা করার দরকার নাই।’
ও’রা মানে?
‘সেইদিন তালই আসছিল- সফি’র বাপ, মা, ডাক নিছে, অত দূরে রাত করে পড়তে যাবে কেন, দরকার হলে বাড়ি নিয়ে যাবে, সফি পড়াবে। সফিও আপনার মত ভাল ছাত্র ছিল, সামনের অফিসের দিকে তাকিয়ে বলে, উনারা তো দেখলাম সেদিন প্রেসিডেন্ট বানাইয়া দিছে।’
‘তাই? কিন্তু আমার মত বলতে?’
পরিক্ষায় ফাষ্ট হইত।
‘আমি স্কুলে কখনো ফাস্ট হইনি। অাবার এক স্কুলে ফাস্ট হলে যে অন্যসব স্কুলে ফাস্ট হতে পারে, ভাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে, তেমন না কিন্ত। আমরা যেখানে পড়াশুনা করেছি, এখানকার অনেক প্রিন্সিপালরাও হয়ত সেখানে ভর্তি হতে পারত না। অামার সম্পর্কে কিছু লোক অনেক কথা ছড়ায়, এরকম তুলনা না করাই ভাল। আমার কাছে বলেছেন ভাল করেছেন, অন্যদের কাছে বলবেন না।’
কেন?
‘এটা আমার জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর – অপরিচিত মানুষের মধ্যে ভুল ধারনা তৈরি হতে পারে।’
‘আপনি কোচিং করাইতে পারেন না? আরো কিছু গুড়াগাড়া নিয়ে, এখানে কোচিং করাইলেই পারেন। তাইলে তো মানুষ ডাক নিতে পারত না।’
‘খারাপ বলেননি। কিন্তু যারা ডাক নিবার তারা তো ডাক নিতেই চাবে।’
কারা?
‘আমি কিন্ত প্রথম দিন রাতেই অনেক কথা বলেছিলাম। এখন দেখলেন তো দুষ্টরা যেভাবে কথা ছড়ায়, তাতে তো সমস্যা।’
উনারা তো খারাপ কিছু বলেনি।
‘সমস্যা কিন্ত তৈরি করছে। উনার কি বলে জানি না, কিন্তু কিছু দুষ্টরা যেভাবে কথা বলে তাতে আমি যদি আপনাদের একেবারে অজানা মানুষ হতাম, তাহলে তাদের কথার ফলে আপনার কাছেই মনে হত, আমি পরিবার, সন্তান, ছেলে-মে ফেলে এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেরাই, খাই-দাই, ইসলামের নাম বেঁচে চলি, কিন্ত ভন্ড, বেনামাজি আর পড়াশুনায় -তাদেরই মত কিন্তু অনেক পুরানো। অথচ আপনি তো জানেন, কারো বাড়ি যাওয়া-খাওয়া তো দূরের কথা, আমার জামাকাপড়ে অনেকের স্পর্শ লাগলেও পারতপক্ষে তা ফেলে দেই।’
‘তা তো জানি, আমি তো অামার ছেলে-মেয়েদেরও বলেছি আপনার কিছু যেন না ধরে। সফি আগে থেকেই জানে, সেদিন এসে আপনার মোবাইলটা সরায়ে রেখেছিল, যদি গুড়াগাড়ারা নষ্ট করে।’
‘আপনাদের ব্যাপারে সমস্যা নেই, আপনার সন্তানদের আমি আগে থেকে চিনি- ও’রা ধরলে সমস্যা নেই, তাতে কিছু নষ্ট হবে না। ঐখানে থাকলেও মোবাইলটা ও’রা ধরত না, এতদিন ধরেনি। তাছাড়া, আমি তো আপনাদের রান্না খাচ্ছি, কিন্তু বলেছিলাম অন্যকোন ঘরের রান্না বা কেউ ধরলে যেন আমাকে না দেন; ও’র হাতে তো আমি পানি খেলাম, কিন্তু অন্যসবার হাতে খেতাম না।’
‘একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে মা’ বলে, আপনি শিক্ষিত মানুষ, একটা চাকরি করেন না কেন?’
‘আমি কিন্তু প্রথম দিনই আপনাকে অনেক কথা বলেছিলাম।’
‘তা তো বলছেন। কিন্তু পোলাডারে কি দিয়ে বুঝ দিব, গরীবের পোলা আমাকে অাম্মু অাম্মু ডাকে, আমাকে ছাড়া কিছু বুঝেনা।’
লোকটা চুপ করে থাকে।
‘ও’রে কিছু টাকাপয়সা দিয়া একটা চাকুরী নেওয়াইয়া দিতে পারলেও হত।’
কেন? সেদিন যে শুনলাম ভাল রোজগার করে।
‘তা তো করে। কিন্তু…’ বলে ঘরে চলে যায়।

পরে কোচিং – এ যাবার সময়, এক সাথে গিয়েছিল, কিন্তু অনেকটা সময় আগেই ছুটি হয়ে যায়। লোকটা গিয়ে দেখে অনেকে অভিভাবকের সাথে, অনেকে একা একা বাড়ি যাচ্ছে, কয়েকজনে অপেক্ষা করছে। কাউকে কিছু জিজ্ঞাস না করতেই ছোট ক্লাশের একজন দৌড়ে এসে বলে, ‘ভাইয়া অাপু তামান্নার সাথে তামান্নার বাপের গাড়িতে গেছে।’ লোকটা ফোনে ও’র মাকে জানায়। তিনি বলেন, ‘কোন অসুবিধা নেই, বিকালে তামান্নাদের বাড়ি থেকে এসে বলছে, তামান্নার বাপ রোজ অানতে যাবে।’
কয়েক দিন আগে দু’পরিবারের মধ্যে বেশ ঝগড়া হয়েছিল- ফুলগাছ তুলে ফেলা নিয়ে। ও’র মা তামান্নাদের পরিবারের চিরত্র নিয়ে কিছু কথা বলে ফেলে। কয়েকজনে বেশ তাল দিচ্ছিল কিন্তু লোকটা বিরক্তি প্রকাশ করলে থেমে যায়। পরে লোকটা শুধু উনাকে বলেছিল, অাপনি মেয়ের মা, আপনার বড় মে ঐ মেয়েটার সমবয়সী। ওভাবে একজনের মা-বাবার চরিত্র নিয়ে কথা বললে, দুষ্টরা তো আপনার সন্তানদেরও শত্রু হতে পারে। আপনি যখন তাদের চরিত্র নিয়ে গালি দিয়েছেন, তাদের কেউ একজন বলেছিল, ‘বানাবো আনে।’

যথেষ্ট মেধা থাকা সত্বেও গতবছর ও’ আর কাজলী ইংরেজিতে ফেল করে। প্রথম দিনে লোকটা যা দেখল তাতে ৫ম শ্রেণি থেকে এপর্যন্ত কিছু শিখেছে বলে মনে হয় না। ও’ পরিক্ষায় পাশ করার কথা বললে লোকটা বলে,
‘ও, সেই কথা? তাতেও তুমি ফেল করবে’। ‘আজেবাজে কথা বলবা না, এমনিতেই সবাই…. ভয় দেখায়। জেনে রাখেন, আমি আবার ফেল করলেও কেউ কিছু বলবে না।’
তাতে আমার কি?
‘গতবছর, আমি যে কি ভয় পেয়েছিলাম, মনে করেছিলাম সবাই এসে… এক্কেবারে, কিন্তু কেউ কিছু বলে নাই, একটা মে আত্মহত্যা করেছিল তো, ওরাই বেশি ভয় পেয়েছিল’।
কারা?
‘যারা রেজাল্ট জানতে এসেছিল। ভাইয়ার বন্ধুরা। ভাইয়া শুধু বলেছিল, আর পড়াশুনা করতে হবে না, আজকেই বিয়ে দিয়ে দাও’।
তারপর?
‘তারপর কি? তারপরে বিয়ে করেছি’।
তোমার বিয়ের বিষয়টা কিন্তু স্পষ্ট করে কিছু বলছ না।
‘তার মানে? সবই তো বললাম, সব জেনেই তো…..’
কি?
‘আপনার কি হয়েছে বলেন তো, বাড়িতে কেউ কিছু বলেছে? সেদিনও রাতে হঠাৎ করে বাইরে গিয়ে কোথায় থেকেছেন!’
‘আজ আবার সেদিনের কথা বলছ কেন? সেদিনেও তো তুমি ফোন করেছিলে, অনেক কথা বলেছিলাম।’
‘কি বলেছিলেন?’
‘তোমার আসলে পাশ করার ইচ্ছে নাই, তুমি অনেক কিছুই ভুলে যাও, অনেক কিছুই গোপন করার চেষ্টা কর।’
‘কি গোপন করলাম?’
‘দেখ, এখন কিন্তু তুমি ছোট নেই, তোমার বিয়ের কথা আগে অনেকবার শুনেছি, কিন্তু এবারের বিষয়টা কিন্তু ভিন্ন।’
‘মানে?’
মনে করার চেষ্টা কর।
‘কি?’
ছোটবেলার কথা।
‘ছোটবেলার কথা আমার মনে নেই।’
‘ভুলে যাওয়া কথা না, যা ভুলে যাওনি তা কেন অস্বীকার করতে চাচ্ছ?’
‘কি অস্বীকার করছি?’
‘তুমি হয়ত ছোটবলার কথা সত্যিই অনেক কিছু ভুলে গেছে, কিন্তু মাত্র কয়েক মাস আগের কথা, তুমি ফোনে যা বলেছিলে?’
‘আমি ভুলি নাই। তুমি আমাকে ভুলে গেছিলা।’
‘তাই? তুমি আমার কথা সব ভুলে গেছ।’
‘সব ভুলি নাই।’
তোমার লক্ষণটা ভাল না।
‘মানে?’
পরে বলব।
‘এখন বলেন।’
‘পরে বলব, তুমি আমার কথা ভুলে যাও কেন, তাই বল।’
‘ভুলি না, ভুলি না, একটা কথাও ভুলি নাই।’
‘তা হলে বললে না কেন? গোপন করছ কেন?’
‘মোটেও না, আমি আপনাকে যা বলেছি, তা কোন মেয়ে……. আমি জানিনা বলে কিনা? আমি আপনাকে খুব অাপন ভাবতাম।’
এখন ভাব না?
‘ভাবি তো।’
তাহলে, বল?
‘কি?’
সেদিন যা জানতে চেয়েছিলাম!
‘আমার এত মনে থাকে না, আপনি বলেন, আগে বাসায় আসেন।’

কয়েক মাস হল, ও’ যখন প্রথম মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে, লোকটা সত্যিই বিস্মিত হয়। হঠাৎ ও’র কন্ঠ শুনে বিশ্বাস করতে পারেনি। কিন্তু, ছোটবেলার কথার টোন, ভাষাটাও বুঝি ধরে রেখেছিল লোকটার জন্য। ধ্যান করা মানুষ, বেশি কান্নাকাটি, হাসাহাসি করার অভ্যাস নাই- শুধু মনে আচমকা ইচ্ছে হয়েছিল -সত্যি ভাল আছে তো!, জানার, স্বচোক্ষে দেখার। কয়েক দিন অনেক কথা বলে – লোকটার কাছে মনে হয় ৫ম শ্রেণীর সেই ছোট মেয়ে যেন একদিনেই ষোল ছুই ছুই। যখন ও’ বলে ‘একটা মেয়ে কতকাল একা থাকতে পারে, কতকাল অপেক্ষা করবে আপনার জন্য’ লোকটা সত্যিই বিস্মিত হয়, লজ্জিত হয়। অপরাধবোধ থেকেই ও’কে সুযোগ দেয়, নিজের করনীয় সম্পর্কে জানতে চায়। ও’র ভালবাসায় কোন ঘাটতি ছিল না কিন্ত ও’ নিজের অপারগতার কথা বলে, ‘আমি আগের মত নেই, ‘খুব খারাপ, খুব নষ্ট হয়েগেছি স্যার’। লোকটা বলে, ‘তোমার সম্পর্কে আমি অনেক কিছুই জানি। আমার কথা শুনলে, আমার কাছে সত্য না লুকালে, আমাকে আপন ভাবলে হয়ত এমন হত না। তুমি বল, যা বলবে আমি তাই করব।’ একদিকে নীতি অাদর্শ, অধর্ম বিরোধী প্রেম অন্যদিকে ও’র ভালবাসা – ভালবাসার দাবি এবং ও’র প্রতি লোকটার ভালবাসা – সবকিছু মিলে লোকটা সবকিছু ছেড়ে দিতেও প্রস্তত কিন্তু ও’র অসন্তুষ্টি নিয়ে মুহূর্ত কাটাতে চায় না, বিধাতার মুখোমুখি হতে চায় না – সেটা বুঝি নড়ক বাসই। লোকটা জানতে চেয়েছিল, তুমি কাকে ভালবাসো, কাকে বিয়ে করতে চাও?
কাউকে না। বিয়েই করব না!
‘কেন যার সাথে বিয়ের কথা চলছে? তাকে ভালবাস না?’
প্রশ্নই উঠেনা।
তাহলে?
‘কি? আমার কথা না ভেবে নিজের কথা ভাবেন। আপনি এত বড় মানুষ, পড়াশুনা করেছেন, আপনি নিজেও তো বিয়ে করছেন না।’
‘সে কারণ তো তুমি জানো। কিন্তু পুরুষ আর নারীর মধ্যে পার্থক্য আছে। অামি বিয়ে না করে থাকলেও, কোন নারী জোড় করে পাপ করাতে পারবে না, কিন্তু পুরুষদের মধ্যে অনেক ধার্মিকও আছে, যারা এতটাই দুর্বল পরে পরে অবস্থার পুরুষ যে, কেবল দুর্বল নারীর উপরই অনধিকারে অধর্মের জুলুম করে।’
‘স্যার, এসব কেন বলছেন, আমার মনে হয়- আমি মরে যাই।’
‘থামো, আমার অাগে না। আমি তোমার জন্য, তবে ব্যর্থ হয়েছি, যদিও আমরা দায়ি না।’
মানে?
আমারও মরতে ইচ্ছে করে, তা তোমার জন্য।
কি অাজেবাজে কথা বলছেন ভাল লাগে না।
‘ব্যর্থ নাহলে এতকাল তুমি শতভাগ চাহিদার জন্য আমাকে কাছে পেতে, সবকিছুই পেতে অথচ মলিন হতে হতনা।’
‘অামি কিছু বুঝি না, আমার জন্য কেন মরতে চান?’
‘ঠিক সেরকমটা না, তোমার মলিনতার জন্য যারা দায়ী তাদেরকে মেরে ফেলাটাই মনেহয় সঠিক ধর্ম – প্রয়োজনে মরব, এভাবে বেঁচে থাকার থেকে যত দ্রুত তাদের মারা যায় ততই শান্তি – সেটাই সঠিক।’
‘স্যার, আপনি কি বলছেন! পাগল হয়ে গেলেন! সেই ছোটবেলা খায়ের কে মেরে ফেলার কথা বলেছিলেন। বিশ্বাস করেন আমার কোন মলিনতা নাই।’
‘আছে, তা নাহলে তুমি এইখানে থাকতে!’
কোন খানে? এইখানে।
‘আসবো ক্যামনে….। স্যার আপনি আমাকে ভুলে যান।’
তুমি, খায়ের’কে খুব ভালবাসতে, না?
না, আমি কাউকেই ভালবাসতাম না।
তাহলে?
‘তাহলে আমি কি করব? আপনি আসলে আসেন, না হয় কোনদিন কথা বলব না।’ ‘পারবে না, তুমি কোনদিন আমাকে ভুলতে বারবে না, আমি চাই তুমি সুখী হও, কিন্তু…..।’
কিছুটা কিছুটা দুকরে উঠা বুকে বলে, ‘আমার সুখী হওয়া লাগবে না, ঠিকই সব ভুলতে পারবো’ বলে ফোন কেটে দিয়েছিল।
কিছু সময় পরে আবার কথা হয়, ‘স্যার আপনি একদিনের জন্য অাসেন।’
‘তোমাকে নিষেধ করেছিলাম স্যার ডাকতে ভুলে গেছ?’
‘না কিচ্ছু ভুলি নাই, আপনার কথা ভোলা সম্ভব না।’
একদিনের জন্য আসবো কেন?
আমি মনে হয় মরে যাবো,….। ….
‘আবার সেই কথা। তুমি আসলে আমাকে ভুল গেছে, ভুলে যেতে চাও, মোটেও ভালবাস না।’
আপনি এসে দেখেন ভুলেছি কিনা।
‘হ্যা, অনকে কিছুই ভুলেগেছ, নইলে অনেককিছু বলতে।’
কি?
‘আমি যা জানি না, যা জানতে চাই, অথচ তুমি গোপন কর।’
তোমার কাছে কিচ্ছু গোপন করিনা।
‘তুমি হঠাৎ করে ওড়না পরে কেন, এসেছিলে?’
কবে?
ছোটবেলা যখন ওড়না পরতে না।
মুখ ঢাকা হাসিতে বলে, ‘বেলা’ মানে কি?
তোমার সাথে কথাই বলব না।
‘রাগ করছেন? ঠিকই তো, ওড়না পরতামনা, আবার পরছিলাম কেন? আপনি আমাকে…..কিছু বললেন না কেন?’
‘তোমাকে আমি কিছুই বলব না, তুমি প্রশ্ন এড়ালে।’
কৈ এড়ালাম?
বেলা মানে জিজ্ঞাস করলে কেন, বেয়াদব?
সেরকম কোন দিন ছিল না!
‘বুঝছি, যাহোক, তুমি শাড়ি পরে কাকে প্রথম ডেকে ছিলে?’
কবে?
আবার? তোমার তো ভুলে যাবার কথা না।
সেগুলো তো কথা না স্মৃতি।
তোমার লক্ষণ তো ভাল না।
মানে?
‘মাদ্রাসায় যাবার আগে তোমার নাম তো সাথী ছিলনা, সাথী নামটা পেলে কিভাবে?’
আমার হাসবেন্ড ডাকে….
‘তার সম্পর্কে যতটুকু বলেছ, তাতে তাকে হাসবেন্ড পরিচয় দেয়া ঠিক হয়নি। হবুহাসবেন্ড বলতে পারতে। সে বিয়ে করতে চেয়েছে, তুমি যতটুকু বলেছ তাতে এমন কিছু হয়নি যা বিয়ের পরে হয়, কাজেই হাসবেন্ড না বলাই ভাল। যাহোক, সেদিন চাঁন রাতের সন্ধায় তুমি প্রথম শাড়ি পরে আমার সামনেই দাড়িয়েছিল, তারপরের কথা মনে অাছে? -তোমার গোপন রাখা সত্যগুলোই যেন তোমার ছোটবোন হয়ে মাঝে বাঁধা হয়ে দাড়ায়। মনে পড়ে না, পরে উঠনে দাড়িয়ে – কি অাশা করেছিলে, কোথায় যেতে চেয়েছিলে?’

সেদিন ফোনে দু’জনের অনেক কথাই হয়েছিল। লোকটা ও’র কাছে জানতে চেয়েছিল ‘তোমার জীবনের প্রথম সবথেকে আনন্দের, সুখের, মজার মুহূর্তটা কখন ছিল, তখন তোমার কাছে কে ছিল?’ ও’ জবাব না দিয়ে এড়িয়ে যায়, বলে ‘সেরকম কোন মুহূর্ত নেই।’

আমি সেদিনও তোমার কাছে তোমার প্রথম সবথেকে আনন্দের আর সব থেকে কষ্টের, এবং ঘৃণার মুহূর্তের কথা জানতে চেয়েছিলাম, তুমি বলনি।
এত কথা এক সাথে বলা যায়না। কাজলীর মা’ও বসে আছে। আপনি বাসায় আসেন।
তুমি আসো, আমার সাথে খাবে।
ধুত।
কি?
একদম মেরে ফেলবে।
কে মারবে? বল।
কেউ না।
তুমি বল না যে – এটাই তো সমস্যা।
ধুত।
শোন শোন, ঠিক বলেছ, সবকিছু বলা যায় না, জানতে তো হয়, চার টাকা দামের পরাটা গুলো কবে যে ছোট হতে হতে তিন টাকার সাইজ হয় তা কিন্তু বলা কঠিন, যখন পাঁচ টাকা দাম হয় তখনই বলা যায়।
মানে?
আমি প্রথম যখন এখানে আসি তখন দাম ছিল তিন টাকা। তিনটা পরটা, ডিম, সবজি উনিশ টাকা। কিছুদিন পরে, সাইজটা বেশ বড় হয়ে দাম চার টাকা হয়। আরো কিছুকাল পরে দাম পাঁচ টাকা হয়, সাইজও বড় হয়, কিন্তু ছোট হবার খবর নজরে আসে না।
আপনার সাথে কথা বলতে আমার আর ভাল লাগছে না।
আমারও ভাল লাগছে না- তুমি আমাকে আপন ভাব না।
‘হেই হেই – আপনি কে যে, আপন ভাবতে হবে? আমি কি না বলছি, অন্য কাউকে বললে…। মরে গেলে বুঝবেন।’
‘আমি এখনই আসতেছি, লাইন কেট না প্লিজ।’
‘যাকে ভাল লাগে তার সাথে কথা বলেন, ভাল লাগলে কাজলীরে পড়ান, না পড়ালে এসে কাজলীর মাকে জানাইয়া যান।’
তুমি নাকি আমার সাথে রাগ করনা?
আপনি কে যে আপনার সাথে রাগ করতে হবে?
এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে?
আপনাকে চিনিই না, আবার ভুলব কি?
ধন্যবাদ তোমাকে, আমি এখনই মরে যাব।
হৈ মিঞা, আপনার কি হয়েছে বলেন তো!
‘তোমার কি? তোমাকে আর আমার হৃদয়ের মধ্যে ঢুকতে হবে না, তোমার হৃদয়ে যে আছে তার হৃদয়ে গিয়ে ঢুক।’
‘এখন…আপনাকে, আপনাকে…আমি নিজেও… একটুকু দেরি করব না- আপনাকে দেখতেও আসব না – মনে রাইখেন।’
মরে গেলে মনে রাখব কিভাবে।
মরলে মরেন, আমাকে শুনাচ্ছেন কেন?
সরি।
‘এহন….,’ কিছুটা কাঁদোকাঁদো কন্ঠে, ‘আমি তো ভুলে যাই; আপনি? -মনে রেখে কি করছেন, আপনাকে যা বলেছি তা একটা কলা গাছকে বললেও ফল হত। অাপনি যে কি তা এখন বলাও দরকার।’
‘আমাকে সম্মান করতে হবেনা। আমি তোমার টিচার না, তুমি যা ইচ্ছে তাই বলতে পার।’
আপনি কি মানুষ নাকি?
তাহলে?
‘আপনি কথা বলবেন না, অাসেবনও না। আমি অনেক ছোট হয়েও আপনাকে অনেক কিছু বলেছিলাম, বিশ্বাস করে। আপনি একটা ইতর। আপনি তো আবার কিছু ভুলে যান না, শুধু মনে রাখেন; না?’
‘আচ্ছা ঝগড়া করেনা, সোনা, তুমি আগে বললে তো অাগেই মরে যেতাম, আর দেরি হবেনা। শুধু জেনে রেখো, তুমি আমার সাথে ঝগড়াও করতে পার, রাগও করতে পার।’
অত সোজ না।
কি?
‘আমি কারো সাথে ঝগড়া করিনা। শুধু কাজলীর মা’কে বলেছিলাম, আপনি সময়মত ঠিকই আসবেন, তাই এত কথা বলালাম।’
আমি জানি তো?
কি জানেন?
তুমি মিথ্যাবাদী!
কি মিথ্যা বললাম?
‘তুমি তো অনেক মিথ্যা বল, নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি, কয়েকদির আগের ফোনে যে কথা বলেছিলে?’
তো?
‘তখন আমি নিষেধ করেছিলাম, তারপরেও তুমি কি বলেছ?’
কি বলেছি?
কেন
‘সেদিনও আমি তোমাকে সাবধান করেছিলাম, বলেছিলাম শুধু যাকে ভালবাসো, যাকে বিয়ে করতে চাও তাকেই কেবল ভালবাসার কথা বলেবে, অন্যদের না। তুমি ভুলে গেলে কেন?’
কৈ?
আমাকে লিখেছ কেন?
‘এহন..’ হেসে দিয়ে বলে, ‘ভাল হবে না কিন্তু স্যার।’
আমাকে ভালবাস, আগে বলনি কেন?
কে ভালবাসে অাপনাকে?
আমাকে কেন তুমি, ‘তুমি’ ‘তুমি’ বলেছ; I love you লিখেছ?
আচ্ছা আর বলবা না। ভুল হয়েগেছে, বাবা।
‘হৈই, এক থাপ্পর দিব, আমি নিষেধ করিনি, কারণ জানতে চেয়েছি?’
কেন লিখেছ
কেন লিখেছ
‘আপনি কি বলেন তো। আমি আপনার কাছে ঋণী হয়ে আছি, তাই। কিন্তু, আমি আপনার দাবীর তলে থাকতে চাইনা। বাসায় আসলে আসেন, আপনার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করব নাকি।’
‘তুমি আসলে অনেক বড় বড় – মানে বড়দের মত কথা বলছ, আমিও বলছি। কিন্তু তুমি সেই ছোট্ট নিষ্পাপ ফুল- মনে হয় তোমাকে জাপটে ধরে বুকের মধ্যে ঢুকায়ে রাখি।’
অনেকটা ভিন্ন কন্ঠে, ‘আমার কিন্তু ভাল লাগে না, ঘরে আসেন।’
‘উদ্ভট কথা বলবে না, ঋণ মানে? তাহলে আমিও তো তোমাদের কাছে ঋণী। তোমার উপর আমার কোন দাবী নেই, থাকবেও না, কিন্তু আমি তোমাকে ভালবাসি। তাই এটা আমার আকাঙ্খা তুমি আমাকে আপন ভাবো আর সবকিছু আমাকে বল। তোমার সব প্রয়োজনের কথা আমাকে বল।’
‘অনেকটা দৃঢ় কন্ঠে বলে, আমি ঠিকই বলেছি, কিন্তু, আপনি……। আর বেশিদিন কিন্তু আমাকে পাবেন না। বাসায় আসেন।’
কিন্তু আমি কি?
বাসায় আসেন, আমার কিন্তু কিছু ভাল লাগে না।
তোমাদের বাড়ি যেতে আমার মোটেও ভাল লাগে না, তুমি চলে এসো।
কেন?
আমার সাথে খাবে।
সেটা সম্ভব না।
কেন? ১০ মিনিটেই আসতে পারবে।

আমি একা যাব কিভাবে, আমাকে মেরে ফেলবে……..।
‘তুমি আবারো ভুল করছ, আমি যেদিন এসেছিলাম সেদিন, তারপরে, সেদিনও তুমি…….’ )

২৮/১২/২০১৮
মোবাইলাটা বন্ধ করে দিল। কিছু কিছু কষ্ট মানুষের চিন্তার বাইরে থাকে। মানুষ ভাবে কোনদিন হয়ত সহ্যই করতে পারবে না, কিন্তু যখন ঘটে যায় তখন তো তা জীবনেরই অংশ। আবার অন্যের কোন কষ্ট দেখে মানুষ অনেক সময় খুব কষ্ট পায় কিন্তু তারা হয়ত ঠিকই মানিয়ে নেয়। লোকটার মনেপড়ে ছাত্রজীবনের একজন প্রিয় শিক্ষকের কথা। এসএসির পরে কলেজ জীবনে সব থেকে বড় প্রাপ্তি ছিলেন সেই শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক। একদিন স্যারের বৈঠক খানায় পাঠদানের মাঝে তিনি যেমনটা বলেন, তাতে একটা ছোট শিশুকে বড় একটা নারকেল গাছে উঠতে দেখে, অনেকের কাছে খুব কষ্ট লাগে, ব্যথিত হয়, ভয় লাগে অথচ সে কিন্তু মনের অানন্দেই উঠে যায়, বিপদও হয়না। তাকে থামাতে গেলে বরং সে অখুশি হতে পারে, বিপদের অাশংকাও বেশি হতে পারে। একের পরে এক বাস্তবতার মাঝে ও’কে দেখে লোকটার প্রচন্ড রাগ হয়, কিন্তু আস্তে আস্তে নিজেকে মৃতই মনে হতে থাকে। ও’দের বাড়িতে সেই প্রথম রাতের পরে……. ও’র হাতে কয়েকজন পুরুষের জিন্স প্যান্টসহ পোশাক দেখেও মনে হচ্ছিল সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। খুব ভোরে লোকটার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। খোলা জানালায় তাকিয়ে থাকে। গাছপালাগুলো অস্পষ্ট, কিছুটা স্পষ্ট হচ্ছে। ও’জানালায় এসে উঁকি দিয়ে বিছানার দিকে তাকাচ্ছে। লোকটা টেরই পায়নি ও’ কখন কিভাবে জানালার কাছে এসেছিল। প্রথমে চেপে রাখা দরজা খোলার মত দরজায় একটু চাপ দেয়, তারপর বিস্মিত হয়ে জানালা দিয়ে ভিতরে তাকায়। লোকটাকে দেখে আরো কিছুটা অবাক হয়। একটু ভাল করে দেখার চেষ্টা, তারপর সিঁড়িতে বসে থাকা। লোকটা নিজেও ছোটবেলা ভোর হওয়া মাত্র দরজায় বসে থাকত যতক্ষণ না অন্য কেউ জাগত। এমনকি রাতেও -অনেকে ভয়ের কারণে দরজা জানালা বন্ধ করত, আর লোকটা দরজা খুলে বসে থাকত, বন্ধ করলেই যেন অস্বস্তি। লোকটা উঠে দরজা খুলে বলে, ‘ভিতরে এসো, তুমি তো দেখি সবার আগে ঘুম থেকে উঠেছ। দরজা নক করতে; ভিতরে এসো।’
কোন কথা না বলে, মুখ ঘুরিয়ে গাছপালার দিকে তাকিয়ে থাকে।
তোমার ঘুম তো কাটেনি, বিছানায় গিয়ে ঘুমাও।
মনে হয় কথা শুনে বিরক্ত হচ্ছে, লোকটা ও’র সামনের সিঁড়িতে বসে। ও’ ঘুম ঘুম চোখে একবার তাকিয়ে হাটুতে মাথাগোঁজে।
পড়ে যাবে তো।
ও’হুট করে উঠে হাটা শুরু করে।
লোকটা বলে, আচ্ছা, আমি চলে যাচ্ছি, তুমি ভিতরে যাও।
কিন্তু ও’ একে বারেই বোবা আর কানে না শোনা মানুষের মত রাস্তার দিকে হেটে যায়। তারপর পিছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে, দরজা যদিও বন্ধ ছিল কিন্তু কিভাবে যেন খুলতে পারে। মোটেও দেরী হয়নি সাথে সাথে ঘর ঝাড়ুর শব্দ। ঝাড়ুটা মনে হয় দরজার সাথেই ছিল। লোকটা ওখানেই বসে থাকে কিন্তু কয়েক দিন আগের একটা ভীতিকর ফোনের কথা মনেপড়ে – হঠাৎ করে তার মন খারাপ হয়ে যায়। কিছুটা দূরে রাস্তায় পথচারীরা লোকটাকে দেখে বিস্মিত হয়ে তাকায়, ইশারায় সালাম জানায়। লোকটাও ইশারায় সালাম জানায় আর বিছিনায় গিয়ে শুয়ে থাকে।
গভীর রাতে অচেনা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল, অনেক্ষণ পরে বলে, ‘হ্যালো’
হ্যালো
কোন জবাব নেই
কে আপনি? কথা বলছেন না কেন?
আমি
একেবারেই কোন শিশুর কন্ঠ যেন কন্ঠ থেকে আওয়াজ বের করতেই ভয় পাচ্ছে।
বল তুমি কে, নাম কি?

কথা বলছ না কেন? কোথায় তুমি?
লেপের মধ্যে।
মানে? কোথায়?
দ্রুত শ্বাস করার শব্দ আসছে কিন্তু কথা বলছে না।
তোমার কোন ভয় নাই, বল কে তুমি, কি হয়েছে?
আমাকে মারে যদি!
এবার লোকটা বিছানা থেকে উঠে বসে, আর ঠিকানা জানতে চায়। জেলা, থানা কিছুই বলতে পারে না, শুধু বলে মইপুবাজার। লোকটার নম্বর কি ভাবে পেল তাও বলেতে পারছে না। কে মারবে, কেন মারবে, তোমার পাশে বড়রা কে অাছে জানতে চায়। কিন্তু শুধু বলে () রানা।
ঠিক করে বল কি হয়েছে? আমি তোমার কি হই? আমার নম্বর পেলে কিভাবে? উনি তোমার কি হয়? উনাকে আমার সাথে কথা বলতে বল।
কিন্তু ওপ্রান্ত থেকে কোন উত্তর আসছে না।
আমি কি করতে পারি? ঠিকানা ঠিক করে বল। আমি কি পুলিশকে জানাবো? তোমার নাম বল।
মেয়েটা হঠাৎ বলে উঠে, ‘দরজা বন্ধ করে নেন।’ তারপর দরজা বন্ধের শব্দ। মেয়েটা তখন যা জানায় তাতে সে বোন বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল। এখন কোথায় তা জানেনা। রুমে মাসুদ রানা নামে একজনই আছে। সে মাত্র বাথরুমে গেছে। লোকটা বাড়ি ঘরের ঠিকানও জানতে চায়, কিন্তু ততক্ষণে ওর হাত থেকে মোবাইলটা ছিনিয়ে নেয়, আর বেশ ভদ্র ভাষায় ‘ছোট মানুষ না বুঝে চাপাচাপি করেতেছিল, কিছু মনে করবেন না’ বলে মোবাইল বন্ধ করে রাখে। লোকটা সাথে সাথে খায়ের আর রাখালকে ফোন করে এবং ও’র কথা জানতে চায়।
ওরা বলে মায়ের সাথে সিনা আপুদের বাড়ি বেড়াতে গেছে। লোকটা ওদের অনুরোধ করে যেন এখনি ফোন করে খোঁজ নেয় আর ও’র সাথে কথা বলে। ওরা কারণ জানতে চেলে লোকটা বলে অবশ্যই কারণ আছে, তোমরা আগে খোঁজ নাও। আর সেই বাড়ি কোথায় আমাকে ঠিকানাটা দাও। কিন্তু ওরা ঠিকানা দিতে রাজি হয়না, বলে কি হয়েছে আগে বলুন, খোঁজ নেয়া সমস্যা না, এখনি নিচ্ছি। লোকটা বলে, আমি কিন্তু এখনি আবার তোমাদের ফোন করছি, তাড়াতাড়ি জানো। কিছুক্ষণের মধ্যে ও’দের সাথে আবার কথা হয়। বলে, আপনি কোথায়? কি ভাবে জানলেন?
মানে?
কিছু না, কিছু হয়নি, সবাই ভাল আছে। তয় ফোন করে ভাল করেছেন। ছ্যাড়ি ভয় পাইছিল। মা’ পাশের বাড়ি গেছিল, ও’ ঘুমে ছিল। ঘুম থেকে উঠে ভয় পাইছে। কিন্তু আপনি জানলেন কিভাবে?
পরে বলছি, আগে বল ও’র সাথে তোমার কথা হয়েছে কিনা? মা’ কি এখন ও’র কাছে অাছে?
হ্যা, ভয়ের কোন কারন নেই।
কিন্তু ও’র কাছে কে গিয়েছিল? কে ভয় দেখিয়েছিল?
কেউ না। আপনি ঘুমান।
লোকটা সেই নাম্বারটা ও’কে দিয়ে জানতে চায় চেনে কিনা? কিন্তু ওদের কাছে মোবাইল নম্বরটা অপরিচিত। লোকটা ও’র মায়ের নম্বর জানতে চায়, কিন্তু ততক্ষণে ও’র মোবাইলের চার্জ শেষ। পরের দিন লোকটা ও’দের বাড়ি আসে। তখন বাড়িতে কেউ ছিল না।।প্রতিবেশী একজন বলে, সকালে বাড়ি ফিরেছে, কিছুক্ষণ আগে স্কুলে গেছে। লোকটা ও’র মায়ের সাথে মোবাইলে কথা বলে, কিন্তু সেখানে চিন্তার কোন ছাপ ছিল না আর সে বাড়িতে এট্যাষ্ট বাথরূম ঘরও ছিল না। লোকটা বাড়ি ফিরে যায়, বেশ কিছুদিন সেই নম্বরে ফোন করে কিন্তু নম্বরটা আর খোলা পায়নি। অনেক দিন পরে নম্বরটা খোলা পায়, বলে এটা ঢাকার নম্বর, ডিসপ্লে নষ্ট হয়েছিল, তাই বন্ধ ছিল অনেকদিন। , আমার ঘরে আমার মেয়ে ছাড়া ছোট কেউ নাই। লোকটা তার মেয়ের সাথে কথা বলার ইচ্ছে প্রকাশ করে কিন্তু তখন নাকি তার মে স্কুলে ছিল। তার পরেই লোকটা বাসার সামনে সন্ত্রাসীদের উৎপাতের শিকার হয়েছিল আর নিজের মোবাইলটাও ভেঙ্গে গিয়েছিল।

ও’ ভিতরের রুমগুলো ঝাড়ু দিয়ে সামনের কপাট খুলল। লোকটাকে শুয়ে থাকতে দেখে ঝাড়ুটা ফেলে উপরে চলে যায়। তখনো সম্ভবত সবাই ঘুমাচ্ছে। ঘন্টা পার হয়ে যায় কোন সাড়াশব্দ নেই। কেউ ঘুম থেকে উঠলে, কোন কথা নেই, সামনের রুমেও আসা নেই, পিছন দিয়ে চলে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ পরে, ও’র মা এসে ফ্লাক্স ভরা চা আর বিস্কুটের প্যাকেট রেখে বলে, ‘ঘুম থেকে উঠে আওয়াজ দিলেই পারতেন। চা খান, সকালে বানাইছিলাম, ঘুমান কিনা, তাই ডাকি নাই।’
রাখাল কোথায়?
সকালেই বেড় হয়েগেছে। আপনার কিছু দরকার হইলে জানাবেন, পিছনে টিউবয়েল আছে।
হ্যা, দরকার তো, কি ভাবে যাবো? আগে মুখ-হাতটা ধুই।
ঘরের ভিতর দিয়ে সোজা চলে যাবেন। বাইরে থেকেও যাওয়া যায়। এটা আপনার নিজের ঘরের মত, কেউরে জিগাইতে হবে না। তিনি ও’কে ডেকে পানি আনতে বলে কিন্তু কোন জবাব নেই। পরে নিজেই পানি নিয়ে আসে হাতমুখ ধোয়ার জন্য। খাবার জলটাও পাল্টে দেয়। বলে, ‘আপনি তো পানতা খাবেন না, ভাত চাপাইছি। খেয়ে বের হবেন, আমি একটু ঐ বাড়ি থেকে অাসতেছি।’
কিছুক্ষণ পরেই খায়ের আসে, ‘স্যার ভাল অাছেন?’ জিজ্ঞাস করেই ঘরে ঢুকে যায়।
তুমি কেমন আছো?
‘জী, স্যার ভাল আছি? উপরে উঠে ছিলেন?’ বলতে বলতে উপরে উঠে যায়। সাথে সাথেই আবার নেমে এসে বলে ‘ছেড়ে দিলাম’।
কি ব্যাপার কি হয়েছে?
চাচী বাইন্দা রাখছিল একজনকে।
কি বলছ? কাকে?
চাচীর কথা বইলেন না, গুড়াগাড়া দুষ্টামি করলেই বাইন্দা রাখে। গুড়াগাড়া মারা তো এখন নিষেধ।
মারা নিষেধ মানে?
জানেন না? স্কুলে বেত নেয়াই নাকি নিষেধ।
ও, তাই…
আপনি স্যার ঘরের মানুষ, ভিতরে অাসেন, মন চাইলে উপরেও থাকতে পারেন।
আচ্ছা, সবাই আসুক, একা একা ভিতরে কি করবো!
স্যার, আপনাকে কিন্তু সবাই খুব ভাল জানে। আপনি আসছেন জেনে চাচাও খু্ব খুশি হয়েছে, কালকেই আসবে আনে।

খায়েরই প্রথম লোকটাকে এবাড়িতে নিয়ে এসেছিল। এবং ও’র মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।
রাখাল তখন নিখোঁজ ছিল। ছেলেটা একদিন দুপুরবেলা গেমস খেলতে আসে। লোকটা স্কুল টাইমে গেমস খেলতে দিত না। রাখাল জানায় তার মা আজ স্কুলে যেতে নিষেধ করেছিল, বাড়িতে মেহমান তাই বাজারে যেতে হবে।
বাজারে গিয়েছিলে?
জি স্যার।
এমন সময় ওর কাকা এসে ওকে বাইরে ডাকে। কিছুটা দূরে রাস্তায় নিয়ে গিয়ে ‘গেমসের নেশায় পাইছে? স্কুল বাদ দিয়ে গেমস খেলতে আসছ’ বলেই কয়েকটা থাপ্পর দেয়।
লোকটা কিছুক্ষণ পরে দাদার দোকানে যায়, সগীর তখন সেখানই ছিল। সেও স্কুলে যায়নি, দোকানের কাছেই কাকার সামনে মারবেল খেলছে।
আজ স্কুলে যাওনি, তোমরা?
না।
কেন?
এমনিতেই।
তাই? স্কুলে না গিয়ে মারবেল খেলছ, কেউ কিছু বলে না?
কে কি বলবে?
রাখাল স্কুলে যায়নি কেন, জানো?
না।
রাখাল এই মাত্র মার খেয়েছে।
কি বলেন, কে মেরেছি?
আমাকে বলেছিল বাড়িতে মেহমান, তাই বাজারে গিয়েছিল। এটা কি সত্যি, যদি মিথ্যা হয় তাহলে আমাকে জানাইও। আমি ও’কে আর পিসি ধরতে দিব না।
দাদা বলে, হ্যা অনেক মেহমান আছে, মিথ্যা বলেনি।
সম্ভবত ওর কাকা জানে না। মনে করেছিল গেমস খেলার জন্য স্কুলে যায়নি।
এর মধ্যে আরেকটি ছেলে বলে, কাকা, আপনি যদি খেলতে দিতেন আমি স্কুলেই যেতাম না, আপনি তো একদিনের বেশি স্কুল টাইমে খেলতে দেন না।
অাসলে কয়টা টাকা খরচ হয় তো, তাই। রাখাল তো একদিনও স্কুলে যায়না, ওর কাকার সাথে দোকানদারি করে।
স্কুল ফাকি দিয়ে মারবেল খেলা বা দোকানদারি করার সুযোগ আছে কিনা জানি না। তবে তোমরা তো জানো, আমার ওখানে গেমস খেলার সুযোগ দেই না।
এর পর লোকটা প্রায়ই খেয়াল করত, ওরা দোকানদারিতে বেশ মনযোগী কিন্তু স্কুলে মোটেও নিয়মিত না। কিছুদিন পরেই কিছুটা নেশায়ও জড়িয়ে যায় – ধুমপানটা স্পষ্ট। লোকটা পথে ডেকে একদিন কথা বলে। ছেলেটা ভালো কিন্তু বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। সে ভালোটা -লাভজনকটাই গ্রহণ করে কিন্তু কোনটা সঠিক তা নির্ধারণে অন্যের পরামর্শটাই বেশি প্রভাব ফেলে। মায়ের উপর ও’র প্রচন্ড রাগ। বাপ ছাড়া কিছু বুঝে না। কিন্ত বাপ বাড়ি থাকে না। বাপ নাথাকলেই মা বকাঝকা করে, রান্নাবান্নাও ঠিক থাকে না। কি কারণে বকে, জানতে চেলে বলে, শুধু শুধু, কথা না শুনলেই বকে, মারে।
কথা শুনো না কেন?
তা আপনিও শোনতেন না।
আজ কি কারণে বকেছে?
আজ তো বাড়িই যায়নি।
গতকাল?
না।
বাড়ি ছিলে না?
ছিলাম, বকে নাই। ও’র কথা আর ও’র ছোট বোনের কথা বলে, ও’দেরকে মেরেছিল; চাচার বাড়ি পাঠাইতে চাইছিল, যায়নি বলে।
যায়নি কেন?
যাবে কিসের জন্য? অতদূর যাইতে পারে?
তোমাকে কবে বকেছিল, কেন বকেছিল?
টিউবয়েলে পানি আনতে যায়নি তাই।
তুমি ছাড়া আর কে অাছে পানি আনার মত?
চুপ করে থাকে, বলে আমিই আনি।
লোকটা না যাওয়ার কারণ জানতে চেলে বলে, বন্ধুরা, চাচাত ভাই- বোনরা হাসাহাসি করে, তাই।
তোমাদের ঘরে তো তুমি ছাড়া পুরুষ মানুষ নেই। কোনটা ভাল? কোনটা বুদ্ধিমানদের কাজ? মা’কে বা বোনকে কলস নিয়ে রাস্তায় পানি আনতে পাঠানো নাকি নিজেদের যাওয়া? তুমি পুরুষ মানুষ, তোমার নিজের যাওয়াই ভাল, উনাদেরকে পাঠানোর মধ্যে বাহাদুরি নেই।
ও’ বলে সবাই তো তা বুঝে না।
সে যাই হোক অামার ধারণা তুমি বকা খাবার কাজই করেছ।
আপনি বুঝবেন না, এমনিতেই বকে, কেউ ঘরে এলেই খালি এখানে সেখানে পাঠায়। আমাকে পাঠায় পাঠায় ওদেরকেও পাঠাতে হবে কেন?
কিন্তু এখন রাগ করে তুমি যে বাড়ি ছেড়েই দিয়েছ, নেশা করছ, এটা কি ভাল হচ্ছে? তোমার বোনরা কিন্তু তোমার ছোট। তোমার বাবা বাড়ি থাকেন না, কাজেই ও’দের ভাল মন্দ দেখাটাও তোমার দায়িত্ব।
কিছুক্ষণ চুপকরে থেকে বলে, আচ্ছা যাবো আনে।
ও’র মা বেশ পরোপকারী, বিশেষ করে গরীবের প্রতি খুবই দরদ, তবে সবার জন্য স্থায়িত্ব টিকে থাকেনা। আর বড়লোকরা যেন অন্তরের মধ্যেই প্রতিপক্ষ হয়ে থাকে, তবে সেরকম সকলের প্রতি আবার সবসময় নমনীয় কিন্তু যাদের ভালোলাগে তাদের জন্য বিশেষ দরদ দেখাবার সুযোগ ঘটলেই যেন তার আনন্দ। সত্যিকার অর্থে অনেকটা সাসসেপটিবল। সেরকম অনেক মানুষই থাকে যারা অনেক দিনের জিয়িয়ে রাখা দৃঢ় সিদ্ধান্ত হয়ত কারো বিশেষ যুক্তিতে নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তেও বদলে ফেলতে পারে, আবার ভুল প্রমাণিত হলে ফিরেও আসে কিন্তু লোক লজ্জার কারণে প্রকাশ করতে চায় না। তারা হয়ত আজ একজনের প্রতি চির কৃতজ্ঞ, বিপদে – অাপদে তাকে পাশে পায়, একেবারেই নিঃস্বার্থ ভাল মানুষ কিন্তু দুষ্টরা কেউ যদি বলে লোকটা খুব বদ – টাকা দিয়ে মানুষ কিনতে চায় তখন তারা ঘৃণা করতে সময় নেয় না। আবার অনেকের কাছে নিজের সন্তানদের স্বার্থ, ভবিষ্যৎ তুচ্ছ হয়ে যেতে পারে কিন্তু ক্ষমতাবানদের কথা ফেলবার নয়, তবে ক্ষমতাবান বলতে পোশাকি পরিচয় কিংবা পেট মোটারাই সেরা, তাদের অভয় বাণীতে সবথেকে বেশি অাস্থা রাখে।
যে চাচার বাড়িতে ও’র বোনকে পাঠাতে চেয়েছিল সেই চাচত ভাইয়ের পাল্লায় পরেই ছেলেটা নেশা শুরু করেছিল তবে দু’একদিনের মধ্যেই মুক্ত হয়ে যায়। বেশ কিছুদিন পরে খায়ের একদিন ওর খোঁজ নিতে আসে। রাখালকে নাকি দু’তিন দিন যাবৎ পাওয়া যাচ্ছে না। লোকটার দোকানে নাকি একজন দেখেছিল।
লোকটা বলে, হ্যা, গতকালের আগের দিন এসেছিল। তারপরে তো দেখেছিলাম ঐ বা দিকের ঘরটার দিক যাচ্ছে।
সব জায়গায় খোঁজ করেছি। এই এলাকাতেই নেই।
কি ব্যাপার, বাড়িতে রাগারাগি করেছে?
কিছু না। একটা চিঠি লিখে ওর বোনের কাছে রেখে চলে গেছে, লিখছে নাকি আর আসবে না।
লোকটা জানতে চায় সেই চাচতো ভাইটা কোথায়।
আপনি ঠিক ধরছেন, কিন্তু সে তো বাড়িতেই অাছে, বলে অনেক দিন যাবৎ ওর সাথে চলে না।
আত্মীয়সজনের বাড়ি খোঁজ নেও, আর পুলিশকে জানাও।
ও’র মা-বাপ কি তা মানে, কান্যাকাটিতে অস্থির। এর মধ্যে কারা যেন বলছে আপনার কাছে দেখেছে, তাই কেউ কিছু বলার আগে আমি তাড়াতাড়ি চলে এসেছি।
কান্নাকাটি তো স্বাভাবিক। তোমরা থানায় জিডি কর। আর ঐ দিকের ঘর গুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখ।
ওটা তো হাউজিং কোম্পানির অফিস। তারা জানে না।
লোকটার কাছে বিষয়টা স্বাভাবিক মনে হয়না। বলে, তোমাদের থানায় জিডি করা উচিত। আর ওখানের সব ঘরে খোঁজ নেও, কারণ আমি দেখেছিলাম ঐ দিকে যেতে। আর আমাকে জানাইও।
পরেরদিনও কোন খোঁজ পাওয়া যাইনি। কোন জিডিও করেনি। দুপুরে দাদার দোকানে লোকটা জানতে চেলে খায়ের বলে, ‘স্যার আপনি বাড়ি চলেন, ও’র মা-বাপরে একটু বুঝাইয়া বলেন, সবাই জিডি করার কথা বলে কিন্তু ও’র মা সাহস পায়না অথচ কান্দে।’ ওদের দাদা বলে, ‘ডাঙ্গর পোলা, হারায় ক্যামনে, কোথাও পলাইছে না হয় মরছে। কান্নাকাটি করে কি হবে, আল্লাহ বিল্লাহ করলে তো হইত।’ দাদা সেরকম বলতেই পারে। তার এক ছেলে বন্যার সময় নিখোঁজ হয়েছিল আর খুঁজে পায়নি। যাহোক, লোকটা খায়েরের সাথে বাড়ি যায়। ও’র মা জানায় ‘গতরাতে ফোন করছিল, কোথায় বলে নাই তয় ভাল অাছে।’ ও’র সেই কাকাটাও আসে। এসে বলে, ‘কি বুঝেন, কোথায় থাকতে পারে?’
তা তো, আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। যে নম্বর থেকে ফোন করেছে তা আপনারা থানায় জানালে পারেন।
আপনি গুনে টুনে কিছু পাননাই?
সে রকম কিছু তো আমার জানা নেই। তবে ও কাদের সাথে চলত, কোথায় যেত তা জানলে হয়ত খোঁজ নেয়া যেত।
পোলা এখন —- গ্রামে আছে, সেখানে খোঁজ লাগাইছে।
খায়ের বলে কোথায় আছে আমাদের জানা হয়েগেছে। গণক টনক বাদ দেন।
ফকিরের কথা মিথ্যা হয়না সত্যি হয়, ঐ ওদের জিজ্ঞাস করে দেখ। ফকির বাড়ির একেবারে বড়জনে বলছে পশ্চিমে গেছে —- গ্রামে, সেখানে খোঁজ লাগাইছে। স্যারে কি বলেন পারবে?
খায়ের বলে, ফকির টকির বাদ। আমরা জানি কোথায় আছে।
লোকটা বলে, এভাবে বল না, এখনো আসেনি তো।
কাকা লোকটাকে আবার জিজ্ঞাস করে, আপনি দেখি কিছুই বলেন না, কি বলেন, পারবে?
আমি কি ভাবে বলব? আমি তো তাদের চিনিই না।
ঐ বাড়ির ওরা তো বলে, যেখানেই থাক না কেন বড় ফকিরে বের করতে পারেন। আপনার কথাও বলে, আপনি অনেক বড় দরবেশ।
যারা একদা মরুভূমি থেকে খয়রাতি সাহায্য পাওয়ার সংবাদে অানন্দ মিছিল করত তাদের রাজনৈতিক দলের অফিস তখনো ওদের ঘরের সামনে হয়নি, কিন্তু তিন দিকেই তাদের সমর্থকদের ঘর। লোকটা বলে অামি তো গণক না। আমি জিডি করার জন্য বলেছিলাম।
ও’র মা বলে, হ্যা, তাই করতে রওনা করেছিলাম, কিন্তু এর মধ্যে পোলাটা ফোন করে। থানা-পুলিশ করতে নিষেধ করে, বলে, ‘নিজের ইচ্ছায়ই বাড়ি ছাড়ছে।’ কিন্তু কয়দিন, আসতে তো হবেই। অাপনি পারবেন স্যার নম্বর নিয়ে জানত?
না। তবে পুলিশ হয়ত পারতে পারে।
কাকা বলে, কি রান্না করছ, স্যারে কি খান? স্যার, আপনার কিছু লাগলে বলেন, দেখেন ছেলেটাকে খুঁজে বের করতে পারেন কিনা? কালকে ফকিরবাড়ি গিয়ে কতগুলো টাকা থরচ করেছে।
আপনি আসলে ভুল করছেন। আমি কিছু খাব না, খায়েরের সাথে এসেছি শুধু দেখা করার জন্য। এখন তো জানলাম, ভাল অাছে।
খায়ের বলে, ভাল না ছাই, টাকা শেষ হলেই কান্দন শুরু করবে আনে! কাকাকে বলে, স্যারে কি কিছু চাইছে নাকি? আগেই ওসব বলেন? স্যারে, গোনাটোনা করেনা, বলল দেখি।
কাকা বলে, যদি খারাপ চক্রে মেলে, ইচ্ছা করে লুকাইয়া থাকে?
ও’র মা আবার কান্না শুরু করে।
সেরকম করলে পত্রিকায় ওর ছবিসহ একটা নিখোঁজ স্যবাদ ছেপে দিতে পারেন।
খায়ের বলে স্যারে একটা ভাল বুদ্ধি দিছেন, তাইলে আর পলাইয়া থাকতে পারবে না।
ও’র কাকা বলে ও’র যে ছোটকালের ছবি আছে তা দেখে তো আমিই চিন্তে পারিনি।
লোকটা বলে, আমার স্টুডিওতে ও’দের ছবি আছে।
মা বলে, ভালোয় ভালোয় না এলে সেটাই করব আনে। ওদের কাকাকে বলে, আর কোথাও যাওয়ার দরকার নাই, স্যারেই পারে, স্যারে অাসলে ধরাদিতে চায় না, ও’র বাপ আসুক। স্যারে, কি বলেন, আমার পোলাটা ফিরে আসবে তো?
লোকটা কিছুটা বিব্রত হয়। ওদের পরিবারের অনেকের মধ্যেই অনুমান ভিত্তিক কথা বলা আর গোয়েন্দাগিরির প্রবনতা আছে। রহস্য তৈরি, রহস্য উদঘাটন, কথার মারপেঁচ ধরা, এমনকি রোগী ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করালে সুস্থ হবে কিনা, বেঁচে থাকবে কিনা ইত্যাদি সব বিষয়েই ওরা কেবল অনুমান করে কিন্তু মন্তব্য যখন করে একেবারে বিজ্ঞের মত দৃঢ়তার সহিত বুঝবার উপায় নেই যে তা অনুমান ভিত্তিক কথা। যার কথা মিলে যায় সেই পরিবারের খেলাফত প্রাপ্ত হয়, সেই যেন বাহাদুর। লোকটা ভাবে, সান্তনা দিয়ে কিছু বলাটাও বোকামি হবে, তবু বলে, আবার ফোন করলে আমার সাথে কথা বলতে বলবেন, আশা করি ফিরে আসবে।

পরেরদিন ও’র বাবা-মা স্টুডিওতে এসে ছবি নেয় আর জানায় বেশ কয়েকবার কথা বলেছে। বলেছে ঢাকায়, আবার চট্টগ্রামেও যেতে পারে। যেতে নিষেধ করেছি, বাড়ি আসতে বলেছি কিন্ত আমার পোলা, জানি কথা শুনেবে না। আপনারে মানে, আপনি দেখেন বুঝাইতে পারেন কিনা।
ছেলেটার সাথে রাতে লোকটা দীর্ঘক্ষণ কথা বলে। তার দাবী, বাবার বাড়ী এসে থাকতে হবে। পরিবারের খরচ দিতে হবে। বাড়িতে কোন ব্যাডাদের -উনার বন্ধুদের আনতে পারবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি। লোকটা ও’র বাবার সাথে কথা বলে। কিন্তু, প্রথমে ও’র বাবা মানতে চায় না, পেশাগত সীমাবদ্ধতার কথা বলে। ওর বাবা অনেকটা সূর্য্যের মত। সনাতনরা সূর্যদেবকে যেভাবে চেনেন তাতে মনে হয় তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং নির্লিপ্ত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তিনি ন্যায় বিচারক নয়। ছায়া তার আড়ালে থেকে যায়। হৃদয়ের তোয়াক্কা করে না, ইন্দ্রের মত গুনে গুনে মাথায় ঠাডা ফেলে না, বরং চোর আর সাধুকে একই ভাবে অালো দেয়। ও’র বাবা বলে তার বাড়িতে থাকা না থাকার সাথে ও’দের কি সম্পর্ক – ওরা স্কুলে যাবে পড়াশুনা করবে তাতে তার কেন বাড়ি থাকতে হবে? কত মানুষই তো বিদেশ থাকে। লোকটা ও’কে বলে, ‘তুমি চলে আসো, বাড়ি না যাও, আমার কাছে থেকে পড়াশুনা করবে।’ ও’র বাবাও তাতে রাজি হয় প্রয়োজনীয় খরচও দিবে কিন্তু ও’র দৃষ্টিতে পরিবারে শুধু ও একা না, অন্যদের ভবিষ্যৎ চিন্তাও ঢুকে গেছে -লোকটাও একই চিন্তা করে। পরে অবশ্য ও’দের বাবা সন্তানদের স্বার্থে বাড়িতে থেকেই কিঝু ব্যবসা করার চিন্তা করে আর ও’কে বাড়িতে নিয়ে আসে। কিন্তু তেমনটা বেশিদিন ছিল না। কিছুদিন পরে ও’র মা একেবারে ছোট বোন দু’টোকে নিয়ে নানা বাড়ি চলে যায়।
কিছুক্ষণ পরে যখন ও’খালি পায়ে উঠন ঝাড়ু দিচ্ছিল, লোকটা নিষেধ করে, বলে তুমি এসব রাখো। আর কর না। প্রয়োজনে এসবের জন্য একজনকে নিয়োগ কর।
ও’ কোন কথাই বলছে না। সোজা হয়ে দাড়ায় কিন্তু আবার ঝাড়ু দেয়া শুরু করে।
লোকটা বলে, আমার কাছে দাও, আমি ঝাড়ু দিয়ে দিচ্ছি।
কিন্ত ও’ কোন কথা বলছে না।
আমার পায়ে স্যান্ডেল আছে, আমার কাছে দাও। তুমি হাত-পা ধুয়ে পড়তে বস।
তার পরেও থামছে না।
ঐ দিকটায় নোংরা, কাটা , আমার স্যান্ডেলটা পরে নাও।
ও” কথার কোন জবাব দিচ্ছিল না, বেশি দূরে আর এগোয়নি, ঝাড়ুটা নিয়ে ঘরে চলে যায়।
তারপর কয়েকটা জিন্স প্যান্ট আর সার্ট হাতে নিয়ে ধুতে যাচ্ছে।
কিছুটা ধমক দিয়ে লোকটা বলে, ওসব কার? রাখো তুমি ওসব।
লোকটা তার নিজের পোষাক যেকোন লন্ড্রিতে দেয় না, অন্যদের পোষাকের সাথে মিশবে, ছুঁত লাগবে তাই, সেখানে ও’র হাতে অতসব দেখে আচমকা মনে হল সবশেষ।
কয়েকটা মুহূর্ত থেমে থাকে।
ও’র মা বলে, সফির প্যান্ট সার্ট নিছ?
হ্যা।
স্যারের কিছু ধোয়া লাগবে কিনা জিজ্ঞাস কর।
লোকটা জানতে চায়, ওসব কে ধুবে?
কোন কথা না বলে, এক পা এক পা করে এগুচ্ছে।
রাখো এসব, যারটা সে ধোবে, তুমি অন্তত ধুয়ো না।
ক্যান?
সবার পোশাক সবার ধরতে নেই। লোকটা ও’র মাকে ডেকে বলে, ও ছোটা মানুষ, ওকে দিয়ে এসব না করানোই ভাল।
আপনার কিছু ধোয়া লাগবে কিনা বলেন।
‘লাগবে, কিন্তু আমারটা আমি নিজেই ধুই, সবার কাছে দেই না। তবে, ও’কে দিতাম যদি অন্যেদের পোশাক না থাকত। তবে আপনারা মনে হয় ভুল করছেন, ঘরের মেয়েকে দিয়ে বাইরের মানুষের পোশাক না ধোয়ানোই ভাল। ও’র বাবা কিছু বলে না?’ ও’ তখন হেটে চলে যাচ্ছে, লোকটা ইশারায় নিষেধ করে। ও’র মা ভিতরের ঘর থেকে বলে, ‘ও’র বাপে দেখবেন এক গাদা নিয়ে আসবে, সাথে তার সঙ্গীদের তাও, আমি কখনো ধরিই না। ঘরে তো ও’ ছাড়া আর কেউ নাই। কে ধুইবে? এবার অবশ্য ও’র বাপে সঙ্গী টঙ্গী নাও অানতে পারে, আপনি অাছেন যে।’
সনাতন ধর্মে নোমো, কায়স্থ আর ব্রম্মনদের মধ্যে হয়ত অনেক পার্থক্য অাছে। কিন্তু তথাকথিত নোমো, যেমন নাপিত, ধোপাদের পক্ষে পেশাগত কারণে ছুঁত মুক্ত হতে পারাটা কঠিন। অধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে তেমন জ্ঞান না থাকলেও লোকটা দৃঢ়ভাবে অনুভব করে যে ছুঁত মুক্ত না হয়ে অধ্যাত্মিকতার বন্ধন হয়ত অনেকটা অসম্ভব এবং সে ক্ষেত্রে মানুষ অধ্যাত্মিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, ফলে সহজেই পাপ করে বসে, অন্যের বুদ্ধিতে প্রভাবিত হয় ও নীতি বিরোধ ভুল করে বসে। কিছুদিন আগে একটা টিভি সিরিয়ালে যেমনটা দেখা গেল, যে নৈবদ্য নিয়ে যাওয়ার পরে স্বর্গের গেটে কিছু ভক্তদের আটকে দিয়েছে, কারণ অনেকটা এরকম যে তারা স্বর্গেগেলে স্বর্গের পরিবেশ নষ্ট হবে। মা’ দুর্গা তাদের প্রবেশের অনুমতি দেয় কিন্তু লক্ষ্মী মা’ নিষেধ করে, লক্ষ্মী দেবীর মতে, ওদেরকে যদি স্বর্গে প্রবেশ করতে দেয়া হয় তবে স্বর্গ লক্ষ্মীছাড়া হয়ে যাবে, শ্রীহীন হয়ে যাবে। মা’ দুর্গা তারপরেও তাদের ভিতরে আসার সুযোগ দিতে বলেন। তারাও জগত মাতার সন্তান আর মায়ের কাছে স্বর্গের শ্রীর থেকে সন্তান বড় – তাছাড়া তাদের ভক্তিতে কোন ত্রুটি ছিলনা। কিন্তু বিদ্যার দেবী মা’ সরস্বতীর মত স্পষ্ট। সবাই দুর্গা মায়ের সন্তান তা সবাই মানে, কিন্ত সেজন্য স্বর্গের পরিবেশ নষ্ট করা উচিত হবে না। দুর্গা মায়ের যেহেতু সন্তানদের প্রতি এতই দরদ তিনি বরং স্বর্গ ছেড়ে সন্তানদের সাথে গিয়ে বসত করুক। তারপর, সন্তানদের প্রতি ভালবাসার টানে দূর্গা মা’ স্বর্ণ ছেড়ে সেই সন্তানদের মাঝে কিছুকাল বসত করেন। সে যাহোক, লোকটা ও’কে থামিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল। আর অাশ্চর্যজনক ভাবে মাসুদ রানার প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু জিজ্ঞাস করতে ভুলে যায়। সে বারান্দার চেয়ারে বসে থাকে। ও’র মা এনজিওর কিস্তি পরিশোধের জন্য বের হচ্ছেন, আর ও’কে ঘরে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু ও’যেন একেবারে বোবা মানুষ, নিজের কোন মতামতই নেই। লোকটার অাগমনে একেবারেই খুশী হয়নি, কিছুক্ষণ পরে একবার এসে আশেপাশের চাচার ঘরে চলে যায়। সগীর একটা বাইসাইকেল এনে সামনে রাখে, ‘এখানে থাকল, কেউরে ধরতে দিয়েন না, স্যার।’
নতুন কিনেছ?
না।
সবসময় এখানেই রাখো?
না।
তাহলে?
ঐ দিকে চোরের ভয়, এখানে তো অাপনি আছেন।
ও’ আচ্ছা।
দুপুর হয়ে যায়, লোকটা চেয়ারে বসে বসে ঘুমিয়ে পড়ে। পিছনের দরজা খোলা। কালো বোরখা পরা একজন কোন কথা না বলেই পিছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকছে। লোকটাকে দেখেও যেন কিছু দেখছে না। ভিতরের রুমে এসে বোরখা খুলতে শুরু করে, লোকটা জানতে চায়, কে আপনি?
বলে, ফতেমা।
কোথা থেকে এসেছেন, বাড়ি কোথায়?
এটা আমার বাড়ি।
তাই? রাখালের মা আপনার কি হয়?
মেয়েটে অত্যধিক কালো। একটা রহস্যজনক হাসি দেয়, কিন্তু কিছু বলে না। সে তার কাজ করে যাচ্ছে। আপনি কিন্তু বলছেন না, ওরা আপনার কি হয়, রাখালের মা বাড়ি নেই, পরে আসেন, অথবা নীচে অপেক্ষা করেন।
‘আমাকে একজনে আসতে বলেছে’, বলে ভীতরের রুমে বসে থাকে।
লোকটা হতবাক হয়ে যায়, ভাবে রাখালের মা’কে ফোন করে জানাবে। নিজের বাড়ি বলছে আবার বলছে কেউ অাসতে বলেছে!
কে আসতে বলেছে, জানতে পারি?
কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।
এরিমধ্যে সগীর সামনের উঠন দিয়ে উঁকি দেয়। লোকটা তাকে ডাক দেয়, কিন্তু সে তার সাইকেলের দিক একবার তাকিয়ে চলে যায়। লোকটা দ্রুত বাইরে বের হয়ে সগীরকে উচু কন্ঠে ডাকে, কিন্তু সে তখন চোখের আড়ালে। একজন পথচারী সগীরকে ডেকে বলে, ‘ঐ তুই কি কানা সাজচ্ছ? তোকে দেখি ডাকে।’
লোকটা সগীরকে উঠনে নিয়ে আসে, ‘দেখ তো তুমি চেন কিনা? পিছনের দরজা দিয়ে এক মহিলা ঢুকেছে, উপরেও উঠতে শুরু করেছিল।’
তাতে সমস্যা নাই চাচী টাচী হবে।
হলে তো ভাল, আমি তো চিনিনা, যদি না হয়?
সগীর একনজর তাকিয়ে বলে তা তো আমিও চিনি না। চলেন তো দেখি।
কে আসতে বলেছে জিজ্ঞাস কর তো?
ও’ কাছে গিয়ে জিজ্ঞাস করে আর এসে বলে, ‘আপনার নাম বলে দেখি।’
‘আমি না, তোমাদের রাখাল হবে হয়ত’ বলে লোকটা রাখাল কে ফোন করে।
রাখাল বলে, আমি কাউকে আসতে বলেনি, প্রশ্নই উঠে না। আপনার কাছে আসছে মনে হয়।
…..
২৪/০১/২০১৯

জান্নাতির কথা লোকটা কখনোই মনে রাখতে চায়নি, কিন্তু সেদিন নদীর ঘাটে এসে কয়েকটা মে বলে, ‘আসলেই মেয়েটা খুব সুন্দর, বুদ্ধিমতী, কতশত মানুষের সাথে লেনাদেনা, খুবই অাকর্ষনীয় অথচ বাঁকা হবার মত নয়,’ তারা ১২/১৩ বছরের মেয়েটাকে বলে, ‘তুমি কি জান্নাতি?’ জন্ম থেকেই সে নদীর ঘাটের দোকানে। বিরক্তি আর ব্যস্ততা নিয়ে বলে, ‘হ, কি হইছে?’
‘কি হয়েছিল, সেটাই তো জানতে চাই!’
মেয়েটা এতই ব্যস্ত যে চোখ গরম করে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকার সুযোগ নেই, তারপরেও বলে, ‘কোথায় কি হয়েছে, কি বলেন অাপনারা?’
লোকটা একটা সিগারেট ধরিয়ে হেটে চলে যায়। আসলে ওদের সময় জ্ঞানটা বুঝি তার মায়ের মতই। মা’ সম্পর্কে সকলেরই উচ্চ ধারণা থাকে, কিন্তু লোকটার জন্য একটা বড় হ্যাযার্ড। কেননা শয়তান অতিসহজেই তাকে বেশ সুবিধাজনক পথে পাঠিয়ে দিতে পারে যা লোকটার সবকিছু নস্যাৎ করে খুব সহজেই। ওদের মত ছোট ছোট কিছু বুদ্ধিমান শিশুরা স্কুলে যাওয়া আসা করে, শিক্ষা গ্রহণ করে কিন্তু পেশা হিসাবে ব্যবসায় মনোনিবেশ করে পাকা ব্যবসায়ীদের মত। সহপাঠীরা যখন উচ্চ শিক্ষার পিছনে ছুটাছুটি করে, অাবার অনেকে ফিরে এসে চাকুরীর জন্য মোটা অংকের ঘুষ লাগবে বলে, ওদের অনেকে তখন বলে, আমি একদিনে যে টাকা লাভ করি তাতে ১০/১২জন কর্মকর্তার এক মাসের বেতন হয়ে যায়, আমার উপার্জনে কোন পাপ নেই, আছে পরিশ্রম, ধৈর্য আর সেবা। লোকটা ছোটবেলা থেকেই রাজনীতিকে সব থেকে সম্মানের বিষয় হিসাবে দেখত। উকিল, পরামর্শক, গবেষকদের দেখত গুরুজনের দৃষ্টিতে – তাদের কাছে এমন কিছু আছে যা সমাজে বঞ্চিতদের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। শিক্ষার প্রতি যথেষ্ট মোহ তবে তা চাকুরী করার জন্য নয়। সমাজে সকল পেশারই প্রয়োজন আছে, কিন্তু তার কাছে ব্যবসাই শ্রেয় তা ক্ষুদে ফেরী ব্যবসায় হলেও। কিন্তু ঠিক সময়মতই অপশক্তি বাসা বাধে তার মায়ের মস্তিস্কে যেন সব ভাল বিষয়কে খারাপ আর খারাপ বিষয়কে ভাল হিসাবে পরিচয় করিয়ে যায়। দোকানদার, উকিল, জেলে – যেন সব থেকে নিচু জাত। তাদের ছেলে-মেয়েদের শুধু তাড়িয়ে দেয়া নয় বরং তারা যেন দ্বিতীয়বার কথা বলার সুযোগ না পায়! বিভিন্ন পেশায় বিভিন্ন স্তরে মানুষের অাচরণে ভিন্নতা থাকে। এমনকি বাড়ন্ত শিশুদের খাদ্যের চাহিদা যে বৃদ্ধদের উপযোগী ভাল ভাল খাবারের থেকে ভিন্ন হতে পারে আবার একজন উচ্চ স্তরের কর্মকর্তা বা জ্ঞানী ব্যক্তিদের থেকে সাধারণ মানুষের আচরণ বা যোগ্যতায় যে ভিন্নতা রয়েছে সেটাও। আবার অর্থ না বুঝে মুখস্ত ধর্মীয় জ্ঞানের জ্ঞানী আর মহাভারতে উল্লেখিত স্থিতপ্রজ্ঞগণের আচরণে ভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। ‘ভগবান বললেন-হে পার্থ মানুষ যখন মানসিক জল্পনা কল্পনা থেকে উদ্ভূত সমস্ত মনোগত কাম পরিত্যাগ করে এবং তার মন যখন আত্মাতেই পুর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করে তখনই তাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়।’ ‘সংযতচিত্ত মানুষ প্রিয়বস্তুতে স্বাভাবিক আসক্তি ও অপ্রিয় বস্তুতে স্বাভাবিক বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়ে তার বশীভূত ইন্দ্রিয় দ্বারা ভগবদ্ উক্তির অনুশীলন করে ভগবানের কৃপা লাভ করে।’ কোলাহল কিংবা নির্জনতা, চপলতা কিংবা অচপলতা এসব সবার জন্য সবসময়ে পছন্দের নাও হতে পারে। ভগবান বললেন- ‘হে ভারত ভয়শুন্যতা, সত্তার পবিত্রতা, পরমার্থিক জ্ঞানের অনুশীলন, দান, আত্মসংযম, যজ্ঞ অনুষ্ঠান, বৈদিক শাস্ত্র অধ্যয়ন, সরলতা, অহিংসা, সত্যবাদিতা, ক্রোধশুন্যতা, বৈরাগ্য, শান্তি, অন্যের দোষ দর্শন না করা, দয়া, লোভহীনতা, মৃদুতা,.. , লজ্জা, অচপলতা, তেজ, ক্ষমা, ধৈর্য্য, শৌচ, অনাভিমান,… এই সমস্ত গুণগুলি দিব্যভাব সমন্বিত ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়।’ কিন্তু শয়তান ধর্মের নামেই মানুষকে বিভ্রান্ত করে মানুষের ভাল গুনগুলোকে তামাশার বিষয় বানিয়ে কর্তব্য কর্ম ভুলিয়ে রাখে। আবার অাসুরিক আচরণগুলে নিয়ে দম্ভ করতে শেখায়। তিনি বলেন, ‘হে পার্থ, যারা আসুরী ভাব নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন, দম্ভ, দর্প, অহংঙ্কার, ক্রোধ, বাক্য ব্যবহারে কর্কশভাব এবং অবিবেচক এই সমস্ত অসৎ ভাব তাদের মধ্যে প্রকাশিত হয়।’..’অসুর স্বভাব বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলে এই জগৎ মিথ্যা, অবলম্বনহীন এবং ঈশ্বর শূন্য।’ যে সমাজ গার্মেন্টস ওয়ার্কার, কন্সটেবল বা স্মার্ট পিয়নদের সাথে পরিচিত সেখানে যদি একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে পুলিশ আর একজন ভাইস চ্যান্সেলরকে স্কুলের শিক্ষক বলে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়, তবে অশিক্ষিতদের বিবেচনায় না হলেও কুশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত অসৎ ব্যক্তিদের তাড়ায় তারা পাগল হিসাবেও বিবেচিত হতে পারেন। ডক্টর, ইন্জিনিয়র, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন পেশার মানুষই নিজেরা কম্পিউটার ব্যবহার করেন, গাড়ি চালান; কিন্তু তাদের কাউকে বা একজন মন্ত্রীকে যদি অজান্তে পরিচত করে তোলা হয় একজন কম্পিউটার অপারেটর বা গাড়িচালক হিসাবে তবে বিপত্তিটা সেরকমই হতে পারে। সেখানে হয়ত কোন বাসের একজন চালক কিংবা দোকানের কোন টাইপিষ্ট অনেক বেশি দক্ষ, বেশি সম্মানিত হতেই পারে। বুদ্ধিমানরা জ্ঞানী- শিক্ষিত মানুষদের কাছে থেকে, জ্ঞান অর্জন করে, শিক্ষা গ্রহণ করে, নানা জটিলতায় পথ চলতে পরামর্শ নেয়ার চেষ্টা করে – তাদেরকে অন্তত বুঝাইয়া -শুনাইয়া পথে অানার চেষ্টা করে না। কিন্তু আবার লোকটা শিক্ষা জীবন থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের পরপরেই মনে হল তার মা’য়ের উপরে কেহ যেন বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে নিজস্ব বিবেক বিবেচনার সীমাবদ্ধতায় লোকটাকে অাটকানোর। মানুষ সুশিক্ষিত, জ্ঞানী, বিবেকবান ভাল মানুষদের কাছে যায় পরামর্শ নিতে, পরামর্শ দিতে নয়। উপদেশ দিতে হয় যারা অজ্ঞ কিংবা বখাটে। উচ্চশিক্ষিতরা উচ্চ পর্যায়ে যে বেতন ভোগ করে তা তো তাদের কথা আর সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতার কারণে, দৈহিক পরিশ্রমের কারণে নয়। কিন্তু সবাইকে যদি বলা হয় তাদের কথা না শোনার জন্য, বরং তাদেরকে একটু বুঝিয়ে টুঝিয়ে দেয়ার জন্য, পরামর্শ দেয়ার জন্য, ভাল পথে অানার জন্য, অথবা তাদের মতই দক্ষ করে তোলার জন্য তাহলে তাদের গলাটিপে হত্যা করাই ভাল। বোকাদের কথা ভিন্ন, কিন্তু শয়তান কখনো মায়ের কাছে সন্তানের জন্য কুপরামর্শ দেবার তাগিদ দেয় না, বরং সুপরামর্শের মধ্যেই অনিষ্ঠ জড়িয়ে থাকে। সেই পুরানো কাল থেকেই বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষ অনেক কিছু বিবেচনা করে। কুসংস্কারের কথা বলে সবকিছুই কি অসম্মান করা যায়! একজন অধ্যক্ষের সন্তান হয়ে কৃষক- শ্রমিক – পিয়নের সন্তানকেও মানুষ গ্রহণ করতে পারে হয়ত কিন্তু জজ কোটের পেসকারের সন্তানকে গ্রহণ করার ঘটনা একটার বেশি হয়েছিল কিনা – লোকটার সন্দেহ!। যারা মন্দিরে মন্দিরে মায়ের পুজা করে, সেই সব সন্তানরাও নিজের মাকেই অাসল মা মনে করে। হয়ত সেকারনেই অপশক্তি সেখানেই বাসা বাধার চেষ্টা করে। শিক্ষিত পুরুষের জন্য শিক্ষিত নারী হয়ত অনেকে জুতসই মনে করে, কিন্তু সবাই নয় -বিশেষ করে যে কুমারী নারী বিয়ে করতে চায় এবং যার স্ত্রী’র থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেবার প্রয়োজন নেই। মন্দিরে অাগত বলতে গেলে সব শিশুরাই দেবী মায়ের থেকে নিজের মাকে বড় মনেকরে। কারণ তারা অনুধাবন করার চেষ্টা করেনি যে দেবী মা, দুর্গা মা কোন ভুল করেননা, তিনি ভুলের উর্ধে, তাঁকে দিয়ে শয়তান ভুল করাতে পারেনা, সন্তানের অনিষ্ঠ করতে পারে না। কিন্তু নিজেদের মা যত অাপনই হোক তারা ভুলের উর্ধে নয়। তাছাড়া, সমাজটা এরকমই যে একেবারে নির্বোধরাও তৎপর থাকেন অন্যদের বুদ্ধি দেবার নামে অন্যেদের উপরে নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবার জন্য, অন্যদের নিজের থেকে অবুঝ প্রমানের জন্য, আর তা যদি না পারে অন্তত দু’টি কাশি দিয়ে বড়ত্ব প্রমান করতে চায়, একেবারে অযোগ্য কিংবা নির্বোধ বেহাহা মতলববাজ শয়তানগুলোও।
ও’র সেই চাচাত ভাই শান মাস্টরের শিশ্য সাবু আর চাচাত ভাইর খালাত ভাইরা সেই কবে থেকেই ও’র মা’কে বলে, ‘কাকী, এত তাড়াতাড়ি মেয়ের বিয়ে দিয়েন না। এ গ্রামের মেয়েরা কিন্তু সব দামি, আপনাদের গ্রামের মত না। এ গ্রামের মেয়েদের সারা বিশ্বে চাহিদা আছে আর আপনার মেয়ে তো এক চান্সে সেরা।’ আরেকজনে বলে, ‘বিয়ে দেয়াই ভাল, এখানে সেখানে কেলেংকারি হবার আগে বিয়ে দেয়াই ভাল।, তাতে অন্তত আমাদের বংশের বদনাম হবে না।’ লোকটার মনেপরে কয়েকজন কল গার্লের কথা যাদের আত্মীয় সজনরাও সেরকস কলঙ্ক মুক্ত এবং চিন্তা মুক্ত কারণ কন্যাকে তারা বিয়ে দিয়েছেন হাফেজের কাছে যারা কিনা এমনিতেই বেহেশতের টিকিট প্রাপ্ত তারউপর এখন মরুভূমির দেশে কর্মরত। তারও প্রায় একবছর আগে ও’র এক চাচাত ভাই আর তার এক প্রতিবেশী সহপাঠীর মধ্যে তর্ক বেঁধে যায়, লোকটার কাছে জানতে চায়, হাফেজ ভাল নাকি ফাজিল ভাল। একজনের দাদী নাকি বলেছেন হাফেজই ভাল – তারা সবাই নামাজ পড়াতে পারেন, সবাই বেহেশতে যাবেন, পরিবারে একজন হাফেজ থাকা ভাল, তাহলে কোন মাওলানারা আর ফতোয়া দিয়ে জানাজা আটকানোর বাহানা করতে বারবে না। লোকটা বলে, ‘আমার কাছ থেকে কিছু জেনে অাবার অন্যদের বুদ্ধি দিতে যেওনা। সবার প্রয়োজন, সবার সমস্যা সবাই হয়ত বুঝতে পারে না।’ এখানে গত দশ বছরে অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু, তার আগে মানুষ ছিল বাস্তবে বস্তুবাদী। মানুষরা এখনও আগের মতই ভাল, কিন্তু অনেকটাই অনুকরণপ্রিয় – অনেকের ভাষায় কালা সিদুর। ফকিরের মত লোকগুলোই তাদের গুরু, শিক্ষাদীক্ষায় অনেকটা শূনো কিন্তু তাতে কি বিশ্ব: কলেজ থেকে পাশ করা ভাগ্নে শান মাষ্টার তো আছে- তার কাছে সে যেন দুনিয়ার সব থেকে বড় পন্ডিত, সে ই তো তাকে সমাজের গুরু মানে। তার মত মানুষরা বেশ পরোপকারী, পরের দু:খ কষ্টে বেশ চিন্তিত হয়ে যায়। কিন্তু সাধারণের জন্য তাদের পরোপকার কর্ম কেবলি পুল করার মধ্য সীমিত, পুষ আপ করা তাদের স্বাভাবে নেই। অথচ নিজেদের অবস্থান চাপরাশি কিংবা ক্লিনার। সেরকম ভাল মানুষরা খুবই অানন্দিত হয় যখন উচু স্তরের মানুষরা তাদের কাছে ঠেকে যায়। পারতপক্ষে তাদের ঠেলে নিচে ফেলা আর নিচ থেকে তুলে পরোপকারী খেতাব টিকিয়ে রাখাতেই তাদের সুখ। আর তার ভাগ্নেরা অনেকে উচ্চ শিক্ষার নামে যা করে, তা মূলত: নিজেদেরকে পথে ঘাটে শিক্ষিত হিসাবে পরিচিত করার জন্য, বেয়াদবী করার জন্য, নিজেদের অাচরণ শুদ্ধি কিংবা নিজেদেরকে ভাল মানুষদের কাছে বিপদমুক্ত রাখার জন্য নয়। বেয়াদবীটা যেনে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকার। তারা মানুষের আত্মমর্যাদার অধিকার লংঘন করে নিজেদেরকে মাহাত্ম্যপূর্ণ করতে। অথচ তারা মূলত; বিবেক বর্জিত ভাবে নিজেদেরকে পিয়ন শ্রেণীর দাসে পরিণত করে রেখেছে। প্রতিষ্ঠান চালাতে তাদেকে বেশ প্রয়োজন কিন্তু সাবধান, তাদের অাচরণে শিক্ষাদীক্ষা, ধর্ম জ্ঞান, বংশ মর্যাদা, রাজনৈতিক দলের অাদর্শ নয় বরং স্বার্থান্বেষী মহলের কানপড়াই প্রাধান্য পায়। এখানের মানুষগুলো এতটাই বস্তুকেন্দ্রিক ছিল যে, খুব সহজেই তাদের মস্তিস্কে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল শিক্ষাদীক্ষা, ভাল আচরণ, ভাল ব্যবহার, বুদ্ধি, নীতি-আদর্শ জ্ঞানসহ মানবীয় ভাল গুনগুলোর থেকে ডাষ্টবিনের অাবর্জনাও মূল্যবান, কারণ তা বিক্রি করে টাকা পাওয়া যাবে। তাদের কাছে কাজ বলতে শারীরিক শ্রম কিংবা ক্ষমতা খাটিয়ে তদবির করে কোন কাজ হাসিল করে দেয়া। আর শিক্ষা বলতে অনেকটা ধর্মীয় শিক্ষাই স্বীকৃত যতক্ষণ না স্কুল শিক্ষিতরা বস্তুগত কোন লাভজনক ফল দেখাতে পারে। বেশ কিছু শিশুদের মধ্য থেকে লোকটা পাঁচজন শিশুকে চিহ্নিত করেছিল মেধাবী ছাত্র হিসাবে। পরে দেখাগেল তারা সত্যই ক্লাশে প্রথম আটজনের অন্তর্ভুক্ত; তবে দু’জনই অমুসলিম। বাকি তিন জনের দু’জন ফসল তোলার বিবেচনায় কতটা সফল হবে তা অনিশ্চিত কারণ তারা ছোটবেলা অন্যদের মত ঈমানি বলে অর্থ না বুঝেই ধর্মীয় জ্ঞানের ধার্মিক নন কিন্তু অমুসলিমদের মতই সুচিন্তিত ও অযাচিত দম্ভমুক্ত। সন্তানহারা ফকিরের মত লোকগুলো এখনো দম্ভ করে বলে, এক দেশ এক নিয়ম, সবাই সমান। তারা সুযোগ পেলেই অন্যায্য দাবী করে, এমনকি তাদের গড়ে তোলা পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও। মার খাওয়া ছেলেদের মাথায় হাত বুলিয়ে, ‘কুকুরের কাজ কুকুর করেছে…’ নীতি বাক্যে বলে লোকটার সামনেই একদিন তিনি সবার দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু নিজের সন্তানকে কেউ কিছু বললে তার জন্য কঠোর শাস্তির কথা বলে বসে। তার আদরের ছেলেটা তখনো বেঁচে ছিল, যার অভিযোগে তিনি স্কুলের শিক্ষককে শুধু লাঞ্চিত করেই থামেনি বরং গর্ব করে বলে বেরাত, এবং সমাজেও প্রশংসিত হত। প্রায় ১২ বছর আগে লোকটার সাথে সে যেচে পরে তর্ক শুরু করেছিল। যুক্তিগুলো খুবই বিরক্তি কর, কিন্তু যুক্তি তো! বস্তুবাদীরা তো যুক্তিতে চলে, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অনেকের মাথায়ই যুক্তি নাই, তারা যখন যেটে শোনে তখন সেটার পক্ষে, শুধু তাই নয়, তারা তা প্রচার করে অাগন্তুকদের বদৌলতে পুরো দেশকে প্রভাবিত করতে পারেন। তারা সুযোগ পেলে আবারো অচেনা মানুষের মত। শান মাষ্টর আর ডাক্তারদের ছত্রছায়ায় কিছু হোটেলে চলা নারী ব্যবসার সুযোগভোগী অনেকে লোকটার উপর প্রথম থেকেই ক্ষেপে গিয়েছিল, কারণ সে ‘অন্যের ব্যবহার করা জিনিস ব্যবহার করে না’ বলেছিল। কিন্তু পাবলিক বাস, পাবলিক টয়লেট, টিউবয়েল আর ব্যত্তিগত জুতা, স্যান্ডেল, পোশাক কিংবা বাসনকোসন এর প্রসঙ্গ যে ভিন্ন তা তাদের আগে থেকেই জানা। লোকটা নিজের বিয়ে আর নারী সঙ্গী গ্রহন সম্পর্কে পানির বোতল খুলে বলেছিল ‘আমার কাছে অনেকটা এরকম, খুলে ফেললে তা গ্রহন করা যায় না’। আগত অনেক লোকজনের সামনে হঠাৎ করেই ফকির বলে উঠে, ‘আপনি যতবড় লার্নেট হন না কেন, এ গ্রামে ভাওতাবাজি চলে না, অন্যের ব্যবহার করা জিনিস ব্যবহার করবেন না বেশ ব্যবহারই করবেন না, করলে সব ব্যবহার করতে হবে।’
‘আপনি যাই বলেন না কেন, সবার রুচি একরকম না। আপনি অন্যের জুতা স্যান্ডেল, পোশাক ব্যবহার করতে চাইলে করেন। কিন্তু, সবার তাতে রুচি নাই, আমারো নাই। তবে অন্যের বাসে চড়ি।’
‘আপনি যান, আপনি বাছাই করে করে ব্যবহার করবেন! এই আপনার শিক্ষা? আপনি অাজকেই গ্রাম ছেড়ে চলে যাবেন। এখানের সবাই এক নিয়মের মানুষ।’
‘ভুলে যাবেন না, আপনি যখন অনেককে মাথায় হাত দিয়ে সান্তনা দিতেন ‘কুকুরের কাজ কুকুর করেছে……’ বলে, আমি কিন্তু তখন আপনাকে জানিয়েছিলাম, যেমন কুকুর তেমন মুগুর, সবার কাছে হয়ত থাকে না, কিন্তু মুগুরেরও প্রয়োজন হয়, অনেক সময় প্রয়োজন সৃষ্টি হলে ইনজেকশন দিয়েও কিছু কুকুর মেরে ফেলা হয়।’
উপস্থিত সবাই নির্বাক তাকিয়ে থাকে আর সে চিৎকার করে বলে, ‘বড় বড় নবী বাসূল গাউস কুতুব’রা মানতে পারে, আর আপনি কে, যে জায়গায় জায়গায় সুবিধামত নিয়ম বানাবেন?’
‘আমি কোন নিয়ম বানাচ্ছি না, আপনি বানাচ্ছেন, আপনার নিয়ম আপনিই মানেন, সবার ব্যবহার করা জলাশয়ের মত নারী আপনি গ্রহন করতে চাইলে করেন, কিন্তু অনেক অনেকবার বলার পরেও অাবারো বলছি, যত বড় ধার্মিকের উম্মাদই হোক না কেন, খোলা কোক যেমন কিনি না, তেমনি সতীত্ব হারানো নারী আমি গ্রহন করি না।’
‘টাক দিয়ে আপনার মাথা ফাটাইয়া দেয়া দরকার–, না করলে, না করেন, অন্যের কিছুই আপনি ব্যবহার করতে পারবেন না।’
লোকটা অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, ফকিরকে বলে, ‘আপনি পাগল না শয়তান বুঝা দরকার, আপনি জেনেশুনে পুরানো কথা নিয়ে নতুনকরে ঝামেলা করছেন। অন্যের উপর এতটা দাবী করা ঠিক না। আপনি টাকার বিনিময়ে সবাইকে পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে দিচ্ছেন, তারমানে আপনার বিবেচনায় আপনার স্ত্রী,কন্যা রাও টাকার বিনিময়ে সবাইকে ব্যবহার করতে দিতে পারে কিন্তু সেরকম যুক্তি অসভ্যরাই মানে’।
ফকির আর তার ভাগ্নেরা আর যাই করুক তাদের ধর্ম ঠিক রাখেন। স্থানীয়রা তাই তাদের বেশ মান্যকরে, এবং অাগুন্তুকরাও প্রশংসা শুনে শুনে অাশির্বাদ দিয়ে দিয়ে বেশ দুঃসাহসী করে তোলে, কিন্তু ধর্ম মানা বলতে, মদপান করেন না, কারণ তা তার ধর্ম নিষেধ করে কিন্তু গাঁজা সেবন ছাড়া যেন তার সাধন ভোজন অসম্ভব। আর পান তা তো সবসময়ের সঙ্গী। একদিকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার তদারকি করতে ছোট ছোট দোকানে প্রতিকাপ চা তৈরি শেষে চামচটা ধুয়ে ফেলা যেন দুধ জড়িয়ে না থাকে, মশামাছি না বসে। কিন্তু কাপগুলো যে পাত্রের পানিতে চুবিয়ে ধোয়া সেই পাত্রের জলে শুধু চামচে ছুঁত লাগানো নয়, পানগুলোও চুবিয়ে তোলা হয়। তাদের ধর্ম মতে দান করা ভাল, আর গোপনে দান করা আরো ভাল, তাই তারা নাকি গোপনে দান করেন। খালেদার রাজনৈতিক পেটের গোসাইদির ব্চ্চা ধার্মিকরা খুব সহজেই বোকাদের ধোকা দিয়ে ধর্মের নামে সমাজ জয় করার অপচেষ্টা করে। সমাজে স্বাভাবিক ভাবেই গ্রহীতার থেকে দাতাদের সম্মান বেশি। লোকটা যখন রেষ্টুররন্টে খেতে বসে, তারা অন্যসবাইকে জানিয়ে কিন্তু লোকটার কাছে গোপন রেখে বলে আসে, ‘যা খেতে চায় খাওয়াবেন, টাকা আমি দিবো’। এভাবেই তারা গোপনীয়তা রক্ষা করে দান করার ইচ্ছা প্রকাশের মাধ্যমে একই সাথে ধর্ম আর সমাজ জয় করে যেখানে অপবাদ দান আর মানবাধিকারের আত্মমর্যাদা লংঘনের পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে উঠেনি। লোকটা সেই গ্রামেরই ছেলে দু’টোকে বলেছিল, ‘কেরোসিনের থেকে পেট্রলের দাম বেশি, তারমানে কি পেট্রল সবক্ষেত্রে ভাল?’
‘ভালোই তো’।
‘তাই? কিন্তু তোমার প্রদীপটায় পেট্রল দিলে ভয়ংকর বিপদ হতে পারে, তোমার নিজের শরীরীরেও অাগুন ধরতে পারে, প্রদীপ নিয়ে পেট্রলের কাছে আসার বুদ্ধি তোমাকে কে দিল?’ ‘কেউ না, কেউ না, একজনের বোন বিয়ে দিবে তো, তাই’।
‘তা নিয়ে তোমাদের এত মাথা ব্যথা কেন? সেই বোনের কি পছন্দ তা কি জেনেছ?’
‘সে তো বলে, বিয়েই করবে না’।
প্রায়ই দেখা যায়, কিছুকিছু শিশুরা খাবারের ওয়াক্তে বলে, খাবো না। তার মানে সবসময় এই না যে তাদের ক্ষুধা নেই বা তারা না খেয়ে থাকতে চায়; তারা হয়ত অপছন্দের খাবার এড়িয়ে যেতে চায় কিংবা পছন্দের খাবার খেতে চায়। মেয়েরাও ঠিক তেমনি প্রথম পছন্দের কথা প্রকাশ করতে চায় না। এটা সবারই উপলব্ধি করার কথা, কিন্তু খুব কম অভিভাবকই তাদের সুযোগ দেয়। কিছুদিন পূর্বে সেই টিভি সিরিয়ালের একটি অংশে যেমনটা দেখানো হয়েছিল, তাতে সূর্যদেব তার সন্তান যমুনার সাথে চাঁদের বিয়ে ঠিক করেন। যমুনা চাঁদের কলঙ্ক সম্পর্কে জানার পরে জানায়, কোন মেয়েই নাকি চাঁদকে বিয়ে করতে রাজী হবে না। তারপরেও সে রাজী – কারণ তার পিতা সেই বিয়ে ঠিক করেছেন – নারী হয়ে কন্যা ধর্ম পালন করাটাও তার কর্তব্য – যদিও সে মনে করে চাঁদকে বিয়ে করার থেকে অাত্মহত্যাও শ্রেয়। জান্নাতিকে অনেক অনেক বছর পূর্বেই দূরে চলে যেতে হয়েছিল। এখন তার বয়স ১০/১২ না, উনিশ/বিশ হবে, আর তার সাখে চাঁদও রয়েছে। জান্নাতির কথা অনুযায়ী সেদিন তার বাবার অাসার কথা ছিল। ও এসে সুযোগের অপেক্ষায় থাকত, সবাই চলেগেলেই লোকটাকে জড়িয়ে ধরত। সেদিন হারিস এসেই বলে, ‘এক থাপ্পর মারবো, বাহির হ..?’
মেয়েটা অাতংকে লোকটাকে খামচে ধরে থাকে। লোকটা হারিসের পরিচয় জানতে চায় আর উচ্চ স্বরে কথা না বলে, চেয়ারে বসতে বলে।
হারিস চেচিয়ে উঠে বলে, ‘ ঐ ছ্যামরী তোরে একেবারে জবই করুম, বাইরে আয়….:
লোকটা জান্নাতির কাছে জানতে চায়, ‘উনি তোমার কি হন?’
বলে, ‘কিছু না।’
‘আপনি কে? এভাবে কথা বলছেন কেন? কি হয়েছে আমাকে বলেন।’
‘হেই মিয়া, আপনি বেশি কথা বলবেন না।’
‘ও ওর বাবা-মার অনুমতি নিয়ে এসেছে, আপনি এভাবে বকাঝকা করছেন কেন?’
‘আপনি চুপ থাকেন বলছি! ওর আবার বাপ-‘মা’কে? আমি ওকে খাওয়াই, আমি ছোটবেলা থেকে পড়াই, আমিই ওর বাপ-মা, জিজ্ঞাস করে দেখেন।’
‘কিন্তু, আপনার রাগ করার কারণ কি?’
মেয়েটার দিকে তাকিয়ে সে বলে, ‘তোরে কিন্তু একেবারে মেরেই ফেলব। তুই বাইরে বের হ, তাড়াতাড়ি।’
‘ও কোন ভুল করেনি, কোন খারাপ জায়গায় আসেনি, অযথা বকাঝকা করবেন না। যাবার সময় হলে, এমনিতেই যাবে, প্রয়োজনে আমি ওর বাবা-মার কাছে নিয়ে যাব। ও ত অাপনার সাথে যেতে রাজি না।’
সদ্য মাদ্রাসা থেকে পাশ করা, মাথায় টুপি, ড্রেসিং করা ছোট ছোট দাড়ি নিয়ে এক হাত জাগিয়ে সে বলে, ‘আপনাকে এখনো কিছু বলি নাই,,,চুপ থাকেন বলছি। সবাইকে জিজ্ঞাস করে দেখেন, ওর বাপ-মা কে, কোথায় থাকে আর ও কার কাছে থাকে, আমি ওর চাচা। আপনি মুরুব্বী, আপনার বাড়িআলাও আপনাকে ভাল জানে দেখে কিছু বললাম না, নাইলে অাপনি যা করছেন তাতে অাপনাকে………
আপনি কিন্তু এবার ভয়ংকর অন্যায় কথা বলছেন। আমি কোন ভুল বা অন্যায় করলে তার শাস্তি আমি ভোগ করতে রাজী আছি, কারো দোহাই বা কোন অছিলা কিন্তু আমি দেই না। আপনি চাচা, শিক্ষক সে হিসাবে আপনি ভদ্রভাবে, ভাল মনে বলেই ও’কে নিয়ে যেতে পারতেন, তাছাড়া ও বলেছিল ওর বাবা অাসবেন।’
‘ওর বাপেই অামাকে পাঠাইছে।’
‘আপনি ওর কিরকম চাচা হন?’
পথচারী দু’য়েকজন বলে, ‘তা মিথ্যা না, অাপন চাচাই, ও হারিসদের ঘরেই খায়লয়।’
মেয়েটা তখনো ভয়ে কাপছিল, লোকটার পিছনে দাড়িয়ে আছে, সামনে অাসতে চাচ্ছে না, ইশারা করে, যেন যেতে না দিয়ে হারিসকে চলে যেতে বলে।
‘তুমি সত্যি করে বল, তোমার বাবা-মাকে জানিয়েছিলে কিনা?’
‘জানাইছি তো!’
‘তাহলে এত ভয় পাচ্ছো কেন? উনি যা বলছেন তা কি সত্যি?’
মেয়েটা চুপ করে থাকে।
‘উনি কি তোমার শিক্ষক? তোমার কিরকম চাচা? সামনে এসে স্পষ্ট করে বল।’
কোন কথা না বলে চুপ করে থাকে।
প্রতিবেশী একজন বলে, ‘আপন চাচা, আপন চাচা। ঐ ছ্যামরি বাড়ি যা। হারিস, তুই ও বা এরকম হৈচৈ করতেছ কেন? ওনার কাছে আসছে তো কি হয়েছে, সব গুড়াগাড়াই তো আসে।’
‘তুমি উনার কথা আমাকে বলনি কেন? উনার কথা আমার কাছে বলা উচিত ছিল। স্পষ্ট করে বল, তোমার বাবার অনুমিত নিয়ে এসেছিলে কিনা?’
‘কিসের কি অনুমিত, ওর বাপে যা বলছে তা তো আমি কিছুই করতেছি না, আপনাকে ভাল মানুষ জানতাম তাই, ও’র বাপে স্কুলে আসতেই নিষেধ করছে। আমি সকালে স্কুলে পাঠাইছি।’
‘তোমাকে কিন্তু এবার অামারই মাইর দিতে ইচ্ছে করছে। আমার সাথে মিথ্যা বলতে নিষেধ করেছিলাম। উনি তোমার চাচা হলে উনার সাথে যাও। আর অাপনি, ওর চাচা হয়ে ওর খারাপ না বরং ভাল কিছুই চাইবেন! ও এত বকাঝকা বা মার খাবার মত কোন কাজ করেনি, বরং অনেক ভাল। আপনি ও’কে বকবেন না, প্লিজ। যদি কোন অন্যায় হয়, তা আমার হয়েছে, আমাকে বলেন, কিন্তু কি অন্যায়- তা আমাকে জানানো উচিত।’
লোকটা হাতে ধরে মেয়েটাকে সামনে নিয়ে আসে, হারিস অনেকটা শান্ত হয়েছিল কিন্তু কাছে যেতেই ও’কে কষে কয়েকটা থাপ্পর দিল, লোকটা বলে, ‘আপনি খুবই অন্যায় করলেন। আমার সামনে আমার স্টুডিওতে দাড়িয়ে অাপনি যা করেছেন তাতে আপনার হাত কাটা যায়। তারপরেও, বলছি আপনারা ওর ভাল চাইলে, ওর পড়াশুনা, ভবিষ্যৎ সবকিছু চিন্তা করে ওর মতামতটাই মেনে নিন। জান্নাতি, তোমার বাবা কোথায় বল, আমি উনার সাথে দেখা করব।’
মেয়েটা কোন কথা না বলে কাঁদতে কাঁদতে দ্রুত চলে গিয়েছিল।
‘আপনাকে আমি অনুরোধ করছি ওর গায়ে আর হাত দিবেন না। আপনি যা করেছেন তার জন্য সারাজীবন আপনাকে আবার কাঁদতে না হয়। ও’কে ভাল রাখতে পারলে আপত্তি নাই, ও’র দায়িত্ব নিয়েছেন কাজেই ভাল মন্দ সব আপনার কাঁধেই পরবে।’
‘আপনি যে কত ভাল মানুষ তা জানা হয়েগেছে, আর কথা বলবেন না।’
‘কি জেনেছেন বলেন? আমি ভাল মানুষ না হলেও খারাপ কিছু করিনি। কারো কানপড়ায় না পরে, আগে সবকিছু জানেন, বুঝেন। ওর ভাল চাইলে, ওকে ভাল রাখতে চাইলে মাথা ঠান্ডা করে ভাবুন, আর আসলে সময়মত নিয়ে অাসবেন।’
দু’দিন পরেই দেখাগেল মেয়েটা স্কুলের সামনে এক বুড়ো ফেরিআলার কোলে বসে অাছে, তারপরের দিন অারেক জনের ।

এই জান্নাতির মত লোকটাও রাখালের জন্য কিছুটা বিব্রত হয়েছিল। সফি’কে তখনো লোকটি দেখেনি, একটি ছেলে এসে বলে, ‘তোদের স্যারের সাথে বেশ ভালোই মানাবে, স্যারের মতই লম্বাচোড়া আছে, মজাই আলাদা।’ সগীর আড়ালে দাড়ানো ছিল, কিছুটা চোখ গরম দিয়ে তিরস্কার করে আর তাকে চলে যেতে বলে। লোকটাকে বলে, ‘স্যার, গ্রাইম্মা পোলা, কাকে কি বলতে হয় বুঝে না।’ আরেকজন, এসে বলে, ‘আমি আগেই জানতাম, এই ছ্যামরির জন্যই লোকটা বারবার এখানে আসে। তুই এখানে দাড়াইয়া আছো ক্যান, উনারা ভিতরে যাইয়া মিলুক। মাইয়া তো জোড় করে আনে নাই, আপন ইচ্ছায় ধরা দিছে।’
‘ও স্যার বলে কি, শুনছেন?’
লোকটা তখন রাখালের মা’কে মোবাইলে জানায়, রাখাল নাকি মেয়েটাকে বিয়ে করেছে, রাখালই নাকি আসতে বলেছে।
কিন্তু ও’র মা বলে, ‘আপনি কিছু বলেন না কেন? ঘরে ঢুকতে দেলেন কেন?’
‘পিছনের দরজা তো খোলা ছিল, আমি নিষেধ করেছিলাম, বলেছি আপনারা বাড়ি তে নেই, যেন পরে আসে।’
‘কোথাকার খারাপ মাতারি, খাইল্লা ঘরে ঢুকে…. আপনি কিছু বলেন না কেন? বাইর করে দেন।’
‘আমি তো পরে অাসার জন্য অথবা বাইরের রুমে অপেক্ষা করতে বলেছিলাম, সে ভিতরের রুমে বসে অাছে। আপনি তাড়াতাড়ি আসেন অথবা কাউকে পাঠান।’
‘ওর বসে থাকা ছুটাবো অানে, আমি আসতেছি, আপনি একলাছা দিয়ে বাইর করেন।’
‘আপনার মে’রা থাকলেও কিছু বলা যেত। এখানে সগীর অাছে, সগীর’কে বলেন।’
‘না না, বান্দর টান্দর ঘরে ঢুকানোর দরকার নাই, অামি অাসতেছে। ছ্যামরি কি চায়, টাকাকড়ি চায় নাকি?’
‘আমি জানি না, তাছাড়া সে নিজেকে রাখালের বউ পরিচয় দিয়েছে?’
‘এত্তবড় সাহস, অামি এসে নেই, রাখাল কে! চিনাবো অানে!’
ও পিছনের দরজা দিয়ে মলিন মুখে ঘরে ঢোকে। কিছু বলবে হয়ত, কিন্তু আবার চলে যাচ্ছে।
‘উনি তোমার কি হয়?’
‘জানি না, বলে চলে যাচ্ছে।’
‘তুমি দাড়াও, তোমার মা না আসা পর্যন্ত ঘরে থাকো।’
বোরখা পরা মেয়েটা বারান্দার দরজায় এসে জিজ্ঞাস করে, ‘আপনি কি হন?’
‘কিছুনা, পরিচিত, গতকাল রাতে ও’দের বাড়ি বেরাতে এলাম।’
‘রাজি তো!’
‘মানে?’
মেয়েটা ঘুরে ও’র দিকে তাকায়, ও তখন পিছনের দরজার কাছে বসে ছিল।
লোকটা বলে, ‘রাখাল সত্যিই কি আপনাকে আসতে বলেছে?’
‘মিথ্যা বলব কেন?’
‘কবে অাসতে বলেছে?’
‘আজকে।’
‘আপনার কাছে আজ গিয়েছিল?’
‘না।’
‘তাহলে? কি মোবাইল করেছে?’
‘হ্যা।’
‘কখন?’
‘সকালে।’
‘কি ভাবে করল? ওর নম্বর তো বন্ধ ছিল!’
‘আরেকজনের নম্বর থেকে বলেছে?’
‘নিজে কথা বলেছে?’
‘হ্যা’ বলতে গিয়ে চুপ হয়ে যায়।
‘নম্বরটা আমাকে দেয়া যায়?’
‘আমার কাছে নাই, বান্ধবীর নম্বরে করেছিল।’
‘বান্ধবী কোথায়?’
‘মাদ্রাসায় গেছে।’
‘আপনিও কি পড়াশুনা করেন?’
‘হ্যা, মাদ্রাসায় পড়ি।’
এর মধ্যে এক মহিলা এসে বলে, ‘ঘরের মধ্যে কথা বলে কারা? আপনারা কারা, বাড়ি কোথায়?’
‘মেয়েটা বলে, আমি হাসনাপুর থেকে এখন এসেছি, উনি গতকাল এসেছে!’
‘ভালোই তো! উনারে তো চিনি চিনি মনে হয়।’
ও’ আস্তে করে বলে, ‘উনি তো স্যার।’
‘এই ছ্যামরি, তুই কি বুঝ? এখানে নিয়ে আসছে কেন?’
ও’ বলে উঠে, ‘উনারে টানো কেন, তোমাগো রাখাল বিয়া করে আনছে।’
মেয়েটাও এগিয়ে গিয়ে বলে, ‘উনি ভাল লোক, উনাকে আমি চিনি না।’
‘ও আচ্ছা, সফি আর রাখাল শুনি ক্যাল ক্যাল ঐ দিকে যায়, তা কি তোগো বাড়ি? কি, কথা বল না কেন? রাখাল বিয়া করছে না ছাই। দেখি মুখ খান। এতো দেখি তোগো স্যারের সাথে রঙ-এ রং মিলে গেছে।’
সগীর বলে উঠে, ‘স্যার ঐ দিকে দেখি আবার আপনার সাথে মিলাইতেছে।’
সগীরের কথা শুনে, ‘ভালোই মানাবে’ বলে ফর্সা রঙ-এর একটি ছেলে ছুটে অাসে আর লোকটা আস্তে করে বলে, ‘তোমারা তো লেখাপড়া করা মানুষ, কালো কালি কি কালো কাগজে নাকি সাদা কাগজে মানায়?’
ছেলেটা এসে বলে, ‘স্যারে তো বিয়ে করেনি, স্যারের সাথেই ভালো মানায়।’
সগীর বলে, ‘শুনছো, বলে তো রাখালের বউ।’
‘রাখাল ওসব বিয়া করবে না, দরকার হয়, রাখালরে পিটাবো আনে। স্যার, আপনি রেডি হন।’
‘কে তুমি, তোমাকে এত বড় সাহস কে দিল?’
‘ভাল কথা বললাম।’
‘সাবধান। নিজে থেকে বলেছ? নাকি কেউ বলতে বলেছে?’
‘আপনি রাগ করবেন, বুঝি নাই।’
লোকটা রাখাল’কে আবার ফোন করে। রাখাল বলে, ‘বিশ্বাস করেন অামি ওর সাথে কথাই বলিনি। আপনি কিছু বললে বলেন, নাইলে চলে যেতে বলেন।’
‘তাহলে তোমার বাড়ি আসতে সমস্যা কোথায়, এখনি বাড়ি আসো।’
তারপর থেকে তার মোবাইল বন্ধ।
এর মধ্য ও’র মা এসে, ‘তুই এখনো ঘরের মধ্যে? তোমার রাঙ্গা মুলা লাগবে! বলে থাপ্পর মারতে মারতে মেয়েটাকে সামনের দরজা দিয়ে বের করে দেয়।
লোকটা ও’র মা’কে বলে, ‘এভাবে মেরে বের করা কি ঠিক হল? পিছন দিয়ে এসেছিল, পিছন দিয়ে চলে যেতে বলতেন! কে, কি কারণে এসেছিল তা তো আপনার জানা উচিত ছিল।’
‘কারণ আবার কি? আপনি তো সব বলেছেনই।’
‘আমি নিজেই তো সব জানিনা, আমাকে যতটুকু বলেছে, আমি শুধু ততটুকু জনিয়েছি।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়ে পক্ষের কয়েকজন চলে আসে। তাদের মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে। প্রতিবেশী দু’একজন মীমাংসা করতে এগিয়ে আসে কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। নির্যাতন করেছে, সাথে অাবার রেফ হয়েছে কিনা? অপহরণ, নির্যাতন, রেফসহ নানা মামলার হুমকী।
লোকটা তাদের কাছে জানতে চায়, ‘আপনাদের মেয়ে কতদিন ঘরের বাইরে? রাতে কি আপনাদের বাড়ির বাইরে ছিল?’
তারা কিছু বলতে চায়, কিন্তু মেয়েটা দুর্নামের ভয়ে তাড়াতাড়ি বলে, ‘না, আমাকে অাজ সকালে আসতে বলছে, তাই এসেছি।’
‘একা এসেছেন নাকি কোন পুরুষলোক সাথে ছিল?’
‘একা এসেছে?’
‘সরাসরি? নাকি অন্যকোথাও গিয়েছিলেন?’
একটা ছেলে বলে, ‘আপনি এত কথা বলেন কেন? আপনি কি জানেন? রাখাল’রা নিত্য নিত্য যাইয়া কি করে, জানেন? মাইয়াটা মাদ্রাসায় যেতে পারে না। সেদিন লোকজন শুধু মারে নাই, তওবা করাইছে – আর যাবে না। বলে, বিয়া করা বউ:
; সবাই তো পিটাইতে চাইছিল। শুধু হক ভাইয়ের কথা বলছে দেখে। বিয়া করা বউ হলে, উঠাইয়া নিয়ে আসবে, তা না যত সব অসভ্যতামি। মনে হয়, ওদের মা-বোন নাই। বেশি কথাবার্তা না বলে, রাখাল’কে ডাকেন। নাইলে, ভাল হবে না। মামলা তো দেবো দেবো… রাখাল যেখানেই থাক আমরা ধরে আনতে পরি।
লোকটা তার কথায় কর্ণপাত না করে, মেয়েটার কাছে জানতে চায়,
‘রাখাল বা এবাড়ির অন্যকারো সাথে কি পথে দেখা হয়েছে?’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নাড়িয়ে বলে, ‘না।’
তাহলে অাজকে যা হয়েছে, তাতে রাখাল বা এ বাড়ির কাউকে কি সেরকম দায়ী করা যায় যে মামলা করবে? যদি অন্যায় হয়ে থাকে তা অাপনার হয়েছে। তাছাড়া ঘটনা যদি অাগে কিছু হয়েও থাকে সেটা অসামাজিক কাজ- আপনি নিজেও দায়ী। তারপরেও যদি কেউ আপনার সাথে প্রতারণা করে, লোভ -লালসা দেখায় তবে আপনার অবশ্যই ঘর থেকে বের হবার আগে অাপনার বাবা-মা, ভাই-বোন বা উনাদের মত প্রতিবেশী অভিভাবকদের জানানোর কথা, তারাই অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারত।’
হক সাহেবও চলে আসেন। তার বিচক্ষণতায় অতি দ্রুত ঘটনার জট অনেকটা খুলে যায়। সফি রাখালের মা’কে ধর্ম মা ঢেকেছে, আম্মু আম্মু বলে রাখালের থেকেও শক্ত আসন দখল করেছে, তার নিজের বাড়ি-আর মা-বাবার বসতি তিন চারশ গজের মধ্য, কিন্তু সে রাখালদের বাড়িতেই থাকে। দৈনিক নগদ উপার্জনের টাকায় সে সমবয়সীদের মধ্যে বেশ সচ্ছলই নয় বরং বিপদে আপদে কিছু প্রতিবেশীর কাছে বেশ নির্ভরযোগ্য। সেই নাকি রাখালের বিয়ের ব্যবস্থা করতে চায়। ও তখন ৫ম শ্রেণীতে উঠেছে। যদীয় ধর্ম বোন ডাকে কিন্তু চুপে চুপে অাংটি পরিয়েছে, ও’র মায়েরও তাতে সম্মতি ছিল। সমস্যা হবেনা কারণ আগত বোরখা পরা মেয়েটাও তার ধর্ম বোন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রাখেল’কে বিয়ে না করিয়ে ও’র নিজের বিয়েটা অসামাজিক হয়ে যায়। তবে লোকটার অাগমনে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। কেননা, গতরাতে লোকটার সাথে রাখাল আর তার মা’য়ের যে কথাবার্তা হয় তাতে তারা নতুন ভাবে চিন্তাভাবনার প্রয়োজন মনে করছে। সফি দুপুরে বাড়ি আসেনি। কোথায় কাজ করে- হক সাহেব খবর পাঠিয়েছেন যেন ধরে নিয়ে আসে। বাড়িতে ফিরে সে যদীও নিজেকে ওসবের সাথে জড়িত নয় বলে দাবী করে, কিন্তু উপস্থিত সবার মতে তাকে পুলিশে দিয়ে দেয়া হয়, যেখানে রাখালকেও আসামী করা হয়। কিন্তু সন্ধা হতে না হতেই ওদের মা ছুটছুটি শুরু করে তাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য। চেয়ারম্যানসহ সরকার দলের লোকরা মোটেও হস্তক্ষেপ করতে রাজী হয়না। ও’র মা লোকটাকে বলে, ‘টাকাপয়সা গেলেও তাকে ছাড়িয়ে অানতে হবে, নিজের বাবা-মা ছেড়ে আমার কাছে থাকে, আমাকে মা ডাকে, ওদের বাপ বাড়ি থাকে না, পোলাটাই বাজার সদায় করে, আমার ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করে, গতকালও ছোট মেয়ে দুইটাকে কি সসুন্দর গোসল করিয়ে দিছে। আজকালের ছেলেরা নিজের ভাইবোনেরও এত খোঁজ রাখে না। ছেলেটা একেবারে এতিম -খাটাখাটনি সব আমাদের জন্যই করে।’
‘কিন্তু সে ফোন করার কথা অস্বীকার না করে, সালিশ মানলেই পারত।’
‘ও’আসলেই নির্দোষ সফি আরেকজন আছে।’
‘মানে?’
উনি এড়িয়ে গিয়ে বলে, ‘ছাড়াইতে না পারলেও ও’র বাপ-মা’কে কিছু টাকা তো দেই, পোলাটাকে নাকি থানায় পিটাইতেছে, না খাওয়াইয়া রাখছে।’
‘সে যদি নির্দোষ হয় তাহলে আপনি হক সাহেবের মাধ্যমে পুলিশকে জানাতে পারেন।’
‘তা শুনবে না, তাদের দল অালাদা।’
‘আমি কি করতে পারি? তাছাড়া ছেলেটা নিজেই তো বলেছিল তাকে থানায় আটকে রাখতে পারবে না।’
‘চেয়ারম্যানের কাছে লোক গেছিল কিন্তু, চেয়ারম্যানে উল্টা বকাঝকা করছে, এসব মামলায় কোন তদবিরই করবে না। ও’র বাপ-মা খুব কান্নাকাটি করতেছে, আমাকেই দোষারোপ করছে। ঘরে আমার ডাঙ্গর মে, আমার মেয়েরও বদনাম শুরু করছে।’
ও’ ভিতরের রূমে ছিল দরজার কাছে এসে উকি দিয়ে দাড়িয়ে থাকে।
‘তোমার ভাইয়ার জন্য কি তোমার মন খারাপ?’
ও একটু হাসি দিয়ে ভিতরে চলে যায়। ভিতরে গিয়ে এক গ্লাস জল ঢেলে খায়।
ও’র মা বলে, ‘রাতের মধ্য ছাড়াইয়া আনতে না পারলে নাকি অনেক বছর জেলে খাটতে হবে। জায়গা জমি যায় যাক’, বলে ও’কে ডেকে বলে ‘মোবাইলটা দে তো।’
কিছুক্ষণ পরে মোবাইলটা হাতে এনে দেয়। মোবাইলে বাতি জলছে না।
ও’ এর মধ্য এক জগ পানি এনে টেবিলে রাখে আর খালি জগটা নিয়ে যায়।
ও’র মা প্রচন্ড ক্ষেপে গিয়ে ও’র পিঠের উপর একটা চর মারে, ‘তোকে মোবাইল ধরতে নিষেধ করছিলাম তারপরেও…।’
‘চার্জ শেষ হয়ত!’ বলে লোকটা নিজের মোবাইল বের করে।
‘আপনি কি বলেন, ফুল চার্জ দেয়ে ব্যাটরী এই মাত্র লাগাইছি বলে’, ও’কে আবার মারতে উঠে। তারপরে লোকটার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে কথা বলে। তারপরেই বোরখা পরে বের হয়ে যান।
ও ভিতরের রুমে থেকে বলে, ‘স্যা-আর আপনি দুপুরে কিছু খাইছেন?’
‘লোকটা হেসে দিয়ে বলে খাবো কখন, ওদের ঝামেলাতে তো মনে হয় সবার খাবারই বন্ধ। তুমিও না খেয়ে অাছো?’
উত্তর না দিয়ে বলে, ‘আপনি আসছেন কেন?’
‘তুমি কাছে আসো,’
উকি দিয়ে বলে, ‘কেন?’
‘কাছে তো আসো’
আবার আড়ালে চলে যায়।
‘খেয়েছ কিনা বল? সামনের দোকানটায় কি পাওয়া যায়?’
আমি চাচীদের বাড়ি খাবো আনে, ‘আপনি বাড়ি যাবেন না!’
‘যাবো কেন? আমি তো তোমাদের বাড়ি থাকবো।’
‘থাকেন, সইফ্ফা কি সত্যই ছাড়া পাবে না?’
‘তোমার মন খারাপ?’
ও’র মা এসে বলে, ‘সুলতান হুজুরে দেখা করতে বলছে, কিছু টাকা দিলেই নাকি ছেড়ে দিবে।’
‘তাই, তাহলে তো ভালোই, কে তিনি?’
ও’র মা উঠানের অফিস দেখিয়ে বলে, ‘বড় জন। তারা তো এখন ক্ষমতায় নাই, ক্ষমতায় থাকলে এক টাকাও লাগত না, কখন ছাড়িয়ে আনত। আর চেয়ারম্যানরে টাকা দিলেও বলে ছাড়াইতে পারবে না।’
ও’ এক নজর তাকিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে যায়।
‘ও সম্ভবত না খেয়ে আছে।’
‘ও’র খাওয়েনের অভাব, ওই ছ্যামরী স্যারের জন্য সগীরদের ঘর থেকে ভাত এনে দিলেও তো পারতি।’
‘না, অন্যদের ঘরে থেকে কিছু এনে দিতে হবে না, প্রয়োজনে আমি দোকান থেকে খেয়ে নেব। আপনি ঝামেলা মিটান।…. চেয়ারম্যান কি টাকা নিয়েছিল?’
‘না, হে কি টাকা নিবে? হে থানাপুলিশ ডড়ায় মনে হয়’ বলেই আবার বের হয়ে যান।
রাতে নাকি মাত্র চার হাজার টাকার বিনিময়ে তারা আসামীকে ছাড়িয়ে এনেছিল।

(০৩/০৩/২০১৯)

পরেরদিন অবশ্য পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকেনি। খুব সকল বলা যায় না, জানালায় এসে উঁকি দিয়ে সড়ে যায়। আবার উঁকি দিয়ে নিজে নিজেই, ‘ঘুমায়’ বলে সরে যায়। লোকটা উঠে দরজা খুলে দেয়। বলে, ‘স্যার, আপনি এত সকালে উঠেছেন কেন?’
কেন, উঠলে কি হয়েছে?
কিছু হয় নাই!
ভিতরে অাসো।
কেন?
বাইরে দাড়িয়ে থাকবে কেন?
দাড়িয়ে থাকব না তো!
তাহলে?
আপনি কোথাও যাবেন?
কোথায়?
হাটতে যাবেন না?
সকাল হয়নি তো এখনো।
ঠিকই তো এখনো রাত, চাঁদ দেখা যায়।
তাই?
এই যে!
তুমি যাবে অামার সাথে?
অত দূর! আপনি তো দূরে রাস্তায় রাস্তায় হাটেন, অত দূরে যান কেন? ঐখানে ঐখানে হাটতে পারেন না? না না থাক, ঐদিকে কাদা পিছলা, পড়ে যাবেন।
কেন, তুমি পড়ে গেছিলা?
শীত আসুক হাটতে পারবেন, এখন একদম কাদা, বৃষ্টি হয়েছিল তো।
তুমি এত সকালে ঘুম থেকে উঠ কেন?
দাদি উঠায়ে দেয়!
তারপর?
তারপর কি, দাদা দোকানে যায়।
আর তুমি কি কর?
কিছুনা!
এখন কি করবে?
আরেকটু বেলা হোক, তাল টোকাতে যাবো!
তোমাদের তাল গাছ আছে?
না, ঐ দিকের বাড়ি।
কিছু বলে না।
না, বলবে কেন?
বাহ্! অন্যদের তালগাছের তাল তুমি কেন অানবে, তোমাদের পেয়ারা যদি নিয়ে যায় কেউ?
এত্ত সাহস কারো নাই; তয়, নেয় তো চুরি করে করে।
আচ্ছা, তুমি তাহলে জোড় করে নিয়ে আসো।
তাল তো সবাই নেয়, গাঙ্গ পাড়ে কত তাল পড়ে থাকে ভাদ্র মাসে।
তাই তো! তা তো সবার। আচ্ছা, কিন্তু, এখন কি মাস।
এগুলো বারো মাইস্যা তাল।
তাই? কিন্তু তুমি একটা বংশীও বাড়ির মেয়ে হয়ে অন্যদের বাড়ির তাল টোকাতে যাবে কেন? যদি বকা দেয়?
ঠিক বলছেন, অার যাবো না। ঠিক বলছেন, অাগে কিছু বলত না, এখন রাস্তার ব্যাডারাও ডাক লয়।
কেন, কেউ কিছু বলেছে নাকি?
সেইদিন এক শয়তান ব্যাডা রাস্তা দিয়ে যাইতেছিল, কি চোটপাট, মনে হয় যেন হেই মালিক, যাগো গাছ তারা কিছু বলে না, অার শয়তান ব্যাডাডা কয় গাছের লগে বাইন্দা রাখবে, ধরতে পারলে নাকি পিটাইবে, তারপরে যাদের গাছ তারা বের হয়ে দিছে ব্যাডারে বকা।
‘তোরে ঘরেই ঢুকতে দিমু না, তুই এমনে ওমনে তাল টোকাইতে যাও’, – ও’র বাবা তখনো উপরে, ঘুম থেকে উঠে নীচে নেমে আসে। ও’ চুপ করে বসা ছিল। ও’র বাবা এসে বলে, ‘স্যার ও’কে ঘরেই ঢুকতে দিবেন না, যেখানে মন চায় সেখানে যাউগ্গা’। ও’ উঠে সোঁজা হাটা শুরু করে।
অাসলে সফি ছাড়া পাবার ঘটনাটা ও’ তখনো জানত না। লোকটা ডাক দিয়ে বলে, কোথায় যাচ্ছো?
‘কোথায় আবার তাল টোকাতে যায়, আজকে ও’র পিঠের উপরেই তাল পরবে আনে!’
যাই আমিও হেটে আসি।
কিন্তু ও’ হাটা বন্ধ করে, ও’র বাবার দিকে একনজর তাকায়, তারপর জমা করে রাখা কয়েকটি তালের স্তুপের কাছে গিয়ে বসে শিকড় বের হয়েছে কিনা।
লোকটাও এগিয়ে যায়, ও’র বাবা আস্তে করে বলে, ‘এ বান্দরামী আমি নিজেও করতাম, খাইতে কিন্তু দারুণ লাগে’।
তা ঠিক বলেছেন!
‘ওরে নিষেধ করব কি, ও’ ত টোকাইয়া টোকাইয়া অানছে, কিন্তু নিজে কাইট্টা তো খাইতে পারে না, আমাগো বুড়াগুলার পেটেই বেশি যায়’ বলে ও’র বাবা বাইরে চলে যায়। যাবার সময় বলে, ‘আপনি আবার চলে যাইয়েন না, না খেয়ে যাইয়েন না, চা বানাচ্ছে।’ ও’র মাকে ডেকে বলে, ‘ভাত হইছে? দেরী হইলে, আগে চা -পানি দে স্যারেরে’।
আপনি কৈই যান তয়?
আরে যাই না, মিরাইজ্জার মায়ের লগে কথার কাজ সেরে আসি।
ও’র মা এবার ও’কে বকা দিয়ে বলে, ‘তোমার পিঠের উপর তালের আটি খাওয়াবো আনে! ঘরের কাম কাজ রেখে তানিবানি কর?’
আমি আবার কি করলাম?
একেবারে জুতা দিয়ে দিব, স্কুলে যাওনা কেন?
সকাল বেলা স্কুলে যামু, না! স্কুলদি বন্ধ!
সইফ্ফা আইতেছে, তোরে কোন বাড়ি নেবে না দেখিছ; সংসারের কাজ রাইখ্খা আবার কাইজ্জা কর।
মুহুর্তের মধ্যে ও’র চোখ ছলছল করে উঠে। লোকটার দিকে একনজর তাকিয়ে মাথা নিচু করে ঘরের পিছনের দরজায় চলে যায়। লোকটা আবার বিছানায় শুয়ে পরে। ও’ ঝাড়ু হাতে সরাসরি বারান্দায় চলে আসে।
ঘর ঝাড়ু দিবে?
কোন কথা না বলে, শুধু সামনের রুমটা ঝাড়ু দিয়ে পিছনে চলে যায়, তারপর পিছনের দরজায় চুপ করে বসে থাকে।
লোকটা ও’কে ডাক দিয়ে জানতে চায়, তোমার মা কী রান্না করছে?
একটা দীর্ঘ শ্বাসে উঠে এসে বলে, স্যার কি বলেন?
শুনতে পাওনি?
হ্যা, শুনেছি, ভাত, ডাল, কি যেন তরকারি আর ডিম ভাজবে মনে হয়!
তুমি তাহলে রান্না ঘরে যাওনি?
কিছুটা বিব্রত হয়ে যায়, কিছুটা বুদ্ধি খরচ করে বলে, ‘আমি গিয়ে কি করব, আমি তো রান্না করতে পারি না’।
ও’র খালাত ভাই ঘুম থেকে উঠেই, ও’র পিঠে থাপ্পর দিয়ে বলে, কইতে পারো না, রান্না ঘরে ঢুকলে মা বটি নিয়া লড়ায়’।
ও’ দ্রুত হাতটা সরিয়ে নেয়, কিছু একটা বলবে করে, কিন্তু কিছু না বলে দরজার আড়ালে গিয়ে দাড়ায়।
ও’র মা রান্না ঘর থেকে হেঁসে হেঁসে বলে, ‘ভায়ড়ার ছেলের ঘুম ভাঙ্গছে বুঝি?’
ঘুম কি আমার এখন ভাঙ্গছে?
এহনো উঠ না, বিছান ভিজাইছ নাকি?
পাক্কা মারা কথা পাইছেন কই? এবার বাড়ি যাইয়া সবাইরে কমু আনে!
লোকটা পুরোপুরি বিরক্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে ও’কে জিঞ্জাস করে ‘তুমি, কোথায় তুমি? আজ স্কুল বন্ধ কেন?’
ও’ কোন কথা না বলে দরজার আড়ালেই দাড়িয়ে থাকে।
খালাত ভাইটা বলে, ‘তুই তো বোন ভালোই, ভালো থাকিস, তোর মায়ের মত হইস না।’ লোকটার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলে, ‘ও’র মায়ের যে কথাবার্তা তা নানা-নানীও সইতে পারে না, কার সামনে কি বলে কোন হুশ নাই।’
ও’ স্কুল ব্যাগটা হাতে নিয়ে একা একা বলে, ‘স্কুল যে কেন বন্ধ করে!’
‘বলদা বলদা কথা কও ক্যা, স্কুল বন্ধ কেন তা কি আমরা জানবো না তুই জানবি? তোগো স্কুলের মাস্টাররা জানবে, আমাগো জিগাও ক্যা?’
‘চোপেন আপনি, আপনার কাছে জিগাই নাই।’
‘স্যারের কাছে জিগাস করছ, স্যারের কাছে যাইয়া জিগাস কর?’
‘আপনি চোপেন! উনি দাদা ভাইদের স্যার, আমারে পড়াইলে তো কাজই হইত।’
এর মধ্য ও’র মা একটা গরম খুনতি নিয়ে এসে তার ভায়ড়ার ছেলেকে বলে, ‘আমি পাক্কা মেরে কথা বলি না? এক্কারে বাপের নাম ভুলাইয়া দিমু।’
‘শুধু! শুধু! এয়ারে কি কয়? স্যারে ঐ জায়গায় বসা আর আপনি!’
‘উনি আছে উনার ভাবে, তাতে তোর কি, তুই বিছানা দিয়ে নাম।’
‘স্যার ঘরে, স্যার ঘরে থাকলে নিশ্চুম থাকতে হয়।’
ও’র বাবা এসে বলে, ‘কই? ভাত কই? এয়া মানুষে সইতে পারে, স্যারে ভিন দেশী মানুষ এতক্ষণ বসে আছে, শিক্ষিত মানুষ কিছু কইবে না বুঝি, কিন্তু কুটুম বাড়ির মেহমান যাইয়া তোর বাপ-মায়েরে কইবে আনে কি?’
‘হেয়া, হ্যাগো মাইয়ার খবর হেরা ভালই জানে, মোর বাপে শুধু কইয়া দেছে, যাও যাও, কিন্তু ভায়ড়া বউ-এর যেন মুখ না ছোটে।’
ও’রে মাবুদ।
ও’ একটু হাসি দিয়ে পিছনের দরজার দিকে একটু এগিয়ে যায়, কিন্তু আবার ঘুরে সামনের রুম দিয়ে বাইরে চলে যায়। ও’র মায়ের মুখ এবার ছুটবে বুঝি।
২৪/২৫ বছরের মানুষটা তার খালাকে ডাক দেয়, ‘ভায়ড়া বউ কোথায়’ বলে; ‘আমার না হোক আমার বাপের তো……।’
এর মধ্যেই ও’র মা ঘর থেকে তেড়ে আসে, ‘তোর মা তাইলে তোর কি হয়? জুইকে নিয়ে আসতি, তাইলে স্যারেই বিচার করত আমার মাইয়া না তোগ মাইয়া মুখ ছোটা।’
লোকটা সামনের রুমে বসা ছিল, সে বাইরে চলে আসে।
তোমার স্কুল খুলবে কবে?
১৫দিন পরে।
কিসের বন্ধ?
জানিনা, স্যার আপনি জানেন?
এখন তো জ্যৈষ্ঠমাস।
হ্যা হ্যা মনে পরছে গরমের বন্ধ।
কি মনে পরেছে?
স্যারেরা বলেছিল কি.. যেন!..গরমের কি যেন মাস?
গ্রীষ্ম…, মাস না কাল?
হ্যা গ্রীষ্মকালের বন্ধ। কিন্তু বন্ধ দেয় কেন, স্যার; বন্ধ না দিলে কি হয়?
এর মধ্য ও’র বাবা বলে, ‘আসেন আসেন ঘরে আসেন।’
স্কুল বন্ধ থাকলেই তো সবার মজা।
‘স্কুল সবসময়ই খোলা থাকা ভাল- রাত্রেও, তাইলে যখন মন চাইত স্কুলে যাইতাম গিয়া।’
দুপুরে যখন লোকটা ঘরে ফিরে, তখন ও ড্রেসিন টেবিলের সামনে দাড়ানো আর সফি পিছনে দাড়িয়ে চুল অাঁচড়ে দিচ্ছে। লোকটার উপস্থিতি টের পেয়ে সফি দ্রুত ও’র মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরার চেষ্টা করে, তারপরে বারান্দায় এসে বলে, ‘স্যার কেমন আছেন, আপনি আসছেন ভাল হয়েছে। আপনি এখন দায়িত্ব বুঝে নেন, আমার আর থাকা ঠিক হবে না।’
ঠিক বুঝলাম না, কি বলছেন?
‘এয়া আমি বুঝাইতে পারবো না, ও’র খালাত ভাই আসছে, দেখছেন?’
হ্যা, কি হয়েছে?
‘যা দেখেছেন, তাই, আরো কত কি! জানি না।’
০২/০৪/২০১৯
(পান্ডুলিপি অসমাপ্ত)পোকা সব মরে যাক(৩)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *