হাছিনা বুবুর বারবার তিনবার আর বাংলাদেশের সংখ্যালঘু

একবার নয়, দুবার নয়, বারবার তিনবার হাসিনা বুবু, বাংলাদেশের ইলেকশন জিতে মদিনা সনদের সিংহাসনে বসবেন । সেই ‘৭০ এর পূর্ব পাকিস্তানের আমল থেকেই ইলেকশন মার্কেটে আওয়ামী লীগের পেটেন্ট পুঁজি সে ভূখণ্ডের সংখ্যালঘু বাঙালি হিন্দু ভোটাররা । সংখ্যালঘু দরদী আওয়ামী সরকারের শাসনামলে, স্বাধীন বাংলাদেশে যতই সংখ্যালঘুর জমিজমা লুট হোক, যত সংখ্যালঘুই ঘুম খুন, ধর্ষিত হোক না কেন, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু বাঙালি ভোটার, ভোটের দিন সকালে স্নান করে, ইস্তিরি করা জামাকাপড়ের পাট ভেঙে,গায়ে দিয়ে দৌড়েছে তাদের ঠিকাদার আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে । এই যে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুর আওয়ামী ডেডিকেশন, তার এক প্রধান কারণ হলো নিজ জন্মভূমে নিরাপদে, মানুষ পরিচয়ে জীবন যাপনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা । ১৯৪৬ থেকে দ্বিজাতিতত্ত্বের রক্তক্ষয়ী থিওরি এই ভূখণ্ডের সংখ্যালঘু হিন্দু বাঙালিদের জন্য এক বিভীষিকা হয়ে বারেবারে উপস্থিত হয়েছে । হ্যা, ১৯৭১ এ এই ভুখন্ড স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেওয়ার পরেও । তিনবারের বার বাংলাদেশ মদিনার সিংহাসনে বসে এইবার হাসিনা বুবু কি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মানুষ পরিচয়ে জীবন যাপনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম হবে ? আসুন দেখা যাক ঘেঁটে :

দেশভাগের সময় থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘উদ্বাস্তু’ শব্দটা ইতিহাসে নিজের পাকাপোক্ত জায়গা করে নিয়েছে । মুসলমানের ঐশী কিতাব কোরান অনুযায়ী মানুষ দুই প্রকার : ইসলামে বিশ্বাসী অথবা ইসলামে অবিস্বাসী । যারা ইসলামে অবিস্বাসী, তাদের সাথে মুসলমানের একসাথে বসবাস তো দূরের কথা, কোনোরকম সম্পর্কই ইসলামে হারাম ! অগত্যা লন্ডন ফেরত জিন্নাহকেও সেই ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ থিওরির জন্ম দিতে হলো অবিভক্ত ভারতকে ভাগ করে, মুসলমানের পবিত্র বাসভূমি ‘পাকিস্তান’ সৃষ্টি করার জন্য । ব্যাপারটা একেবারে মসৃন হলোনা । উপমহাদেশের মুসলমান, তাদের ধর্মের ঐতিহ্য মেনে শান দেওয়া তরবারি নিয়ে ঝাঁপালো পবিত্র বাসভূমি ‘পাকিস্তান’ কায়েমের জন্য আর বিধর্মীরা প্রতিরোধ করলো প্রথমে আর তারপর তারাও প্রত্যাঘাত করলো । মানুষ মরলো, নারীর ইজ্জত ভুলুন্ঠিত হলো, মানুষ নিজ জন্মভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে ভূখণ্ডের অন্য অংশে পারি জমালো নিরাপদে জীবন যাপনের জন্য । এই নিজ জন্মভূমি থেকে উৎখাত হওয়া মানুষগুলো সকল সময়েই নিঃস্ব, রিক্ত, সর্বহারা আর এরাই আজ উপমহাদেশের ইতিহাসে সেই ‘উদ্বাস্তু’ । আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ, ১৯৪৭ এর দেশভাগের পরে ছিল পূর্ব পাকিস্তান, বাঙালি মুসলমানের পবিত্র বাসভূমি । এই বাসভূমি কায়েমের জন্য বাঙালি মুসলমান সেই ১৯৪৬ এই স্লোগান তুলেছিল : ‘হাত মে বিড়ি, মু মে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ । অগত্যা, বাঙালি মুসলমানের সেই ঈমানী জোশে, সেই ভূখণ্ড ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল প্রধানতঃ সেই ভূখণ্ডের সংখ্যালঘু বাঙালি হিন্দু, জান মালের আশা ছেড়ে তারা কেবল জীবন বাঁচাতে দেশান্তরী হয়েছিল । দেশান্তরী মানুষগুলো তারপরেও তাদের মা বোনেদের ইজ্জত খুইয়েছে, মারা পরেছে, জমিজমা, বাড়ি সব খুইয়েছে । কিন্তু কোরানের অনুসারী বাঙালি মুসলমানের তবু জিঘাংসা মেটেনি ! দেশভাগের এত বছর পরেও তাই প্রতিনিয়ত স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে গড়ে ৬০০ র উপর সংখ্যালঘু বাঙালি হিন্দু দেশান্তরী হয়ে ভারতে প্রবেশ করে, উদ্বাস্তু হিসেবে । এই উদ্বাস্তুরা কেবল মানুষ পরিচয়ে বাঁচার জন্য ভারতের ভূমিতে আসে আর অনেক প্রচেষ্টার পর এই ভারতকে তার দেশ মানিয়ে ফেলে । কিন্তু এই উদ্বাস্তুদের প্রতি ভারতের রাজনৈতিক প্রতিদান কি ? কিসের উপরে ভিত্তি করে আমরা আজ স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে মানুষের উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া ঠেকাবো বা দাবী করবো ?

আপনাদের সামনে কিছু সত্য তুলে ধরি :

➤ ভারতের তথাকথিত ভাম সেকুলাঙ্গাররা ১৯৫৩ সালের ৭ এপ্রিল, পশ্চিমবঙ্গ আইনসভায় ‘বাস্তুহারা মুসলমানদের পুর্নবাসন ও তাদের জনা অন্তবর্তী ত্রাণভাতা দাবী করেছিল, অথচ নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি অনুযায়ী উদ্বাস্তু বাঙালি হিন্দুদের নিরাপদে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার কথা একটাবারও উচ্চারণ করেনি !
➤ এপার বাংলার সেকুলাঙ্গার কলমচি, সাংবাদিকরা যে খবর ছাপেনা, এপারের বাঙালির থেকে লুকিয়ে যায় তা হলো : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবুল বরকত এই বিষয়ে অসাধারণ গবেষণা বলছে-গড়ে প্রতি বছর ২ লক্ষ ১৮ হাজার ৯১৯ জন হিন্দু দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, কারণ শত্রু/অর্পিত সম্পত্তি আইনের জনা উদ্ভুত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ! অথচ, ইতিহাসের কি অদ্ভুত বিদ্রুপ :১৯৭১-এর বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল মূলতঃ লক্ষ লক্ষ হিন্দুর মতদেহের উপর। ভাবা গিয়েছিল এবার বােধহয় সব ঠিক হয়ে যাবে কারণ পাকিস্তনিরা আর নেই। কিন্তু বাঙালি হিন্দু (উচ্চ শিক্ষিত বুদ্ধিজীবি/বিদ্বজ্জন সহ) কোরাণ-হাদিস জানেন না যা প্রতিটি মুসলমান জানে। এই কোরাণের মূল কথা যে আল্লা ছাড়া কোন উপাস্য নেই, অন্য কোন ধর্ম নেই, বিশেষতঃ মূর্তিপূজারীরা হচ্ছে, মা–ন ! ফলে দু তিন বছরের মধ্যেই আবার হিন্দু নিপীড়ন শুরু হয়ে গিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে ।
➤ লক্ষ লক্ষ মানুষের এক দেশ থেকে অনা দেশে আসাটা ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি বা পরিবেশের গবেষণার বিষয়। বাংলাদেশে তা হলেও পশ্চিমবঙ্গে তা হবে না কারণ, তাহলেই পূর্ববঙ্গে ধারাবাহিক নির্যাতনের ইতিহাস প্রকাশ পেয়ে যাবে, ভেঙে যাবে সেকুলার মিথের মিথ্যা দুর্গে নিরাপত্তার মেকী আশ্রয়ে থাকা হিন্দু বাঙালির সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের দিবাস্বপ্ন।
➤ ২৯ নভেম্বর ১৯৭১, ভারত সরকারের আন্ডার সেক্রেটারি সি, এল, গােয়েল সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্যসচিবদের একটি এক্সপ্রেস লেটার (Express Letter No ২৬০১১১৬ ৭১ ১০) পাঠায় : ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর পর যে সব উদ্বাস্তুরা পূর্ববঙ্গ থেকে ভারতে প্রবেশ করেছেন ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য এই সব উদ্বাস্তুদের আবেদন গ্রহণ করা হবে না । ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পর আসা বাংলাদেশী হিন্দু উদ্বাস্তুরা ও তাদের উত্তরপুরুষেরা সবাই পাকাপাকি বেআইনী অভিবাসী হয়ে গেল। এই লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু বাঙালী উদ্বাস্তুর সর্বনাশ এভাবেই করা শুরু করেছিল ভারতের রাজনীতিকরা। নাগরিকত্বের মত এরকম গুরুত্বপূর্ণ দাবী সাম্প্রতিক নির্বাচনে কংগ্রেস, কমুনিস্ট, তৃণমূল কারও ইস্তাহারেই ছিল না।

পাঠক, এতক্ষন আপনাদের সামনে অনেক কিছু তুলে ধরলাম প্রকৃত ইতিহাসের আলোকে । এবারে বলি, উদ্বাস্তুরা এখনও আসছেন, আসতে থাকবেন। যারা ভাবছেন পশ্চিমবঙ্গে আমরা নিরাপদ তারা যেমন অতীতকে লুকিয়ে রেখে অস্বীকার করতে চাইছেন, আবার তারা অন্ধকার ভবিষ্যৎকেও দেখতে পারছেন না। যে ভূখণ্ডে কেবল মানুষের পরিচয়ে বাঁচার জন্য বাংলাদেশের সংখ্যালঘু বাঙালি হিন্দু পালিয়ে আসছে, সেই ভারতের রাজনৈতিক পরিমহল কি স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারকে চাপ দিতে নিজেরা তৈরী বা ইচ্ছুক বাংলাদেশে সংখ্যালঘু খেঁদানো বন্ধ করার জন্য ? হাসিনা বুবু কি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু বাঙালি হিন্দুর প্রতি ততটাই সহানুভূতিশীল যতটা তিনি মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল না কি সেখানেও ধর্ম প্রধান বিচার্য ?

রেফ : Hiranmoy Karlekar, Bangladesh – The Next Afghanisthan ।

Prafulla Chakrabarti, The Marginal Men, ‘Refugee Power and the Left’ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *