‘ধর্ষক নামা’

বেশ মুখরোচক একটা ‘সাবজেক্ট’ পাওয়া গেছে। কক্সবাজারের চকোরিয়ায়। মাত্র এগার বছর, পঞ্চান্ন দিন, ধর্মান্তর, ধর্ষণ, কি নেই এই ‘স্টোরি’ তে। ফেসবুক আর ব্লগ এখন সয়লাব এই গল্পের বিচার বিশ্লেষণ নিয়ে। গল্পের ডাল পালা হিসেবে চলে আসছে, নাস্তিক আস্তিক বিতর্ক, সেকুলারিজম, হেফাজতের প্রতিক্রিয়া, বিয়ের বয়স। মেয়ে আবার খুব ভালো ছাত্রী, স্থানীয় এক এম পি র হাতে পুরস্কারও পেয়েছে, এব্যাপারটাও হাইলাইটেড হচ্ছে।

বেশ মুখরোচক একটা ‘সাবজেক্ট’ পাওয়া গেছে। কক্সবাজারের চকোরিয়ায়। মাত্র এগার বছর, পঞ্চান্ন দিন, ধর্মান্তর, ধর্ষণ, কি নেই এই ‘স্টোরি’ তে। ফেসবুক আর ব্লগ এখন সয়লাব এই গল্পের বিচার বিশ্লেষণ নিয়ে। গল্পের ডাল পালা হিসেবে চলে আসছে, নাস্তিক আস্তিক বিতর্ক, সেকুলারিজম, হেফাজতের প্রতিক্রিয়া, বিয়ের বয়স। মেয়ে আবার খুব ভালো ছাত্রী, স্থানীয় এক এম পি র হাতে পুরস্কারও পেয়েছে, এব্যাপারটাও হাইলাইটেড হচ্ছে।
এখনও অবশ্য ধর্ষণের রগরগে বর্ণনা সহযোগে কোন আর্টিকেল প্রকাশ হয় নি। চেষ্টা চলছে কি না কে জানে। পুরো ফিচারটা একটা দৈনিক পত্রিকায় পড়লাম। মেয়েটি এবং তাঁর সাথে হওয়া সেই নির্যাতন ব্যাপারটাই ফোকাস করা হয়েছে। অপরাধীর ধরা পরা সম্পর্কে শেষে কেবল একটা লাইন, তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য যেখানে অবধারিত ভাবে এসেছে “পলাতক’ শব্দটা। যেভাবে ইন্টারনেটে এ নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে, তাতে মনে হয়, পুলিশ একটু গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেও উঠতে পারে। বিবেক কিংবা কর্তব্যের কারণে হয়তো না। অপরাধী ধরা পড়লে, পত্রিকায় ছবি ছাপা হবে, একটু নায়ক হওয়াও যাবে—এই কারণে। পরে এক সময় দেনা পাওনা নিয়ে ধর্ষকের সঙ্গে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং এ যাওয়া যাবে।
আচ্ছা বলুন তো এই পুরো গল্পের কোন অংশটা সবচেয়ে উপাদেয়? ‘হিন্দু’ নাকি ‘ধর্মান্তরিত করা’ নাকি ‘ধর্ষণ’ নাকি ‘এই পঞ্চান্ন দিন পুলিশের অকর্মণ্যতা’? ব্লগ আর ফেসবুকে সবচেয়ে উপাদেয় মনে হচ্ছে, ‘ধর্মান্তরিত’ ব্যাপারটা। এই নিয়ে আলোচনা কিংবা সমালোচনার সঙ্গে দুটো ব্যাপার প্রসঙ্গক্রমে চলে আসছে, তাঁর একটি হচ্ছে হেফাজত আর অন্যটি হচ্ছে নাস্তিকতা। হেফাজত ব্যাপারটা আসছে কারণ এমন ঘটনার পরে হেফাজতের পক্ষ থেকে তেমন কোন বক্তব্য আসে নি। কিন্তু কেন? ‘এই জোর পূর্বক ধর্মান্তরিত করনকে অন্যায় বলে’ একটা বক্তব্য আসা কি সবাই করছিল?
নাস্তিকতা ব্যাপারটা আসছে অন্য কারণে। ব্লগাররা যেহেতু গণহারে নাস্তিক উপাধি পেয়েছে তাই নাস্তিকদের এই একটি গুণকে তাঁরা হাইলাইট করছে। নাস্তিকরা যে আঘাত করে, তা হচ্ছে অনুভুতিতে, চিন্তায় কিংবা ধারনায়। শারীরিক আঘাত না। যদি তুলনা করা হয় তবে নাস্তিকরা অন্ততঃ এই দিক দিয়ে উত্তম। ধর্ম ব্যবহার করে তাঁরা খুন কিংবা ধর্ষণ কে জায়েজ করে না।
আরও কিছু ব্যাপার লক্ষণীয় এসব রিপোর্ট কিংবা লেখালেখিতে। সেখানে ধর্ষণ নিয়ে দুএক লাইন বলা হচ্ছে ঠিকই, তবে সেসবে যেন কোন প্রাণ নেই। ধর্ষিতার করুন অভিজ্ঞতা, এখন তাঁর মনের অবস্থা, পরিবারের করুন দশা এমন সব কমন ব্যাপার। পুরনো কোন রিপোর্ট থেকে কপি করে ছেপে দিলেও চলে। সঙ্গে যোগ হয়েছে গতানুগতিক কিছু গালি গালাজ। ‘পশু’ ‘জানোয়ার’ এজাতীয় গালি ধর্ষকের জন্য। কেউ আবার সেই ধর্ষকের মা কিংবা বোনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে কিছু গালি গালাজ করছেন। গালি যিনি দিচ্ছেন তাঁর চিন্তা ভাবনায়ও ধর্ষণের কিঞ্চিৎ আকাঙ্ক্ষা। গালি গুলোর লক্ষ্যবস্তু আবার, কোন না কোন নারী। পুরুষ হওয়ায় ধর্ষকরা বিশেষ এই একটা সুবিধা পাচ্ছে। পুরুষকে হেয় করে খুব ভালো গালি গালাজ বাজারে নাই।
‘পঞ্চান্ন দিন’ ব্যাপারটা নিয়েও কিছু লেখা দেখলাম। ধর্ষণের ঘটনাটা নিউজ হওয়ার জন্য বোধহয় সময়কালটাও গুরুত্বপূর্ণ। এলেবেলে ধর্ষণ তো প্রায়ই হচ্ছে। সেসব তেমন বড় করে রিপোর্ট হয় না। সঙ্গে কিছু মশলা থাকা চাই। ‘গন ধর্ষণ’, ‘ধর্ষণের পরে খুন’ কিংবা ‘পরিবার কে হুমকি’ এসবও আজকাল হালে পানি পায় না। একটা রিপোর্ট হয়েছিল ‘গাছের সঙ্গে বেধে ধর্ষণ’ অনেক আকর্ষণীয় নিউজ। হয় গল্পটায় অভিনব কোন নৃশংসতা থাকতে হবে, নইলে ‘বড় কোন ব্যক্তিত্ব’ এর ইনভল্ভমেন্ট থাকতে হবে। বড় নেতার আত্মীয়, এপিএস হলেও চলে।
এই ঘটনায় সময়কালটা একটা ফ্যাক্টর হতে পারে। সাধারনতঃ যেসব রিপোর্ট হয় সেসব ঘটনা ঘটবার সঙ্গে সঙ্গেই রিপোর্ট হয়। এক্ষেত্রে এতো দীর্ঘ কাল ধরে ঘটেছে, পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন নীরব থেকেছে। এলাকায় ও কোন সাহসী ব্যক্তিত্ব পাওয়া যায় নি যে এই মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কথা বলে। সব মিলিয়ে এই দিকটি উল্লেখ করে কিছু নীতিকথা, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বক্তব্য দেয়ার অপূর্ব সুযোগও অনেকে হাতছাড়া করছেন না। তবে বিরোধী দল মনে হয় না এ নিয়ে খুব আগ্রহী। তাঁদের আপাততঃ কাজ সদস্যপদ, বেতন ভাতা আর সাংসদ হিসেবে সুযোগ সুবিধা রক্ষা করা।
আরও একটা রিপোর্ট পড়লাম। ধর্ষকদের জন্য বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশ এসব রিপোর্ট নিতে চায় না। মেয়েরা গোসল করে ফেলে দেখে আলামত নষ্ট হয়ে যায়। ‘সিমেন’ প্রিসার্ভ করার সুবিধা কয়টি ল্যবরেটরীর আছে কে জানে। তাঁর ওপর তো আছেই সামাজিক ভয়, একঘরে হওয়া, দোররা। এসব থেকে পার পেয়ে গেলেও আছে কেস উইথড্র করার জন্য হুমকি। আরও শক্তিশালী পার্টি হলে হুমকিও দিতে হয় না, ভিক্টিম এর জন্য ‘ইশারাই কাফী’ হয়ে যায়।
এতসব বাঁধা অতিক্রম করতে পারলে যেখানে পৌঁছবে তা হচ্ছে, আদালত। উকিলের ফিস, প্রতিপক্ষের উকিলের জেরা, সাক্ষীর অভাব, পরবর্তী তারিখ– অবস্থা তখন ‘ছেড়ে দে মা’। পুলিশের সঙ্গে আসামী পক্ষের লেনদেন, কেস দুর্বল করা, আলামত নষ্ট করা—আসলে উপায় এর তো শেষ নেই। আচ্ছা, ধর্ষণকে ‘অপরাধ’ এর সংজ্ঞা থেকে মুক্তি দেয়া যায় না? শুধু শুধু ভিক্টিম কে আশা দিয়ে লাভ কি? কোন দরিদ্রের মেয়ের ধর্ষণের কোন কেস এ কেউ সাজা পেয়েছে এবং তা ইমপ্লিমেন্ট হয়েছে এমন কোন রিপোর্ট কি কখনও দেখেছেন? বা আশা করেন, আপনার জীবদ্দশায় দেখতে পাবেন?

১১ thoughts on “‘ধর্ষক নামা’

  1. আজ ৫৫ হাজার বর্গমাইল জুড়ে
    আজ ৫৫ হাজার বর্গমাইল জুড়ে সবাই ধর্ষক…
    মেয়ের মা-বাবাও এই সমাজের প্রতিনিধি হয়ে তার মেয়ের ধর্ষণের দায় এড়াতে পারে না!!

    ধর্ষিতা! তুমি কি মানুষ বুঝ? সমাজ? রাষ্ট্র? ধর্ম?
    পুরুষতন্ত্র কি বুঝ? বাবা? ভাই?
    আর এই ধর্ষণ? বা প্রেম? অথবা কাম?

    ভাল লিখেছেন… সমাজটাই অন্তঃসারশূন্য!!!

  2. আচ্ছা, ধর্ষণকে ‘অপরাধ’ এর

    আচ্ছা, ধর্ষণকে ‘অপরাধ’ এর সংজ্ঞা থেকে মুক্তি দেয়া যায় না? শুধু শুধু ভিক্টিম কে আশা দিয়ে লাভ কি? কোন দরিদ্রের মেয়ের ধর্ষণের কোন কেস এ কেউ সাজা পেয়েছে এবং তা ইমপ্লিমেন্ট হয়েছে এমন কোন রিপোর্ট কি কখনও দেখেছেন? বা আশা করেন, আপনার জীবদ্দশায় দেখতে পাবেন?

    এই বিষয় এ পড়তে আর ইন্টারেস্ট নাই । তবু আপনার পোস্ট এর শেষ প্রশ্ন গুলাই পড়লাম। এই প্রশ্নগুলায় ভাইটাল । :তালিয়া: :তালিয়া:

    1. এই বিষয়ে লিখতে আমারও ইচ্ছা
      এই বিষয়ে লিখতে আমারও ইচ্ছা করে না, তারপরও লিখে ফেললাম। মন্তব্যের জন্য দহন্যবাদ।

    1. কষ্ট করে মোবাইল থেকে মন্তব্য
      কষ্ট করে মোবাইল থেকে মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ। বাকী লেখাগুলো পড়লে আরও খুশী হব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *