মুসলিম পুনর্গঠন আন্দোলন – ১৪০০ বছরের জমাট অন্ধকারে আলোর রেখা?

বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে এক নতুন ধরণের আন্দোলন শুরু হয়েছে।  যে আন্দোলনের কথা আগে কখনো শোনা যায় নি, যে আন্দোলনের কথা কেউ ভাবতেও সাহস করে নি, তেমনই এক অভিনব আন্দোলন শুরু হয়েছে এই বছর তিনেক আগে।  ২০১৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন ডিসি শহরের ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হয় যেখানে “Muslim Reform Movement” বা মুসলিম পুনর্গঠন আন্দোলন নামে একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে।  সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতারা সেখানে একটি ঘোষনাপত্র পাঠ করেন যেখানে সেই সংগঠনের আদর্শ-উদ্দেশ্য সবার সামনে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়।  এরপর তারা সৌদি রাজতন্ত্রের সমর্থিত প্রতিষ্ঠান ইসলামিক সেন্টার অফ ওয়াশিংটনে যান এবং সেখানকার মসজিদের দরজায় তাদের ঘোষণাপত্রটি লাগিয়ে দেন।

কি এমন আছে সেই ঘোষণাপত্রে তা জানতে নিশ্চয়ই এতোক্ষণে পাঠকদের মনে কৌতুহল জেগে উঠেছে।  কিন্তু তার আগে আমরা জেনে নেই যাদের নেতৃত্বে এই সংগঠন আত্মপ্রকাশ করেছে তারা কারা।

আসরা নোমানিঃ পুরো নাম আসরা কোরাতুলাইন নোমানি, ভারতের মুম্বাই শহরে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ৪ বছর বয়সে আমেরিকা পাড়ি জমান যেখানে তার বাবা জাফর নোমানি পিএইচডি অধ্যয়নরত ছিলেন।  আসরা নোমানি সেখানে বেড়ে উঠেন এবং আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।  কর্মজীবনে তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দ্যা ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্যা আমেরিকান প্রসপেক্টসহ বহু নামীদামী পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন।  চাকরির পাশাপাশি বেশ কিছু বইও তিনি লিখেছেন যেগুলো পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে।  তবে তিনি আলোচনায় এসেছেন নারীপুরুষ সম্মিলিতভাবে নামায আদায় করার আন্দোলনের উদ্যোক্তা হিসেবে।  ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ২০০৫ সালে নিউইয়র্কের একটি মসজিদে নারীদের ইমামতিতে নামায পড়ানো হয়, যার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন এই আসরা নোমানি।  আসরা নোমানি সর্বদাই মুসলিম নারীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার এবং সমাজে নারীদের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একজন সামনের সারির কর্মী।

তওফিক হামিদঃ তওফিক হামিদ একজন মিশরীয় লেখক ও শান্তিপূর্ণ ইসলামিক আন্দোলনের কর্মী।  তিনি ইসলামের শান্তিপূর্ণ ব্যাখ্যায় বিশ্বাসী এবং চিন্তার স্বাধীণতা ও সার্বজনীন মানবাধিকারের সাথে ইসলামকে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।  তিনি যখন থেকে তার মতবাদ প্রচার করার জন্য মসজিদে মসজিদে বয়ান দিতে লাগলেন তখন থেকেই তিনি ইসলামিক মৌলবাদীদের নজরে পড়ে যান।  তারা তাকে নিয়মিত হুমকি ধামকি দিতে থাকে।  ফলে তিনি আমেরিকায় নির্বাসিত হোন এবং সেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিতে থাকেন।

কর্মজীবনে তিনি ছিলেন একজন ডাক্তার কিন্তু ডাক্তারিকে পেশা হিসেবে না নিয়ে তিনি বিশ্বের পশ্চাৎপদ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং জঙ্গিবাদকে সাধারণ মানুষের কাছে নিরুৎসাহিত করতে ও ইসলামের শান্তির বাণী প্রচার করতে নিজেকে নিয়োজিত করেন।  বর্তমানে তিনি islamforpeace.org নামে একটি ওয়েবসাইট পরিচালনা করছেন।  তার “Inside Jihad” নামে একটি বই আছে যা জিহাদ সম্পর্কে ধারণা পেতে বিশ্বব্যাপী পাঠকদের সহযোগিতা করছে।

যুহদি যাসেরঃ মোঃ যুহদি যাসের একজন সিরিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান ডাক্তার যিনি ইন্টারনাল মেডিসিন এবং নিউক্লিয়ার কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমেরিকার এরিজোনা প্রদেশে বসবাস করে আসছেন।  তিনি রাজনৈতিক ইসলামের একজন কট্টর সমালোচক এবং ধর্মকে রাজনীতির সাথে মেশানোর ব্যাপারে তীব্র বিরোধীতাকারি।

তিনি প্রায় ১১ বছর ইউ এস নেভির একজন চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সেখানে সম্মানের সাথে তার দায়িত্ব পালন করেন।  তিনি আমেরিকায় বসবাসকারি মুসলিম কমিউনিটিতে জঙ্গিবাদ প্রসার ও প্রচারের বিরুদ্ধে আমেরিকান সরকারের একজন পরামর্শদাতা।  প্রথম সারির সকল নিউজ চ্যানেলে তাকে নিয়মিত উপস্থিত হতে দেখা যায় এবং বরাবরই তিনি রাজনৈতিক ইসলামের বিরুদ্ধে তার শক্ত অবস্থান ব্যক্ত করেন।  তিনি এবং আরও কিছু আমেরিকান মুসলিম অধিবাসীরা মিলে একটি সংগঠন গঠন করেন যার নাম “আমেরিকান ইসলামিক ফোরাম ফর ডেমোক্র্যাসি”।

উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও এই আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের মধ্যে রয়েছেন পাকিস্তানি-কানাডিয়ান ইমিগ্র্যান্ট রাহিল রাজা, কানাডিয়ান লেখক, প্রকাশক তাহির আসলাম গোরা, বৃটিশ জ্যোতির্বিদ উসামা হাসান, পাকিস্তানি আমেরিকান লেখক এবং রাজনীতিবিদ ও পাকিস্তান সংসদের সদস্য ফারহানা ইস্পাহানি, সিরিয়ান বংশোদ্ভূত ড্যানিশ পার্লামেন্টের সদস্য নাসের কাদের, কোর্টনি লোনেরগান, আরিফ হুমায়ুন, হাসান মাহমুদ, সোহেল রাজা এবং সালমা সিদ্দিকি।

এই সকল ব্যক্তিরা প্রত্যেকেই তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও চিন্তার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী একটি গণতান্ত্রিক পৃথিবী গড়তে দৃঢ় প্রত্যয়ী।  তারা মুসলিম সমাজের কাছে একটি পুনঃর্গঠনের ডাক দিয়েছেন এবং সারা বিশ্বের মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদেরকে ও পুরো পৃথিবীকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত ভালোবাসাময় পৃথিবী গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন।  এখন দেখা যাক মুসলিম উম্মাহ তাদের ডাকে কেমন সাড়া দেয়।  যাইহোক, এবার আমরা চলে যাই সেই বৈপ্লবিক ঘোষণাপত্রে যেখানে তারা তাদের সংগঠনের আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

 

সূচনাঃ

আমরা একবিংশ শতাব্দীর মুসলমান।  আমরা ইসলামের সেইসকল ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করি যেখানে সবার জন্য  সমান মর্যাদা দেয়া হয়েছে।  আমরা ইসলামে অন্তর্নিহিত শান্তির জন্য লড়াই করছি এবং শান্তিপূর্ণ ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য এগিয়ে যাচ্ছি যা অবশ্যই রাজনৈতিক ইসলামকে পরাজিত করবে, যে  রাজনৈতিক ইসলাম ইসলামিক স্টেইট বা ইসলামিক খলিফতের মত(আই এস) একটি সন্ত্রাসপূর্ণ জনপদ গঠন করতে চায়।  আমরা একবিংশ শতাব্দীর আলোকে ইসলামের হারিয়ে যাওয়া প্রগতিশীল চরিত্রকে পুনরুদ্ধার করতে চাই যা নিয়ে সপ্তম শতাব্দীতে এর সূচনা হয়েছিল।

আমরা ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাকে সমর্থন করি।  আমরা ইসলামের সেইসকল ব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করি যা ইসলামকে নিয়ে রাজনীতি করতে উৎসাহিত করে কিংবা সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে অনুপ্রেরণা যোগায়।  আমরা আমাদের সম্প্রদায়কে তিনটি মূল ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে চাই।  এগুলো হলঃ শান্তি, মানবাধিকার এবং ধর্ম নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা।  আমরা আজকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কথা ঘোষণা করতে চাই যার নাম হচ্ছে “মুসলিম পুনর্গঠন আন্দোলন”।

ক) শান্তিঃ জাতীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ প্রতিহতকরন এবং বিদেশ নীতি

১।  আমরা সার্বজনীন শান্তি, ভালোবাসা এবং সহমর্মিতায় বিশ্বাস করি।  আমরা সন্ত্রাসপূর্ণ জিহাদকে প্রত্যাখ্যান করি।

২।  আমরা বিশ্বাস করি, যে সমস্ত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এবং পশ্চিমা বিশ্বে ব্যক্তি মানুষকে জেহাদী সন্ত্রাস এবং নিপীড়নের চাবুক সন্ত্রস্ত করে রেখেছে আমাদের অবশ্যই সেইসব চরমপন্থার আদর্শকে পরাজিত করতে হবে।

৩।  আমরা জাতি, ধর্ম, ভাষা, বিশ্বাস, যৌনতা এবং লিঙ্গের ভিত্তিতে পরিচালিত যেকোন ধরণের নিপীড়ন, সন্ত্রাস কিংবা অন্ধবিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করি।

খ) মানবাধিকারঃ নারীর অধিকার এবং সংখ্যালঘুর অধিকার

১। আমরা মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে।  আমরা ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সকল মানুষের সমানাধিকার এবং সমমর্যাদায় বিশ্বাস করি।  আমরা জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাকে সমর্থন করি।

২।  আমরা গোষ্ঠীতন্ত্র, রাজতন্ত্র, বর্ণবাদকে প্রত্যাখ্যান করি এবং সকল মানুষের সাম্যে বিশ্বাস করি এবং মানবাধিকার ব্যতীত বিশেষ কোন জন্মগত সুবিধা/ অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করি।  আমরা বিশ্বাস করি সকল মানুষই স্বাধীন হয়ে জন্মায় এবং মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে সবাই সমান।  মুসলমানদের বেহেস্তের উপর একচেটিয়া কোন অধিকার নেই।

৩।  আমরা সম্পত্তির উত্তরাধিকার, আইনী স্বাক্ষ্য, সক্রিয়তা, পার্সোনাল ল, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সকল নারীদের সমানাধিকারে বিশ্বাস করি।  মসজিদে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে সকল প্রকার আইনি কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কিংবা সমাজের সকল স্তরে পুরুষ এবং নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাস করি।  আমরা নারীদেরকে নিয়ে ঘৃণা ছড়ানো কিংবা বৈষম্য প্রণয়নকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করি।

গ) ধর্ম নিরপেক্ষ শাসনব্যস্থাঃ বাকস্বাধীনতা এবং ধর্ম পালনের অধিকার

১। আমরা ধর্ম নিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা, গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি।  আমরা ধর্মের নামে রাজনৈতিক কর্মকান্ডকে প্রত্যাখ্যান করি।  আমরা রাষ্ট্র এবং মসজিদকে আলাদা করে দেখতে চাই।  ইসলামিক খলিফতের কোন প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করি না।  আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শরীয়াকে বিরোধীতা করি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শরীয়া আইনসমুহ মানুষের দ্বারা রচিত বলে মনে করি।

২।  আমরা জীবন, আনন্দ, বাক-স্বাধীনতা এবং আমাদের চার পাশের সৌন্দর্যে আস্থা স্থাপন করি।  প্রত্যেক ব্যক্তির ইসলাম ধর্মকে নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করার অধিকার আছে।  আদর্শের কোন অধিকার থাকে না, অধিকার মানুষের জন্য।  আমরা ব্লাসফেমি আইনকে প্রত্যাখ্যান করি।  এগুলো ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা হরণের হাতিয়ার মাত্র।  আমরা ইজতিহাদ বা বিশ্লেষণমূলক চিন্তায় অংশ নিতে সকল ব্যক্তির সমানাধিকার নিশ্চিত করতে চাই এবং আমরা ইজতিহাদের পুনর্জাগরণ ঘটাতে চাই।

৩।  আমরা যেকোন ধরণের বৈষম্য, হুমকি কিংবা নিপীড়ন ছাড়াই যেকোন মানুষের বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস চর্চা করার অধিকারে বিশ্বাস করি।  ধর্ম ত্যাগ করা কোন অপরাধ নয়।  শুধু মুসলিমরাই আমাদের উম্মাহ বা সম্প্রদায় নয়, আমরা বৃহত্তর মানব সম্প্রদায়ের অংশ।

তথ্যসূত্রঃ

Home

https://en.wikipedia.org/wiki/Muslim_Reform_Movement

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *