বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের ছায়া দীর্ঘ হতে পারে!

বাংলাদেশ স্বৈরতান্ত্রিক দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় এ বছরই। গত ২২ মার্চ ২০১৮ জার্মানির গবেষণা প্রতিষ্ঠান বেরটেলসমান স্টিফটুং প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে নতুন করে পাঁচটি দেশ একনায়কতান্ত্রিক দেশের তালিকায় ঢুকেছে। তার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৭’র জানুয়ারি পর্যন্ত করা এই গবেষণায় বাংলাদেশ নিয়ে মন্তব্য করা হয় যে, ‘নির্বাচনের মানে অবনতি ঘটায়, এক সময়ের পঞ্চম বৃহৎ গণতন্ত্রের এ দেশটি ফের স্বৈরতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।’

স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরেও বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রীয় ব্যক্তি শেখ হাসিনা এ নিয়ে মাথা ঘামাননি। কারণ বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থতিতির প্রেক্ষাপটে এটা কোনো ব্যাপার নয়। তিনি আরও বেপরোয়া হয়েছেন। বিরোধীদের বিরুদ্ধে হামলা-মামলা বাড়িয়েছে তার সরকার। এমনকি নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়েছে শিশু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। গ্রেপ্তার করে জেলে পুরেছেন আলোকচিত্রী, সাংবাদিক, অভিনেত্রীসইহ বিরুদ্ধমত উচ্চারণকারীদের।

শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের চরম নিয়ন্ত্রণমূলক আইন অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট তারা ফিরিয়ে এনেছে। ব্রিটিশ প্রশাসনকে সব ধরনের জবাবদিহি থেকে রক্ষা করার জন্য ওই আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল, এখন শেখ হাসিনা সেই সুবিধা ভোগ করতে চান। বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের এই বাড় বাড়ন্তের মধ্যেই হাজির হয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

দেশে স্বৈরতন্ত্র যে চরম রূপ নিয়েছে, তাতে গতবারের মতো এই নির্বাচনেও আওয়ামী জোটের বাইরে কোনো দলের অংশগ্রহণ করার কথা নয়। কিন্তু আদালত ব্যবহার করে বিরোধীদের জেলে পুরে রাখা হচ্ছে। গুম করা হচ্ছে বিরোধী নেতাদের। কাউকে কাউকে তুলে নিয়ে বিদেশের মাটিতে ফেলে আসা হচ্ছে।এ রকম অবস্থায় সংসদের প্রতিনিধিত্ব বাড়তি সুবিধা দিতে পারে ভেবেই চরম এই স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কৌশলগত অংশ হিসেবে নির্বাচন করছে বিএনপিসহ অন্য দলগুলো।

শেখ হাসিনার সরকার নির্বাচন নিয়ন্ত্রণের সমস্ত আয়োজনই সম্পন্ন করে রেখেছেন। কিছুদিন আগে হওয়া সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মহড়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল পুলিশ ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের দখলে। বিরোধীদের জেলে ঢোকানো, হামলা, হুমকি দিয়ে ভোটকেন্দ্র নিজেদের দখলে রাখতে পেরেছে তারা। সে রকম একটি নির্বাচন আয়োজনই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য।

প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রধান নেতা খালেদা জিয়া কারাগারে, দ্বিতীয় প্রধান নেতা তারেক রহমান নির্বাসনে। আদালত বিরোধীদের একের পর এক দণ্ড দিচ্ছে। আর সরকারপন্থিরা আদালতে গেলেই জামিন পাচ্ছেন। শহিদুল আলমের মতো আলোকচিত্রীকেও সরকার জামিন দেয়ার বিরোধিতা করেছে। আদালত সরকারের সেই আশাও পূরণ করেছে। এরকম ভীতিকর অবস্থা তৈরি করে নির্বাচন করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচন কমিশন তাদের পছন্দের লোক দিয়ে সাজানো। পুলিশ-প্রশাসনে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তারাও আওয়ামী লীগেরই লোক।

বিএনপি এই অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সরকারকে বাধ্য করতে বিদেশিদের কাছে নিয়মিত আর্জি জানাচ্ছে। কিন্তু ভারতের মনোনীত শেখ হাসিনাকে অতিক্রম করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ভারত এখানে শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। যে কারণে আওয়ামী লীগকে তাদের দরকার। আবার চীনবিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে পাশে চায়। ফলে আঞ্চলিক দেশগুলো ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকলে তাদের আপত্তি নেই। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এই অঞ্চলে দেশটি বেশ কিছুদিন নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করতে পারেনি। আবার ট্রাম্পের বিরোধিতা করে সাউথ এশিয়ান ডেস্ক থেকে অনেকে চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনোইতিক খেলাধুলার ক্ষমতা কমে গেছে, অভিজ্ঞ লোক ছাড়া এটা করা অসম্ভব।

চীন হয়তো এগিয়ে আসতে পারত। কিন্তু এ অঞ্চলে ভারতের সঙ্গে দর অষাকষির অংশ হিসেবে কিছু দেশে ভারতকে ছাড় দিতে তারা প্রস্তুত। এর বিনিময়ে তারা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পে ভারতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায়। তাই বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের কিছু দেশের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে ভারত সন্তুষ্ট হলে চীনের আপত্তি নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ অঞ্চলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারী শক্তি হলেও ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ানোর ক্ষেত্রে তারা এতকাল যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই নির্ভরশীল ছিল। ফলে এই মুহূর্তে এখানে নিজস্ব কোনো মত এককভাবে বাস্তবায়নের অবস্থানে তারা নেই। তাছাড়া সেরকম কোনো কারণও তৈরি হয়নি। শেখ হাসিনার সরকার সবাইকেই কম-বেশি সুবিধা দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির এসব সমীকরণের ফলে বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার আবারও ক্ষমতায় আসতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ পতিত হবে অন্ধকারের বৃত্তে। কথিত ‘উন্নয়ন’ চলতে থাকবে, যার উদ্দেশ্য হবে ভয়ঙ্কর লুটপাট। শেখ হাসিনা আরও প্রতাপশালী হবেন। বিরোধীদের মূলোৎপাটন করে দেশ বিরোধীশূণ্য করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবেন তিনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের দলীয় নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আগামীতে কোনো কিছুই বাদ থাকবে না। জাতীয় ক্রিকেট দল ইতোমধ্যে এই আগ্রাসনের শিকার।

এ ধরনের স্বৈরতন্ত্র বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে দিতে পারে। হাসিনার বিরুদ্ধে জেগে উঠতে পারে জনতা। তবে সেসব লক্ষণ এখনও অদৃশ্য। ফলে এটুকু অনুমান করা যায় যে, জনতা জেগে ওঠার আগেই অনেক মানুষ গুম হবেন, জেলখানায় সমাধি হয়ে যাবে কত কত মানুষের, ক্রসফায়ার, পুলিশি নিপীড়ন অতিষ্ঠ করে তুলবে মানুষের জীবন। ভোগান্তি, সব কিছুর বেশি দাম, সংগঠিত হতে না পারা, এরকম সংকট চেপে বসবে সামাজিক জীবনের সকল স্তরে।

স্বৈরতন্ত্রের যে ভয়াল ছায়া এখন বাংলাদেশের ওপর পড়েছে, এখনই তা হঠানোর জন্য যদি গণতান্ত্রিক পক্ষগুলো হাত না লাগায়, তারা যদি জোর আন্দোলন না করে, তাহলে দেশ ও দেশবাসীকে আরও দীর্ঘকাল স্বৈরতন্ত্রের কালো ছায়ার নিচে থাকতে হতে পারে। দেশবাসীকে এখন এই বিপদ আমলে নিতে হবে। স্বৈরতন্ত্র মোকাবিলায় একজোট হতে হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *