ডোন্ট ডিস্টার্ব আ.লীগ নীতিতে বামজোট?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বামপন্থিরা নানা কারণেই দুর্বল। শিক্ষিত সমাজের বড় একটি অংশ তাই আওয়ামী লীগের দিকেই হেলে থাকেন। তারা মনে করেন, ক্ষমতায় যেতে সক্ষম, এমন দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ মন্দের ভালো! কিছু উল্টাপাল্টা করলেও এই দলটিই সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের বাড় বাড়ন্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।

কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। ১০ বছরের লম্বা শাসনামল পেয়ে আওয়ামী লীগের যেখানে সুযোগ ছিল, দেশের অধিকাংশ মানুষকেই নিজেদের পক্ষে টেনে নেয়ার, তা না করে তারা বিএনপির ভোটব্যাংকে হানা দেয়াটাকেই মনে করল সবচেয়ে জরুরী কাজ। ফলে আওয়ামী লীগ এখন ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। তার আমলেই জঙ্গিবাদ নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশ খেলাধুলা করছে।

পাশাপাশি ভারতের বিষয়ে নরম মনোভাব গ্রহণ ও দেশের মানুষের মনোভাবকে গুরুত্ব না দেয়ার মাধ্যমে আত্রা দেশের অভ্যন্তরে মৌলবাদ বিকাশের এক ক্ষেত্র তৈরি করেছে। অনেক তরুণকেই ভুল বোঝানো হচ্ছে যে ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ বাংলাদেশের ওপর ব্যাপক শোষণ, লুটপাট, নিপীড়ন চালচ্ছে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ভারত। তাছাড়া আওয়ামী লীগের মদদে রাজনিতিতে হেফাজতের উত্থানকে দেশের সচেতন সমাজ মেনে নিতে পারেনি।

এ অবস্থায় ড. কামাল হোসেন, মান্না, রবসহ একদল নেতৃবৃন্দ, যারা কিনা শিক্ষিত সমাজের মধ্যে ‘ক্লিন ইমেজের’ নেতা হিসেবে গ্রহণযোগ্য, তারা এগিয়ে এলেন। রাষ্ট্রের দলীয়করণ, আদালতের দলীয় ব্যবহার, লুটপাট, হামলা, নিপীড়ন বন্ধে আগে এই সরকারের পতন প্রয়োজন মর্মে একজোট হলেন তারা। রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপিও তার অংশীদার হলো। কিন্তু বামপন্থিরা এক্ষেত্রে যেন একেবারেই নিষ্ক্রিয়!

আওয়ামী লীগ কর্তৃক আশাভঞ্জন এ দেশের শিক্ষিতদের বারবারই সইতে হয়েছে। কিন্তু তারা কোনো বিকল্প পাননি। তারা বিকল্প হিসেবে বিপ্লবী দল চান না, ক্ষমতার রাজনীতির ধারায় অপেক্ষাকৃত ভালো পার্টি চান তারা। বামপন্থিদের মধ্যে সিপিবি, বাসদ (খালেক) ও গণসংহতির বিষয়ে এক্ষেত্রে অনেকের আশা ভরসা ছিল। দলগুলো বামপন্থি ধারার হলেও ক্ষমতার রাজনীতি, নির্বাচন ও মেইনস্ট্রিম মিডীয়ার সঙ্গে এদের এক ধরনের ওঠাবসা আছে। এরা এগিয়ে এলে কামাল হোসেনদের হাত শক্তিশালি হতো এবং রাজনীতিতে বিকল্প স্রোত সৃষ্টির চেষতা গতি পেত।

কিন্তু বামপন্থিরা নির্বাচনে আগ্রহী হলেও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আমলে নিলেন না। সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে তারা সাড়া দিলেন না। আমাদের দেশে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম, গণতন্ত্রী দল আর কংগ্রেস মিলে নৌকা মার্কায় নির্বাচন করে। ১৯৬৪ সালের জুলাই মাসে মুসলিম লীগের নেতা খাজা নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), কাউন্সিল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং নেজামে ইসলাম একজোট হয়ে তৈরি করেছিল কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি (কপ)। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে জামাতের সঙ্গে ঐক্য করে সরকার পতনের আন্দোলন করে।

এর অর্থ হলো, সরকার পতনের আন্দোলন হলো একটি ইস্যুগত ব্যাপার। এখানে আদর্শিক ঐক্যের প্রয়োজন নেই। বড় শত্রুকে ঠেকাতে অন্য পক্ষগুলো নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব স্থগিত রাখবে। সম্ভব হলে একরে শক্তি প্রদর্শন করবে, না হলে যে যার মঞ্চ থেকে যুগপৎ লড়াই চালিয়ে যাবে, এটাই এ ধরনের আন্দোলনের পদ্ধতি। এতে দোষের কিছু নেই। চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সেতুং জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে এ ধরনের ঐক্য করেছিলেন। সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিনও এক সময় জার্মান একনায়ক হিটলারের সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি করেছিলেন।

কিন্তু বাংলাদেশে যখন আওয়ামী লীগ ভয়ঙ্কর কর্তৃত্ববাদী এক শাসনকাঠামো তৈরির চেষ্টায় মত্ত, জাতীয় সম্পদকে তারা ব্যবহার করছে বিদেশীদের সঙ্গে সমঝোতা গড়তে, দেশের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তাকে করা হচ্ছে বিপন্ন, দুর্নীতি-লুটপাট আগের সব সীমা ছাড়িয়েছে, রাজনোইতিক নিপীড়োন হার মানিয়েছে এরশাদকেও, রাষত্র হয়ে উঠেছে পুলিশের সম্পদ। এরকম অবস্থায় বামপন্থিদের কাজ ছিল দিশা দেখানো। কিন্তু তারা এমনভাবে বসে আছে যেন তাদের কিছুই করার নেই।

তারা নির্বাচনে যাচ্ছে, কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবীতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তরুণ নেতাকর্মী ও অনলাইনে সমালোচনার ভয়ে বামপন্থি দলগুলো বিএনপির সঙ্গে কোনোরূপ গা ঘেঁষাঘেঁষিতেও যেতে চাইছে না। বাংলাদেশের রাজনিতি সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে, তারা স্পষ্টতই বুঝবেন, এটাই আওয়ামী মনস্তত্ত্বের ফাঁদ। বামপন্থিরা সেখানে আটকে গেছে। বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ যে বেশি মৌলবাদী কার্যক্রম চালাচ্ছে, এটা তারা আমলে নিচ্ছে না।

নির্বাচন উপলক্ষে বামপন্থিরা গড়ে তুলেছে গণতান্ত্রিক বামজোট। এই জোট গঠন সহজ ছিল না। বহুধাবিভক্ত বাম রাজনীতি মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। একাংশ নির্বাচনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিবন্ধিত দল হিসেবে বিরাজ করে। আরেক অংশ আধাপ্রকাশ্য/গোপন সংগঠনের ভিত্তিতে কার্যক্রম চালায়। প্রকাশ্য বাম দলগুলোর জোট গঠনও সহজ ছিল না। শুরুতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সঙ্গে ২০১২ সালে জোট গড়ে বাসদ। পরবর্তী সময়ে সিপিবি-বাসদের দ্বি-দলীয় ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চাও।

এ বছরের জুলাইয়ে সিপিবি-বাস-বাম গণতান্ত্রিক মোর্চার আটটি দলসহ বৃহত্তর বামপন্থি জোট হিসেবে বাম গণতান্ত্রিক জোট গঠিত হয়। এই জোটের দাবি সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও এদের লক্ষ্য পরিষ্কার নয়। নির্বাচনে জয় কিংবা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের লক্ষ্য তো কেবল ঘোষণা দেয়ার ব্যাপার নয়। সেক্ষেত্রে কার্যকরী পদক্ষেপও থাকতে হয়, সেরকম কিছু দেখা যাচ্ছে না। কোনো জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা বামদের মধ্যে দেখা যায়নি, এমনকি শাহবাগ এলাকাতেও নয়! দুই বড় দলের জোটে না গিয়ে নিজেদের পৃথক অস্তিত্ব ধরে রাখা ছাড়া তারা রাজনীতির পরিবর্তনের জন্য বিশেষ কিছু করতে পারছেন না।

তবে জোট গঠন সত্ত্বেও এই জোট ততটা ঐক্যবদ্ধ নয়, এর অভ্যন্তরে নানা ইস্যুতে বিভেদ প্রকট। বাম রাজনীতিতে ঐতিহাসিকভাবে বিভেদ ও বিভাজনের যে চর্চা, তা থেকে এরা কোনো শিক্ষা নিতে পেরেছে বলে দৃশ্যমান হয় না। সিপিবি ৭৭, বাসদ ৪৯ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ৩০টি আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। বেশ কিছু স্থানেই তারা একে অপরের বিপরীতে প্রার্থী দেবে। যদিও তারা প্রচলিত বিধিতে ভোটে যেতে পক্ষপাতি, কিন্তু ভোটারদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টিতে তাদের প্রচেষ্টার অভাব আছে, কারোই কোনো ভোটব্যাংক নেই।

অতীতে বামপন্থিদের বিভিন্ন অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করেছে। এখনও আওয়ামী জোটে বামপন্থিদের একটি অংশ আছে। এ অবস্থায় বামদের নির্বাচনমুখী বড় অংশটি যদি এমন ধরি মাছ না ছুঁই পানি ধরনের অবস্থান নেয়, জনমনে তার অর্থ দাঁড়ায় ভিন্ন। জনগণ মনে করেন, বামরা আওয়ামী লীগকে ডিস্টার্ব করতে চাইছে না! বামজোট যদি জনগণের কাছে এমন বার্তা দিতে না চায়, তাহলে তাদের নির্বাচন ও দেশের রাজনীতির বিষয়ে শক্তিশালী, জোরদার অবস্থান নিতে হবে।

আওয়ামী লীগের ছায়া থেকে বের হওয়াটাই বামদের চ্যালেঞ্জ। মানুষ তাদের আওয়ামী লীগের বি-টিম মনে করে। বিএনপির সঙ্গে তারা গেলেও মানুষ তাদের বিএনপির ছায়া ভাবত না। সেখানে তারা না-ই যেতে পারেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের ছায়া থেকে বামদের বের হতে হবে। তাহলেই কেবল আওয়ামী লীগের ওপর ক্ষুব্ধ, তাদের নির্যাতনে স্তব্ধ তরুণদের বামরা দলে টানতে পারবেন। স্বৈরাচার প্রতিরোধের আন্দোলনে না গিয়ে বামরা তাদের ইমেজ আরও নষ্ট করছে। তরুণ বামপন্থি কর্মীদের এই বাস্তবতা বুঝতে হবে, আন্দোলন এড়িয়ে নির্বাচনের মৌসুমে তারা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে আরামে ঘুরে বেড়াতে পারেন না। এটা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার সামিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *