গোপন সুতোর মায়াফোঁড় (গল্প-৩৯)

‘জাত গেল জাত গেল বলে
এ কী আজব কারখানা……’

চৈত্রের গনগনে দুপুরের বাতাসে গান আর একতারার সুর মিলিয়ে গেলে চোখ খুললেন গহর ফকির, সামনে বসা শর্বরীর সাত বছরের ছেলে দীপ। গহর ফকিরের মুখে শুভ্র দাড়ি-গোঁফ, তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘কেমন আছিস দাদুভাই?’
‘ভাল।’
‘মা কই?’
‘ঘরে।’ বারান্দার খুঁটিতে পিঠ ঘষতে ঘষতে বললো দীপ।
গহর ফকির হাত বাড়িয়ে ডাকলেন, ‘কাছে আয়।’

দীপ কাছে গিয়ে বসলো। অনুমতির অপেক্ষা না করে একতারাটি কোলের উপর তুলে নিয়ে কচি আঙুল দিয়ে টুং টাং শব্দ করতে লাগলো। গহর ফকির ঝোলা থেকে দুটো আতা বের করে দীপের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এট্টা তোর, আরেট্টা দিদির।’
‘দিদি তো স্কুলি।’ চটজলদি একতারাটা নামিয়ে আতা দুটো হাতে নিয়ে বললো দীপ।
‘দিদি স্কুল থেকে ফিরলি দিস।’

ঘাড় নাড়লো দীপ। আতা দুটো পাশে রেখে আবার একতারাটা কোলে তুলে আঙুল চালাতে লাগলো একতারার তারে। ভেজা কাপড় হাতে ঘর থেকে বের হলো শর্বরী। মাথার চুল ভেজা গামছায় বাঁধা। সদ্যস্নাত গৃহস্থ বধূর মুখে উপচে পড়া স্নিগ্ধতা। গহর ফকিরের দিকে তাকিয়ে সে বললো, ‘এতোদিন কই ছিলেন কাকা?’

‘মন বড় টানছিল রে মা। তাই শাঁইজির আখড়ায় গিছিলাম। সেখান থেকে নানা জায়গায় ঘুরে কাল আইচি।’
শর্বরী উঠোনের তারে কাপড় মেলে দিতে দিতে বললো, ‘দীপ, তেলের বোতলডা দে দাদুরে। কাকা চান করে আসেন। আপনার পছন্দের লাউয়ের ডাঁটা-পাতার ঝোল রান্না করছি।’

‘তুই কি আগের জন্মে আমার মা ছিলি? কেমন করে বুঝলি আজ আমি আসপো!’
শর্বরী হেসে বললো, ‘আমি তো আপনার মা-ই। সকালে আপনার ছেলে কোতেছিল, অনেকদিন কাকা আসে না। গানও শোনা হয় না। তাই আপনার কথা মনে হতেই কি মনে করে লাউয়ের ডাঁটা-পাতা রান্না করলাম।’

গহর ফকিরের চোখ ছলছল করে উঠলো, মাথায় তেল ঘষতে ঘষতে তিনি পুকুরঘাটের দিকে হাঁটা দিলেন। সংসারে তার আপন কেউ নেই। নিঃসন্তান তিনি। স্ত্রী শাহানা মারা গেছেন প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। এখন তার বয়স নব্বই। এতোগুলো বছর একা কাটিয়েছেন। শাহানা মারা যাবার পর আর বিয়ে করেননি। এখন শাহানার স্মৃতি আর লালনের গান আঁকড়ে ধরেই বেঁচে আছেন। এই নব্বই বছর বয়সেও তিনি মোটামুটি শক্ত-সমর্থ। তবে আগের মতো এখন আর নিয়মিত গ্রামে বের হন না। যখন ঘরে আর দানাপানি কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, তখন বের হন। সকালে ভাত আর আলু ভর্তা খেয়ে কাঁধের ঝোলা আর একতারাটা নিয়ে পথে নামেন। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে ঘুরে লালনের গান করেন। যে যা দেয় হাসিমুখে তাই নিয়েই খুশি থাকেন। মানুষের ভাল মুখ, কালো মুখ সবই তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করেন।

মানুষের সম্পর্কের শিকড় নিজের অজান্তেই কখন, কিভাবে, কোনদিকে ধাবিত হয় তা বোঝার উপায় নেই। জগতে মানুষের অভাব নেই। পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে, গ্রামে-শহরে সর্বত্র মানুষ আর মানুষ। কিন্তু সব মানুষকে সবার ভাল লাগে না। একজনের মানসপটে সব মানুষের স্থান হয় না। অনেক সময় কাছের মানুষকে মনে হয় কতো দূরের! মনের কতো গলি পেরিয়ে যেতে হয় তার কাছে! আবার অনেক সময় দূরের অচেনা মানুষও মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নেয়। গোপন সুতোর মায়াফোঁড়ে মানুষ মানুষকে জড়িয়ে ধরে। কখন যে মায়ার সুতো মানুষকে জড়ায়, আর কখন যে সুতো কেটে যায় তা মানুষ বুঝেও উঠতে পারে না। নইলে কোথাকার কোন গহর ফকির এই বটেশ্বরের শর্বরীর গৃহে স্নানাহার করবে কেন! আরও তো কতো গ্রাম আছে, কতো বাড়ি আছে, কতো মানুষ আছে! কতো বড় বড় ধনীর গৃহ আছে। তাদের বাড়িতে রকমারি খাবারের আয়োজন। দুটো খেতে চাইলে তারা হয়তো না-ও করবে না। তবু সেসব বড় বড় পাকা ঘর-বাড়ি ফেলে এসে বটেশ্বরের এই গৃহের মাটির বারান্দায় বসে শর্বরীর হাতে লাউপাতার ঝোল কেন খাবেন গহর ফকির! কেন শর্বরীকে বলবেন, ‘আগের জন্মে তুই আমার মা ছিলি!’ এই ভালবাসার সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। খুঁজতে যাওয়াও বোকামী। পৃথিবীতে নিয়মের বাইরেও কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠে, আত্মীয়তার বন্ধন হয়, ভালবাসার জন্ম হয়!

পুকুর থেকে স্নান সেরে এসে বারান্দার এক কোনে বসে পড়লেন গহর ফকির। অনেকটা লালন ফকিরের মতোই দেখতে তিনি। মুখে শুভ্র দাড়ি-গোঁফ। শুভ্র চুলগুলো কাঁধ পর্যন্ত। শর্বরী ভাত নিয়ে এলো; সাথে লাউপাতার তরকারি, আলু ভাজি আর পুঁটি মাছের ঝোল।
‘দাদুভাই খাইচে?’ শর্বরীর দিকে তাকালেন গহর ফকির। এরই মধ্যে দীপ কোথায় গেছে খেলতে।
‘হ, খাইচে।’
একটু থেমে শর্বরী বললো, ‘এই দুপুরের রোদে আর বের হবেন না কাকা। খায়ে কাছাড়ী ঘরে ঘুম দেন। বিকেলে যাবেন।’
‘তাই করবো। মায়ের আদেশ, অবাধ্য হই কেমনে! আমার আর কিছু লাগবেন না। যা, তুই খায়ে নে।’
শর্বরী চলে গিয়ে একটু পর এক বাটি দুধ নিয়ে আবার এলো। দুধ দেখেই গহর ফকির বললেন, ‘আবার দুধ কেন রে?’
‘কালো গাইটা এই প্রথম বিয়েলো। দুধ ভালই অয়।’
‘কি বাছুর অইছে?’
‘বকনা বাছুর।’
‘যাক ভাল অইছে। পাল বৃদ্ধি পাবেনে।’
বিকেলে রোদের তেজ কমলে বের হলেন গহর ফকির। সকালে গাইতে গাইতে ঘর ছাড়া, আবার বিকেলে গাইতে গাইতে ঘরে ফেরা।

দুই

সেই কতো বছর আগে, যৌবনে লিয়াকত শাঁই নামে লালন ফকিরের এক শিষ্যের সঙ্গে দেখা হয়েছিল গহর ফকিরের। ছোটবেলা থেকেই গান-বাজনার প্রতি ঝোঁক থাকলেও লিয়াকত শাঁইয়ের কাছেই লালনের গানের হাতেখড়ি। লিয়াকত শাঁইয়ের দেখা পেয়ে যেন অন্য এক জগতের সঙ্গে পরিচয় তরুণ গহরের। অনেকদিন ঘরছাড়া হয়ে তাঁর সাথেই ঘুরে বেড়ান তিনি। মাঝে মাঝে বাড়িতে আসতেন, কিছুদিন বাড়িতে থেকে আবার দেশান্তরি হতেন। শেষে মা-বাবা ছেলেকে ঘরমুখী করতে প্রায় জোড় করে বিয়ে দিলেন, যাতে ছেলে সংসারে মন দেয়। কিন্তু কোথায় কী! যার ভিতরে বৈরাগ্যের বাসা, নিরন্ন বাউলের সংসার; তাকে কী আর চাইলেই বিয়ে দিয়ে সংসারী করা যায়! ঘরের বউ ঘরেই থাকে কিন্তু গহরের আর দেখা নেই। দিন যায়, রাত যায়। এমনিভাবে সপ্তাহ ঘুরে মাসও যায়। আবার কোনো এক রাতে গান গাইতে গাইতে ফিরে আসেন গহর। অভিমানী বধূর অভিমান ভাঙান। স্বামীর বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বধূর অভিমান ভাঙে। সেই রাতে বধূ আদর-ভালবাসায় ভরিয়ে দেন গহরকে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সেবা-যত্ন করেন। বধূটি ভাবেন এমনি ভালবাসা দিয়ে যদি স্বামীকে আঁচলে বেঁধে রাখা যায়! কিন্তু বাউলের কী আর সংসারের এতো ভালবাসা সয়? আবার পাখি উড়াল দেয়!

এই আসা-যাওয়ার মাঝেই দিন কাঁটতে থাকে গহরের। সময়ের আবর্তে মা-বাবা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। শাহানা ছাড়া তখন সংসারে আর কেউ নেই। কোনো সন্তান হয়নি। তবু অভাবের সংসার। সামান্য এক খণ্ড জমির ফসলে দুজনের সংসার কোনো মতে টেনেটুনে চলে। শাহানা স্বামীকে বোঝায়, পাড়া-প্রতিবেশীরা টিপ্পনী কাটে। কোনো কিছুই গায়ে মাখেন না গহর। তবে শাহানাকে খুব ভালবাসেন গহর। শাহানার অসুখ হলে তার কাছ ছাড়া হন না কখনও। রাত জেগে সেবা-যত্ন করেন। রান্না করে নিজে খান, শাহানাকে খাওয়ান।

একবার শাহানাকে বলেই লালনের আখড়ায় গেলেন বাৎসরিক উৎসবে। ফিরে এলেন প্রায় মাস খানেক পর এক রাতে। বাড়ি ফেরার সময় রাস্তা দিয়ে খালি গলায় গান গাইতে গাইতে আসেন গহর। গান শুনে হারিকেন হাতে রাস্তায় এগিয়ে যান শাহানা । এবারও গান গাইতে গাইতে বাড়ির ভিতরে চলে এলেন। তবু হারিকেন নিয়ে এগিয়ে গেলেন না শাহানা। কোনো সাড়াশব্দ নেই। ডাকতে ডাকতে গহর বারান্দায় উঠলেন, ‘কই, ঘুমালে নাকি?’

কোনো সাড়া নেই। দরজায় তালা ঝোলানো। গহর ভাবলেন শাহানা কি তার বাবার বাড়ি গেল নাকি? কিন্তু কোনোদিন তো বাড়ি খালি রেখে বাবার বাড়িতে যায় না। গহরের গানের সাড়া পেয়ে পাশের বাড়ি থেকে হারিকেন হাতে এগিয়ে এলেন ফরিদা ভাবী আর জামাল ভাই। ওরা কাছে আসতেই বারান্দা থেকে নেমে জিজ্ঞাসা করলেন গহর, ‘ও কই ভাবী, বাবার বাড়ি গেছে?’

ফরিদা ভাবী নিঃশ্চুপ থাকে। জামাল ভাই হারিকেন নিয়ে একটু এগিয়ে আঙুল দিয়ে দেখান আতা গাছের নিচে সদ্য দেওয়া কবর!
এতোদিন ঘুড়ি আকাশে উড়তো কিন্তু নাটাইয়ের টানে এক সময় ঠিকই ফিরে আসতো। নাটাই যেদিন সুতো কেটে দিলো সেদিন থেকে আর ঘরে ফেরার তাড়া নেই। কোনো সুতোর বন্ধন নেই। সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি দক্ষিণের বাতাসে উত্তরে যায়, উত্তরের বাতাসে দক্ষিণে। আগে ঘুরতে ঘুরতে একসময় মন কেমন করে উঠতো ঘরের জন্য। তখনই ঘরে ফিরতেন গহর। এখন আর ঘরের জন্য মন কেমন করে না। বরং ঘরে ফিরলেই ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। কতোবার বাড়ি ফিরে এসে দেখেছেন বৈশাখের ঝড়ে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গেছে ঘর। জামাল ভাইয়ের সাহায্যে ঘরটা আবার দাঁড় করিয়েছেন। ঘর তুলে দিয়ে জামাল ভাই, ফরিদা ভাবী বা অন্য প্রতিবেশীরা আবার বিয়ে দেবার জন্য কতো চেষ্টা করেছেন। লাভ হয়নি। সারাজীবনে আর বিয়েই করলেন না সংসার বৈরাগ্য গহর ফকির। গহর ফকির সেই গোত্রের মানুষ, যারা সংসারের সুখ-দুঃখের মাঝে জন্মে, প্রকৃতির আলো-বাতাসে বড় হয়, শস্যদানা খেয়ে বেঁচে থাকে, অথচ সারাজীবন তারা সংসারের বাইরের মানুষ হয়েই থাকে।

আজ জীবনের এই গোধূলি লগ্নে এসেও মানুষটা বদলালেন না একটুও। একবার অসুখে পড়ে জমিটুকুও বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন এই ভিটেটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই। গান গেয়ে যা পান, তাই দিয়েই চলে। এখন অসুখে পড়লে অভূক্ত থাকেন অথবা পাড়া-প্রতিবেশীরা দয়াবশত কেউ যদি কিছু দেয় তাই খান। আজ আর ফরিদা ভাবী-জামাল ভাই নেই যে না খেয়ে থাকলে আদর করে খাইয়ে যাবেন। কিংবা অসুখে পড়লে সেবা-যত্ন করবেন।

গান পাগল লালন অন্তপ্রাণ এই মানুষটি গানের জন্য অনেক লাঞ্ছনা-বঞ্চনাও সহ্য করেছেন। বছর কয়েক আগে এক গ্রামে গিয়েছেন গান করতে। কয়েকটি বাড়িতে গান করার পরই একজন মৌলবী তার কয়েকজন চেলা নিয়ে চড়াও হয়েছিল গহর ফকিরের ওপর। গহর ফকির প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘শাঁইজির গান করি। মানব প্রেমের কথা কই। তোমাদের ধর্ম নিয়ে তো কিছু কই না। তাইলে তোমরা আমার পিছনে লাগিছ ক্যান?’

মৌলবী বললো, ‘বুড়ো বয়সে তোমার ধর্ম-কর্ম নাই?’
গহর ফকির বললেন, ‘কর্মই মানুষের ধর্ম। একজন কৃষকের কাজ জমি চাষ করা, একজন জেলের কাজ মাছ ধরা, তেমনি আমার কাজ গান করা। গানই আমার নামাজ-রোজা। সৎ ভাবে নিজ নিজ কাজ করাই তো ধর্ম!’

‘আস্তাকফিরুল্লাহ! কয় কী বুড়ো নাস্তিকটা! শুনছো তোমরা, গান নাকি নামাজ-রোজা হইতে পারে!’
গহর ফকিরের উদ্দেশে বললো, ‘এই বয়সে রসের নাগর হয়ে প্রেমের বাণী বিলাও! দুইদিন পরে কবরে যাবা। এহন তুমি মনের মানুষ খোঁজো! এই বয়সেও মেয়ে মানুষের প্রতি লালসা!’

গহর ফকির হাসলেন। এই গণ্ডমূর্খকে তিনি কী বলবেন! তবু বলেন, ‘তোমরা মানুষের ভেতর সুন্দর কিছু দেখতে পাও না কেন জান? কারণ তোমরা সারাক্ষণ কেবল মানুষের ভেতরের কুৎসিত দিকটা নিয়েই ভাব। মানুষ কী শুধু নারী সঙ্গ পাবার জন্যই মনের মানুষ খোঁজে! মনের মানুষ তো একজন পুরুষও হতি পারে।’
‘আস্তাকফিরুল্লাহ! একি শুনি আমি!’

গহর ফকির শান্ত গলায় বললেন, ‘মৌলবী সাহেব। গানের ভিতরে আমি যে মনের মানুষ খুঁজি, সে মনের মানুষ কারো কাছে হতি পারে রক্ত মাংসের মানুষ। নারী কিংবা পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ যে কেউ! কারো কাছে হয়তো তার চাইতেও বেশি কিছু; যা দেখা যায় না, ছোয়া যায় না। কারো কাছে হতি পারে সৃষ্টিকর্তা।’

মৌলবী ক্ষেপে গিয়ে চড় মারলো গহর ফকিরের গালে। অকথ্য ভাষায় গালাগালি করলো। চোখ রাঙিয়ে শাসালো, ‘ফের এই গ্রামে এলে তোর পায়ের রগ কাঁটে দেব। আল্লাহ্’র পবিত্র জমিনে তোর মতো গুনাহ্গারের থাকার অধিকার নাই।’

গ্রামের লোকজন বাধা না দিলে হয়তো ঐ ধর্মান্ধ লোকগুলো আরও মারতো গহর ফকিরকে। সেদিন কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফিরেছিলেন গহর ফকির। তবু তার গান গাওয়া থেমে থাকেনি।

তিন

মাস ছয়েক হলো গহর ফকিরকে আর কোথাও দেখা যায় না। শর্বরী কতোজনের কাছে জিজ্ঞাসা করেছে কিন্তু কেউ তাঁর খোঁজ দিতে পারেনি। কতো ফকির-বোষ্টমীর কাছে গহর ফকিরের সন্ধান করেছে, মেলেনি সন্ধান। সবাই একই কথা বলেছে, ‘বোধ হয় মরে গেছে। বয়স তো কম না।’

শর্বরী প্রথমে অবিশ্বাস করলেও এক সময় বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, বোধ হয় মরেই গেছে গহর কাকা। ভাবতে খুব কষ্ট হয় শর্বরীর। কানে বাজে দুটি শব্দ, ‘মা আছিস?’ অনেক ফকির-বোষ্টমী-ই তো ‘মা এক মুঠো ভিক্ষে দাও’ বলে ডাকে। কিন্তু সেসব সাজানো বুলি। প্রাণের টান বড় কম। দাড়িওয়ালা কোনো ফকির এলেই গহর ফকিরের কথা মনে হয় শর্বরীর। সেদিন অনেকটা সময় তার ভেতরে জেগে থাকে গহর ফকির। কাজ করে, হাঁটাচলা করে কিন্তু ভেতরে থাকে গহর ফকির। কানে বাজে ‘মা আছিস?’
বিকেলে ঘর ঝাঁট দিচ্ছে শর্বরী। ভাঙা অস্পষ্ট গলার দুটি শব্দ এলো কানে, ‘মা আছিস?’

প্রথমবার শোনার পর ভাবলো তার মনের ভুল। দ্বিতীয়বার শোনার পর হাতের ঝাড়ু ফেলে দিয়ে প্রায় দৌড়ে ঘরের বাইরে এলো শর্বরী। বারান্দায় এসেই পাথুরে দৃষ্টিতে থমকে দাঁড়ালো সে। গহর ফকির! তার গহর কাকা! এতোদিন যাকে ভেতরে ভেতরে খুঁজেছে, সেই গহর কাকা! কিন্তু একি তাঁর চেহারা! এই গহর কাকাকে তো দেখতে চায়নি সে! ভ্যানের উপর বসা যেন একটি কঙ্কাল! কাঁপছেন। হাড়ের উপর শুধু কালো চামড়ার প্রলেপ। একতারাটা ভ্যানের উপর পড়ে আছে অসহায়ভাবে। শর্বরী বারান্দা থেকে নেমে ভ্যানের কাছে এসে গহর ফকিরের ডান হাত ধরে বললো, ‘কাকা!’

ভ্যানওয়ালা বললো, ‘তিন-চার দিন ধরে আমারে কয়, আমার একবার বটেশ্বর নিয়ে চল। আমার আর সময় হয় না। শ্যাষে আজকে খুব কাকুতি মিনতি করে কোলো, আজকে আমার নিয়ে চল। নইলে মা’র সাথে আমার আর দ্যাহা হবেন না। তাই নিয়ে আলাম।’
শর্বরী বললো, ‘কাকা, ভ্যানেরতে নামেন।’

হাত নেড়ে কাঁশতে কাঁশতে গহর ফকির বললেন, ‘আর নামবো না রে মা। যাবার আগে শুধু তোরে একবার দেখে গেলাম। এক গ্লাস জল দে। শেষ বেলায় তোর হাতের জল খায়ে যাই।’
হাঁফাতে লাগলেন গহর ফকির।

সন্দেশ আর জল নিয়ে এলো শর্বরী। কাঁপা কাঁপা হাতে খেলেন গহর ফকির। খাওয়া শেষ হলে শর্বরী ঘর থেকে একশো টাকা এনে বাড়িয়ে দিলো গহর ফকিরের দিকে, ‘কাকা, কিছু কিনে খাবেন।’

গহর ফকির দু-দিকে মাথা নেড়ে শর্বরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘আমি আর টাকা দিয়ে কী করবো রে মা! দাদু ভাই কই?’
‘খেলবার গেছে।’
তারপর ভ্যানের উপর থেকে একতাড়াটা হাতে নিয়ে শর্বরীর দিকে এগিয়ে দিয়ে গহর ফকির বললেন, ‘দাদুভাইকে দিস।’

শর্বরী একতাড়াটা হাতে নিয়ে গহর ফকিরের দিকে তাকিয়ে রইলো। গহর ফকির বললেন, ‘আমার সময় শ্যাষ। আর দুই-এক দিনের মদ্যেই আমি আমার বাড়ি চলে যাব রে মা। তুই ভাল থাহিস। মা রে তুই না কইলেও আমি জানি, তোর ভিতরে অনেক কষ্ট, অনেক ব্যথা। সহ্য কর মা। সহ্য কর।’
কাঁশতে লাগলেন গহর ফকির।

দুই-একদিনের মধ্যেই এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবেন গহর কাকা, চিরদিনের মতো চলে যাবেন? আর কোনোদিন তাকে বলবেন না ‘মা আছিস?’ তার হাতের লাউয়ের ডাঁটা-পাতার ঝোল খাবেন না? গান শোনাবেন না? ভেতরটা মুচড়ে যাচ্ছে শর্বরীর। চোখের জলের বাঁধ ভেঙেছে। গহর ফকির বললেন, ‘কাঁদিসনে মা!’

শর্বরী গহর ফকিরের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। তার মাথায় হাত ছুঁইয়ে আকাশে তাকিয়ে চোখ বুজলেন গহর ফকির। চোখ থেকে দুটো জলের রেখা শতেক বলিরেখার মধ্য দিয়ে নিচের দিকে নেমে হারিয়ে গেল শুভ্র দাড়ির জঙ্গলে। হাত দিয়ে ইশারা করে ভ্যানওয়ালাকে যেতে বললেন।

শর্বরী একতারাটা হাতে নিয়ে ভ্যানের পিছন পিছন বাড়ির সামনের বটগাছ পর্যন্ত এগিয়ে গেল। ক্রমশই ভ্যান দূরে চলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বাড়ি-গাছপালার আড়ালে চলে গিয়ে আবার চোখে পড়ছে ভ্যানটা। সূর্যটাও মেঘের আড়াল থেকে শেষবারের মতো উঁকি দিচ্ছে।

দিগন্তে হারিয়ে গেল সূর্য। চোখের আড়ালে চলে গেলেন গহর কাকা। তবু একতাড়া হাতে ঝাপসা চোখে সেদিকেই তাকিয়ে আছে শর্বরী। এখনও যে মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছে তার গহর কাকাকে। কানে বাজছে, ‘আর দুই-এক দিনের মদ্যেই আমি আমার বাড়ি চলে যাব রে মা! তুই ভাল থাহিস!’

শেওড়াপাড়া, ঢাকা।
২০০৮।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *