হিজিবিজি লেখা কচু গাছের মাথা

আমার বয়স তখন খুব কম হলেও স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি এখনো মনে আছে, শহর ছেড়ে গ্রামে নানা’র বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি বাবা সরকারি চাকুরী থেকে বিদায় নিয়ে আমাদের গ্রামের বাড়িতেই ফেলে রাখলেন, মামারা মুক্তিযুদ্ধে চলে গেলেন তবে মাঝে মাঝে হালুয়া ঘাট বর্ডার পার হয়ে গভীর রাতে গ্রামের বাড়িতে এসে আমাদের খোঁজ খবর নিয়ে যান, বাড়ীর বেশীর ভাগ মানুষ ওপারেই চলে গেছে, পাক বাহিনী এদিকটায় আসলে নানার বাড়ীটা যে ধুলায় মিশিয়ে দেবে সেটা আমাদের সবারই জানা। রাতের বেলা পালা করে বাড়ি পাহারা দেয়া হচ্ছে, মুরগীর খোঁয়াড়ে কু শব্দটিও সবার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়।
ভোর বেলা ঘুম ভাঙতেই নাস্তার আয়োজন চলছে তবে সবাই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে সর্বদাই প্রস্তুত তাই একটা ব্যাগে প্রয়োজনীয় কাপড় চোপড় আর জিনিসপত্র তৈরিই থাকে, পাশের বাড়ীর রফিক আমার চাইতে বয়সে একটু বড়ই হবে দৌড়াতে দৌড়াতে আমাদের বাড়িতে একটা কচু পাতা নিয়ে এসে সেটাতে আরবি ভাষা লেখা ভেসে উঠেছে জানিয়ে সব্বাইকে পাতাটি দেখাচ্ছে আর যে যার মতো পাতাটিকে বিনম্র শ্রদ্ধায় কপালে ঠেকাচ্ছে, আহা সবাই যেন কত সৌভাগ্যবান যে কচু পাতাগুলো শুধু আমাদের বাড়ীর পুকুরের পারেই পাওয়া গেল যেখানে আরবি ভাষায় লেখা ভেসে উঠেছে, পাতাগুলো পড়া ও বোঝার জন্যে গ্রামের একজন মোল্লা ডেকে পাঠানো হোল কারণ সবার ধারণা লেখাগুলো তর্জমা করতে হলে একজন মোল্লা মানে ইসলামিক জ্ঞানে টিউটুম্বুর এমন একজনকেই প্রয়োজন, তিনি খবর পাঠালেন দুপুরের দিকে দুটো মুরগী আর চিকন চালের ভাত রান্না করে রাখতে তিনি জোহরের নামাজের পর আসবেন, সে সময় দুপুরের পর বা বিকেলের পর কিংবা সকালের পর এভাবেই সময় নির্ধারণ করা হতো। অনেকের হাতে তখন ঘড়ি থাকত না।
যথা সময়ে মোল্লা মশাই এসেই পেট পুড়ে খেয়ে নিলেন, কচু পাতাগুলো নানী ইতিমধ্যে খুব যত্ন করে একটি বইয়ের ভেতর চাপা দিয়ে রেখে দিয়েছেন ঘন্টা খানেক বইয়ের ভেতর চাপা পরা কচুপাতা গুলো আলো ও বাতাসের অভাবে ইতিমধ্যেই খয়েরি বর্ণে রং বদলাতে শুরু করেছে, লেখাগুলো প্রায় সেই রঙের মাঝে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, কিছুই বোঝার উপায় নেই। পাতাগুলো মোল্লা মশাইয়ের সামনে হাজির করতেই তিনি বেশ কিছুক্ষণ বিজ্ঞের মতো দেখে নিয়ে বিড়বিড় করে কি সব পড়ে বলে উঠলেন সব্বাইকে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়তে হবে কারণ মহান সৃষ্টি কর্তা কচু পাতায় বাণী পাঠিয়েছেন, এই বাড়ীর উপর কোনই আক্রমণ বা হামলা হতে যাচ্ছে না তাই সব্বাইকে নিয়মিত নামাজ আদায় করতে হবে আর মোল্লা মশাই মাঝে মাঝে দুপুরে জোহরের নামাজের পর আসবেন, মোল্লার কথা শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে নানী এর মাঝেই মুরগি হিসাব করে ফেলেছেন, এখন থেকে মুরগিগুলো মোল্লা মশাইয়ের জন্যেই বরাদ্দ হয়ে গেল, আমার দুচোখ বেয়ে দুফোটা জল গড়িয়ে যাচ্ছে, মুরগির মাংস ছাড়া ভাত খেতে পারি না, শহুরে ছেলে বাবা খুব শখ করেই আমার জন্যে কষ্ট করে হলেও মাংসের ব্যবস্থা করতেন, সেই আমার কিনা নানার বাড়ী এসে মাংস খাওয়া থেকে অব্যাহতি নিতে হবে? মা’র আঁচলের নীচে জায়গা নিয়ে প্রশ্ন করলাম – ‘সব মুরগীগুলো কি হুজুরকেই দেয়া হবে,’ নানী আমার কান মোলে দিয়ে বললেন,’ইচেড়েপাকা পাকা হয়েছ তাই না’। আমি এক দৌড়ে পড়ার টেবিলের কাছে চলে গিয়ে ভাবছি সৃষ্টিকর্তা ঘরের ভেতর এতগুলো খাতা পেন্সিল থাকতে পুকুর পারে কচু পাতায় হিজিবিজি করে লিখতে যাবেন কেন? আর লিখতেই যদি যাবেন তবে মুরগীর মাংসের বিষয়টি উল্লেখ্য করলেন না কেন? শিশু মন তাই এর চাইতে বাস্তব চিন্তা আমার মাথায় কিছুতেই আসলো না।
দুঃখভরাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে রাতে ঘুমাতে গেলাম, মুরগীর মাংসের শোকটা কিছুতেই সম্বরণ করতে পারছিনা, দুপুরের দিকে এক পশলা ঝির ঝির বৃষ্টি হয়ে গেলো, জীবনে এই প্রথম মাংস ছাড়া পুঁটি মাছের এক গাদা ঝোল দিয়ে ভাত খেলাম কারণ মাছ দেখলেই কাটার ভয়ে গলা দিয়ে ভাত নামতেই চায় না। সময় কাটাবার জন্যে নানা আমার জন্যে মাছ ধরার ছিপ আর বড়শির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, দুপুরে পর বিকেলের শেষ দিকে কচু পাতা গুলোর উপর সজাগ দৃষ্টি রেখেই পুকুরের পারে আসন গেড়ে মাছ ধরতে বসে গেলাম, মনে মনে ভাবছি সৃষ্টিকর্তা যদি আর একবার কিছু লিখতে আসেন অবশ্যই তাকে এই মুরগীর মাংসের বিষয়টা জানাতেই হবে। দুপুরের বৃষ্টি পরার পর তেঁতুল গাছে জন্ম নেয়া অনেক শুও পোকা টপ টপ করে নীচের দিকে ঝরে পড়তে থাকে আর কিছু শুও পোকা কচু পাতার উপর এসেও পরে পোকাগুলো নরম পাতা পেয়ে পাতার উপরি ভাগের সবুজ অংশ খেতে খেতে সামনের দিকে এগুতে থাকে অনেকটা এঁকে বেঁকে চলার কারণে খানিক সময় পর পাতার উপর খয়েরি রঙের আচরকে বিদঘুটে লেখার মতোই মনে হচ্ছে, পাতার শেষ প্রান্তে এসে পোকাগুলো আবার বিপরীত মুখে যাওয়া শুরু করে একই ভাবে তাতে মনে হয় নেক্সট লাইনে লেখা শুরু হয়েছে।
আমার গায়ে আগুন লাগার মতো অবস্থা এতো বিজ্ঞ মোল্লা কিনা এই সাধারণ বিষয়টি বুঝেতে না পেরে মুরগির মাংস খাবার লোভটা সামলাতে পারলো না? মুরগীর মাংস আমার প্রিয় আর মাংস ছাড়া আমার ভাত খাওয়া চলেই না।
আমি এক দৌড়ে পুরো বিষয়টা নানীকে জানাতেই নানী দ্বিতীয়বার আমার কান মোলে দিলেন।

—মাহবুব আরিফ কিন্তু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *