ধর্ম বাণিজ্য ও গদামতত্ত্ব

ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কল্যাণকর কোন দিক পৃথিবীর কোন দেশ আজ পর্যন্ত খুঁজে পায়নি। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই আবর্জনা স্বরূপ এই জিনিসটাকে সরানো দেশ, রাজনীতি ও জনগনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিবেচনায় আলাদা করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে মোকাবিলা করা যায় না। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে পরিচিত ভারতে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেও বিজেপি এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলো ছাড়াও কমপক্ষে ৩৭টি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি সর্বভারতীয় ভিত্তিতে এবং ১০টি আঞ্চলিক দল হিসেবে তৎপর । এসব রাজনৈতিক দল বৈধভাবেই কাজ করছে। কিন্তু পাশাপাশি এটাও দেখা দরকার যে জাতীয় নিরাপত্তা এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টা করলে এসব দলকে অন্যদের মতোই দেশের প্রচলিত আইনের পরিণতি ভোগ করানো যায় কিনা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও ধর্মভিত্তিক দলের উপস্থিতি দেখা যায়, এবং তাদের নিষিদ্ধ করার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এর বিপরীতে বেশ কিছু দেশে এখনো ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ব্যাপক প্রচলন আছে।

তাহলে কি এর অর্থ এই যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলের প্রভাব হ্রাস করার, জনসাধারণের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ধর্মের পার্থক্যকে চিহ্নিত করার, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিপজ্জনক দিকগুলো মোকাবিলা করার কোনো উপায় নেই????? অবশ্যই আছে। এ বিষয়ে দীর্ঘ মেয়াদে কী করা যেতে পারে, তা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করা উচিৎ।
যে কোনো দেশে রাজনৈতিক দলে কেবল রাজনীতির মধ্য দিয়েই বিকশিত হয় না। বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতিও তার ব্যতিক্রম নয়। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এমনকি দাতব্য সংস্থার মধ্য দিয়ে তার মানসিক জমিন এবং তার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শিক্ষা ও গণমাধ্যম সেই রাজনীতিকে সমাজের গভীরে স্থায়ী আসন করে দেয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল অবধি দেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল না থাকলেও এ লক্ষ্যে কাজ করেছে বিভিন্ন সংগঠন। একই প্রক্রিয়া তার পরও অব্যাহত থেকেছে এবং এখন তা ব্যাপক রূপ নিয়েছে। বিপরীতক্রমে তার নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরার কাজে নিয়োজিত সংগঠনগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সীমিত আকারে কাজ করেছে। এ পরিস্থিতিকে ধর্মভিত্তিক দলগুলো তাদের অনুকূলে ব্যবহার করতে সফল হয়েছে। সমাজের ভেতরে এ অবস্থা অব্যাহত রেখে ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে আইনি ও সাংবিধানিক বিধিবিধান দিয়ে, কিংবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে চাইলে তাতে সাফল্য কোনদিনই আসবেনা । এ জন্যই করণীয় হলো সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করা ও তা অব্যাহত রাখা। এজন্য শিক্ষাক্ষেত্রে বড় আকারের সংস্কার প্রয়োজন। আর একটি ব্যাপার লক্ষণীয়, সারা পৃথিবীতে ধর্ম ও সেক্যুলারিজম বিষয়ে কয়েক দশক ধরে যে ব্যাপক আলোচনা চলছে, বাংলাদেশের একাডেমিক জগতে সে বিষয়ে উৎসাহ কম। বিশ্বের জ্ঞান-জগতের নতুন চিন্তাভাবনা ও বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত না থাকার কারণে চিন্তার একধরনের দৈন্য তৈরি হচ্ছে। প্রাসঙ্গিকভাবে বলা যেতে পারে যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামপন্থীদেরও চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন ঘটেছে, আদর্শিক অবস্থানেও বদল দেখা গেছে। কিন্তু তার সামান্য ছোঁয়া পর্যন্ত আমরা দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামপন্থী রাজনীতিবিদ ও তাঁদের সমর্থক চিন্তাবিদদের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়না। বাংলাদেশে ধর্ম, সেক্যুলারিজম, রাজনীতি ও সমাজের সম্পর্ক বিষয়ে পঠন-পাঠন, গবেষণা এবং এ বিষয়ে নির্ভয়ে বিতর্কের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে না পারলে আমরা পুরোনো চিন্তার বৃত্তচক্রে ঘুরপাক খেতে থাকব। এ থেকে বেরোনোর পথ খোঁজার দায়িত্ব অন্যের ওপরে চাপিয়ে দিয়ে আমরা এটা আশা করতে পারি না যে হঠাৎ করে একটা সমাধান তৈরি হবে। এটাও মনে করার কারণ নেই যে এর বিতর্কে ভিন্নমতাবলম্বীদের যুক্তির সবটাই অগ্রহণযোগ্য। যুক্তিসম্পন্ন নিরাবেগ বিতর্কের মধ্যেই সমাধানের পথ খুঁজতে দরকার।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, ধর্মভিত্তিক দল এবং ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সমাধান হঠাৎ করে পাওয়া যাবে না। তবে সেই সমাধানের জন্য কেবল ঘটনাধারার ওপর নির্ভর করাও যথাযথ নয়; শক্তি প্রয়োগের মধ্যে এ প্রশ্নের সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং এই সমস্যার সমাধান করতে হবে সবার সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে।

৯ thoughts on “ধর্ম বাণিজ্য ও গদামতত্ত্ব

  1. ধর্মভিত্তিক রাজনীতি,

    ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, ধর্মভিত্তিক দল এবং ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সমাধান হঠাৎ করে পাওয়া যাবে না। তবে সেই সমাধানের জন্য কেবল ঘটনাধারার ওপর নির্ভর করাও যথাযথ নয়; শক্তি প্রয়োগের মধ্যে এ প্রশ্নের সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং এই সমস্যার সমাধান করতে হবে সবার সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে।

    সহমত

  2. হ্যা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে
    হ্যা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে গোয়াড়দের থামানো যাবে না।
    প্রয়োজন ধীর একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু শুরুটা করবে কে?

    ভোট হারানোর রিস্কতো কেউ নিতে চায় না।

  3. @ পৃথু স্যন্যাল>>> দেখুন
    @ পৃথু স্যন্যাল>>> দেখুন প্রতিবার নির্বাচনে এইসব ধর্মব্যবসায়ী ও ভণ্ড চেতনাধারীদের কিন্তু আমরাই ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনি। সো শুরুটা করতে হবে আগে আমাদেরকেই।

  4. ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতির সুযোগেই
    ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতির সুযোগেই ধর্মান্ধতা তৈরী হয়। তাই সর্ব প্রথম কাজটি হবে ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত…

    1. @মুকুল>> আইন করে বা শক্তি
      @মুকুল>> আইন করে বা শক্তি প্রয়োগে এর মূল উৎপাটন কখনই সম্ভব নয়। সবার আগে জরুরী সমাজের সচেতন নাগরিকদের সক্রিয়তা।

Leave a Reply to সৌ রভ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *