অনুশীলনটা এখন কে করছেন?

গল্প চলছে বাঘ শিকারের। সবাই যে যার মত গল্প বলছে। একজন বলল, আমি একবার খালি হাতে বাঘ শিকারে গিয়েছিলাম। সবাই আগ্রহ নিয়ে শুনতে শুরু করলো। ‘এরপর বাঘ আমাকে তাড়া করা শুরু করলো’। সবাই উৎকণ্ঠিত। ‘বনের শেষ প্রান্তে ছিল একটা খাঁড়ি। দৌড়তে দৌড়তে আমি পৌঁছলাম সেই খাঁড়ির কাছে। আমার সামনে তখন খাঁড়ি আর পিছনে বাঘ’। শেষটায় কি হল জানবার জন্য সবাই উতসুক, ‘তারপর?’
‘তারপর আর কি, বাঘটা আমাকে খেয়ে ফেলল।‘

গল্প চলছে বাঘ শিকারের। সবাই যে যার মত গল্প বলছে। একজন বলল, আমি একবার খালি হাতে বাঘ শিকারে গিয়েছিলাম। সবাই আগ্রহ নিয়ে শুনতে শুরু করলো। ‘এরপর বাঘ আমাকে তাড়া করা শুরু করলো’। সবাই উৎকণ্ঠিত। ‘বনের শেষ প্রান্তে ছিল একটা খাঁড়ি। দৌড়তে দৌড়তে আমি পৌঁছলাম সেই খাঁড়ির কাছে। আমার সামনে তখন খাঁড়ি আর পিছনে বাঘ’। শেষটায় কি হল জানবার জন্য সবাই উতসুক, ‘তারপর?’
‘তারপর আর কি, বাঘটা আমাকে খেয়ে ফেলল।‘
যদিও রাজনীতি নিয়ে নাপিতের দোকানে বসে তর্ক বিতর্ক করা ছাড়া দেশবাসীর তেমন কিছু করণীয় নাই, বিশেষ করে ভোট দেয়ার পরের পাঁচ বছর। তারপরেও ইদানীং আরেকটা কাজ তাঁরা করছে, তা হচ্ছে ‘টেনশান’ করা। কারণটা হচ্ছে সরকারী এবং বিরোধী দলের ভেতর শুরু হয়েছে মজার এক খেলা। দেশবাসী হচ্ছে বাধ্যতামুলক দর্শক। এই মুহূর্তে প্রতীক্ষায় আছে, শেষে কি হবে?
প্রথম চাল দিয়েছে সরকারী দল। অন্তর্বর্তী সরকারের বিল পাশ করেছে। আদল অনেকটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতই তবে এগারো জন এবার আর সুশীল সমাজ থেকে আসবেন না, সকলেই হবেন রাজনীতিবিদ। কাক কাকের মাংস খায় না, এই নীতিতে হয়তো এবার দুর্নীতির দায়ে ‘সাব জেল’ এ থাকতে হবে না। প্রধান কে হবেন, এই বিষয়ে একটু ফাঁক রাখা হয়েছে, নির্ধারিত কাউকে মনোনীত করা হয় নি। কিংবা অন্য কাউকে মেনে নেবে কি না সে ব্যাপারে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ কিছুই বলে নি।
এবার বিরোধী দলের চাল। বেশ খানিকটা বিপাকে আছে তাঁরা। তাঁদের চাল হবে আন্দোলন, কিন্তু কি নিয়ে আন্দোলন করবে সেই ব্যাপারে মৃদু একটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আন্দোলনে যদি যায় আর সরকারীদল মেনে নিয়ে তত্ত্বাবধয়াক সরকার পদ্ধতিতে পরবর্তী নির্বাচন করতে রাজী হয়, তবে সরকার প্রধান হিসেবে তাঁদের মেনে নিতে হবে এমন একজন প্রাক্তন বিচারপতিকে, যিনি এই ১৩তম সংশোধনীকে অবৈধ করেছেন। যাকে তারা বেশ অপছন্দ করে এবং মনে মনে সরকার দলীয় মনে করে।
ফলে তখন তাঁদের আবার আরেক আন্দোলনে যেতে হবে এই প্রাক্তন বিচারপতিকে মানবো না। তাঁর আগের জন কে চাই কিংবা আপিলেট ডিভিসানের কাউকে চাই। সংবিধান অনুযায়ী এমনটা তাঁরা চাইতে পারবেন না। যা করতে হবে তা হচ্ছে অনুরোধ, ‘আপনি অপারগতা জানান’। এই যুক্তি আবার সরকারী দল না মানলে, ২০০৬ এর ঘটনার পুনরাবৃত্তি। রাস্ট্রপতিকে তখন গ্রহণযোগ্য কাউকে খুঁজতে হবে। খোঁজার ক্ষেত্রে বলা আছে তিনি চেষ্টা করবেন, কিন্তু কিভাবে তা বলা নাই। ইয়াজুদ্দিন সাহেবের মত মনে মনে খুঁজতে পারেন। আগেরবার সেই প্রক্রিয়াকে সঠিক বলেছে বর্তমান বিরোধী দল। ফলে এবারো যদি রাস্ট্রপতি নিজে ক্ষমতা নেন? পুরো চাল উল্টো পড়তে পারে।
সংবিধানে বর্তমান যে ফর্মুলা, সেই ফর্মুলা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, ব্যাপারটা ‘নমনীয়’ দেখাবে। মনে হবে পরাজয় মেনে নিলাম। নাম নিয়ে আপত্তি নেই বলাতে এমনই এক বিভ্রাট দেখা দিয়েছিল, সবাই ভেবেছিল ভয়ে পিছিয়ে গেছে বিরোধী দল। তাই বিদ্রোহী ভাব বজায় রাখা এবং আন্দোলনের হুমকি দেয়া খুবই জরুরী। সরাসরি এই আলোচনায় যাওয়া যাবে না। অপেক্ষায় থাকতে হবে, সরকারী দল নিজে থেকে কিছু সমাধান দিক, দুই দলের থেকে ৫জন করে নেয়া হবে এবং প্রধান হবে ‘মিঃ এক্স’। অনেকটা তত্ত্বাবধায়ক ধাঁচেরই ব্যাপার। এমন একটা চাল দিতে পারলে ভালো হত।
অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিরোধীদলের চাল যাই হোক আসল খেলা শুরু হবে ‘প্রধান একজন’ এর খোঁজ নিয়ে। যেন নির্দলীয় কেউ হয়। ব্যাপারটা আঁচ করে একজন সাবেক উপদেষ্টা ‘টস’ তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। ব্যাপারটাতে কেউ খুব আমল দেন নি। কারণ এই মুহূর্তে কেউই সমাধান চান না। পানি আর একটু ঘোলা হোক। একজন সাবেক এটর্নি জেনারেল নিজেকে নির্দলীয় প্রমাণ করতে দুই দলেরই দুর্নীতিতে অভিযুক্ত তাবত বড়বড় নেতার মামলা লড়লেন। নির্দলীয় প্রধান হওয়ার খায়েস ও জানিয়ে দিলেন। এবং যথারীতি প্রত্যাখ্যান। তারপর সবাইকে আবার ‘চোর বাটপার’ বলা শুরু করলেন।
দেশবাসী এই নিয়ে খুব একটা ভাবছেন বলে মনে হয় না। দায়সারা গোছের কিছু আন্দোলনের জন্য তাঁরা প্রস্তুত। অচিরেই আসবে বিভিন্ন কলেবরের হরতাল, সঙ্গে কিছু মানব বন্ধন, লং মার্চ। শুধু দিন তারিখ জানিয়ে জনগণকে নিশ্চিত করা হবে ‘আপনাদের জন্যই এসব উপহার দিচ্ছি’। জনগণও নিয়ম মাফিক সন্ধার পর থেকে বিভিন্ন চ্যানেলে খবর দেখবার প্রস্তুতি নেবে। আরও দেখবে সঙ্গে আর কি কি থাকে। ভাংচুর কেমন হয়, কতজন মারা যায়। উপরি পাওনা হিসেবে দেখতে পাওয়া যাবে হরতাল এর সমর্থনে করা মিছিলে পুলিশের হামলা, বেশ কিছু নেতার পিটুনি। মধ্যরাতে পাওয়া যাবে কিছু ‘গলাকাটা টক শো’। একসময় ২০১৩ তেই সরকারী দলের সময়কাল শেষ হবে।
এর পরে কি? এই ব্যাপারেই সবাই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে। আবার ১/১১ নাকি সমঝোতা। নাকি ৯৬ মার্কা নির্বাচন। খেলার শেষ দৃশ্য পূর্বের কোন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে ভালো লাগবে না। আবার নতুন কোন ‘সমাপ্তি’এর সম্ভাবনা কেন যেন কেউ ভাবছেন না। বোধ হয় ভাবছেন প্রভু দেশগুলো সমর্থন করবে না। তাছাড়া আইন কানুন করে যে কোন উটকো ক্ষমতা গ্রহণ বন্ধ করা হয়েছে। সত্যিই কি তাই?
এক শিকারি আর এক বাঘ একবার মুখোমুখি হল। একই সঙ্গে শিকারিও গুলি ছুঁড়ল আর ওদিকে বাঘ ও ঝাঁপ দিল। দুজনেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। শিকারির আত্মসম্মানে দারুণ আঘাত লাগলো, ‘এতো কাছে থেকে টার্গেট মিস করলাম’। সে একটা গাছে গোলাকার কিছু বৃত্ত এঁকে লক্ষ্যভেদ অনুশীলন করতে লাগলো। এমন সময় শুনতে পেল পাশেই ‘থপ থপ’ আওয়াজ হচ্ছে। কিসের আওয়াজ খুঁজতে যেয়ে দেখে, সেই বাঘটা ঝাঁপ দিয়ে শিকারি ধরা প্র্যাকটিস করছে, টার্গেট তো সেও মিস করেছে।
দুই দলেরই বোধহয় বোঝার সময় এসেছে, শুধু শিকারিই অনুশীলন করে না, শিকার ও অনুশীলন করে। সেও অপেক্ষায় বসে আছে, আরেকবার বাগে পেলে যেন মিস না হয়। গতবার দুই বছরের মাথায় ছেড়ে দিতে হয়েছিল, এবার যেন তা না হয়। প্ল্যান শুধু আপনারাই করতে পারেন না, অন্যরাও পারে। সবচেয়ে বড় কথা খেলা শেষে বিজয়ের কাহিনী শোনাবার জন্য জীবিত ফেরত আসতে হবে, একথাও মনে রাখবেন।

লেখাটি আগে সামু, নাগরিক এবং একটি দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছিল
http://www.amadershomoy2.com/content/2012/10/30/news0680.htm

১৮ thoughts on “অনুশীলনটা এখন কে করছেন?

  1. দর্শকের কাজ দেখে যাওয়া তাই
    দর্শকের কাজ দেখে যাওয়া তাই দেখেই যাচ্ছি।
    কিন্তু দর্শক ও কিন্তু খোবে ফেটে পরেন। তখন এই সার্কাস কারীদের কি হবে।

  2. শুধু শিকারিই অনুশীলন করে না,

    শুধু শিকারিই অনুশীলন করে না, শিকার ও অনুশীলন করে

    :থাম্বসআপ:

  3. রাজনীতিতে আমরা যারা জনগণ
    রাজনীতিতে আমরা যারা জনগণ তাদের ভূমিকা কি? সবাই বলবেন দর্শকের ভূমিকা। আমি বলি- “না”। আমরা হচ্ছি রাজনীতি নামক সার্কাসের জোকার।

  4. আমরা জনগণ রাজনীতির তাস !
    আমরা জনগণ রাজনীতির তাস ! রাজনীতিবিদরা আমাদের নিয়ে কখনও ২৯, কখনও জোকার, কখনও আবার জুয়াও খেলে ! আর আমরা জনগণ একজনের হাত থেকে অন্য হাতে বদল হতে থাকি ! খেলা শেষে তারা ছুঁড়ে ফেলে দেয় ৫ বছরের জন্য….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *