তোমায় করবে মুক্ত যারা, তাদের কেন বন্দী চাও?

‘মুক্তি’ শব্দটির সাথে আমার পরিচয় যতদূর মনে পরে মুক্তিযুদ্ধ শব্দটির মাধ্যমে, অনেকেরই তাই। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এতটাই গর্বের বিষয় যে এর শাব্দিক চর্চা কখনো শেষ হবার নয়। কিন্তু আমরা এর বিস্তৃত উপলদ্ধি করতে পেরেছি কি? পারছি কি? পারবো কি?


‘মুক্তি’ শব্দটির সাথে আমার পরিচয় যতদূর মনে পরে মুক্তিযুদ্ধ শব্দটির মাধ্যমে, অনেকেরই তাই। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এতটাই গর্বের বিষয় যে এর শাব্দিক চর্চা কখনো শেষ হবার নয়। কিন্তু আমরা এর বিস্তৃত উপলদ্ধি করতে পেরেছি কি? পারছি কি? পারবো কি?

[৭১-এ ফিরি] আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের যে মুক্তিযুদ্ধ তা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং ছিল যুগ যুগ ধরে শোষন-নিঃষ্পেষণের বিরুদ্ধে জাগ্রত লড়াকু বাঙ্গালীর ভৌগলিক-জাতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সুতীব্র বহিঃপ্রকাশ। যার আগুনে দগ্ধ হয়ে পাকি-শোষনের অবসান। নয় মাসের যে ব্যপ্তির কথা আমরা বলে থাকি তা ছিল মূলত আমাদের সকল স্তরের মুক্তিকামী যোদ্ধাদের স্বস্বস্ত্র সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে স্নাত হয়ে, চার লক্ষ মা-বোনের হারানো সম্ভ্রমের বিনিময়ে তাদের একটি জাতীয় পতাকা উপহার দেয়ার অসামান্য আকাঙ্খায় যে ১৬-ই ডিসেম্বরের জন্ম- তবে কি তার মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছিল?

[যদি আরও পেছনে যাই-] সেই সব গৌরবোজ্জ্বল সময়ের দিকে তাকালে মনে পড়বে, আমরা একটি স্বাধীন মানচিত্র চেয়েছিলাম- ভৌগলিক মুক্তির জন্য, আমরা একটা জাতীয় পতাকা উড়িয়েছিলাম -আমাদের জাতীয় মুক্তির জন্য, আমরা একটা জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছিলাম- সাংস্কৃতির মুক্তির জন্য। কিন্তু আমরা কি ভুলে গেছি- অনেক পূর্বেই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালী জাতিসত্বার ঐতিহাসিক উৎথান ঘটেছিল? এভাবে যদি অতীত থেকে আরও অতীতে ফিরে যাই তবে দেশ-কাল-সীমানা-সংস্কৃতি পেরুতে পেরুতে মানবজাতির কোন এক শিকড় সময়ে গিয়ে দেখবো শোষন-মুক্তির যতসব সংগ্রাম পৃথিবী ব্যাপী সংঘটিত হয়েছে তার সাথে আমাদের মুক্তির সংগ্রাম একই সূত্রে গাঁথা। সময় পাল্টেছে, বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির উন্নয়নে আজ পৃথিবী যেন একটাই দেশ, তাই তো আজও অনেক আন্দোলন সংগ্রাম ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক দূরত্বঅতিক্রম করে একাত্মতা ঘোষনায় সংঘটিত হচ্ছে। মুক্ত মত প্রকাশের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম তেমনই একটি মুক্তিযুদ্ধ।

[৭১ থেকে ১৩-তে আসতে] আমরা নিজেদের একটা মানচিত্র পেয়েছি, জাতীয় সঙ্গীতের সূরের সাথে একাত্ম হয়ে পতপত করে উড়তে থাকা একটা লাল-সবুজে পতাকা পেয়েছি, গনতান্ত্রিক সংবিধানের কাগজে মোড়ানো আইন-আদালত-অধিকার পেয়েছি। তার মানে কি- আমরা সব দিক থেকে মুক্তি পেয়েছি? পাই নি। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের নারী পদে-পদে ধর্মীয়-সামাজিকভাবে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। রসিকতার শিক্ষা বাজেটে খেয়ে করা অনাধুনিক শিক্ষানীতিএকদিকে জন্ম দিচ্ছে মাশরুমের মত গড়ে ওঠা ব্যয়বহূল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খরচ বাড়ছে অপ্রতুল সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের অন্যদিকে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে ধর্মীয় শিক্ষার নামে কু-শিক্ষা ছড়ানো হচ্ছে দিক-নির্দেশনাহীন মাদ্রাসাগুলোতে,সুকৌশলে আঘাত হানা হচ্ছে বিজ্ঞান শিক্ষার ভিত্তিমূলে। উগ্র-ধর্মান্ধতার জাগরণে স্বকীয় অন্যন্য বাঙ্গালী সংস্কৃতি আজ হুমকীর মুখে। কয়েকটি ধর্ষকামী রাজনৈতিক দলের সহযোগিতায় মৌলবাদীদের নগ্ন নৃত্যে নারী অধিকার আদায়ের সংগ্রাম আজ স্থিমিত। স্বাধীন বাংলাদেশের রক্ত খেয়ে পুষ্ট পরজীবী শত্রুরা আজ মধ্যযুগীয়, সহিংসতা, বর্বরতা-উগ্রতায় আঘাত হেনেছে সামাজিক-সাম্প্রদায়িকসম্পৃতিতে, রক্ত চক্ষু দেখিয়ে বাংলা সংস্কৃতিতে অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে মৌলবাদী-জঙ্গীবাদী চর্চা। দূর্নীতি ও ধর্মব্যবসা থেকে কোটি কোটি কালো টাকা তৈরি করে তারা বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করছে সাধারন জনগনকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়ে। মুনাফার নামে দেশের সম্পদ পাঁচারের চোরাই চুক্তি করার ষড়যন্ত্র এদেশে অনেকবার হয়েছে, কই আমরা তো মুক্তি পাই নি!

[বর্তমান প্রেক্ষাপটে ] মুক্তিযুদ্ধ কখনও থামে নি, চলেছে বারবার রাষ্ট্রীয় গ্লানি মোচনে রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের চুড়ান্ত শাস্তির দাবীতে গণজাগরনের মধ্য দিয়ে, একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠনে ‘ধর্ম যার যার, দেশ সবার’ স্লোগানে রাজপথ কাঁপিয়ে। মৌলবাদ-ধর্মান্ধতার সাহসী বিরোধীতা করে বৈজ্ঞানিক প্রগতীর প্রতি আস্থা রেখে মুক্ত মত প্রকাশের লড়ছে এ সময়ের তারুন্য। এরা লড়ছে কলম হাতে, আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে স্লোগানে-গানে-নাটকে-চারুকলায় মত প্রকাশের সৎ সাহস দেখিয়ে, অন্যদিকে শত্রুরা পূর্বেকার মতই অস্ত্র হাতে নিয়ে পেছন থেকে আঘাত হানছে, অন্যতম অস্ত্র ধর্মীয় ও অশিক্ষাগত অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশ ও মানবতা বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। তাদের ভয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রও যেন মুক্তির চেতনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মুক্ত মত প্রকাশের অধিকার সংরক্ষনের দাবী আজ বিশ্বজনীন, এদেশে সে সাংবিধানিক অধিকারই আজ লঙ্ঘিতহচ্ছে। স্পষ্ট-সাহসী, প্রগতীবাদী তারুন্যের প্রতিনিধিদের কয়েকজনকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের জামিন প্রদান নিয়ে চলছে টালবাহানা। কিসের ভয়ে? কোন রাজনৈতিক স্বার্থে? অদম্য তারুন্য সব বোঝে। তাইতো তারা প্রতিবাদ করে যাবে মুক্তিকামী পূর্বপুরুষদের মত, মুক্তির আগ পর্যন্ত।

মুক্তিযুদ্ধ চলবে যতদিন অন্যায় অবিচার অন্ধত্বা অমানবিকতা থাকবে। মুক্তির এ যুদ্ধ সকলের মঙ্গলের জন্য। চেতনা-চর্চায়-বোধে পশ্চাৎপদ যারা রাজনীতিক-ধর্মীয় গোড়ামী-অন্ধত্বা-উগ্রতাকে বুকে লালন করে বিপথগামী তাদেরকে পথে ফেরানোর জন্যেও এ যুদ্ধ। এরা পরাধীন চেতনায়,এদের মনোজগতের আদর্শ-নীতি নৈতিকতা-মূল্যবোধের প্রতিটি নক্ষত্রের আলোক আজ ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ এর দুষ্টগ্রহে ঢাকা পরে আছে। এদেরও মুক্তি দরকার দেশ ও সমাজের প্রগতীর লক্ষ্যে। আটক ব্লগাররা সে চেষ্টাই করেছে,এরা একা নয়, সারা বিশ্বের মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিবাদী কল্যানকামী মানুষ আজ এদের পক্ষে। তাই এসব কলমযোদ্ধা দেশপ্রেমিকদের বিরোধীতাকারীদের একটা প্রশ্ন- তোমায় করবে মুক্ত যারা, তাদের কেন বন্দী চাও?

[অন্যায়ভাবে আটককৃত ব্লগার ও ফেসবুকারদের অনতিবিলম্বে মুক্তি চাই]

৫ thoughts on “তোমায় করবে মুক্ত যারা, তাদের কেন বন্দী চাও?

  1. “” তোমায় করবে মুক্ত যারা,
    “” তোমায় করবে মুক্ত যারা, তাদের কেন বন্দী চাও?””
    চমৎকার শিরোনাম।

  2. ব্লগারদের মুক্তি চাই
    ব্লগারদের মুক্তি চাই 🙁 ব্লগারদের মুক্তি চাই 🙁 ব্লগারদের মুক্তি চাই 🙁 ব্লগারদের মুক্তি চাই 🙁 ব্লগারদের মুক্তি চাই 🙁 ব্লগারদের মুক্তি চাই 🙁

    চাই কণ্ঠের স্বাধীনতা।

    1. দুজনকেই ধন্যবাদ।
      দুঃখজনক হল

      দুজনকেই ধন্যবাদ।
      দুঃখজনক হল ব্লগারদের মুক্তির জন্য আমাদের দাবী ও প্রতিবাদ করা লাগছে, যেখানে এদের আটকেরই কোনো যৌক্তিক ও আইনসম্মত ভিত্তি নাই।
      মুখের ভাষা কেড়ে নেয়া, আর মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরন করার ভেতরে খুব কি পার্থক্য আছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *