পোকা সব মরে যাক

“একটু বেধে তো দেন, নাকি তাও দিবেন না? উহ করে চিৎকার করে উঠলাম, ও সামনের রূমে ছিল। হুট করে বিছানা থেকে উঠে দাড়িয়েছে। মনে হল, আচমকা ছুটে অাসবে, বাইরে তো বৃষ্টি। কিন্ত লোকটা চৌকাঠ পেরলনা। শুধু জিজ্ঞাস করল, কি হয়েছে? আমি সামনের রুমে ছুটে যাই, ওকে সরে দাড়াবার সুযোগ না দিয়েই সামনের দড়জার কাছে গিয়ে আবার ভিতরে চলে আসি। ও পথ আগলে জানাতে চেল, কি হয়েছে। আঙ্গুল দিয়ে তখনও রক্ত ঝরছে তবু হেসে উঠি, কিছু হয়নি। একটা হাত সামনে বাড়িয়ে আমাকে থামাতে চাইল। কিন্ত আমি এড়িয়ে ভিতরে চলে আসি। তবু চৌকাঠে পা রেখে বলে, কাছে আসো, কাটল কিভাবে। কাছে এসো, হাত ধুয়ে দেই, তারপর চেপে রাখ। নিজের লালা লাগাও। ‘কাছে এসো’ বলা মাত্র এগিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু আবার ভিতরে ফিরে যাই। এক টুকরো কাপড় এনে ওর হাতে দেই, হাতটা জাগিয়ে পর্যন্ত ধরি, তারপরেও….”
আমার ইচ্ছে ছিল ওকে জড়িয়ে ধরি আর ওর পাওনা উম্ম্’টা ফিরিয়ে দেই, শুধু তাই না, সীমানার সব নিষেধ ভেঙ্গে ফেলি। কিন্তু, ও তো আমার না। ভালবাসি, ভালবাসি বলে, আমি তোমার তাও, কিন্তু মালিকানা বুঝি অন্যকারো। তোমার মাঝে কে?
আমার উপর অন্তত: ন্যস্ত করেনি। ভালবাসার নানা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও শেষমেশ দু’একটা কথা যেন রান্না শেষে কেরোসিনের ছিটে দেবার মত। ও অামার জীবনে সম্পূর্ণ আলাদা। যেন সর্গ থেকে নেমে আসা উপহার। ও যে ভালবাসা শব্দটা আমার সামনে উচ্চারন করতে পারবে সেটাই আমার চিন্তার বাইরে ছিল। যদিও ওর ভালবাসার রাজ্যে আমি ছাড়া অন্যকেউ নেই – সেই ছোট্ট শিশুটি চোখ রাঙ্গানি দিয়ে, সর্ব শক্তি দিয়ে সকলের আমন্ত্রনই একে একে প্রত্যাখ্যান করে। শুধু ব্যতিক্রম এখানেই, যেন সব সময় সুযোগের অপেক্ষা। চোখে চোখ আটকে যায় ঠিকই কিন্তু দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। হাতের কাঠিটা নড়াচড়া করার গতিও স্তিমিত হয়ে যায়। আবার তাকায় আমার চোখে। মুহুর্তেই চোখ নামিয়ে আবার কাঠি দিয়ে দ্রুত চারাগাছটি রোপনের চেষ্টা করছে। কয়েকটা মুহুর্তের ব্যাপার। বিস্মিত দৃষ্টিতে আবার তাকায় এবং এক দেয়াল ঘেষা ছোট পথে ঘরের পানে ছুটে। আমার দৃষ্টি তখনও ওর দিকেই – উকি দিয়ে চোখে চোখ তারপর একঝলক হাসিতে দ্রুত ছুটে পালালো – বেশি দূরে গিয়েছিল না, ৪/৫ কদম হয়ত। এটা অলৌকিকতা নয়, অলৌকিক অাশংকার পরে এটা বাস্তবে তাকে প্রথম দেখা। তখন ও ৫/৬ বছরের শিশু কিন্তু ব্যতিক্রম চোখেমুখে সর্বত্র – যেন ব্যস্ত স্টেশন চোখের আড়াল হওয়া প্রিয়জনকে খুঁজে।

লোকটা অনেকটাই হতভম্ব। ও প্রান্ত থেকে এসমেসে যে এই নামটি লিখে পাঠাবে তা ছিল অকল্পনীয়।
আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না। আমার নম্বর পেলে কিভাবে?
সংগ্রহ করেছি। মা’কে বলবেন না কিন্তু।
কি?
মা জানলে বকবে

তুমি কোথায়?
বাড়িতে

মা’ চলে আসছে, পরে আবার…

অামি ফোন করছি
কেন?
তোমার সাথে কথা বলব, কথা শুনতে খুব ইচ্ছে করছে।
আমারও

ফোন করি?
এখন না, মা’ বকবে

কেন বকবে? তোমার মা’য়ের সাথেও কথা বলি

পরে। মায়ের নাম্বারে ফোন কইরেন
এটা কার নম্বর?
বুবুর। আমি পরে আপনাকে ফোন করব আনে।
আচ্ছা, কিন্তু আমার কিন্তু কথা বলতে ইচ্ছে করছে। ফোন করলে কি সমস্যা, করি?
করেন, না না। একটু পরে আমি করব আনে। মা’ জানলে বকবে

কি জানবে? তুমি ভয় পচ্ছো কেন? তুমি ভাল আছো তো?
হ্যা, আপনি?
তোমাকে পেয়ে তো খুব ভাল লাগছে। তুমি সত্যি ভাল অাছো তো?
এরি মধ্য ও একটি মিস কল করল। এবং চুপ করে থাকল।
কেমন আছো? কি ব্যাপার, ভয় পাচ্ছো কেন? আমার সাথে কথা বলতে ভয় কিসের? তোমার বাবা মা, ভাইয়া সবার সামনেই তো আমার সাথে কথা বলতে পারতে।
হ্যা পারি। কিন্তু আমি মেসেজ দিয়েছি তা কিন্তু বলবেন না। মা আবার এসে পরতে পারে, আমি পরে আবার ফোন করব আনে।
লোকটি অস্থির হয়ে উঠে- ভাবতে থাকে এত রাখঢাক করার কারণ কি হতে পারে। ও তো সেই ছোট্ট শিশু যার সাথে কথা বলা বা কাছে যাওয়ার ব্যাপারে কোন নিষেধ ছিল না। ও অনেকটাই অস্পট – সমস্যা বা প্রয়োজনের কথা বলতে চায় না আর যখন বলতে শুরু করে তখনও প্রয়োজনের গুরুত্বটা অস্পস্ট থেকে যায় – যেন তিন দিন একটানা উপসের পরে চতুর্থ দিনে প্রবল চিৎকার চেঁচামেচি। লোকটা চিন্তায় পরে যায় – এমন কি বলতে চায় যা মা’এর সামনে বলতে পারছে না।

২১/১০/২০১৮
(চলমান- ২)

অনেক অনেক বছর আগেকার কথা। বন্ধুর বাসায় বসে পারিবারিক কিছু জটিলতা নিয়ে চিন্তা ভাবনা। এরি মধ্যে কারেন্ট চলে গেল আর রান্না ঘর থেকে বন্ধুর ভাতিজি কেরোসিনের প্রদীপ এনে ডাইনিং টেবিলে রাখার চেষ্টা করছে। লোকটা ভাবে জীবনে যত ভাল কিছুই করুক না কেন, তার মা’য়ের দু’একটা বেখেয়ালী কাজ বা কথা যেন চমৎকার রান্না শেষে একটু কেরোসিনের ছিটে লেগে যাবার মত।
৫ বছর অাগে যখন ও’কে অনেক অাগ্রহ ভরে তার কাছে এনে বাবা-মা বলে, এই স্যারের কাছে পড়বি, অন্যকোথাও যেতে হবে না, ও মুখ লুকিয়ে বলে, “আমি কি স্কুলে যেতে চেয়েছিলাম নাকি?” বাবা-মা’র পিছনে একটু দূরে দাড়িয়ে দু’হাতে পর্দাটা এমনভাবে অাগলে নিল যেন লোকটার কাছে মনে হচ্ছে ‘সামাজিকতা আর সংকোচ জ্ঞানের কারনেই হয়ত ও আমার থেকে এতটা দূরে’। কিছুক্ষণ আগে, ও হাটতে না শেখা একটা শিশুর দু’হাত অতি যত্নে ধরে আদর করে আর নিজের গলায় বেঁধে বুকে তুলে নেয়। ওর বাবা – মা উভয়েরই হয়ত আরো কিছু বলার ছিল, কিন্তু বাবা পিছন ফিরে কিছুটা লজ্জিত রাগে বাইরে চলে যায় আর মা ভিতরে। “স্যার সামনের রুমে পড়াবে কেমনে, যদি লোকজন আসে?”
কিসের লোকজন?
ও চুপ করে থাকে।
মা’ বলে, লোকজন এলে তোর কি, তোর পড়ার কাজ, পড়বি, ব্যাডারা কি তোর কাছে আসে নাকি – তোর বাপের কাছে অাসে বাপের সাথে থাকবে।
হ, একটু পরে পরেই তো খোঁজতে অাসবে, কৈ? কবিরাজে কৈ?
ওই ছ্যামরি, চোপরাইয়া। রাতে আমি না ফেরা পর্যন্ত, ১০টা হোক, ১২টা হোক স্যারের কাছে পড়বি, বাইরের কাউরে ঢোকতে দিবি না।
দিনের বেলা?
দিনের বেলা কি হয়েছে? স্কুলে যাবি।
আবার কোচিং এ যাব কেন, স্যারেই তো সব পারে।
আচ্ছা তয় স্যারের কাছে পড়। আর মাইকেল আসলে বসতে কইস।
দাত খিটমিট করে, বিরক্ত হয়; কিন্তু কিছু বলতে পারে না, ওদিকে মা’য়ের একটু অট্টো হাসি। কিছুক্ষণ নিরব থেকে লোকটার দিকে তাকায় আর লোকটার নিরবতায় বিরক্ত হয়ে বলে, ধ্যুত পড়বই না।
লোকটা বলে, আচ্ছা এখন পড়তে হবে না, কিন্তু তুমি যাচ্ছো কোথায়?
স্কুলে।
কেন, আবার স্কুলে কেন?
তাতে আপনার কি?
ওর মা বলে, এই ছ্যামরি বেয়াদব! স্কুলে যাওয়া লাগবে না বললি দেখি!
লোকটা মা’কে বলে, ও কিন্তু যথেষ্ট মেধাবী, পড়াশুনাতেও অাগ্রহ আছে। ওকে একটা আলাদা রুম করে দেন, আসলে যখন তখন লোকজন এলে পড়াশুনা হয়না।
কোথায় লোকজন, অামাদের বাড়িতে, লোকজন আসে না, ওর বাপের সাথে দু’একজন আসে, এছাড়া কেউ আসে না। এরি মধ্য ওর কয়েকজন চাচাত- খালাত ভাইবোন হৈচৈ করতে করতে পিছনের দরজা দিয়ে হামলাই করল। ওর হাত থেকে ছোট ছোট শিশুরা বই-খাতা কেড়ে নিয়ে ছুড়তে শুরু করল, কয়েকটা পাতাও চলে গেল। সেখানে লোকটার হাতে লেখা কিছু একটা ছিল। ও কষে থাপ্পর দিল ছোট চাচাত বোনকে। ঘটনা বেশি দূর গড়ায়নি, কিছুক্ষণের মধ্যে আরো দুই চাচি এসে কারণ জানতে চায় মাত্র। তারপরে লোকটাকে অনুরোধ করে যেন বজ্জাত গুলোকেওই একটু পড়ায়।
লোকটা বলে, এটা আসলে আমার পেশা না, এত ছোট বাচ্চাদের পড়ানো আমার জন্য কঠিন। অামি ওদের বাড়ি আছি, ও পড়তে চাচ্ছে তাই শুধু ওকেই একটু পড়াব।
আমারা সবাই এই বাড়িরই। ওরা বেয়াদবি করলে মাইর দিয়ে সোজা করবেন।
আসলে এটা আমার পক্ষে সম্ভব না।
ও এরি মধ্যে ও উকি দিয়ে বলে, সম্ভব না কেন, সবাইকে পড়াতে হবে, নইলে আমি পড়ব না।
তুমি তো আমার কাছে পড়বেই না বললে, এখন কি কোচিং এ যাবে?
আবার কোচিং? আজকে শেষ ক্লাশ, সবাইকে না পড়ালে আমি কাল থেকে কোচিং- এ যাব।
ও অাচ্ছা। এখন না বলে উঠে গেলে কেন? কোচিং তো অাগামী কাল থেকে।
ফিস ফিস করে বলে, বলদটা কিচ্ছু বুঝে না। এই তোরা এখন যা অামি পড়তে বসবো।

পাগোল।
কোমরে হাত রেখে সাথে সাথে নামিয়ে ফেললো বটে, কিন্ত শিশু ধমকানোর মুড নিয়েই লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল।
এরি মধ্যে ওর চাচিরা বলে, ওগো ধাওয়াইতে হবে কেন, তুই পড়লে, স্যারের কাছে পড়বি। ব্যাডাডাও কেমন জানি কোন কথা বলে না।
লোকটা বলে, বইটা আর খাতাটা আবার নিয়ে এসো, পড়াটা শেষ করে স্কুলে চল, অাজ তোমার ৫ম শ্রেণীর শেষ ক্লাশ, তাই না?
আপনিও যাবেন?
হ্যা, যেতে পারি, তোমার স্কুল পর্যন্ত।
খর্গশের মত মাথা নেড়ে বলে, তাইলেই হবে।
কি হবে?
খাতা-বইটা গোছাতে শুরু করল। গোছাতে গোছাতে বলে, স্যার আপনার নামটা যেন কি?
নাম জানতে হবে কেন?
স্যার, দেখছেন! বলেন না!
বই বন্ধ করছ কেন? বইটা দাও।
স্কুলের সময় হয়ে গেছে। গোসল করব।
স্কুল ১২টায়, এখন ১০টা বাঁজে মাত্র।
অাজকে শেষ দিন তো স্যার।
অাচ্ছা, যাও।
নামটা বলেন না, স্যার।
নামটা তুমি অনেকবার শুনেছো।
খাতাটা একটু ফাক করে, কলম হাতে লেখার ভঙ্গিতে, বিশ্বাস করেন আমাকে বলেন নাই, আমি জানিও না। বলেন না, আমি লিখে রাখি যেন ভুলে না যাই।
খাতা দাও, আমি লিখে দেই।
বলেন, আমি লিখতে পারবো।
কাগজ ছিরে যাবে তো।
বলেন তো!
লোকটা পুরো নাম বলতে পারেনি, ও প্রথম শব্দটা লিখেই দৌড় দেয়।
বাইরে থেকে কে যেন গান গেয়ে উঠে, হৃদয়ে লিখ নাম…..
ওর চাচী বলে উঠে, আর স্কুলে যেয়ে কী হবে, তোর জামাই তো মিলে গেছে, হৃদয়খুলে নামটা লেখ।
গোসলে যাচ্ছিল, হঠাৎ উল্লটো ঘুরে পা বাড়ায়…..
বলদটা আবার ঐ বুইড়া খয়রাতির দিকে তাকায়, মনে রাখিস, সোহাগ জীবনেও তোরে বিয়া করবে না, কত সুন্দর একটা গান গাইল, আর ছ্যামরি করল কি?
অাপনে কারে বুইড়া কন? ঐ ব্যাডায় মোডেও বুইড়া না, একেবারে জোয়ান।
এতক্ষণ চুপ করে ছিল ছোট চাচিটা। সে কিছুটা অাধুনিক স্কুলে পড়েছে। প্রতিবাদ করে উঠে, ‘ও’ সোহাগের না, ঐ লোকটার নামই লিখেছে।
সাইজ্জা ভাবীরও যা খাইছলত! জোয়ান ব্যাডারে ঘরে বসাই রাখছে। যেখানের যে হোকনা কেনে ভালমন্দ খাওয়াইয়া দেলেই পারে, তা না, ঘরে পালা শুরু করছে। ঘরে একটা যুবতি মাইয়া।
ঐ তোর মা কোথায় গেছে?
জানি না।
ঐ সোহাগ, তুই ওর সাথে সাথে থাক, ওর মায়ের যে অাক্কল জ্ঞান, একটা ভন্ড ব্যাডা ঘরে, আর মেটাকে একা রেখে গেছে!
হৈ, উনি ভাল মানুষ।
ভাল না ছাই, চুল-দাড়ি থাকলেই হয়, নামাজ পড়ে না এক ওয়াক্তও।
লোকটা ওকে ডেকে বলে, উনারা তোমাদের কিরকম চাচী হন, আপন চাচী?
ও ঘরের ভিতরে ছিল, চুপ হয়ে থাকে, ছোট চাচাত বোনটা উকি দিয়ে বলে, ক্যান, কি হয়েছে? মোগো দাদা জাফইররা আগেই দুটা নিহা করছিলা, অাপনার ছাত্রী আগের ঘরের।
হইছে, তোর অাগের ঘর, পরেরে ঘর পড়াইতে হবে না, ব্যাডার রূম ভিতর দিয়ে বন্ধ করে ঘরে আয়, ভাত দুগ্গা খেয়ে স্কুলে যা। ওই তোর মায় কি সকালে রান্না করছে? না করলে, আমাগো ঘরে এসে খাইছ, আর সোহাইগ্গা থাকল তোর মা না আসা পর্যন্ত।
সোহাগ তার বোনের ছেলে, ওর থেকে তিন চার বছরের বড়। গতকালই এ গ্রামে এসেছে। হাফেজী মাদ্রাসায় পড়ে আর বাজারের লোকজনদের সাথেও বেশ ভাল শখ্য। সে লোকটাকে বারান্দায় রেখে দরজা বন্ধ করা এবং লোকটাকে উদ্দেশ্য করে মহিলাদের কথায় কিছুটা বিব্রত। তবে ভিতরের ঘরে শুয়ে পরল। ও পিছনের টিউবয়েল চেপে পানি উঠাচ্ছিল, চাচী চলে যেতেই, টিইবয়েলে বিরক্তিকর দু’একটা চাপ দিয়ে জামাকাপড় নিয়ে উঠে আসে, ঘরের ভিতরে আর ঢুকল না। বাইরে থেকে বারান্দার সামনে জানালায় তাকায়, লোকটা তখন একেবারে সামনের দরজায়, সিঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে আছে।
কোথায় যাচ্ছ গোসল করতে?
ও মুখ না ফিরিয়েই বলে, সামনের বাড়ির বাথরূমে।
কেন, তোমাদের বাথরূমে কি হয়েছে?
আমাদের আবার বাথরুম কোথায়? একটা বেড়াও নাই, মিরাজদের কত সুন্দর লক করা বাথরুম।
কি হয় তোমার?
মিরাজের বাপে আমার মামা হয়।
লোকটার দিকে একটুকও না তাকিয়ে একটানা কথাগুলো বলে চলে যায়। কিন্তু মুহূর্তেই পিছন দিয়ে ডাক আসে। তোকে না ঐ বাড়ি ডেতে নিষেধ করেছে? এত কিছু হইল তার পরেও আবার…..। ঐ রাস্তা পার হইলেই দাদার কাছে বলব, তোর ভাতই বন্ধ। দেখি কে খাওয়ায়। ও ফিরে আসে, আর লোকটার দিকে একনজর তাকিয়ে পশ্চিম দিকের বাড়িতে চলে যায়। অবুজ মনের নিষ্পাপ হাসি খুশি চেহারায় হঠাৎ করেই যেন কেমন হয়ে যায়। মনে হচ্ছে, অতি কষ্টশেষে পাওয়া একমাত্র চাকুরি ঘুষ না খাওয়ার প্রত্যয়ে ছেড়ে দেওয়া কোন মানুষ আনন্দ, দৃঢ়তা আর শঙ্কায় কম্পমান। লোকটা লজ্জিত হয়ে যায়- কিছুই বলতে পারে না নিজেকে শুধু অসহায় মনেকরে।

তুমি একটুকু কথা শুনছ না।
কি?
আঙ্গুলটা এত নড়াচ্ছ কেন! স্যাভনাল লাগিয়ে রেখেছো কেন? তোমার হাতে তো ভারী অাঘাত লাগেনি, কেটে গেছে মাত্র। স্যাভনিল দিয়ে ধুয়ে, চেপে রাখ। শুকিয়ে যাবে।
এটা স্যাভনাল না, পেষ্ট। রক্ত এক মুহূর্তে বন্ধ হয়।
মুখগহ্বরে নিজস্ব লালা থাকে, সেখানে ক্ষত বা রক্ত ঝড়া বন্ধে টুথপেষ্টের কার্যকারিতা আর জং ধরা টিনের ঘষায় এন্টিসেপটিক হিসাবে তার কার্যকারিতা কতটুকু তা নিয়ে প্রশ্ন নয়, ভাবনা অন্যখানে। নিজের মুখের লালা কি অন্যের ক্ষত সারাতে উপকার না কি অপকার করতে পারে। ও হাতটা একটু জাগিয়ে ফুপিয়ে কেঁপে উঠার মত কেপে বলে, এটা পেষ্ট, খাওয়াও.যায়. বলতে গিয়ে, লোকটার সামনে থেকে হাতটা নিজের ঠোট পর্যন্ত নিয়ে লোকটার দিকে ঘুরে দাড়ায়, কিন্ত একবারো চোখের দিকে তাকায়নি, জানালা দিয়ে হাতটা পিছনে যখন বৃষ্টিতে পৌছে তখনি লোকটার দিকে তাকায়। লোকটার হাত-পা স্থির ছিল, কিন্ত মনে হচ্ছিল কিছুটা ঝুকে পরেছে, তবে ভারি বর্ষণে বড় বড় বৃক্ষগুলো যতটা ঝুকে পরে ততটা নয়, অাধা ইঞ্চি হবে হয়ত। নিঃসন্দেহে কেটে যাওয়া যন্ত্রণাটা তখনো ছিল, কিন্তু হাসি আর নিশ্বাসে যেন শিশুদের শরু সাঁকো পার হবার সাফল্য। হুট করে ভিতরে চলে যায় আর একটুকরো কাপড় এনে লোকটার হাতে দিল। এখনো, কিন্তু সোহাগ রূপী কোন ছায়া বিদ্যমান যা ওর চোখে মুখে ব্যস্তার ছায়া এঁকে রেখেছে – যে নির্লিপ্ত ব্যস্ততা নিলামকারীদের মধ্যে বিরাজ করে বেঁচা বিক্রির সময়।
ছবি

হাপুস হুপুস সাতার কাটার শব্দ, হৈচৈ, চিৎকার। মাঝে একটু নিরবতা, ছোট একটা নেংটা ছেলে কলাপাতার বেড়া ফাক করে লোকটার দিকে তাকাচ্ছে আর পিছন ফিরে ইশারায় কিছু বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু তা মাঝ-পুকুর পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে না। ছেলাটার বড় বোন তামান্না ও’র সাথে একই ক্লাশে পড়ে।
বাচ্চা ছেলেটা হঠাৎ বলে উঠে, ‘বসে অাছে’।
লোকটা ছেলেটার দিকে তাকায়, সে বেড়ার ফাকাটা বন্ধ করে চলে যাচ্ছিল। আবার উকি দিয়ে, বলে সিড়িতে।
লোকটা বাচ্চাটাকে ইশারা দিয়ে কাছে ডাকে। কিন্তু সে পিছন ফিরে ওদেরকে বলে, ডাকে।
কিছুক্ষণ একেবারেই নিরব। লোকটা কিছুটা বিব্রত হয়ে উঠে দাড়ায়। তামান্নাদের বাড়িতে কেউ একজন দরজা খুলে বের হয়েই বকাঝকা, তুই নাইতে আসছ, ভাল কথা, চুপ চাপ নাইয়া ঘরে যাবি, আবার এত ডাকাডাকি কিসের?
ও ফিস ফিস করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। আবার হাপুস হুপুস সাঁতার কাটা শুরু করে পুকুরের উল্টো দিকে। তামান্না বলে, মা, আস্তে, স্যারে।
তাতে কি হয়েছে? ব্যাডায় নাইবে? নাইলে এসে নেয়ে যাক।
স্যার, আপনি ডাকেন ক্যান? উনি নাইতেছে, জানেন না?
লোকটা একটু এগিয়ে গিয়ে বলে, মানে? উনি কে?
সে মুখ ঘুরিয়ে পুকুরের দিকে তাকিয়ে বলে, স্যারে তোকে চেনেনা; বলেই কুচকুচে কালো মেয়েটা বেড়ার কাছে এসে বলে, তাইলে আমাকে ডেকেছেন?
ছোট ছেলেটাকে ইশারায় ডাকার কথা বুঝি ভুলে গেছে, তার নজর সাঁতারের শব্দের দিকে। কৈ, আমি ডাকিনি তো, ফাতেমার গোসল হয়েছে?
ওমনি কলাগাছের শুকনো পাতাগুলো সরিয়ে ওকে দেখার পথ করে দিল। পুকুরের ওপ্রান্তে ভাসমান চোখে যে বিরক্তি তা আগে কখনো দেখিনি।

০২/১১/২০১৮

তামন্নার মা এবার বেশ রাগ করেই তামান্নাকে বকা দিল, তোর বাপ বাড়ি আসুক আজ। মেয়েটাও হাসি তামাশা বন্ধ করে বলে, স্যারে স্নান করেন কোথায়? আপনি আমাদের পুকুরে স্নান করতে পারেন, আমরা তো বেশি আসি না, সারাদিন ঘাটলা খালিই থাকে।
ও’র ইশারা পেয়ে তামান্নার মা বলে, ঐ ছ্যামরি, তুই বেড়াটা সরাইছ কেন?
তামান্না একটু এগিয়ে লোকটার কাছে এসে পুকুরের দিকে তাকিয়ে বলে, এখান থেকে কিচ্ছু চিনায় না।
এবার লোকটাও তাকে বকা দিয়ে আবার সামনের দরজায় চলে আসে। মাঝের রুমের দরজা তখনো বন্ধ। ভিতরে সোহাগ দু’ট কাশি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়।
তামান্না হাসি হাসি কন্ঠে, যার জন্য করলাম চুরি…
ওমনি একা একা মেয়েটি ঘরের পিছনে এ্যালুমিনিয়ামের বালতিতে একটা লাথি মেরে বসল।
ওর রাগ হয়ত চিরকাল টিকে থাকে, কিন্তু ধরা পরার ভয়তে হলেও রাগের প্রকাশটা বেশিক্ষণ টিকিয়ে রাখে না। তার অাচরণে যে ভিন্নতা তা ছোট ছোট শিশুদের কাছেও অনেকটা স্পষ্ট। সেদিন অন্যদের মতই অাগ্রহ নিয়ে দাড়িয়ে ছিল, দেখছিল। কিন্তু হঠাৎ করে মলিন মুখে কাঁদোকাঁদো ভাবে বেরিয়ে গেল। তা আরো তিন বছর আগের কথা। দাত না উঠা একটা মেয়ে লোকটার হাতটা ধরে নিজের হাতের উপরে রেখে বলে, চালাও, সবগুলোকে মেরে ফেল। সবাই তখন হাউজ অব ডেডের বসের পতন দেখার অপেক্ষায়, কিন্তু ও’ রক্ত লাল চোখে একনজর তাকিয়ে চলে যেতে চায়। সহপাঠিরা অাটকে রাখল। ‘আমার উপর নিশ্চিত রাগ করেছে, কিন্তু কেন? ও’কি বিশেষ কোন দাবি রাখে?’ লোকটা মনে মনে ভাবে আর মনে করে, ‘সেদিন সাথে সাথে আমি নিজের হাত সরিয়ে ও’র সহপাঠীদের বলিছিলাম, যেন ছোটদের মাউজ ধরা শিখিয়ে দেয়। সবাই কাড়াকাড়ি শুরু করে, একজন ছাড়া। ও’র এক সহপাঠী তামান্না এগিয়ে আসা মাত্রই, ও আবার হাটা শুরু করে। বাইরে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকে, কিন্তু রোদের মধ্যে মাঠে ছুটাছুটি করার মত সঙ্গী সেখানে ছিল না। ও’ একাই চলে যায়। তারপরে স্কুল থেকে বইকটা হাতে নিয়ে চলে যাচ্ছে। আরো কয়েকজন শিশু যাচ্ছে, তবে তাদের হাতে ব্যাগ অথবা টিফিন বক্স আছে।’

যাহোক গোসল শেষে, উপচে পরা পাউডার গলায় মেখে বের হল। লোকটা বসে আছে, কিন্তু ও ফিরেও তাকায় না, হাটা শুরু করে আবার থেমে গেল। খাওয়া-দাওয়া করেছ? স্কুলে কখন যাবে?
কোন উত্তর না দিয়ে আবার ঘরের ভিতরে যাচ্ছে।
তুমি বেয়াদবি করছ কেন? কথার কোন উত্তর দিচ্ছ না যে!
লোকটার কথাগুলো ওর কানেই যাচ্ছে না। ঝটপট ব্যাগটা ধরল, কিন্তু তা রেখে দিয়ে একটা বই হাতে নিল, তারপর সেটাও রেখ দিল। শুধু একটা পেনসিল হাতে নিয়ে বের হল। উঠন পেরিয়ে একটু দাড়িয়ে চিৎকার করে বলে আমি স্কুলে যাচ্ছি।
লোকটাও চুপ যায়। মাথা নিচু করে বসে থাকে। ও’ দু’দুবার পিছনে তাকায় কিন্তু লোকটা ওর দিকে ফিরেও তাকায় না, তামান্নাদের বাড়ির বেড়ার দিকে তাকায়।
আপনি বসে আছেন কার জন্য?
তোমার জন্য।
আতঙ্কিত কন্ঠে ফিস ফিস করে বলে মা’য় ঘরে।
কখন এলো, তাতে কি হয়েছে?
মা ততক্ষণে সামনের রুমে চলে এসেছে। ও উচ্চ কন্ঠেই বলে, আপনি কোথায় যাবেন, যাচ্ছেন না কেন?
আমি তো অনেক অাগেই বের হতাম, কিন্ত দরজা বন্ধ করার তো কেউ ছিল না।
ঐ ছ্যামরি, তোরে পড়াশুনাই করাবো না, স্যারের সাথে এভাবে কথা বলে! স্যার, দেখছেন, কোন অাদব-কায়দাই শিখে নাই। তুই কোথায় ছিলি, দরজা বন্ধ করলি না কেন? ব্যাডাডা এতক্ষণে কোথায় যাইত!
নাইতে গেছিলাম দেখি।
দরজা বন্ধ করে যাইতি?
স্কুলেই যাবো না, লোকটার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে, ঘরে চলে গেল। ছোট চাচাত ভাইটা ছুটে এসে বলে, ও এতক্ষণ পুকুরে ডুবাইছে।
তোর আর ভাঙ্গতে হবে না, পুকুরে না টিউবয়েলে, তুই জানলি কিভাবে। পুকুরে গেলে আমি দেখতাম না বুঝি? কোন সময় থেকে আমি দরজার কাছে দাড়ানো।
স্যারেও দেখছে, স্যাররে জিজ্ঞাস করেন। ও করছে কি, আপনাকে দেখে পুকুরের ঐ পার দিয়ে উঠে কল গোড়ায় গেছে।
ভিতর থেকে আবার দু’টা কাশির শব্দ, সোহাগ বলে, মামানি, হাসান মিথ্যা বলে না, ও নামাজ পড়ে পাঁচ ওয়াক্ত।
এরি মধ্য ও’ আবার স্কুলে হাটা শুরু করে। ওর মা’ বলে, পিটাইয়া ঠ্যাং ভেঙ্গে দেব। ঐ তোরে, তোর বাপ এবাড়ি ওবাড়ি যাইতে নিষেধ করছে না। তোর স্কুলে যাওয়া বন্ধ। ওই দাড়া বলতেছি।
দাড়াও। তোমাকে যেতে নিষেধ করেছে। গেলে আমার সাথে যাবে।
থমকে দাড়ায়।
আমার সাথে যেতে পার যদি তোমার মা’ অনুমতি দেয়।
না স্যার, আপনার সাথে যাবে কেন? আপনি যান, আপনার দেরী হয়ে গেছে। ওই তুই, পুকুরের ওপার দিয়ে ঐ পথেই আবার যা, ওদের সাথে নিয়ে ঐ দিক দিয়ে ঐ দিক দিয়ে স্কুলে যাবি। স্যার আপনি যান, অরা নিজেরাই যাইতে পারে।
আমি তো ঐ পথেই যাচ্ছি, আমার সাথে যেতে পারে।
তা দরকার নাই, লোকে মন্দ বলবে।
মানে?
ও’র জামাই – বলতেই ঘৃণা আর রাগে ও’ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোর’। ও’র মা বলে, যা শুরু করছো, তাতে তোমার কপাল আস্তা থাকবে না।
লোকটা চুপ হয়ে থাকে। পরিস্থিতি বুঝবার চেষ্টা না বরং ছোট্ট শিশুটার লড়াই প্রত্যক্ষ করা। অনেক বিবেচনায়ই সে অন্যদের থেকে আলাদা। যদিও শক্তি বলতে নিজের অাগ্রহ আর বুদ্ধি, সে তার সমস্ত শক্তিই ব্যবহার করে যাচ্ছে সততা, পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা অার তার ভালবাসার পক্ষে। সেদিন লোকটা একটা বাইসাইকেল নিয়ে ও’র পিছু নিয়েছিল, তামান্না, জান্নাতিসহ অন্য কয়েকজন তখন কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
ও’র দাদার ছোট্ট চায়ের দোকানে দুপুরবেলাও চা পাওয়া যায় তবে ভাতের বিকল্প হিসাবে তেমন কিছু নেই। পাশেই আরেকটা দোকান, সেখানে গরম গরম পিঠা তৈরি করে। দাদার দোকানে বই রেখে ও’ সেই দোকানের দিকে যাচ্ছে, লোকটাও সেখানে গিয়ে থামে আর কোন কথা না বলেই দোকানের ভিতরে বসে। কিন্তু মেয়েটি লোকটিকে দেখে দোকানে না থামে, একটু হাসি হাসি মুখে সামনে চলে যায়। আবার ফিরে আসে, ততক্ষণে লোকটির প্লেটে কয়েকটা গরম পিঠা। মেয়েটি সাইকেলের দু’হাতল ধরে, সিটের উপর হাত বুলিয়ে লোকটার দিকে এক নজর তাকিয়ে মুঠ করা হাতে দাদার দোকানে চলে যায়। দাদা, ‘কি, দেয় নাই’ বলে পিঠার দোকানে পিঠা চাবার আগেই মেয়েটা ‘লাগবে না’ বলে, মুঠ করা হাতে শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে দাদার চায়ের কেটলি জাগানোর চেষ্টা করছে। ততক্ষণে, লোকটা সাইকেলটা টেনে দাদার দোকানে চা খেতে বসে।
ও’ চা বানাতে পারো?
উনি বানাবে চা? ‘সর সর’ বলে মেয়েটিকে সরিয়ে দিয়ে ভরা এক গ্লাস চা বানিয়ে দেয়। তারপরে, লোকটার জন্য চা বানাতে শুরু করে।
পরে যাবে তো। মেয়েটি তখন ও’র চায়ের গ্লাসটা জাগানোর চেষ্টা করছিল। এবার টেবিল বরাবর নিচু হয়ে গ্লাসে ফু দিয়ে গরম চা খাবার চেষ্টা। প্রথম বারে পারলো না।
পানি খেয়ে নাও এক গ্লাস।
এই তুই পানি না খেয়ে চা খাও, মরতে চাও।
কৈ পানি?
ততক্ষণে লোকটা নিজে এক গ্লাস পানি রেখে, জগটা ও’র দিকে এগিয়ে দেয়। ততক্ষণে ও’র গরম চায়ে চুমুক দেয়া হয়ে যায়।
‘বাড়ি যাইয়া ভাত খাবে তা না, প্রত্যেক ডেইলি আমার শ্রাদ্ধ খাইতে আসা লাগবে’ বলতে বলতে দাদা এক গ্লাস পানি ঢেলে দেয়। ও’তখন চোখের অাড়ালে; দাদার কথা গুলো ও’র কানেই জায়নি হয়ত। জ্বলে উঠা অাগুন নেভাতে এক গ্লাস পানি এক শ্বাসে খেয়ে নিল।
সকালে কি খাইছ?
কোন কথা না বলে, এক টুকরা বিস্কুট চায়ে ভিজিয়ে খাচ্ছে।
স্কুলে যাইতে হবে না। বাড়ি যাইয়া ভাত খাবি।
দাদার কথার কোন উত্তর না দিয়ে, বইগুলো হাতে নিচ্ছে।
লোকটা দাদাকে জিজ্ঞাস করে, ও’ কি প্রতিদিনই এরকম করে?
আপনি আবার কি দেখলেন?
লেইজারে বাড়ি গেল না যে।

বাড়ি গেলে আমার শ্রাদ্ধ করবে কে?
আপনার কতজন নাতি নাতিন আছে?
‘অনেক’, সত্যিকার অর্থে তার হিসেব ছিল না।
ও’র একটা বড় ভাই আছে না, সেও কি স্কুলে যায়?
হ্যা।
সেও কি আসবে এখানে?
কোনটায়ই বাদ রাখে না, ওরা তো খাইয়া – দাইয়া আসবে আনে, কিন্তু ওই বলদটা তো বলতেই ও পিছন ফিরে তাকায় – দেখছেন, কোন কথা শুনলো, বাড়ি যাইয়া ভাত খেয়ে স্কুলে যাবে, তা না।
দেরি হবে, স্যারেরা বকবে।
কথা, বুঝে ছ্যামরি! দেরি হলে হবে, স্কুলে যাওয়া লাগবে না। বাড়ি যা।
বকবে বললাম।
এত বুঝ! টিফিন বক্স নিয়ে যাইতে পার না?
ও পিছন ফিরে তাকায়, কিছু বলবে বুঝি, কিন্তু লোকটার দিকে তাকিয়ে আর কোন কথা না বলে, বইগুলো বুকে নিয়ে হাটতে থাকে।
এরি মধ্যে আরেকজন নাতিন দাদার জন্য টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে আসে। দাদা একটু জোড়ে বলে, দাড়া, আমার ভাত দুগ্গা খেয়ে যা।
কিন্তু ফিরেও তাকায় না।
দাদা লোকটার দিকে এক নজর তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে, ‘কি জানো হইছে আজ, মা’য়ে কিছু কইছে কিনা? না, তাও না, তাইলে এতক্ষণ তো চুপ থাকার কথা না। ডাকলাম তারপরেও’…. বলে লোকটার দিকে আবার তাকায়। লোকটার জন্য যে মেয়েটা কিছু কথা গোপন করে গেছে তা দাদার কাছে স্পষ্ট। এই, কাজলি, বাড়িতে কিছু হইছে নাকি আবার?
ও’র মায়ে রান্দে নাই।
তা তো আগেই বুঝছি, তয় ছ্যামরি আজকে আমারে কইল না যে কিছু।
তবে লোকটার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে মেয়েটি তার কাছে ছোট হতে চাচ্ছে না। ঐ বয়সে অন্যসব মানুষের সামনে হয়ত সে এতটা গোপন করত না।
লোকটা সিগারেট ধরিয়ে দোকানের উল্টো দিকে হাটাহাটি করতে থাকে। এরিমধ্যে, ও’র কন্ঠ, দাদা, ঐ লোকটা কি রোজ অাসে?
কোন লোকটা?
ঐ যে, এই খানে চা খাচ্ছিল।
তার সাথে তোর কাম কি?
আসে কিনা, বললেই তো হয়…. এরকম কিছু বলার আগেই লোকটার মুখোমুখি, থতমত হাসিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
তুমি কি আমাকে চেন?
কোন কথা না বলে, দাদার পিছনে গিয়ে বসে আবার, আর বারবার তাকাতে থাকে।
দাদা বলে, তোরে কি জিগায়, কওনা কেন?
ও’ কোন কথা না বলে, আবার বইগুলো হাতে নিয়ে উঠে দাড়ায়।
দাদা ও’র দিকে তাকিয়ে আছে, ও’ ও দাদার দিকে তাকিয়ে অাছে।
লোকটা আবার জানতে চায়।
মাথা নাড়িয়ে বলতে চায় না, কিন্তু মুথে বলে ঐ খানে দোকান আছে।
তাই? ‘আমার নাম কি’ বল তো?
মাথা নেড়ে জানায়, জানি না।
তুমি কি আমাকে ভয় পাও, আমার সাথে কথা বলছ না কেন?
কিছুক্ষণ, চুপ থেকে বলে ‘না’।
তা হলে বল, রাগ করেছ কার সাথে? দুপুরে বাড়ি গেলে না কেন? স্কুলেও তো গেলে না!
চুপ করে থাকতে চায়, কিন্তু দাদার ধমক খেয়ে বলে রাগ করলাম কৈ?
তুমি আমাকে আগে কখনো দেখেছ?
মাথা কাত করে জানায়, হ্যা।
প্রথমে কোথায় দেখেছ, বলতে পারবে?
হাসি হাসি ভাবটা নেই, গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে যায়, কিছুক্ষণ পরে দাদাকে বলে ‘উনি অনেক শিক্ষিত…..
তুমি জানলে কিভাবে?
লোকেরা বলে, স্যারেরাও বলে। আপনি কি পড়ান?
না, পড়াই না। লোকেরা বললেই কি শিক্ষিত হয়, তুমি বুঝলে কিভাবে? তুমি বল আমি শিক্ষিত না অশিক্ষিত?
অনেক অনেক শিক্ষিত।
তাই? তুমিও কিন্তু শিক্ষিত হতে পারো, বেশি বেশি জানলেই বেশি শিক্ষিত হবে।
একটু হাসি দিয়ে, ব্যস্ততা রেখে স্বাভাবিক হয়ে বসল।
আমি যে অনেক শিক্ষিত তা বুঝলে কিভাবে?
শিক্ষিতই তো?
শিক্ষিত না হলে কি কম্পিউটার চালাইতে পারে, শাহিন ভাইর থেকেও ভাল চালায়, আর শান পেরফেসার আছে না, হেও কইছে আপনি অনেক ক্লাশ পর্যন্ত পড়ছেন – ওর চাচাত ভাইটা বলে উঠে।
ও’র চোখ তখন লোকটার দিকে, লোকটাও ও’র দিকে তাকিয়ে বলে, তা, ঠিক আছে, কিন্তু জানারও শেষ নেই, অনেক অনেক শিক্ষিত হবারও শেষ নেই। কম্পিউটার তোমরাও চালাতে পারো, তাতে বেশি শিক্ষার প্রয়োজন নেই, কিন্তু বানাতে কিন্তু অনেক শিক্ষা লাগে।
কাজলি জানতে চায় কি ভাবে বানায়।
একবারে তো সবকিছু জানা যায় না, আস্তে আস্তে জানতে হয়। প্রথমে এ, বি, সি লিখতে শিখেছ, তারপরে নাম লিখতে শিখেছে, বড় বড় শব্দ, বা…
এবার আর থামল না, বাড়ি গেলাম বলে বই গুলো বুকে নিয়ে চলে গেল।
দাদা বলে, আপনি কত পর্যন্ত পড়ছেন শুনি।
অনেক।
কলেজ পাশ করছেন?
তা করেছি অনেক অাগেই। আসলে পথেঘাটে ডিগ্রির কথা বলতে আমার ভাল লাগে না, তাই আমি বলিনা, বলতে পারেন, সর্বচ্চো ডিগ্রি অর্জন করেছি, এখন গবেষণার কাজ করছি।

উনি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে, কপালে হাত রেখে বলে ‘ওরে আমার কপাল’। লোকটাকে বল, আপনি রোডে রোডে না ঘুরে, কয়েকটা গুড়াগাড়া পড়াইলেও তো পারেন’।
স্যারে তো ঐ বাড়ি, ঐ বাড়ি পড়ায়ই।
তোরা পড় না কেন?
কৈ, আমি তো পড়াই না, কোন বাড়িতেও পড়াই না, তুমি এটা কি বলছ?
অনেকে দেখি স্যার ডাকে?
অপরিচিত মানুষকে সম্মান করে ডাকতেই পারে।
শান মাষ্টার রা তো বলাবলি করেছিল, ভাল কম্পিউটার চালান, ইংরেজীও পড়তে পারেন, আপনি নাকি কোথাও পড়াইতেন, তারপরে…..এক জনে আবার কইল, আপনি অাইএ পাশও করছেন।
তাদের সম্পর্কে আমার জানা নেই। তারা আমার সম্পর্কে এসব বলেছে? তারা ঠিক বলে নাই। তারা হয়ত না জেনে বলেছিল। পড়ানোটা আমার পেশা না, তবে কাছাকাছি থাকলে আর শেখার আগ্রহ থাকলে অনেক কিছুই শিখতে পারো, তোমারও অাসতে পারো।
সবুজ আর শান মাষ্টার হলো সেই ব্যক্তি যারা শুরুতেই ও’র জীবনের পথ ঘুরিয়ে দেয়। একটা সামান্য নালা বা ড্রেন কেটে দিলে জল যেমন সেপথেই বয়ে চলে, শিশুরাও তেমনি ঝুকে পরে। হঠাৎ একদিন ও’কে বউ সাজিয়ে

১৫/১১/২০১৮
(৪)
নিয়ে এলো। ‘বউ নিয়ে এলাম, তাড়াতাড়ি সব বন্ধ করেন’ অতুলনীয় সুন্দর একটা পরিচ্ছন্ন ফুল, চোখে মুখে অানন্দ, অস্থিরতা; কিন্তু তখনো মুখে কথা ফুটেনি। ‘স্যারে কোথায়? নতুন বউ নিয়ে এলাম?’ কৈ দেখি, দেখি, আমার বউ? ‘আপনার না, আবার কার’ বলে সরে দাড়াতেই ওর ছটফট চাহনি- যেন অপেক্ষায়রত প্রিয় কিছু হাতে পেতে। লোকটা টেবিলের ওপ্রান্ত থেকেই হাত বাড়িয়ে কাছে যেতে চায় – ‘আগে বলেন কি খাওয়াবেন?’ খাওয়াবো তো অবশ্যই খাওয়াব, ওকে আমার কাছে নিয়ে এসো। ‘না, না, তা হবে না, মোরগ পোলাউ খাওয়াতে হবে’। আগে যেতে তো দাও ওর কাছে, বললাম তো সব খাওয়াব। ‘শুধু খাওয়ালে চলবে না, পাঁচ হাজর টাকাও দিতে হবে’। সব দিয়ে দিব, উঠে কাছে যেতেই বাঁধা দিয়ে দাড়ায়। সর, ও’ দাড়িয়ে থাকতে পারছে না। তোমাদের সাথে বড় কেউ আসেনি, তোমারা একারা এত দূরে এসেছ! বাড়িতে বলে এসেছো? ‘বড়ারাই তো পাঠাইছে’ বলে লোকটার পথ আগলে রাখে। তুমি সর বলছি। ‘আগে দিয়ে নিন, দেখি কত অাছে’ – বলে আশা ক্যাশ বক্সের দিকে ঝুঁকে পরে। অাশা দু’হাতে জাগিয়ে ও’কে যেভাবে সামনে এনে রাখে ও’ ঠিক সেখানেই সেভাবেই দু’হাত জাগিয়ে অালিঙ্গিনের অপেক্ষায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে কাঁপছে, আর পা’দুটোতে ছোট বাচ্চাদের মতই কোলে উঠার অাহবান। মুহুর্তের জন্য বাইরে কারো তুড়ির আওয়াজ, ওর চোখ আচমকা ঘুরে যায়, লোকটাও বাইরের দিকে তাকায়। টুপি পরা একটা মানুষ চলে গেল লোকটার এটেলিয়ারের বা দিক থেকে পিছনে। ও’র সাথে সাথে লোকটাও আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে, দু’জনেই এক পা এগিয়ে যায়। হঠাৎ দু’টো কালো হাত ছোবল মেরে ও’কে বাইরে নিয়ে যায় – ‘আমার মাইয়া’। দাড়ান কে আপনি? তার মাথায়ও টুপি, বলে ‘ও’র চাচা’। ও’কে ভিতরে নিয়ে অাসেন, দাড়ান আপনি। কিন্তু মুহুর্তেই অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটা উধাও হয়ে যায়। লোকটা বাইরে বেরিয়ে দেখে, নবি দাড়িয়ে আছে। মলিন মুখে বলে, আমার গোঙ্গা পোলাটার পাওই কাটা যায়, কোন সাহসে আপনার দোকানে পা দিল?
আপনার ছেলে? কোথায় গেল? ডাকুন।
আসবে আনে, আপনি চিন্তা কইরেন না। ঠিক জায়গায়ই নিয়ে গেছে?
মানে, আপনি চেনেন ও’দেরকে?
এটা কি কন? আমাগো আত্মীয় হয়।
এগার/বার বছরের অাশা কিছু একটা বলতে চায়, লোকটা জিজ্ঞাস করে, তুমি চেন?
কাকে?
যে নিয়ে গেল ও’কে?
না।
ঐ ছ্যমরি তুই কে শুনি, কার মে? কবিরাজ তোর কি হয়? আমার তো….
সে যাই হোক, ও’কে এভাবে নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি, আপনার ছেলেকে ডাকুন।
এর মধ্য দাতগুলো বের করে সবুজ হাজির, স্যারে খুব খুশি হইছে।
নবি বলে, তোর দাত সব ফেলাইয়া দিমু, তুই উনার দোকানে যে ঢুকছো, কার কাছে জিগাইয়া ঢুকছো?
জিগাজিগি পরে করেন, ও কোথায়, নিয়ে আসেন?
স্যারের কাছে দিয়ে আসছি?
কার কাছে? লোকটা নবির দিকে তাকিয়ে বলে, ও কে নিয়ে আসতে বলেন।
দাত বের করে বলে, স্যারে বড় স্যার, পোরফেসার।
নবি বলে, যা নিয়ে আয়।
স্যারে খুশি হইছিল, এই মাত্র নামাজ পড়ে আইল, আবার ব্যাজার করুম?
পালা গরু ছাগল জবেহ করলে যতটুকু কষ্ট লাগে, আপনাকে দি-খন্ডিত করলেও ততটুকু কষ্ট হবে না, আপনি অনেক অন্যায় করছেন, যান নিয়ে আসেন। ও’রা আমার সাথে কথা বলছিল, যেতে চাইলে আমি নিয়ে যেতাম। লোকটা আশাকে বলে, যাও তো ও’কে নিয়ে আসো।
ততক্ষণে সবুজ উকি দিয়ে ফিরে এসে বলে দরজা বন্ধ করেছে।
তার সাথে কথা বলা যেন অর্থহীন, লোকটা নিজেই যেতে শুরু করে, কোথায়? কোন ঘরে? কার কাছে?
নবি তখন কিছুটা ইত্তেজিত হয়ে তার ছেলেকে প্রহার করতে উঠে, দু’দুইটা বাচ্চার বাপ হইছ, তারপরেও অাক্কেল হয়নাই।
এর মধ্যে সে দৌড়ে যায় আর কড়া নক করতে থাকে, লোকটাও এগিয়ে যায়। সবুজ ফিরে তাকিয়ে বলে, খাইতে বসেছে।
আশা ফিরে এসে বলে ‘আমার দোষ, আমি পারলাম না’।
তোমাদের এভাবে পাঠানো ঠিক হয়নি, আমি তো দোকানে নাও থাকতে পারতাম। তোমাদের রাখাল ভাইয়া কোথায়? গতকাল বলেছিলাম ও’কে নিয়ে আসতে, ও’ই কি পাঠিয়েছে তোমাদের? আশা কেপে উঠে, কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, ‘স্যার কি আপনি না উনি?’ কে উনি? উনাকে তো আমি চিনি না, তবে তোমাদের রাখাল আমাকে ‘স্যার’ ডাকে।
গতকাল প্রথম রাখালের সাথে পরিচয় হয়, বেশ ভাল, চুপচাপ বসেছিল, সে যে ও’র ভাই তা জানা ছিলনা।
‘ও’রা আপনার কি হয়?’ কিছু না। ‘তাইলে ও’কে চেনেন কি ভাবে?’ অনেক আগে থেকে চিনি, ও’কে, ও’র দাদা, চাচা, চাচাত ভাই সহ অনেকজনকে কিন্তু ও’র বাবা-মা’কে চিনি না। তোমরা যে এসেছো, ও’র বাবা-মা জানেন? ‘ও’র মা জানে, বাবা তো বাড়ি থাকে না। আমারই দোষ’ বলে আশা চলে যেতে চায়।
আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার না, দোষটা নবির ছেলের। তুমিও যাও খাওয়া শেষ হলে আবার নিয়ে এসো।
স্যারেই নিয়ে আসবে, স্যারে খারাপ না, স্যারেরে কইছি, আপনি মন্দ কইছেন, ও’রা খাইতে আসছিল, স্যারে খাওয়াইয়া টাওয়াইয়া নিয়ে আসবে আনে, তাতে সমস্যা কি?
আপনার সাথে কথা বলার কোন ইচ্ছে আমার নেই। সে কে, সে ভাল না খারাপ, নামাজি না বেনামাজি তা আমার জানার বিষয় না; যখন আমারা কথা বলছিলাম তখন আমাদের অনুমতি ছাড়া আপনি যা করেছেন তাতে আমার বিবেচনায় আপনার বাবা যা বলেছে তেমনটাই করা উচিত।
নবি এবার বলে উঠে, হইছে, আপনি এখন থামেন। ও’রা আমাগো আত্মীয় আমরা বুঝমু।
এরি মধ্য, রাস্তায় আরো দু’তিনজন লোক দাড়িয়ে যায়।
নবি বলে, ঐ কবিরাজের মাইয়াগ্গারে আনছিল, স্যারের কাছে ভাত খাওয়াইতে। সবুজ কোলে কইরা মাইয়াটারে স্যারের ঘরে দিয়ে আসছে, হেইতে উনি এতগুলা কথা শুনাইল।
তাতে উনার কি!
গুড়াগাড়া দু’টা যাইয়া প্রথমে উনার ঘরে ঢোকে যে!
একজনে জানতে চায়, শান মাষ্টার আছে ঘরে?
হয়, হে গুড়াগাড়া নিয়া খাইতে বইছে।
তয় আর সমস্যা কি, ও’রা হারাইবে না। গ্রাইম্যা ছেলেপেলে, রাস্তাঘাট সবই চেনে।
তারপরেও লোকটা নিজে যেতে চায়, ওদের মা-বাবা আপনাদের অাত্মীয় হতে পারে, কিন্তু ওরা আমার ঘরে এসেছিল, আমার সাথে কথা বলছিল।
নবি সবুজকে বলে, যা দেখ, খাওয়া হইলে নিয়ে আয়।
সবুজ কিছুক্ষণ পরে এসে বলে, ও’রা পিছন দিয়ে বাড়ি চলে গেছে?
লোকটা জানতে চেলে নবি বলে, শান পেরফেসার অনেক বড় স্যার, কলেজে পড়ায়।
সে যাই হোক, আপনার ছেলে ভয়ংকর অন্যায় করেছে, আর আপনিও কথা রাখতে পারেননি। লোকটা তার দিকে তাকিয়ে বলে ও’রা এই পথে হাসি খুশি ভাবে আমার কাছে এসেছিল আর অাপনারা ঐ পথে – বা’দিক দিয়ে বাড়ির পিছনে কোথায় পাঠিয়ে দিয়েছেন তা আপনারাই জানেন। আমার এখানে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত ও’দের সমস্ত ভাগ্যের জন্য আপনারা দায়ী।
কেউ একজন বলে, স্যার কিন্তু ভুল বলে নি।
নবি তার ছেলে সবুজকে উদ্দেশ্য করে বলে, তোর হাতই আমি কেটে ফেলব, দেখিস।
আমি যদি স্থানীয় হতাম তাহলে আপনাদের সাথে এতক্ষণ কথা বলতাম না। আমি সবাইকে চিনিনা, আপনারা জানেন, তবে আমি যতটুকু জানি তাতে আমার অাত্মীয় কোন শিশু! এমনকি আমি নিজেও ঐ পথে যেতে দ্বিধা করি।
ইস, ইস বলে নিজের উপর ঘৃণা ছোড়ে সবুজ, বলে, আমি এত কিছু বুঝি নাই। ও’রা স্যার, স্যার ডাকছে, আর স্যারেও নমাজ পইড়া যাওয়ার সময় মাইয়াডার সাথে চোখ মিলাইছে তাই………
নবি এবার বিরক্ত হয়ে বলে, আপনিও বা কেমন পুরুষ, এত বাসনা তয়, কানের উপর দু’টা চোফার দিয়া নিয়ে আসলেন না ক্যান?
দেবতা গণেশ তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের স্বার্থে নাকি সকল দেবতাদের উপেক্ষা করে মস্তক হারিয়ে দেবতা হয়েছিল। লোকটার কাছে তখন মসজিদ থেকে বের হয়ে আসা লোকগুলোর উপর অাস্থা না রাখাটা ততটা সঠিক মনে হয়নি যতটা পরে মনে হয়। তারা সকলেই তখনকার সেই রাজাকার প্রেমী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সাথে জড়িত যারা ভোটের চিন্তা করত, জনসমর্থের চিন্তা করত, কিন্তু ন্যায় -অন্যায় বা ভাল-মন্দের বিবেচনা থেকে অনেকটা দূরে, তারা ধর্মের নামে অন্যের অধিকার হরণ, অমর্যাদা করণে মানব ধর্ম হারিয়ে পশুত্বের পরিচয় দেয়, আর নীতি বর্জিত রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারে ঐক্যবদ্ধ। তারা ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের ধার্মিক বেশে পরিচিত করতে আর অন্যদের ধর্মের পথে দাওয়াত দিতে সচেষ্ট, অথচ ধর্ম চর্চা অনেকটা নামাজ দ্বারাই পরিমিত। তারা পাপ- পুণ্য, পরিচ্ছন্নতা, ন্যায়-অন্যায় কিংবা অধিকার সচেতন নয় বরং জনসমর্থনের লোভ বা বেহেশতের লোভে লোভী। তারা ধর্মীয় আর রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের ধার্মিক বেশে পরিচিত করতে আর অন্যদের ধর্মের পথে দাওয়াত দিতে সচেষ্ট, অথচ ধর্ম চর্চা অনেকটা নামাজ দ্বারাই পরিমিত। তারা পাপ- পুণ্য, পরিচ্ছন্নতা, ন্যায়-অন্যায় কিংবা অধিকার সচেতন নয় বরং জনসমর্থনের লোভ বা বেহেশতের লোভে লোভী। তারা ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে যথেষ্ট তৎপর অথচ তাদের সেই ভবনগুলোতে আবাসিক হোটেলের যে ব্যবসা তাতে রাতে দিনে অনেকেরই জ্ঞাতসারে চলে নোংরা দেহব্যবসা – প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছোট ছোট শিশুরাও ঢিল ছোড়ে গ্লাস ভাঙ্গে, অথচ তারা রাতবিরেত শুধু ব্যবসার ঝগড়া নয়, নির্যাতনের জটিলতা প্রশাসনের অাড়ালে রাখতে নিজেরাই বিচার শালীশির মধ্যস্থতায় যতটুকু ব্যস্ত তাতে এটা কারো কাছেই অস্পট ছিল না যে ওসবের সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন অবান্তর নয়। ধর্মের পোশাকে সমাজের বখাটে, চাঁদাবাজ, বেয়াদব, অন্যের অধিকার ও ইজ্জত লুন্ঠনকারী, বেহায়া মর্যাদাবোধহীন, স্বাধীনতার চেতনা বিরোধী, অন্যের ফসল কেড়ে খাবার মানসিকতায় দুষ্ট আর দু:স্বচরিত্রদের জন্য যেন নিরাপদ আশ্রয়-প্রশ্রায়ের শক্তি যোগায়ে চাচ্ছে সেই রাজনৈতিক সংগঠনের ছায়ায় কোন অপশক্তি। তারা সর্বাগ্রে নামাজের কথা বলে, ধর্মের কথা বলে, নারী নেত্রীত্বের বিরোধিতাসহ ধর্মের জন্য নানা কথা বলে, অথচ সমাজে ইজ্জত লুন্ঠনকারি সেই লোকগুলো তাদেরই নীতি বর্জিত নারীনেত্রীর ক্ষমতায় বলীয়ান, ঐক্যবদ্ধ – তাদের ধর্ম কর্ম মুলত: প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে নিজেদের স্বার্থ সুদৃঢ় করা তা অবৈধ হোক, পাপ হোক, অনৈতিক হোক, অন্যায় হোক, অন্যের অধিকার হরণ করুক, অমর্যাদা করুক তাতে কোন লজ্জা নেই।

লোকটা ছুটে আসে এই দোকানটিতে। রাখাল দূর থেকে দেখেই চলে যায় আর অন্যরা বলে ও’রা এসেছিল, বাড়ি চলে গেছে। লোকটা দাদার কাছে জানতে চায়, দাদাও একই কথা বলে। তারপরেও কেন যেন অপরাধবোধ কাজ করে, কিন্তু দাদাকে কিছু না বলে, শুধু অনুরোধ করে যেন রাখালকে একটু তার কাছে পাঠিয়ে দেয়।
ফিরে গিয়ে লোকটা অন্ধকার ঘরে একা একা বসে থাকে। রাখাল তার চাচত ভাইকে সাথে নিয়ে আসে।
ডাকছেন কেন?
তোমরা কেমন অাছে?
ভাল।
বাড়িতে কোন সমস্যা হয়েছে কি?
না। কেন?

তোমার বাবা-মা কি আমাকে চেনেন?
চেনে তো।
কিভাবে?
কেন, আমি বলেছি তো!
কি বলেছ?
আপনি খুব ভাল।
তাই? আর কিছু বলেছ?
আর কি বলব?
তারপরে, উনারা কি বলল?
কিছু না।
বাড়ি থেকে কখন বের হয়েছ?
কিছুক্ষণ আগে?
বাড়িতে কোন সমস্যা অাছে?
না।
লোকটা ও’র কথা জানতে চায়, ও কোথায় আছে এখন? রাখাল বলে বাড়ি গেছে দেখলাম। লোকটা বলে, তুমি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানো, ও’ আজ কোথায় গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল, কি হয়েছিল, কি কি করেছে, জেনে আমাকে জানাবে। ঠিক অাছে?
আচ্ছা।
আগামী কাল, আমার কাছে আসতে বল, অথবা তুমি নিয়ে এসো।
ঠিক আছে।
কিন্তু পরের দিন ও’রা আসেনি। লোকটা খোঁজ নেয়। ও’রা নানা বাড়ি বেরাতে গিয়েছিল। কয়েক মাস কেটে যায়। পরে যখন ও’কে রাস্তায় হেটে আসতে দেখে, ও’র চোখ আর লোকটার চোখ পর্যন্ত পৌছে না। লোকটাকে দেখে কিন্তু তারপরেও মাথা নিচু করে হেটে যায়।
তুমি কেমন আছো? নানা বাড়ি থেকে কবে এলে?
কোন কথা না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। দিনের পর দিন এভাবেই কেটে যায়, দৃষ্টি না মিললেও লোকটার উপস্থিতি ও’র নজরে থাকে। কয়েক মাস পার হতেই মুখে হাসি ফোটে কিন্তু দৃষ্টি মেলে না। এমনকি দাদার চায়ের দোকানেও বড়জোর একনজর তাকিয়ে ঘুরে চলে যায়।
লোকটা রাখালকে বলে যেন ও’কে নিয়ে আসে। কিন্তু তারপরে কিছু দিন ও’কে স্কুলেই আসতে দেখেনা লোকটা। হ্যা, পরে একদিন দেখে কয়েকজনের সাথে বেশ হাসিখুশি ভাবে স্কুল থেকে ফিরে আসছে। দূর থেকে লোকটাকে দেখেই অপলক চেয়ে থাকা। অন্যদের পিছনে ফেলে দ্রুত সামনে চলে আসে। রাস্তার ওপ্রান্তে লোকটার দিকে ট্রাফিক পুলিশের মত এক হাত ভাসিয়ে হাতটা নিজের দৃষ্টির সামনে এনে মধ্যমা আঙ্গুলটি দৃঢ়তার সাথে জাগিয়ে ধরে। লোকটা ফিরে তাকাতেই গভীর চিন্তিত চোখে একনজর দেখে চলে যায়। পিছনের কেউ বলে, ‘দ্যাখ দ্যাখ’।
তৎক্ষনাৎ এই আঙ্গুলের ভাষাটা জানা না থাকলেও লোকটার ইচ্ছে হয়, ছুটে গিয়ে ও’কে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু লোকটা ও’র ব্যাপারে বিশেষভাবে সচেতন। নিজের ইচ্ছে গুলো চাপিয়ে ও’র দাস হওয়াটাই যেন কর্তব্য মনেকরে। এর বিশেষ কারণ আধ্যাতিকতায় যতটুকু বিশ্বাস তাতে এই মেয়েটাই একটা বড় কারণ। কয়েকদিন যেতেই কোন ফেরিওয়ালা বা প্রতিবেশির কাছ থেকে শেখা একটা কৌশলের কথা বলে কয়েকটি শিশু। মনের সব ইচ্ছে তো সবসময় সবাইকে সরাসরি বলা যায় না। ল্জ্জা থাকে, ভয় থাকে আবার হয়ত অপমানিতও হওয়া লাগতে পারে। কারো দিকে এক অাঙ্গুল দেখালেই অন্যরা বুঝে নিবে সে তার এক নম্বর পছন্দ। মীমের দিকে তার ক্লাশের কয়েকজনেই এক অাঙ্গুল দেখাল, তাই নিয়ে ঝড়গা। নিজেরাই সালিশ করল প্রথমে যে দিখিয়েছে সেই মালিক। মেয়েটা হতভম্ব দাড়িয়ে থাকে, হৈচৈ এর কারণ জানতে চায়। এরি মধ্য একজনে বাঁধা দেয়, এটা কোন নিয়মই না, এটা সবাই জানে না, কাজেই এ নিয়ম বাদ, মীম শুধু আমার। ‘তোর এত্তবড়া সাহস’।
আমাকে বক কেন? ও’রা সবাই তোকে বিয়ে করতে চায়।
সবাই একত্রে প্রতিবাদ করে ওঠে, তুই বলছ, আমরা বিয়ের কথা বলিই নাই।
লোকটা কাজলী আর জান্নাতির কাছে ও’র খোঁজ জানতে চায়। বলে, ‘স্কুলে’। কি করে? ‘জানে কে? একা একা ক্লাশ রুমে বসে থাকে’। তোমারা গিয়ে নিয়ে আসো। ওরা গিয়ে ফিরে আসে, ‘আসবে না’। আমার কথা বল, ডেকেছি। ও’রা আবার যায় কিন্তু আসে না, একা একা নাকি বসে থাকে। ছুটির সাথে সাথে লোকটা দাদার দোকানে যায়, সেখানেও ও’কে দেখে না আজ। এর মধ্য রাখালের সাথে তার বড় একটা চাচাত ভাই আসে, সালাম,,,,,,,,। স্যার, কেমন আছেন?
ভাল না।
কেন?
জেনে কি হবে?

আগে বলেন তো, দেখি যা করতে হয়, করব।
তোমরা কি স্কুলে যাও?
কেমনে যাব স্যার, দোকান না চালাইলে পেট চলবে কেমনে! স্কুলে যাই, সীজন শেষে যখন বেঁচা কেনা থাকে না।
তোমাদের বাড়ি যাব, নিয়ে যাবে?
‘বলেন কি! এখন চলেন’ বলে খায়ের রাখালকে বলে, চল বাড়ি যাই।
রাখাল বলে, তুই নিয়ে যা।
দেখেছো, রাখাল আমাকে ওদের বাড়ি নিতে চায় না!
নেয়া লাগবে কেন? আপনার যখন খুশি তখন যাবেন?
অপরিচিত বাড়িতে এভাবে যাওয়া যায়? তুমি নিবে না, তাই বল।
কেউ অপরিচিত না, বাড়িতে সবাই অাপনাকে চেনে। খায়ের, তুই স্যার’কে নিয়ে যা।
এরি মধ্যে খবর আসে ‘ওর মা ও’কে নিয়ে বুবুর সাথে বুবুর বাড়ি বেরাতে গেছে।
অনেক দিন কারো দেখা নেই। একা একা বাড়ির খোঁজেও যায়, ‘অনেক দিন বাড়ি থাকে না, কোথায় যেন গেছে!
পরে একদিন খায়ের ও’কে নিয়ে আসে, লোকটার পাশে বসিয়ে দেয়। ‘এখানে বসে থাক’।
সেদিনের সেই উড়ন্ত ভাব নেই, বসে অাছে অনেকটা দূরে, চুপচাপ। হাত দু’টো টেবিলের উপরে নাকি নিচে রাখবে, তাই নিয়ে চিন্তিত। কথা বলে মনে হয় সেদিনের কথা ও’র কিছুই মনে নেই। দিনক্ষণ তার মনে নেই, কিন্তু এমন কিছুর সাথে পরিচিত হয়েছিল যা বিয়ের পরে প্রয়োজন হয়, যার অভাবে কুকুরের বাচ্চা সংখ্যার উপরে কুকুরের নিয়ন্ত্রণ নেই, তবে সেসবের সুবাদে কিছু মানব পশু সন্তান সংখ্যা নিয়ান্ত্রণ করে বটে কিন্তু স্বভাবে কুকুরের মতই নিয়ন্ত্রণহীন। তাছাড়া ও’র বয়স, স্থান, আনুষ্ঠানিকতা কোন কিছুই সেসবের জন্য সঠিক ছিল না। লোকটা জানতে চায়, কার উপর ও’র সব থেকে বেশি রাগ?
ও চুপ করে থাকে।
ভয় করছে?
না।
আমাকে ঘৃণা কর?
না।
তাহলে অত দূরে বসেছ কেন, কাছে এসে বস।
বাইরে খায়েরের দিকে একনজর তাকিয়ে কাছে এসে বসে, বলে ‘অাপনি কি করেন?’
এখন?
মাথা নাড়িয়ে বলে, হ্যা।
এখন তো তোমার সাথে কথা বলছি।
খায়ের’কে কী বলছেন? আমাকে ডাকছেন কেন?
ও’র জীবনে অনেকগুলো মাস কেটে গেল এবং এমন সময়ে যখন পরিবর্তন ঘটে যায় দ্রুত। অনেক গুলো মাস কিন্ত লোকটার কাছে মনে হয় কটাদিনের মধ্যেই ও’র কথা বলা, আর চিন্তা ভাবনায় মুরুব্বিয়ানা ভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। লোকটা বলে, কেন? অামি তো কিছু বলিনি?
ও বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকে?
কেন ও’ তোমাকে কি বলেছে?
না না, কিছু না।
লোকটা খায়েরকে ডাকতে চায়, কিন্তু ও বাধা দিয়ে উঠে। একটা হাত কি বোর্ডে পরে যায় আরেকটা গায়ে, শক পাবার মতই সাথে সরিয়ে নেয়।
ভয় নেই, তুমি ইচ্ছে মত ধরতে পার।
এগুলো কার?
আমার, কেন?
যদি নষ্ট হয়?
নষ্ট হবে না, হলে হবে, সমস্যা নেই।
লোকটা ও’কে কি বোর্ড, মাউজ ধরতে বলে। মনে হল, ও’র ডান হাতে এসিড দিয়ে কিছু একটা লেখা।
এসব কি?
কিছুনা?
দেখি।
হাত বাড়িয়ে দেয়, হাত ফুলে আছে এখনো, ছোটবেলায় এক ফোটা এসিডের যন্ত্রণা লোকটা পেয়েছিল, সেই জ্বালাই যেন অনুভূত হয়। কিন্তু ও’র বাচ্চা হাতে ফুলে ফুলে উঠা দাগগুলো সত্যই সহ্য করার মত নয়। বল এসব কী, কেন করেছে?
বাবলা পাতার কষ।
কার নাম লিখেছ?
চুপ করে হাতটা ঘুরিয়ে দেয়।
ইংরেজীতে ‘এ’ অথবা ‘আর’ দিয়ে শুরু করে আঁকাজোকা- ফুল আঁকা অথবা কিছু লিখে কেটে দেয়া।
ডাত্তার দেখিয়েছে? ঔষধ খেয়েছ?
ঔষধ বাড়িতে অাছে।
এবার বল তো, এসব কে করেছে?
আমি করেছি, কেন কি হবে?
আগে বল, কেন করেছ, কার নাম লিখেছ?
ও’ লেখা জায়গা থেকে আমার হাত সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।
তুমি বল, আমি তো পড়তে পারছি না।
চুপকরে আছে, অন্যদের মত কম্পিউটারে অাগ্রহ নেই। কি হল, বল কি লিখেছ? ‘এ’ নাকি ‘আর’?
এরি মধ্য মুক্তি বলে, আর লিখেছে আর, আপনার নাম .’…..’. না? ‘অারিফ’।
আপনার নাম কি?
আমার নাম জেনে কি হবে, কি লিখেছ, তাই বল।
মুহূর্তেই মুখটা মলিন হয়ে যায়।
আচ্ছা বলতে হবে না, কে লিখে দিয়েছে তাই বল।
মুক্তির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আর’।
লোকটা মুক্তির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাস করে, কে লিখে দিয়েছে?
আপনি এত জিজ্ঞাস করেন কেন, বুঝেন না, ভালবেসে লিখছে?
ভালবাসা ভাল, কিন্তু এরকম ক্ষতি করাটা ভাল না বলে লোকটা ও’কে কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞাস করে, সত্যি করে বলে, তুমি কাকে পছন্দ কর।
কাউকে না।
মিথ্যা বলছ কেন? আমার কাছে বল, কে সে?
কেউনা, অাপনি বিয়ে করেন না কেন?
লোকটা, ও’কে ছেড়ে দিয়ে বলে তোমাকে, বকা দিব কিন্তু। বল, তুমি কাকে ভালবাস
সবাইকে।
তাই? বেশি ভালবাস কাকে?
চুপকরে থাকে। বলে কাউকে না।
কাকে তুমি বেশি অপছন্দ কর?
কাউকে না।
আমাকে পছন্দ কর না কি অপছন্দ কর?
খুব পছন্দ করি।
তাহলে বলছ না কেন?
কি?
কাকে বেশি ভালবাস আর কাকে বেশি অপছন্দ কর? মা’কে বেশি ভালবাস না বাবা’কে?
সবাইকে। স্যার আপনি কি অামাকে বকবেন?
কেন?
আমি যদি রোজ আসি?
কেন? রোজ অাসবে কেন?
আসবো, প্রত্যেকদিন আসবো।
কিন্তু এসে কি করবে?
চুপকরে তাকিয়ে থাকে।
আচ্ছা আসবে, তোমার যেতেই হবে না, আমার কাছে থাকবে, বই নিয়ে আসবে। রাজি?
হুঁ।
এখন, কি খাবে বল?
কিছু না।
দুপুরে খেয়েছ?
না। আমি বাড়ি যাই?
আমার সাথে খাবে। তারপরে, খায়ের অাসুক অথবা অামি নিয়ে যাবো।
কোথায়?
তোমাদের বাড়ি।
মা তো বাড়ি নাই, সবাই এখানে কাকার বাড়ি।
‘খাবার ঘরে’ নতুন রান্না হতে আরো কিছুটা সময় লাগবে, লোকটা ও’র জন্য ছোটা এক প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে আসে। রান্না হলে, একটু পরে আমরা একসাথে খাবো।
‘এই তুই এখনো এখানে বসে আছো কেন? স্যারে আছেন, ও’কে সবাই খোঁজ করতেছে, এখন পর্যন্ত খায়নি। কাকা’য় এখনি ডাকছে তোকে’।
আচ্ছা, চিন্তা করতে নিষেধ কর, আমার সাথে খাবে আনে, খায়েরকেও আসতে বল।
এবার বল, আমার উপর কি তোমার রাগ হচ্ছে?
কেন?
তোমাকে যেতে দিলাম না যে?
না।
তুমি খুব লক্ষী।
মানে?
তুমি খুব ভাল, বড় হয়ে কি হতে চাও?
প্রানখোলা হাসি হেসে বলে, নায়িকা।
কি? সর্বনাশ! কেন?
কি ভাবে হয়?
অভিনয় করতে পারো?
মাথা নিচু করে মিটমিট করে হাসে।
একটা ছড়া বল অথবা একটা গান।

পারিনা।
তোমার বই এর একটা ছড়া বা কবিতা বল।
পারিনা বলে চলে যেতে চায়। লোকটা বলে চলে গেলে কিন্তু কথা বন্ধ।
মাথায় ঘোমটা দিয়েছ কেন?
মা’ দিয়ে দিয়েছে।
দিলে ভাল লাগে নাকি না দিলে?
না দিলে তো পাপ হবে।
নামাজ পড়?
পারিনা তো।
পারলে কি পড়বে?
হ্যা।
শিখো না কেন?
হুজুরে তো ছেফারা শিখায়।
আর কি শিখায়?

ওজু করা, ঘোমটা দেয়া, নামাজও।
বেশ ভাল, ঘোমটা কখন দিতে হয়?
বাইরে বের হলে?
নাইকারা কি ঘোমটা পরে?
পরে তো?
তাই? কি বলছ তুমি? আমি তো জানি পরে না।
পরেই তো, বিয়ে করার সময়।
তাইলে, তুমি এখন কেন পরেছ?
আচমকা চোখের দিকে তাকিয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলে।
আচ্ছা বুঝতে পেরেছি, তুমি তো বাইরে গেলে চুল ঢাকো আর বড় হলে বোরখা পরবে; তাই না?
হ্যা।
না পরলে কি হবে?
পাপ হবে, মানুষে খারাপ বলবে?
তাহলে নাইকা হবে কিভাবে?
না, না, ইস আল্লাহ নাইকা হব না, বলে দৌড় দিতে চায়।
দাড়াও দাড়াও, বলে লোকটা ক্যামেরা বের করে আর বলে, তোমার একটা ভিডিও করি।
না না, পাপ হবে।
কেন? আমি তো সিনামা বানাবো না, তাছাড়া মুসলমানদের ইরান দেশেও নাইকা আছে, সুন্দর পোশাকে। তুমি নিষেধ করলে তুলব না। কিন্তু তোমাকে তো আমি সরাসরি দেখছিই, ততটুকুই ক্যামেরা দিয়ে মনিটরে নিবো, তুমিও দেখতে পাবে, অন্যকেউ তো দেখবে না পাপ হবে কেন?
অন্যকেউ দেখবে না তো?
না, কেউ দেখবে না, তুমি নিজে দেখবে, তারপরে কেটে দিবো।
ক্যামেরা বের করতে করতে, ও’ দরজার কোনে দাড়িয়ে গুনগুন গেয়ে উঠে ‘কারো নজরে পরলাম না……’
আমার উপরে রাগ হচ্ছে?
না, কেন?
ক্ষুদা লেগেছে?
না।
কারো উপর তোমার কোন রাগ নেই?
চুপকরে থাকে।
খায়েরকে মেরে ফেলবো?
কেন?
ও’ তোমাকে কি বলেছে, বল তো? জোড় করে নিয়ে এসেছে? বকাঝকা করেছে? ও’রা কেউ তোমাকে মারে, বকাঝকা করে? তুমি ওদের ভয় পাও?
না, জিজ্ঞাস করছেন কেন?
আচ্ছা ঐ লোকটার উপরেও তোমার রাগ নেই, যে তোমাকে ধরে নিয়েগেছিল আমার সামনে থেকে।
শিউরে ওঠে, হাসি থেমে যায়, কিছুক্ষণ চুপথেকে বলে, কোন লোকটা মনে নেই।
আমার কিন্তু অনেক দুষ্ট লোকের উপর রাগ অাছে, আমার ক্ষমতা থাকলে আমি তাদের মেরে দিতাম।
কেন?
এখন যদি অপরিচিত কেউ এসে আমাকে বা তোমাকে জোড় করে নিয়ে যায়, তেমার রাগ হবে না?
হবে তো।

তাই তো জানতে চেয়েছি তোমার কারো উপর রাগ অাছে কিনা?
মুনি বুই।
কে?
ঐ যে ঐখানে দোকান আছে?
কোথায়?
ব্যাংকের কাছে।
আচ্ছা যা হোক, সে তোমার কি হয়?
জানিনা।
তার উপর রাগ কেন?
ধরছিল।
মানে?
এরকম করে,,,,,,
তাতে কি হয়েছে, আদর করে ধরেছে।
না, ব্যাট শয়তান, হাত দিতে নিছিল…। যেমনটা বলছিল তাতে মনে হয়ে নারীর যে অংশ শুধু মাত্র তার জীবন সঙ্গীর জন্যে সেখানে সে অনুমতি ব্যতিরেক প্রবেশের চেষ্টা করে।
তারপরে?
হেসে দিয়ে বলে, হাতে কামড় দিয়েছিলাম।
বেশ করেছে। পরে তোমাকে কিছু বলেছে?
না।
আর কাকে কামড় দিয়েছে?
ভাইয়াকে, মাকে..
কেন?
তখন তো ছোট ছিলাম।
এখনো তো তুমি ছোট, আমাকে একটা কামড় দাও?
কেন?
দিলে কি হবে, ব্যাথা পাবনা, তোমার দাত দেখি বলে লোকটা সামনে হাত বাড়িয়ে দেয়। ও লজ্জ ভরে মুখে উম্ উম্ করে চলে যেতে চায়।
দাড়াও, চল, খেতে যাবো।
এরি মধ্যে কাকা এসে বলে, এখানেই বসে অাছো? বুড়া মানুষটাকে জ্বালাইয়া নেছ, না! ও’কে এখানে বসিয়ে রাখছেন কেন? ভিতরে নিয়ে বসাতেন। একদম বদ হয়ে গেছে, কি কি বলছে এতক্ষণ? বেশি আস্কারা দিয়েন না।
দুষ্টামি করে না। আর অামি কিন্তু বিয়ে করিনি কাজেই বয়স কিন্তু দশ/বারো। ও’এতক্ষণ ভিতরেই বসাছিল, খাওয়ার জন্য বের হচ্ছিলাম।
ও সেই কথা, তয় আমি দেখছি কিন্তু, দরাজার কাছে বসেছিল। ভিতরে বসাইতেন, কোথাথেকে যেন ভিতর বাহির শিখে আসছে, এতক্ষণে তো অাপনিও শিখতে পারতেন। যা এখন বাসায়, যা।
ও’ চুপচাপ পা ফেলতে শুরু করে
আজ আমার সাথে খাক, এখনি ও’কে নিয়ে যাচ্ছিলাম।
তা দরকার নাই, ও’র কাকি মেহমানের জন্য রান্না করেছে, বাসায় খাবে আনে, আপনি তো হোটেলে খান।
লোকটা সেখানকার ভাল রেষ্টুরেন্টেই খেত, কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেশি একটা জোড় করে না, এমনকি ও’র ইচ্ছের কথাও জানতে চায়নি, শুধু কাকা’কে বলে, বাসায় তো সবসময়ই খায়, অামি এতক্ষণ বসিয়ে রেখেছিলাম, অাজ না হয়….
তাতে সমস্যা নাই, হোটেলও তো বারো মাস খোলা থাকে।
পরের দিন, ও’র দেথা নেই। এদিকে লোকটার দোকান উচ্ছেদ্দের জন্য কয়েকজনের চেষ্টা। সবকিছু বিবেচনা করে লোকটা দোকান স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। চার পাঁচ দিন পর, খায়ের আবার ও’কে নিয়ে আসে। ও এমনিতেই অদ্ভুত সুন্দর, তার উপর কাঁচা হলুদের রং যেন সোনায় পরিনত করেছে, হলদে টোপেজের মতই উজ্জ্বল, সূর্যাস্তের রোদটাও ও’র দিকে ফিরে অাছে।
তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।
মলিন মূখে এক নজর তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়।
কেমন অাছো, একয়দিন কোথায় ছিলে?
চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ পরে হতাশার দৃষ্টিতে বলে, আপনি নাকি চলে যাবেন?
হ্যা যাবই তো।
কেন?
তুমি আসোনি কেন?
কিভাবে আসবো?
কেন, কি হয়েছে কেউ বকেছে?
ও’ চুপ করে থাকে। খায়ের বলে, উনাকে কাল দেখতে আসবে,…. বুবু নাকি নাতি বউ বানাবে, দেখেন স্যার পছন্দ হবে কিনা?
কি বলছ, এসব?
আমিও তো বলি, পিটানোর কাজ, কিন্তু সত্যই আংটি পরাতে আসবে।
তুমি বিয়ে করতে চাও?
না, স্যার। মা’য়……
ও’র মা’য় আংটি পরানোর কথা শুনেই রাজী। স্যার, ও’র একটা ছবি তুলে রাখেন।
লোকটা ওকে কাছে ডেকে নেয় আর বলে তোমার ভয় নেই, তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারেনা। খায়েরকে জিজ্ঞাস করে পাত্রের সম্পর্কে।
পাত্র শিক্ষিত, মেট্রিক পাশ, কিছু টাকা পেলেই নাকি স্কুলে ভাল বেতনে চাকুরি পাবে, জমা-জমি অনেক কিন্তু চেহারা বেশি ভাল না।
কি, তুমি রাজী?
না।
তাহলে তো বাতিল। তুমি তোমার বাবা-মাকে বলেছ যে তুমি রাজি না?
ও’চুপ করে থাকে।
অাঠারো বছরের আগে বিয়ে এমনিতেই নিষিদ্ধ আর যদি তুমি রাজী না থাকো, তাহলে আইন, ধর্ম দু’টোই তোমার বিয়ে আর তোমার বাবা-মা’র বিপক্ষে।
খায়ের ও’কে রেখে দ্রুত চলে যায়।
এবার বল তুমি রাজি না কেন? বিয়ে হলে তো ভালই, সব সময় একটা বন্ধু থাকবে, তুমি ইচ্ছে মত মজা করতে পারবে!
আমি তো রান্না করতে পারি না।
তুমি তো ছোট, তুমি রান্না করবে কেন? তুমি লক্ষী বউ হয়ে থাকবে, বড়রা বা কাজের লোকেরা রান্না করবে।
না।
কী না?
আপনি কাকে বিয়ে করবেন?
আমি? আমাকে যে বিয়ে করতে চাইবে।
তাইলে করেন না কেন?
কাকে বিয়ে করব, কেউ বিয়ে করতে চায় না তো।
চায়।
কে চায়?
আপনি যাকে চান, সে ই।
আমি কাকে চাই?
বললেন দেখি?
কিন্তু, তুমি নাম বল, একজনের।
আপনি চলে যাবেন কেন?
কোথায়?
কাল নাকি চলে যাবেন?
না, চলে যাবো না, দোকানটা আগের স্থানে তোমার স্কুলের কাছে নিয়ে যাবো।
তাহলে আমাকে আর পাবেন না।
মানে?
যাবেন কেন?
ওখানে তো ভাল হবে, রোজ অাসবে, আমার কাছে থাকতেও পারবে।
যেতে দেবে না।
কে?
মা’
কেন? কোমার মা’র সাথে কথা বলব?
কেন?
যেন তোমাকে যেতে দেয়?
মা’ না।
মানে?
খায়ের বলল দেখি।
কী।
মা’রেই নিষেধ করছে।
জোবায়ের আর সাবুর গতিবিধি মোটেও ভাল না। ও’কে আমার কাছে দেখা মাত্রই ছুটে যায় যেন কোথাও কোন জরুরী সংবাদ দিতে হবে। তারপর এসে যা করে তাতে ও’যে ওদের চাচাত বোন তা বুঝারই উপায় নেই – যেন একেবারেই অপরিচিত তাছাড়া কোন সুযোগের অপেক্ষাও না; যেকোন ভাবে লোকটাকে ডিলিউড করতে পারলেই যেন মিশন সফল। ‘স্যারের দোয়ার কাছে বড় বড় ডাক্তারাও ফেল, স্যারে দোয়ার জন্য টাকা পয়সাও নেয় না- বাড়ি নিয়ে খাওয়ালেই হয়, স্যারে একটা সুন্দর মাইয়া খোঁজে নাতি বউ মানাবার জন্য, স্যারের কোন অভাব অাছে নাকি, উনার যে কয়টা টাকা লাগে তা তো আমিই দিতে পারি, অন্যের কাছে হাত না পাতলেও পারে, স্যারে খুব ভাল কম্পিউটার চালায় ইত্যাদি ইত্যাদি মনগড়া যতসব মিথ্যা রটানোর পিছনে তাদের বেশ স্বার্থ ছিল হয়ত। প্রথমে ছোটজনে এসে বলে, কৈ? খেলব।
আজ গেমস বন্ধ।
তারপরে বড় জনে এসে, গেমস বন্ধ কেন?
কাল ঘর পালটাবো তো তাই।
মালিক কি জানে?
কোন মালিক?
লোকটার পিসি আর জিনিসপত্র দেখিয়ে বলে, এসবের মালিক।
এসবের আবার মালিক কে?
যারা শহর থেকে পাঠায়।
সেটা আপনার জানার বিষয় না, সেরকম কোন মালিক নেই।
ও’ তাইলে মালিক অাছে, বলে দ্রুত চলে যায়।
লোকটা মনে মনে ভাবে, এরা সেই দুষ্টদের দলের লোক বুঝি।
লোকটা আবার ও’র সাথে কথায় ফিরে আসে, বল তুমি কাকে বিয়ে করবে?
কিছুটা বিরক্ত হয়, কিন্তু হাসি দিয়ে বলে, বললাম দেখি?
তাই?
হু।
আচ্ছা, বুঝলাম তুমি তার নাম বলবে না। এবার বল কিরকম জামাই তোমার পছন্দ, তোমাদের সাথে স্কুল পড়ুয়া?
না।
তাহলে?
বড়।
কত বড়?
লোকটার মাথা পর্যস্ত হাত জাগিয়ে বলে, ‘আমার থেকে বড়’।
তাই?
হুঁ।
শিক্ষিত না অশিক্ষিত?
মানে?
পড়াশুনা জানা নাকি না জানা?
আপনি দেখি জানেন?
তাতে কি, কে বলল?
জানলেও হবে, না জানলেও হবে।
সুন্দর নায়কের মত হতে হবে?
না।
তাহলে, কালো, খারাপ চেহারা?
সাহস থাকলেই হবে।
তুমি তো দেখি…..আচ্ছা.., বল তো বড়লোক জমিদার নাকি….
শক্তি, অনেক ক্ষমতা।
অনেক মোটা হতে হবে?
না, ক্ষমতা যার আছে।
মানে?
আপনার কি আফছার মাঝির থেকেও বেশি ক্ষমতা।
মানে?
যার কথায় সবাই চলে, পুলিশও।
কি সর্বনাশ, উনি তো অনেক বড় মানুষ, টাকা পয়সা অনেক, আমি যতটুকু জানি তাতে খুবই ভাল মানুষ, আর আমার তো ক্ষমতাই নাই। তুমি অাফছার মাঝিকে বিয়ে করতে চাও?
না–আ।
কেন? উনার তো সত্যিই অনেক ক্ষমতা।
উনার তো বউ আছে।
তাহলে?
আপনারও তো ক্ষমতা আছে?
কি বল আমার কোন ক্ষমতা নাই।
তাহলে, আপনার কথা সবাই মানে কেন?
ও’র কথা শুনে লোকটা, কয়েক মাইল রোদে হেটে এসে এক গ্লাশ শরবত পান করার মতই ঝিমিয়ে যায়, বাস্তবতা বিবেচনায় ও’র পা’দুটো ধরে ক্ষমা চাওয়ার বিকল্প নেই। ও’র কাছে দুনিয়াটা অনেক ছোট, সবাই বলতে হয়ত গুটিকয়েক মানুষ তাও হয়ত সীমিত সময়ের জন্য। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে লোকটা বলে, আমকে বিয়ে করতে চাইলেই কিন্তু আমি যেকাউকে বিয়ে করব না। সময় মত রাজি হতে হবে।
মানে?

তুমি তো খুব ভাল, তাই তো খারাপ জেনে একজনকে কামড় দেয়ার কথা বলেছিলে, কিন্তু কেউ যদি সেরকম না করে নিজেও খারাপ হতে থাকে তবে সে যতই রাজি হোক না কেন, আমি তাকে বিয়ে করতে রাজী না।
ও’র মাথায় যেন অাকাশ ভেঙ্গে পরে। যদি গলা চেপে ধরে?
মানে?
কামড় দিলে যদি গলা চেপে ধরে?
রাগ করে, জিজ্ঞাস করে, কে তোমার গলা চেপে ধরেছে?
ভয় পেয়ে বলে, কেউ না।
তোমার ভয় হচ্ছে, ভয় হলে অামাকে জড়িয়ে ধর। লোকটা হাত বাড়িয়ে দেয়। ও’র হাতের ক্ষতটা অনেকটাই সেরে গেছে। হাত ধরতেই ও’র নিশ্বাসটা মনে হয় স্বাভাবিক হয়ে আসে। ভয় পেলে, তোমার আম্মু, ছোট বোন, ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরবে। এবার আমাকে বল ঐ লোকটার মত কেউ তোমার সাথে দুষ্টামি করে কিনা?
আপনি কি করবেন?
সূর্যাস্ত হয় হয় বুঝি, ছোট্ট একটা মে এসে বলে সেদিন ও’ এসেছিল, ইমুইন্না ঘরে নিয়া, নিজের পোশাক দেখিয়ে বলে খোলা শুরু করেছিল, তারপরে কান্নাকাটি করে ভাসাইছে।
লোকটা কি হয়েছে জানতে চায়, বিষয়টা সত্য তাই আর বেশি কিছু জিজ্ঞাস করে না। তাছাড়া ও’র একয়দিনের অসহায়ত্ব যেনে সেই নিরাপত্তাহীন ফুলের কথাই মনে করিয়ে দেয় যেখানে পোকার বিচরণে ফুলের করনীয় কিছু থাকে না।
তুমি আমাকে তোমার সব বিষয়ে বলতে পারো, আমি তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছুই করব না। তোমার বাবা মা, ভাই, বোনের মত আমাকেও অাপন ভাবতে পারো, এমনকি তাদের থেকে বেশিও। মনে রাখবে, ভাল-মন্দ, ন্যায়কারী – অন্যায়কারী, পাপী- পুণ্যবান এসবের মধ্যে শত্রুতা থাকে, এরা একে অন্যের প্রতিপক্ষ। তুমি যখন সঠিক ন্যায়ের পথে তখন খারাপ পাপী অন্যায়কারী তারা যেই হোক না কেন, সুযোগ পেলে তোমার অপকার করতে চাইবে। আরেকটা বিষয় মনে রেখ..
কি?
কখনো অন্যের বুদ্ধিতে চলবে না। মানে ধর, কেউ যদি আমার ব্যাপারে কিছু বলে বা তোমাকে বুদ্ধি দেয় তবে তা মানার আগে আমাকে জানাবে। মনে থাকবে?
কেন?
আমি তোমাদের মত আরবী পড়তে পারি না, কিন্ত কোরআনের শেষ দিকে ‘ কুৎসা রটানো শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাবার জন্য আশ্রয় প্রার্থনার কথা লেখা আছে। কোন শয়তান বা জীন কুৎসা রটায় কিনা জানি না তবে দুষ্ট মানুষরা রটায়, কাজেই তাদের মধ্যেই শয়তান থাকতে পারে; আবার ভাল বুদ্ধির মধ্যেই দুষ্ট বুদ্ধি দিয়ে অনিষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে, সবাই বুঝতে পারে না, তুমি ছোট মানুষ তাই বলি কেউ ভাল খারাপ যাই বলুক আমাকে জানাবে। ঠিক অাছে? নিজে ভাল থাকার চেষ্টা করবে, যে কোন প্রয়োজনের কথা অামাকে জানাতে পারো, কেউ অন্যায় করতে চাইলেও আমাকে জানাবে।
আপনি কি করবেন?
তুমি কি করতে চাও?
কিছুনা।
কামড় দিয়েছিলে কেন?

দেয়নি, ভুলে যান।
দেখ সম্মানের সাথে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন কিন্তু মেরে ফেলা সহজ। আমরা কোন কষ্মতা নেই, কিন্তু তুমি সেদিন আল্লাহর কথা বলেছিলে, তাঁর কিন্তু ক্ষমতা অাছে। আমরা বিধাতার কাছে প্রার্থণা করতে পারি। তিনি তো সবথেকে ক্ষমতাবান, তিনি তো ন্যায়ের পক্ষে, কাজেই যতক্ষণ তুমি ন্যায়ের পক্ষে -অন্যায়ের বিপক্ষে ততক্ষণ তিনি তোমার পক্ষে – যে সবথেকে বেশি ক্ষমতাবান। কাজেই আমার বিশ্বাস তুমি নিজেই ক্ষমতাধর হতে পার, যদি পাপ বর্জন করে চল আর ন্যায়ের পক্ষে থাকো। যার কেউ নাই সে যদি সঠিক ভাল মানুষ হয়, তার জন্যও বিধাতা থাকে আর যার সাথে বিধাতা থাকে তার সাথে দুনিয়ার সকল ভাল মানুষরা থাকে। দেখ, কতদিন লালন পালন করে মুরগিটা বড় করেছে অথচ এক মিনিটেই মরা, এক মিনিটে কিন্তু অতবড় মুরগি বানানো জায়না।
অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, আপনার বাড়ি কতদূর?
কেন?
বাড়ি থাকেন না কেন?
তোমার বাবা, তারপরে ঐ বোনটা, ভাই -উনারা তো বাড়ি থাকে না। বিভিন্ন জনে বিভিন্ন কারণে।
বাড়ি যাবেন না?
না, কেন তুমি যাবে?
রাত্রে যান?
না, অনেক দূর তো। তুমি গেলে বল, তোমাদের নিয়ে যাবো।
কতদূর?
অনেক দূর, বাসে তিন চার ঘন্টা লাগে।
হাটা লাগে না?
না, শহরে হাটা লাগে না। তুমি গেছো কোথাও?
ও নানা বাড়ি, অনেক হাটতে হয়।
বড় হতে হতে দেখবে রাস্তা হয়ে গেছে।
খায়ের চলে আসে, চল চল, সবাই রওনা করছে। স্যার অাপনিও চলেন।
কোথায়?
বাড়ি।
ঐ যে বললাম মেহমান আসছে। আপনিও চলেন ও’র বাবা-মার সাথে দেখা হত।
অনুষ্ঠান কি আজ না আগামীকাল?
অনুষ্ঠান নাই, আর ওসব হবে না, কেউ রাজি না, শুধু চাচী আর বুবু।
সবাই চাইলেও হয় না, কারণ ও’ রাজি না। আমি পরে একদিন যাব, রাখালকে বলবে, তোমরা ও’কে নিয়ে আমার নতুন দোকানে এসো। তুমি বই নিয়ে এসো, পড়াশুনা করলে ভাল করবে, তোমার কিন্তু মেধা আছে।
ও’কে দেখে মনে হয়, নতুন করে কিছু বলার নেই, চুপচাপ হেটে যায়।
ও’র বাবা-মা’কে বলিও, ও’র প্রতি যেন খেয়াল রাখে, কেউ যেনে কোন ব্যাপারে জোড় না খাটায়, ভয় না দেখায়। ছোট মানুষ, অনেক সচেতন তারপরেও অসহায়। কেউ যেন অন্যায় অধর্ম না করে। তোমরাও খেয়াল রেখ। রাখাল এলো, সব ঠিক ঠাক অাছে তো?
তুমি ভাল আছে?
উনি সবসময়ই ভাল থাকে, বলে খায়ের চলে যায়।
কথা প্রসঙ্গে লোকটা রাখালকে বলে, আমি যখন তোমাদের মত, ক্লাশ সিক্সে পড়তাম তখনই বিয়ে করতে ইচ্ছে হত। মে’য়েদের ক্ষেত্রে আরো দু’বছর আগে থেকেই সে ইচ্ছে আরো বেশি মাত্রায় হতে পারে। তুমি তো নামাজ পড়, ধর্মের কাজে বিভিন্ন জায়গায় যাও, অনেক সময় দেখি মানুষদেরকেও ধর্মের কথা বলছ। একারণেই বলি, নিজেকে পাপ মুক্ত রাখাটা হচ্ছে সব থেকে বড় ইবাদত। এবং পরিবারে ছোটরা যেনে পাপের শিকার না হয় সেটাও নিশ্চিত করতে হয়। তোমার বাবা বাড়ি থাকে না, কাজেই তোমার অনেক বড় দায়িত্ব। নামাজ পড় আর যাই কর না কেন, নিজেকে পাপ মুক্ত রাখতে না পারলে, আর ছোটদের নিরাপত্তা দিতে না পারলে সব ব্যর্থ। ধর্মের অাসল উদ্দেশ্যই হচ্ছে নিজেকে পাপ মুক্ত রাখা আর দুর্বল এবং ছোটদের পাপ মুক্ত থাকতে সহায়তা করা।
একদম ঠিক কথা বলছেন, স্যার।
শুধু মুখে স্বীককার করলেই হয় না, কাজেও প্রমান করতে হয়।
ঠিক, ঠিক।
তাহলে তোমার বোনের মতামত ছাড়া বিয়ের চিন্তা কেন করছ?
আমি করি নাই তো, ওসব বাতিল।
সবদিকই চিন্তা করতে হয়। তোমার বোনের ইচ্ছা অনিচ্ছা, ভবিষ্যৎ….
ঠিক বলছেন…..আর বলতে হবে না। আপনি বাড়ি আসেন না কেন, খায়েরের সাথে গেলেই তো পারতেন।
যাবো, তার আগে তোমার বাবা’র সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিও।
আচ্ছা।

ও’র কথা আর অাচরন দেখে মনেই হয়নি যে ও’র এতসব স্মৃতি মনে আছে, নাকি রাগ আর ঘৃণায় ভুলে থাকতে চেয়েছিল। লোকটা দাদাকে বলে, অনেকদিন পরে ও’কে দেখলা। কোথায় ছিল এতদিন।
কোথায় আবার ধান উঠলে নানা বাড়ি যায়।
বেশ বড় মুরুব্বি হয়ে গেছে, একা একা স্কুলে যায়। একটা ব্যাগ কিনে দিবেন আর ব্যাগে টিফিন বক্সে টিফিন দিয়ে দিবেন।
তাতে বাপ-মা লাগে, জ্ঞান থাকা লাগে। কয়টা টাকা হইলেই কি হয়? বাপের তো খবর নাই, মা’য় কি করে তা তো নিজের কানেই শুনলেন।
লোকটা অস্থির হয়ে উঠে এতগুলো দিন কিভাবে কাটিয়েছে? হেসে দিয়ে বলে, অনেকদিন আগে ও’র বিয়ের কথাবার্তার কথা শুনেছিলাম?
সেই কথা আমার সামনে? সবগুলারে পিটানোর কাজ। গুড়াগাড়ারা বলে, চাচী পরলে তো ও’কে রোজ বিয়া পরায়, তামা টামা নিয়ে পটাইছিল ও’কে লেপের তলে নেবার জন্য, পান্না কাকা শুনে এক্কারে বিয়ার নাম ভুলায়ে দিছে।
পান্না কাকা প্রগতিশীল দলের মিছিল মিটিং করে, খুবই পরিশ্রমী, রগচটা কিন্তু সহজেই নিজের বিবেক বিবেচনা ভুলে অন্যের উস্কানিতে পরে যায়। সে প্রথমেই নিজে এসে লোকটার সাথে পরিচিত হয়েছিল। ‘আপনার আর দোকান টোকান করার দরকার নাই। আমাকে কিছু টাকা দেন, আপনাকে অাপনি যার জন্য আসছেন তার ঘরেই থাকাবেন, খাবেন দাবেন আর টাকাটা আমি ব্যবসায় খাটাবো’। লোকটা অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল, সে কী জানে? সঠিক জানে কিনা? কি জন্য এসেছে, কার জন্য এসেছে তা সে কিভাবে জানে! কেউ কিছু বলেছে, নাকি তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা আছে? সে কিছুই প্রকাশ করে না, শুধু বলে বিশ্বাস নিয়ে এলে পাবেন, দু’দিন পরে কিন্তু চাইলেও পাবেন না।
‘আমি এই মুহূর্তে মত দিতে পারছি না, আগে বলেন। অনন্ত কোথায় ব্যবস্থা করবেন, তা তো দেখাবেন, তারপরে টাকা সংগ্রহ করতেও সময় লাগবে’। কিন্তু, তার কাছ থেকে সেরকম সময় নেয়ার কোন সুযোগ পায়না।
লোকটা কাজলিসহ অন্যদের বলে তোমারা আমার কাছে এসো, ও’কেও নিয়ে এসো, গেমস খেলার জন্য না, পড়াশুনার জন্য তারপরে দোকানে রওনা করে।
আমরা গিয়েছিলাম একবার বাবার সাথে আপনার মনে আছে?
হ্যা মনে অাছে, বলে দোকানে চলে যায়।
জান্নাতি তখনো ছবি অাঁকছে, সবাই চলে গেছে। লোকটা গিয়ে বসতেই, কোলে উঠে বসে। কি ব্যাপার? সর।
আপনি ও’র পিছনে পিছনে গেছিলেন, না?
কার পিছনে?
এখন আর চেনেন না, না?
তুমি ঐ চেয়ারে গিয়ে বস।
না।
সরো বলছি, বলে নামিয়ে দেয়, কিন্তু আবার উঠে বসে। কোলে বসতে হয়না, অাচ্ছা তুমি বস, আমি ঐ চেয়ারে যাচ্ছি।
না, আপনার কোলে বসব, বলে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে।
প্রতিবেশী একজন বলে, ছোট মানুষ বসতে চায় বসুক, ধমক দিলে বেপথে যায়।
লোকটা দু’হাতে আলতো করে বুকে আগলে ধরে বলে, বাড়ি যাওনি কেন এখনো?
দোকান খালি রেখে যাবো ক্যামনে, তাই।
আচ্ছা, ভাল করেছে এখন যাও।
আপনি কি ও’কে বিয়ে করবেন?
লোকটা অবাক হয়ে বলে, তাতে তোমার কি?
ও’কিন্তু আপনাকে….আপনি টাকা পান কোথায়?
মানে?
মানুষজনের কাছ থেকে নেন?
কি উল্টা পাল্টা কথা বলছ? যাও বাড়ি যাও…. যদিও মন থেকে বলছিলনা, বরং আরো কাছে টেনে নিতে চাচ্ছিল কিন্তু অত্যন্ত সুন্দর গরনের মেয়েটির আহবান যেন ও’র বয়সের অপরিপক্বতা ছাপিয়ে দূরের উচু বাঁধকেও ভেঙ্গে নিবে। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি আর ধর্ম-অধর্ম বিবেচনায় তাকে জোড় করে সরিয়ে দেয়। এরি মধ্য আরো কয়েকজন চলে আসে। মেয়েটা আবার কোলে উঠে বসে। আমি তোমার বাপও না, ভাইও না, তুমি আমার কি হও, বারবার কোলে উঠে বসছ কেন? সবাই বলে উঠে, ‘জামাই’।
চুপ।
কেন? সবাই তো ঠিকই বলেছে?
তাতে ওদের কি?
সবাই বলে, জান্নাতি রাজি!
লোকটা জিজ্ঞাস করে, সত্যি?
রাজীই তো।
তাহলে কলেমা পড়।
তুমি রাজী হলেই হবে না, তেমার বাবা-মা রাজী কিনা, তুমি আগে কয়টা বিয়ে করেছে, কারো দাবী আছে কিনা, তাও জানতে হবে। তোমার বাড়ি কোথায় বল। বলে, ঐ তো ঐ জায়গায়, ঐ বাড়ির পাশে।
আচ্ছা, তোমার বাবা-মা’কে নিয়ে বেরাতে এসো। এখন বাড়ি যাও, নাকি থাকবে?
আপনিও চলেন।
হুঁ, তোমার বাপ ধরে পিটাবে।
বজ্জাত গুলোর জন্য বলে হাটা শুরু করে।
শোন, তোমার বাবা-মাকে আমার সালাম জানাবে।
ও চলে গেলে, লোকটা দোকান বন্ধ করে রাখে কিছুক্ষণ।
বিকালে দোকান খোলতেই আবার এসে পাশে দাড়ায়, বলে সবাই রাজী।
সবাই রাজী মানে?
বাবা আসবে আনে আপনাকে নিতে।
কি সর্বনাশ! তুমি কি বলেছ তাদেরকে?
বলছি, মা’ও রাজী।
কি বলেছ তাদেরকে?
বলছি আপনি বিয়ে করতে চাইছেন?
কি? আমি না তুমি?
আগের তাও বলছি।
মানে?
আসবে আনে, উনারা চেনে আপনাকে, আপনি যা বলছেন সব বলছি।
লোকটা এবার ও’কে টেনে নেয় আর বলে তুমি অনেক ছোট, অবুঝ। তুমি যা করেছে সেরকমটা অন্যকারো সাথে করবে না, যদি কর তাহলে তোমাকে আর অাদর করব না। আমার কাছে আসতে দেব না। তোমার বাবা রাজী থাকলে তুমি আমার সাথে তোমার যা ইচ্ছে তাই করতে পারো আমি নিষেধও করবো না, আর তুমি ছোট তাই জোড়ও করব না, কিন্তু বড় না হওয়া পর্যন্ত তো তুমি বিয়ে করতে পারবে না। তোমার বাবা-মা অনুমতি দিলে, আর যদি তোমার উপর কারো দাবী না থাকে তবে তুমি চাইলে আমার সাথে থাকতে পারো। ঠিক অাছে? মনে থাকবে?
থাকবে।

ও’ বাড়ির পিছন দিকে যাচ্ছিল, লোকটা সামনে থেকে বের হয়ে ধীরেধীরে হাটতে থাকে। অনেক উৎসাহ নিয়ে বলেছিল স্কুলে যাবার কথা। ছোট মানুষ কিন্তু অনেক কিছুই শিখিয়ে যাচ্ছে লোকটাকে – সেই ছোটবেলা থেকেই। মানুষ মরে যাবে, দেহ নষ্ট হয়ে যাবে, যদি কিছু বেঁচে থাকে তা আত্মা। যে আত্মার শান্তি আসলে মনের শান্তি দ্বারাই প্রভাবিত। সেই শান্তির মাঝে কোন একটা কর্তব্যবোধ যেন সামাজিক নিয়মনীতি, সকলের অধিকারবোধ আর বাস্তবতার সাথে সমন্বয়ের তাগিদ দিয়ে একটা ব্যর্থতার কাটা হয়ে উঠেছে। যতুটুকু বেঁচে থাকা ততটুকু আত্মার শান্তি আর মনকে সতেজ আর বিজয়ী রাখাই যেন লোকটার চেষ্টা – দেহের শান্তি না হলেও যেন মনের শান্তি টিকে থাকে। কিন্তু কিছু কিছু অনিচ্ছার মুহূর্ত, অনিচ্ছায় ঘটে যাওয়া কিছু কিছু ঘটনা ফুলের দেহেও হয়ত কচুপাতায় জলের ছিটে কিন্তু নিষ্পাপ কচি মনকে লজ্জবতি পাতার মতই গুটিয়ে দেয়। মনের মধ্যে ভালবাসার প্রকাশ ঘটাতে যেন একটা সুইচ তৈরি হয়ে যায়, অতীতে তেমনটা ছিল না। ছোট মানুষ তবু অভিভাবকের মতই অনেক কিছু চাপিয়ে রাখতে পারে। অন্যদের প্রতি তার অনেক মায়া, কেউ হাত পাতলে নিজের অতি দরকারি জিনিসটাও দিতে দ্বিধা করে না, বিশেষ করে তার ভাইয়া আর মায়ের জন্য নিজের যেকেন স্বার্থই ভুলে যেতে পারে। আর লোকটার প্রতি তার ভালবাসা, তার সমর্থন, পাশে থাকার মানসিকতা আর বিপদ তাড়ানোর যে চেষ্টা তাতে সে মোটেও ছোট নয় বরং লোকটার জন্য একটা বড় বন্ধু, বড় শক্তি। সবাই লোকটার শত্রু হতে পারে, কিন্তু সে শত্রু হয় না বরং সবার বিরুদ্ধে সবকিছুর বিপক্ষে গিয়ে লোকটার জয়েরই প্রত্যাশা করে। এত ছোট মানুষ, তারপারেও মাঝে মাঝে মনে হয় সব ভুলে মনকে সামলে সেই অতীতের রূপে আবার ফিরে আসে। লোকটার মন চায় ভালবাসার আদরে ও’কে চিরকাল বুকে জড়িয়ে রাখতে। কিন্তু অনিচ্ছার মুহূর্ত গুলো ও’র স্বভাবে যে গোপন করার মানসিকতা তৈরি করে দিয়েছে তা যেন কাটা হয়ে মনের বুকে অশুরের উপস্থিতি জানান দেয়। যদিও লোকটার অন্তরের কথা সে সহজেই বুঝে যায়, আর লোকটার জয়েই যেন তার অানন্দ। কিন্তু লোকটা শঙ্কিত – তার প্রতি ভালবাসার কারণে মেয়েটাকে অন্যদের রোষানলে পরতে হয় প্রায়ই। ও’র এতটুকু কষ্টের থেকে বরং মনের অতৃপ্ত বাসনাই ভাল। ভালবাসার টানে কাটাগুলো বিলীন হতেই পারে, কিন্তু লোকটা প্রয়োজনে নিজের আত্মার শান্তির বিরুদ্ধে যাবে তবু ও’র ইচ্ছের বিরুদ্ধে না। তিন চারটে বাড়ির পরে ধুসর রঙের একটা দোতলা জংধরা টিনের ঘর। সামনে বেশ কিছু খালি জায়গা। রাস্তার কিনার ঘেষে চকচকে টিনের বেড়া। ও বের হতেই দূর থেকে চোখে চোখ। কোন গেট ছিল না, আর দু’পাশ থেকে বেড়া দু’ট এমন ভাবে তৈরি যে রাস্তা থেকে উঠোন দেখা যায় না, বা’দিকে ঘুরে চার পাঁচ কদম, তারপরে ডানদিকে মোড় নিতে হয়। ও তখন বেড়ার মাঝে ছটফট করে বের হচ্ছিল, কিন্তু থেমে গেল। লোকটা চুপচাপ হেটে যায়।
ডাক দে, চলে যাচ্ছে তো।
যাক, শখ কত, মনে করেছে উনার সাথে…..কোন লোকটার হেটে যাওয়া দেখে আর সময় নষ্ট করল না, ‘ও স্যার, যান কেন?’
লোকটা দাড়িয়ে থাকে। ও’রাও থেমে যায়।
দাড়িয়ে আছো কেন? হেটে এসো..
আপনি যান।
লোকটা ইশারায় ডাকে আর বলে সামনে মসজিদ।
তামান্না হেটে আসে কিন্তু ও কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকে। তারপর মাথা নিচু করে হেটে আসে, ততক্ষণে তামান্না লোকটাকে পিছনে ফেলে মসজিদ পার হয়ে গেল। ও কাছে আসা মাত্রই বলে, ও স্যার বলে ডাকতে হয় না, স্যার বললে আস্তে করে সম্মান করে বলতে হয়। আমি কিন্তু তোমাদের শিক্ষক না, স্যার না বললেও হবে, কিন্তু ‘ও স্যার’ বলে ডাকবে না। যাও, স্কুলে যাও, পথে দুষ্টামি করবা না।
ও’ সামনে গিয়ে দাড়িয়ে থাকে, যদিও তার সঙ্গী সামনে চলে গেছে।

একে একে অনেক স্মৃতি মনে পরে। পাশে পাশে চুপচাপ হেটে চলা বেশি দিন নয়, নানা কথা নানা বায়না, রাস্তার এপ্রান্তে ও প্রান্তে ছুটোছুটি কত কথা।
স্যার বলেন কবুল – আজকের মূহুর্তের মতই অস্থির হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল তারায় তারায় কিছু রটিয়ে দিতে চায়। বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে পাঁচ পাঁচটা মসজিদ। একটি মসজিদের পূর্ব দিকে রয়েছে ছাত্রাবাস, কবর স্থান আর টিউবয়েল। অনেকেই প্রতিদিন হেটে চলা দেখে, দেখে হাসি খুশি কথা বলা,,,,
সেদিন ঠিক সেখানটায় হঠাৎ দাড়িয়ে বলে, ‘বলেন কবুল’।
তার মানে।
ও কয়েকজন মুসুল্লির দিকে তাকালো।
তামান্নাও বলছে, বলেন।
কেন? কি বলছ তোমার।
লোকটি মুসল্লিদের দিকে তাকায়। তারা কয়েকজনে নজর ঘুরিয়ে নেয়। কয়েকজন কিশোর মাদ্রাসা ছাত্র হাসি হাসি মুখে এখনো তাকিয়ে আছে। তামান্না বলে, পাতার শীষটাও মিষ্টি।
ও’ একটা কঁচি পাতা হাতে নিয়ে মুখের সামনে ধরে, ‘বলেন কবুল’।
কি করছ এসব?
আপনি রাজি না?
কিসের রাজি?
ও পাতাটা হাতে ঘুরে যায়।
তামান্না সামনে দাড়ানো ছিল, লোকটার দিকে তাকিয়ে বলে, রাজী, রাজি বলেছে।
ওর মুখে এখনো হাসি, তবে স্থির হয়ে সামনে দাড়িয়ে বলে, এটা খেয়ে বলেন।
ওরা কয়েকজন আবার ফিরে তাকায়।
অামি কি ছাগল নাকি?
খান বলছি।
তুমি নিজে খাও তো দেখি,,,,, না, না খেতে হবে না। তুমি রাজী হলে আমিও রাজী। রাস্তার পাশের পাতা, ময়লা থাকতে পারে, খেওনা।
পাতাটা ধোয়ার জন্য টিউবয়েলের দিকে যাচ্ছে। লোকটা হাত দিয়ে অাগলে বলে, আমি রাজী তো, কিন্তু কিসে সেটা তো বল।
বোকা সাজছে, মনেহয় কেউ বুঝে না, সবাই দেখছে কিন্তু….
তামান্না দ্রুত হাটা শুরু করল। আর ও লোকটার সাথে গুটি গুটি পায়ে।
বল তুমি আমার কাছে কি চাও? কোন বিষয়ে রাজী খুশী চাও?
সব বিষয়ে।
তাহলে তো তোমাকে আমার কথা অনুযায়ী চলতে হবে।
চলি তো।
হ্যা, চল তো, তাই তো আমি তোমার কাছে।
মানে?
আগে বল তুমি রাজী কিনা?
কিসে?
সব বিষয়ে।
ইস……. রাজী রাজী।
ইস বললে কেন?
কৈ! স্যার বলেন না,,, কী, বলেন?
মানে?
রাজী-ই-ই – কোন বিষয়ে?
সব বিষয়ে।
রাজি তো। তুমি রাজি?
লোকটা হাত জাগিয়ে ছিল কিন্ত এক থাপ্পর আর বলতে পারেনি, হেসে দিয়ে বলে কাছে আসো।
কিন্তু ও দ্রুত হাটা শুরু করে।
৩০/১১/২০১৮

(২য়)
https://youtu.be/u95Dxja6OsA

“বলেছিলাম, ভীষণ কষ্ট পাবো, অনেক ঘৃণা করবো, কিন্তু দেখা হলে কি করতে পারি তা বলিনি। দু’দুবার চোখে পলক ফেলি, কতগুলো মানুষের মধ্যে থেমে যাই কিন্তু জানানোর সুযোগ পেলাম না।”
“তোমার শেষ চিঠি পেয়ে জানতে চেয়েছিলাম আবার দেখা হলে কি করবে। সে করানেই হয়ত সন্ধার অন্ধোকারে চৌরাস্তার ঠিক সেখানে অতগুলো কালো বোরখার মাঝে তোমার চোখেই চোখ পরে। বিশ্বাস কর তোমাকে চিনতে ব্যর্থ হইনি, কিন্তু চিঠিতে লিখেছিলে আর দেখা হবে না, তাই চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। শীতের সন্ধায়, কাপা কাপা শরীরে তোমার হাসিখুশি পথচলায় বিরক্ত হতে চাইনি।”
এটা ঠিক সেখানটায়, যেখানে অনেক বছর অাগে মেয়েটা লোকটাকে ডাক দিয়ে বলেছিল, “কোথায় যান? দাড়ান। বাড়ি আসেন না কেন? বাড়ি আসবেন কিন্তু”। তখন ও’র পরনে বোরখা ছিল না। দুপুরবেলা একা একা মাথা নিচু করে হেটে আসছিল, চারদিকে অনেক পরিচিত মানুষ। লোকটাকে দেখে আচমকা দাড়িয়ে যায়, এক হাতে ধরে রাখা বক্সটা যেন ছেড়ে দিচ্ছিল, আর ওড়নাটা মাথা থেকে আরেক হাতে নামিয়ে গলায় দিল। লোকটা কোন উত্তর না দিয়েই চলে যেতে চাচ্ছিল, কিন্তু মেয়েটা দাড়িয়ে থাকে। লোকটা একটু সামনে গিয়ে পিছন ফিরে বলে, আসছি এখনি, ঐ দিকেই যাব, তবে তোমার বাড়িতে না। লোকটা ও’র এই অাচমকা পরিবর্তনের কারণটা বুঝার চেষ্টা করতে থাকে।
মনে পরে মাত্র একটা দিন আগেও, ও’ নির্জন রাস্তায় লোকটাকে দেখে মাথা নিচু করে এড়িয়ে যায়। বেশ কয়েকবার ডাকলেও কথা না বলে ওড়না দিয়ে মুখ আড়াল করে চলে যায়। অথচ তার কয়েকদিন আগেও স্কুলে যাবার পথে সেখানটায় ও’ অপেক্ষা করত, লোকটাকে দেখে আনন্দে ছুটে আসত, কিছুটা পথ একত্রে হেটে চলাই যেন ও’র দাবী। পরীক্ষা শেষে নানা বাড়ি বেরাতে গিয়েছিল, কয়েক দিনের জন্য। আসার পর থেকেই কেমন যেন অচেনা, বেশ কয়েকবার দেখা হয়, কিন্তু ফিরেও তাকায় না। যাবার মোটেও ইচ্ছে ছিল না। পরীক্ষা শেষে, চলেন বলে দু’হাত তুলে সামনে দাড়িয়েছিল। নাছোড়বান্দার মত অাবদারও করছিল। লোকটাও রাজি, শুধু বলে, ‘গেলে কিন্তু আর আসতে পারবে না, আমি সাগরে ভেসে গেলে তোমাকেও ভাসতে হবে’। ও’র এক হাত লোকটার দিকে আরেক হাত তামান্না টেনে নিয়ে যাচ্ছে। লোকটার পিছনে দেয়াল আর ও’ রাস্তায় দাড়িয়ে। দুজনের মাঝ থেকে একটা মটর সাইকেল হয়ত যেতে পারত, কিন্তু তা ও’র পিছন দিয়ে চলে যায়। সেই সুবাধা কিছুটা সামনে এগিয়ে আসে। আরো কাছে টেনে নিতে লোকটা হাত বাড়ায়, ‘কাছে আসো, পিছনে গাড়ি তো’। ওমনি আরেকটা মটর সাইকেল এসে ব্রেক করে দাড়িয়ে থাকে। মেয়েটার বাড়ির কাছের বেশ পরিচিত মানুষ, বয়সে লোকটার সমান সমান। ও’র দিকে তাকিয়ে ঘার কাত করে ইশারা দেয়, যেন লোকটার কাছে আসে, পিকাপ বাড়িয়ে যেন বলতে চায় ‘কথা শুননা কেন?’ ও’ তখন চাকার সামনে, তবে অনেকটা এ পাশে। কিন্তু ঐ পাশে চলে গেল। https://youtu.be/1qK-wSpw-js তামান্না টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, ও’ আরেক হাতে পাঁচ আঙ্গুল ঘুরিয়ে ইশারা করছিল, আর বলছিল, ‘কাল থেকে কিন্তু আর পাবেন না’। লোকটা ‘দাড়াও’ বলে পা বাড়াতেই ও’ তামান্নার হাত ঝেড়ে দ্রুত হাটা শুরু করে, পিছন ফিরে আর চেয়েও দেখেনি। বিরক্তিতে দু’হাত ছেড়ে আবার একটা ঝাকি দিয়ে মানুষটা বাইক নিয়ে চলে যায়। প্রতিকূল রাজনীতির ধারায় হওয়া সত্বেও পরবর্তীতে এলাকার মানুষজন তাকেই কাউন্সিলর নির্বাচিত করেছিল। আর ও’র কাকা হেরে যায়। এটা মেয়েটারও জানা ছিল, শুধু নিজেদের না, বরং যারাই দু’জনকে একত্রে দেখত, তাদেরই মন ভাল হয়ে যেত। কিন্তু, সত্যিই কয়েকদিন পরে তামান্না লোকটাকে বলে, ‘হেই মিয়া, আপনি কোথায় ছিলেন, ও’ নানা বাড়ি চলে গেছে, যেতে চাচ্ছিল না, কত কান্না করছে’। লোকটা সেখানে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়, কিন্তু কিছু কিছু পথের কুকুর যেমন বীনা অনুমিতেই বিরক্ত করে, গা ঘেঁষে দাড়ায় তেমনি কিছু বখাটে লোকটার জীবনে ঢুকে পরে, নানা বাড়ি যাবার বদলে ঘটনাক্রমে উল্টো তাকে হাজতবাসী হতে হয়।

সেদিন বেরাতে নিয়ে না যাওয়া, নাকি ওভাবে চলে আসতে দেয়ায় ও’ রাগ করেছিল; নাকি অন্যকোন কারণ! যা হোক ও’র সেই আচমকা পরিবর্তনের কারণ বুঝার দরকার নেই। ও’র আমন্ত্রনে সাড়া দেয়াটাই জরুরী। ও’সেই মানুষ যে জীবনে সব থেকে বেশিবার আমন্ত্রণ করছে – চিন্তা করতে করতে লোকটা দ্রুত ফিরে চলে আসে।

তবে, এবারে অবশ্য একদিন নয় অনেক দিন অনেক কথা বলে আসা। রাস্তায় দাড়িয়ে আচমকা যখন বাড়ি যেতে বলে, তখন বেশি কথা বলা যায় না। এবার ফোনে, অালাপ, তাই অনেক কথা, অনেক অভিযোগ। সব বিচারেই লোকটা একাই দায়ী, তাকে কোন ভাবেই দায়ী করা যায় না। ‘তিন চার বছর একটা মেয়ে একা থাকে কিভাবে, আপনি কোন খোঁজ না নিয়ে পরলেন কিভাবে?’ ‘আমি কত জায়গায় কতজনকে জিজ্ঞাস করেছি? অনেক বলেছে মরে ভুত….. ‘ ‘মোাবাইলও করেছি, বলে, ‘চিনিনা”। ‘আপনি সত্যি ভাল অাছেন স্যার।… ‘ ‘আমি আংটি নিতে চাই না, ও’রা দু’একদিনে নাকি চলে আসবে।’ ‘আপনি কিছু বলেন। আজকেই চলে আসেন’। ‘আমার আঠারো বছর এখনো হয়নি, কাকা নির্বাচন করছিল তাই বয়স বাড়িয়ে ভোটার করেছে’। ‘আপনি এখনো বিয়ে করছেন না কেন?’ ‘আমি উনাদের আংটি নেব না, আমি কোনদিন বিয়েই করব না’। ‘আপনি আসেন….’। ও’র একেকটা কথা, একেকটা অভিযোগ শুনে লোকটা প্রথম দিনই বলেছিল, ‘আমার এখন কি করতে হবে? তুমি যা বলবে আমি তাই করব, আগেও বলেছিলাম, তুমি আমার মালিক, তুমি যা বলবে আমি তাই করব।’ তারপরে অনেক ফোন, অনেক কথা, অনেক অভিযোগ।

লোকটা দ্রুতই চৌরাস্তায় ফিরে এসেছিল, কিন্তু ও’ ততক্ষণে চৌরাস্তা থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিল, ডাক দিয়ে পৌঁছানো সম্ভব হত না। লোকটা যখন ও’দের বাড়ি পৌঁছে, দেখে ও’দের ঘর তালাবদ্ধ। কিছুক্ষণ বসে থাকে, আশেপাশে কেউ নেই। বেড়ার ওপাশে ফিসফিস কথা। একটু সামনে গিয়ে দেখে তামান্নাদের উঠানে তামান্না আর ও’ মোবাইলে কিছু একটা দেখছে। ছি ছি বলে ও’চলে আসতে চায়। কিন্তু তামান্না আটকে রাখে। লোকটা দূর থেকে ডেকে বলে, দাওয়াত করে ঘরে তালা ঝুলিয়ে রেখেছ কেন?
কে দাওয়াত করেছে? তামান্নার দিকে তাকিয়ে বলে, আমি নাকি উনাকে দাওয়াত করেছি! যান যান, আপনাকে লাগবে না।
আগে এদিকে আসো, সামনে এসে কথা বল।
ও’ চুপ করে থাকে, দেখি দেখি বলে মোবাইলটা হাতে নিতে চায়। কিন্তু তামান্না মোবাইল বন্ধ করে, ‘তুই যা। মোবাইল ধরছি জানলে আব্বু একদম….’
ও’ তামান্নাকে আস্তে করে বলে, দেখ বলদটা দাড়াইয়া আছে, ঘরে যাইয়া চুপকরে বসতে পারে, তা না। লোকটার দিক তাকিয়ে বলে, আপনি আসছেন কেন? যান।
লোকটা প্রচন্ড ক্ষেপে যায়, না পারছে অন্য বাড়ির উঠনে পা রাখতে, না পারছে চলে যেতে।
তামান্না বলে, স্যার, আপনি ওদের বাড়ির সামনে যান, ও’ চাবি নিয়া যাচ্ছে, দরজা খুলবেনে।
লোকটা সামনে গিয়ে আবার সিঁড়িতে বসে।
ওড়নার ঘোমটায় মাথা মুড়িয়ে স্যা স্যা করে এসে তালাটা খুলে আবার চলে যায়। লোকটার মন চায়, থাবা দিয়ে ও’কে ধরে একটু জব্দ করতে, কিন্তু চুপ করে বসে থাকে। এক মিনিট যেতে না যেতেই ও’ আবার আসে, একনজর তাকিয়ে ঘরের পিছনে চলে যায়। মোবাইল হাতে তামান্না পিছন পিছন এসে লোকটার সামনে অনেকটা দূরে দাড়িয়ে থাকে। অনেকক্ষণ কোন সাড়াশব্দ নেই। লোকটা গম্ভীর গলায় বল, ‘ও’ কোথায় গেল? দেখ তো কি করছে?’
ও’র কাছে আপনার এত কি?
এইপ, ও’র কাছে কী, তা তোমাকে বলব কেন? ও’কে ডাক।
আসবে আনে।
এতক্ষণ কি করছে বলে, দরজাটা ধরতে যায়।
তামান্না জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বলে, স্যারে কপাট খুলল কিন্তু।
এরি মধ্যে ভিতর থেকে দরজায় খিল দেবার আওয়াজ।
ও’ এখানে? দরজা খুলছ না কেন, তুমি একা একা কি করছ ভিতরে?
তামান্না বলে, আসতেছে একটা লাল জামা পরে, ঠোটের কাছে হাত নিয়ে ইশারায় বলে, ঠোটে লিপিস্টিক লাগাচ্ছে।
তাই? লোকটা দ্রুত দরজায় ধাক্কা দিবে করে, কিন্তু,
এই এই বলে তামান্না ও’কে সতর্ক করে, ‘জামা এখনো….’
ভিতর থেকে দরজা চেপে ধরে। খিল দেয়া তবে একটু জোড়ে চাপ দিলেই খুলে যেত।
এর মধ্যে হর্ণ দিয়ে একটি বাইক থামে, স্যার, চলেন বাজারে যাই।
যাবো, একটু পরে।
পরে আবার হেটে আসবেন কেন? আমার সাথেই চলেন।
সমস্যা নেই, ওদের সাথে একটু কথা বলছি। রোদ কমলে দেখি হেটে হেটে আসব।
সাইজ্জা ভাবি ঘরে? স্যারে বাইরে বসে আছে, দুয়ার খুলতে বল, বলে ও’র কাকা চলে যায়।
লোকটার কাছে মনে হয়, তিন জনেই হয়ত অন্যকোন জগতে সময় কাটাচ্ছিল। সব ভেঙ্গে আবার রৌদ্র, রাস্তাঘাট, লোকজন।
পিছনের দরজা থেকেই বের হয়ে এলো। ভাজ করা জামা পরতে সময় বেশি, তাই হয়ত পুরনো জামাটাই গায়ে, লিপিস্টিকও মুছে ফেলেছে কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।
কাছে এসো,
আপনি এখনো যাননা কেন?
কোথায়?
কোথায় যাচ্ছিলেন- ঐ দিকে, ঐ দিকে, ঐ দিকে, যান…
তুমি আমাকে পাগোলের মত ভালবাস? তাই না?
বড় বড় চোখে, এক হাত থাপ্পরের ভঙ্গিতে, কিছু না বলেই ঘুরে যাচ্ছিল, একটু থেমে যা-আন বলছি…
‘দাড়াও’ বলে লোকটা উঠে দাড়ায় আর বলে, মানুষজন আমাকে সম্মান করে, তাই; নইলে তোমাকে দৌড়ে ধরতাম।
ইস, উনি নাকি আমাকে ধরতে পারবে।
তামান্না বলে, ধরেন তো।
ইস, তুমি ও’কে ধরে নিয়ে আসো।
ইস, আমার ঠেকা পরছে বুঝি?
তোমার মোবাইলটা দেখি।
কি করবেন?
তোমরা কি করতেছিলে।
‘তামান্না’ দিস না।
‘তোর মোবাইল?’ বলে তামান্না লোকটার কাছে এগিয়ে আসে। কিন্তু মোবাইল না, দিয়ে বলে, আপনার মোবাইলে নাটক আছে, স্যার?
ও’ দূরে দাড়িয়ে বলে, নাটক না, নাটক না, সাপের ছবি।
তোমার সাথে আড়ি, তোমার কথা আমরা শুনব না।
ও’ মন খারাপ করে একা দূরে দাড়িয়ে থাকে।
কিছুক্ষণ পরে তামান্না বলে, ঠিকই তো। স্যার তো ঠিকই বলছে, তুই পাক্কা মেরে কথা বল কেন? তোর সাথে, স্যারের আড়ি। মোবাইলটাও লোকটার হাতে দিচ্ছে। এবার সত্যি কেঁদে ফেলবে বুঝি। হঠাৎ ফন ফন করে হেটে পিছনের দরজা দিয়ে ঘরে চলে যায়। ড্রয়রের মধ্যে কিছু একটা খোঁজ করছে। কিছুক্ষণ পর লোকটা তামান্নাকে বলে, দেখ তো কি করে।
এই, তুই আবার গলায় দড়ি দিস না।
লোকটা ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্ত হয়ে, এক থাপ্পর দিব বলে তামান্নাকে বকা দেয়, ‘আর কখনো এরকম দুষ্টামি করবে না’।
ও’ ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণ চুপ করে দাড়িয়ে থাকে। তারপরে, এসে বলে, স্যার আমার কাছে একটা মেমোরি কার্ড আছে, একটু দেখবেন ভাল কিনা? – কোন হাসিও নেই, চোখের দিকেও নজর নেই -যেন স্কুলের কোন রাগি শিক্ষকের সামনে দাড়িয়ে।
লোকটাও আবারো কাছে ডাকতে গিয়ে ডাকল না, বলল, ‘কার?’
পরে পাইছি।
তাহলে ওটা ভাল না।
একটু দেখেন।
নষ্ট তাই কেউ, ফেলে দিয়েছে। ওটা আমি দেখব না, ফেলে দাও।

মনে হল শেষ চেষ্টাটাও ব্যর্থ। খুব অপমানিত হয়েছে, এতটাই কষ্ট পেয়েছে যে রাগ পর্যন্ত করল না। আস্তে করে কার্ডটা মাটিতে ছেড়ে দিল। লোকটা চোখ তুলে একনজর তাকাল। কিছুটা ভয় পেয়ে যায় লোকটা, খুব বেশি আঘাত পেয়েছে। কিন্তু ও’র যে ভালবাসা তা কখনো হার মানবার নয়। কিছুক্ষণ পরে বলে, স্যার তাহলে, আপনার মেমোরিতে একটা সাপের ছবি নিয়ে আসবেন।
ছোট মানুষ সাপের ছবি দেখবে কেন, ঠোকর দিবে।
না, আমি না।
তাহলে?
মা, চাচি উনারা দেখবে।
আচ্ছা।
কি? আনবেন?
উনারা বললে আনব। এখন তুমি বল তোমার কি লাগবে।
অনেক্ষণ পর, একটু হাসি দিয়ে বলে, কিছু না। মিটমিট করে হেসে বলে, আচ্ছা, তখন দরজা ধাক্কা দিচ্ছিলেন কেন?
কখন?
এই যে, সে সময়?
ভিতরে যাবার জন্য।
তাইলে এখন যাচ্ছেন না কেন?
এখন গিয়ে কি করব, এখন তো তুমি বাইরে?
তাইলে তখন যাচ্ছিলেন কেন।
লোকটা এবার চোখ তুলে তাকিয়ে বলে, তুমি কাছে আসো তো।
কেন?
আসো বলছি।
কাছেই তো আছি।
ও’ সামনের সিড়িতে বসা, লোকটা দাড়াতেই ও’ উঠে হাসতে হাসতে একটু দূরে সরে সরে যায়।
আমি কিন্তু এবার সত্যি সত্যি দৌড়ে ধরব।
তামান্না ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু, ও’রা দু’জনেই চলে যায়।
কিছুক্ষণ পরে, পিছন দিয়ে এসে হঠাৎ করে ও’ পাশে বসে। হয়ত সেই রাজ্যেই রওনা করেছিল। কিন্তু হঠাৎ যেনে রাস্তা থেকে ছিটকে পরে। এক হাত ও’র কাধের উপরে অাগলে দিতে লোকটা হাত জাগায়, আর বলে, এবার বল তো, তুমি আমাকে….. এরি মধ্যে আরেকটি বাইক এসে পরে – ও’র আরেক কাকা; ‘চলেন বাজারে চলেন। সন্ধার সময় একা একা কি করবেন? ও’র মা’ কখন আসে ঠিক নাই’।
লোকটা দাড়িয়ে ও’কে ‘মা কখন আসবে’ জিজ্ঞাস করতেই, ‘ওই তো ঐ বাড়ি গেছিল, এখনি আসবে। আপনি বসেন’।
হেই! সন্ধার সময় ঘরে বসে থাকবে কেন? খাওয়াইছ কিছু?, এতক্ষণ বসাইয়া রাখছ যে?
মা’য় আসুক।
তার দরকার নাই, তুই তোর বুবুর ঘরে যা। স্যারে যাবেন নাকি থাকবেন?
ও’ পিছন ফিরে হেটে যায়। আসলেই কি খুব ধীরজ। হাস-মুরগি তো না, মানুষ; কিছুটা সময় তো লাগবেই। তবে, সেই রাজ্যে একবার পরিচয় ঘটলে হয়ত ভিন্ন কথা, কিন্তু ভালবাসা নিয়ে সেই রাজ্যের সাথে পরিচিত হতে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু পথ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল দু’জনেই। লোকটাও, বাজারে রওনা দেয়।
রাত তখন ১০টা, বাজারে রাখালের সাথে দেখা হয়েছিল। বাড়ি যাচ্ছে। বলেছিল, মা তো বাড়ি নেই, সকালে পশ্চিম কান্দা আত্মীয় বাড়ি গেছে, রাতে আসতে পারে, নাও আসতে পারে।

সেদিন, সেদিন আঙ্গুলটা জাগিয়ে যখন শক্তকরে বেঁধে দেবার জন্য বলছিল, তখনও লোকটার কাছে এটা স্পট ছিল যে, আদর না বরং একটূ বেশি ব্যথার অনুভুতিই যেন ক্ষুধা। লোকটাও হয়ত বুকের খা খা ভাবটা ও’র অাঙ্গুলের উপর কষে দিতে পারত, কিন্তু তাতে হয়ত ও’ নিশ্চিত বুকের উপর ঢলে পরত। বুকে বুকের অাকুতি অনুভব করে কিন্তু তারপরেও একেবারেই আলত করে বেঁধে দেয়। সেদিন মাঝরাতে হঠাৎ করে সত্য কিছু বলতে গিয়ে মিথ্যা কেন বলেছিল? বাড়িতে আসার পরেও, অভিযোগের বিষয়টা কেন ভুলে যায়, তা তো ভুলে যাওয়া সম্ভব না। ভালবাসার ঘাটতি, অবিশ্বাস নাকি এখনো সেই অাস্থার অভাব? লোকটা তার আপন জনের কাছে যে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়, তাতে অন্যদের কিছু যায় আসে না, কিন্তু মেয়েটার কাছে হয়ত চিরকাল অাস্থাহীন হয়ে থাকবে।
এতরাতে ফোন করেছ কেন?
খুব খারাপ লাগছে।
কেন কি হয়েছে?
তুমি আসবে কবে?
কি হয়েছে তা তো বল।
বললাম তো।
তুমি এরকম করছ কেন, বল তো কি হয়েছে? ঘুম আসছে না?
ঘুমাচ্ছিলামই তো।
তাহলে, স্বপ্ন দেখেছ?
না। ভাল লাগছে না, তুমি আসতে পারবে?
মাথাটাতা ঠিক অাছে?
না সব নষ্টা, বাড়ি থেকেই বের হয়ে যাব, দেখবেন।
তাহলে চলে আসো।
হাসি দিয়ে বলে, কিভাবে আসব?
সকালে বাসস্টান্ড গিয়ে টিকিট করে, বাসে উঠবে, চার-পাঁচ ঘন্টার মধ্যে চলে আসবে। এবার বল কি হয়েছে? মন খারাপ কেন?
মনখারাপ না। কপালই খারাপ।
কি অাজেবাজে কথা বলছ।
স্যার, সত্যি বলছি। আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।
আবার বললে? আচ্ছা ঠিক আছে, বিয়ের পরে তো যেতেই হবে।
কোথায়?
শশুড়বাড়ি যাবে না?
আমার কোন শশুড়বাড়ি নাই, আর হবেও….। আচ্ছা ঠিক আছে আপনি ঘুমান।
রাগ করছ? কি হয়েছে বল, ঘুম ভাঙ্গল কিভাবে?
আপনাকে বললে কি হবে?
আমি আসবো?
আসেন তো দেখি, আসতে পারবেন?
এই তো, এখন বল ঘুম ভাঙ্গল কিভাবে?
নিচে ঘুমাচ্ছিলাম…….., স্যার অামার ভালোই লাগছে না, মনেহয় এখনই ঘর থেকে বের হয়ে যাই – বলতে বলতে ও’ মোবাইল হাতে দু’এক পা হেটে গেল।
কি পাগলামী কথা বলছ, তুমি এখন কোথায়?
বাড়িতে।
বুবুর ঘরে নাকি তোমাদের ঘরে?
আমাদের ঘরে।
আর কে অাছে?
সবাই।
তুমি যে কথা বলছ, তোমাকে বকবে না?
বকুক।
তোমার মা’ কোথায়?
নীচে, ঘুমায়।
তুমি কি উপরে একা?
হুঁ।
একা একা ভয় করে না? মায়ের সাথে ঘুমাতে পারো না?
নীচেই ঘুমাইছিলাম, কিন্তু ভাইয়া এসে ঘুম ভাঙ্গানো শুরু করছিল।
ভাইয়া ঘুম ভাঙ্গাইছে? এখন কোথায় ভাইয়া?
জানিনা।
ভাইয়ার সাথে রাগ করছ? ঘুমাচ্ছে? আমি কথা বলব?
আমি নিচের খবর জানি না।
আচ্ছা বেশ ভাল। তুমি কি প্রতিদিন উপরে একা ঘুমাও?
না, বুবুর ঘরেই তো থাকি।
আজকে ঘরে ঘুমাচ্ছো?
আজকে ভাইয়া……..থাক স্যার আপনি ঘুমান। আপনার ঘুম নষ্ট করলাম।
একদম বকা দিব কিন্তু, আমি রাতে ঘুমাবো না, তুমি বল, কি হয়েছে।
কি?
ভয় করে?
করছিল, এখন করে না।
কেন?
এখন তো তুমি আছো!
তাই? আচ্ছা ঘুমাও।
না।
কী না?
আচ্ছা, তুমি আসবে কখন, বল?
আমি তো সাথেই আছি।
কথায় কথায় ঘুমিয়ে কাটায়, সকাল হয়ে যায়, ফোন কেটে মেসেজ পাঠায়, গুড মর্নিং।
সকাল এখনো হয়নি, আবার ঘুমাও – কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে ও’র মোবাইল বন্ধ হয়ে যায়।
কিছু সময় পরে লোকটা রাখালকে ফোন করে বিস্মিত হয়। আমি তো বাড়ি নেই, গতকাল দুপুরে, ঢাকা এসেছি।
বাড়িতে কে আছে?
সবাই?
মানে তোমার বাবাও?
না, উনি তো বাড়ি থাকে না।
তাহলে, তোমার মা’ আর বোনদের ভয় করে না?
না। লোক অাছে তো।
কে?
আছে চেনবেন না, আপনি।
চিনব না কেন, তোমার আত্মীয় না বন্ধু? তোমার সব অাত্মীওদেরকেই তো চিনি।
ও’কে চেনবেন না। আমার অফিসে কাজ করে।
এরকম অপরিচিত লোকের উপর ভরসা করা কি ঠিক?
অসুবিধা নেই। পরিচিত, কেন, কিছু শুনছেন নাকি?
হ্যা, কিন্তু তাতে তো তোমার বাড়ি থাকার কথা, জেনে ছিলাম তুমি বাড়ি আছ।
লোকটা আবার মেয়েটাকে ফোন করে, কিন্তু মোবাইল বন্ধ। বিকেল পেরিয়ে রাত পেরিয়ে পরেরদিন সকালে মোবাইল খুলে কিন্তু কল রিসিভ করে না। সন্ধার দিকে ফোন রিসিভ করে শুধু এতটুকুই বলে, আপনি আর আমাকে ফোন করবেন না, আমিও আপনার ঘুম নষ্ট করব না। মনে থাকে যেন।
লোকটা রাখাল আর ও’র মায়ের সাথে কথা বলে কয়েক বার, ও’র কথা জানতে চায়, ‘ এখন কোথায়?’ বলেছিল, ও’ বুবুর ঘরে থাকে।

লোকটা নিজেই চেয়েছিল, প্রশ্ন তুলবে, সবার সামনে ও’কে বিব্রত করাটা ঠিক হবে না। তাই চেপে যায়। তাছাড়া ও’দের দু’জনের কথাবার্তায় বৈরীতা নয় বরং ঘনিষ্ঠতাই স্পষ্ট হতে থাকে।
লোকটা তারপরেও কাছে ডাকে, ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি পরছে, এসো শক্ত করে বেঁধে দেই। মেয়েটাও কাছে আসে কিন্তু, কিন্তু কিছুক্ষণের স্বর্গীয় আনন্দের লোভে লোকটা ঘৃণিত পশু কিংবা ণড়কবাসিদের সাথে মিলে যেতে চায় না। সবাই জানে, বিচারে যখন মানুষ মরে তা মহৎ দায়িত্ব পালন, কিন্ত হত্যাকান্ড অত্যন্ত ঘৃণিত। কিন্তু ও’ মিথ্যে কেন বলল? সেডিউসমেন্টের অভিযোগ তুলে কোন নারি যদি আবার সেই সেডিউসরের সাথে ঘনিষ্ঠ থাকে, তা সবাই মেনে নিতে পারে না। অাসলেই কি সেডিউসমেন্টর অভিযোগ ছিল? নাকি অন্যকিছু? ধর্ম অধর্মের নানা প্রশ্ন লোকটাকে আটকে ফেলে। তাছাড়া, ও’ মানুষের হাতে ভয়ংকর জখম দেখেছে, ইমোনও বেঁচে নেই, মা’য়ের পছন্দের সেই জামাইয়ের কথাও ভোলেনি – একারণে কি ভালবাসার অাগুনে মুছে দিতে চায় সোহাগরূপী ছায়াগুলো? কিন্তু, ভালবাসা তো পাওয়ার ষ্টেশনে গাড়িতে তেল ভরার মত বিষয় না। ধর্ম-অধর্ম – সবথেকে বড় কথা ভালবাসা থাকে; বিরামহীন ঝর্ণা ধারার মত।
তার বয়স বেশি না। কথাই বলেনি, প্রথম প্রথম। ঘুম থেকে উঠেই নামাজ, গোসল, গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে-সবকিছু নিয়ম মাফিক। বারান্দাতেই ঘুমায়। ঘরে মহিলারা থাকলে অনন্যোপায় একা একা বৃষ্টিভেজা মাটিতে সিজদা দিয়ে নামাজ পড়ে।
মা’বলে, বারান্দায় আরেকটা বিছানা আর ফ্যান কিনতে হবে, রাখালকে বলেছি।
কেন?
ও’ই ছেলেটার জন্য।
এতদিন কোথায় ছিল?
এতদিন তো এই বিছানায় রাখাল আর ও থাকত।
আপনারা কি উপরে থাকতেন?
না, মধ্যের রূমে, আর উনি উপরে। কেন?
আগে তো সবাই উপরে থাকতেন, রাখাল আর ‘সফি’ ভিতরে থাকত।
‘সফি’ আছে নাকি? কবে চলে গেছে। কয়েক মুহূর্ত বিরাম নিয়ে বলে, উপরে একদম গরম থাকা যায় না।
হ্যা, তা তো হবেই। কিন্তু ও’ থাকে কিভাবে?
কিছু কিছু মানুষ বুঝি মায়েরও হিসাবের বাইরে থেকে যায়। ও’র মা মেহমানের কথা চিন্তুা করছে, কাজের ছেলের জন্য ফ্যান কিনছে অথচ নিজের বড় মে অসহ্য গরমে দিন কাটাচ্ছে। সোজা হয়ে দাড়ালে হয়ত মাথার উপরে একফুট, তারপরেই উত্তপ্ত টিন।
হঠাৎ করে মনে হল মহিলা কেঁপে উঠল, মাথা আর চোখে একটু ঝাকুনি। একটু শান্ত হয়ে ছটফট করে বলে, উনার গরম লাগে না, গরম লাগলে এততদিন বলত না, কখনো ছ্যামরি বলেই নাই…।
রাখালরা এখানে থাকুক, আপনি বরং ও’কে একটা ফ্যান কিনে দিন। আমি তো আগে জানতাম না, অামি বরং আজ থেকে বাইরে … বলতেই পর্দার আড়ালে ও’র চোখে চোখ পরে যায়। এই মাত্র ঘরে ঢুকেছে। বলে, ‘আপনি কিন্তু কোথাও যাবেন না, স্যার’। ও’র মা ও’র কথা শুনে ভিতরে চলে যায়, যাবার অাগে পিছন ফিরে বলে, ‘আপনি কি বাড়িতে যোগাযোগ রাখেন? আপনার মা’ কেমন অাছে, আসতে বলেন একদিন’।
এবার যখন ফোনে বারবার করে ও’ অাসতে বলছিল, তখন লোকটা বলেছিল, আমি কিন্তু তোমাদের বাড়ি থাকব না।
কেন?
মনে নেই? কি করতে?
কি?
আমাকে বারান্দায় রেখে, দরজা বন্ধ করে দিতে।
আমি কি করব, তখন তো ছোট ছিলাম।
জানতাম, ছোট ছিলে। মিথ্যা বলবে না, তুমি ছোট ছিলে ঠিকই, কিন্তু অামি শুনেছি, আমাকে বুড়া বুড়া বলতে অথচ আমার থেকে কম বয়সের, আমার থেকে বুড়াদের সাথেও একবিছানায়…….
আমার দোষ দিবা না, অামার কি দোষ? তুমি আসো। আর সেরকমটা হবে না।
কি হবে?
ভুলে গেছ?
কী?
বললাম দেখি?
কি বলেছ? আবার বল।
গতকাল কোথায় ঘুমাইছিলে?
কোথায় আবার, এইখানে।
পাশে কে ছিল?
পাশে আবার কে? আমি তো একা থাকি?
তুমি স-অব ভুলে গেছ? তোমাকে ঘরে ঢুকতেই দেব না।
কেন?
আমার পাশে এইখানে একজন ছিল।
তুমি কোথায়?
তোমার বুকের মধ্যে।
ও, আচ্ছা সেই কথা? ছিল বলছ কেন? এখনও তো আছি!
স্যার আমার কেমন যেন লাগে, খুব অস্থির লাগে, আপনি না এলে, বলেন আপনাকে আর কোনদিন ফোন করব না।
এলে তো আবার সেই বারান্দায়…..
আপনি উপরে ঘুমাবেন,
কোথায়?
আমার বিছানায়, কতবার বলেছি আর কি বলব।
কিন্তু,…. https://youtu.be/HD4IBjdohjM

৭/১২/২০১৮

আসার পরে কয়েকটা দিন কেটে যায়, একই সময় ঢাকা থেকে তিন চারটে ছেলে বেরাতে আসে। সুযোগ করে কথা বলতে পারত হয়ত, কিন্তু মুখে কোন কথা না বলে শুধু ইশারা। চলে যেতে চাইলে নিষেধ করে কিন্তু অন্য কেউ উপস্থিত হলে, যেন কিছুই জানেনা। সেই নামাজি লোকটাও চুপচাপ, মেহমান গেলে দু’একটা কথা বলে। ‘স্যার, ফজরের নামাজের সময় ডাক দিয়েন।’
আমি? আমি তো নামাজ পড়ি না।
এটা কেমন কথা? মুসলমান না?
মুসলমানের ঘরে জন্ম, কিন্তু নামাজ পড়ি না, আমার ধর্মীয় বিশ্বাস ভিন্ন।
মানে?
আচ্ছা, এসবের মানে বুঝতে হবে না। তুমি কি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়?
হ্যা, নামাজই তো আসল। এসব কিছুই সাথে যাবে না, কিন্তু নামাজ যাবে। আপনি নামাজ পড়েন না, এটা তো মানা যায় না।
মানার কথা বলছি না, প্রতিদিন নামাজ পড়লে, আজ আমাকে কেন ডাকতে বললে?
বললাম যদি আপনি উঠেন, আপনি না পড়তে পারলেও আমাকে জাগিয়ে দিয়েন। তাতেও সোয়াব অাছে। একটু সময় নিয়ে বলে, আমারই উঠতে কষ্ট হয়, অনেক সময় দেরী হয়ে যায়।
তেমনটা আমি করিনা, আমার সোয়াবের কথা চিন্তা করতে হবে না, তুমি তো বললে, শুধু নামাজই সাথে যাবে, তোমার নামাজ তুমি প্রতিদিন যেভাবে কষ্ট করে পড়, সেভাবেই পড়।
কিন্তু আপনি নামাজ পড়েন না, এটা মানা যায় না, সমস্যা কি?
মানতে হবে না। রাখাল কি নামাজ পড়ে?
উনারে আমি কি বলব, কাকিই ডাক নেয় না।
বুঝলাম।
কি?
সবাইকে সবাই বেশি ডাক নিতে পারে না, তাই না?
স্যারে কি যে বলেন। আপনি কোন জায়গার বয়াত হয়েছেন যে নামাজই ছেড়ে দিছেন?
কোন জায়গার বয়াত না, এটা আমার নিজের ব্যাপার।
আপনি শিক্ষিত মানুষ ডাক নেয়া যায় না, কিন্তু ‘বেনামাজি’ কেউ মানবে না।
সবারই ধর্মের দাওয়াত দেবার অধিকার আছে কিন্তু বাধ্য করার অধিকার নাই।
এটা ঠিক না, নামাজ পড়তেই হবে, আপনি বড় বড় আলেমদের জিজ্ঞাস করে দেখেন।
বেশি ডাক নেয়া ঠিক না, সবাইকে তো আর জান্নাত/বেহেশতে নিতে পারবে না, সর্গেও যাবে, নরকেও যাবে। মন্দ কজা, ভুল কাজ, অন্যের অনিষ্ঠ, অন্যায় পাপ না করলেই হয়।
নামাজ না পড়াটাই সব থেকে বড় পাপ, এর থেকে বড় আর পাপ হয়?…. বলে নামাজি লোকটা উঠে যায়।
এই গ্রামে এরকমই একজন মাদ্রাসা ছাত্রকে মাত্র দশ বছর আগেও লোকটা বলেছিল, আমার দৃষ্টিতে পাপ দু’প্রকার। একটা শুধুমাত্র বিধাতার সাথে আর আরেকটা অন্যদেরও ক্ষতি করতে পারে। প্রথমটা দয়াবান আল্লাহ্ চাইলেই মাপ করতে পারেন, কিন্তু দ্বিতীয়টা করবে বলে মনে হয় না, যতক্ষণ ক্ষতি পূরণে যথাযথ ভাবে ত্যাগ না করা হয়। পরীক্ষা কে ভাল দিল সেটা হচ্ছে বিষয়। পরীক্ষার সময় কেউ ভুল লিখতে থাকলে, তাকে বলা ঠিক না যে তুমি ভুল লিখছ, ভুল লিখতে পারবে না। দাওয়াত দেয়া ভাল, কিন্তু জ্ঞান-বুদ্ধি সবারই থাকে, নিজ নিজ জ্ঞান বুদ্ধি আর চেষ্টায় যে যেমন করবে তেমন ফল পাবে। পরীক্ষার হলে ভুল শুদ্ধ করে সঠিকটা লিখতে বললে শিক্ষকের কি হতে পারে, বুঝ? আবার নিয়মিত স্কুলে গেলেই যে সবাই পাশ করবে, তেমনটাও ঠিক না।
লোকটা নামাজি লোকটাকে বলে, দুনিয়াতে অনেক ধর্ম আছে, সব ধর্মের কথা জানিনা, কিন্তু তোমাদের অনেক কিছুই অামার কাছে ভুল মনে হয়।
কয়েকটা দিন যেতেই একটা বিষয় লোকটার নজরে আসে, নামাজী খেতে বসে চামচ দিয়েই ভাত নেয়, কিন্তু প্রতিবারই প্লেটে ভাত নিয়ে নিজের প্লেট থেকে হাতে করে একমুঠো ভাত উঠিয়ে আবার বড় ডিসে রাখে, যেখানে পরিবারের অন্য সবার অন্নও থাকে। লোকটার কাছে মনে হয় অবশ্যই তার কোন বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। সে যে ছুঁত না বুঝে, না মেনে, হারাম-হালাল বিবেচনা করা দলের লোক তা তো স্পষ্ট। কিন্তু ছুঁত লাগাচ্ছে কেন? হঠাৎ করে তার উদ্দেশ্যটা কি? নাকি সে সেই দলের লোক, নাকি সেই কিছিমের যারা অনেকে একত্রে একই প্লেটে খাওয়া পূণ্যের কাজ বা মিলমহব্বতের কাজ মনে করেন। মিলমিশ তো অবশ্যই, তা মানতেই হয়। কুকুরগুলো যখন একত্রে কোন মরা প্রাণী খায় তখন প্রায়ই ঝগড়া করে। কিন্তু তাদের মধ্যে অবশ্যই সেই পাশবিক অাচরন হয়ত নেই।

পরে একদিন, কাক্কু কি খেয়েছেন? – সুরেলা কন্ঠে জানতে চায়, বলে, আপনি তো দেখি পরেজগার মানুষ, সবই ঠিক অাছে, নবীর সুন্নতও মেনে চলেন, কিন্তু নামাজটা পড়েন না – এটাই তো খারাপ। শিক্ষা দীক্ষাও ভাল, তবে নামাজ না পড়লে কিছুই মানা যায় না।
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। সে নিশ্চিত বেয়াদবি করছে। তারপরেও লোকটা কিছু বলছে না, উত্তর গুলো বাড়ির লোকদের জানা আছে, তাই অপেক্ষা করে ও’দের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য। সে আবার জানতে চায়, খেয়েছে কিনা।
লোকটা বলে, আমি তো তোমার কাক্কু না।
তাহলে?
কিছুই না। ‘কাক্কু’ বলে কেন ডাকছ? কেউ ডাকতে বলেছে?
তাহলে কি ডাকবো?
কিছুই ডাকতে হবে না। তোমার মালিকরা তো সেরকম কিছু ডাকে না, তাই না?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, তাদের কথা আমি কি বলব। আমি মানতে পারি না, যেই হোক, যত শিক্ষিত হোক বেনামাজির সাথে থাকা যায় না।
এর মধ্যে রাখালও আসে, কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, স্যারে কি খেয়েছেন?
না।
ততক্ণণে, নামাজি টা একমুঠো ভাত তুলে রাখল।
রাখাল বলে, স্যার আসেন খেতে বসি।
খাওয়া কি ঠিক হবে?
কেন?
ইচ্ছে করছে না।
লোকটা নামাজীকে জিজ্ঞাস করে, তুমি কোন দল সমর্থন কর?
স্যার, এটা কেন জিজ্ঞাস করলেন?
কারণ তো অবশ্যই আছে, কিন্তু তোমার জানাতে কি সমস্যা আছে।

আসলে আগের কয়েকজন প্রকাশ্যেই বলত, ‘আমি কিন্তু রাজনীতি করতাম, এখন পরিস্থিতির কারণে চাকরামি করি’।

সে উত্তর দেয়, ‘সবাই তো নৌকা’।
রাখাল, রাখালের চাচা, ভাই-বোন, বলতে গেলে সবাই নৌকার ভক্ত, তা আমি জানি, কিন্তু তোমার কথা জানতে চাচ্ছি।
আমিও নৌকা।
তুমি কি বঙ্গবন্ধুকে মানো না।
মানবো না কেন? উনিই তো নৌকার মালিক। রাখালও হেসে দিয়ে বলে, বঙ্গবন্ধুই তো আসল।
লোকটা তাকে জিজ্ঞাস করে, বঙ্গবন্ধু কি জীবনে কোন ভুল করেছেন?
তা আমি জানবো কিভাবে?
তোমার জানা মতে কোন ভুল?
রাখাল বলে, তা আমরা জানবো কিভাবে, আপনারা বড়রা যারা দেখেছেন তারা বলতে পারেন।
উনার মৃত্যুর পরে আমার জন্ম, কাজেই সেই সৌভাগ্য আমার হয়নি।
আপনিই জানেন না, আমরা জানবো কিভাবে?
আমার জানা মতে তিনি কোন ভুল করেননি। তিনি নির্যাতন বন্ধের জন্য, মানুষের স্বাধীনতা, অধিকারের জন্য যা করেছেন ঠিক করেছেন, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
তা তো সবাই জানে, সবাই মানে।
উনার অনেক ছবি তোমরা দেখেছ, কিন্তু তিনি নামাজ পড়ছেন – এরকম কোন ছবি দেখেছ?
তারা একে অপরের চোখের দিকে তাকায়, নামাজি লোকটা বলে উঠে, নামাজ না পড়লে উনাকেও মানা যায়….
লোকটা থামিয়ে দিয়ে বলে, তিনি এই দেশের স্থাপিত, জাতির পিতা- তিনি ভুল করেননি। নামাজ না পড়ে থাকলেও ভুল করেননি। বিধাতা কি মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল? নির্যাতনের পক্ষে ছিল? এইদেশ-মাটিকে আমি মানি বলেই উনার প্রতি কৃতজ্ঞ এবং উনাকে মেনে চলি।
রাখাল চুপ করে থাকে।
লোকটা আবার বলে, অামি কিন্তু নিশ্চিত জানিনা, তবে বঙ্গবন্ধুর বইতে এক জায়গায় যেমনটা লেখা আছে তাতে কোন এক নামাজের ওয়াক্তে কয়েকজন সঙ্গীর নামাজে যাবার কথা লিখেছেন কিন্তু তিনি নিজেসহ অন্যরা নামাজ পড়েছিলেন কিনা তা স্পষ্ট না। তাছাড়া সেরকম কোন ছবিও আমার চোখে পরেনি কোথাও। তুমি ঠিকই বলেছ বড়রা হয়ত বলতে পারবেন। কিন্তু আমি ব্যক্তিগত ভাবে উনাকেই মানি, নামাজ না পড়লেও মানি, তিনি ভুল করননি। নামাজে তোমরা যে সুরা পাঠ কর তার অর্থ জানো?
কেন?
তাহলে আমার ধরনা অনেকেই ভিন্ন কিছু বলতে। রাখালের দিকে তাকিয়ে বলে, ৮/১০ বছর আগে নিজেই বলেছিলাম, কেউ ইজ্জত রক্ষার জন্য বাড়ি বিক্রি করে আবার কেউ ইজ্জত বিক্রি করে বাড়ি করে। সঠিক ধর্ম যারা ইজ্জত রক্ষা করে চলে তাদের সাথে তা তারা নোমো (তেমাদের ভাষায়) হলেও, আর যারা সতীত্ব টিকাতে পারে না, তারা নামাজী হোক আর হাজ্বি হোক আমি তাদের ধর্মকে নোংরা মনে করি।
রাখাল উঠে ভিতরের রুমে যায় আর নামাজি লোকটা বলে, যত যাই বলেন, আমার মনে সায় দেয় না। পাপের শাস্তি অাল্লাহ দিবে, কিন্তু সব মাখলুকেরই কলেমা পড়তে হবে, নামাজ আদায় করতে হবে -এটাই ইসলামের কথা, নবীর খেলাফত।
অন্যধর্মের মানুষরা কেন কলেমা পড়বে?
বুঝলে তো অবশ্যই পড়ত, তারা তো শয়তানের প্রলোভনে ভুলে আছে, তাই বুঝে না। ইসলামের উপর কোন ধর্ম নাই। হিন্দুরা তো মুর্তি পুঁজা করে, যা একেবারে শিরক -যার কোন ক্ষমাই নেই।
যারা শয়তানের প্রলোভনে ভুলে অাছে তারা শয়তানি করে, অন্যের অনিষ্ট করে, কুৎসা রটায়, দুর্বলদের উপর জোড় খাটায়। আবার তারা শক্তিশালীদের বশে থাকে – এমনকি অন্যায় বা পাপে লিপ্ত থাকলেও – সেটাও একরকম শিরক মনে করি। যাহোক তোমাদের সাথে এসব নিয়ে বেশি কথা বলতে চাই না।
নামাজি লোকটা বলে উঠে, তা ঠিক, কথায় কাজ হয় না। কপাল দোষে অনেকে মরেও, ইহকাল পরকাল সব হারায়। আবার, বিধর্মীরাও ঈমান এনে নবীর খেলাফত পায়।
কিছুক্ষণের জন্য, ঈমান, খেলাফত, নবী, নামাজ,… এ সমস্থ কথা রেখে, চিন্তা করে দেখ, কারা অন্যায় করছে, মিথ্যা, দুর্নীতি, ছলনা, ধর্ষণ, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, ব্যাভিচার, বেয়াদবি, কুৎসা রটানো, দুর্বলের হক নষ্ট, নির্যাতন … তারা যারাই হোক তারা এবং তাদের ধর্ম খারাপ। আমি মনে করি মানুষদের সঠিক পথে সঠিক রাখার জন্যই ধর্ম, পাপ-মুক্ত থাকা আর পাপ মুক্ত করার জন্যই ধর্ম। কেউ অন্যায় করলে শুধু প্রশ্ন না শাস্তি দেয়াটাও ধর্ম। আমি যদি চুরি করি, তবে আমার নবী চোরের নবী। কাজেই নিজেকে সঠিক রাখাটাই ধর্মের কাজ। আবার নিজেকে ঠিক রাখলেই চলে না, ছোটদের – যেমন ছোট ভাই-বোন, সন্তানদের অপকর্মের দায়ভারও নিজেদের কাধে আসে। তবে, আমার অজ্ঞতা বা উদাসীনতার কারণে অন্য একজনের অন্যায় পথে, পাপের পথে চলাটা গ্রহনযোগ্য হয়ে যায় না। আমি দায়ী হতাম যদি অামি অভিভাবক হতাম বা তার দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হত। মনেকর, তুমি দরজা খুলে ঘুমিয়ে আছ, তাই বলে অন্যের জন্য চুরি করাটা যায়েজ হয়ে যায় না আর চোরদেরও মাপ করা যায় না। চোরের চুরির পক্ষে নয় বরং চুরি বন্ধের চেষ্টা করা প্রয়োজন।
‘আসলে অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়।’
‘হতে পারে, অনেকে নিয়তির কথাও রলে, কিন্তু সে জন্য অন্যায়কারিদের ক্ষমা বা প্রশ্রয় দেয়া ঠিক না।’
লোকটা ভাবে, যারা অশিক্ষা, অজ্ঞতা বা অসহায়ত্বকে দায়ী করেন মেয়ে সন্তানদের পাপের পথে যাবার জন্য, তাদের অবশ্যই চিন্তা করা প্রয়োজন তারা সেই নোংরা অভিভাবক আর সুবিধাভোগী পাপীদের অাড়াল করে পাপের পথকে সুগম করছে কিনা? নির্যাতিতাদের অনিষ্ঠ করছে কিনা? আর নির্যাতনকারীদের পক্ষে থাকছে কিনা? নিয়তির কথা অনেকে বলে, তাই মরা মানুষ জেতা করার দাবি করিনা, তাই বলে খুনিদের আড়াল করা নয় বরং ফাঁসি দাবি করি, আবার ক্ষতিগ্রস্তদের পুনরুদ্ধার।
‘স্যার কি তাহলে নামাজ ছেড়ে দিতে বলেন?’
আমি তোমাকে কিছুই বলছি না, যার ধর্ম তার কাছে, আমার ক্ষমতা থাকলে কে কি করছে তা বিচার করতাম।
রাখাল আবার এসে বসে।
নামাজি লোকটা বলে, কোরআন এর উপর কোন সত্য নাই, ইসলামের উপর কোন ধর্ম নাই।
তা তোমাদের বিশ্বাস, আমি মানতে বাধ্য নই। তারপরেও বলি, ধান চাষ করতে শুরুতেই লুঙ্গি গুটিয়ে বাঁধে মানুষ, কিন্তু শুধু তাতেই ফসল ফলবে না। সূরা আল-মুমিনুন অর্থ বাংলায় যেভাবে লেখা আছে তাতে
সূরা আল-মুমিনুন আয়াত ১
মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে
সূরা আল-মুমিনুন আয়াত ২
যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-নম্র;সূরা আল-মুমিনুন আয়াত ৩
যারা অনর্থক কথা-বার্তায় নির্লিপ্ত,সূরা আল-মুমিনুন আয়াত ৪
যারা যাকাত দান করে থাকে
সূরা আল-মুমিনুন আয়াত ৫
এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে।
৬……….
-এসব কোরআনের আয়াত, আমার কথা নয়। কিন্তু এটা বুঝি শুধু নিজের সেই অঙ্গের পর্দা রক্ষা নয়, অন্যের পর্দা হরণ না করা হরণ করতে বাধ্য করা বন্ধ করা, এবং যারা হরণ করে বা করতে বাধ্য করে তাদের শাস্তি দানও সঠিক ধর্মীয় দায়িত্ব। যারা প্রথম কাজকেই বড় মনে করে সেখানেই আবদ্ধ তারা মূলত: সকল নোংরামিতে ডুবন্ত। হাজি হোক বা নামাজি হোক বিয়ে ছাড়া সতীত্ব হারানো নারী ও তা গোপনে মেনে নেয়া অভিভাবকদের থেকে সতীত্ব সম্পন্ন মেথর নোমো পরিবারের নারীর ধর্মও শ্রেয় মনিকরি। কুকুর বা সেরকম পশুর সাথে সমাজের মানুষের অনেক পার্থক্য – তাদের পরস্পর সম্পর্কের জন্য হয়ত বিয়ে, সম্মতি, সামাজিক মতামত, কাবিন, সাতপাক – এসবের প্রয়োজন হয় না, কিন্তু মানুষের???? নামাজিদের কথা হয়ত ভিন্ন, কিন্তু জ্ঞাতসারে কেহ সেরকম নির্যাতনের শিকার হলে বা শিকার হয়ে পাপের পথে থাকলে, সত্য ধার্মিকদের অনেক কিছুই করণীয় থাকতে পারে, তারা অন্তত লুঙ্গি গুটিয়ে ফসল অাসা করতে পারে না। তোমরা তো তেমন কিছু বলনি, কিছু নামাজি ও জামাতিদের মুখে এমনও শুনেছিলাম যে, পুজামন্ডব বন্ধ করতে হবে, মুর্তি, স্টাচু ভেঙ্গে ফেলতে হবে, নইলে নামাজ হয় না। কিন্তু, সনাতন ধর্ম সম্পর্কে যেরকমটা শুনেছি তাতে, দুর্গা পুজায়, সেরকম কোন নির্যাতিত নারীর বাড়ি থেকে মাটি সংগ্রহ করা নাকি অাবশ্যক। এর অর্থ এমনটাই মনে হয়, যে পাপ বন্ধ করার জন্যই ধর্ম। যদি তেমনটা সত্যই হয়, তবে বলা যায় যদি পাপ না হত বা পাপ বন্ধ করা যেত তবে অশুর নিধনে দুর্গা মায়ের প্রতিমূর্তি গড়তে পারত না আর দুর্গা মা’কেও আসতে হত না।
সমাজে অনেক ধর্মের মানুষ থাকতে পারে, নাস্তিকও থাকতে পারে, কে ভাল কাজ করে, কে খারাপ সেটা হচ্ছে বিষয়। কিন্তু, মুসলমানের সাথে বেনামাজি, নাস্তিক হিন্দুরাও থাকতে পারে, আবার হিন্দুর ঘরেও নামাজী থাকে। কিন্তু আমার অন্যায়কারী, পাপী, কুৎসাকারীদের সাথে থাকতে অস্বস্তি লাগে।
রাখাল না খেয়ে উঠে যায়। আর লোকটা সগিরের একটা সাইকেল নিয়ে বাজারে যায়, ফেরবার পথে সেই রেষ্টুরেন্টে খেতে বসে।
ও’ফোন করে বলে, আমারা বসে আছি তোমার জন্য।
মাত্র তিন দিন হল, ও আর কাজলী ফেল করা বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেবার জন্য লোকটার কাছে পড়তে বসছে।
এসে কি হবে, তোমরা তো আবার ফেল করবে। টেক্সট
তাইলে তুমি আসো না কেন?
এসে কি হবে?
পাশ করায়ে দিবা।
ইস, তুমি তো আলরেডি ফেল করেছ….

১৫/১২/২০১৮

ভাল হয়েছে, অাসতে কতক্ষণ লাগবে তাই, বল।
মোটেও ভাল হয়নি।
কি?
ফেল করলে কেন?
কোথায় ফেল করলাম? আমি নাকি ফেল করছি, পরিক্ষার এখনো অনেক দেরি আছে। আপনি না পড়াইলে বুঝি পাশ করব না, দেখবেন ঠিকই পাশ করব। আসতে কতক্ষণ লাগবে, বলেন?
দশ মিনিটে আসতে পারবে।
মানে?
এবার কিন্তু গতবারের থেকে কঠিন হবে, সামনে আরো কঠিন।
তা জানি? তুমি দশ মিনিটে আসবা কিনা, বল।
আমি আসব কেন? তুমি কি জানো, তাই বল।
ভয় দেখাবেন না, বুঝলেন।
ভয় না, সত্যি বলছি পড়াশুনা কর, নইলে কিন্তু ১০০% পাশের হারের চিন্তার সুবাধে তোমার পাশের সুযোগ নেই।
মানে?
আমাদের সময় ২৫ – ৩০ ভাগ পাশ করত। সবাই পাশের যোগ্য না। শতভাগ পাশের যোগ্য করার চিন্তা না করে যেভাবে পাশের হার বেড়েছে তাতে পাশ করার যোগ্যতা অনেকই হারিয়েছে। আমি যোগ্যতা নিশ্চিত করার পক্ষে, তাই পাশের হার অনেক কমতে পারে।
আপনি বেশি কথা বলতেছেন। আসবেন কখন বলেন।
ঠিক বলেছ। পাশের হার ১০০% হোক বা কমে ১০% হোক, তুমি পরিক্ষায় ফেল করলে আমি খুব খুব খুশি।
কেন স্যার, আপনি এরকম বলছেন কেন?
তুমি তো খালি ফেল কর, পরিক্ষায় ফেল করলে যদি সত্যি সত্যি পাশ করতে পারতে!

সেই ছোটবেলাতেও পড়তে বসেছিল লোকটার কাছে, অনেক অাগ্রহ নিয়ে। কিন্তু মাত্র তিন দিন পরেই পড়া বন্ধ। বিদ্যুৎ তখনো ওদের বাড়ি পৌঁছয়নি। হ্যারিকেনের টিম টিমে আলো। সোলার বাতি ছিল, কিন্তু তা জ্বালায়নি। ও’র মা প্রদীপ হাতে এসে বলে, ও’রে রেখে গেলাম, বেশি আস্কারা দিবেন না, একদম পড়তে চায় না। লাঠি আছে? নাকি একটা দিয়ে যাব?
আপনি চিন্তা করবেন না, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
সবাই তো কয়, কিন্তু আমি তো দেখি, দিন দিন…।
‘কি হইছে দিন দিন, আমি বুঝি পড়ি না?’
শুনছেন, ও’র কথা শুনছেন? -এক থাবর দিব বেহাংরা!

লোকটা কিছু বলার সুযোগ পায়নি, মেয়েটা ও’র মায়ের আচল ধরে দাড়ানো ছিল। রাগ করে ভিতরে চলে যায়। প্রদীপ হাতে ও’কে ধাওয়া করতে এক পা এগিয়ে যায়, কিন্ত না গিয়ে পিছন ফিরে লোকটাকে বলে, থাক স্যার ও’রে পড়ান লাগবে না, আপনি যান, কোথায় যাইতে ছিলেন!
লোকটা ও’র নাম ধরে ডাকে, ‘বই নিয়ে, তাড়াতাড়ি এসো’।
মা’ কোন কথা না বলে বাইরে চলে যায়। ঘরের মধ্যে প্রদীপটা জ্বলছে, তবে নিভু নিভু। খুট খুট শব্দ। কিছুক্ষণের মধ্যে অন্ধকার -প্রদীপ নিভে যায়। লোকটা বলে, ‘কি হল? না পড়লে না পড়বে অন্ধোকারে কি করছ? প্রদীপ নিয়ে এসো, জ্বালিয়ে দেই’।
টেবিলের উপর হ্যারিকেনটা। ভিতরের ঘর থেকে টেবিলের দূরত্ব মাত্র এক কদম। হাত বাড়ালেই পেতে পারে। লোকটা আলো একটু বাড়িয়ে দিতে লাগল, এমন সময় হুট করে পিছন দিয়ে এসে ছোবল মেরে হ্যারিকেনটা ভিতরে নিয়ে যাচ্ছে।
‘দাড়াও, এটা নিয়ে যাচ্ছ কেন?’
কোন কথায়ই শুনলো না।
‘আমি কি অন্ধকারে বসে থাকব? আমি বাজারে চলে গেলাম কিন্তু; চলে যাবো? ভুতে ধরবে কিন্তু।’
অত সোজা না।
‘তাহলে আমি চলে গেলাম’ বলে লোকটা উঠে দাড়ায়।
এক হাতে হ্যারিকেনটা ঝুলিয়ে বেশ বড় মানুষী মুড নিয়ে পাশে এসে দাড়ায়। টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কানটা যেন লোকটার দিকে। ‘আপনি কি চোখে দেখেন না?’
লোকটা বলে, ‘আলো নিভে যাবে তো, আলোটা বাড়াও।’
কোন কথা না বলে আরো একটু সোজা হয়ে দাড়িয়ে হ্যারিকেনটায় দোল খাওয়াচ্ছে। বুক জুড়ে ও’র ওড়না ঝুলানো – এই মাত্রই প্রথম পরেছে। ‘আপনি কি অন্ধ? বই তো এখানেই’ -বলে হ্যারিকেনটা ধপ করে টেবিলে রাখে। যতটা জোড়ে রাখে তাতে আলোটা নিভে যাওয়াই স্বাভাবিক ছিল।
‘সরি, আমি তো দেখতে পাচ্ছি না, আলোটা একটু বাড়িয়ে দিবেন?’
এক নজর তাকিয়ে একটু হেসে উঠবে বুঝি, কিন্তু চোখে চোখ পরে যায়; আর ওমনি আলোটা ধপ করে বাড়িয়ে দিল – কালো ধোয়ায় ঢেকে যাচ্ছে চিমনি।
‘তুমি কি বই খোঁজ করছিলে নাকি ওড়নাটা?’
মানে?
ওড়নাটা তোমার?
তা দিয়ে আপনার দরকার কি? কি পড়াবেন পড়ান।
আজকে আমি পড়াব না।
কেন?
তুমি পড়াবে।
মানে?
প্রথম দিন তো, তাই। আজ তুমি আমাকে পড়াও।
মানে?
এত মানে মানে কারছ কেন!, মানে, তুমি পড়াও, মনে কর আমি তোমার ছোট, তোমার কাছে পড়তে এসেছি।
পড়্…
কি?
হেসে দিয়ে বলে, আমি কি পড়াব, স্যার?
তোমার যা ইচ্ছে তাই।
দেখছো! কেমন লাগে, আপনি পড়াবেন তা না।
পড়াব তো, কিন্তু এখন তুমি পড়াবে। বল কি পড়ব?
পড়েন তো এখানে কি লেখা?
আমি কি এত খারাপ ছাত্র, আমাকে বই-এর নাম পড়তে বলছ কেন?
বড় গাইড বইটা খুলে বলে, বলেন তো ‘দুখু মিয়া’ কে ছিলেন?
আমি জানি, তুমি বলত, বঙ্গবন্ধু বড় নাকি শেখ হাসিনা বড়?
মানে?
কার বয়স বেশি?
বঙ্গবন্ধু’র।
তুমি জানলে কিভাবে? লেখা আছে?
সবাই তো জানে, বঙ্গবন্ধু তো প্রধানমন্ত্রীর পিতা।
তুমি এত কিছু জান! বইতে পড়েছ নাকি শুনেছ?
বইতে অাছে, স্যাররা স্কুলে পড়াইছে.., বঙ্গবন্ধু’কে যুদ্ধের সময় মেরে ফেলেছে।
কি? কোন যুদ্ধের সময়?
হ্যা। দেশ স্বাধীনের সময় বঙ্গবন্ধু, তারপর উনার পরিবারের লোকজনসহ ব্যামালা মানুষ মেরে ফেলেছে।
কারা মেরে ফেলেছে?
পাকিস্তানিরা।
তুমি যা বলেছ, তার মধ্যে একটা বড় ভুল আছে। আগামীকাল তা পড়ে আমাকে সঠিকটা বলবে। দেশ স্বাধীনের সময় পাকিস্তানি আর এদেশের রাজাকাররা অনেক মানুষ হত্যা করেছে -অনেক মানুষ শহীদ হয়েছেন; বঙ্গবন্ধু’র নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু স্বাধীনের কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্বাসঘাতক খুনিরা উনাকে এবং উনার পরিবারের লোকদের হত্যা করেছিল। আচ্ছা এবার অংক আর ইংরেজী শিখাও।
আপনি তো সব জানেন।
কোথায় সব জানি, তুমি আরো শিখাও।
কি শিখাব?
বললাম তো, তোমার যা ইচ্ছে।
বলেন তো এটা কি লিখেছি?
কৈ? ঢেকে রেখেছ কেন? দেখি কি লিখেছ।
খাতাটা হ্যারিকেনের আলোর একটু দূরে ধরেই আবার কেটে দেয়।
তোমার সাহস তো কম না?
কেন?
কি লিখেছ?
পড়েন?
এভাবে কেটেছ কেন? এটা কি পড়া যায়? আই, ওয়ান নাকি এল লিখেছ?
খাতাটা টান দিয়ে ঘরের মধ্য চলে যায়।
তোমার কিন্তু শাস্তি প্রাপ্য হয়ে গেছে, প্রথম দিন মাপ করলাম। কাল থেকে কিন্তু।
আমি মাপ চাইছি নাকি?
তাইলে শাস্তি চাও?
কেন, শাস্তি দিবেন কেন, আমি কি করছি? আচ্ছা দিলে দেন।
এদিকে আসো।
না।
কেন?
ভয় করে।
‘আমাকে ভয় করে? ভয় নেই আমি তোমাকে মারবও না, ধরবও না।’
‘সত্যি, ঐ খানে ভুতের মত কি যেন।’
‘কাছে আসো।’
কাছে এসে টেবিলের ওপ্রান্তে গিয়ে লেখা শব্দটা একেবারে কেটে কেটে কাগজটাই যেন ছিড়ে ফেলেছে।
‘তুমি কি করছ, এসব?’
কেন?
তুমি ছাত্রীও না, শিক্ষকও হতে পারোনি।
শিক্ষক না তো, শিক্ষিকা।
হতে পারনি তো, হও আগে।
হয়েছিই তো।
তোমাদের শিক্ষিকারা বুঝি এভাবে পড়ায়?
ও’ খাতাটা মুড়িয়ে বলে, ‘এই প…’।
অনেক হয়েছে, এবার এসে বের কর- সবথেকে কঠিন অংকটা।
চোখ টোক খিচলে বলে উঠে, ‘আপনিই তো..’
লোকটা বলে, ‘কি? বসে কথা বল।’ কিন্তু, ও’ ছটফট করছে, প্লাস্টিকের চেয়ারটা তুলছে, আবার রাখছে – পিছনে, সামনে, পাশে। তারপরে বসে বলে, ‘আপনি স্যারও না, ছাত্রও না।’
তাহলে?
আবার চেয়ার ছেড়ে দাড়িয়ে গেল।
‘কি হল আবার? বস।’
…..
‘কথা শুনছ না, কেন? বস বলছি।’

‘অাচ্ছা, বল, আমি তোমার ছাত্র হলে খুশি নাকি শিক্ষক হলে খুশি?’
‘ছাত্র হলে তো এতক্ষণে……’ বলে, চেয়ারে ধপ করে বসে, লোকটার দিকে ফিরে গলা চেপে ধরার ভঙ্গিমায় দুহাত জাগিয়ে মুহূর্তেই দু’হাতে বইটা নিয়ে নিজের কোলের উপর চাপিয়ে রাখে।
লোকটা খোলা দরজা-জানালায় তাকিয়ে আবার ও’র দিকে চোখ ফিরিয়ে এনে বলে,
‘কি করছ এসব, এটা কি পড়াশুনা।’
‘কি? আপনি আসলে বেশি কথা বলেন।’
‘হু, ঠিক বলেছে, তুমি আসল কথা বলনা তো, তাই।’
‘কি? বলিনা? বলে চেয়ার থেকে আবার দাড়িয়ে যায়।’
কয়েক সেকেন্ড হবে হয়ত, দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু ততক্ষণে, ও’র দু’হাত বইয়ের মলাট খামচে ধরেছে।
‘তুমি অস্থির হয়ে যেও না, মারতে চাইলে মারতে পারো, ধরতে চাইলে ধর।’
এবার অনেকটা ভেঙ্গে পরার মত অবস্থা। লোকটা হাত বাড়িয়ে বলে, ‘বসো’।
কিন্ত ও’ ভিতরের রূমে যেতে চায়, লোকটা আবারো হাত বাড়িয়ে বলে, ‘বসো, তুমি -শান্ত হয়ে বস।’
চেয়ারে বসে, আস্তে করে বলে, ‘মায়ের কাছে বলবেন না তো!’
কি?
দুষ্টামি করছি যে!
এখন তো আমি তোমার ছাত্র, তুমি নির্দেশ করলে বলব না।
বলবেন না, দেখেন তাহলে আমাকে মারবে।
আচ্ছা ঠিক আছে, কিন্তু মনে রেখো, শিক্ষকের সব নির্দেশ কিন্ত ছাত্র-ছাত্রীরা শুনতে বাধ্য না।
মানে?
কোন শিক্ষক যদি তোমাকে অন্যায় কিছু করতে বলে, তুমি কি মানবে?
হ, হ, অনেক মাষ্টাররা বদমাইশ একছের- ছাত্রীদের সাথে নাকি খারাপ ব্যবহার করে।
হ হ বললে কেন? হ হ মানে? তুমি কি মানবে?
‘না, মানবো কেন? একেবারে থাবর মারবো, কোথায় যেন মাইরও খেয়েছে’ – বলতে বলতে উঠে পিছনের দরজা খুলে বাইরে চলে যায়। লোকটা চুপকরে বসে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসে, ‘বাইরে কি অন্ধকার।’ বাইরে যাবার কারণটা লোকটার জানা, তাই আর কারণ জানতে না চেয়ে বলে, ‘ভয় করে না – একা যেতে।’
লোকটা তখনই ও’র গোসল করার জন্য ছুটাছুটি দেখে, ও’র বাবা, মা আর ভাইকে বলেছিল যেন একটা বাথরুম বানায়- কাছেই। এটা তেমন কোন খরচের বিষয় না যা ওদের অায়ত্বের বাইরে। অাসলে অনেক পরিবারেই পুরুষরা মেয়েদের চাহিদার কথা অনুধাবন করে না। কয়েকদিন পরে, ও’র বাবার পিছন পিছনে একজন এসেই বলে, ‘স্যারে এইখানে ঘুমান, মশায় কামড়ায় না! আ জানলে তো বাড়ি থেকে মশারি নিয়ে আসতাম।’
আপনি?
‘আপনার বাথরুম দরকার নাকি, বাথরুম বানাইতে আইছি’ বলে বিছানার দিকে আসে।
লোকটা নিজের চাদর হাতে নিয়ে উঠে চেয়ারে বসে।
রাতেই বানাবেন?
না। সকালে, দু’তিনদিন লাগবে। এখন একটু ঘুমাই।
লোকটা হতবাক হয়ে য়ায়, কারণ সে অন্যদের সাথে বিছানায় ঘুমায় না।
ও’র বাবা কিছুক্ষণ পরে, তাকে ডাকতে আসে ভিতরের রুম ঘুমাতে দেবার জন্য। লোকটা বাঁধা দেয়, যা হবার তো হয়ে গেছে; বলে, আমার সমস্যা নেই, আমি চেয়ারে বসে রাত পার করতে পারবো। কিন্তু তিনি তা মানতে রাজি না, ভিতরের রুমে ওরা ঘুমাচ্ছিল। তিনি ও’কে ডেকে তুলছেন, বুবুর ঘরে পাঠাবে, আর তাকে ভিতরের রুমে। লোকটা বলে, ‘আমার কথা চিন্তা করে, এখন আর উনার ঘুম না ভাঙ্ানোই ভাল, উনি অলরেডি তো বিছানায় শুয়ে পড়েছে। ও’দেরকেও এত রাতে আর দাদির ঘরে পাঠাতে হবে না।’
‘পাঠাই কি স্বাধে? আপনি তো কারো বিছানায় ঘুমান না, তাই। নইলে তো, বড় বিছানা, গুড়াগাড়া আপনার পাশেও ঘুমাইতে পারতে।’
‘আপনি অন্যদের কাছে শুনেছেন, আমার কাছ থেকে কিন্তু সরাসরি শুনেননি।’
ভিতরের রুমে ও’ ঘুমান্ত চোখে উঠে আবার বিছানার এক কোনায় শুয়ে পড়ে।
বাবা বলে, এটাও অনেক বড় বিছানা, আরো কয়েকজন ঘুমাতে পারে। আপনি তো ঘুমাবেন না।
এর মধ্য সেই মিস্ত্রী জেগে উঠে, ‘তা বুঝলে তো এখানে ঘুমাইতাম না’ বলে ভিতরের রুমে যায়।
ততক্ষণে ও’ ঝট করে উঠে, কারো দিকে না তাকিয়ে, পিছনের দরজা দিয়ে দাদির ঘরে চলে যায়।
লোকটা সারারাত চেয়ারে বসে আর পায়চারী করে পার করে- পিছনের অচেনা রাস্তার মাথা আর উঠান। সকালে সেই ছোটবেলার রূপ। কয়েক দিনের জন্য কথা নাবলে, না তাকিয়ে এড়িয়ে চলার মত। জানতে চেয়েছিল, এগুলো দিয়ে কি বানাবে? ও’ কোন উত্তর দেয় না, ছোট বোনটা বলে বাথরুম। লোকটা বলে, বাথরুম মানে গোসলখানা, এবার বল কি বানাচ্ছে?
ও’ একটু তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে লোকটার দিকে তাকায়, ছোট বোন বলে, ‘…. খানা’। ও’ কষে থাপ্পর মারার দেখায়। বেশ মজবুত একটা লেট্রিন বানাচ্ছে, তা আবার আগের স্থানেই। লোকটা মিস্ত্রিকে বলে, ‘আসলে একটা বাথরুম প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সবাই যে ২/৩ ফুটের লেট্রিনকে বাথরুম বলে তা জানা ছিল না’। মিস্তি বলে, ‘গোসলখানা? – তা বানাইতে কতক্ষণ! বানাইয়া দেব আনে।’ ও’র মা এসে বলে, ‘তা লাগবে কেন?’
সেদিনের সেই বাইরে যাবার আতঙ্ক, বিড়ম্বনা ও’দের এখনও আছে। ভয় করে কিনা জানতে চেলে সেদিন ও’ বলেছিল, করে তো।’
লোকটা বলেছিল, ‘আমাকে বলতে পারতে?’
‘স্যার আপনি যে কি না?’ মাথা নিচু করে একটু হেসে বলেছিল, ‘আমি কিন্তু এমনিতেই বাইরে গেছিলাম।’
‘জানি, এখন কষ্ট করে আমার জন্য পানি নিয়ে এসো তিন গ্লাস।’
চোখ বড় বড় করে, খুশিতে লাফ দিয়ে উঠে, ঘর থেকে দু’হাতে দু’টা গ্লাস এনে রাখে, আর টিবিলে একটা গ্লাস অাগেই ছিল।
বসো।
চুপ করে দাড়িয়ে থাকে।
লোকটা কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ়।
চেয়ারটা একটু টেনে দেয় আর হাতটা বাড়িয়ে বলে, ‘কিছু বলতে চাচ্ছো?’
চেয়ারে বসে, দু’হাতে নিজের দু’ই ডানা শক্ত করে ধরে, যেন শীত শীত ভাব, বলে ‘কি অন্ধকার, মনে হয় অমাবস্যা’।
‘তাই? আচ্ছা তুমি আমাকে কিছু বলছ না কেন?’
কি বলব?
আমাকে মারছ না কেন- তোমাকে না পড়িয়ে তো আমি তোমার সাথে দুষ্টামি করছি?
এবার অাস্তে করে দাড়িয়ে দু’হাত এমন ভঙ্গিমায়, যেন লোকটাকে আলত করে কোলে নিতে চায়, আর মুখে বলে, ‘স্যার আপনি এরকম কেন, আপনি তো কোন অন্যায়ই করেননি!’
এরকম মানে?
‘কেমন যেন’ বলে বসে টেবিলের উপর হাতটা বাড়িয়ে দেয়, ততখানি যতটুকু লোকটা হাত বাড়িয়েছিল।
I’ve fallen for you
লোকটা একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে, ‘আজকেই শেষ না, প্রতিদিন সুযোগ পাবে’।
ছাত্ররা কিছু বলে না?
কোন ছাত্ররা?
আপনি যাদেরকে পড়ান তারা যদি সত্যি সত্যি মারে?
‘বোকা, আমি কি সবাইকে সে সুযোগ দিব নাকি, শুধু তোমাকে, তাছাড়া আমি তো শুধু তোমাকেই পড়াচ্ছি, সবাইকে না।’
ও’ চুপ করে থাকে। লোকটা বলে, এবার একটা অংক কর।
বললেন দেখি আজ পড়াবেন না।
তাহলে তুমি পড়াচ্ছ না কেন।
আমার ইচ্ছা।
তাহলে ছুটি?
মা’ না আসা পর্যন্ত বসে থাকেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, ‘রোজ?’
কি?
স্যার, আপনি কি সত্যিই রোজ পড়বেন আমার কাছে?
হুঁ, আমি ওয়াদা করলাম, তুমি আজ থেকে প্রতিদিনই আমার টিচার হতে পারবে, তোমার যখন মন চায় তুমি আমাকে ছাত্র বানাইও। কিন্তু মনে রাখবে, আমি কিন্তু বড়, ছোটদের সাথে সবাই অন্যায় করে না, আমি কোন অন্যায় করব না। আমি অন্যায় দাবি করলে তুমি ঠেকাতে পারবে না; কিন্ত তুমি এখন আমার সাথে যা ইচ্ছে তাই করতে পারো, কারণ, অন্যায় বা ভুল করতে চাইলে আমি ঠেকাতে পারব, যদি দোষ হয়, অন্যায় হয় আমার হবে, তোমার কোন দোষ বা অন্যায় হবে না। এবার বল, কোন অংকটা কঠিন।
স্যার সব অংকই কঠিন, অংক থাক আপনার শিখতে হবে না, স্যার বলেন তো, ইংরেজীতে কয়টা অক্ষর?
জানি, তুমি বাংলাদেশ লেখ তো ইংরেজীতে।
পারিনা।
তোমার স্কুলের নাম লেখ তো।
খাতাটা নিয়ে লিখতে শুরু করে, ‘কি যেন স্যারেরা বলেছিল ভুলে গেছি’।
ক্লাশ ফাইভ লেখ।

আমার মনে হচ্ছে, তুমি ক্লাশ ওয়ান আর টু পর্যন্ত পড়েছ, তারপরে আর পড়াশুনা করনি।
মানে?
পড়াশুনা লিখতে ‘র’ নাকি ‘ড়’।
সব ‘র’ আর ‘ই’ কার।
মানে?
হুঁ, স্যারেরা বলছে।
Who, When, Where মানে কি?
হোয়াট মানে কি, ওসব জানিনা।
তাই, আচ্ছা বল তো, পরে, পড়ে, পড়া এবং পড়ি আর পরী -এর মধ্যে পার্থক্য কি?
জানিনা।
পরের দিনও বেশ উৎসাহ নিয়ে পড়তে বসেছিল। মেয়েটা’র মা ঘরেই ছিল। পড়াশুনায় ও’র বেশ মনযোগ। কিন্তু তারপরেও মনে হচ্ছিল, কোন কিছুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। আজ ও’ লোকটার চেয়ার আগে থেকেই দখল করে রাখে। বেশ বেশ মেধাবী, দিনে এক ঘন্টা পড়াশুনা করলেও অনেক ভাল করত। স্কুল, কোচিং- এ অনেক সময় কাটিয়েছে, কিন্তু নিজের মেধাটা কখনো ব্যবহার করেছে বলে মনে হয়নি। গণিতটাও ভাল বুঝে, কিন্তু নিজে বুদ্ধি খাটিয়ে কোন অংক করেছে বলে মনে হয়নি। অনেক্ষণ পরে লোকটা পানি খেতে চায়। ও অানন্দে লাফিয়ে, সশব্দে চেয়ার সরিয়ে পানি আনতে যাবে, এক হাত পিছনে- প্যারেডের ভঙ্গীতে, ঘুরে তাকিয়ে বলে, ‘তিন গ্লাস?’ লোকটা হেসে দিয়ে বলে, ‘তুমি যা পা…..তোমার ইচ্ছে, তবে তিনটা গ্লাস না আনলেও চলবে, একটা থেকেই অনেক গ্লাস খাওয়া যাবে।’ দৌড়ে গিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে টিউবয়েলে যায় আর একগ্লাস জল এনে দাড়িয়ে থাকে। ও’র মা ভয়ংকর রাগে কিছু একটা বলতে গিয়ে, দেখে কলসে পানি নেই। তিনি পানি আনতে চলে যান। লোকটা দু’হাত আলিঙ্গনের জন্য বাড়িয়ে দেয়। ও’ ধরেন বলে জলটা বাড়িয়ে দেয়। গ্লাসটা ধরতেই, ও’ কাছে এসে বলে, ‘আপনি আমার চেয়ারে বসছেন কেন? আপনার চেয়ারে যান।’ ততক্ষণে দু’জনেই দাড়ানো। সামনের দরজা খোলা, একটু দূরে অন্ধকারে কাশির শব্দ। মিরাজদের ঘরের সামনে কেউ দাড়ানো। ও’গা ঘেঁষে লোকটার চেয়ারে বসে পড়ে। লোকটা চেয়ারে গিয়ে বসতে বসতে ও’ দুবার চেয়ার ছেড়ে উঠে আবার বসে, কথাও যেন সব চিৎকার করে করে বলতে চায়। ‘পানি খাচ্ছেন না কেন?’ এর মধ্যে ও’র মা’ চলে আসে, সামনের দরজা দিয়েই ঢুকল। লোকটা পানির গ্লাস হাতে নিয়ে ও’র দিকে তাকিয়ে থাকে – খুব ছটফট করছে। উঠে দাড়িয়ে একটু জোড়েই বলেফেলে, ‘পানি খাচ্ছেন না কেন?’ ও’ বার বার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল। লোকটা বলে, দরজাটা বন্ধ করে দাও, বাইরে কোন দুষ্ট লোক আছে। ও’ দরজা বন্ধ করতে গেলে, মা’ ক্ষেপে যায়, দরজা বন্ধ করে পড়া লাগবে না। ও’ ঘরের ভিতরে চলে যায়। অনেক্ষণ পরে এসে সবগুলো বই গুছিয়ে, ভিতরে চলে যায়। তারপরে ঠাস করে পিছনের দরজা খুলে ও’র চলে যাবার শব্দ। ও’র ছোট বোন দু’জনে মাত্র ঘরে ঢুকল। ঢুকেই লোকটাকে কয়েকটা ঘুষি মেরে ভিতরে চলে যায়। ও’দেরকে ডেকে অনেক অাদর করে, মেয়েটা কোথায় জানতে চায়। খুঁজে এসে বলে, ঘরে নাই। এর মধ্যে দু’টা লোক এসে, ‘লোকজন কেথায়, বউ কোথায়’ বলতে বলতে ঘরে ঢুকে যায়। লোকটা কিছু বলতে চাইলে, না দেখার ভান করে, ‘কোথায়, সফির বউ কোথায়’ বলে ভিতরের রুমে যায়। ও’র মা উচ্ছ্বসিত হাসিতে সশব্দে বলে, ‘বিয়ে হইছে নাকি, আগেই বউ বউ বল তোরা?’ আর আস্তে আস্তে বলে, ‘স্যারে বসা, উনারে গ্রাহ্য করিস।’ ও’দেরও একজন অাস্তে করে বলে, ‘আমরা চিনি’। এর মধ্য তাদের একজন, লোকটার কাছে এসে, ঠিকানা জানতে চায়। তারা এতটাই কাছে আসতে চায় যতটা ও’ এসেছিল। লোকটা দূরের চেয়ার দেখিয় বসতে বলে আর সেই সাথে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, আগমনের হেতু আর তাকে কিভাবে, কবেথেকে চেনে তা জানতে চায়। সন্দেহ ভুল নয় – তারা সেই রাজাকার প্রেমী সংগঠনের লোক যারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে এতটাই ঘৃণিত যে পুরো পৌর এলাকায় দৃশ্যমান কোন স্থানে তাদের অফিস নেই। একটাই মাত্র অফিস গ্রাম্য বাড়ির রান্নাঘরের পিছনে, ওদের ঘরের সামনেই – রাজনীতির নামে তাদের লক্ষ যেন পেটুয়া কলেজ শিক্ষিত অনামন্ত্রীত লাইসেন্সাস সেই বাতিল পুরুষদের মত লোকগুলো সমাজে টিকিয়ে রাখা। ‘তয় তো ভালই হয়েছে, মুরুব্বী মানুষ আছে, বিয়া তো স্যারেই পড়াইতে পারবে।’ আরেক জনে বলে, ‘স্যারে, সফির সাথে বিয়ে পড়াবে? স্যারের বাড়িতে পোলা নাযেন কে আছে, কবে যেন সফির বউরে নিয়ে যায়!’ ‘আপনারা যেভাবে কথা বলছেন, তাতে অনেকে ভাবতে পারে আপনারা অনেক কিছু জানেন, কিন্তু সত্যটাও তো অাপনাদের জানা আছে। আমি অন্যকারো বিয়ে দেয়া বা ভাঙ্গার জন্য অাসিনি আর চুরি করতেও না, যেমনটা ঐ অফিসের লোকরা করেছে।’
এ কথা কেন বললেন?
কোন কথা।
ঐ অফিসের কথা।
‘ভালো করে চিন্তা করে দেখেন, যা হোক অাপনারা ওনাদের গেষ্ট হলে আমার সম্পর্কে অবান্তর কথা না বলাই ভাল আর যদি আমার সাথে প্রয়োজন থাকে, তাহলে ভিতরে না এসে বাইরে আমার সাথে কথা বলবেন।’
স্যারে কেমন কেমন যেন কথা বলে।
‘ঠিক বলেছেন। আপনারা যে ভাবে আমার সাথে কথা বলেছেন, সেরকমটা আসলে স্বাভাবিক না।’
ও’র মা বারান্দায় এসে বলে, ‘স্যারকে মনে হয় ওরা চেনে নাই’।
‘তা ঠিক, কিন্তু একেবারে অপরিচিত হলে এরকমটা করে না, সব মানুষই – এমনকি আপনারাও তো অামার অপরিচিত ছিলেন। আসলে উনারা যার মাধ্যমে আমাকে চিনেছ সেই দায়ী। যা হোক, আপনাদের কি হয়?’
উনারা ফেলনা না, আত্মীয় স্বজন।
ও অাচ্ছা তাই।
‘রাখালের বন্ধু সফি’কে বাড়ির সবাই পছন্দ করে। বুবু শাশুরি তাই, মাইয়াটার সাথে বিয়ে ঠিক করছে। ওরা সফির অাত্মীয় – কি যেন হও তোরা?’
তাদের একজনে ‘আর লাগেনা’ বলে অন্যজনের হাত ধরে টানে -চলে যাবার জন্য, ‘ল, ল’। অন্যজন ‘দাড়া’ বলে থেমে বলে, ‘আমরা যাই মামানি, স্যারে মনে হয় রাগ করছে। স্যারের, কিছু আনাইয়া টানাইয়া খাওয়ান’। লোকটার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘খালাত ভাই’, ‘চাচাত ভাই’।
লোকটা উনাদের দিকে না তাকিয়ে, ও’র মাকে বলে, ‘কি বলছেন? সত্যি?’
‘হ্যা’। উনারা একটু দূরে গেলে বলে, ‘এখনো কথা পাকা হয়নি, রাখালের বাপ রাজি না’।
বুবু শাশুড়ি মানে কি ও’র দাদি?
হ্যা দাদি, তারপর বেগম বুবুও।
আপনার মেয়ে রাজি?
‘ও’র আবার রাজি আর নারাজি কি? আপনিই শুধু…… মাইয়া বড় হয়েছে, বুঝেন না, আর ঘরে রাখা যায়না, ও’র বাপ বাড়ি থাকলে চিন্তা হইত না’।
লোকটা মোটেও হতবাক হয়না, শুধু বিধাতার উপর আস্থাটা বেড়ে যায়, কিন্তু করণীয় কি তাই নিয়ে চিন্তা।
এর মধ্য উনারা আবার ফিরে আসে, ‘বউরে একটু ডাকেন, একনজর দেখে যাই, নাইলে সফি রাগ হবে’।
‘হেয়া ক্যা।’
‘বুঝেন না, কামের ফ্যান্নে অাইতে পারে না, আমাগো খোঁজখবর রাখতে কইছে, আর যদি শোনে দেখি-ই নাই!’
ছোট মেয়েটাকে বলে, ‘ডেকে আন তো’। যাইয়া বল, ‘দেবরে আইছে’।
উনারা মা’কে ডেকে ভিতরে নিয়ে যায়, ‘মামানির সাথে একটু কথার কাম আছে।’
তারা আস্তে আস্তে কিছু বলছে। কিন্তু যখন বলে উঠে, ‘উনি পড়াইতে পাড়ে?’ – মনে হয় তারা বুঝি কানে একটু কম শুনে।
‘ভাল পড়ায়!’
‘আগেকার দিনের পড়াশুনা, ভাল তো পারবেই। তয় এখন ঐ… কলেজ দিয়া এমএ পাশ কইরাও কিন্তু অনেকে গুড়াগাড়ার পড়া বুঝে না’।
‘উনি বুঝে, সবাই কইছে।’
কিছুটা আস্তে বলে, ‘বুঝে বুঝুক, উনি তো ভিনদেশি, নামাজও পড়ে না, গ্রামে কি মাষ্টার নাই! টাকা লাগে সফি দিবে, একটা ভাল মাষ্টার লাগান। সফি’র কামাই রোজগার তো কম না, ভাল ছেলে, কইদিন পরে রাজ মিস্ত্রি হয়ে যাবে। আমাগো হাফিজ সাহেবও তো ভাল, লাগে হেরে পাঠাব অানে।’ কন্ঠের সরটা উচু করে বলে, ‘স্যারে মুরুব্বী মানুষ, উনার গুড়াগাড়া পড়ান লাগে? উনি তো হ্যা্ব্বি শিক্ষিত, বড় বড় ব্যাডারাও স্যার বলে। যে পড়াশুনা জানা লোক ভাল বেতনে চাকরি পায়, জিগান ত চাকরি করবে কিনা, করলে, যে কোন গদিতে বসানো যায়, ভাল বেতনে।’
মা’ বলে উঠে ‘তা তো ঠিকই, ও-স্যার আপনি একটা চাকুরী করেন তয়।’
এর মধ্যে, ‘ও’র ছোট বোন, এসে বলে, বুবুর ঘরে, ঘুমায়।’
ডেকে আনলি না কেন!
ডাকছিলাম, আসবে না।
উনারা আস্তে করে বলে, ‘যতই ভাল হউক, সফিকে না জিগাইয়া এখানে পড়তে দেয়া ঠিক হয় নাই। যদি জানে, কি হবে বুঝেন?’
‘হে চিন্তা করতে হবে না। ভাল মানুষ।’
‘এতই যখন দরদ, নামাজ টামাজ শিখাইয়া, লাইনে আনতে পারেন কিনা দেখেন। আমাগো সফি’র মাইয়ার অভাব হবে না, এই বয়সে প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছে, দল ক্ষমতায় আইলে তো কথাই নাই।’
‘ওসব কি কও, কপাল পোড়া কথা!’
‘তয়, আমরা তো বুঝিনা, হের কাছে পড়াইতে হবে কেন, গ্রামে কি পড়ানোর মানুষ নাই?’
তারপরেই উনারা বের হয়ে যায়, যাবার সময় বলে, ‘স্যারকে কাল আমাদের বাড়ি পাঠাইয়া দিয়েন’। লোকটার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমাদের বাড়ি আপনি চেনবেন, একেবারে সহজ…. আধা-কিলো হবে, মেম্বারের শালার বাড়ির কাছেই বাড়ি। আমার ছোট বোনরে পড়াবেন আনে, টাকা পয়সা যা লাগে দিব, কত করে নেন? – যা নেবেন, দিব; কম না, বেশি দিব আনে।’
লোকটা মা’য়ের দিকে তাকিয়ে সামনে ঈশারা করে বলে, ‘ঐ দলটার ম্যানেজমেন্ট খুবই দুর্বল এবং সমর্থকরা অনেকেই খুব দুর্বল চেতার। সমাজের দুষ্ট লোকরা অন্যায় করার জন্য, বাহাদুরি দেখাবার জন্য খুব সহজেই ঐ দলের পরিচয়ে, ঐদলের দুষ্ট, লোভী অথবা বোকাদের ব্যবহার করে। তারা নিরীহদের অনিষ্ঠ করে, পাড়াপড়শির উপর জুলুম করে- তারা মূলত ভালোর শত্রু আর খারাপের উৎসাহদাতা।’ ঐ লোকদের বলে ‘অন্যদের সব বিষয়ে চিন্তা না করাই ভাল, বিশেষ করে অপরিচিত মানুষের। আপনাদের হয়ত মনে কষ্ট লাগবে, কিন্তু, খালেদার রাজনৈতিক পেটে কিছু গো-সাইদির বাচ্চা আছে যারা শুধু আমার না, অনেকেরই শত্রু। তাদের কারনে হয়ত অনেকে ট্যানেল ভিশন নিয়ে অবান্তর কথা বলে, মানসম্মান জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, না বুঝে আহাম্মকের মত অন্যের অনিষ্ঠ করে – সেরকম কেউ থাকলে আমার সাথে বাইরে সরাসরি কথা বলতে পারত। কিন্তু তা না, তারা ঐ বোকা আর লোভীদের দলটাকে ঘৃণার বিষয় বানিয়ে ফেলেছে।’
মানে?
‘যা হোক, এখানে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না, আপনি যদি আপনার বোনের পড়াশুনার কথা চিন্তা করতেন, তাহলে আমাকে বলতেন না, আপনাদের তো হাফিজ সাহেবই আছেন। ভিন্ন কোন উদ্দেশ্য থাকলে বলেন।’
মানে?
‘আমি যে, যেকোন বাড়ি গিয়ে যে কাউকে পড়াব, সে রকম ভুল ধারনাটা কে দিল? আমি তো শুধু এবাড়িতেই পড়াচ্ছি।’
‘এখানে পড়ালে, আমাদের বাড়ি কি সমস্যা?’
‘আমার এত জবাব দিতে ভাল লাগছে না, আপনার বাড়ি বা গ্রামের কোন ভাল শিক্ষিত মানুষের কাছ থেকে জেনে বুঝার চেষ্টা করতে পারেন’।
‘আমার বোন কিন্তু পড়াশুনায় ভাল। কোন বিষয়ে ফেল করেনি। আপনাকে পাইলে আরো ভাল করবে।’
‘আপনার কাছে যা ভাল, অন্যের কাছে তা অত্যন্ত খারাপ হতে পারে। যাহোক, আমি ও’র সাথে কথা বলব, যদি বুঝতে পারি ও’ আপনাদের বাড়ির বউ হতে চায় তবে, আমি ও’কে পড়াব না, নাহলে সবাইকেই বলছি এই বয়সে ও’র বিয়ে নিয়ে কোন কথা বলবেন না।’
এটা কেমন কথা?
‘ও’র বাবা-মা’র মত আমিও ও’র অভিভাবক, ভাল-মন্দ দেখার দায়িত্ব, আবার অধিকার আমারও আছে।’
ও’র মা কথা না বলে, ভিতরে চলে যায়। আর উনারাও একে অন্যের হাতে চিমটি কেটে আস্তে করে ‘আসলেই তো’ বলে চলে যায়।
কিছুক্ষণ পরে সগির আর মিরাজ আসে। সগির ঘরে ঢুকে আর মিরাজ পিছনের বাড়ি অর্থাৎ বুবুর ঘরের দিকে যায়। ‘সালামা…., স্যার। কাল থেকে আমি আর কাজলীও আপনার সাথে পড়ব। মুক্তিও আসতে চায়।’ ‘বেশ ভাল, এসো।’
পরের দিন সকালে, সফি আসে। সন্ধায় সবাই পড়তে বসে, ও’র মধ্যেও বেশ উৎসাহ ছিল। কিন্তু, ও’ যেন সবাইকে জানাতে চায়, স্যার সব পারে, খুব ভাল পারে, সব থেকে ভাল পারে। অন্যদিকে সগিরের উদ্দেশ্য ছিল ঠিক জ্ঞান অর্জন নয় বরং লোকটা পারে কিনা, ভুল করে কিনা তা যাচাই করা। লোকটা প্রথমেই বলে ‘তোমরা শিখতে এসেছ এটাই বিশ্বাস করি, কিন্তু অন্যদের শিখাবে না, পড়ার কৌশলও বলবে না, যেমন অন্যদের সম্পর্কে এখানে বলেছ।’
কি স্যার?
যেমন তোমরা বলেছ, ‘তাইলে স্কুলের স্যারে ভুল পড়াইছে’, বলছে, ‘এখানে’। কিন্তু তিনি হয়ত ভুল পাড়াননি। উচ্চারণ একই রকম হলেও বানান ভিন্ন, আবার বানান একই রকম হলেও অর্থ ভিন্ন হতে পারে, here মানে এখানে কিন্তু এখানে hear লেখা। আবার এখানে then না than লেখা। আরেকটা বিষয় তোমরা বলেছ, ‘ইংরেজী শব্দের অর্থ জানার দরকার নেই – স্যাররা বলছে’। কিন্তু পড়াশুনা করলে, অবশ্যই জানার দরকার আছে। পরিক্ষায় শব্দের অর্থ লিখতে না দিলেও, শব্দের অর্থ জানতে হয়। তা না হলে, প্রশ্নও বুঝবে না, সব উত্তরও লিখতে পারবে না। আর উপরের ক্লাশে উঠে তো কিছুই পারবে না।
পরের দিন দুপুরে, ও’র মা বলে, ‘ফাইনাল পরিক্ষার পর থেকে ও’কে আপনার কাছে দিয়ে দিব, আপনি পড়াবেন। ও’র বাপেও বলছে, দরকার হয় আপনি আলাদা একটা ঘর নেন, ও’ আপনার কাছে থেকে পড়বে, আমি রান্না করে খাবার পাঠাইয়া দিব। কোচিং-এর স্যার ফোন করছে, পরিক্ষার আগে ছাড়তে চায় না।’
‘আমি চিনি উনাকে, আমি দেখেছি অনেক স্টুডেন্টরা উনার কাছে পড়ে। কিন্ত ও’ কিন্ত পড়াশুনা করে নাই, যদিও মেধা অনেকের থেকেই ভাল।’
আমি দেখি আবার কথা বলে।
‘সবার সাথে কোচিং করলে খারাপ না, কিন্তু পড়াশুনা ঠিকমত করে কিনা, খেয়াল নিতে হবে।’
কিছুক্ষণ চিন্তা করে উনি বলেন, ‘না’ কইয়া দিব আজকে, আপনার কাছেই পড়বে আনে।
‘তা কেন? আমার কাছে তো সারাদিনই পড়তে পারবে, কোচিং -ও করুক।’
‘কোচিং- এ আনা নেয়া করবে কে? সন্ধা থেকে রাত ১০টা/১১টা, স্কুল কি এখানে, কোথায়!’
আমি চিনি।
‘আপনি যদি আনা-নেয়া করেন তাইলে তো হয়ই, কিন্তু ও’রা মানবে কিনা! সেদিন বলে গেছিল, অত রাত পর্যন্ত পড়াশুনা করার দরকার নাই।’
ও’রা মানে?
‘সেইদিন তালই আসছিল- সফি’র বাপ, মা, ডাক নিছে, অত দূরে রাত করে পড়তে যাবে কেন, দরকার হলে বাড়ি নিয়ে যাবে, সফি পড়াবে। সফিও আপনার মত ভাল ছাত্র ছিল, সামনের অফিসের দিকে তাকিয়ে বলে, উনারা তো দেখলাম সেদিন প্রেসিডেন্ট বানাইয়া দিছে।’
‘তাই? কিন্তু আমার মত বলতে?’
পরিক্ষায় ফাষ্ট হইত।
‘আমি স্কুলে কখনো ফাস্ট হইনি। অাবার এক স্কুলে ফাস্ট হলে যে অন্যসব স্কুলে ফাস্ট হতে পারে, ভাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে, তেমন না কিন্ত। আমরা যেখানে পড়াশুনা করেছি, এখানকার অনেক প্রিন্সিপালরাও হয়ত সেখানে ভর্তি হতে পারত না। অামার সম্পর্কে কিছু লোক অনেক কথা ছড়ায়, এরকম তুলনা না করাই ভাল। আমার কাছে বলেছেন ভাল করেছেন, অন্যদের কাছে বলবেন না।’
কেন?
‘এটা আমার জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর – অপরিচিত মানুষের মধ্যে ভুল ধারনা তৈরি হতে পারে।’
‘আপনি কোচিং করাইতে পারেন না? আরো কিছু গুড়াগাড়া নিয়ে, এখানে কোচিং করাইলেই পারেন। তাইলে তো মানুষ ডাক নিতে পারত না।’
‘খারাপ বলেননি। কিন্তু যারা ডাক নিবার তারা তো ডাক নিতেই চাবে।’
কারা?
‘আমি কিন্ত প্রথম দিন রাতেই অনেক কথা বলেছিলাম। এখন দেখলেন তো দুষ্টরা যেভাবে কথা ছড়ায়, তাতে তো সমস্যা।’
উনারা তো খারাপ কিছু বলেনি।
‘সমস্যা কিন্ত তৈরি করছে। উনার কি বলে জানি না, কিন্তু কিছু দুষ্টরা যেভাবে কথা বলে তাতে আমি যদি আপনাদের একেবারে অজানা মানুষ হতাম, তাহলে তাদের কথার ফলে আপনার কাছেই মনে হত, আমি পরিবার, সন্তান, ছেলে-মে ফেলে এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেরাই, খাই-দাই, ইসলামের নাম বেঁচে চলি, কিন্ত ভন্ড, বেনামাজি আর পড়াশুনায় -তাদেরই মত কিন্তু অনেক পুরানো। অথচ আপনি তো জানেন, কারো বাড়ি যাওয়া-খাওয়া তো দূরের কথা, আমার জামাকাপড়ে অনেকের স্পর্শ লাগলেও পারতপক্ষে তা ফেলে দেই।’
‘তা তো জানি, আমি তো অামার ছেলে-মেয়েদেরও বলেছি আপনার কিছু যেন না ধরে। সফি আগে থেকেই জানে, সেদিন এসে আপনার মোবাইলটা সরায়ে রেখেছিল, যদি গুড়াগাড়ারা নষ্ট করে।’
‘আপনাদের ব্যাপারে সমস্যা নেই, আপনার সন্তানদের আমি আগে থেকে চিনি- ও’রা ধরলে সমস্যা নেই, তাতে কিছু নষ্ট হবে না। ঐখানে থাকলেও মোবাইলটা ও’রা ধরত না, এতদিন ধরেনি। তাছাড়া, আমি তো আপনাদের রান্না খাচ্ছি, কিন্তু বলেছিলাম অন্যকোন ঘরের রান্না বা কেউ ধরলে যেন আমাকে না দেন; ও’র হাতে তো আমি পানি খেলাম, কিন্তু অন্যসবার হাতে খেতাম না।’
‘একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে মা’ বলে, আপনি শিক্ষিত মানুষ, একটা চাকরি করেন না কেন?’
‘আমি কিন্তু প্রথম দিনই আপনাকে অনেক কথা বলেছিলাম।’
‘তা তো বলছেন। কিন্তু পোলাডারে কি দিয়ে বুঝ দিব, গরীবের পোলা আমাকে অাম্মু অাম্মু ডাকে, আমাকে ছাড়া কিছু বুঝেনা।’
লোকটা চুপ করে থাকে।
‘ও’রে কিছু টাকাপয়সা দিয়া একটা চাকুরী নেওয়াইয়া দিতে পারলেও হত।’
কেন? সেদিন যে শুনলাম ভাল রোজগার করে।
‘তা তো করে। কিন্তু…’ বলে ঘরে চলে যায়।

পরে কোচিং – এ যাবার সময়, এক সাথে গিয়েছিল, কিন্তু অনেকটা সময় আগেই ছুটি হয়ে যায়। লোকটা গিয়ে দেখে অনেকে অভিভাবকের সাথে, অনেকে একা একা বাড়ি যাচ্ছে, কয়েকজনে অপেক্ষা করছে। কাউকে কিছু জিজ্ঞাস না করতেই ছোট ক্লাশের একজন দৌড়ে এসে বলে, ‘ভাইয়া অাপু তামান্নার সাথে তামান্নার বাপের গাড়িতে গেছে।’ লোকটা ফোনে ও’র মাকে জানায়। তিনি বলেন, ‘কোন অসুবিধা নেই, বিকালে তামান্নাদের বাড়ি থেকে এসে বলছে, তামান্নার বাপ রোজ অানতে যাবে।’
কয়েক দিন আগে দু’পরিবারের মধ্যে বেশ ঝগড়া হয়েছিল- ফুলগাছ তুলে ফেলা নিয়ে। ও’র মা তামান্নাদের পরিবারের চিরত্র নিয়ে কিছু কথা বলে ফেলে। কয়েকজনে বেশ তাল দিচ্ছিল কিন্তু লোকটা বিরক্তি প্রকাশ করলে থেমে যায়। পরে লোকটা শুধু উনাকে বলেছিল, অাপনি মেয়ের মা, আপনার বড় মে ঐ মেয়েটার সমবয়সী। ওভাবে একজনের মা-বাবার চরিত্র নিয়ে কথা বললে, দুষ্টরা তো আপনার সন্তানদেরও শত্রু হতে পারে। আপনি যখন তাদের চরিত্র নিয়ে গালি দিয়েছেন, তাদের কেউ একজন বলেছিল, ‘বানাবো আনে।’

যথেষ্ট মেধা থাকা সত্বেও গতবছর ও’ আর কাজলী ইংরেজিতে ফেল করে। প্রথম দিনে লোকটা যা দেখল তাতে ৫ম শ্রেণি থেকে এপর্যন্ত কিছু শিখেছে বলে মনে হয় না। ও’ পরিক্ষায় পাশ করার কথা বললে লোকটা বলে,
‘ও, সেই কথা? তাতেও তুমি ফেল করবে’। ‘আজেবাজে কথা বলবা না, এমনিতেই সবাই…. ভয় দেখায়। জেনে রাখেন, আমি আবার ফেল করলেও কেউ কিছু বলবে না।’
তাতে আমার কি?
‘গতবছর, আমি যে কি ভয় পেয়েছিলাম, মনে করেছিলাম সবাই এসে… এক্কেবারে, কিন্তু কেউ কিছু বলে নাই, একটা মে আত্মহত্যা করেছিল তো, ওরাই বেশি ভয় পেয়েছিল’।
কারা?
‘যারা রেজাল্ট জানতে এসেছিল। ভাইয়ার বন্ধুরা। ভাইয়া শুধু বলেছিল, আর পড়াশুনা করতে হবে না, আজকেই বিয়ে দিয়ে দাও’।
তারপর?
‘তারপর কি? তারপরে বিয়ে করেছি’।
তোমার বিয়ের বিষয়টা কিন্তু স্পষ্ট করে কিছু বলছ না।
‘তার মানে? সবই তো বললাম, সব জেনেই তো…..’
কি?
‘আপনার কি হয়েছে বলেন তো, বাড়িতে কেউ কিছু বলেছে? সেদিনও রাতে হঠাৎ করে বাইরে গিয়ে কোথায় থেকেছেন!’
‘আজ আবার সেদিনের কথা বলছ কেন? সেদিনেও তো তুমি ফোন করেছিলে, অনেক কথা বলেছিলাম।’
‘কি বলেছিলেন?’
‘তোমার আসলে পাশ করার ইচ্ছে নাই, তুমি অনেক কিছুই ভুলে যাও, অনেক কিছুই গোপন করার চেষ্টা কর।’
‘কি গোপন করলাম?’
‘দেখ, এখন কিন্তু তুমি ছোট নেই, তোমার বিয়ের কথা আগে অনেকবার শুনেছি, কিন্তু এবারের বিষয়টা কিন্তু ভিন্ন।’
‘মানে?’
মনে করার চেষ্টা কর।
‘কি?’
ছোটবেলার কথা।
‘ছোটবেলার কথা আমার মনে নেই।’
‘ভুলে যাওয়া কথা না, যা ভুলে যাওনি তা কেন অস্বীকার করতে চাচ্ছ?’
‘কি অস্বীকার করছি?’
‘তুমি হয়ত ছোটবলার কথা সত্যিই অনেক কিছু ভুলে গেছে, কিন্তু মাত্র কয়েক মাস আগের কথা, তুমি ফোনে যা বলেছিলে?’
‘আমি ভুলি নাই। তুমি আমাকে ভুলে গেছিলা।’
‘তাই? তুমি আমার কথা সব ভুলে গেছ।’
‘সব ভুলি নাই।’
তোমার লক্ষণটা ভাল না।
‘মানে?’
পরে বলব।
‘এখন বলেন।’
‘পরে বলব, তুমি আমার কথা ভুলে যাও কেন, তাই বল।’
‘ভুলি না, ভুলি না, একটা কথাও ভুলি নাই।’
‘তা হলে বললে না কেন? গোপন করছ কেন?’
‘মোটেও না, আমি আপনাকে যা বলেছি, তা কোন মেয়ে……. আমি জানিনা বলে কিনা? আমি আপনাকে খুব অাপন ভাবতাম।’
এখন ভাব না?
‘ভাবি তো।’
তাহলে, বল?
‘কি?’
সেদিন যা জানতে চেয়েছিলাম!
‘আমার এত মনে থাকে না, আপনি বলেন, আগে বাসায় আসেন।’

কয়েক মাস হল, ও’ যখন প্রথম মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে, লোকটা সত্যিই বিস্মিত হয়। হঠাৎ ও’র কন্ঠ শুনে বিশ্বাস করতে পারেনি। কিন্তু, ছোটবেলার কথার টোন, ভাষাটাও বুঝি ধরে রেখেছিল লোকটার জন্য। ধ্যান করা মানুষ, বেশি কান্নাকাটি, হাসাহাসি করার অভ্যাস নাই- শুধু মনে আচমকা ইচ্ছে হয়েছিল -সত্যি ভাল আছে তো!, জানার, স্বচোক্ষে দেখার। কয়েক দিন অনেক কথা বলে – লোকটার কাছে মনে হয় ৫ম শ্রেণীর সেই ছোট মেয়ে যেন একদিনেই ষোল ছুই ছুই। যখন ও’ বলে ‘একটা মেয়ে কতকাল একা থাকতে পারে, কতকাল অপেক্ষা করবে আপনার জন্য’ লোকটা সত্যিই বিস্মিত হয়, লজ্জিত হয়। অপরাধবোধ থেকেই ও’কে সুযোগ দেয়, নিজের করনীয় সম্পর্কে জানতে চায়। ও’র ভালবাসায় কোন ঘাটতি ছিল না কিন্ত ও’ নিজের অপারগতার কথা বলে, ‘আমি আগের মত নেই, ‘খুব খারাপ, খুব নষ্ট হয়েগেছি স্যার’। লোকটা বলে, ‘তোমার সম্পর্কে আমি অনেক কিছুই জানি। আমার কথা শুনলে, আমার কাছে সত্য না লুকালে, আমাকে আপন ভাবলে হয়ত এমন হত না। তুমি বল, যা বলবে আমি তাই করব।’ একদিকে নীতি অাদর্শ, অধর্ম বিরোধী প্রেম অন্যদিকে ও’র ভালবাসা – ভালবাসার দাবি এবং ও’র প্রতি লোকটার ভালবাসা – সবকিছু মিলে লোকটা সবকিছু ছেড়ে দিতেও প্রস্তত কিন্তু ও’র অসন্তুষ্টি নিয়ে মুহূর্ত কাটাতে চায় না, বিধাতার মুখোমুখি হতে চায় না – সেটা বুঝি নড়ক বাসই। লোকটা জানতে চেয়েছিল, তুমি কাকে ভালবাসো, কাকে বিয়ে করতে চাও?
কাউকে না। বিয়েই করব না!
‘কেন যার সাথে বিয়ের কথা চলছে? তাকে ভালবাস না?’
প্রশ্নই উঠেনা।
তাহলে?
‘কি? আমার কথা না ভেবে নিজের কথা ভাবেন। আপনি এত বড় মানুষ, পড়াশুনা করেছেন, আপনি নিজেও তো বিয়ে করছেন না।’
‘সে কারণ তো তুমি জানো। কিন্তু পুরুষ আর নারীর মধ্যে পার্থক্য আছে। অামি বিয়ে না করে থাকলেও, কোন নারী জোড় করে পাপ করাতে পারবে না, কিন্তু পুরুষদের মধ্যে অনেক ধার্মিকও আছে, যারা এতটাই দুর্বল পরে পরে অবস্থার পুরুষ যে, কেবল দুর্বল নারীর উপরই অনধিকারে অধর্মের জুলুম করে।’
‘স্যার, এসব কেন বলছেন, আমার মনে হয়- আমি মরে যাই।’
‘থামো, আমার অাগে না। আমি তোমার জন্য, তবে ব্যর্থ হয়েছি, যদিও আমরা দায়ি না।’
মানে?
আমারও মরতে ইচ্ছে করে, তা তোমার জন্য।
কি অাজেবাজে কথা বলছেন ভাল লাগে না।
‘ব্যর্থ নাহলে এতকাল তুমি শতভাগ চাহিদার জন্য আমাকে কাছে পেতে, সবকিছুই পেতে অথচ মলিন হতে হতনা।’
‘অামি কিছু বুঝি না, আমার জন্য কেন মরতে চান?’
‘ঠিক সেরকমটা না, তোমার মলিনতার জন্য যারা দায়ী তাদেরকে মেরে ফেলাটাই মনেহয় সঠিক ধর্ম – প্রয়োজনে মরব, এভাবে বেঁচে থাকার থেকে যত দ্রুত তাদের মারা যায় ততই শান্তি – সেটাই সঠিক।’
‘স্যার, আপনি কি বলছেন! পাগল হয়ে গেলেন! সেই ছোটবেলা খায়ের কে মেরে ফেলার কথা বলেছিলেন। বিশ্বাস করেন আমার কোন মলিনতা নাই।’
‘আছে, তা নাহলে তুমি এইখানে থাকতে!’
কোন খানে? এইখানে।
‘আসবো ক্যামনে….। স্যার আপনি আমাকে ভুলে যান।’
তুমি, খায়ের’কে খুব ভালবাসতে, না?
না, আমি কাউকেই ভালবাসতাম না।
তাহলে?
‘তাহলে আমি কি করব? আপনি আসলে আসেন, না হয় কোনদিন কথা বলব না।’ ‘পারবে না, তুমি কোনদিন আমাকে ভুলতে বারবে না, আমি চাই তুমি সুখী হও, কিন্তু…..।’
কিছুটা কিছুটা দুকরে উঠা বুকে বলে, ‘আমার সুখী হওয়া লাগবে না, ঠিকই সব ভুলতে পারবো’ বলে ফোন কেটে দিয়েছিল।
কিছু সময় পরে আবার কথা হয়, ‘স্যার আপনি একদিনের জন্য অাসেন।’
‘তোমাকে নিষেধ করেছিলাম স্যার ডাকতে ভুলে গেছ?’
‘না কিচ্ছু ভুলি নাই, আপনার কথা ভোলা সম্ভব না।’
একদিনের জন্য আসবো কেন?
আমি মনে হয় মরে যাবো,….। ….
‘আবার সেই কথা। তুমি আসলে আমাকে ভুল গেছে, ভুলে যেতে চাও, মোটেও ভালবাস না।’
আপনি এসে দেখেন ভুলেছি কিনা।
‘হ্যা, অনকে কিছুই ভুলেগেছ, নইলে অনেককিছু বলতে।’
কি?
‘আমি যা জানি না, যা জানতে চাই, অথচ তুমি গোপন কর।’
তোমার কাছে কিচ্ছু গোপন করিনা।
‘তুমি হঠাৎ করে ওড়না পরে কেন, এসেছিলে?’
কবে?
ছোটবেলা যখন ওড়না পরতে না।
মুখ ঢাকা হাসিতে বলে, ‘বেলা’ মানে কি?
তোমার সাথে কথাই বলব না।
‘রাগ করছেন? ঠিকই তো, ওড়না পরতামনা, আবার পরছিলাম কেন? আপনি আমাকে…..কিছু বললেন না কেন?’
‘তোমাকে আমি কিছুই বলব না, তুমি প্রশ্ন এড়ালে।’
কৈ এড়ালাম?
বেলা মানে জিজ্ঞাস করলে কেন, বেয়াদব?
সেরকম কোন দিন ছিল না!
‘বুঝছি, যাহোক, তুমি শাড়ি পরে কাকে প্রথম ডেকে ছিলে?’
কবে?
আবার? তোমার তো ভুলে যাবার কথা না।
সেগুলো তো কথা না স্মৃতি।
তোমার লক্ষণ তো ভাল না।
মানে?
‘মাদ্রাসায় যাবার আগে তোমার নাম তো সাথী ছিলনা, সাথী নামটা পেলে কিভাবে?’
আমার হাসবেন্ড ডাকে….
‘তার সম্পর্কে যতটুকু বলেছ, তাতে তাকে হাসবেন্ড পরিচয় দেয়া ঠিক হয়নি। হবুহাসবেন্ড বলতে পারতে। সে বিয়ে করতে চেয়েছে, তুমি যতটুকু বলেছ তাতে এমন কিছু হয়নি যা বিয়ের পরে হয়, কাজেই হাসবেন্ড না বলাই ভাল। যাহোক, সেদিন চাঁন রাতের সন্ধায় তুমি প্রথম শাড়ি পরে আমার সামনেই দাড়িয়েছিল, তারপরের কথা মনে অাছে? -তোমার গোপন রাখা সত্যগুলোই যেন তোমার ছোটবোন হয়ে মাঝে বাঁধা হয়ে দাড়ায়। মনে পড়ে না, পরে উঠনে দাড়িয়ে – কি অাশা করেছিলে, কোথায় যেতে চেয়েছিলে?’

সেদিন ফোনে দু’জনের অনেক কথাই হয়েছিল। লোকটা ও’র কাছে জানতে চেয়েছিল ‘তোমার জীবনের প্রথম সবথেকে আনন্দের, সুখের, মজার মুহূর্তটা কখন ছিল, তখন তোমার কাছে কে ছিল?’ ও’ জবাব না দিয়ে এড়িয়ে যায়, বলে ‘সেরকম কোন মুহূর্ত নেই।’

আমি সেদিনও তোমার কাছে তোমার প্রথম সবথেকে আনন্দের আর সব থেকে কষ্টের, এবং ঘৃণার মুহূর্তের কথা জানতে চেয়েছিলাম, তুমি বলনি।
এত কথা এক সাথে বলা যায়না। কাজলীর মা’ও বসে আছে। আপনি বাসায় আসেন।
তুমি আসো, আমার সাথে খাবে।
ধুত।
কি?
একদম মেরে ফেলবে।
কে মারবে? বল।
কেউ না।
তুমি বল না যে – এটাই তো সমস্যা।
ধুত।
শোন শোন, ঠিক বলেছ, সবকিছু বলা যায় না, জানতে তো হয়, চার টাকা দামের পরাটা গুলো কবে যে ছোট হতে হতে তিন টাকার সাইজ হয় তা কিন্তু বলা কঠিন, যখন পাঁচ টাকা দাম হয় তখনই বলা যায়।
মানে?
আমি প্রথম যখন এখানে আসি তখন দাম ছিল তিন টাকা। তিনটা পরটা, ডিম, সবজি উনিশ টাকা। কিছুদিন পরে, সাইজটা বেশ বড় হয়ে দাম চার টাকা হয়। আরো কিছুকাল পরে দাম পাঁচ টাকা হয়, সাইজও বড় হয়, কিন্তু ছোট হবার খবর নজরে আসে না।
আপনার সাথে কথা বলতে আমার আর ভাল লাগছে না।
আমারও ভাল লাগছে না- তুমি আমাকে আপন ভাব না।
‘হেই হেই – আপনি কে যে, আপন ভাবতে হবে? আমি কি না বলছি, অন্য কাউকে বললে…। মরে গেলে বুঝবেন।’
‘আমি এখনই আসতেছি, লাইন কেট না প্লিজ।’
‘যাকে ভাল লাগে তার সাথে কথা বলেন, ভাল লাগলে কাজলীরে পড়ান, না পড়ালে এসে কাজলীর মাকে জানাইয়া যান।’
তুমি নাকি আমার সাথে রাগ করনা?
আপনি কে যে আপনার সাথে রাগ করতে হবে?
এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে?
আপনাকে চিনিই না, আবার ভুলব কি?
ধন্যবাদ তোমাকে, আমি এখনই মরে যাব।
হৈ মিঞা, আপনার কি হয়েছে বলেন তো!
‘তোমার কি? তোমাকে আর আমার হৃদয়ের মধ্যে ঢুকতে হবে না, তোমার হৃদয়ে যে আছে তার হৃদয়ে গিয়ে ঢুক।’
‘এখন…আপনাকে, আপনাকে…আমি নিজেও… একটুকু দেরি করব না- আপনাকে দেখতেও আসব না – মনে রাইখেন।’
মরে গেলে মনে রাখব কিভাবে।
মরলে মরেন, আমাকে শুনাচ্ছেন কেন?
সরি।
‘এহন….,’ কিছুটা কাঁদোকাঁদো কন্ঠে, ‘আমি তো ভুলে যাই; আপনি? -মনে রেখে কি করছেন, আপনাকে যা বলেছি তা একটা কলা গাছকে বললেও ফল হত। অাপনি যে কি তা এখন বলাও দরকার।’
‘আমাকে সম্মান করতে হবেনা। আমি তোমার টিচার না, তুমি যা ইচ্ছে তাই বলতে পার।’
আপনি কি মানুষ নাকি?
তাহলে?
‘আপনি কথা বলবেন না, অাসেবনও না। আমি অনেক ছোট হয়েও আপনাকে অনেক কিছু বলেছিলাম, বিশ্বাস করে। আপনি একটা ইতর। আপনি তো আবার কিছু ভুলে যান না, শুধু মনে রাখেন; না?’
‘আচ্ছা ঝগড়া করেনা, সোনা, তুমি আগে বললে তো অাগেই মরে যেতাম, আর দেরি হবেনা। শুধু জেনে রেখো, তুমি আমার সাথে ঝগড়াও করতে পার, রাগও করতে পার।’
অত সোজ না।
কি?
‘আমি কারো সাথে ঝগড়া করিনা। শুধু কাজলীর মা’কে বলেছিলাম, আপনি সময়মত ঠিকই আসবেন, তাই এত কথা বলালাম।’
আমি জানি তো?
কি জানেন?
তুমি মিথ্যাবাদী!
কি মিথ্যা বললাম?
‘তুমি তো অনেক মিথ্যা বল, নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি, কয়েকদির আগের ফোনে যে কথা বলেছিলে?’
তো?
‘তখন আমি নিষেধ করেছিলাম, তারপরেও তুমি কি বলেছ?’
কি বলেছি?
কেন
‘সেদিনও আমি তোমাকে সাবধান করেছিলাম, বলেছিলাম শুধু যাকে ভালবাসো, যাকে বিয়ে করতে চাও তাকেই কেবল ভালবাসার কথা বলেবে, অন্যদের না। তুমি ভুলে গেলে কেন?’
কৈ?
আমাকে লিখেছ কেন?
‘এহন..’ হেসে দিয়ে বলে, ‘ভাল হবে না কিন্তু স্যার।’
আমাকে ভালবাস, আগে বলনি কেন?
কে ভালবাসে অাপনাকে?
আমাকে কেন তুমি, ‘তুমি’ ‘তুমি’ বলেছ; I love you লিখেছ?
আচ্ছা আর বলবা না। ভুল হয়েগেছে, বাবা।
‘হৈই, এক থাপ্পর দিব, আমি নিষেধ করিনি, কারণ জানতে চেয়েছি?’
কেন লিখেছ
কেন লিখেছ
‘আপনি কি বলেন তো। আমি আপনার কাছে ঋণী হয়ে আছি, তাই। কিন্তু, আমি আপনার দাবীর তলে থাকতে চাইনা। বাসায় আসলে আসেন, আপনার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করব নাকি।’
‘তুমি আসলে অনেক বড় বড় – মানে বড়দের মত কথা বলছ, আমিও বলছি। কিন্তু তুমি সেই ছোট্ট নিষ্পাপ ফুল- মনে হয় তোমাকে জাপটে ধরে বুকের মধ্যে ঢুকায়ে রাখি।’
অনেকটা ভিন্ন কন্ঠে, ‘আমার কিন্তু ভাল লাগে না, ঘরে আসেন।’
‘উদ্ভট কথা বলবে না, ঋণ মানে? তাহলে আমিও তো তোমাদের কাছে ঋণী। তোমার উপর আমার কোন দাবী নেই, থাকবেও না, কিন্তু আমি তোমাকে ভালবাসি। তাই এটা আমার আকাঙ্খা তুমি আমাকে আপন ভাবো আর সবকিছু আমাকে বল। তোমার সব প্রয়োজনের কথা আমাকে বল।’
‘অনেকটা দৃঢ় কন্ঠে বলে, আমি ঠিকই বলেছি, কিন্তু, আপনি……। আর বেশিদিন কিন্তু আমাকে পাবেন না। বাসায় আসেন।’
কিন্তু আমি কি?
বাসায় আসেন, আমার কিন্তু কিছু ভাল লাগে না।
তোমাদের বাড়ি যেতে আমার মোটেও ভাল লাগে না, তুমি চলে এসো।
কেন?
আমার সাথে খাবে।
সেটা সম্ভব না।
কেন? ১০ মিনিটেই আসতে পারবে।

আমি একা যাব কিভাবে, আমাকে মেরে ফেলবে……..।
‘তুমি আবারো ভুল করছ, আমি যেদিন এসেছিলাম সেদিন, তারপরে, সেদিনও তুমি…….’
২৮/১২/২০১৮ পরবর্তী অংশ
(চলমান)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *