শুভ জন্মদিন মাহফুজ আনাম জেমস

বব মার্লে, বব ডিলান, জিম মরিসন কিংবা মার্ক নফলার শোনা মানুষের সংখ্যা আমাদের দেশে খুবই কম। খুবই কম বলেছি এই অর্থে যে, কিছু সংখ্যক মানুষ এখনো তাদের গান শুনে সেটা যেমন সত্যি তেমনি এটাও সত্যি যে, অনেকেই এদের নামটা শুনলেও গান শুনে নি। কিন্তু এই পুরো দেশের মানুষ একটা নাম ঠিকই চেনে, একটা নাম ঠিকই জানে, এবং এই নামের মানুষটা কি করতে পারে সেটাও বুঝে। বলছিলাম “মাহফুজ আনাম জেমস” এর কথা। এটা ভেবে ভুল করবেন না যে আমি এদের সাথে জেমসের তুলনা করছি। আমি শুধু বুঝাতে চাচ্ছি এ দেশের মানুষের কাছে এই নামটা, এই মানুষটা, কতটা জনপ্রিয়।

জেমসের জীবনের গল্পটা মোটামুটি সবারই জানা। গানের জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে আসার সাহস সবার থাকে না। গানের জন্য নিজের পরিবার ছেড়ে চলা আসা মানুষটার ছোট্ট পরিবারকে গানই অনেক বড় করে দিয়েছে। তাইতো স্টেজে দাঁড়িয়ে গুরুকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, “তোমরা যতদিন আছো আমিও ততোদিন আছি।”

এখন পর্যন্ত জেমসের চারটা লাইভ কনসার্ট দেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করেন এই চারটা কনসার্ট শেষ করে খালি হাতে ভাঙা গলায় বাসায় ফিরলেও বুকের মধ্যে করে আরো কিছু একটা নিয়ে আসতে পেরেছি। আমি একদম সামনে থেকে দেখেছি মা গানটায় সদ্য মা হারানো ছেলেটা কিভাবে চিৎকার করে কান্না করেছে। আমি দেখেছি বাবা গানটায় বহুবছর আগে হারানো বাবাকে মনে করে একটা মেয়েকে চোখের জল ফেলতে। কিংবা প্রেমিকা হারানোর ব্যথায় কোনো এক ব্যর্থ প্রেমিককে “কবিতা তুমি স্বপ্নচারিণী হয়ে খবর নিও না” গাইতে শুনেছি।

আমাদের সমাজে কিছু ছেলে আছে যারা চাইলেই নিজের জেদে অনেক কিছু করার ক্ষমতা রাখে। দুর্ভাগ্যবশত এই ছেলেগুলো কখনোই সমাজের চোখে ভালো হতে পারে না। কিন্তু এদেরও একটা ভালো মন আছে। এদের জেদের ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর প্রেম আর ভালোবাসা। কিন্তু এই একটা মানুষ ছাড়া তাদের নিয়ে গান করবে দূরের কথা আর কাউকে কথাও বলতে দেখি নি কোনদিন। আমি নিশ্চিত জেমসের মত আর কেউ এই পাগলাটে ছেলেদের মুখে হাসি ফুটাতে পারতো না। গুরু সেটা নিজেও জানে নিশ্চয়ই। এই মানুষটা যখন স্টেজে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোনে বলে “আমার দুষ্টুছেলের দল কেমন আছিস তোরা” শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়।

“লেইস ফিতা” কিংবা “সুলতানা বিবিয়ানা” গানগুলো করার ক্ষমতা এই পৃথিবীতে আর কারো নেই, কারো নেই।

আমি তখন খুব ছোট। এতটাই ছোট যে স্কুলে যাওয়া আসা করতাম মায়ের হাত ধরে। আমাদের বাসার সামনেই একটা সিডির দোকান। এই সিডির দোকানে যদি দিনে দশটা গান বাজতো তবে তার মধ্যে আট গানই ছিলো জেমসের। ছোট ছিলাম বলে বুঝতাম না এই মানুষটা কেন প্রতিদিন একই গান বারবার বাজায়। কিন্তু আজ যখন সেইসব দৃশ্যগুলো ঝাপসা ঝাপসা চোখে ভেসে উঠে তখন বুঝতে বাকি থাকে না এই হাসিখুশি মানুষটারও কিছু চাপা কষ্ট আছে। আর পৃথিবীর সব ঔষধ যেখানে ব্যর্থ তখন গুরুর গানই ঔষধ হিসেবে কাজ করে।

এই মানুষটা না থাকলে ঘোরগ্রস্ত হাজার হাজার নিশাচর ছেলে- মেয়ে কবেই এই সুন্দর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতো। এদের সবচেয়ে খারাপ সময়টায় পৃথিবীর সব ঔষধ ব্যর্থ হয়ে গেলেও জেমসের মত কিছু মানুষের গান মহা ঔষধের মত কাজ করে।

আবার হতে পারে সে কোন রিকশা চালক কিংবা কোন শিল্পপতির সন্তান তবে এই মানুষটার গানের গলা আর গানের লাইনই তাদেরকে একসাথে এক লাইনে এনে দাঁড় করাতে পারে। মনে হয় যেন চুম্বকের মত আকর্ষণ করে।

গুরু আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। বিদেশে পর্যন্ত নিজের প্রতিভা দিয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। আজ যে কয়টা ছেলে গিটার নিয়ে টুংটাং করে তাদের স্বপ্নের মহানায়কও এই মাহফুজ আনাম জেমস। এই মানুষটাই আমাদের দেখিয়ে দেয় কিভাবে গানটাকে মনে ধারণ করতে হয়, দেখিয়ে দেয় কিভাবে মনের ভেতরের চাপা কষ্টগুলোকে গিটারের ছয় তারে উড়িয়ে দিতে হয়।

আজ থেকে অনেক অনেক বছর পরে ভোরের আলোয় এই সুন্দর পৃথিবীতে আরো অনেকেই আসবে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এদের মনেও অনেক চাপা কষ্ট জমা হবে। কিন্তু ভয় নেই। এই মহানায়কই তখন জাদুকরী গলা নিয়ে ঔষধ পৌঁছে দিবে তাদের সকলের ঠিকানায়।

শুভ জন্মদিন গুরু। আমার মত তোমার অনেক অনেক কোটি ভক্ত তোমার গান আর গলায় জীবনের অর্থ খুঁজে নিতে পারে।

“দুখিনী দুঃখ করো” না কিংবা “জেল থেকে বলছি” শুনার জন্য হলেও বারবার এই পৃথিবীতে ফিরে আসতে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *