ঝাপসা পৃথিবী

নবনিতা বসে আছে রিপনের বাসার ড্রয়িং রূমে। তার সামনে রিপনের বাবা আকতারুজ্জামান সাহেব গম্ভির মুখে বসে আছেন। তার হাতে একটা জ্বলন্ত বেনসন। আকতারুজ্জামান সাহেব চেইন স্মোকার হলেও, তিনি এখন তাকিয়ে আছেন নবনিতার দিকে। অনেকটা অবাক ভাব কাজ করছে তার মধ্যে। কিন্তু তার মুখটা এমন ভাবে খেলা করছে যেন মনে হচ্ছে তিনি বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে আছেন নবনিতার দিকে। নবনিতার অস্বস্তি লাগছে না। তার গরম লাগছে।

নবনিতা বসে আছে রিপনের বাসার ড্রয়িং রূমে। তার সামনে রিপনের বাবা আকতারুজ্জামান সাহেব গম্ভির মুখে বসে আছেন। তার হাতে একটা জ্বলন্ত বেনসন। আকতারুজ্জামান সাহেব চেইন স্মোকার হলেও, তিনি এখন তাকিয়ে আছেন নবনিতার দিকে। অনেকটা অবাক ভাব কাজ করছে তার মধ্যে। কিন্তু তার মুখটা এমন ভাবে খেলা করছে যেন মনে হচ্ছে তিনি বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে আছেন নবনিতার দিকে। নবনিতার অস্বস্তি লাগছে না। তার গরম লাগছে।
আকতারুজ্জামান সাহেব নবনিতাকে আরেকবার ভাল মত পরখ করে দেখলেন। দেখতে শুনতে ভালো। মাথায় লাল টিপ দেয়া, তবে তা বরাবর মাঝখানে বসে নি। একটু ডানে সরে আছে। মুখটা হালকা খোলা করা স্বাস নিচ্ছে। এটা দেখেই আকতারুজ্জামান সাহেবের কাছে নবনিতাকে মাছের মত মনে হল। তখন খেয়াল করলেন তার মুখটাও অনেকটা মাছের মত। তিনি মনে করলেন একটু পরেই বলে বসবে, “আঙ্কেল আপনাদের ওয়াশ রূমটা কোথায়? নিস্বাস নিতে পারছি না, পানি লাগবে” । কিন্তু নবনিতা বলল না। অবাক হয়ে ঘরের জিনিস পত্র দেখতে লাগল।

নবনিতা মেয়েটাকে রিপনের মায়ের অর্থাৎ রাশেদা বেগমের কাছে ভালই মনে হয়েছে। কারণ ঘরের কলিংবেল বাজানোর পর যখন আকতারুজ্জামান সাহেব দরজা খুললেন তখন নবনিতা তাঁকে কদমবুসি করল। বর্তমানের ফাজিল ছেলে-মেয়েদের মত হাঁটু পর্যন্ত না, একেবারে পায়ের উপর হাত বুলিয়ে মাথায় স্পর্শ করল। তখন আকতারুজ্জামান সাহেব অবাক না হয়ে বিরক্ত হয়েছিলেন। তিনি এই সালাম-টালাম পছন্দ করেন না। তখন তার বিরক্ত মুখটা দেখে মনে হল, পাঁচ বছরের একটি ছেলে তার বাবার হাত ধরে হাঁটছে আর অবাক করে তাকিয়ে আছে আকাশের অর্ধেক খাওয়া চাঁদটাকে।

নবনিতা কদমবুসি করে দাড়িয়ে থাকল। আকতারুজ্জামান সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, “ কি চাই? ” । নবনিতা অনেক সাহস নিয়ে বলেছিল রিপনের কথা। মনে মনে ভাবছিল হয়ত তাকে থাপ্পর আকতারুজ্জামান সাহেব মারবেন। নাহ, নবনিতাকে হতাশ হতে হল। আকতারুজ্জামান সাহেব তাঁকে ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। রিপনের মা দরজার পর্দার আড়াল থেকে তাঁকে দেখছিলেন। নবনিতা সেদিকে তাকাতেই হুড়মুড় করে চলে যেতে গিয়ে কিসে সাথে যেন বাড়ি খেলেন। ঠুং ঠুং করে বাসন পড়ার আওয়াজ হল।

“তুমি রিপনের বন্ধু?”
নবনিতা উপরে নিচে মাথা নাড়ল। আকতারুজ্জামান সাহেব ধমকের সুরে বললেন
“শব্দ করে উত্তর দেবে”
“জ্বি আচ্ছা”
“ক্লাস মেট”
“জ্বি না”
“একসাথে অভিনয় কর?”
“জ্বি না”
“জ্বি না বলা কি তোমার অভ্যাস?”
“জ্বি না”
“রিপন কি তোমাকে বিয়ে করেছে?”
“জ্বি”
“আজকে তুলে আনার কথা। তাই তো?”
“জ্বি”
নবনিতা মাথা নিচু করে বসে ছিল। এই প্রশ্নের পর মনে মনে বলছিল, হে মাটি তুমি দ্বিধা হয়, আমি সেধিয়ে যাই।
“নাম কি?”
“জ্বি, নবনিতা”
“জ্বি জ্বি, করবা না। মনে হয় ছাগল ম্যা ম্যা করছে।”
“জ্বি আচ্ছা”
“আবার!”

নবনিতা চুপ করে গেল। আকতারুজ্জামান সাহেব বললেন-
“তুমিকি ধর্ম কি?”
“জ্বি হিন্দু”
“হিন্দু না বল, সনাতন ধর্ম। হিন্দু বলে কোন ধর্ম নাই। যারা সিন্ধু নদের তীরে থাকে তাদের হিন্দু বলে। তাই ভারতকে হিন্দুস্থান বলা হয়। তার অর্থ সেখানকার মুসলমানরাও হিন্দু। বুঝেছ?”
“জ্বি, বুঝেছি। আমি সনাতন ধর্মী”
“Great! তোমার সাথে বিয়ে কবে হয়েছে?”
“এক মাস হল”
“বাসার কেউ জানে?”
“জ্বি”
“ভাল। তুমি কি জানো যে রিপন ইনসমনিয়ার রোগী? সারারাত ভুতের মত হেটে বেড়াত? ট্যাবলেট পুড়িয়ে খেত?”
“জ্বি জানি”
“তারপরও তুমি কি ওর সাথে থাকতে পারবে?”
“জ্বি পারব”
“তুমি কি জানো যে ওকে রিহ্যাবে ভর্তি করা হয়েছে?”
নবনিতা অনেক অবাক হয়ে আকতারুজ্জামান সাহেবের দিকে তাকাল। এখন আকতারুজ্জামান সাহেবকে দেখতে ছোট খাট ব্যাঙ এর মত দেখাচ্ছে। ব্যাঙ হাতে সিগারেট ধরে আছে আর একটু পরপর টান দেয়ার চেস্টা করছে। খুবই সুন্দর দৃশ্য।
“কি জানো না?”
“জ্বি না” নবনিতা আবার নিচের দিকে তাকাল।
“শোন, ওকে আজ সিঙ্গাপুর পাঠিয়ে দেয়া হবে। No offence! তোমার সাথে কি ওর কোন intercourse মানে… কোন …. ….”
“জ্বি না। ও আমাকে ছোয়ার চেস্টাও করে নি।”

আকতারুজ্জামান সাহেবের কথায় একটু ইতস্তত বোধ করছিল নবনিতা। এই পর্যায়ে আকতারুজ্জামান সাহেবের উঠে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। একটু পর তার এবং তার স্ত্রীর রাশেদা বেগমের মধ্যে কথা কাটা কাটি শোনা গেল। এক পর্যায়ে আকতারুজ্জামান একটু গম্ভির গলায় বললেন,
“যাও, আলমারি থেকে ৫০ হাজার টাকা মেয়েটিকে দিয়ে বিদায় করে দাও। বলবে নতুন করে জীবন শুরু করতে। আর রিপনকে ভুলে যেতে”
রাশেদা বেগম মিন মিন গলায় কি জেন বললেন ঠিক বোঝা গেল না। তিনি মৃদু পায়ে নবনিতার কাছে এলেন। নবনিতা তখনও মেঝের দিকে তাকিয়ে।
রাশেদা বেগম এসে বললেন-
“মা, কিছু মনে কর না। এই টাকাটা রাখ। আর চলে যাও। রিপনকে ভুলে যেও। আর পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
বলেই ডুকরে কেদে উঠলেন। নাহ নবনিতা তখনও কাদেনি। সে চুপচাপ উঠে গিয়েছিল সেখান থেকে। তার সাথে আনা প্যারাডাইজ কোম্পানির বিরাট ব্যাগটা নিয়ে রাস্তার মোড়ে এসে দাড়াল সে। হাত দিয়ে আকড়ে ধরে আছে পত্রিকা দিয়ে মোড়ান টাকার বান্ডিল। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে।

এই অবস্থায় নবনিতা ঘরে ফিরে যেতে পারবে না। একটাই করণীয়। ডুব দিতে হবে চিরকালের জন্য। সে রিকশা নিল। চলে গেল কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। রেললাইনে নেমে হাটা শুরু করল। একটাই চিন্তা, কি করবে সে এখন? একটা ট্রেন জাহাজের ঢুলে ঢুলে তার দিকে এগিয়ে আসছে। প্রথমে সে লাইন থেকে নেমে গেল হাটতে থাকল। আশে পাশে কেউ কিছু বোঝার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। সুন্দন ফুটফুটে একটি মেয়ে নিজের মৃত্যুকেই বেছে নিল। একটু প্রান ছিল তার দেহে। চারিদিক ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। তার কাছে মনে হচ্ছিল না যে সে মারা যাচ্ছে, তার কাছে মনে হচ্ছে দুর্নিবার এই মুক্ত পৃথিবী ঝাপসা হয়ে আসছে। ভালবাসা ঝাপসা হয়ে আসছে। আর কিছুই না।

নবনিতার হাতে একটা বড় শীল পাথর আটকাল। সে মনে করল যে রিপন তার হাত ধরেছে। মৃত্যুর নিকটে এসেও সে ভালবাসা উপলব্ধি করল। মৃত্যকে অগ্রাহ্য করে শক্ত করে ধরল পাথরটা। ঝাপসা পৃথিবী তে তার কাছে তার ভালবাসাটুকুকেই শুধু স্পষ্ট মনে হল। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ঝড়ো বৃষ্টিতে পরিণত হল। Cats and Dogs । ভালবাসার আরেকটি মৃত্য এই ঝাপসা পৃথিবী বুঝতে পেরে ডুকরে কেঁদে উঠল।
পারল না, থামাতে পারল না

৯ thoughts on “ঝাপসা পৃথিবী

  1. গল্পটা ভালোই হয়েছে। কিছু কিছু
    গল্পটা ভালোই হয়েছে। কিছু কিছু যায়গায় হুমায়ূন আহমেদের লেখার ছাপ চলে এসেছে। সেটা বড় কোন ব্যাপার না। আসতেই পারে। লিখতে থাকুন, আপনি ভালো ফিকশন লিখতে পারবেন। বেশ কিছু বানান এবং বাক্য গঠনে ভুল আছে। ভুল থাকলে লেখার মান কমে যায়। ঠিক করে দিয়েন। শুভেচ্ছা রইল আপনার প্রতি। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    1. হুমায়ুন স্যারকে আমি ওস্তাদ
      হুমায়ুন স্যারকে আমি ওস্তাদ মানি। আর টাইপ করার পর আবার পড়ার ধৈর্য্য থাকে না। আগামী বার থেকে চেস্টা করব ভাই।

  2. গল্পের পরিণতিটা কি
    গল্পের পরিণতিটা কি আরেকটু মেচুর্ড হতে পারতো না ??
    তবে শব্দের গাঁথুনি চমৎকার ।।

  3. শেষ মূহুর্তে এসে লেখার ইচ্ছা
    শেষ মূহুর্তে এসে লেখার ইচ্ছা চলে গিয়েছিল। দু:খিত
    । আগামী বার চেস্টা করব। :-B

  4. “সে। হাত দিয়ে আকড়ে ধরে আছে
    “সে। হাত দিয়ে আকড়ে ধরে আছে পত্রিকা দিয়ে মোড়ান টাকার বান্ডিল। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে।”
    Why did she accept the money if she had the intention to commit suicide? Then again, what made her so surprised to know about Ripon’s Rehab admission, while she was full aware of Ripon’s drug addiction? Nobonita’s not knowing that Ripon was going to Singapore for treatment was a little far fetched. Was it too difficult an information to obtain, specially in this cell phone era? One can’t take Singapore visa over night. It takes at least 5 days, give and take, let alone other issues i.e. ticket booking, arrangement for hospital booking etc. And it is not possible to obtain Ripon’s visa without his knowledge.

    But you surely have good sense of humor. You have an easy flowing style also. Nice. Yes, there is influence of Humayun Ahmed in your style. Great writers always have their influence, that’s what makes them great. Humayun Ahmed is my most favorite too. Time will take care of that influence issue, I believe. Once again, I enjoyed your story quite a lot. Take care and keep writing. Wishing you all the best.

    1. মানুষ অনেক সময় এমন এমন কাজ
      মানুষ অনেক সময় এমন এমন কাজ করে, যেটার ব্যাক্ষ্যা সে নিজেই দিতে পারেনা। নবনিতা আর রিপন অনেকটা তেমনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *