গণিতঃ নিজেই শেখান নিজেকে

নিজেই নিজেকে শেখানো!স্বশিক্ষিত হওয়া!
মনে করা যাক,আপনি কোন দিন উচ্চতর বীজগণিত করেন নি। এবার যদি জিজ্ঞাসা করি,বইপত্রের সাহায্য নিয়ে নিজে নিজে উচ্চতর বীজগণিত আপনি শিখতে পারবেন কি?
অথবা যদি বলি, আপনি ভাষাবিজ্ঞানের স্টুডেন্ট। এখন আপনার ‘তরঙ্গ’ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকভাবে জানার ইচ্ছা দেখা দিল।বেশ কিছু বইপত্রও সংগ্রহ করলেন।কিভাবে নিজেকে নিজেই ‘তরঙ্গ’ সম্পর্কে শেখাবেন?
হ্যা,আপনি যদি নিজেই নিজেকে কোনো কিছু শেখাতে পারেন, তাহলে ঐ বিষয়ে আপনি স্বশিক্ষিত।
তবে এটা করা কিভাবে সম্ভব?

আজ আমি শুধুমাত্র ‘গণিত’ বিষয়টা কিভাবে নিজেকে নিজেই শেখানো যায় -তাই নিয়ে কথা বলব।
তবে আমাদেরকে প্রথমে যে প্রশ্নটার উত্তর জানতে হবে তাহলঃ
‘গণিত শেখা’ মানে কি?অর্থাৎ আমরা গণিতে কোন পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করলে বলতে পারবো গণিত শিখেছি?
আর আমাদের সেল্ফ লার্নিং অভিযানে ঠিক এই প্রশ্নটির উত্তর গুরুত্ব খুবই।যা কিনা আমাদের কোনদিকে কিভাবে এগোতে হবে তার নির্দেশনা দিবে।
এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে পারি,নির্দিষ্ট লেভেলের গাণিতিক সমস্যাবলীর সমাধান করতে পারলে (অবশ্য নিজের যৌক্তিক চিন্তার পদ্ধতিতে)আমরা তাকে গণিত জানে বলে ভাবতেপারি।সমস্যা যদি এদিক ওদিক ঘুরিয়েও দেয় তবে সে তার সমাধান করতে পারে।

আর এটাই যদি ‘গণিত শেখা’র সংজ্ঞা হয়, তবে আমাদের লক্ষ্য হল,
নির্দিষ্ট লেভেলের সমস্যার সমাধান নিজের চিন্তার পদ্ধতিতে সমাধান করা।

আর এটার জন্য যা করতে হবে,আমরা তাই করবো।
তার আগে আরেকটি বিষয় আমরা পরিষ্কার হয়ে নিই,
একজন শিক্ষক এবং একজন স্টুডেন্টের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?(গণিতের ক্ষেত্রে)
এক্ষেত্রে,আমি আমার কলেজের গণিত ক্লাসের ব্যাপারটি আনতে চাইঃ
এক বন্ধু, একটি সমস্যা স্যারকে দিলো।স্যার বোর্ডে লিখলেন।উপস্থিত আমরা কেউই সমস্যাটির সমাধান করতে পারি নি।
এবার স্যার, শুরু করলেন ধীরে ধীরে এগোনো।এবং এক পর্যায়ে সমাধান করলেন।
এখানে আমার বিস্ময়,
স্যারের বুদ্ধি বা দৃষ্টিভঙ্গি এমন কোন পর্যায়ে আছে যাতে করে,
সমস্যাটির সমাধান করে ফেললেন?
ঠিক যেমন আমি নিচের ক্লাসের অনেক সমস্যার সমাধান এভাবে করি?
এমনও হয়, ঠিক ওই সমস্যাটি আমি আগে কোনদিন সমাধান করি নিই,অথচ নিজের বুদ্ধিতে ধীরে ধীরে সমাধান বের করে ফেলছি,যেমনটি স্যার আমাদের উক্ত সমস্যাটির ক্ষেত্রে করলেন।
বুদ্ধিতে সমাধান করতে পারি।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে, আমি কেন পারলাম?

প্রথমত,সমস্যাটি ঠিক ভাবে বুঝেছিলাম তাই।
কিন্তু আসল প্রশ্নই বাদ পড়ে গেছেঃ
গাণিতিক সমস্যা মানে কি?
সাধারণত, পারস্পারিক সম্পর্কযুক্ত একাধিক গাণিতিক ধারণা একটি গাণিতিক সমস্যা তৈরি করে থাকে।যেখানে এক বা একাধিক গাণিতিক ধারণার মান দেওয়া থাকে এবং এক বা একাধিকের মান দেওয়া থাকে না।যেগুলোর থাকে না,সেগুলো কিন্তু যেগুলো দেওয়া থাকে তার সাথে সম্পর্কযুক্ত।আর এই সম্পর্কের হাত ধরে যেটার বা যেগুলোর মান নেই তা বের করতে বলার নামই গাণিতিক সমস্যা।

এবার আসি আগের সেই প্রশ্নে,গাণিতিক সমস্যা বোঝা মানে কি?
উত্তরে বলতে পারি,একটা গাণিতিক সমস্যায় যে একাধিক ধারণা আছে, তাদের মধ্যে রিলেশন যে আছে তা বুঝতে পারা।এবং যেটা বা যেগুলো বের করতে বলছে তাদের সাথেও যে রিলেশন আছে তা বুঝতে পারা।

এটা কিভাবে সম্ভব?
বেশ,তাহলে একটা কাজ করা যাক।
মনে করা যাক,চারজন মানুষকে তোমার সামনে আনা হল।যারা কিনা একে অপরের আত্নীয়।এখন তোমাকে প্রশ্ন করলাম, কে কার কী হয়?
তুমি সহজেই তাদেরকে প্রশ্ন করে বুঝতে পারবে।

তবে সম্পর্কসূচক শব্দগুলোর যথার্থ অর্থ যদি আপনি না জানেন বা বোঝেন তবে কি আপনি মামা-ভাগ্নের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে তা ধরতে পারবেন।ঠিক তেমনি গাণিতিক সমস্যার ক্ষেত্রে নানা কনসেপ্ট যদি আপনি ঠিকভাবে না বোঝেন তাহলে সম্পর্ক বুঝতে পারা আপনার পক্ষে সম্ভব হবে কি?
এখানে বলে রাখি,এগুলো না বুঝেও বহু সংখ্যক ছাত্রছাত্রী কিন্তু গণিতের সমাধান করছে।এক্ষেত্রে কি বলা যায়?
হ্যা,বলা চলে এটাই আমাদের গণিত শিক্ষায় একটা প্রচলিত পদ্ধতি যেখানে কিনা গণিতিক প্রক্রিয়া একটা মেশিন, অনুভূতির সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।এতে করে,অনুসরণ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা অনেক সমস্যার সমাধান করে ফেলে ঠিকই কিন্তু
গণিত শিক্ষায় যে আবিষ্কারের আনন্দ তা থাকে না।
তখন তা হয়ে ওঠে কৃত্রিম।
কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন এসেই যাচ্ছে,কিভাবে বুঝবো, গাণিতিক কনসেপ্ট গুলো?
এর জন্য প্রথমত আপনাকে দৃঢ় প্রত্যয়ী এবং প্রশ্নশীল হতেই হবে।মনের কোণে জেগে ওঠা সংশয় বা সন্দেহকে প্রশ্নের আকার দিয়ে তুলে আনতে হবে -অন্যের কাছে না হোক অন্তত নিজের কাছে। একটা গাণিতিক প্রক্রিয়া -ধরা যাক,ভাগ প্রক্রিয়া-এটা আসলে কি?কিভাবে এটা কাজ করে?
এই প্রশ্নটা শুনে অনেকেই হাসবেন, কিন্তু আমি আমি জানি, অনেকেই এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারবেন না।ঠিক এমন হবে যোগ বা বিয়োগের ক্ষেত্রেও।
যোগ বা বিয়োগ ব্যাপারটাকে আমরা একটা প্রক্রিয়া হিসাবেই শুধু কাজে লাগিয়ে গেছি।কোনোভাবে অনুভব করার মত মনোভাব নিয়ে নয়।

এবার আপনাকে কোনো একটা বিষয়ে ধারনা অর্জনের জন্য অগ্রসর হতে হবে।
প্রথমত উক্ত বিষয়ের বই খুলে পড়তে শুরু করতে হবে।ধীরে ধীরে প্রত্যেকটি কনসেপ্টকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে ফেলে এগোতে হবে।(এই ব্যাপারটি নিয়ে ভাববার খুব গুরুত্ব)।
তবে যদি বেধে যায়,তবে কোন কনসেপ্ট টি না জানার জন্য এটা বেধে যাচ্ছে তা খুজে দেখতে হবে।তারপর আগে সেই বিষয়টি জেনে আসতে হবে।এভাবে ধীরে ধীরে প্রত্যেকটি কনসেপ্ট এমন ভাবে জানতে হবে যেন আপনি আবিষ্কার করছেন।আর এটা যদি করতে পারেন,বিভিন্ন কনসেপ্টের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্ক আপনি অনুভব করতে পারবেন।
যখন কোন সমস্যার সম্মুখীন হবেন, তখন সমস্যাটির ভিতরে কি কি গাণিতিক ধারনা কার্যকর আছে সেগুলোকে বের করে ফেলতে হবে।কিভাবে তা করা যায়?
যেহুতু আগেই আপনি কনসেপ্টচুয়াল একটা ধারনা পেয়ে গেছেন এবার আপনার কাজ হবে সেই কনসেপ্ট গুলোর অস্তিত্ব উক্ত সমস্যায় আছে কিনা খুজে বের করা।থাকলে প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের রিলেশনশিপ কিভাবে গড়ে ওঠে তা তুলে আনা।এই কাজটি গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে এই প্রসঙ্গ যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তুলতে হবে,তা হল রিলেশনশিপ কিভাবে প্রকাশ পায়।সহজ করে বললে বলতে পারি,
প্রত্যকটা সূত্রই একাধিক বিষয়ের রিলেশনকেই প্রকাশ করে।অর্থাৎ সূত্রে দক্ষতাই আমাদেরকে রিলেশনটা কিভাবে বিদ্যমান তা বুঝতে বা জানতে শেখাবে।কিন্তু আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন এসেই যায়,সূত্রে দক্ষ হওয়া যায় কিভাবে?
অধিকাংশই কিন্তু প্রয়োগের মধ্য দিয়ে সূত্র মনে রাখে।অর্থাৎ কোন সূত্র কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করতে করতে ধীরে ধীরে সূত্র মনে গেথে যায়।এটাকে আমিও শ্রেষ্ঠ একটা টেকনিক মনে করি।তবে কাজটি যেন সুন্দর এবং পরিকল্পিত হয় তার জন্য একটা পদ্ধতির কথা বলছিঃ
প্রথমত,গণিতের যেকোনো বইয়ের প্রত্যকটি অধ্যায়ের শুরুতে নির্দিষ্ট বিষয়ের গাণিতিক ধারনাগুলোর উপর আলোকপাত করা হয়।যেখানে কিভাবে সূত্রগুলো এলো তা প্রমাণসহ থাকে।(অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষিকারা এই অংশটি তেমন গুরুত্বই দেন না।দিলেও এতো তাড়াতাড়ি করিয়ে সমস্যা সমাধানে নজর দেন, আসলে ছাত্রছাত্রীদের উক্ত বিষয়টি আদৌ বোধগম্য হল কিনা তা দেখার অবকাশ থাকে না।ভেবে নেন সমস্যা সমাধান করতে দিলেই শুধু হবে)।
এই অংশটি খুব ধীরে ধীরে আবিষ্কারমূলক পড়ার মাধ্যমে(নিজেই প্রশ্ন করে করে এমনভাবে পড়তে হবে যেন মনে হবে আমিই বিষয়টি আবিষ্কার করেছি)শেষ করতে হবে।সূত্রগুলো প্রমাণসহ উপলব্ধি করতে হবে।তখনও সেগুলো মনে না থাকলে সমস্যা নেই।
এখন আপনাকে একটি খাতায় প্রত্যকটি সূত্রের জন্য কিছু জায়গা তৈরি করতে হবে।যেখানে উপরে থাকবে সূত্র এবং নিচে থাকবে উক্তসূত্রের প্রয়োগগত নানা সমস্যা।কিন্তু নির্দিষ্টভাবে উক্ত সূত্রের প্রয়োগ হয় এমন সমস্যা কোথায় পাবো?

এরজন্য আপনাকে তার পর পর যে উদাহরণগুলো( Examples) আছে সেগুলোর দিকে নজর দিতে হবে।প্রত্যকে সমস্যার সমাধান যদি নিজে নিজে না করতে পারেন তবে এখান থেকেই একটা নতুন চিন্তা মাথায় আনতে হবে।আপনার এই উদাহরণগুলোই( Examples)আপনার শিক্ষক হবে।তার আগে আপনাকে আপনার একটু আগে করা সূত্রগুলোর এপ্লিকেশন দেখতে হবে।এর জন্য, প্রত্যেকটি সমস্যার সমাধানের কোথায় কোন সূত্র প্রয়োগ হচ্ছে তা খুজে বের করতে হবে।

আর এই গুলোই হল,প্রত্যকটি সূত্রের জন্য আপনার আলাদা আলাদা সমস্যা।

এভাবে সম্পূর্ণ উদাহরণের সমাধান থেকে সূত্রের প্রয়োগত সমস্যা আপনাকে তুলে আনতে হবে।প্রয়োজনে আপনাকে নিজেকে দুই একটা সমস্যা তৈরি করতে হবে।এবং এই সমস্যাগুলো নির্দিষ্ট সূত্রের প্রয়োগে বার বার সমাধান করতে হবে।বারবার।যতক্ষণ না না দেখে আপনি সূত্রটা উক্ত সমস্যায় প্রয়োগ করতে পারছেন।এভাবে করতে থাকলে সূত্রটা আপনার মস্তিষ্কে গেথে যাবে।আপনি আর ভূলবেন না।প্রয়োজনে আপনি বিভিন্ন টেকনিক অনায়াসে ব্যাবহার করতে পারেন।
আসলে এই সূত্র মনে রাখা মানেই রিলেশনশিপ মনে রাখা। আর রিলেশনশিপটা মনে রাখতে পারলেই আপনার সমস্যার সমাধান চলে আসবে।

সুতরাং এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আমরা বলতে পারছি,সূত্রের প্রয়োগের মাধ্যমে আপনি রিলেশনশিপটা মাথায় গেথে নিয়েছেন।
কিন্তু এখনো আপনার কাজ বাকী আছে খানিকটা।

এখানে কোন রিলেশনশিপটা বা সূত্রটা কাজে লাগবে -সেটা আপনাকে বুঝতে হবে।কিন্তু বুঝবো কিভাবে?
হ্যা,এবার আপনাকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে
উক্ত সমস্যাটি আসলে কি বের করতে বলছে বা খুজতে বলছে?
এবং ওই দিকে তাকিয়েই আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন সূত্রটি আনতে হবে।কিন্তু তা কিভাবে?

এটা করার জন্য আপনাকে ভাবতে থাকতে হবে।অনবরত ভাবতে হবে।আর অংকের মৌলিক পরিশ্রমের অনেকটাই দিতে হয় কিন্তু এখানেই।যারা এই স্তরে পরিশ্রমে নারাজ তারা গাণিতিক সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনে অক্ষম হতে পারে।কেননা এখানে আপনারবুদ্ধি প্রয়োগের একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তর।অনেক সময় যেতে পারে।
তবে আমার মনে হয় সমস্যাটি সমাধানের ক্ষেত্রে আপনাকে মূল সমস্যাটি নিয়ে আরো বেশিভসময় কাটাতে হবে।কেননা সমস্যার রহস্য যদি বোঝা যায় তবে তার সমাধান করা সহজ হয়।
প্রয়োজনে সমস্যাটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।এখানে আইনস্টাইনের দুটি কথা মনে রাখতে হবেঃ
“আমার হাতে যদি সমস্যা সমাধানের জন্য ১ ঘন্টা সময় থাকে তবে আমি ৫৫ মিনিটই সমস্যাটি নিয়ে ভাবি।আর ৫ মিনিট নিই সমাধানের জন্য”
“যে চিন্তায় একটি সমস্যার জন্ম হয়েছে সে চিন্তা দিয়ে তার সমাধান করা যাবে না।”

তথ্যসূত্রঃ How to solve it By Gorge Polya

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *