ঋতুপর্ণ ঘোষঃ তুমি রবে নীরবে

মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভিতর
মন খারাপের দিস্তা
মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়
ব্যকুল হলে তিস্তা

ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘তিতলি’ ছবির এ গানটি বৃষ্টিমেদুর দিনে এক মেঘ বৃষ্টি আর কুয়াশা ঘেরা পাহাড়ের অন্য জগতে নিয়ে নিয়ে যায়। ‘তিতলি’ই বলতে গেলে সচেতনভাবে ঋতুপর্ণ ঘোষের শিল্পসৃষ্টির সাথে প্রথম পরিচয়।


মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভিতর
মন খারাপের দিস্তা
মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়
ব্যকুল হলে তিস্তা

ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘তিতলি’ ছবির এ গানটি বৃষ্টিমেদুর দিনে এক মেঘ বৃষ্টি আর কুয়াশা ঘেরা পাহাড়ের অন্য জগতে নিয়ে নিয়ে যায়। ‘তিতলি’ই বলতে গেলে সচেতনভাবে ঋতুপর্ণ ঘোষের শিল্পসৃষ্টির সাথে প্রথম পরিচয়। যদিও এর আগে ‘চোখের বালি’ ছবিটি দেখেছি, কিন্তু সাধারণ দর্শকের মত ঐশ্বয্য আর প্রসেনজিতের অভিনয় উপভোগ করেছি, তখনও ঋতুপর্ণ ঘোষ যে কি জিনিস তা অজানা ছিল। এরপর যখন চলচ্চিত্র বুঝার চেষ্টা করলাম তখন আবিষ্কার করলাম ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেনের পর পরবর্তী জায়গাটি ঋতুপর্ণ ঘোষের।

এরপর আগ্রহ নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম অন্তরমহল, সব চরিত্র কাল্পনিক, দোসর, খেলা , আবহমান, মেমরিজ ইন মার্চ, দ্য লাস্ট লিয়ার, নৌকাডুবি এবং সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত চিত্রঙ্গদা, যেটি দেখি দেখি করে এখনো দেখা হয়নি। ঋতুপর্ণঘোষের আরও অনেক ছবি আছে যেগুলো এখনো দেখা হয়নি।

ঋতুপর্ণ ঘোষ আপাদমস্তক একজন অঁতর চলচ্চিত্রকার। তার ছবিগুলো সেই স্বাতন্ত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। সত্যজিৎ রায়ের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে প্যারালাল সিনেমার পতাকা বয়ে চলেছেন যতদিন সক্রিয় ছিলেন। সত্যজিতের মত তিনিও রবীন্দ্রনাথের প্রতি ভীষণভাবে অনুরক্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি ও নৌকাডুবি উপন্যাসের চলচ্চিত্ররুপ দান রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর গ্রেট ট্রিবিউট। ঋতুপর্ণ ঘোষ সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র দ্বারা প্রভাবিত। অনেক সমালোচকের মতে তিনি সুইডিশ চলচ্চিত্রকার ইঙ্গমার বার্গম্যান দ্বারা প্রভাবিত। পূর্বসূরীদের কাজের প্রভাব উত্তরপ্রজন্মের মধ্যে পড়বেই সেটা সচেতনভাবে হোক আর অবচেতনভাবেই হোক। এরপরও সমসায়য়িক যে কোন পরিচালকের থেকে তিনি একেবারেই আলাদা তার ইউনিক নির্মাণশৈলী ও আঙ্গিকের স্বাতন্ত্রের জন্য। তার চলচ্চিত্রের গল্প বলার ভঙ্গি ন্যারেটিভ। পরিপাটি প্রকাশভঙ্গি, ক্যামেরার নান্দনিক ব্যবহার, কলাকুশলীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চটা আদায় করে নেয়া তার ছবিকে সমসাময়িক ছবি থেকে এগিয়ে রাখে। ১২টি ভারতীয় জাতীয় পুরষ্কার তার কাজের স্বীকৃতি।

তার ছবির বিষয়বস্তু ছিল কলকাতার মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট, মনস্ত্বাতিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন। কলকাতার মধ্যবিত্ত জীবনের একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা ও বোবাকান্নার নৈঃশব্দের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্রে।

কলকাতার সুস্থধারার চলচ্চিত্রের মহান এই কারিগর চলে গেছেন অন্যকোথাও অজানা গন্তব্যে। মাত্র জাগতিক ৪৯বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন সব সাঙ্গ করে যেখানে এই বয়সে অনেকে সূচনা করেন চলচ্চিত্র জীবনের। তার এই মহাপ্রয়াণে রবীন্দ্রনাথের একটি বহুল পঠিত কবিতার চরণ মনে পড়ছে-

বহুদিন ধরে বহুক্রোশ ঘুরে
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শীষের উপর
দুইটি শিশির বিন্দু

আমরা চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করলে আইজেনস্টাইন, গদার, ফেলিনি না উগরালে নিজের পান্ডিত্য নিয়ে সংশয় থাকে। কিন্তু আমাদের ঘরের কাছে সত্যজিৎ, ঋত্বিকদের নাম উচ্চারণ করতে একধরনের হীনমন্যতায় ভূগি। আগামী প্রজন্মকে নিজেদের এই হীনমন্যতা কাটিয়ে উঠতে হবে, নিজের শেকড় চিনতে হবে। জয়তু ঋতুপর্ণ ঘোষ,জয়তু চলচ্চিত্র।

৫ thoughts on “ঋতুপর্ণ ঘোষঃ তুমি রবে নীরবে

  1. ঋতুপর্ণের মুভির মধ্যে আমার
    ঋতুপর্ণের মুভির মধ্যে আমার প্রথম দেখা মুভি “দহন”। সে প্রায় অনেক বছর আগে ২০০০ সালে। তখনও আলাদাভাবে উনাকে চিনতাম না। প্রথম আকৃষ্ট হই তাঁর একমাত্র হিন্দি চলচ্চিত্র “রেইনকোট” দেখে, এবং এখন পর্যন্ত কেন জানিনা এটাই আমার কাছে সেরা মনে হয়। তারপর “চোখের বালি” আর “নৌকাডুবি” দেখে ঋতুপর্ণের জাত চিনেছি। সেটা পোক্ত হয়েছে “আবহমান”, “উৎসব”, “বাড়িওয়ালী”, “সব চরিত্র কাল্পনিক”, “চিত্রাঙ্গদা” দেখে। উনার তিনটা মুভি দেখা বাকী আছে। দেখে ফেলব। বিদায় “চিত্রাঙ্গদা”।

  2. ঋতু-দা কে সুস্থ বাংলা ছবির
    ঋতু-দা কে সুস্থ বাংলা ছবির দর্শকেরা খুব মিস করবে…
    :কানতেছি: :কানতেছি: :কানতেছি: :কানতেছি: :কানতেছি: :কানতেছি: :কানতেছি: :কানতেছি: :কানতেছি:

  3. আমার পছন্দের পরিচালকদের
    আমার পছন্দের পরিচালকদের মধ্যে “ঋতুপর্ন ঘোষ” একটি অনন্য নাম , বলা যেতে তার চলচিত্রের হাত ধরেই আমার মুক্ত মনে বেড়ে ওঠা ।।

    আজ তার বিদায়ের সুর মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু তুমি আমাদের মাঝে রবে , নীরবে ।।

  4. ঋতুপর্ণ ঘোষঃ তুমি রবে নীরবে

    ঋতুপর্ণ ঘোষঃ তুমি রবে নীরবে

    :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ:

Leave a Reply to তারিক লিংকন Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *