একজন আলাউদ্দিন অথবা একটি ব্যর্থতার উপাখ্যান……

(১)
আলাউদ্দিন হোসেনের প্রতিদিনের ঘুম ভাঙ্গে তার স্ত্রীর চেঁচামেচিতে। আজকের দিনটাও এর ব্যতিক্রম নয়। ঘুম ভেঙ্গেছে অনেকক্ষণ আগেই। কিন্তু এখন উঠলেই কথা শুনতে হবে। এই ভেবে উঠার সাহস হচ্ছে না।

রান্নাঘর থেকে তাদের শোবার ঘর বেশি দূর নয়। তাই সব কিছু পরিষ্কার কানে আসছে। ঐতো আলাউদ্দিন হোসেন এর স্ত্রী হামিদা বলছে, ”কি পেলাম এই সংসারে। ঘরে চাল থাকে তো ডাল থাকেনা। নুন থাকে তো তেল থাকেনা। সারাজীবন ঝি-এর মত কাজ করে গেলাম। কি পাপ করেছিলাম যে এই শাস্তি পোহাতে হচ্ছে আমাকে”।


(১)
আলাউদ্দিন হোসেনের প্রতিদিনের ঘুম ভাঙ্গে তার স্ত্রীর চেঁচামেচিতে। আজকের দিনটাও এর ব্যতিক্রম নয়। ঘুম ভেঙ্গেছে অনেকক্ষণ আগেই। কিন্তু এখন উঠলেই কথা শুনতে হবে। এই ভেবে উঠার সাহস হচ্ছে না।

রান্নাঘর থেকে তাদের শোবার ঘর বেশি দূর নয়। তাই সব কিছু পরিষ্কার কানে আসছে। ঐতো আলাউদ্দিন হোসেন এর স্ত্রী হামিদা বলছে, ”কি পেলাম এই সংসারে। ঘরে চাল থাকে তো ডাল থাকেনা। নুন থাকে তো তেল থাকেনা। সারাজীবন ঝি-এর মত কাজ করে গেলাম। কি পাপ করেছিলাম যে এই শাস্তি পোহাতে হচ্ছে আমাকে”।

আলাউদ্দিন হোসেন উঠে বসলেন। বয়স পঁয়তাল্লিশ হলেও তাকে অনেকটা বৃদ্ধের মতন লাগে। দারিদ্র্য, দুশ্চিন্তায় মাথার চুল বেশিরভাগই সাদা হয়ে গেছে। তিনি এককালে ঠিকাদারির কাজ করতেন। আইনগত ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার কারনে ঐ লাইন থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর অনেক কিছুই করেছেন। কিন্তু কোনটাতেই সফল হননি। পৈতৃক সম্পত্তি যা ছিল আস্তে আস্তে সব শেষ হয়ে গেছে।

বাথরুম থেকে মুখ হাত ধুয়ে বেরিয়ে আসতেই হামিদার সামনে পড়তে হল।
— মহারাজার ঘুম ভাঙল তাহলে। সংসারের প্রতি কোন খেয়াল আছে? মেয়েটার স্কুলের ৪ মাসের বেতন দেয়া হয়নি এখনও। সামনের সপ্তাহ থেকে পরীক্ষা শুরু। টাকাটা দিতে হবেনা?
– সেটাতো দিতেই হবে। আমতা আমতা করে বলে আলাউদ্দিন হোসেন
– তা কবে দিতে পারবে শুনি। এদিকে ঘরে তরি-তরকারীও শেষের পথে।
তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, ‘আনবো’

গতরাতের বাসি ভাত খেয়ে বের হয়ে গেলেন বাসা থেকে।

(২)
পকেটে আছে তেত্রিশ টাকা। বন্ধু আজিজের সাথে দেখা হয়েছিলো সপ্তাহখানেক আগে। গ্রামে একসাথে বড় হয়ে ওঠা তাদের। মাঝে কিছুদিন বিদেশে ছিল শুনেছে সে। বউ-বাচ্চা নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিলো। দেখে মনে হল বেশ সুখেই আছে। একপাশে ডেকে নিয়ে কিছু টাকা ধার চায় আলাউদ্দিন হোসেন। আজিজ বেশ অনাগ্রহ নিয়ে মানিব্যাগ থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে দেয়। বলে, ”রেখে দে। এটা তোকে ফেরত দিতে হবেনা”।

এই তেত্রিশ টাকা নিয়ে আর যাই হোক, বাজারে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবেনা। গলির মোড়ে হারুন চাচার দোকান থেকে ৫ টাকা দিয়ে একটা পান কিনে মুখে দিলেন। সঙ্গে পানের বোঁটায় অল্প একটু চুন। তার গন্তব্য সেলিমের ডেকোরেশনের দোকান। সেখানে তার মত আরও কিছু জীবনযুদ্ধে পরাজিতরা আড্ডা জমায়।

(৩)
গত দেড় বছর ধরে আলাউদ্দিন হোসেন বেকার। অনেক চেষ্টার পর একটা বেসরকারি ফার্মে ঢুকেছিলেন। কিন্তু এ বয়সে মালিকের দুর্ব্যবহার সহ্য হয়নি। তিনি চাকরী ছেড়ে দেন। সংসার কিভাবে চলছে তা কেবলমাত্র সৃষ্টিকর্তা জানেন। সেলিমের দোকান বাদে অন্য সময় তিনি তিনি এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ান। মাঝে মধ্যে আত্মীয়-বন্ধুবান্ধবদের ঠিকানায় টাকার সন্ধানে হানা দেন।

তার এক ছেলে, এক মেয়ে। তাদের রাজ্যের বায়না। এটা দিতে হবে, সেটা দিতে হবে। তিনি সন্তানদের আবদার পূরণ করতে পারেননা। এজন্য সন্তানরাও তাকে খুব একটা মান্য করেনা। ওদেরই বা কি দোষ দেবেন। কোথায় যেন তিনি পড়েছিলেন, যে পিতা সন্তানদের সাধ মিটাতে পারেনা। সে কোনদিন সন্তানদের সম্মান পায়না।

মাঝে মাঝে তার খুব হতাশা হয়। তিনি সৃষ্টিকর্তাকে তার এই জীবনের জন্য গালাগাল করেন। আবার পরক্ষণেই নিজের অজ্ঞতার জন্য ব্যাকুল হয়ে ক্ষমা চান।

রাতে শহরের কোলাহল যখন থামতে শুরু করে তখন তিনি বাড়ি ফেরেন। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত আলাউদ্দিন হোসেনকে আরেক দফা সংসারের অভাবের ফিরিস্তি শুনতে হয়। শূন্য দৃষ্টিতে হামিদার দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। কোনরকম খাওয়া-দাওয়া শেষে বিছানায় যখন গা এলিয়ে দেন, ঘুমে তার চোখ ভারি হয়ে আসে। সামনের দিনটি কাটানোর কোন দুর্বল পরিকল্পনা করতে করতে এক সময় বিলীন হন ঘুমের রাজ্যে। সেখানে কিছুটা সময়ের জন্য পৃথিবীর ক্ষুদ্রতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনা…………প্রশান্তির ঘুমে তলিয়ে যান আলাউদ্দিন হোসেন।

১৩ thoughts on “একজন আলাউদ্দিন অথবা একটি ব্যর্থতার উপাখ্যান……

    1. সব মধ্যবিত্তের জীবনই কমন। এই
      সব মধ্যবিত্তের জীবনই কমন। এই কমন চিত্রগুলো আমাকে খুব কাছ থেকে দেখতে হয়েছে। তাই এগুলো মাথায় সবসময় ঘুরাফিরা করে।
      বাই দা ওয়ে, আপনি আমার প্রথম গল্পের প্রথম মন্তব্যকারী। কোথায় একটু উৎসাহ দিবেন। তানা :কানতেছি:

      1. ওমা, নিরুৎসাহিত করলাম কখন?
        ওমা, নিরুৎসাহিত করলাম কখন? :খাইছে:
        কাইন্দেন না ভাইডি। এই ন্যান এক গাদা উৎসাহ দিলাম। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  1. পুরো গল্পটা খুব বেশি সরল
    পুরো গল্পটা খুব বেশি সরল রৈখিক হয়ে গেছে. পাওনাদার দেখে লুকিয়ে যাওয়া, বাকির খাতা নিয়ে দোকানদারের সাথে খিটিমিটি, ডেকোরেটর এর দোকানে বসে রাজা উজির মারা, অর্থের অভাবে কোনো একটা দু নম্বর ফন্দি করেও বিবেকের টানে ফিরে আসা ইত্যাদি ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে গল্পটা আরো নাটকীয় করা যেত হয়ত.

  2. এ আর নতুন কি? আবারও বলতে হয়
    এ আর নতুন কি? আবারও বলতে হয় অনুপযুক্তদের জন্যে না এই দুনিয়া…
    ইকোসিস্টেমের যাঁতাকলে পরে মানবিক সব সংঘই যেখানে মৃতপ্রায় সেখানে একজন আলাউদ্দিনতো কিছুই না!!

    1. সবাই সফলদের নিয়ে শুনতে চায়।
      সবাই সফলদের নিয়ে শুনতে চায়। আমি ব্যর্থদের নিয়ে শুরু করলাম। এই আরকি। :খুশি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *