আমাদের ফার্মের মুরগিগুলো

পোস্ট মিলেনিয়ালস বা যাদেরকে অবজ্ঞার্থে আমরা বলি ইয়ো জেনারেশন – এদের সাথে আমার প্রথম পরিচয় মাত্র কয়েক বছর আগে। সারাজীবন সরকারি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এই আমি বিলেতি ডিগ্রি নিয়ে তখন সবে দেশে ফিরেছি। ক্যারিয়ার নিয়ে একটু দোলচালে ভুগছি, তাই জাস্ট টু টেস্ট দ্যা ওয়াটার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক হিসাবে যোদ দিয়েছি। রবীন্দ্রনাথের অমিট রয় উরফে অমিত রায়ের সাথে পরিচয় থাকলে নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পারছেন সেই সময়ের আমার চিন্তাভাবনা আর নাক-উঁচু স্বভাব, বিলেতে যাকে বলে স্নবিস। তখনকার সহকর্মীদের মাঝে সব্বাই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভয়ঙ্কর রকমের রেজাল্ট নিয়ে পাশ করা, অনেকেরই বিদেশি ডিগ্রি। কাজ শুরুর প্রথমদিনেই সিনিয়র এক সহকর্মী নিচু গলায় বললেন, এই জেনারেশনের ছেলেমেয়েরা সব ফার্মের মুরগি, ম্যাডাম। তারপর এগুলো আবার বাপের টাকা খরচ করে নামকাওয়াস্তে পড়াশুনা করতে প্রাইভেট
ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হইছে। লেখাপড়ায় মন এদের একেবারেই নেই, এরা সারাদিন স্টাইল করে ঘুরে বেড়ায়, ফেসবুকে ফটো আপলোড করে আর হিন্দি-ইংরেজি মুভি-টুভি দেখে। ইতিহাস জানে না, দেশ নিয়ে কোন ভাবনাই নেই এদের। বড়দের সম্মান-টম্মান করতে জানে না একেবারেই। ক্লাসের প্রথমদিন থেকেই টাইটের উপর রাখবেন। নতুবা এরা মাথায় চড়ে বসবে।
টাইটের উপর রাখার প্ল্যান নিয়েই ক্লাসরুমে ঢুকেছিলাম সেদিন। কিন্তু দিন গড়াতেই আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম ওরা আমাদের চেয়ে আলাদা, ভীষণ কৌতুহলি। একটু ভালো করে বাঁচব বলে আর একটু বেশি রোজগারের আশায় আমরা যখন ঘাড় গুঁজে কলম পিশে চলি, মেরুদণ্ড বিকিয়ে দিয়ে স্বচ্ছ্বলতা কিনে বাড়ি ফিরি; একটা গ্রাজুয়েশন আর কোন রকমে একটা সরকারি চাকুরি জোগাড় করার জন্য ইউনিভার্সিটির প্রথম বছর থেকেই বিসিএস গাউডের পাতা উল্টাই, এদেশের কিচ্ছু হবে না বলে কলার খোসা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলি- তখন এই ইয়ো জেনারেশন প্রশ্ন করে আমরা কেন নিদেনপক্ষে মালেশিয়া, সিঙ্গাপুর হতে পারব না? চাকুরির সোনার হরিণের পিছে না ঘুরে আমরা কেন স্টার্ট-আপ শুরু করতে পারবো না? যখন আমরা কেবল পড়ার টেবিলে মুখ গুঁজে পড়ে থেকেছি পরীক্ষায় ভালো নম্বরের আশায়,কেবলমাত্র মফস্বলের কোন গরীব ছাত্র পড়ার খরচ চালানোর জন্য ছাত্র পড়িয়েছে, তখন এই পোস্ট মিলেনিয়াল জেনারেশন ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করছে,মোবাইল কোম্পানিতে কাস্টমার সার্ভিসে পার্ট টাইম কাজ করছে শুধু পকেটমানির জন্য হলেও।

বিশ্বায়নের এই যুগে ওরা নিজের জাতীয়তা নিয়ে যেমন গর্বিত তেমনি একইসাথে হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনের বদৌলতে মানচিত্রের বেড়া ডিঙ্গিয়ে এক মুহূর্তে ওরা হয়ে যায় বিশ্বনাগরিক। এই দ্বৈতস্বত্তাকে আমরা বুঝি না, ওদের মত নির্ভয় হয়ে স্বপ্ন দেখতে আমরা পারি না। অগত্যা- তোমাকে বুঝিনা প্রিয়, বোঝো না তুমি আমায়,দূরত্ব বাড়ে,
যোগাযোগ নিভে যায়।

এই মিলেনিয়ামের যে বড়সড় ছাত্র আন্দোলন আমরা দেখেছি তার প্রথমটাই ছিল মানবতাবিরোধি অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত রাজাকারদের ফাসির দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরন মঞ্চ। ইতিহাস সাক্ষী বাংলাদেশের যে কোন আন্দোলনের কেন্দবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় , স্বভাবতই গণজাগরণ মঞ্চের মধ্যবিন্দু হয়ে ওঠে শাহবাগ, বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালেয়ের, শ্রেণি আর পেশার মানুষের সমন্বয়ে এ আন্দোলন গড়ে ওঠে বিধায় ছাত্রদের একক কৃতিত্ব এখানে কিছুটা ক্ষীণ। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফী-র উপর অর্থমন্ত্রীর ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রথমবারের মত এককভাবে রাস্তায় নেমে আসে তরুণ ছাত্ররা। সবার আশংকাকে অমূলক প্রমাণ করে ওরা সম্পূর্ন অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি পূরণে সমর্থ হয়। আমাদের ইতিহাসে এধরণের কার্যকরী অহিংস ছাত্র আন্দোলন একেবারেই বিরল। এই ভ্যাট আন্দোলনের সময়েই প্রথম আমরা উপলব্ধি করলাম যে, এই ইয়ো জেনারেশনের ফার্মের মুরগিগুলো আসলে দাবি আদায়ে কতটা সুশৃঙ্খল আর সোচ্চার। এরা কেবল ফেসবুকে সারাদিন ফালতু সময় নষ্ট করে না, বরং ফেসবুককে ওরা কী দারুণভাবে ব্যবহার করলো আন্দোলন সচল রাখতে, বিভিন্ন এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পারস্পারিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে। পুরো জাতির টনক নড়লো এইবার। পরবর্তীতে আমরা দেখলাম কোটা আন্দোলন, আবারো সেই ছাত্রদের দিয়ে পরিচালিত। কিন্তু গত কয়েকদিনে স্কুল আর কলেজের বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো আমাদের যা দেখালো তা অভূতপূর্ব! যাত্রীবাহী বাসে পিস্ট হয়ে দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে রাস্তায় নেমে এসেছে ওরা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে নয় দফা দাবি পূরণের শর্ত নিয়ে গত পাঁচদিন ধরে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কিশোর-কিশোরীগুলো আমাদের জানিয়ে দিয়েছে ওরা আপোসহীন। টক শো আর জনসভায় গালভরা বুলি আউড়ানো রাজনীতিবিদ আর বুদ্ধিজীবীরা হাল ছেড়ে দিয়েছে সড়ক আর ট্রাফিক সমস্যা নিয়ে, বলেছে কিচ্ছু হবে না এদেশের, কেউ মানবে না ট্রাফিক আইন। অথচ গত বুধবার থেকে সেই গডফরসেকেন ঢাকার নতুন রূপ আমরা দেখেছি। স্কুল ইউনিফর্ম পরে শতশত দেবদূতেরা নেমে এসেছে যেন ঢাকার বুকে। ওরা দলবেঁধে গাড়ি থামিয়ে গাড়ির কাগজপত্র আর লাইসেন্স দেখতে চাইছে,ওদের চেকিং থেকে বাদ যাচ্ছে না একটি গাড়িও। হোক সে গাড়িতে আছে মন্ত্রী মহোদয় কিংবা উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা, সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি কিংবা সাংবাদিক। কাগজপত্র সব ঠিক তো কোন বাঁধা নেই, কিন্তু সামান্য কোন ত্রুটিই অমার্জনীয় ওদের কাছে। কারণ ওরা জানে এই সামান্য ত্রুটি, কিঞ্চিত গাফিলতি এক মুহূর্তে কেড়ে নেয় জীবন, যেমন ওরা হারিয়েছে ওদের দুই বন্ধুকে। তাই ওরা ওদের কাজে পটু, নীতিতে অটল। শুধু তাই নয়এই ক্ষুদে বিচ্ছুগুলো পিঠে ব্যাগ কাঁধে বন্ধুদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করেছে গোটা ঢাকাবাসিকে। সিঙ্গেল লাইনে রিক্সা, পাশের লাইনে সারিবদ্ধ গাড়ির বহর দেখে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, একি আসলেই আমাদের প্রতিদিনের দেখা তিলোত্তমা নগরী ঢাকা ? গত কয়েকদিনে ফেসবুক জুড়ে কেবলএই ব্যাঘ্র শাবকদের স্তুতি চলছে। পথে পথে পুলিশের অবরোধ, কখনও কখন দমন-পীড়ন ও চলেছে এই ছেলেমেয়েগুলোর উপর, অথচ নিজেরা বিন্দুমাত্র টলে না গিয়ে ওরা উল্টো জাতিকে প্রশ্ন করেছে, জাতির টনক নড়বে কবে? এই অকুতোভয় ছোট্ট মানুষগুলো আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে, এ দেশ সম্ভাবনার দেশ, সব সম্ভবের দেশ! শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছা আর একতা। প্লাকার্ড হাতে ওরা শিরদাঁড়া উঁচু করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলেছে-
যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ
যদি তুমি রুখে দাঁড়াও
তবে তুমিই বাংলাদেশ !

বৃহস্পতিবারের ঢাকার চিত্র ছিল একেবারেই অন্যরকম। ক্ষুদে আন্দোলনকারিরা পথে নেমেছে গত কয়েকদিনের মত, গর্বিত মায়েরা রাস্তার পাশে বসে ছিল সমর্থন জানাতে, কখনও ভাত মেখে মুখে তুলে দিয়েছে সন্তানসম এই ছেলেমেদের মুখে। বাবারাও কম যায় না। শুকনো খাবার পানির বোতল নিয়ে হাজির হয়েছে ওদের ছোট ছোট জটলাগুলোতে। দুই ঘন্টার পথ চার ঘন্টায় পাড়ি দিয়ে, কখনো হেঁটে , কখনো রিক্সায় ভেঙে ভেঙে জার্নি করে অফিস শেষে সাধারণ মানুষ ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছে গত কয়েকটা দিন, তবু সবাই ছাত্রদের এই আন্দোলনে একাত্মতা জানিয়েছে। লাজুক হেসে আন্দোলনকারীরা ক্ষমা চেয়ে বলেছে , সবার সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত, রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে।
জনসাধারণের যে অকুন্ঠ সমর্থন এই আন্দোলনে এইটাই হয়তো তার সবচাইতে বড় কারণ – ওরা রাষ্ট্র মেরামত করছে। আমরা হররোজ এই আন্দোলন, সেই আন্দোলন দেখি, কেউ এটা চায় তো কেউ ওটা চায়। কিন্তু এই প্রথম এই বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো নিজেদের জন্য নয় বরং দেশের সবার জন্য নিরাপদ সড়ক চাইছে। এই প্রথম কেউ দেশ গড়ার কাজে হাত দিয়েছে, ভোট চাইতে আসা নেতাদের মত নির্বাচনে জিতলে এটা ওটা করে দেখাবো বলে প্রতিজ্ঞা নয় বরং ওরা সবাই মিলে করে দেখাচ্ছে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে সর্বসাধারণের দ্রোহের আগুনে জ্বলে ওঠা একটা প্রতিকী মাত্র! দেয়ালে আজ সবার পিঠ ঠেকে গেছে। একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলেছে, সাগর-রুনি, তনু সহ আরও হত্যাকাণ্ডের কোন কূলকিনারা হয়না কয়েক বছরেও, ব্যাংকগুলোতে চলছে হরিলুট, বাংলাদেশ ব্যাংকের সোনা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে কয়েক মেট্রিকটন কয়লা। ভোটকেন্দ্রে সিলমারা ব্যালট পেপার যাচ্ছে, তবু নির্বাচন কমিশনের দাবি সুষ্ঠ নির্বাচন হয়েছে সবখানে। কোটা আন্দোলনে জড়িত শিক্ষার্থীদের মন্ত্রী বলছেন রাজাকারের বাচ্চা, তো সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত শিক্ষার্থীদের প্রতি আরেক মন্ত্রীর অবজ্ঞার হাসি। আওয়ামী সরকারের বড়সড় এচিভমেন্ট-গুলো প্রহসনে পরিণত হচ্ছে কেবল অরাজকতা আর অব্যবস্থাপনার দরুণ। জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা আর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মত ধারণা রয়ে যাচ্ছে কেবল রাষ্ট্রবিজ্ঞান বইয়ের পাতায়, সব সমস্যায় প্রধানমন্ত্রী একমাত্র ভরসা।

এই ঘুণে ধরা সমাজে, এই পোড়া দেশে হরতাল, অবরোধ,আন্দোলন, অনশন আর মৃত্যু দেখে দেখে মুখ বজে সয়ে যাওয়া জীবন্মৃত আমরা জাতিরে করিবে ত্রাণ এই আশায় বুক বাঁধি এই কিশোর-কিশোরীদের অহিংস আন্দোলন দেখে। সত্যি বলতে গত কয়েকদিনে ঢাকার রাস্তায় ওরা যা করে দেখিয়েছে তা অসাধারণ বটে, কিন্তু অস্বাভাবিকও। কোন আইনেই সিভিলিয়ান কারো কাছে লাইসেন্স বা গাড়ির কাগজপত্র দেখাতে বাধ্য নয় কোন পুলিশ বা জনসাধারণ। কেবলমাত্র এই ক্ষুদে বাঘ-বাঘিনীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সম্মান আর সমর্থন জানিয়েই আমরা সবাই গতকয়েকদিনে ওদেরকে লাইসেন্স দেখিয়েছি, লাইন মেনে গাড়ি চালিয়েছি। স্বাভাবিক হলো, এই ছেলেমেয়েগুলো এখন ঘরে ফিরে যাবে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দলবেঁধে স্কুলে যাবে। পড়বে, জানবে,শিখবে, নিজেদের প্রস্তুত করবে, তারপর আসবে দেশ গড়তে। ওরা যা শেখানোর তা শিখিয়ে দিয়েছে একদিনেই। এই শিক্ষাকে ধারণ করার আমাদের দায়িত্ব শুরু এখান থেকেই। ঢাকার গণপরিবহণ ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে কথা হচ্ছে অনেকদিন ধরেই । শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইনের একটি খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাইয়ের পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।আগামী সংসদ অধিবেশনে এই আইন পাশ করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সরকারের তরফ থেকে সবাইকে আশ্বস্ত করা হোক যে এবার পরিবর্তন আসবেই। আর সরকার এই প্রতিজ্ঞা কোন অযুহাতেই ভাঙবেনা সে নিশ্চয়তাও দেওয়া হোক।

অবজ্ঞা করে নাম দেওয়া আমাদের সেই ফার্মের মুরগিগুলোর রোদ-জল-পুলিশের লাঠির বাড়ি মাথায় নিয়ে সবার জন্য নিরাপদ সড়কের দাবিতে করা এই আন্দোলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে- Not all Superheroes wear capes, some wear school uniforms too!

লেখকঃ ফারজানা হুসাইন
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

১ thought on “আমাদের ফার্মের মুরগিগুলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *