পাহাড়ের প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনা কামের সীমানা পেরিয়ে রাজনৈতিক পীড়ণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ।

২০১৫ সালের ধর্ষণের ঘটনা।ভারতের উত্তর পুর্ব অঞ্চলের নাগাল্যান্ডের রাজধানী ডিমাপুরের জেল থেকে ধর্ষককে ছিনিয়ে এনে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলেছে উত্তপ্ত জনতারা।ধর্ষক ছিলেন সঈদ শরিফ খান,অবৈধ বাংলাদেশী ।২০১৫ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে ডিমাপুরের কেন্দ্রীয় জেলে রাখা হয়েছিল, কিন্তু ৫ মার্চ মারমুখী জনতা জেল থেকে তাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে চরম নির্যাতন চালিয়ে পাথর দিয়ে থেঁতলে মেরে ফেলে।

আরেকটি ঘটনা, এটাও ঘটিয়েছিল নাগাল্যান্ডের জনতারা। এবছর মে মাসের। নাগাল্যান্ড এবং মায়ানমার সীমান্তে নাগাল্যান্ডের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম।১২ বছরের নাবালিকাকে তিন তিনবার ধর্ষণ করেছে ২৯ বছরের এক যুবক, ধর্ষণের অভিযোগে ধর্ষককে উলঙ্গ করে বেধড়ক মারধর করেছে আম জনতা। এখানে শেষ নয়। তাকে উলঙ্গ করে “আমি ধর্ষক ” লেখা সাইন বোর্ড গলায় ঝুলিয়ে ঘোরানো হল গোটা গ্রাম।

এই যে, নাগাল্যান্ডের জনতারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে ধর্ষককে নিজেরাই শাস্তি দিয়েছিল, আইন কিন্তু তাদেরকে কিছুই করতে পরেন নি।আমি চিন্তা করে দেখি নাগাল্যান্ডের চিত্রটা যদি একটিবারের জন্য আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের মানুষেরা করত,তাহলে আরো কয়েকটা গণহত্যা যোগ হত,যেখানে মুখ্য ভূমিকায় থাকত বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় সমস্ত শক্তি।

কৃত্তিকা ত্রিপুরা,ওরফে পূর্ণা ত্রিপুরা। ১০-১১ বছরের ছোট্ট একটা মেয়ে।চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ত। বাবা -মা জুমের চাষ করে।পূর্না চোখের ছিল স্বপ্নময় জীবন,লেখাপড়া পড়ে হয়ত কোন একদিন মা-বাবাকে দেখাশুনা করবে এই স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার, পৃথিবীটাকে ঘুরে দেখার। তার মা-বাবার কাছে সে এক রাজকুমারী তা বলে দিতে হয় না।কিন্তু সে কী কখনো ভাবতে পেরেছিল যে তাকে অসময়ে চলে যেতে হবে পৃথিবীর,মা-বাবার মায়া ত্যাগ করে, স্বপ্নগুলোকে অপুর্ণতা রেখে । না, পূর্ণাকে কোন এক মরণব্যাধির বা প্রাকৃতিক দুর্ঘটনার জন্য চলে যেতে হয় নি। তাকে চলে যেতে হয়েছে নরখাদক সেটেলারদের জন্য। চার নরখাদক সেটেলার তাঁকে বাঁচতে দেয় নি।এই লেখাটি লেখার সময় চোখের সামনে ভাসছে বাঁচার জন্য তার চিৎকার ,তার কাকুতি মিনতি। কতো দাদা, কাকা -মামা করে প্রাণ ভিক্ষা চাচ্ছে, কিন্তু নরখাদকরা রেহাই দেয় নি আমাদের পূর্ণাকে। ধর্ষণ করার পর কত বীভৎসভাবে হত্যা করেছে ।হাত দুটো ভেঙে দেয়া হয়েছিল, যৌনাঙ্গ ছিল ক্ষতবিক্ষত, পায়ুপথে গাছের গুড়ি ঢোকানো। কত নৃশংসভাবে একজন মানুষকে হত্যা করতে পারে তা পূর্ণার লাশটা না দেখলে ভাবা যায় না।

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে প্রতিদিন ঘটে ধর্ষণের ঘটনা,খবরে কাগজে যদি একদিন ধর্ষনের ঘটনা না দেখেন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে সেদিন হবে একটি অস্বাভাবিক দিন,একটি বিরল দিন। ধর্ষণের হার যে পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে, তাতে যদি বলি রাষ্ট্র ধর্ষকের চাষ করে তা নিশ্চয় ভুল হবে না।

পাহাড়ের অতীতের ঘটনা থেকে আমি একটি কাল্পনিক ঘটনাই পৌঁছাইতে পারি।শুনেছি পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেছে, এবং আগামীকাল ধর্ষকদের নাম ও ছবি প্রকাশ করবে। ধরেন, আগামীকাল ধর্ষকদের নাম ও ছবি প্রকাশ করার সাথে সাথে পাহাড়িরা ক্ষুব্দ হয়ে ধর্ষকদের গণপিটুনি দিলেন, যেভাবে দিয়েছিলেন নাগাল্যান্ডের আম জনতা। এরপরের চিত্রটা কল্পনা করতেও গায়ে শিহরণ জাগে। তারপরেও বলে দিই কাল্পনিক চিত্রটা। এখন যদি ধর্ষকদের গায়ে কোন এক পাহাড়ি একটি তুড়ি মারলেও সেটা পরিণত হবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। মুখ্য ভূমিকায় থাকবে সেনাবাহিনী ও আইনের প্রশাসন,এবং লেলিয়ে দেবে সেটেলারদের। পাহাড়িদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেবে, যাকে সামনে পায় তাঁকে মেরে ফেলবে। পেছন পেছন থাকবে সেনাবাহিনীরা,যা অতীতে বিভিন্ন ঘটনায় প্রকাশ্য সেনাবাহিনীরা জড়িত থাকার প্রমাণ আছে।

ধরেন, গতকালকের ঘটনায় পূর্ণা ত্রিপুরা না হয়ে ,পূর্ণা ইসলাম, বা পুর্ণা রহমান হতেন ,এবং ধর্ষকদের নামের শেষে রহিম,করিম,সোলায়মান না হয়ে চাকমা,ত্রিপুরা,মারমা,বম,খিয়াং হতেন তাহলে খাগড়াছড়িতে মানুষ পোড়ার গন্ধে ভরে যেত।গ্রাম হয়ে যেত জনশূন্য, রহিম করিম’রা লুটপাট শুরু করে দিত। ধরে ধরে পাহাড়ি নারীদের জনসম্মুখে গনধর্ষণ করা হত। খবরের কাগজে বের হত উপজাতি জঙ্গলিরা নিরীহ বাঙালিদের হত্যা করছে,কাজেই পাহাড়ে আরও সেনা মোতায়েন করা হোক !

পাহাড়ে প্রতিটি ধর্ষনের ঘটনায় রাস্ট্র এবং সেনাবাহিনী দায়ী। এই অভিযোগ থেকে কখনো মুক্তি মিলবে না তাদের । আমি শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত বলে যাব রাস্ট্র,সেনাবাহিনী, প্রশাসন, মিডিয়া,বিচার ব্যবস্থা সবকিছুই দায়ী।
পাহাড়ে ধর্ষণ এখন কামের সীমানা পেরিয়ে রাজনৈতিক পীড়নের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে । রাজনৈতিক পীড়নের হাতিয়ার বলছি এ কারণেই – অতীতে যত পাহাড়ি নারী ধর্ষনের শিকার হয়েছে তার একটারও সুবিচার পায় নি পাহাড়িরা। আইনের প্রশাসন ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছে লোক দেখানো কয়েকদিনের হাজত বাস! সামনে দরজা দিয়ে হাজতে ঢুকায় ,আর পেছনের দরজা দিয়ে বাহির করে দেয়।
পুর্ণা ত্রিপুরার লাশের ক্ষতবিক্ষত দেহটি দেখে ভাবছিলাম,এক জনগোষ্ঠীর প্রবল জাতিগত বিদ্বেষ না থাকলে ,কোন জনগোষ্টীকে নির্মুল করার চিন্তাভাবনা না থাকলে এরকম বীভৎস ,নৃসংশতা করা যায় না।

পুর্ণা , তোমার এই অধম ভাইকে কখনো ক্ষমা করবে না। তোমার বিচারের জন্য এই জগন্যতম রাষ্ট্রে আমার বা কী করার আছে। সর্বোচ্চ ক্ষমতা আমার দুই-তিন লাইন লেখা।তোমার জন্য লেখা এই দুই লাইন লেখাটিও তুমি পড়ার সুযোগ পেলে না, নরখাদকরা অন্তত সেই সুযোগটিও রেখে দেয় নি।

স্বাধীনতা নামে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামক একটি নতুন মানচিত্র রচিত হয়েছে, কিন্তু মননে,বর্বরতায় সেই পাকিস্তানি রয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিন লক্ষ মা বোনের ওপর যে ধর্ষণ হয়েছে এরা হচ্ছে সেই ধর্ষকদের ঔরজজাত। পার্থক্য একটা ,ওরা ছিল পাকিস্তানি, এরা বাংলাদেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *