ছেঁড়া নোট…


ধুরছাই, আজ দিনটাই কুফা। সারা রাত কার্ড খেলে সকালে একটু ঘুমাব, তারও উপায় নেই। টেনে-হিঁচড়ে তুলে দিল। এই যাহ! ১২ টা বেজে গেছে এর মধ্যেই। মনে হচ্ছিল মাত্র চোখ বুজেছি।

বাথরুম সাইজের একটা রুমের মধ্যে সাত আট জন দলামোচা পাকিয়ে থাকি। রুমটা মূলত দুজনের জন্য বরাদ্দ। একসাথে এত জন ঘুমানোর ব্যাবস্থা নেই। তাই শিফট করে ঘুমাই। বলতে গেলে পুরা রুমটাই বিছানা। বড় একটা পাটীর উপর দুটো বেডশিট বিছানো। তোষক যেটা ছিল, ভাঁজ করে বালিশ বানিয়ে ফেলেছি। জায়গার অভাবে হোক কিংবা বদভ্যাসে হোক, এক দল সারা রাত তাস খেলে, অন্য দল ঘুমায়। সকাল বেলায় শিফট চেঞ্জ।



ধুরছাই, আজ দিনটাই কুফা। সারা রাত কার্ড খেলে সকালে একটু ঘুমাব, তারও উপায় নেই। টেনে-হিঁচড়ে তুলে দিল। এই যাহ! ১২ টা বেজে গেছে এর মধ্যেই। মনে হচ্ছিল মাত্র চোখ বুজেছি।

বাথরুম সাইজের একটা রুমের মধ্যে সাত আট জন দলামোচা পাকিয়ে থাকি। রুমটা মূলত দুজনের জন্য বরাদ্দ। একসাথে এত জন ঘুমানোর ব্যাবস্থা নেই। তাই শিফট করে ঘুমাই। বলতে গেলে পুরা রুমটাই বিছানা। বড় একটা পাটীর উপর দুটো বেডশিট বিছানো। তোষক যেটা ছিল, ভাঁজ করে বালিশ বানিয়ে ফেলেছি। জায়গার অভাবে হোক কিংবা বদভ্যাসে হোক, এক দল সারা রাত তাস খেলে, অন্য দল ঘুমায়। সকাল বেলায় শিফট চেঞ্জ।

ডিসেম্বর মাস। শীত নেহাত কম না। তবে আমাদের আস্তানা মোটামুটি গরম। পাতলা একটা কাঁথা গায়ের উপর চড়িয়ে দিলেই দিব্যি কাজ চলে যায়। একে তো এই মুরগীর খোপে দরজা আছে, জানলা নাই। তার উপর গোটা রাত আগরবাতির মত একটার পর একটা সিগারেট জ্বলে। সাত আট জনের গায়ের গরমে হোক আর বিশিষ্ট কার্ড প্লেয়ারদের খিস্তী-খেউরিতে হোক, রুম একেবারে তাঁতিয়ে থাকে। সমস্যা একটাই। সকাল ১২ টার মধ্যে প্রাকৃতিক কাজ কারবার সেরে না রাখলে মহাবিপদ। রাতের আগে আর পানি আসবে না।

৯ টা থেকে ১১ টা হচ্ছে সুপার পিক আওয়ার। মেসের চার রুম মিলিয়ে বাসিন্দা মোট ষোল সতের জন। বাথরুম মাত্র দুইটা। এর মাঝে দুই জন বলে সাত জন উঠে গেছি আমরা। ঝামেলা তো বাধবেই। সিরিয়াল দিতে আপত্তি নেই আমার। কাজ সারতে পারছি যে তাই বেশি।

দাঁত মাজা, ছোটটা সারা নিয়ে টেনশান নেই। পাহাড়ি এলাকা। জায়গার অভাব হয় না। বনে বাদাড়ে চোখ বন্ধ করে দাড়িয়ে গেলেই হল। ঝামেলা বাঁধে বড়টা নিয়ে। সিরিয়াল ব্রেক করে বেগ এসে পড়লে আর রক্ষা নেই। লোটা হাতে জঙ্গলে দৌড় দেব যে তারও কোন উপায় থাকে না। পাহাড়ি এলাকার মশা এক একটা এ্যাথলেট সাইজের। শীতকাল বিধায় সাপের ভয় নেই। তবে মশার ভয় করতে হয়। বেজায়গায় দুয়েকটা কামড় বসাতে পারলেই সেরেছে। ম্যান-হোল বন্ধ হয়ে যাবে। তার থেকে দাঁত কামড়ে দুই ঘরের নামতা গুনে অপেক্ষা করা অনেক নিরাপদ।

একটু পরে পানি বন্ধ হয়ে যাবে। অগত্যা চোখ ডলতে ডলতে উঠে পড়লাম।
হুট করে ক্যাম্পাসটা গেল বন্ধ হয়ে। তাড়াহুড়ো করে এর থেকে ভাল কোন থাকার জায়গা পেলাম না। কষ্টে শিষ্টে কোন রকম এক দেড় মাস কাটাতে পারলে হয়। এর মধ্যে ক্যাম্পাস খুলে যাওয়ার কথা।


মেয়র গলি খুব বেশি বড় না। চিপা একটা রাস্তা। দুইটা সিএনজি ক্রস করতে গেলে একটাকে ড্রেনে নেমে পড়তে হয়। গলির ভেতর মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাড়ি। নামকরনের মাজেজা ওটাই। একেবারে শেষ প্রান্তের দুটো লাগোয়া বিল্ডিঙ। ভাল করে না তাকালে আলাদা করা যায় না। তারই একটাতে আমাদের মেস। বাড়ির বয়স ২৫/৩০ বছরের কম হবে না। বার্ধক্যে এসেও প্লাস্টারের মুখ দেখেনি। সবুজ রঙের গেট পেরিয়ে হাতল বিহীন সিঁড়িটা শুরু হতেই শেষ হয়ে গেছে। এ বাড়ির নীচতলা বলে কিছু নেই, দেড় তলা থেকে শুরু। পাহাড়ের উপরে পুরনো বাড়ীগুলো এমনই। একটু অদ্ভুত। কোন কোনটাতে এক রুম থেকে অন্য রুমে যেতেই কয়েক ধাপ সিঁড়ী টপকানো লাগে। সে হিসেবে এ বাড়িটা আধুনিক।

সামনের দরজার লাগোয়া রুমটা আমাদের। জানলা কপাটের বালাই নেই বলে দিন রাত টের পাই না। লোডশেডিং থাকলে রাত, না থাকলে দিন। মেয়রের বদৌলতে রাত কমই আসে। এটা একটা বাড়তি সুবিধা।
গনবিছানা ছাড়া রুমের ফার্নিচার শুধু আমরা ক’জন। ব্যাগ গুছিয়ে যখন তখন কেটে পড়তে পারি। সেয়ানা মেস ম্যানেজার তাই বুদ্ধি করে দুই মাসের ভাড়া এডভান্স নিয়ে রেখেছে। তিন হাজার টাকা। একেবারে পানির দাম।

বাসার পিছনের রাস্তা দিয়ে শর্টকাটে ষোলশহর পৌঁছানো যায়। পাহাড় টপকে দু’তিনটা রাস্তা আছে যাওয়ার। তবে আমি একটু ঘুর পথে যাই। শর্টকাট মারতে গিয়ে কয়েক বার রাস্তা গুলিয়ে ফেলেছি। এর পর থেকে শিক্ষা হয়ে গেছে।

চিটাগাং ভার্সিটির সাঁটল ট্রেন থামে ষোলশহর স্টেশনে। একারণে এই এলাকায় প্রচুর মেস বাড়ি। মেয়রের বাড়িটা বাদ দিলে মোটামুটি সবগুলা বিল্ডিঙয়ে দুয়েকটা মেস পাওয়া যাবে। পারলে ওটাও ভাড়া নিয়ে ফেলে ছেলে মেয়েরা।

ষোলশহর নামটা সুন্দর। প্রেমে পড়ার মত। সকাল থেকে রাত অবধি জমজমাট স্টেশন। ভার্সিটির সাঁটল ছাড়া আরও কিছু লোকাল ট্রেন আসা-যাওয়া করে এ রুটে। তবে সাঁটলের জন্যই এ অবস্থা। লাইনের দুপাশে কম হলেও গোটা বিশেক টং দোকান। সারাদিন ভিড় লেগে থাকে। হৈচৈ, আড্ডা, গানে গমগম গোটা এলাকা।

পৃথিবীর সবচেয়ে মজার জার্নি এই সাঁটল ট্রেন। কাঠের শক্ত বেঞ্চে পিঠ টান করে বসতে যদিও একটু কষ্ট হয়। তবু এক-দেড় ঘণ্টা কখন যে ফুরিয়ে যায় হুশ থাকে না। গোটা রাস্তা বগি পিটিয়ে গান গেয়ে মাতিয়ে রাখে বজ্জাত ছেলেপেলেগুলো। নেশা ধরে যায়।

প্রায় বিকেলে ষোলশহরে আড্ডা দেই। অভ্যাসটা পুরনো। ফার্স্ট ইয়ার থেকে। জিগরি দোস্ত সালসাদ নিয়ে এসেছিল একবার। সেই থেকে মিঠুন, সঞ্জয়, আশিক, জবা, ওয়াহিদদের সাথে পরিচয়। বিকেল নামতে না নামতে হাজির হয়ে যায় সবাই। পনের-বিশ জন লাইন ধরে মুখোমুখি বসে পড়ি। কারো হাতে গীটার, কারো হাতে চায়ের কাপ, কেউ গলা ছেড়ে গান ধরেছে। আবার কেউ টং দোকানের বাকির খাতা দেখে কপাল চাপড়াচ্ছে। কয়েকটা ছোট ভাই আসে আড্ডায়। গান গায়, বিড়ি ফোঁকে। এ আড্ডায় সবাই সমান। শ্রেণী ভেদ নেই, স্বার্থ সন্ধান নেই। সহজ, সুন্দর, অদ্ভুত এক বন্ধুত্ব।

সিরিয়াল পেয়ে গোসল সেরে বেরুতে দেড়টা বেজে গেল। দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গেছে। এদিকে পকেটের অবস্থা কাহিল। আমার একার না, রুমমেটদেরও। মাসের শেষে সবারই টানাটানি যায়। তার উপর বাইরে থাকতে গিয়ে এক্সট্রা খরচ হয়ে গেছে মেলা।

শুধু ক্যাম্পাস বন্ধ হলে সমস্যা ছিল না। হলে থাকা যেত। ১৬ ই ডিসেম্বর মারপিট করেছি ছাত্র লীগের দুই গ্রুপ মিলে। কোন দল শহীদ মিনারে ফুল দেবে এই নিয়ে যত হাঙ্গামা। ২০/২৫ জন হাত-পা মাথা ফাটিয়ে হাসপাতালে কাৎরাচ্ছে। পরিস্থিতি সুবিধের না। এরকম সিচুয়েশনে প্রশাসনের একটাই কাজ করার থাকে। ক্যাম্পাস ভ্যাকেন্ট করে দেয়া। হলে থাকতে পারবে না কেউ। সবগুলা রুম তালা মেরে সিল করে দিয়েছে। সিল ভেঙে তালা খুললেই বিপদ। রুমের সব ক’টাকে সাসপেন্ড করে দেবে।

গত দু’বছরে এ রকম ভ্যাকেন্ট বেশ কয়েক বার দেখেছি। বেশির ভাগ ই পলিটিকাল হট্টগোলের কারনে। তবে এবারের সাফল্য চোখে পড়ার মত। সব গুলো ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটিকে ছাপিয়ে রেকর্ড পরিমান আহতের সংখ্যা। টিভি চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে। পরদিন সবগুলা জাতীয় দৈনিকে বড় করে কাভারেজ পেল। প্রথম আলোতে কার্টুন এঁকেছে চুয়েটের ছাত্ররা স্ক্রু-ড্রাইভার আর রেঞ্জ নিয়ে মারপিট করছে। মোট কথা আমাদের মত আমিই নেতাদের ধুন্ধুমার অবস্থা। হাত তালি পেয়েছি প্রচুর। এসব কাজে উৎসাহ দাতার অভাব হয় না।

আমাদের গ্রুপিংটা বেশ। মামু আর এন্টি-মামু। শুনতে হাস্যকর হলে কি হবে, এটাই নির্ভেজাল সত্য। যতদূর জানি ০২’ব্যাচ থেকে উৎপত্তি এ নামের। নন-চিটাগোনিয়ান পলিটিকালরা মামু আর চিটাগোনিয়ানরা এন্টি। ক্যাম্পাসে এসে ০২’ব্যাচ পাইনি, তবে চিজ বলতে হয় একেকটা। মামু মামু ডাকতে ডাকতে মামু গ্রুপ খুলে ফেলা যেই-সেই কাজ না। আবার এন্টিও দাড় করিয়ে দিল। প্রতিভা ছিল মানতে হবে।
যাহোক, ট্রেডিশন বলে কথা। পূর্ব-পুরুষরা মারামারি করত, আমরাও করি। তবে কেন করি তার কোন উত্তর নাই।


দুদিন আগে পাঁচ’শ টাকার শেষ নোটটা ভাংতি করেছি। এখন পকেটে আছে এক’শ টাকার একটা নোট। গতকাল খাবারের বিল দিতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম নোটটা ছেঁড়া। ভয়াবহ ছেঁড়া, চালানোর উপায় নেই। কোন দোকানদার যে আবুল বানিয়ে ধরিয়ে দিল কে জানে! গরীবের পেটে এভাবেই লাথি পড়ে। আজকের দিনটা কাটাব কিভাবে সেই চিন্তা করছি। টিউশনির বেতন পেতে আরও এক সপ্তাহ। অন্য সবার পকেটের তেলও ফুরিয়ে এসেছে। আজ কালের মধ্যে কেউ একজন বেতন না পেলে সবাই মিলে উপোষ দিতে হবে।

এই ক’দিনে মিলে মিশে থাকাটা বেশ শিখে গেছি আমরা। পকেট খালি হয়ে আসলে বেজার মুখে ঝিমাই। আবার কেউ একজন টিউশনির টাকা পেলে সবার মনে ঈদ লেগে যায়। একজন ডাল চড়চড়ি দিয়ে ভাত খেলে অন্যদের গলা দিয়ে বিরিয়ানি নামে না। এটাই বোধয় বন্ধুত্ব।

আজ বিকেলে মাল্টি বেতন পাবে। খুশী হয়ে গেলাম। মাল্টি আমাদের দেয়া নাম। বাপ-মা রেখেছিল সোহেল। কালের বিবর্তনে চাঁপা পড়ে গেছে। আল্টি মাল্টি মানিকজোড়। আল্টির ওরিজিনাল নাম রাশেদ। মাল্টির রুমমেট। রাশেদ নামটাও সচেতন ভাবে ভুলে গাছি আমরা। বন্ধু মহলে সবারই কম বেশি এরকম দুয়েকটা নিক নেম আছে। হয়ে যায়। আল্টির গার্ল ফ্রেন্ড আকৃতি প্রকৃতিতে হুবহু আল্টির ফটোকপি। আমরা বলি যমজ বোন। মাল্টি বিশিষ্ট আবাসিক মাস্টার। ছুটি ছাটায় গাট্টি বস্তা নিয়ে ছাত্রীর বাড়িতে উঠে যায়। জামাই আদর পায় কিনা কে জানে!

ইদানিং ঘুমে খুব ঝামেলা যাচ্ছে। তিন চার বছরের রিলেশন ভেঙ্গেচুরে গেলে ঘুমের বারটা বাজা স্বাভাবিক। গত ক’দিন যাবত তুমুল যুদ্ধ গেছে। অষ্টম বারের মত মোবাইলের সিম পাল্টেছি। এই যাহ! মনে পড়ে গেছে। সিম কিনেই তো টাকা ভাংতি করলাম। কাস্টমার কেয়ারের আপুটা ভয়ংকর সুন্দরী। কি যে মিষ্টি করে কথা বলে! মন চায় প্রেমে পড়ে বিষ খাই। অমন একটা মেয়ে দুনম্বরী করে ছেঁড়া নোট গছিয়ে দিতে কিভাবে পারে ভেবে পাই না। শালার সব সুন্দরীরাই দুনম্বর।

ধুর ছাতা, কি সব আবোল তাবোল বকছি!! মিথিলাও তো ভয়াবহ সুন্দরী। কই, ও তো কখনো দুনম্বরী করেনি। নাকি করেছে, আমি ভুলে যেতে চাই!? কি জানি।
এই হিউম্যান সাইকোলজি বড়ই গোলমেলে ব্যাপার। কি ভুলতে চাই আর কি মানতে চাই, কোন তাল-ঠিক নেই। মিথিলার কথাই ধরি। আমার জন্য ফ্যামিলি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের কাছে কম অপমান সইতে হয় নি। তবু হয়তো পুরা দুনিয়াটাই ছেড়ে দিতে পারবে আমার জন্যে। চাল চুলা হীন নেশাগ্রস্থ উচ্ছন্নে যাওয়া এক যুবকের প্রেমে এভাবে পড়ে কেউ? ওর জন্য তো ছেলের অভাব ছিল না। ধনী বাপের সুন্দরী মেয়েকে পাওয়ার জন্যে সারাক্ষণই লাইন লেগে থাকতো। তবু যে কোন ভুতের পাল্লায় প্রেমে পরল কে জানে! আবার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি ক’দিন চোখের আড়াল হলে অন্য কারো জন্যেও হাসি মুখে দুনিয়া গোল্লায় পাঠিয়ে দেবে। এক সময় ভাবতাম ওকে খুব বুঝতে পারি। এতগুলো বছর পরে বড় বেশি অচেনা লাগে আজকাল। রক্তাক্ত প্রান্তরে একটা কথা পড়েছিলাম।
“মানুষ, মরে গেলে পঁচে যায়। বেঁচে থাকলে বদলায়। কারনে অকারনে বদলায়। সকালে বিকালে বদলায়…”
অবশ্য ওর বদলে যাওয়ার কারন আছে। আমিই বদলে ফেলেছি। খাঁচায় পুরে রাখতে চেয়েছি, আর ও পালানোর পথ খুঁজছে। দোষটা আমারই। কিন্তু কি করব! সব জেনেও বদলাতে পারছি না নিজেকে। সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি। ওকে হারানোর আতঙ্ক। একারনেই জাপটে ধরে রাখতে চাই। আর ওর তত বেশি দম আটকে আসে। মুক্তি পেতে চায়।

মাঝে মাঝে মনে হয় মেয়েটাকে মুক্তি দেয়াই উচিৎ। এভাবে শাস্তি দেয়ার কোন মানে হয় না। কিন্তু ওকে মুক্তি দিলে নিজে বাঁচব কি করে? সেই যেদিন নর্দমা থেকে টেনে তুলেছিল আমাকে, সেদিন থেকে একটা দিনও চলতে পারিনি ওকে ছাড়া। মাঝে একবার দেখা হয়নি কয়েক মাস। ফোনে পর্যন্ত কথা বলতে পারেনি। তবুতো পাশে ছিল। নাহ! এত বড় একটা সিদ্ধান্ত আমার পক্ষ থেকে নেয়া সম্ভব না। তার চেয়ে বরং সিদ্ধান্তটা ওর পক্ষ থেকে আসুক। জানি নির্লজ্জের মত ছুটে যেতে মন চাইবে। তবু সমাধান একটা আসতে পারে। ওর জিদের ওপর ভরসা করা যায়। নিজে থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলে জিদের বসে ফিরে তাকাবে না আর। দেখি কি হয়।


পলিটিক্সে বিচ্ছিরি রকম জড়িয়ে গেছি আজকাল। সারাক্ষণ মিছিল মিটিং আর এর ওর পেছনে বাঁশ নিয়ে পড়ে থাকি। এর একটা পরোক্ষ কারন অবশ্য মিথিলা। চিন্তা ভাবনা অন্য দিকে সরিয়ে রাখতে কিছু একটা নিয়ে ব্যাস্ত হওয়া দরকার। মেয়েদের সাথে টাইম-পাসের চেষ্টা করা যেত। কেন যেন সায় পেলাম না মন থেকে।

চুয়েটের পলিটিক্স বেজায় এন্টারটেইনিং। সার্কাসের কাছাকাছি। ২০০৮ সালের একটা ঘটনা। আমরা কেবল ফার্স্ট ইয়ারে। তখনও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায়। নির্বাচনের আগমুহূর্তে নেতা নেত্রীরা ছুটাছুটি করছে। একদিন সকালের দিকে এক বড় ভাই ডেকে বলল হাসান মাসুদ আসবে, মিছিল নিয়ে রিসিভ করতে যেতে হবে। আমরাও ব্যাপক উৎসাহে ব্যানার নিয়ে “জয় বাংলা… জয় বঙ্গবন্ধু…” শ্লোগান দিয়ে মেইন গেটে জড়ো হলাম। এর মধ্যে খবর এলো উনার নাকি আসতে বিকাল হবে। কি আর করার, ব্যানার গুটিয়ে ফেরত আসতে হল।

ক্যান্টিনে এসে চা সিগারেটে মনোযোগ ঢেলেছি। এমন সময় সেই বড় ভাই দৌড়ে এসে আরেকটা ব্যানার ধরিয়ে দিয়ে বলল একটু পরে সাকা চৌধুরী যাবে এখান দিয়ে। জলদি আয়। বলেই গলা ফাটিয়ে হাঁক ধরল- “ জিয়ার সৈনিক… এক হও, লড়াই কর…”

কিছুক্ষণ ভ্যাবাচেকা খেয়ে দাড়িয়ে রইলাম। দেখি বড় ভাইরা ঊর্ধ্বশ্বাসে গেটের দিকে ছুটছে। অগত্যা পিছু নিলাম। খানিক বাদে গাড়ীর বহর নিয়ে সাকা চৌধুরী গেল। পিছনে শত শত চ্যালা-চামুণ্ডা। চৌধুরী সাহেব যাওয়ার পথে জানালার কাঁচ নামিয়ে একটু হাত নাড়িয়ে দিলেন। আর তাতেই বড় ভাইদের মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়! এই হচ্ছে আমাদের চুয়েটের সুবিধাবাদী রাজনীতির নমুনা।

দেরি করে ঘুমালে কিছু বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়। সকালের নাস্তার টাকাটা বেঁচে যায়। আজ নাস্তার টাকা বাঁচাতে পারলেও লাঞ্চের টাকা কোত্থেকে আসবে সেই চিন্তায় আছি। পলাশ আশ্বাস দিল ওর কাছে যা আছে তাতে তিন জনের হয়ে যাবে। তিনজন বলতে আমি, পলাশ আর মাল্টি। বাকিরা সকাল সকালই ধান্দায় নেমে গেছে। যা থাকে কপালে, তিনজন বেরিয়ে পড়লাম।
কপাল একেবারে পোড়েনি দেখা যাচ্ছে। পলাশের মানিব্যাগ হাতড়ে যা টাকা বের হল তাতে খাবারের বিল দিয়েও সিগারেটের পয়সা রয়ে গেছে। কি যে বলব, খুশিতে চোখে পানি এসে যাচ্ছে।

সিগারেট ধরিয়ে তিনজন জিইসি’র দিকে হাটা ধরলাম। পলাশের কি যেন একটা কাজ আছে। ওর গতিবিধি আজ কেমন যেন সন্দেহ জনক ঠেকছে। আমার টিউশনি নেই আজ। রুমে বসে থেকে ঘোড়ার ডিম পাড়া নিয়ে গবেষণা চালানোর চেয়ে জিইসি গিয়ে চোখের ব্যায়াম করে আসা ঢের ভাল। সুন্দরীদের মেলা বসে ওখানে।

গ্যালারী এপেক্সের সামনে এসে স্যান্ডেল ছিঁড়ে গেল। মেজাজ গেছে খিচরে! রসিকতার তো একটা লিমিট থাকা চাই। খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগুচ্ছি। এর মধ্যে দলছুট হয়ে গেছি। বাকি দুজনকে খুঁজে পাচ্ছি না। যাক ভাল হয়েছে। ওরা থাকলে এতক্ষণে বত্রিশ পাটী মেলে দিত। এই দুর্দিনে স্যান্ডেল ছেঁড়ার মত ভয়াবহ দুর্যোগ আর নাই।

রাস্তা পেরিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে মুচীর দোকানের দিকে হাঁটছি। ছোকরা বয়সী মুচী দেখি দাঁত কেলিয়ে হাসছে। শালা, মুরগী পেয়েছে। রোস্ট করবে না ঝাল ফ্রাই সেই চিন্তায় লাফাচ্ছে। ইচ্ছা হচ্ছে কানের নিচে দেই একখান লাগিয়ে। কিন্তু উপায় নেই গোলাম হোসেন! এখন এই ছোকরাই একমাত্র ভরসা। স্যান্ডেল সারাতে দিয়ে এক পা তুলে দাড়িয়ে আছি। ছেলেটা তখনও হাসছে। একবার মন চাইল ঐ দেখা যায় তাল গাছ কবিতাটা শুনিয়ে দেই হারামজাদাকে।


নগরীর সবচেয়ে ব্যাস্ত এলাকা জিইসি। বালা যায় চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রবিন্দু। জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি, সংক্ষেপে জিইসি। আলভা এডিসনের বিখ্যাত সেই কোম্পানির চট্টগ্রাম ব্রাঞ্চ। তার থেকেই জিইসি মোড়ের নামকরণ। বড় বড় কয়েকটা শপিং কমপ্লেক্স, পাঁচ তারা হোটেল, নামীদামী রেস্টুরেন্ট সব মিলিয়ে একটা অভিজাত ফ্লেভার এনে দিয়েছে এলাকাটায়। তাই বলে পুরোপুরি উচ্চবিত্তদের দখলে চলে যেতে দেব এটা কেমন কথা! পকেটে টাকা না থাকলে কি হবে, চোখ তো আছে। দেখায় নিশ্চয়ই পয়সা লাগে না। বিকেলে কাজ না থাকলে সেটাই করি। শুধু আমি একা না। এ শহরে আমার মত নির্লজ্জ যুবক আরো আছে। ধনীর দুলালীরা গাড়ী করে শপিংএ আসে। লটারি লাগার আশায় ফিটফাট হয়ে বুক চিতিয়ে দাড়িয়ে থাকে অনেকেই। ফুটপাত জুড়ে চা-সিগারেট আর ভাঁজা পোড়ার দোকানগুলো টিকে আছে ওদের জন্যে।
মাঝে মধ্যে শ্রীলংকান কিছু মেয়ে এসে বাস্তুসংস্থানে তালগোল পাকিয়ে দেয়। বেশিরভাগ এশিয়ান উইমেন কিংবা ইউএসটিসির ছাত্রী। ভৌগলিক কারনে ওদের আকার আকৃতিতে কিঞ্চিত বাহুল্য দোষ আছে। তার উপর পোশাক আশাকেরও ঠিক থাকে না। ঝুলে থাকা বাসের হেল্পার পর্যন্ত ডিগবাজী খায়।

আচমকা হার্ট বিট বেড়ে গেছে। না, মেয়ে দেখে না। এইমাত্র মনে পড়ল মানিব্যাগে ছেঁড়া নোটটা ছাড়া আর কোন টাকা নেই। পলাশ আর মাল্টিকেও দেখছি না আশেপাশে। হয়তো মহাম্মদিয়ার সামনে চলে গেছে। ওখানেই সচরাচর দাড়াই আমরা। কোনাকাঞ্চিতে খুচরা পয়সা থাকার আশায় মানিব্যাগ বের করেছি। সাইজ দেখে মনে হবে কোটিপতি। আট মাসের গর্ভবতীর মত ফুলে আছে। সবটাই কাগজপত্র আর ভিজিটিং কার্ডে ঠাঁসা। ছেঁড়া নোটটা ঝুলিয়ে রেখে মানিব্যাগ হাতড়াচ্ছি। কি যেন ঠেকল একটা শক্ত মত। কয়েন হতে পারে। পাঁচ টাকার হলে এযাত্রা বেঁচে যাব। এই ছোকরা যদি টাকা নিয়ে হাঙ্গামা শুরু করে মান ইজ্জত ফালুদা হয়ে যাবে। শেষ রক্ষা হল না। কয়েন ঠিকই, তবে দুই টাকার।
– কি হইল ভাই? টাকা নাই?
এবার কেঁদে ফেলতে মন চাইল।
– ভাই, টাকা আছে। তবে নোটটা ছেঁড়া। খুচরা আছে দুই টাকা।
– আচ্ছা, দুই টাকাই দেন। খালি তো সেলাই কইরা দিছি। আরেক দিন বেশি দিয়েন।

মহাম্মদিয়া হোটেলের সামনে পৌছে দেখি ওরা কেউ নেই। দাড়িয়ে দাড়িয়ে ভাবছি, একটু আগেও ছেলেটাকে বেয়াদব মনে হচ্ছিলো। আর সেই বেয়াদব মুচির হাতেই মান বাঁচল। মানুষ বড়ই আজীব চিড়িয়া।

পকেটে মোবাইল বাজছে। পলাশ ফোন দিয়েছে। ধরব না। মরুক শালা! পলিফনিক রিং টোন, হতদরিদ্রের ট্রেডমার্ক। এযাবৎ তিন চারটা মোবাইল ব্যবহার করেছি। কোনটা শতের ঘর পেরোয়নি। হয় এগার’শ নয়তো বার’শ কিংবা ষোল’শ। এই ব্যাপারটা নিয়ে মিথিলার জোড় আপত্তি। ও বলত আমার পকেটে যে মোবাইল, রিকশাওয়ালার লুঙ্গীর ভাঁজেও নাকি একই মোবাইল। গিঁট খুলে ঝাড়া দিলেই দুই চারটা এগার’শ বার’শ মোবাইল পড়বে। আমি বলতাম,
– এগুলো আত্মরক্ষার হাতিয়ার। ইমারজেন্সি কেসে এরকম মুগুর টাইপের মোবাইল বেশ কাজে দেয়। আর কথা বলাই যখন মূল বিষয়, এত রংচঙের দরকার কি? কথা এতেও বলা যায়। কল আসে, কল যায়। আবার দেখ টর্চ লাইটও আছে…
শেষে রেগেমেগে বলে,
– তোমার সাথে তর্ক করাই বেকার। একটা না একটা যুক্তি রেডি করা থাকে।

আচ্ছা, মিথিলা এখন কি করছে? এক সপ্তাহ হতে চলল কথা হয় না। আজ আচমকা ফোন করে সারপ্রাইজ দিলে কেমন হয়! ও নিশ্চয়ই কেঁদে ফেলবে। নাহ! কাঁদবে না। আজকাল আর কথায় কথায় কাঁদে না।

মেয়েটাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। এক কাজ করতে পারি, হাতে টাকা পয়সা আসলে ঢাকা থেকে ঘুরে আসব একবার। সাতসকালে হাজির হব ওদের মেডিকেলের সামনে। দারোয়ানের সাথে ভাব জমিয়ে গেটের সামনে আয়েশ করে বসে এক কাপ চা খাব। ও নিশ্চয়ই পরীক্ষা দিতে এসে আমাকে দেখে থতমত খেয়ে যাবে। নাহ! সকালে যাওয়া ঠিক হবে না। মেজাজ বিগড়ে গেলে পরীক্ষা বাদ দিতে পারে। টার্ম না প্রফ কি যেন একটা শুরু হওয়ার কথা কয়েক দিনের মধ্যে। তার চেয়ে বরং দুপুরে যাব।

লংডিস্টেন্স রিলেশন মানিয়ে চলা বিশাল ঝক্কি ঝামেলার ব্যাপার। বিশেষত আমার মত নিধিরাম সর্দারদের। ভার্সিটিতে শুক্র শনি দুদিন ছুটি পাই। চাইলে প্রতি সপ্তাহে ঢাকা গিয়ে দেখা করা যায়। কিন্তু সাধের কাছে সাধ্য মার খেয়ে যায়। আসা-যাওয়ার খরচের ধাক্কা সামলাবে কে! দুপুর বেলার খাবারের বিল যার অন্যের উপর দিয়ে চালিয়ে নিতে হয়, তার এমন ঘোড়া-রোগ থাকতে নেই। যাও বা দুয়েকবার যাই মাঝে মাঝে, ফেরার সময় নির্লজ্জের মত হাত পাততে হয়েছে। গার্লফ্রেন্ডের কাছে হাত পেতে গাড়ি ভাড়া নেয়া সুখের কোন অনুভূতি না। রাস্তায় দাড়িয়ে ব্যাগ খুলে বয়ফ্রেন্ডের হাতে টাকা গুজে দেয়ার দৃশ্যও খুব একটা স্বাস্থ্যকর না।


আবারও রিং বাজছে। এবার ধরলাম।
– কই তুই?
– জাহান্নামে। আসবি নাকি?
– চেতলি ক্যান? কি হইছে?
– স্যান্ডেল ছিঁড়ে রাস্তার মধ্যে ডিগবাজী খাচ্ছি। আর এখন জিগাস কি হইছে!?
– দোস্ত, ঢাকা থেকে আমার একটা ফ্রেন্ড এসেছে। ওকে রিসিভ করতে গিয়ে তোকে হারিয়ে ফেলেছি। রাগ করিস না।
– যা বাবা! তোর দেখি ইম্পোরটেড ফ্রেন্ডও আসা শুরু করেছে আজ কাল। তা মেল না ফিমেল?
– সেন্ট্রাল প্লাজার সামনে আছি। এলেই দেখবি।

অগত্যা আবার রিক্সার গুঁতা খেয়ে রাস্তা ক্রস করতে হল। ফুটপাথে উঠে ডানদিকে তাকাতেই জমে গেলাম। পলাশ আর মাল্টি মিটিমিটি হাসছে। পাশে দাঁড়ানো মেয়েটার হাতে মাঝারি সাইজের একটা ব্যাগ। বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে।
– তুমি? তুমি এখানে কেন?
– প্লিজ, এখানে দাড়িয়ে চ্যাঁচামেচি কোর না। গাড়ীর নিচে ঝাঁপ দেব।
– তা দিতে চাইলে দাও। কিন্তু এখানে এলে কিভাবে?
– গাড়িতে চড়ে।
– উড়াল দিয়ে যে আসনি সেটা জানি। চিনেছ কি করে?
– পলাশের নাম্বার থেকে ম্যাসেজ করেছিলে একদিন। ওকে ফোন করে বলেছি তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে আসছি। ওর কোন দোষ নেই। কিছুই জানত না।

পলাশের দিকে তাকাতে দেখি মুখ চোখ পাংশু করে ফেলেছে। মাল্টির হাসিও মিলেয়ে গেছে। এতক্ষণে আঁচ করে নিয়েছে কোথাও একটা ঝামেলা আছে। “দোস্ত, তোরা থাক” বলে দুজন দুদিকে ফাট দিল।

এতক্ষণে ভাল করে তাকানোর সুযোগ হল। বিদ্ধস্ত লাগছে ওকে। ব্যাগ নিয়ে ঠিকমত দাড়াতে পারছে না যেন। টলটলে চোখ। ভয় পেলাম কেঁদে না ফেলে। গণ ধোলাই খাওয়ার বিন্দু মাত্র সখ নেই এই মুহূর্তে।
– শুধু চ্যাঁচামেচিতে হবে না। পিটানো উচিৎ তোমাকে। পালিয়ে বিয়ে করার শখ হয়েছে আগে বললেই পারতে। এরকম বলা নেই কওয়া নেই ঘাড়ে এসে পড়বে কে জানত! দাও, ব্যাগ দাও।
এতক্ষণে হাসি ফুটল মুখে। নাহ! এই মেয়েটাকে আর কাঁদানো যাবে না। জানতাম অনেক ভালবাসে আমায়। কিন্তু সেই ভালবাসা যে এতটা খ্যাপাটে জানা ছিল না।

– এভাবে পাগলামি না করলেও পারতে।
– হুম, ভুল হয়ে গেছে। আর হবে না।
– আমি ভয় পাচ্ছি বাচ্চা কাচ্চার কথা ভেবে।
– মানে?
– মানে, তোমার মত হলে বাসায় পাগলা গারদ খুলে বসতে হবে আরকি! ওঠো, রিক্সায় ওঠো।

সচরাচর এখান থেকে রিক্সা পেতে যুদ্ধ করা লাগে। মুরাদপুর যাবে…না, নিউমার্কেট যাবে…না, খুলশি, চকবাজার…? না। আরে বাপ, তাইলে যাবি কই??!! সাথে মেয়ে না থাকলে এই মোড়ে রিক্সা পাওয়া বিশাল ব্যাপার। আজ সাথে গার্লফ্রেন্ড আছে। প্রথম চেষ্টাতে পেয়ে গেলাম।
– কোথায় যাচ্ছি আমরা?
– কেন,কাজী অফিস!
– তুমি কি সিরিয়াস?
– একদম না। বাসস্টপ যাচ্ছি। তোমাকে তুলে দেব।
– এত দূর ছুটে এসেছি, এখনি পাঠিয়ে দেবে?
– কে বলেছিল আসতে?
– পরশু থেকে পরীক্ষা শুরু। একফোঁটা পড়তে পারছি না। কথা দিচ্ছি আজকেই ফিরে যাব। এক দুই ঘণ্টা অন্তত থাকি একসাথে।
– শুধু কি বকর বকর করবে, নাকি হাতটাও একটু ধরবে! লাক্স সাবান দিয়ে গোসল দিয়েছি। ময়লা নেই গায়ে।
এই প্রথম স্বাভাবিক হল। হাতটা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখল। অমনি মুখে খৈ ফুটতে শুরু করেছে। আসার পথে এই হয়েছে, সেই হয়েছে। হাজারো কাহিনি। আমি আছি আরেক ঝামেলায়। হাত ধরতে বলেছি, কোলে উঠতে বলিনি। ও তো জানে না ঢাকা চট্টগ্রামের পার্থক্য কতখানি।

ক’বছরে এ শহরের অলিগলি অনেক কিছুই চিনে গেছি। কত নম্বর বাস কোন রুটে যায়, কোন বার সারা রাত খোলা থাকে সব মুখস্ত। কিন্তু গার্লফ্রেন্ড নিয়ে বসার মত মোক্ষম জায়গা কোথায় আছে এটা জানার প্রয়োজন হয়নি কখনো। তখন কে জানত এই দিন আসবে! একবার ভাবলাম রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করি। শেষে রোমিও টাইপের এক ফ্রেন্ডকে ফোন করে কিছু লোকেশন জেনেছি। বন্ধুটা হয়তো অবাক হয়েছে। হুটহাট কেউ ফোন করে ডেটিং মারার লোকেশন জানতে চাইলে অবাক হওয়া দোষের না। যা খুশী ভাবুক, পরে বুঝিয়ে বলা যাবে।

ঘুরতে ঘুরতে বিকেল প্রায় শেষ। মাল্টি ফোন দিয়েছিল এর মধ্যে। বেতন পেয়েছে। দুহাজার টাকা চেয়েছি। বলল ৬ টার ভেতর নিয়ে আসবে। পলাশকে বলে দিয়েছি রুম থেকে আমার সোয়েটার আর মোবাইলের চার্জার নিয়ে আসার জন্য। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। ঢাকা যাব।


পহেলা জানুয়ারি, ২০১০। ফকিরাপুল থেকে বাস ছেড়েছে ঘণ্টা দেড়েক হল। এখন চিটাগাং রোডে এসে পড়েছি। গত এক সপ্তাহ আদর্শ বয়ফ্রেন্ড হয়ে কাটিয়েছি। সকাল বেলা বাসা থেকে কলেজে পৌঁছে দেয়া, পরীক্ষা শেষে নিয়া আসা, বিকেলে একটু রিক্সা করে ঘুরে বেড়ানো, আইসক্রিম খাওয়া, সব। অষ্টম সিমটা ভেঙ্গেছি গতকাল। নতুন বছরে নতুন করে শুরু করতে চাই সব। দেখি পারি কিনা।

একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য শুধু ভালবাসাই যথেষ্ট নয়। বিশ্বাস আর রেসপেক্টের ভীত ঠিকঠাক না থাকলে এক ছাদের নিচে বাঁচা মুস্কিল। ওকে দোষ দেব না। দুনিয়ার অন্য যেকোনো মেয়ের কাছে আমি হয়তো শান্ত সহনশীল একটা মানুষ হয়ে থাকতে পারব। কিন্তু ওর কাছে গেলেই কেন যেন বদমেজাজি খুঁতখুঁতে হয়ে যাই। এর কোন ব্যাখ্যা জানা নেই। হয়তো এক্সপেকটেশন অনেক বেশি থাকে ওর কাছে।

সিগারেট কেনার পর পকেট খালি হয়ে গেছে। তবে মানিব্যাগে ছেঁড়া নোটটা রয়ে গেছে এখনো। কদিন আগে পাশের সিটে মিথিলা বসেছিল। শেষরাতের দিকে শীতে কষ্ট পাচ্ছিল খুব মেয়েটা। এরকম জার্নির অভ্যাস নেই ওর। হুডি ওয়ালা টিশার্টটা খুলে জড়িয়ে দিয়েছিলাম ওর গায়ে। যতটুকু পেরেছি পেঁচিয়ে রেখেছি। তবু শীতে কাঁপছিল। আজ যখন ফিরে যাচ্ছি, পাশের সহযাত্রী মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক। বাসে ওঠার আধঘণ্টার মধ্যে নাক ডাকা শুরু করেছে। জার্নিটা বিচ্ছিরি যাবে। নাকের শব্দে ছেঁড়া নোটের থিউরীটা মিলাতে পারছি না। ভাবছি আমার জীবনের সাথে ওটার একটা কানেকশন বের করে ফেলব। নাহ! হচ্ছে না। চিন্তাভাবনার মাঝে নাক ডাকা ঢুকে যাচ্ছে। চোখ বুজলাম। অনেক দিন ঘুম হয় না। ক্লান্ত লাগছে খুব।

পরিশিষ্টঃ
অনেক বছর পর চট্টগ্রাম এলাম। খুলশীতে উঠেছি। বন্ধুর বাসায়। মাঝখানে লেখাপড়া ছেড়েছুড়ে চলে গেলাম। দুই আড়াই বছর ঘুরে ফিরে কাটিয়ে বোধোদয় ঘটেছে। ইঞ্জিনিয়ার হতে ফিরেছি আবার।

এরই মধ্যে শহরটা পাল্টে গেছে অনেক। নতুন নতুন বিল্ডিং উঠেছে, বহদ্দারহাটে ফ্লাইওভার হচ্ছে। রাস্তায় জ্যাম লেগে থাকে ঢাকার মতন। বিকেলের দিক একটু বের হয়েছি জিইসি যাব বলে। আজও মোড়ে আসতে স্যান্ডেল ছিঁড়ে গেল। পকেটে খুচরা নেই। পাঁচ’শ টাকার নোট। পঞ্চাশ টাকার কার্ড কিনে ভাংতি করলাম। মুচীর খোঁজে এগুতেই দেখি সেই ছেলেটা। আজও আমাকে ল্যাংচাতে দেখে হাসছে। হয়তো এটা কোন মজার খেলা ওর কাছে। আজ ওর হাসি দেখে খারাপ লাগছে না। কানা বগির ছাঁ হয়ে দাড়ালাম। গোঁফ রেখেছে ছেলেটা। বয়স বাড়াতে চাইছে হয়তো। মনে হয় বিয়ে করেছে। বউ বলেছে গোঁফ রাখতে। রেখে দিয়েছে। নতুন বউদের কথা শুনতে হয়।

মাল্টি, পলাশ দুজনেই চাকরীতে ঢুকেছে ৬ মাসের মত হবে। মাল্টি টিকে গ্রুপে, আর পলাশ এসিআই তে। আমি এসেছি অসমাপ্ত পড়ালেখাটা শেষ করতে। জানি না আগামী দুইটা বছর কেমন করে কাটবে। তবু দেখি চেষ্টা করে।

আজকাল মানিব্যাগ ব্যবহার করি না। মিথিলা একটা মানিব্যাগ দিয়েছিল একসময়। ৬ বছর আগলে রেখেছি। কয়েকমাস আগে পিস্তল ঠেকিয়ে কেড়ে নিল ওটা ছিনতাইকারীরা। নাহ! জান দিতে পারিনি ওটার জন্যে। বুদ্ধি গজাতে শুরু করেছে। আবেগ কমে গেছে।

সেলাই শেষ। ভাবছি ছেলেটাকে আজ পাঁচ টাকার জায়গায় বিশ টাকা দেব। নেবে কিনা কে জানে! মানিব্যাগ থাকলে টাকা রাখতে ঝামেলা হয়না। পেছনের পকেটে রেখে দেয়া যায়। সামনের দুই পকেটের ডানেরটাতে মোবাইল অন্যটায় সিগারেট। টাকা পয়সা যা থাকে, এ দুটোর একটাতে ভাগাভাগি করে রাখতে হচ্ছে এখন। সমস্যা হচ্ছে দিনের ভেতর সিগারেটের প্যাকেট যতবার বের করি মোবাইল ততবার করি না। তাই ডান পকেটে রাখলে পড়ে গিয়ে হারানর ভয় কম। যাহোক, পকেট হাতড়ে টাকা বের করেছি। হঠাত মনে হল একটা নোটে একটু ঝামেলা আছে। ভাল করে খেয়াল করে দেখি ঠিক তাই।একটা এক’শ টাকার নোটে টেপ লাগানো। বাকি তিনটা ঠিক আছে। হাসি পেল খুব। পেট ফাটানো হাসি। দুনিয়াটা বড়ই অদ্ভুত। ঘুরে ফিরে এক নাটকেই বার বার ফিরে আসে।

ছিড়ে কুটিকুটি করলাম নোটটা। মুচী ছেলেটা কিছু বুঝতে পারছে না। অবাক হয়ে কাণ্ডকারখানা দেখছে। আচ্ছা, ছেলেটার কি মনে আছে আমার কথা? হয়তো আছে। ছোটলোকেরা অনেক কিছু ভুলতে পারে না। মনে রেখে দেয়। যেমন আমি পারিনি।

২ thoughts on “ছেঁড়া নোট…

  1. Dear আজীব রাজীব, Please allow
    Dear আজীব রাজীব, Please allow me to write my comment in English. There is something wrong with my Avro software. You have a very catchy style of writing, with plenty of humor elements. At the same time there is a silent inner flow of sadness. Very wisely blended. BEAUTIFUL. It didn’t stop anywhere. I enjoyed reading thoroughly. But there is something I would like to point out. You expressed some kind of restlessness in your writing. In one way it gave your writing a unique style, but in few places I lost grip over the chronological order of different incidents mentioned in the story due to the same reason. Well, never mind, it may be my weakness as a reader. Very well done. Keep it up. Looking forward to reading more stories from you. Take care.

    1. ধন্যবাদ ইকরাম ভাই। সত্যি বলতে
      ধন্যবাদ ইকরাম ভাই। সত্যি বলতে এত বড় লেখার অভ্যাস নাই। শেষ দিকটায় এসে লিখতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলাম। এমনকি পোস্ট করার আগে একবার পড়েও দেখি নাই। আর আপনার লেখা পড়েছি। অসাধারন লেখেন। আপনার লেখারও অপেক্ষায় থাকলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *