আমি এক সংখ্যালঘু (শেষ)

পরিশেষে বলতে চাই, সংখ্যালঘু কোন শব্দ নয়, কোন পরিসংখ্যান নয়, কোন রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের শ্লোগান নয়, সংখ্যালঘু এক বীভৎস অনুভূতির নাম। এক বুক প্রচন্ড অভিমান, অপমান, বঞ্চনা, হীনমন্যতা, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা, মা-মাটি-মানুষ হারানোর বেদনার অনুভূতিকে যদি এক কথায় প্রকাশ করতে চান তবে সেই শব্দের নাম হবে সংখ্যালঘু। আর হ্যা, আমি এক সংখ্যালঘু।

আজান যখন আতঙ্ক

তারপর আরও কিছুদিন গেলো। আমরা শ্রীমঙ্গলের বাসা ছেড়ে দিয়ে বাবার কর্মস্থল মৌলভীবাজার চলে গেলাম। সেখানে কিছুদিন থেকে আমাকে পড়ার জন্য সিলেটে পাঠানো হল। উঠলাম গিয়ে সিলেটের কুমার পাড়াস্থ একটা মেসে। সেখানে আমার স্কুলের বন্ধুরা আগে থেকেই থাকে। পুরনো বন্ধুদেরকে পেয়ে তো আহ্লাদে আটখানা অবস্থা। অনেক রাত পর্যন্ত গল্প-গুজব হল। রাত গভীর হলে একে একে উঠে যার যার বিছানায় চলে গেলাম। তখন মৌলভীবাজার থেকে সিলেটের রাস্তা এতো খারাপ ছিল যে ঐটুকুনি জার্নিতেই প্রাণ হাঁপিয়ে উঠত। ফলে দিনের বেলা জার্নি এবং রাতের বেলা আড্ডা-ফাড্ডা মিলিয়ে ক্লান্ত থাকার কারণে অল্প সময়েই ঘুমিয়ে পড়লাম।

কতক্ষণ গিয়েছে জানি না হঠাৎ আমার ঘুম ভাঙলো একজনের ঝাঁকুনির চোটে। চোখ খুলে দেখলাম মেসের সদ্য-পরিচিত এক বড় ভাই আমার নাম ধরে ডাকছে আর উঠে বসতে বলছে। কোন রকমে চোখ কচলে কষ্টে-সৃষ্টে বসে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে ভাই”? সে মাথাটাথা ঝাঁকিয়ে রাগত স্বরে জানতে চায়, “কি হয়েছে মানে? তুমি কোন দিকে পা দিয়েছ আর কোন দিকে মাথা দিয়েছ?”। আমি এবার পুরাই হতভম্ব। মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে বলছে কি লোকটা? আমি সবেমাত্র আজ মেসে উঠলাম, দিকটিক চিনব কিভাবে? বললাম, “জানি না তো ভাই। কেন? কোন দিকে শুয়েছি জেনে আপনি কি করবেন?”

সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বুঝার চেষ্টা করল। এরপর খুব বোঝানোর ভঙ্গিতে বলতে থাকলো, “শোন, তুমি যেদিকে পা দিয়েছ, সে দিক হচ্ছে পশ্চিম দিক। আর পশ্চিম দিক আমাদের জন্য খুব পবিত্র একটা দিক। এই দিকে কাবাঘর রয়েছে। এই দিকে মাথা রেখে আমরা নামাজ পড়ি। তাই এই দিকে আমরা কখনো পা দিয়ে শুই না। এতে কাবা ঘরের অপমান হয়। বুঝেছ? ধর্ম সবার জন্য সমান, সবাই যেটা মান্য করে তোমাকেও সেটা মানতে হবে। বুঝলে?” আমি খুব সুবোধ বালকের মত মাথা ঝাঁকিয়ে জানালাম বুঝেছি। গভীর ঘুমে আমার চোখ বুজে আসছিলো, আমি কোন কথাই বলতে পারছিলাম না। সে হয়তো বুঝতে পারছিল, তাই এরপর আমার বালিশের দিক বদলে দিয়ে আর কোন কথা না বলে চলে যায়।

পরের দিন ঘুম থেকে উঠার একটু পরে আমার সব মনে পড়ে যায়। আমার তখন তার একটা কথাই মনে পড়ে, “ধর্ম সবার জন্য সমান”। ধর্ম আবার সবার জন্য সমান হয় কিভাবে? যার যার ধর্মের আইন তো তার তার কাছে। আমি তো হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস থেকে আমার বইকে প্রণাম করি, মা কালী, মা দূর্গা, বাবা লোকনাথকে প্রণাম করি, তো এটা কি কোন মুসলমান করবে? যে ভাইটি আমাকে গত রাত্রে পূর্ব-পশ্চিম দিক নিয়ে জ্ঞান দিয়ে গেলেন তিনি কি করবেন? এটা আবার কেমন কথা? ইসলাম ধর্মের আইন অমুসলিমরা মানবে কেন? কিন্তু মনের প্রশ্ন মনেই রয়ে গেলো, আমার আর জিজ্ঞেস করা হল না। কারণ ততদিনে আমি বুঝে গেছি সংখ্যাগুরুদের সাথে থাকতে হলে সংখ্যাগুরুর আইনই আইন, তাদের বিশ্বাসই প্রধাণ, তাদের আব্দারই আদেশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

এমনই আদেশবাচক আরেকটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে হয় আমাকে ঐ মেসে থাকাকালীন সময়েই। তখন রমজান মাস, ২০০৩ কিংবা ০৪ সালের ঘটনা। পুরো সিলেট শহরে দিনের বেলা একটা খাবার দোকানও খোলা পাওয়া যায় না। যদি কেউ চিপায়-চাপায় কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা দোকান খোলেও, কিছুদিন পরই কিছু মানুষ এসে ওগুলোকে ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। তাদের এক দফা এক দাবী, আমরা খেতে পাচ্ছি না, অতএব তোমরাও খেতে পাবে না। আমরা ক্ষিদেয় কষ্ট পাচ্ছি, অতএব তোমাদেরও কষ্ট পেতে হবে। এখন তুমি হিন্দু/ বৌদ্ধ/ খৃস্টান/ অসুস্থ/ মুসাফির যেই হও না কেন। কোন কারণে যদি মেসে বুয়া না আসত তাহলে আমাদের খবর হয়ে যেত। সারাদিন না খেয়ে, ক্লাস করে এসে বিকেল বেলা রান্না করে খেতে হত। তো এমনই এক কড়াকড়ি উপাস থাকার দিনে আমাদের এক বন্ধু চয়ন(ছদ্মনাম) কলেজে না গিয়ে মেসে থেকে গেলো। সম্ভবত তার শরীর খারাপ ছিল বা অন্য কিছু। বিকেলে আমরা কলেজ থেকে মেসে এসে দেখলাম বেচারা মন খারাপ করে বসে আছে।

কারণ জিজ্ঞেস করতে জানা গেল, সে দুপুরবেলা তার ঘরে বসে পানি খাচ্ছিল। এমন সময় রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন এলাকার এক মুরুব্বি। তিনি জানলা দিয়ে দৃশ্যটি দেখলেন। এরপর তার ঘরে ঢুকে যা নয় তা গালাগালি করলেন। এক মাসের মধ্যে মেস তুলে দিবেন বলেও শাসিয়ে গেলেন। চয়নের কত বড় সাহস, সে নাকি রোজার দিনে মুরুব্বিকে দেখিয়ে দেখিয়ে পানি খাচ্ছিল। আমরা কেউই বুঝতে পারছিলাম না পানি আবার দেখিয়ে খাবার কি আছে? আর তিনিই বা ঘরের ভিতর উঁকি মেরে কে কি খাচ্ছে সেটা দেখতে গেলেন কেন? পুরো ঘটনায় চয়ন ভীষণ রকম মর্মাহত হয়ে রইলো কয়েকটা দিন, সাথে আমরাও।

আরেকটা ছোট্ট ঘটনা দিয়ে আমার মেসের গল্প শেষ করি। আমি যেহেতু কম্পিউটার সাবজেক্ট নিয়ে পড়তাম, তাই আমার ঘরে একটা কম্পিউটার ছিল। তখন আর কারো ঘরে কম্পিউটার আসে নি। আমরা মেসের সবাই মিলে কম্পিউটারটা ব্যবহার করতাম। ব্যবহার বলতে সিনেমা দেখা আর গান শোনা। সারা দিনই কম্পিউটারে কেউ না কেউ তার পছন্দের গান বাজাতো। কিন্তু আমি আর আমার বন্ধু রিমন(ছদ্মনাম) এক অদ্ভুত কান্ড করতাম। যখনই মাইকে আজানের আওয়াজ শুনতাম তখনই পড়িমড়ি দৌড়ে গিয়ে গান বন্ধ করে দিতাম। রিমন প্রথম দিকে না করলেও আমি শুরু করার কিছু দিন পরে সেও আমার মত ত্রস্ত-ব্যস্ত-সন্ত্রস্ত হয়ে দৌড়ে গিয়ে গান বন্ধ করত। আতঙ্ক সম্ভবত ছোঁয়াচে একটা ব্যাপার।

আমাদের এই অতিরিক্ত আজান ভক্তি দেখে আমাদের মুসলিম বন্ধুরা খুব হাসাহাসি করত। “তারা জানতে চাইত তোরা আজান পড়লে এতো অস্থির হোস কেন? আজান তো আমাদের জন্য দেয়, আমরা গান বন্ধ করব, নামাজ পড়ব। আমাদেরকে গান বন্ধ করার সুযোগ দে। আর এত হুড়মুড়িয়ে বন্ধ করারই বা কি আছে? ধীরে-সুস্থে স্বাভাবিকভাবে এসে বন্ধ কর। তোদের সমস্যাটা কি ম্যান?”

আমাদের সমস্যাটা আসলে যে কি ছিল তা আমরা নিজেরাও বুঝতাম না। কিন্তু আজানের সময় ঘরে গান বাজলেই কেমন এক অজানা আতঙ্ক এসে মনে ভর করত। মনে হত এই মুহূর্তেই গান বন্ধ না করলে কি যেন এক উথাল-পাথাল ঘটনা ঘটে যাবে। তখন না বুঝলেও এখন বুঝি এই আতঙ্কের জন্ম কোথায়। আজান ব্যাপারটা কেন আমার কাছে এতো স্পর্শকাতর হয়ে উঠল। সেই ১৪ বছর বয়সের বিভীষিকাময় স্মৃতি তখনও আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল, এখনো এই পরিণত বয়সে এসে আমি সমপরিমাণ আতঙ্ক বোধ করি। এখনো যখন গিটার নিয়ে টুংটাং রেয়াজ করি, তার আগে ঘরের দরজা-জানালা টাইট করে বন্ধ করে দেই, যেন আমার গিটারের আওয়াজ বাইরের কারো কানে গিয়ে পৌঁছাতে না পারে, যেন কেউ এসে দরজা থাবড়ে বলতে না পারে আজানের সময় গান করছিস কেন রে হারামজাদা? গান যে তোর পু** দিয়ে ভরে দেব তুই জানিস?

হিমালয় পর্বত যখন চোখের সামনে টলে উঠে

এবার আসেন বেশ কিছুটা সময় এগিয়ে যাই। আমার বয়স তখন ৩১/৩২ হবে। বাবা চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। সারাদিন পুজা-পাঠ আর ধর্মগ্রন্থ নিয়ে পড়ে থাকেন। তিনি সারা জীবন একটি বেসরকারি হাসপাতালে সেবা দিয়ে গেছেন। আসলে চাকরি করতেন, কিন্তু তার কাজের প্রতি দরদ এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আন্তরিকতা দেখে তার কলিগরাই তার কাজকে সেবা বলে অভিহিত করেছিল। তারা বলত, “আমরা এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি, আমরা চাকরিজীবি, আর দাদা এই প্রতিষ্ঠানের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। তিনি যতটা না চাকরি করতেন তার চেয়ে ঢের বেশি সেবা করতেন। সেই ভোর ছয়টায় কাজে বসতেন আর রাত ১১টায় খেয়েদেয়ে ঘুমাতে যেতেন। খাওয়া আর বাথরুমে যাওয়া ছাড়া একটা মিনিট সময়ও তিনি অপব্যয় করতেন না। দাদার মত এতো ধৈর্যশীল এবং পরিশ্রমী মানুষ আমরা আর একজনও দেখি নাই।”

এ ব্যাপারে আমিও ১০০% সহমত কিংবা তার চেয়েও বেশি। আমার বাবার মত ধৈর্যশীল, বিনয়ী এবং ঠান্ডা মাথার মানুষ আর একজনও দেখি নি আমার জীবনে। তাকে দেখলে আমার শুধু হিমালয় পর্বতের কথাই মনে হয়। যেমন নিরেট, তেমনই ঠান্ডা, তেমনই বিশাল। হাজারটা যন্ত্রণা সহ্য করেও তিনি তার লক্ষ্যে অবিচল থাকেন, যে যতই খোঁচাখুচি করুক না কেন, যাই বলুক না কেন, কোন কিছুই তার হাসিমাখা মুখকে টলাতে পারে নি। আমার সামনেই কত বাজে মানুষ কত বাজে কথা বলেছিল, তিনি কোন উত্তর না দিয়ে শুধু মুচকি মুচকি হাসতেন। এটা নিয়ে আমার খুব রাগ হত তার উপর। তিনি কেন কিছু বলেন না? কেন তিনি সবার মুখের উপর জবাব দিয়ে দেন না? কেন তিনি নীরবে সব সহ্য করেন? তিনি শুধু একটি কথাই বলতেন, “বাবারে সব কথার জবাব মুখে দিতে হয় না, কিছু জবাব সময়ই দিয়ে দেয়। ” আরও বলতেন, “সব সময় ধৈর্য ধরার, সহ্য করার চেষ্টা করবে। মনে রাখবে যে সয় সেই রয়”। আমার সেই রওয়া-সওয়া বাবার ধৈর্যের বাঁধও একদিন ভাঙলো। আমি অবাক হয়ে সেদিন আমার হিমালয় পর্বতকে টলে উঠতে দেখলাম।

আমি জীবনে বহুবার বহু ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়েছি তবে সেদিনকার মত এতোটা বিচলিত আর হই নি কখনো। ঘটনাটা ঘটল আমরা যে বাসায় ভাড়া থাকি সেই বাসার মালিকের সাথে। আপনারা হয়তো এতোক্ষণে বুঝে গেছেন আমরা এখন আর বাসার মালিক নই, ভাড়াটে। মৌলভীবাজার শহরে কিছুদিন এই বাসায় তো কিছুদিন ঐ বাসায় থাকি, জীবন কাটাই। শেষবার যে বাসায় এসে উঠেছি সেটা শহরের একেবারে কেন্দ্রে। সহজেই বাজারে যাওয়া যায়, আমার অফিসে যাওয়ার জন্যও সুবিধা। সবদিক মিলিয়ে বেশ সাশ্রয়ীও। কিন্তু ছোট্ট একটা সমস্যা আছে এই বাসার। সমস্যা হল বাসার দায়িত্বে আছে এক অল্প বয়সী ছেলে। বাসার মূল মালিক বয়সের ভারে আর শহরে আসতে পারেন না। তিনি গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। তার শহরের বাসা এবং মার্কেটের দোকানগুলোর দেখাশোনা করেন তার মেয়ের জামাই, যার বড় ভাই আবার আমার বন্ধুমহলের বন্ধু। অর্থাৎ, বয়সে সে আমার বেশ খানিকটা ছোট।

বাসার মালিক আমার চেয়ে বয়সে ছোট, সেটা কোন সমস্যা না, সমস্যা হল এই ছেলেটা দিন দিন কেমন জানি অতি ধার্মিক হয়ে যাচ্ছে। যে সমস্ত লোকজনের সাথে চলাফেরা করে তারাও জানি কেমন কেমন, মৌলবাদী মৌলবাদী টাইপের। দিন যায় আর আমরা খেয়াল করি তার মধ্যে এক ধরণের উগ্রতা তৈরি হচ্ছে। কথাবার্তায়, চলাফেরায় কেমন জানি ঔদ্ধত্ব ভাব টের পাওয়া যায়। আগে পথে-ঘাটে দেখা হলে স্বাভাবিকভাবে কুশল বিনিময় করত, যোগ-জিজ্ঞাসা করত, আর এখন দেখলে চোখ ফিরিয়ে নেয়। মাঝে মাঝে অন্যান্য ভাড়াটেদের সাথে তার কথোপকথন শুনি, তার মেজাজের উত্তাপ গায়ে লাগে। লাগলেও কিছু বলি না, কারণ সে বাড়ির মালিক আর আমরা ভাড়াটে। তাকে মাস শেষে ভাড়া দেবো আর তার বিনিময়ে তার বাসায় থাকবো, এই তো তার সাথে আমাদের চুক্তি। এর চেয়ে বেশী কিছু আশা না করাই ভালো।

সেই ছেলে একদিন দুদ্দাড় করে আমাদের ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল। বেশ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো এখানে ঘন্টা বাজায় কে? কে এখানে ঘন্টা বাজায়? তার চিৎকার শুনে আমার বাবা ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, বললেন, সবসময় তো ঘন্টা বাজাই না বাবা, এই ঠাকুর পূজার সময় একটু বাজাতে হয়। সে সাথে সাথেই কড়া ধমকের সুরে জানিয়ে দিল, ওসব ঘন্টা বাজিয়ে পূজা টুজা করা তার বাসায় থাকলে করা যাবে না। তার বাসায় থাকতে হলে ঘন্টা বাজানো বন্ধ করতে হবে আর নাহয় বাসা ছেড়ে চলে যেতে হবে। সাফ কথা বলে মালিকের জামাই নব্য মালিক ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। আমার বাবা যেমন ছিলেন তেমনই দাঁড়িয়ে রাগে-অপমানে কাঁপতে থাকলেন। আমার মা তাকে ধরে ধরে নিয়ে বিছানায় বসালেন।

অফিস শেষে আমি যখন ঘরে এসে ঢুকলাম তখন ঘরে পা দিয়েই বুঝে ফেললাম কিছু একটা উল্টাপাল্টা ঘটে গেছে। কাঁধের ল্যাপটপটা টেবিলের উপর রেখে মায়ের দিকে তাকালাম। মা চোখের ইশারায় বাবার ঘরের দিকে দেখালেন। আলতো পায়ে ভয়ে ভয়ে বাবার ঘরে গেলাম বিষয় কি জানতে। বাবাকে নিয়ে এমনিতেই বেশ শঙ্কায় থাকি। অঘটন কিছু ঘটে যায় নি তো? ঘরে গিয়ে দেখি বাবা মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। আমি বাপি বলে ডাকলাম। জিজ্ঞেস করলাম বাপি সব ঠিক আছে তো? তিনি চোখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। তার সেই অসহায়, নিরুপায়, ব্যাথিত, লাঞ্ছিত দৃষ্টির কথা আমি কখনোই ভুলতে পারব না। কি ভয়ঙ্কর বিষাদমাখা সে দৃষ্টি!!!

আমি নরম সুরে জানতে চাইলাম, বাপি কি হয়েছে বল। বাবা শুধু বললেন, “বাবারে একটা বাসা দেখো খুঁজে পাও কি না। এই বাসায় বোধহয় আর থাকতে পারা যাবে না।” আমি ঘটনাটা বিশদে বুঝতে চাইলে মা পাশে থেকে সব বললেন। আমি বাবার দিকে তাকালাম, দেখলাম তিনি তার হাতের তালুর দিকে শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন। আমি আস্তে করে বললাম, বাপি বাসা আজকেই ছেড়ে দেব চিন্তা কর না। তিনি অনেকটা স্বগতোক্তির মত করে বলতে থাকলেন, “আজ ৪০ বছর ধরে মৌলভীবাজার শহরে থাকছি, কত রকমের মানুষের সাথে চলাফেরা করেছি, কেউ কোনদিন আমার ধর্ম নিয়ে, বিশ্বাস নিয়ে কোন কথা বলে নি। আর আজ একটা হাঁটুর বয়সী বাচ্চা ছেলে এসে কিনা আমাকে আঙ্গুল দেখিয়ে শাসিয়ে গেলো, বলে গেলো আমি যেন আর পূজার ঘন্টা না বাজাই। ” এই বলে বাবা এক ফোঁটা চোখের জল ফেললেন।

আমার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেলো। আমি এমনিতেই বাবা অন্তপ্রাণ। সেই ছোটবেলা থেকেই আমার বাবাকে আমার আদর্শ মেনে এসেছি। আমার সেই পর্বতের মত বিশাল বাবা কাঁদছেন!!! এ দৃশ্য আমি সহ্য করব কিভাবে? আমার ভীষণ ধার্মিক বাবা, আমার অসাম্প্রদায়িক বাবা, আমার কর্মযোগী, যুধিষ্ঠিরের ন্যায় সত্যবাদী, আপাদমস্তক ন্যায়নিষ্ঠ বাবা আজ তার ধর্মীয় স্বাধীণতা হরণের যন্ত্রণায় কাঁদছেন। আর আমি ছেলে হয়ে কিছু করতে পারছি না, এর চেয়ে অসহায়ত্ব আর কি হতে পারে? এর চেয়ে অপদার্থতা আর কি হতে পারে? এর চেয়ে জন্মের সময়ই মরে যাওয়াটা কি ভালো ছিল না? বললাম, তাহলে ঠিক আছে বাপি, আমি এখনই বাসা খুঁজতে যাচ্ছি। আজ যদি পাই তাহলে আজই বাসা বদলে ফেলব, বলে দুপুরের খাবার না খেয়েই আমি বাসা খুঁজতে বের হতে উঠলাম।

আমার মা এতক্ষণ আমাদের কথোপকথন শুনছিলেন। তিনি এমনিতে সহজ সরল আলাভোলা টাইপ আড্ডাবাজ মানুষ। মানুষকে খাইয়ে আর মানুষের সাথে গল্প করেই তার যাবতীয় আনন্দ। সাংসারিক জটিল কূট-কাচালিতে তাকে কখনো যেতে দেখি নি। তবে মাঝে মাঝে যখন খুব সংকটের সময় আসে তখন তিনি খুব বিচক্ষণের মত কথা বলেন, সিদ্ধান্ত নেন। সেই দিনও তিনি তা করলেন। আমাদের আবেগকে এক পাশে সরিয়ে রেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, নতুন বাসা তো খুঁজতে যাবে ভালো কথা, নতুন বাসার মালিক যে এই ছেলের মত বেয়াদব হবে না, আমাদের পূজা-পার্বন করতে দেবে সেই গ্যারান্টি কি দিতে পারবে? মানুষের চেহারা দেখে কি তার মনের ময়লা টের পাওয়া যায়? সে যে এর চেয়েও খারাপ হবে না তার নিশ্চয়তা কি? শেষে যদি এমন একটা ভালো পজিশনের বাসা হারিয়ে আরেক দাজ্জালের হাতে গিয়ে পড়ি? তখন কি হবে?

আমি নিশ্চুপ থাকলাম। যতখানি তেজ নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম ঠিক ততখানি হতাশা নিয়েই আবার বসে পড়লাম। আমি বসলাম কারণ এর কোন উত্তর আমার কাছে নেই। আমি কোনভাবেই কারও মনের জিঘাংসা সম্পর্কে আগাম খবর নিতে পারব না। অতএব, সিদ্ধান্ত হল পূজায় ঘন্টা বাজানোই বরং বন্ধ হোক। ঠাকুর যেহেতু অন্তর্যামী, যেহেতু তিনি সব দেখছেন বুঝতে পারছেন, সেহেতু পূজার এই আচারজনিত ঘাটতি নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমা করে দিবেন। এরপর থেকে আমার বাবা ঘন্টা বাজানো ব্যতিরেকেই তার পূজার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিয়ে কর চোরের মত, বরের মত নয়

এইবারের মত আমার শেষ গল্পটা বলি। এই গল্পটা গত বছরের জুলাই মাসের দিকে, যখন আমার বয়স হল ৩৪ বছর। আর সব স্বাভাবিক মানুষের মত আমারও বিয়ে ঠিক হল, বিয়েটা আসলে আমরা নিজেরাই ঠিক করেছি। আমাদের দুই পরিবারের লোকজন শুধু আনুষ্ঠানিকতার দিন-ক্ষণ নির্ধারণ করেছেন। তো সবকিছু ঠিক হওয়ার পরে এবার বাসার মালিককে জানানোর পালা। আমার বাবার অবস্থা তখন খুবই গুরুতর, সারাদিন বিছানায়ই শুয়ে থাকেন। কারো বাসায় গিয়ে কথাবার্তা বলা আর তার দ্বারা সম্ভব নয়। তাই নিজের বিয়ের বিষয়ে কথা বলার জন্য নিজেই গেলাম মালিকের বাসায়। মালিক ছেলেটা নিজেই দরজা খুলে দিল, বললাম কথা আছে একটু ভেতরে চল। ঘরে বসে তাকে আমার বিয়ের কথা জানালাম এবং সাথে সাথে জানতে চাইলাম তার কোন আপত্তি/ অসুবিধা নেই তো। এটা একটা ভদ্রতা, কারো বাসায় ভাড়া থাকলে এবং সেই বাসায় বিয়ে-শাদীর মত বড় কোন আয়োজন করতে হলে মালিকপক্ষের সাথে আগে কথা বলে নিতে হয়। মালিকপক্ষও তখন সকল প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে যতটুকু যা করা প্রয়োজন সবই করার অনুমতি দিয়ে সেই ভদ্রতার বিনিময় করেন।

কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এই ব্যাপারেও ব্যতিক্রম ঘটলো। মালিক আমার কথা শুনে একটুখানি ভেবে বলল, “ঠিক আছে ভাই করেন তবে একটু বাট-ছিট করে করিয়েন আর কি।” শুনে আমি ভেতরে ভেতরে একটু ধাক্কা খেলাম। একটা বাড়ির মালিক যতই বদরাগী আর বদমেজাজি হোক অন্তত বিয়ে শাদীর ব্যাপারে তারা সাধারণত কোন ওজর-আপত্তি করে না। আমি তার কাছ থেকে এই “বাট-ছিট” শব্দটা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমাদের সিলেটি ভাষায় “বাট-ছিট” শব্দের অর্থ হল, বুদ্ধি-বিবেচনা করে যতটুকু না করলেই নয়, ঠিক ততটুকুই করা। এখন বিয়ে বাড়িতে কি বাট-ছিট করব? বিয়ে মানে তো গেইট একটা করতেই হবে, আলোক-সজ্জা লাগবে, ঢোল-বাদ্য বাজবে, আত্মীয়-পরিজন আসবে, হৈ-হুল্লোড় হবে। এখানে কি বাট-ছিট করব? আমি কিছুক্ষণ নীরব থেকে যতটুকু সম্ভব বাট-ছিট করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বের হয়ে আসলাম।

ঘরে এসে সবাইকে বিষয়টা জানাতেই মুহুর্তে ঘরের পরিবেশ বিষণ্ণ হয়ে উঠল। তখন সবার সাথে বসে ছিলেন আমাদের পরিবারের অকৃত্রিম বন্ধু, আমাদের শ্রীমঙ্গলের পুরনো এলাকার এক প্রতিবেশি। আমি তাকে মাসি বলে ডাকি, কিন্তু আদরে-আহ্লাদে, দায়তও পালনে মায়েরই মতন। তিনি সমাধান দিলেন, “ঠিক আছে, মালিক যখন খোলাখুলিভাবে কিছু বলে নি তখন সকল প্রকার আলোক-সজ্জা, বাদ্য-বাজনা, হৈচৈ বাদ দেয়া হোক। আর ধর্মীয় আচার সংশ্লিষ্ট যা কিছু প্রয়োজনীয় কাজ সেগুলো আমার বাসায় হবে। এই বাসায় শুধু থাকা-খাওয়া আর বিয়ে পরিচালনা সংক্রান্ত যে সকল কাজ তা করা হবে।” আমরা সবাই সেভাবেই সিদ্ধান্ত নিলাম।

আমার বিবাহ পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী আচার-অনুষ্ঠানগুলো মাসির শান্তিবাগের বাসায় করা হল, আর রাতে শুধু খাওয়া আর ঘুমানোর জন্য বাসায় এসে থাকলাম। এভাবে বিনা গেইটে, বিনা লাইটে, বিনা ঢাকঢোলে আমি চোরের মত বিয়ে করলাম। যে আমি বাবার গোষ্ঠী এবং মায়ের গোষ্ঠী মিলিয়ে পরিবারের সবার বড় ছেলে, যে আমার বিয়ে নিয়ে কাকাতো, মামাতো ভাই-বোন, মাসি-পিসি সবার নানা রকম মিষ্টি-মধুর পরিকল্পনা ছিল, সেই আমি নীরবে-নিভৃতে আরেকজনের বাসায় আশ্রয় নিয়ে আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করলাম।

হ্যা, এই হল আমার আপাত যাপিত জীবনের গল্প। আমি এক সংখ্যালঘু। এমন হাজারো গল্প আমার মত এ দেশের সকল সংখ্যালঘুর জীবনে খুঁজলে পাবেন। এই দেশে যারা ধর্মীয় কিংবা জাতিগত কিংবা ভাষাগত সংখ্যাগুরু অবস্থানে থাকেন তারা কখনোই এই সংখ্যালঘুদের চাপা দুঃখের কথা, চাপা যন্ত্রণার কথা বুঝতে পারবেন না। সে আপনি যত বড় প্রগতিশীলই হোন না কেন, আপনার সাধ্যই নেই এই দেশের সংখ্যালঘুদের হৃদয়ের ক্ষত স্পর্শ করার। এ বড়ই মোহন ব্যাধি, নীরবে-নিভৃতে সকলের অগোচরে সমাজের অভ্যন্তরে বয়ে চলছে। শুধু বয়েই যাচ্ছে না, এ ব্যাধি বেড়েও চলছে। যতই দিন যাচ্ছে এ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম-নিরপেক্ষতা নিয়ে, অন্যের মতের-বিশ্বাসের প্রতি সহনশীলতা নিয়ে, দেশজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে উদাসীনতা, অবহেলা বেড়েই চলছে।

এক দিকে মানুষের মধ্যে ধর্ম-কর্ম নিয়ে উগ্র হওয়ার হার যেমন বাড়ছে অপরদিকে লুটপাট, রাহাজানি, প্রতারণা, ঘুষ, দূর্নীতি, নারী-নিপীড়নের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। কিন্তু সমস্যা হল এগুলো নিয়ে সমাজের মূল-স্রোতে যতখানি আলোচনা হয়, সংখ্যালঘুদের দমন পীড়ন নিয়ে ঠিক ততখানি আলোকপাত হয় না। নীরবে-নিভৃতে, সবার অগোচরে এই দেশের ভূমিপুত্ররা, এই মাটির মানুষেরা যে ঊঢাও হয়ে যাচ্ছে, এ নিয়ে কোথাও তেমন উচ্চবাচ্য শোনা যায় না। এ যেন সবাই ধরেই নিয়েছে ৯০% সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে হাজারো সমস্যা বাদ দিয়ে ১০% সংখ্যালঘু নিয়ে আবার ভাবার কি আছে? তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের দলে ভিড়ে যায় না কেন?

পরিশেষে বলতে চাই, সংখ্যালঘু কোন শব্দ নয়, কোন পরিসংখ্যান নয়, কোন রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের শ্লোগান নয়, সংখ্যালঘু এক বীভৎস অনুভূতির নাম। এক বুক প্রচন্ড অভিমান, অপমান, বঞ্চনা, হীনমন্যতা, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা, মা-মাটি-মানুষ হারানোর বেদনার অনুভূতিকে যদি এক কথায় প্রকাশ করতে চান তবে সেই শব্দের নাম হবে সংখ্যালঘু। আর হ্যা, আমি এক সংখ্যালঘু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *