আমি এক সংখ্যালঘু

আমি খেয়াল করে দেখেছি এ দেশের সিংহভাগ মানুষই সংখ্যালঘু শব্দটার প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারে না। ধর্মীয়, ভাষাগত, জাতিগত, সংখ্যালঘুদের মনের গহীনের গোপন ব্যাথা সম্পর্কে মোটেও ওয়াকিবহাল নয় এই দেশ, দেশের মানুষ। এখানকার সচেতনমহল ফিলিস্তিন-ইসরাইলের ইতিহাস নিয়ে যতখানি জ্ঞাত, কাশ্মীরের ঘটনাবলী নিয়ে যতখানি উদ্বিগ্ন তার ভগ্নাংশ পরিমাণ উৎকন্ঠাও পরিলক্ষিত হয় না তাদের নিজের দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর পক্ষে। এমনকি যারা সমাজে খুব প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করেন, সকল প্রকার সংস্কার এবং সংকীর্ণতার উর্ধে অবস্থান করে সমাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত করতে চান তারাও সংখ্যালঘু শব্দের তাৎপর্যটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। সবাই সংখ্যালঘু শব্দের শাব্দিক অর্থই বুঝে নেয়, অর্থাৎ সংখ্যায় যে লঘু সেই সংখ্যালঘু। কিন্তু, এই শব্দটার মানে যে তার শাব্দিক অর্থের চেয়েও বেশি বিস্তৃত, বেশি গভীর এবং বেশি অর্থবোধক তার কোন ধারণাই এদেশের মানুষের নেই। তাই তাদের নিমিত্তে আমি আমার নিজের জীবন থেকে নেয়া কিছু ঘটনার বর্ণনা নিবেদন করলাম। ঘটনার সাথে সমপৃক্ত ব্যক্তিবর্গের নাম-ধাম বদলে দিলাম। যেহেতু তাদের পরিচয় প্রকাশের অনুমতি নেই নি তাই তাদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা সঠিক মনে করলাম না। মনে আশা এই যে, হয়তো এটা পড়ে সংখ্যালঘু শব্দটার ব্যাপকতা কিছুটা মাত্রায় উপলব্ধি করতে পারবেন।

আমি খেয়াল করে দেখেছি এ দেশের সিংহভাগ মানুষই সংখ্যালঘু শব্দটার প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারে না। ধর্মীয়, ভাষাগত, জাতিগত, সংখ্যালঘুদের মনের গহীনের গোপন ব্যাথা সম্পর্কে মোটেও ওয়াকিবহাল নয় এই দেশ, দেশের মানুষ। এখানকার সচেতনমহল ফিলিস্তিন-ইসরাইলের ইতিহাস নিয়ে যতখানি জ্ঞাত, কাশ্মীরের ঘটনাবলী নিয়ে যতখানি উদ্বিগ্ন তার ভগ্নাংশ পরিমাণ উৎকন্ঠাও পরিলক্ষিত হয় না তাদের নিজের দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর পক্ষে। এমনকি যারা সমাজে খুব প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করেন, সকল প্রকার সংস্কার এবং সংকীর্ণতার উর্ধে অবস্থান করে সমাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত করতে চান তারাও সংখ্যালঘু শব্দের তাৎপর্যটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। সবাই সংখ্যালঘু শব্দের শাব্দিক অর্থই বুঝে নেয়, অর্থাৎ সংখ্যায় যে লঘু সেই সংখ্যালঘু। কিন্তু, এই শব্দটার মানে যে তার শাব্দিক অর্থের চেয়েও বেশি বিস্তৃত, বেশি গভীর এবং বেশি অর্থবোধক তার কোন ধারণাই এদেশের মানুষের নেই। তাই তাদের নিমিত্তে আমি আমার নিজের জীবন থেকে নেয়া কিছু ঘটনার বর্ণনা নিবেদন করলাম। ঘটনার সাথে সমপৃক্ত ব্যক্তিবর্গের নাম-ধাম বদলে দিলাম। যেহেতু তাদের পরিচয় প্রকাশের অনুমতি নেই নি তাই তাদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা সঠিক মনে করলাম না। মনে আশা এই যে, হয়তো এটা পড়ে সংখ্যালঘু শব্দটার ব্যাপকতা কিছুটা মাত্রায় উপলব্ধি করতে পারবেন।

রাজীব গান্ধী যখন আমাদের প্রেসিডেন্ট

সে আশির দশকের শেষের দিকের কথা। বয়স আমার কত হবে? বড় জোর ছয় কিংবা সাত? একদিন বিকেলবেলা বাসার সামনের মাঠে খেলতে গিয়ে শুনলাম, আমাদের প্রেসিডেন্ট নাকি মারা গিয়েছে। আমারই এক মাঠবন্ধু আমাকে দেখে দৌড়াতে দৌড়াতে কাছে এসে বলল এই জানিস তোদের প্রেসিডেন্ট তো মারা গেছে। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমাদের প্রেসিডেন্ট মারা গেছে? সে জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, হ্যা তো, মারা গেছে বোম ব্লাস্ট হয়ে। এক মহিলা ফুলের মালার ভিতর বোমা ঢুকিয়ে তাকে মেরে ফেলেছে। তুই জানিস না? টিভিতে আজ সারাদিন ধরে দেখাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট বলতে তখন আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল হাফহাতা সাফারি কোট পরিহিত হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের কথা, যিনি স্যুট-বুট পরে বন্যার্ত মানুষকে দেখার জন্য হাঁটু সমান পানিতে নেমে লোকজন নিয়ে হাঁটাহাঁটি করেন। তার সামনে পেছনে থাকে পুলিশ আর্মি আর ক্যামেরাওলা সাংবাদিক। প্রায় দিনই রাত আটটার সংবাদে এসব দৃশ্য দেখা যেত। সেই লোক মরে গেলো? আহারে…। অবশ্য আমার মামারা তখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। তারা এরশাদের বিরুদ্ধে মিছিল করতেন, স্বৈরাচার বলে গালি দিতেন। আমি ভাবলাম তাহলে তো মামারা খুব খুশি হবেন, যাই দৌড়ে গিয়ে বাসায় খবরটা দিয়ে আসি।

বাসায় এসে পেয়ে গেলাম আমার মেজো মামাকে।(সদ্য প্রয়াত)। হড়বড়িয়ে বলতে লাগলাম, “মামা জানো, প্রেসিডেন্ট এরশাদ মারা গেছে?” মামা একটু অবাক হয়ে বললেন, “কই না তো। তোকে কে বলেছে?” আমার বন্ধু অমুক বলেছে, প্রেসিডেন্ট এরশাদ মারা গেছে, তাকে বোমা মেরে মারা হয়েছে। আজ সারাদিন ধরে টিভিতে দেখাচ্ছে। তাকে নাকি চন্দন কাঠ দিয়ে দাহ করা হবে। তুমি জানো না?” এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। যে মামা সারাদিন এরশাদের নামে মিছিল দেয়, সে কিছুই জানে না!!! মামা কিছুক্ষণ সরু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোকে এ খবর কে দিল?” আমি আমার অমুক বন্ধুর নাম আবার বললাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমাকে কাছে ডাকলেন, “এদিকে আয়”। তিনি আমাকে টিভির দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন, “ঐ দেখ ভারতের প্রধাণ মন্ত্রী রাজীব গান্ধী মারা গেছেন। তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান চলছে। তিনি ভারতের প্রধাণ মন্ত্রী, আমাদের প্রেসিডেন্ট নয়। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, ভারতের নয়। তোর বন্ধুকে জানিয়ে দিস।” আমি বুঝলাম আমার বন্ধুটা খুব বোকা, সে ভারতের প্রধাণমন্ত্রীকে আমাদের প্রধাণমন্ত্রী বানিয়ে দিয়েছে। তার বোকামীতে আমি একচোট হেসে নিলাম। হি হি হি — হা হা হা, মানুষ এতো বোকা হয় কি করে?

তখন খুব হেসেছিলাম। কিন্তু আজ যখন সেই দিনের কথা স্মরণ করি, তখন আর হাসি আসে না, বরং বিস্মিত হই। বিস্মিত হই এই ভেবে যে বাংলাদেশের হিন্দুরা যে বাংলাদেশের নাগরিক না, তাদের দেশ যে ইন্ডিয়া, তাদের প্রেসিডেন্ট যে রাজীব গান্ধী তা একটা ঐটুকু ছেলের মাথায় ঢুকিয়ে দিল কে? কিভাবে?

মোমিনের হিরো জসীম

এরপর আরও কিছু বছর চলে গেলো, মামারা আমাদের বাসা ছেড়ে চলে গেছেন। তাদের ছেড়ে যাওয়া ঘরে নতুন ভাড়াটে এসেছে। ভাড়াটের দুটো ছেলে-মেয়ে। তাদের সাথে আমার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আমরা একসাথে খেলাধুলা করি, গান গাই, ঝগড়া করি, সকাল বেলা ঠাকুরের জন্য ফুল কুড়াতে যাই। অনেকটা সমবয়সী ভাই-বোন যেভাবে বেড়ে উঠে সেভাবেই আমরা বেড়ে উঠছি। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। গায়ে আমার নতুন যৌবনের হাওয়া। এ পাড়ার হয়ে ওপাড়ার ছেলেদের সাথে ঝগড়াঝাটি, মারামারি করি। পৃথিবীর সকল অন্যায়কারী, ঘুষখোর, চোর-বদমাশদের আমার ব্যক্তিগত শত্রু মনে করি। রাজাকার আর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের ঘৃণা করি। আরেকবার মুক্তিযুদ্ধ কেন লাগে না তা নিয়ে হায়-আফসোস করি। যদি আবার মুক্তিযুদ্ধ লাগতো তাহলে আমি একাই গিয়ে সকল হানাদার বাহিনী মেরে-কেটে একেবারে সাফ করে ফেলতাম ভেবে নিজের হাতের তালুতে নিজেই কিলাতে থাকি। একদিকে তিন গোয়েন্দা পড়ি, শার্লক হোমস পড়ি আর দেশটাকে কিভাবে আমেরিকা-ইংল্যান্ডের মত সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়, কিভাবে সকল সমস্যা-সংকট দূর করে দেশকে উন্নত বিশ্বের মত একটা সুন্দর দেশে পরিণত করা যায় তা নিয়ে দারুন দুশ্চিন্তায় ভুগি।

আমার স্পষ্ট মনে আছে তখন কার্তিক মাসের কোন এক সুন্দর বিকেল। আমাদের শ্রীমঙ্গলে তখন কার্তিক মাসের বিকেল বেলা হালকা হালকা হিম পড়ত। চাইলেই বিকেল বেলা একটা পাতলা কাঁথা গায়ে দিয়ে বেশ জম্পেশ করে ঘুমানো যায়। এমনি এক সুন্দর বিকেলে আমি একটা কাঁথা গায়ের উপর টেনে বেশ মজাসে তিন গোয়েন্দার একটা টানটান উত্তেজনার বই পড়ছি। আমাদের বাসায় আর কেউ নেই, শুধু পাশের ঘরের মেয়েটা বিকেল বেলার রেয়াজ করছে। তার মা ভাইকে নিয়ে কোথায় যেন বেড়াতে গিয়েছেন। বইয়ের একবারে শেষ দিকে, সমস্ত রহস্যের জট এই খুলবে কি সেই খুলবে করছে। হঠাৎ কানে গেলো একটা বীভৎস চিৎকার, সাথে কারো দরজায় জোরে জোরে আঘাত করার শব্দ। শব্দটা এতোটাই কাছে যে আমার মনে হল আমার ঘরের দরজায়ই কেউ আঘাত করছে।

আমি হুড়মুড় করে বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলে দেখি আমাদের পাড়ার রঙ মিস্ত্রি জসীম(ছদ্মনাম), যার সাথে ছোটবেলা অনেক খেলাধুলা করেছি, সে এসে আমাদের ভাড়াটের দরজায় উপর্যুপরি কিল-ঘুষি-লাথি মারছে আর অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করছে। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার দশা। হলটা কি? আমি দৌড়ে গিয়ে তাকে থামানোর চেষ্টা করলাম, জসীম ভাই জসীম ভাই কি হয়েছে আমাকে বল? কি সমস্যা তোমার? এরকম করছ কেন? জসীম তার ইটের ভাটার মত জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকালো। এরপর তর্জনী তুলে আমার দিকে হেঁড়ে গলায় চেঁচাতে চেঁচাতে বলল, “এই শোন, তোরার ভাড়াইট্টা ফুরিটারে কইছ আমরার আজানোর সময় যেন গান গাওয়াত না বয়। তাই ফত্যেইক দিন সইন্ধ্যা হইলেই সারমোনিয়াম একটা লইয়া ভ্যা ভ্যা করতে থাকে। তাইরে গতকাইলও না করছি, হুনছে না। আরেকদিন যদি আজানোর সময় ইলা ভ্যা ভ্যা আরম্ভ করে তে ই ঘরবাড়ি আস্তা থাকতো নায়, আর গান তাইর পু** দিয়া ভরি দিমু কইলাম।”

ততক্ষণে মেয়েটা দরজা খুলেছে, আর হতবাক হয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে। হতবাক হয়েছি আমিও, আমার গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না। যে জসীম পেশায় একজন রঙ মিস্ত্রী, যার বাবা ছোটবেলা তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল, যার মা আমাদের বাসায় কাজ করে বাচ্চাগুলিকে খাইয়ে পড়িয়ে বড় করেছে, আমাদের ঘরের পেছনের পানা-পুকুর থেকে বড়শি দিয়ে মাছ মেরে নিয়ে খেয়েছে, পুকুর পাড় থেকে কলমি শাক নিয়ে খেয়েছে, যার সাথে একসাথে খেলেছি, যে আমাকে পাখি ধরার ফাঁদ বানানো শিখিয়ে দিয়েছিল, যে আমার থেকে বয়সে বড় হওয়ার পরেও কিছুটা স্নেহ আর কিছুটা সমীহ থেকে বনি দাদা ডাকতো, সেই জসীম কিনা আমার সাথে এই ভাষায় কথা বলছে।

আমি হা করে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম, আমি তার নাক থেকে ফোঁস ফোঁস করে বের হওয়া গরম নিঃস্বাস অনুভব করতে থাকলাম, আমি তার রাগে থরথর কম্পিত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। সে আর কি যেন বলেছিল আমার আর মনে নাই। আরও একগাদা কথাটথা বলে সে চলে গেল। আমি পাথরের মত শুনে গেলাম, পাথরের মত চেয়ে দেখলাম, পাথরের মত দাঁড়িয়েই রইলাম। একি সত্যি নাকি আমার দুঃস্বপ্ন? পাশের ঘরের মেয়েটা দরজা লাগিয়ে রাগে-অপমানে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। আমি তার কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু কিছু বলতে পারছিলাম না, কিছুই করতে পারছিলাম না।

এরপরে কি হয়েছিলো আর না বললেও চলে। এ ঘটনার কোন বিচার হয় নি। আমার পরাক্রমশালী মামারা ঘটনা শুনে চুপচাপ চেপে গিয়েছিল। পরে জানতে পারা গিয়েছিল মসজিদ কমিটির লোকেরাই জসীমকে উষ্কে দিয়ে এই ঘটনা ঘটাতে পাঠিয়েছে। মসজিদটি যেহেতু আমাদের বাসার একদম লাগোয়া(পাগলা লন্ডনির বাসা) তাই হারমোনিয়ামের শব্দে আজান দিতে নাকি অসুবিধা হয়। নিজেরা আসেনি হয়তো চক্ষু লজ্জায়, তাই গরীবের হিরো জসীমকে পাঠিয়েছে। জসীম এসে তার উপর ন্যাস্ত দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করে গেছে। সমবেত মুসল্লিরা পুরো ঘটনা অবলোকন করে ধীরে ধীরে যার যার বাড়িঘরে চলে গেলেন।

শুধু আমি, ১৪ বছরের এক স্বাপ্নিক কিশোর, দেশ নিয়ে যে দিনের অর্ধেক বেলাই আকাশ-কুসুম স্বপ্ন দেখে, সেই আমি বুঝে গেলাম এই দেশে হিন্দু পরিচয়ে থাকতে হলে জসীমদের মত অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের দাবড়ানি খেয়েই থাকতে হবে। সমাজের শ্রেণী পরিচয়ে যারা নিম্ন বর্গীয়, যারা মেহনতি-শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ তারাও তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সংখ্যাধিক্যের কারণে মধ্যবিত্ত সংখ্যালঘুদের মর্যাদাবোধে আঘাত করতে পারে কিংবা বলা যায় যা খুশি তাই করতে পারে। এর কোন সুবিচার নাই, প্রতিকার নেই, এ দেশ সংখ্যালঘুদের নয়। যাইহোক, সেই মেয়েটা আর কোনদিন হারমোনিয়াম স্পর্শ করেনি। হাজার অনুরোধ করার পরও তাকে দিয়ে আর গান গাওয়ানো যায় নি।

হোলির দিন বর্ণহীন

তারপর আরও কিছু দিন গেলো। আমি স্কুল পাশ করে কলেজে উঠলাম। আমি বন্ধুপ্রিয় মানুষ, সবসময় বন্ধুদের মাঝে থাকতেই পছন্দ করি। আর বন্ধু বাছাই এর ক্ষেত্রে বর্ণ-বিত্ত-ধর্মের চেয়ে মনের মিলকেই বেশি গুরুত্ব দেই। যার সাথেই মনের মিল তার সাথেই বন্ধুত্ব, ফলে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে যেকোন ধর্মের ছেলেদের সাথে জানের জান দোস্তি গড়ে উঠতে সময় লাগত না। সময়ের সাথে সাথে ১৪ বছর বয়সে পাওয়া সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ভুলেই গিয়েছি। কলেজে উঠে ক্লাস করি কম, দোস্তদের সাথে আড্ডা দিতে দিতেই দিন কেটে যায়। এভাবে চলতে চলতেই সে বছর এলো ফাল্গুন মাস। সবাই জানে, ফাল্গুন মাসে দোল পূর্ণিমা হয়। হয়তো ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের কল্যাণে সবাই এটাও জেনে গেছে সেই দোল-পূর্ণিমাকে হিন্দীতে হোলি বলে এবং হোলির দিনে ধুন্দুমার রকমের রঙ খেলা হয়।

বাংলাদেশে এখন আর ওতো দেখা যায় না তবে আমার ছোটবেলাতে বেশ বড় আকারেই হত। বড় বড় দাদা-দিদি-মামা-কাকারা রঙের পিচকারি হাতে নিয়ে একে অপরকে দৌড়াতেন, গ্রুপ বেঁধে একদল আরেক দলের উপর রঙ ঢেলে দিতেন। ক্রমে ক্রমে সেই আনন্দের ঘটা কমে এলো, একটা সময় আর আগের মত হৈ-হুল্লোড় হয় না। এমনি আবীর দিয়ে ছোটরা বড়দের পায়ে প্রণাম করে, আর ঠাকুরের প্রসাদ খেয়ে কোনরকমে উৎসব শেষ হয়ে যেত। আমরা আফসোস করতাম, আহা ছোটবেলা কি মজার মজার কান্ড হত এই দিনে আর এখন কোন নড়াচড়াই হয় না, সবকিছু ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেছে।

তো সেই বছর বন্ধুরা সব এক জায়গা থেকে আড্ডা দিয়ে এসে এলাকায় ঢুকতেই দেখা গেলো পাড়ার মেয়েরা সবাই রঙের বোতল, পিচকারি, বালতি ইত্যাদি হাতে নিয়ে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে আর আমাদের দিকে শিকারির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমরা সাথে সাথে থমকে গেলাম। আমাদের তো কোন প্রস্তুতি নেই। এখন কি হবে? এদিকে মেয়েরা ক্রমাগত হাতের ইশারায় ডেকেই চলেছে, “আয় আয় কিচ্ছু করব না, শুধু হাতে লাগাবো, আর কোথাও লাগাবো না, বিশ্বাস কর, চলে আয়”। আমরা তো আর আগাই না। এরপরে তারা শুরু করল আমাদের পৌরুষে আঘাত দেয়া, “হুঃ কি একেক জনের সাহস দেখে নিলাম, রঙের ভয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটে না, কাপুরুষ একেকটা, যা যা ঐদিক দিয়ে ঘুরে যা চোরের মত, এদিকে আসা লাগবে না”…… ইত্যাদি ইত্যাদি।

এইবার কাজ হয়েছে। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ঘাড়ুয়া যে ছেলেটা, সে বলল এর পরে তো আর থাকা যায় না। কত বড় বড় কথা বলছে, আজ তাদের একদিন কি আমার একদিন, ওদের রঙ দিয়েই ওদেরকে দৌড়াবো দেখে নিস। বলেই তাদের দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে ষাড়ের মত তেড়ে গেলো। আমরা কি এরপরে আর বসে থাকি? আমরাও তাকে অনুসরণ করে যুদ্ধের ময়দানে ঢুকে পড়লাম। সারাদিন জবরদস্ত হুটোপুটি হল, শেষের দিকে আমাদের মা-মাসি-দিদিরাও এসে যোগ দিলেন। বড় হওয়ার পর ঐ দিনটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে রঙীন দিন। যাহোক, সারাদিন রঙ-টং খেলে মেয়েরা যার যার বাড়ি চলে গেলো আর আমরা রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে এক কিলোমিটার দূরে এক ঝর্ণায় গিয়ে দারুনভাবে স্নান করলাম, একে অপরের গা থেকে রঙ মুছে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। পরে বাসায় গিয়ে খেয়েদেয়ে ক্লান্ত-বিদ্ধস্ত হয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

গল্পটা এখানেই সুন্দরভাবে শেষ হতে পারত, কিন্তু এ যে বাংলাদেশ, সংখ্যাগুরুর বাংলাদেশ, তাই গল্পের আরও কিছু অংশ বাকি রয়ে গেছে। সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ মা এসে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বললেন “বলাই বাবু তোকে ডাকছে কেন দেখতো”। মার চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ। উল্লেখ্য, বলাই ভট্টাচার্য আমাদের এলাকার মুরুব্বি, এক সময়কার কমিশনার, সাধারণত বড়দের সাথেই তার কথা বার্তা হয়, আমরা দূর থেকে দেখে এদিক-ওদিক সটকে পড়ি। কেমন জানি গম্ভীর হয়ে চলাফেরা করতেন, এই কারণেই হয়তো কিছুটা ভয়, কিছু সমীহ নিয়ে তার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতাম। এহেন চরম গুরুজনের আমার মত এক পুঁচকে কিশোরের সাথে কি দরকার? কোন অন্যায় টন্যায় করে ফেলিনি তো?

চিন্তিত মুখে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বাসা থেকে বের হলাম। দেখি বাসার পাশের নতুন মসজিদের ভিতরে বেশ ভিড়। আমি এগিয়ে যেতেই দেখলাম মসজিদের ইমাম বলাই দাদুকে কি যেন বুঝাচ্ছে আর দাদু চুপচাপ মাথা নেড়ে কথা শুনে যাচ্ছেন। তাদের ঘিরে ছোট একটা জটলা। আমি এগিয়ে যেতেই দাদু ইমামকে থামিয়ে দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই আজ সকালে এখানে রঙ খেলেছে কে রে? আমি বললাম, “আমরা দাদু, কেন, কি হয়েছে?” তিনি আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ততোধিক গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন, কারা কারা খেলেছিস সবার নাম বল। আমি নামগুলো বলতেই দেখা গেলো, ইমাম সাহেবের মুখ কালো হয়ে গেছে। কেননা, যে সকল ছেলেরা খেলেছে তাদের মধ্যে অধিকাংশই মুসলিম পরিবারের। দাদু ইমাম সাহেবের দিকে তাকালেন। ইমাম অন্যদিকে তাকিয়ে মিউ মিউ করে বলতে লাগলেন, “তবুও খেলাটা শুরু তো করছে হিন্দু ঘরের পোলা-মাইয়ারা। এইটা তো অস্বীকার করতে পারবেন না।” আমি বিষয়টা তখনও বুঝতে পারছি না, আমাদের রঙ খেলার সাথে ইমাম সাহেব আর মসজিদের সম্পর্ক কি? এদিকে দাদু আর কথা না বাড়িয়ে হঠাৎ করে অযু করার টেপের সামনে বসে পড়লেন। এরপর টেপ ছেড়ে খানিকটা জল হাতে নিয়ে টেপের পাশে লেগে থাকা একটুখানি রঙ মুছে দিলেন। এই রঙ এতোই কম যে সহজে চোখে পড়ে না। তারপর ইমামের দিকে ঘুরে বললেন, “ইমাম সাহেব, ছেলে-মেয়েরা না বুঝে ভুল করেছে আমি নিজের হাতে তা শুধরে দিলাম, আশা করি এ নিয়ে আর বেশি কথা না বাড়ানোই ভালো হবে। ” এই বলে আমার দিকে এক কড়া তিরষ্কারের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলে গেলেন। ইমাম সাহেবও মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে মসজিদের ভিতর ঢুকে পড়লেন।

আমি কিছুক্ষণ ভ্যাবাচেকা খেয়ে উপস্থিত একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, “ঘটনা কি রে?”। সে যা উত্তর দিল, তার মোদ্দা কথা হল, আমরা যখন রঙ খেলেছি তখন কে বা কারা মসজিদের ভিতর ঢুকে মসজিদের টেপ থেকে জল নিয়ে যায় রঙ মেশানোর জন্য। তখন একটু রঙ টেপের পাশে লেগে গিয়েছিল। বিকেলে ইমাম সাহেব অযু করতে এসে এটা খেয়াল করেন এবং উপস্থিত সবাইকে সাক্ষী রেখে বলাইবাবুকে ডেকে পাঠান বিচার করার জন্য। এরপরে কি হল তা তো উপরেই বললাম।

এই ঘটনায় আমি দুটো কারণে খুব অবাক হলাম, এক. এই রঙ এর পরিমাণ এতো অল্প যে যেকেউ একটু জল ঢেলে দিলে তা চলে যেতো এবং গেছেও, এটা নিয়ে এতো বিচার-সালিশের কি আছে? আর দুই. মসজিদের ভিতর থেকে জল নিয়ে যাবে এমন বুকের পাটাওলা হিন্দু ছেলে আছেটা কে আমাদের পাড়ায়! আমরা হিন্দু ছেলেরা তো ভয়েই মসজিদের ভিতরে ঢুকি না, আর মেয়েদের তো প্রশ্নই উঠে না। তাহলে করলটা কে কাজটা? কিন্তু তখন কোন সদুত্তর পাওয়া গেলো না। উত্তর পেয়েছিলাম এই ঘটনার দুই দিন পরে। আমারই এক প্রভাবশালী মুসলিম পরিবারের বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারলাম, ইমামসাহেব তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নিলেও আসলে তিনি বিষয়টা ছেড়ে দেন নি। তিনি এলাকার সকল মান্যগণ্য মুসলিম পরিবারের প্রধাণের কাছে গিয়ে ব্যাপারটা নিয়ে নালিশ করেছেন এবং একজন মুরুব্বির বাসায় বিষয়টা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনাও হয়েছে।

সেখানে কয়েকজন মুসলিম ছেলে যারা রঙ খেলায় অংশ নিয়েছিল তাদেরকে জেরা করে জানতে পারা যায় টিটু(ছদ্মনাম) নামের এক মুসলিম দিন মজুরের ছেলে এই কাজ করেছে। কে নাকি নিজ চোখে দেখেছে, পরে টিটুকে চেপে ধরায় সে এটা স্বীকারও করেছে। অতঃপর টিটুর বাবাকে ডেকে এনে মুরুব্বিরা ইচ্ছামত গালমন্দ করেন এবং এক মাসের মধ্যে সপরিবারে এলাকা ত্যাগ করতে আলটিমেটাম দিয়ে দেন। ঘটনাটা এভাবেই শেষ হয়। ঘটনার গুরুত্ব তখন এতোটা বুঝি নি কিন্তু আজ মনে মনে ভেবে শিউরে উঠি যে, যদি এই কাজটা টিটু নামের কোন মুসলিম ছেলে না করে কোন হিন্দু ছেলে করত তাহলে বিষয়টা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো? রঙ খেলার রঙ কোন রুপ ধারণ করত? আমাদের একদিনের আনন্দ-খেলা পুরো এলাকার বিষাদের কারণ হয়ে দাঁড়াতো না তো? কি জানি।

ও আচ্ছা এই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিলো জানেন? ঐ দিনের পর থেকে সেই এলাকায় আর কখনো কোন দোল পূর্ণিমায় রঙ খেলা হয় নি। সেই যে খেলা বন্ধ হয়েছে আর কেউ শুরু করার সাহস করেনি। কি মজা তাই না?

(চলবে)

পরের পর্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *