অ্যাঞ্জেলিনা জোলির স্তন অপসারন ও জরুরি কিছু কথা

হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর জন্য তাঁর উভয় স্তন অপসারণ ও কৃত্রিম ভাবে পুনরায় স্থাপনের খবরটি এখন আমরা কমবেশি সবাই জানি। বিগত মাসেই এই জটিল ও সময়সাপেক্ষ সার্জারির ধকল সামলে সুস্থ হয়ে ওঠা জোলি নিজেই নিউ ইয়র্ক টাইম্‌স পত্রিকায় খবরটি প্রকাশ করেন। তিনি তার ভক্তদের পাশাপাশি পুরো বিশ্বকে আরও জানান যে এরপর তাঁর দ্বিতীয় পদক্ষেপ হবে জরায়ু অপসারণ করে তার স্তন এবং জরায়ুর কান্সারের ঝুঁকি যথাক্রমে ৮৭% ও ৫০% কমিয়ে আনা।


হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর জন্য তাঁর উভয় স্তন অপসারণ ও কৃত্রিম ভাবে পুনরায় স্থাপনের খবরটি এখন আমরা কমবেশি সবাই জানি। বিগত মাসেই এই জটিল ও সময়সাপেক্ষ সার্জারির ধকল সামলে সুস্থ হয়ে ওঠা জোলি নিজেই নিউ ইয়র্ক টাইম্‌স পত্রিকায় খবরটি প্রকাশ করেন। তিনি তার ভক্তদের পাশাপাশি পুরো বিশ্বকে আরও জানান যে এরপর তাঁর দ্বিতীয় পদক্ষেপ হবে জরায়ু অপসারণ করে তার স্তন এবং জরায়ুর কান্সারের ঝুঁকি যথাক্রমে ৮৭% ও ৫০% কমিয়ে আনা।

এই সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়া জোলির পক্ষে মোটেও সহজ কোনো বিষয় ছিল না। দেহে জন্মসুত্রে পাওয়া জরায়ু এবং স্তন ক্যান্সারের জন্য দায়ি বিপদজনক BRCA1 জিন ধরা পরার পরই তিনি এই কঠিন কিন্তু দরকারি সিদ্ধান্তটি নেন। তার মা মাত্র ৫৩ বছর বয়সে এই একই জিনের কারনে স্তন ক্যন্সারে মারা যান। এই মাসের ২৬ তারিখে জোলির সুস্থ হয়ে উঠার মাঝখানেই তার খালাও একই রোগে মৃত্যু বরন করেন। স্তন ক্যান্সার নিয়ে যারা গবেষনা করছে তাদের অনেকেই বলছেন, জোলির এ উদ্যোগ আজকের নারীসমাজের চিন্তা-চেতনায় যোগ করবে নতুন মাত্রা। জোলির এমন মহতী পদক্ষেপকে প্রশংসা করেছে বিশ্বগণমাধ্যমও।

বিশ্বখ্যাত ‘টাইম’ ম্যাগাজিন অ্যাঞ্জেলিনা জোলির এই সাহসী উদ্যোগ নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করেছে তাদের চলতি সংখ্যায়। ‘দি অ্যাঞ্জেলিনা ইফেক্ট’ শিরোনামে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আমরা সবাই মাঝেমধ্যে রোগাক্রান্ত হই। এটা একটা সাধারণ হিসাব। অনেক রোগ আবার প্রাণঘাতী। রোগাক্রান্ত হন বিখ্যাত ব্যক্তিরাও। ১৯৮৫ সালে হলিউডের হার্টথ্রব অভিনেতা রক হাডসন এইডসে মারা যান। অথচ তিনি ছিলেন এমন দেশের বাসিন্দা, ধারণা করা হতো যে কোনো রোগ সহজেই প্রতিরোধ করতে সক্ষম সেই দেশ।

কিন্তু রোগ মানে না কোনো দেশ বা সেলিব্রেটি। এটা ভালো করেই বুঝেছিলেন জোলি। তাইতো সৌন্দর্যহানির চিন্তাকে বড় করে দেখেননি। জোলির এই সাহসী পদেক্ষেপ সবাইকে জানানোর মাধ্যমে বিশ্বের সকল নারীকে স্তন এবং জরায়ুর ক্যান্সার রোধে প্রতিষেধকের চাইতে প্রতিরোমূলক সুযোগ গ্রহনের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছেন। জেনেটিক টেস্টিংকে নিয়ে এসেছে আলোচনার টেবিলে।

জোলির মতে, তার এই সাহসী উদ্যোগ কোনো একসময়ে স্তন ক্যান্সার হবে এমন ১২ শতাংশ এবং স্তন ক্যান্সার নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন এমন ১০০ শতাংশ নারীর জীবনে আশার আলো জ্বালাবে। নিউইয়র্ক টাইমস এর সাথে এক সাতক্ষাৎকারে জোলি বলেন, আমি আশা করি আমার অভিজ্ঞতা থেকে অন্য নারীরাও উপকৃত হবেন। কারণ, ক্যান্সার এখনও এমন একটি শব্দ, যা কি-না আতঙ্ক তৈরি করে মানুষের হৃৎপিণ্ডে।
এক ব্যক্তিগত নোটে জোলি লিখেছেন, ‘নিজেকে একজন নারীর চেয়ে কম কিছু ভাবি না আমি। তা সত্ত্বেও আমি এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা আমার নারীত্বকেই খর্ব করেছে।

জোলির এই উদ্যগেকে কটাক্ষ করার মতো নোংড়া লোকেরও অভাব হচ্ছে না। এমনকি নোংরা কর্পোরেট গেম খেলতেও পিছপা হচ্ছে না অনেকেই। তাঁর নারীত্ব ক্ষুন্ন হয়েছে কিনা, ঘরের কথা পরেরে বলা নিয়ে সমালোচনা, জোলির অপ-এড লেখার সাহস ইত্যাদি বিভিন্ন আলোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে মিডিয়া। রয়েছে বহু পুরুষের হায় হায়। কিছু সাইট নিউজ করেছে এরকম:
মিরিয়াড জেনেটিক্স নামে একটি কোম্পানি কিনে নিয়েছে বি.আর.সি.এ. জীন ঘটিত ক্যান্সার পরীক্ষার মেধাস্বত্ব। তাই অন্য কোন কোম্পানি ৩০০০ ডলার মূল্যের এই ডাক্তারী পরীক্ষা করতে পারছে না। এখন যেই পরীক্ষিত হতে চাইবেন, তার জীনের মেধাস্বত্বও এই মিরিয়াড জেনেটিক্স এর কাছে। তাঁরা বলছে গবেষনায় তাদের যে খরচ, সেটা তুলে আনতেই এই নিয়ম। (লিঙ্ক http://www.slate.com/articles/business/project_syndicate/2013/05/gene_patents_the_case_of_myriad_genetics_shows_the_dangers_of_overly_protecting.html)
আরো সরব হয়ে আরেকদল জানাচ্ছে, অ্যাঞ্জেলিনার এত ঘটা করে নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারটি করা। আসলে মিরিয়াডের জন্যই এক ধরনের পাবলিসিটি ক্যাম্পেইন। (http://edition.cnn.com/2013/05/17/opinion/welch-jolie-mastectomy )

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এক প্রকার মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে স্তন ক্যান্সার। অকালে ঝরে যাচ্ছে বহু নারীর প্রাণ। আতঙ্কিত নারীসমাজ। আজকাল পুরুষের মধ্যেও বিস্তার ঘটছে এই প্রাণঘাতী রোগের। গবেষণায় ফল বলছে,পারিবারিকভাবে স্কন ক্যান্সারের ইতিহাস আছে এমন প্রতি পাঁচ নারীর মধ্যে একজনের স্তন ক্যান্সার হয়ে থাকে। বিআরসিএ-১ এবং বিআরসি-২ জিনের কারণে স্তন ক্যান্সার হয়ে থাকে। যেসব মেয়েদের দেহে বিআরসিএ-১ জিনের উপস্থিতি আছে তাদের ৬৫ ভাগ স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আমাদের দেশে প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ৪৬ হাজার নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তের হার প্রায় ১৮ থেকে ২৪ শতাংশ। স্তন ক্যান্সার নারী পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। তবে আমাদের দেশে নারীদের ক্ষেত্রেই বেশি দেখা যায়। সাধারণত ৬০ শতাংশেরও বেশি ভাগে এ রোগ ২য় এবং ৩য় স্টেজে ধরা পড়ে। ৩০ শতাংশের ক্ষেত্রে এ রোগ ৪র্থ স্টেজে নির্ণীত হয়। কেবলমাত্র ৫ শতাংশে ক্ষেত্রে এ রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয় করা সম্ভব হয়।

ক্যান্সার নির্নয়ে যতবেশি দেরি হবে, চিকিৎসা ব্যয় তত বেশি বাড়বে। অথচ চিকিৎসকেরা বলছেন প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে স্তন ক্যান্সার সম্পুর্ন নিরাময় করা সম্ভব। স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সপ্তাহে ৬ দিন সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সেন্টারে নারীদের স্তন ও জরায়ু পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্তন ও জরাজু পরীক্ষার ব্যাবস্থা রয়েছে। তবে তাতে সাড়া মেলে কম। তবে বাংলাদেশের নারীরা এখনো স্তন ক্যান্সারকে লজ্জাকর একটা বিষয় হিসেবে দেখেন। যতক্ষনটা চুড়ান্ত লক্ষন দেখা দিচ্ছে তার আগে ডাক্তারের কাছে যেতে চান না।

জোলির কথায় আসি। সেলিব্রেটিদের অনুসরণ-অনুকরণের প্রবণতা আছে সবার মধ্যেই। সেলিব্রেটিরা যা করেন, সবাই তা করতে চান। অ্যাঞ্জেলিনা জোলির মতো সেলিব্রেটি হলে তো কথাই নেই। ২০০০ সালে বিখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক, লেখক ও টক শো উপস্থাপক কেটি কৌরিক যখন সরাসরি টেলিভিশনে প্রচার করা কোলনস্কপি করান, তখন এই মেডিকেল চেকআপের চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল রাতারাতি।

অথচ তার আগে অত্যাবশ্যকীয় হলেও ভয়ে কোলনস্কপি করাতেন না অনেকে। কোলনস্কপিতে ‘কৌরিক ইফেক্টে’র মতো এবার ম্যাসটেকটমি বা স্তন অপসারণে ‘অ্যাঞ্জেলিনা ইফেক্ট’ দেখার অপেক্ষায় গোটা বিশ্ব। ‘কৌরিক ইফেক্টে’র সচেতনতায় অগ্নাশয়সহ নানা রোগ থেকে রক্ষা পেয়েছে অনেক জীবন। জোলির ক্ষেত্রে এ ইফেক্ট আরও শক্তিশালী হবে এই আশা রাখি।

(স্তন ক্যান্সার নিয়ে কয়েকটি রিপোর্ট করার কারনে কিছুটা জেনেছিলাম। সেই জ্ঞান থেকেই লিখলাম)

১৬ thoughts on “অ্যাঞ্জেলিনা জোলির স্তন অপসারন ও জরুরি কিছু কথা

  1. নব্বই দশকের কিছু গল্প
    নব্বই দশকের কিছু গল্প শুনেছিলাম, কিছু মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত নারীরা সন্তানকে স্তন দিতেন না শেপ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে। সেরকম কিছু অপদার্থ নিশ্চয়ই এখনও দুনিয়া জোড়া আছে। যারা ক্যান্সার পুষে হলেও শেপ ঠিক রাখছেন। জোলি তাদের মুখে জুতা মেরেছেন। তাকে অভিনন্দন।

    বি. দ্র. মতিকণ্ঠ থেকে অ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে নিয়ে এরপর হাস্যরসাত্মক পোষ্ট দিলে সবাইকে বিরোধিতার আহবান জানিয়ে গেলাম।

    1. আমি জানিনা কারা সেই মা যারা
      আমি জানিনা কারা সেই মা যারা সন্তানকে দুধ খাওয়াই না শেপ নষ্ট হওয়ার ভয়ে। তবে নব্বই দশকের সিনেমার কিছুটা ভুমিকা আছে মায়েদের সম্পর্কে এই ধরনের অপবাদ ছড়ানোর পেছনে। সিনেমায় দেখাতো ধনীর মেয়ে কুটনি বউ সন্তানকে ফেলে চলে যায় পার্টিতে।
      দুএকজন কখনোই উধারন হতে পারে না

      1. আমার কাছে সব সময় মনে হইছে!
        আমার কাছে সব সময় মনে হইছে! শেপ নষ্ট হওয়ার ধারনাটা অতি পুরুষতান্ত্রিক একটা গুজব… আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অবধারিত ফসল হিসেবে কিছু হীনমন্যতায় ভোগা নারীর হঠকারিতা!!

  2. স্তন ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতার
    স্তন ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতার কোন বিকল্প নেই। কারন এডভান্সড স্টেজে ধরা পড়লে চিকিৎসকদের কিছুই করার থাকে না। কিন্তু প্রাইমারী স্টেজে ধরা গেলে চিকিৎসা দিয়ে ভালো করা সম্ভব। জোলির এই উদ্যোগ মানুষকে সচেতন হতে সাহায্য করবে আশা করি। কারন সবাই সেলিব্রেটিদের অনুকরণ করতে ভালু পায়। 😀

  3. জোলি যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে,
    জোলি যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে, তার ফলে অনেক নারী নিজেদের সম্পর্কে সচেতন হয়ে পরবে এখন…
    আর এমন জনসচেতন মূলক পোস্ট এর জন্য আপ্নাকেও ধন্যবাদ

  4. খুব দরকারি কথা। আমাদের দেশের
    খুব দরকারি কথা। আমাদের দেশের নারীদের সচেতন হওয়া উচিত এই ব্যাপারে।
    ধন্যবাদ লেখিকা।

  5. মতিকন্ঠ রে ভালোই লাইক মারতাম
    মতিকন্ঠ রে ভালোই লাইক মারতাম কিন্তু জোলী রে নিয়ে ছ্যাবলামি মনের কোনে ঘা দিছে আর তাই লাইক্যাই তে পারছি না। ইউ ডিড গুড জব। :গোলাপ:

  6. জোলী বেঁচে থাকুক পোষ্ট
    জোলী বেঁচে থাকুক পোষ্ট মডার্নিজম যুগের আধুনিক নারী জাগরনের আদর্শ মডেল হিসেবে ।।

  7. মেদহীন লেখা বলতে যা বোঝায়
    মেদহীন লেখা বলতে যা বোঝায় আপনার এই লেখাটা ঠিক তাই। লেখার বিষয় বস্তু নিয়ে চর্বিত চর্বন নাই করলাম, অনেকেই অনেক সুন্দর করে তা উল্ল্যেখ করেছেন ইতিমধ্যে। শুধু এটুকু বলি, সেলিব্রিটি অনেক আছেন, কিন্তু সাহসী পথিকৃৎ হাতে গোনা। পড়ে আনন্দ পেয়েছি। ভালো থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *