মৃত্যু কামনা

কখনো রাস্তা দিয়ে চলার সময় আশেপাশের কোন কিছু খুব মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করি নি। আজ খুব মনোযোগ দিয়ে সব কিছু দেখছি। প্রতিটি দোকান, সাইনবোর্ড, লাইটিং, ল্যাম্পপোস্ট, কুকুর, এবং অবশ্যই মানুষ। আমার রিকশাটি অত্যন্ত দ্রুত বেগে চলছে। কেন এতোটা দ্রুত চলছে বুঝতে পারছি না। কিসের এতো তাড়া। একটু ধীরে চলুক না। আশেপাশের সবকিছু একটু ভালো করে দেখি।অন্য সময় হলে আমি রিকশা-আলাকে খুব ধমক দিতাম। কিন্তু আজ বলতে ইচ্ছে করছে না। এই রিকশা-আলাকে আমার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। তার বেঁচে থাকাটা অনেক জরুরি। সে না থাকলে তার সংসার হয়তো পথে বসবে। তার স্ত্রীটি হয়তো রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করবে, তার সন্তানগুলো হয়তো অনাহারে মরে যাবে। তার পথ চেয়ে হয়তো তার স্ত্রীটি এবং সন্তানগুলো অপেক্ষা করে আছে। সে বাসায় গেলে হয়তো রান্না হবে। যদি সে কোন কারণে বাসায় না গিয়ে টান বাজারে পরে থাকে তবে হয়তো আজ রাত তার স্ত্রীটি এবং সন্তানগুলো খেতে পারবে না। কিন্তু পরের দিন ঠিকই সে বাসায় ফিরবে। আর সে ফিরা মানেই কিছু পেটে খাদ্য প্রবেশ করা।

কিছু মানুষের জীবন এই রিকশাওয়ালাটির উপর নির্ভর করছে। তার জীবন মৃত্যু কিছু মানুষকে উদ্বিগ্ন করবে। তাই এই রিকশাওয়ালাটি আমার চেয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করে থাকে না। অন্য কারো জীবন আমার উপর নির্ভর করে না। আমার বেঁচে থাকা মরে যাওয়া কাউকে ভাবিত করে না । যদিও এই রিকশাওয়ালাটি আমাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। তার শরীর থেকে ঘাম বের হচ্ছে, কুৎসিত গন্ধ বের হচ্ছে, এবং অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে রিকশা চালাচ্ছে। সে নিজের গুরুত্ব বুঝতে পারছে না। যদি বুঝত তবে এই মাত্র যে ট্রাকটি তার এবং আমার উপর প্রায় উঠেই গিয়েছিলো সে তাতে ভয় পেত। কিন্তু সে টু শব্দও করে নি। টু শব্দ আমিও করি নি। কারণ আমার বেঁচে থাকা মরে যাওয়া একই অর্থ বহন করে। যদি এই ট্রাকটি তার ইচ্ছে পূরণ করতে সফল হতো তবে শুধু মাত্র একটি প্রাণ যাওয়ার ক্ষতি হতো। রিকশাওয়ালাটি এবং তার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হতো। আমার কোন ক্ষতি হতো না। হয়তো সামায়িক মৃত্যু যন্ত্রণা আমাকে স্থায়ী একটি যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতো।

কয়েকদিন আমার পিতামাতা কান্নাকাটি করতো তারপর সব আবার আগের মতো হয়ে যেতো। কারো মনেও থাকবে না আমার এক সময় অস্তিত্ব ছিল। আমি এক সময় নিঃশ্বাস নিতাম, এক সময় হাসতাম, কান্না করতাম, ব্যথায় মুষড়ে যেতাম, না পাওয়ার যন্ত্রণায় হাহাকার করতাম। এই মহাজগতে কারো আমার জন্য অভাব বোধ হতো না। আমার জন্মটাই কারো মনে নেই, মৃত্যু কীভাবে মনে থাকবে।

এতটাই নিরর্থক হয়ে যাবে জীবন কখনো কল্পনাও করি নি। এতটাই প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাবো সবার কাছ থেকে এ তো অচিন্তনীয় ছিল। জীবনে তিনটি মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমার আছে। বাবা মা আর সেই মানুষটি যার জন্য উন্মাদ , যার জন্য করি নি এমন কোন কাজ নেই, যাকে সুখি করার জন্য নিজের সমস্ত খুশিকে বিসর্জন দিয়েছিলাম, সমস্ত অমানুষিক যন্ত্রণা মুখ বুঝে সহ্য করেছি। এই তিনজনের কেউ আমার জন্মের কথা মনে রাখে নি। প্রথম দুজন আর শারীরিক ভাবে অস্তিত্বশীল নয়, যে আশা করব তাঁদের কাছ থেকে কিছু। তৃতীয় জন মনে রাখবে এই আশা সচেতন অবচেতন সব ভাবেই আশা করেছিলাম।

কিন্তু সে আজ এতটাই বিরক্ত আমাকে নিয়ে যে আমার চেহারা এখন তার কাছে ঘৃণিত মনে হয়। অনেকদিন ধরে রোগে ভুগতে ভুগতে চেহারাটি অত্যন্ত কুৎসিত হয়ে গেছে সে আমিও জানি। কিন্তু মহাজগতের শেষ প্রিয় মানুষটির মুখ থেকে এমন কথা অনেকটা বজ্রপাতের মনে হয়।
“ঘিন লাগে তোর চেহারার দিকে তাকাতে”

জন্মের দিনেই এমন কথা এক অসাধারণ উপহার। এমনটি সচারচর কেউ পায় না। আমি ভিন্ন বলেই হয়তো পেয়েছি।
আমি ভিন্ন। ভিন্ন না হলে কারো জন্য এমন ভয়ংকর ভাবে উন্মাদ থাকতাম না। প্রতিনিয়ত অপমান, অবহেলা, অত্যাচার সহ্য করেও তার জন্য ব্যাকুল থাকতাম না। অনেক বার আশা ভঙ্গ হয়েও আশা করতাম না যে তার এইবার আমার জন্মের কথা মনে থাকবে।
“তুই দেখিস, এই বার তোর জন্মের কথা আমার মনে থাকে কিনা। এই বার আমি তোকে অবশ্যই উইশ করবো”
আমি আশা করেছিলাম। আমি বিশ্বাস করেছিলাম। এবং তার শাস্তিও পাচ্ছি। আমার জন্ম হয়েছিলো কোন কিছু আশা না করতে, কোন কিছু ভেবে আগাম খুশি না হতে। আমি আমার জন্মের উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে নির্বোধের মতো আশা করেছি। আর আমার জন্ম সেই ভুলের শাস্তিই দিচ্ছে আমাকে। এবং আমি মেনেও নিচ্ছি। একটু টু শব্দও করছি না।

আজ অনেক বছর হল। ২৩ বছর… কিন্তু গত তিনটি বছরই যথেষ্ট ছিল জীবনটাকে সম্পূর্ণ করার। তিন বছর আমি নিঃশ্বাস নিয়েছি, অনুভূতিহীন ভাবে বেঁচেছি, যদিও শুধু একটা অনুভূতিই প্রচণ্ড তীব্র এবং গভীর ছিল যা অন্য অনুভূতিগুলোকে হত্যা করেছে। প্রতিনিয়ত আমি এই বিশ্বাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম যে আমার বেঁচে থাকা মনে হয় নিরর্থক। এবং আজ আমি নিশ্চিত হলাম। আজই যদি আমি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাই তবে এই মহাজগতে এমন কোন মানুষ থাকবে না যে আমাকে মনে রাখবে। যে আমার অভাব বোধ করবে।
আমি হঠাৎ খুব অসহায় বোধ করতে শুরু করলাম। ভেতরে চরম হাহাকার অনুভব করলাম। আমার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। আমি চিৎকার করে কাঁদতে চাইলাম। আরও অসহায় বোধ করলাম আমি চিৎকারও করতে পারছি না। আমি তীব্র ভাবে অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। আমি নিজেকে শান্ত করতে চাচ্ছি। পারছি না। আর পারছি না।

শাহবাগে এসে আমি রিকশা ছেড়ে দিলাম। অত্যন্ত করুণা নিয়ে আমি রিকশাওয়ালাটির দিকে তাকালাম। সে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকাল। সে কিছু বুঝতে পারে নি। আমি নিজেও কিছু বুঝতে পারি নি। এতোটা শূন্য নিজেকে কখনো মনে হয় নি।
অবশ্য আজ এই শূন্য অনুভব আমার জন্য অনেক ভালোই হল। এতদিন শুধু অনুমান ছিল। আজ নিশ্চয়তা আমাকে মুক্তির স্বাদ দিচ্ছে। আজ আশেপাশের সব কিছুর থেকে অবজ্ঞা আমাকে নিশ্চিত মুক্তির দিকে প্রবল ভাবে ঠেলে দিচ্ছে।
আমি শাহবাগ থেকে টি এস সি দিকে হাঁটতে লাগলাম। আমি জানি না কেন টি সে সি এর দিকে হাঁটছি। ওখানে যাওয়ার কোন ইচ্ছে তো ছিল না। একটি ভার আমাকে খুব ভীষণ ভাবে কান্ত করে তুলছে। কেন জানি আমি ভয় পাচ্ছি টি এস সির দিকে হাঁটতে।
আশেপাশের অনেক হাস্য উজ্জ্বল তরুণ তরুণীর চেহারা চোখে পড়ছে। কিন্তু এরা কেউ আমাকে চিনে না। আমি এদের চিনি না। এরা কেউ আমার না থাকাতে কষ্ট পাবে না। এদের সবার কাছে আমি মৃত। সবার কাছে আমি অদৃশ্য। যেমন ভাবে আমি মৃত তার কাছে।
টি এস সি তে যখনই আসি আমার মনে হয়েছে আমি একটি জীবিত জায়গায় এসেছি। কিন্তু আজ আশেপাশের এই জীবন্ত পরিবেশ আমার কাছে প্রচণ্ড রকম নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে। সব কিছু যেন আমাকে ব্যঙ্গ করছে।
এই মাত্রও একটি তরুণী আমাকে পাশ কাটিয়ে গেলো। আমার মনে হচ্ছে সে যেন বলছে
“ তোমার বেঁচে থাকা বৃথা। তুমি মূল্যহীন”
আমি তরুণীটির চেহারাটি দেখতে চাইলাম। কিন্তু দেখতে পারলাম না।
আমার সামনে একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। টয়োটা হবে বোধ হয়। কালো কাঁচ। গান বাজছে।
কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে কোন সুর নয়। একটি বীভৎস কর্কশ আওয়াজ আমাকে শুনাতে চাচ্ছে “তোমার বেঁচে থাকা বৃথা। তুমি মূল্যহীন”
একজন চা ওয়ালা, একজন রিকশাওয়ালা, একজন সিগারেট বিক্রেতা, একজন আইসক্রিম ওয়ালা, কিছু ছোট বাচ্চা যাদের হাতে সব সময় আমি বেলি ফুলের মালা দেখি তারা সবাই আমাকে চিৎকার করে বলছে
“তোমার বেঁচে থাকা বৃথা। তুমি মূল্যহীন”

আমি হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়াই। আমার সামনে একটি দৃশ্য আমাকে মুষড়ে দেয়। আমি যন্ত্রণায় কাতরে উঠি। আমার শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। আমি আমার ভেঙে চুড়ে যাওয়া আমাকে নিয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই।
“ কেমন আছো?”
সে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করতে থাকে। অন্যজনের হাত ধরা ছিল। সেটা সে ছাড়তে বাধ্য হয়।
“এই তো আছি, তুমি? এখানে কি করো”
“ এমনিতেই আসলাম। তোমরা কি এখানে অনেকক্ষণ?”
“এই তো ঘণ্টা খানেক হল আসলাম। তো তোমার খবর কি”
সে আরও অস্বস্তি বোধ করতে লাগলো। ভীত হতে লাগলো। যদি আমি কিছু বলে দেই।
যদি বলে দেই ওই ভদ্র ছেলেটিকে যে “ আপনি যার সাথে এখন আছেন, সে আপনাকে ভালো বাসে না। সে কাউকেই ভালোবাসে না, সে ভালবাসতে জানে না, সে শুধু জানে নিজের স্বার্থ। আজ সে আপনার হাত ধরে আছে গতকাল সে আমার হাত ধরে ছিল। আগামীকাল অন্য কারো হাত ধরবে। আপনার সাথে আমার পার্থক্য এই যে সে আমাকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পেরেছে। আপনাকে বা অন্য কাউকে পারবে না। কারণ অন্যরা আমার মতো এতো বোকা নয়”
আমার আর এই দৃশ্য সহ্য হচ্ছে না। আমি আবার হাঁটতে শুরু করলাম। কিছু দূর গিয়ে আবার ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলাম তাকে
“আজ কতো তারিখ জানো”
“কেন আজ ৫ তারিখ। কেন কি হয়েছে?”
“না কিছু না। আসি”

আমি আরও নিশ্চিত হলাম। আমি আরও প্রমাণ পেলাম আমি গুরুত্বহীন। মূল্যহীন।
আমার হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। এক প্রচণ্ড অমানুষিক ব্যথা আমার ভিতরটাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমি মাটিতে বসে পড়ি। আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
আমি ঈশ্বরে বিশ্বাসী নই। কিন্তু আজ আমার ইচ্ছে করছে কারো কাছে প্রার্থনা করতে। প্রবল ইচ্ছে হচ্ছে আমি প্রার্থনা করে বলি
“অনেক বেঁচেছি, আর না। আর পারছি না। আজ আমি আমার মৃত্যু কামনা করছি। আমার এই ইচ্ছে কেউ পূরণ করো”

৮ thoughts on “মৃত্যু কামনা

  1. ভাল লাগল! ! মর্ডানিজমের যে
    😀
    ভাল লাগল! ! মর্ডানিজমের যে জটিলতা এবং বিচ্ছিনতা আছে তা বেশ ভাল ভাবেই ফুটে উঠেছে..….…অস্তিত্ব সংকটের বিষয়টি পাঠকবৃন্দকে আর-ও আকৃষ্ঠ করে.…কিছু গুরুচন্ডালী দোষ ছিল আর শব্দের অপব্যবহার-ও আছে.…কিন্তু সর্বপরি লেখাটা যথেষ্ট মান সম্মত..…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *