তোমরা যারা অন্ধকারে রেখেছো

গত ০৭/১২/২০১২ ইং তারিখে “প্রথম আলো”তে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের লিখাটা পড়লাম। বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে যখন অনেকেই আপোষ করে তেলাপোকার মত বেঁচে থাকাকে একমাত্র জীবন দর্শন হিসেবে বেছে নিয়েছে, বুদ্ধিজীবীদের বিপুল অংশ যখন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে বুদ্ধি বিক্রি করছে, মনন বিকাশের হাতিয়ার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা যখন লাল, নীল, হলুদ বা সাদা-কালোয় বিভক্ত হয়ে বিবর্ণ হতে হতে বিলীয়মান প্রায়, ইঞ্জিনীয়াররা যখন গার্ডার এর দায়িত্ব নেয়া থেকে বিবিধ দায়িত্বে ব্যস্ত থাকে, চিকিৎসকরা যখন আর্তমানবতার সেবা বাদ দিয়ে ধর্মঘট- কর্মবিরতি বা ভোট যুদ্ধে ব্যস্ত থাকে, ছাত্ররা যখন শিক্ষার চেয়ে সুবিধাবাদ কে উন্নতির মূলমন্ত্র মনে করে, শিল্পী-গায়ক বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা যখন দিক্ভ্রান্ত, কৃষক-শ্রমিক বা মেহনতি মানুষ যখন জীবন বাঁচিয়ে রাখাকেই জীবনের উদ্দেশ্য বলে মনে করে সর্বোপরী রাজনীতিবীদরা জনকল্যান কে পাশে রেখে ভন্ডামী, প্রতারনা-সন্ত্রাস এবং নিজ স্বার্থকে প্রধান্য দিচ্ছে, ঠিক সেই অস্থিরতম সময়ে স্যারের লেখাটি চীনের ট্যাংক বহরের সামনে দন্ডায়মান একমাত্র প্রতিবাদকারীর প্রতিচ্ছবিরই মতন মনে হয়েছে।

স্যারের মত আমারও সবচেয়ে বিচিত্র এবং অদ্ভুত লেগেছে ইসলামী ছাত্রশিবির এবং রক্তস্রাত বাংলাদেশে এদের ক্রমবিকাশ। আমিও বুঝতে পারিনা, যে বয়সটি হচ্ছে মাতৃভূমিকে ভালোবাসার সেই বয়সটিতে তারা কিভাবে দেশদ্রোহী, বিশ্বাস ঘাতকদের ভালোবাসে? যে বয়সে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বে অনুপ্রানিত হওয়ার কথা, মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে নিজেকে শানিত করার কথা সে বয়সে তারা কিভাবে রাজাকার, আলবদর, আল শামস তথা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির আজ্ঞাবহ হয়ে হায়েনাদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে তথাকথিত বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে? বাস্তবতা হলো, তারা তাদের মত স্বপ্ন দেখে, নিজেদের মত বেড়ে উঠে এবং তাদের কথিত উদ্দেশ্য পূরণে অন্যদের দুধ-কলার সাথে নিজেদের বিষ বাষ্প একত্রিত করে। মাতৃভূমিকে ভালোবাসার তীব্র আনন্দ যারা উপভোগ করেনি, যারা ভবিষ্যতেও কোনদিন অনুভব করতে পারবেনা, সেসব হতভাগ্যদের জন্য স্যার গভীর করুনা অনুভব করেছেন। কিন্তু হাত পা বাধা অবস্থায় পানিতে পড়া মানুষ বা গেটে তালাবদ্ধ অবস্থায় জ্বলন্ত শ্রমিক বা, অর্ধসত্য-অসত্য, নীতিহীন, সুবিধাবাদী সমাজ ব্যবস্থায় বেড়ে উঠা অমানবিক মানুষ এবং তাদের অনিচ্ছাকৃত অসহায় জীবনাচারকে নিয়ে অনেকেই করুনা করবেন না নিশ্চয়ই?

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভাজনের পরে ইসলামী নেতাদের ক্ষমতার খায়েশ মেটাতে গিয়া কোনরূপ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ভৌগলিক সামঞ্জস্যতা না থাকা সত্বেও ধর্মের উপর ভিত্তি করে হাজার মাইল দূরের দুটি ভূখন্ড নিয়ে যে পাকিস্তান রাষ্ট গঠিত হয়েছিল সে রাষ্ট কতটা ইসলামিক, সে রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ কতটা ধর্ম ও ন্যায়পরায়ন তা ২৪ বছরে বাঙ্গলী জাতি টের পায় সবচেয়ে বেশী। জোর করে ধর্ম, ভাষা-সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার যে অপচেষ্টা হয়েছিলো তা বাঙ্গালী জাতী প্রতিরোধ করেছিল সাগর রক্তের বিনিময়ে। যে উদ্দেশ্য, চেতনা এবং আদর্শ নিয়ে মুক্তি সংগ্রাম হয়েছিলো, যুদ্ধপরবর্তী ক্ষমতার লিপ্সা, রাজনৈতিক দেউলেপনা, সাধারণ মানুষের প্রতি ভন্ডামী ও প্রতারনা সে আশায় গুড়ে বালি দিয়েছে বহু আগে।

যুদ্ধোত্তর জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছিলো ইসলামী ছাত্র সংঘ বা আই.সি.এস। যুদ্ধপরবর্তী নানান চড়াই উতরাই পেরিয়ে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি পুনরায় বিকশিত হলে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন আই.সি.এস. নাম ঠিক রেখে পুরানো বোতলে নতুন মদ হিসেবে ইসলামী ছাত্র সংঘের স্থলে হয়ে যায় ইসলামী ছাত্র শিবির। এই বিষয়টা নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না এমনকি আমিও জেনেছি বহুদিন পর। জন্মের পর প্রগতিশীল ছাত্র সংঘঠন সমূহের বাধার মুখে পড়লেও সামরিক ও স্বৈরাচারী শক্তির ক্রমাগত পৃষ্ঠপোষকতায় এই আগাছা বটবৃক্ষে রূপান্তরিত হয়েছে। যে কোন আদর্শ বা মতামত চর্চার বিকাশের জন্য অনুকুল পরিবেশ একান্ত আবশ্যক। ধর্মপরায়ন এবং ধর্ম সংবেদনশীল জাতিগোষ্ঠি হওয়ায়, যুদ্ধপরবর্তী অস্থির সামাজিক জীবনচারণ, সংগ্রাম-প্রাপ্তির হিসাবের অতৃপ্তি, নীতিহীন জীবন মানের উন্নতি, ত্যাগ-ত্যাগির অসম্মান যাবতীয় অনুষঙ্গ জোড়াতালি দিয়ে এক ধরণের রাজনৈতিক কালচার শুরু করে জামায়াত শিবির। যুদ্ধপরবর্তী ক্রীয়াশীল রাজনৈতিক শক্তির ব্যর্থতা, আর্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থায় প্রতিহিংসা ও ভোটের রাজনীতি, সুবিধাবাদী মানসিকতা, বিচারহীনতা, বেকারত্ব, দারিদ্র, অশিক্ষা, মুক্তির সংগ্রাম নিয়ে রাজনীতি ও পারিবারিক শিক্ষাহীনতা প্রভৃতি অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে যুদ্ধপরবর্তী যে প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে তাদের মূল অংশ হলো ছাত্র শিবির এবং তাদের ছত্রছায়ায় হিজবুত তাহরীর মত অপ-রাজনীতির উত্থান ইত্যাদি ইত্যাদি।

ইতিহাসহীনতার ভিতর দিয়ে চরম অশুদ্ধ পরিবেশে অন্ধকারের ভিতর দিয়ে বেড়ে উঠে যুদ্ধপরবর্তী এই প্রজন্ম। এই প্রজন্ম যখন বুঝতে শুরু করে তখন দেখতে পায় কোদাল হাতে খাল খনন করে যাচ্ছে রাষ্ট্র প্রধান; যেন খাল খনন করলেই কুমির চলে যাবে স্বদেশ থেকে! এই প্রজন্ম যখন তরুন হয়ে বেড়ে উঠে তখন স্বৈরাচারের লেলিহান ক্ষমতার লোভ সামাজিক, পারিবারিক মূল্যবোধকে বুটের তলায় পিষতে দেখে, অন্যায়ের সাথে আপোষ করার মানসিকতায় বেড়ে উঠে প্রজন্ম যখন সামাজিক এবং রাজনৈতিক ভাবে তাদের কদর অনুভব করে তখন তাদের মিথ্যা সত্যে, ভুল শুদ্ধে, অমানবিকতা মানবিকে, অনৈতিকতা, নীতিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। এই রূপান্তর তাদের স্বেচ্ছাকৃত নয়। অন্যদের ক্ষমতা লিপ্সা, নীতিহীনতা, ক্ষমতার লোভ অন্ধ-পরজীবী এই মানুষদের সুপথে ফিরিয়া আনার পরিবর্তে গভীর অন্ধকারে কুপে ফেলে রাখে। এই দায় এই প্রজন্মের একার অবশ্যই নয়।

জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশ ছাত্র লীগের রয়েছে আন্দোলন, লড়াই সংগ্রামের গৌরব উজ্জল ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু ৬৬ এর ৬ দফা সর্বোপরি ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে এই দলটির অংশ গ্রহন ছিলো উলে¬খযোগ্য। যুদ্ধ পূর্ববর্তী ছাত্র রাজনীতির অন্যতম নিয়ামক শক্তি হিসেবে ছাত্রলীগ ছিলো মেধাবী ছাত্রদের মিলনস্থল। কিন্তু বাঙ্গালী জাতির দুর্ভাগ্য যুদ্ধপরবর্তী এই সঙগঠনটি দিন দিন তার উদ্দেশ্য আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে থাকে আলোর গতিতে। ছাত্র প্রতিনিধিত্ব বাদ দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি শুরু করার পর থেকেই আপামর ছাত্রদের সাথে সংগঠনটির দূরত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। যুদ্ধপূর্ববর্তী পূর্ব বাংলার সর্বাধিক জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠন ছিলো “ছাত্র ইউনিয়ন”। যুদ্ধপরবর্তী সাবেক নেতাদের মতিভ্রম, গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রে দ্বন্ধ, রুশ-চীন পন্থায় বিভাজিত হয়ে এই সংগঠনটি তাদের জনপ্রিয়তা বা প্রতিনিধিত্ব ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার জন্য তৎ সময়ের ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের পেশি শক্তির রাজনীতি চর্চা ও অসহিঞ্চুতা ও দায়ী বটে। ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব হারানো এবং ছাত্র লীগের ছাত্র বিমুখ হওয়ার সুযোগ, অন্তর্দ্বন্দে জর্জরিত হওয়া, নানান রাজনৈতিক চক্রান্তের মধ্যে ছাত্রলীগের রাজনীতি যখন প্রশ্নবিদ্ধ, তখন ক্ষমতার মোহে মোহাবিষ্ট একদল ছাত্র জাহাজে চড়ে বেড়ায় প্রতিবিপ¬বের সঙ্গী হয়ে। এই দোলাচল, সঠিক নেতৃত্ব না থাকা, বিভ্রান্ত ক্ষমতাসীনদের দূর্বলতায় একদল বিপথ গামী এদেশের কোমল কিশোরদের হাতে তুলে দেয় “এসো নামাজ পড়ি” বই। কোমলমতি বাংলার অধিকাংশ সন্তান ধর্মপরায়ন। নামাজ পড়া পারিবারিক ভাবে আচারিত ধর্মিয় বিধান হলেও এই দল এই ধর্মাচারকে রাজনীতির সাথে যুক্ত করে দেয়। শুরু হয়ে যায় ধর্মভীরু কিশোরের অজানার পথে চলা। এই কিশোরদের প্রথমে বলা হয় “ইসলামী ছাত্র শিবির” জামায়াতে ইসলামীর সাথে যুক্ত নয়। শুধু মাত্র নামাজ, রোযা রাখা, সৎ জীবন যাপন করার জন্য এই সংগঠন কাজ করে। বাস্তবে কিছুদিন পরেই এই মোহভঙ্গ হলেও কিশোর বা তরুনের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা হয় না। অনেকে ফিরে আসতেও চায় না। সংঘবদ্ধ একটি শক্তির সাথে থাকার কতেক সুবিধা তাদের এক সাথে থাকতে সাহায্য করে। হলে থাকতে পারা, পড়া লেখায় নোট বই সহ সাংগঠনিক সাহায্য পাওয়া, পড়ালেখা শেষে চাকুরীর নিশ্চয়তা ইত্যাদি নানামুখী সুবিধা সুবাধাবাদী এই মানুষদের একসূত্রে গেথে রাখে বিপ্লবের আশায়।

বাংলাদেশ বিরোধী সকল শক্তি, এমনকি জামাত-শিবির এর উত্থান বা ক্রম বিকাশ হয়েছে “তোমরা যারা অন্ধকারে রেখেছো” তাদের কল্যানে। নীতিহীন সমাজ ব্যবস্থায় শতভাগ সততা ও দেশপ্রেম নিয়ে নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠবে, দেশমাতৃকা বা বীরদের সম্মান করবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে, এমন আশা করাটা ইতিহাসের সাথে প্রতারনা করা মাত্র। যুদ্ধপরবর্তী দেশপ্রেমিকদের বিভ্রান্ত বিভাজিত হওয়া, ক্রিয়াশীল রাজনীতির সীমাহীন ব্যর্থতা, চলচিত্র, গান, নাটক, এমনকি বিজ্ঞাপনেও সাংস্কৃতিক বর্বরতা, প্রতিহিংসা, ক্ষমতা বা ভোটের রাজনীতিতে ভন্ডামী-প্রতারনা, সামাজিক অনাচার বা বিচারহীনতা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনীতি, ইদানিংকালের যুদ্ধপরাধী বিচার নিয়ে রাজনীতি ও ক্ষমতার হিসাব নিকাশ, পরিবারের পারিবারিক অশিক্ষা-ভুলশিক্ষার যে আবহ তৈরি হয়েছে; দুর্নীতি, অন্যায় চেতনার মেশিনে পরিশুদ্ধ হওয়ার মানসিকতা, ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক নৈতৃত্বের ভন্ডামী, প্রগতিশীলতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার মিশ্রনের দ্রবনে যে শংকর প্রজন্ম বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিতে চায়, বিচার পক্রিয়ারূদ্ধ করতে চায়, শিক্ষাজ্ঞনকে অস্থিতিশীল করে রাজনীতি করতে চায়, প্রতিপক্ষকে খুন করে রগ কেটে ম্যানহোলে ফেলে আতংকিত করতে চায়, নিজ ভাইদের আধিপত্যের বাধা ভেবে দোতলা-তিনতলা বা ছাদ থেকে ফেলে দেয়, তারা “তোমরা যারা অন্ধকারে রেখেছো” তাদের উত্তরসূরী মাত্র। সুখের বিষয় হলো তমাদের একজন আমাদের প্রিয় স্যার, সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে এই জাতিকে পুনরায় সঠিক পথে আনতে উদ্যোগী হয়েছেন। স্যারের এই প্রয়াস সফল হবে আশা করছি। অন্য যারা আমাদের অন্ধকারে ইতিহাসহীন রেখেছে, সময় এসেছে নিজেদের ভুল স্বীকার করে ভুল শুধরাবার।

৯ thoughts on “তোমরা যারা অন্ধকারে রেখেছো

  1. এই পোস্ট তা sticky করতে
    এই পোস্ট তা sticky করতে অনুরোধ করছি। অত্যন্ত ভালো একটি পোস্ট। একমত ব্রহ্ম পুত্র-এর সাথে।

Leave a Reply to একটি স্বপ্নের পথচারী Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *