আনন্দ বেদনার কাব্য

রাত দুটো বাজল- ঘন্টার কাঁটা তাই জানান দিচ্ছে।বালিশে মুখ গুজে উপুর হয়ে শুয়ে আছে মুন্নী।আর ভাবছে দু’ঘন্টা পেরিয়ে গেল, দূরে থাকে বলে কি জন্মদিনের শুভেছাটুকু অন্তত ফোন করেও জানাবে না। এটা কি খুব বেশী চাওয়া হয়ে গেল। প্রায় একবছর হতে যাচ্ছে- আকাশকে সে আজো ভালোমত বুঝতে পারলো না। এই ছেলেটার মধ্যে কি ইমোশন বলতে কিছু নেই।

রাত দুটো বাজল- ঘন্টার কাঁটা তাই জানান দিচ্ছে।বালিশে মুখ গুজে উপুর হয়ে শুয়ে আছে মুন্নী।আর ভাবছে দু’ঘন্টা পেরিয়ে গেল, দূরে থাকে বলে কি জন্মদিনের শুভেছাটুকু অন্তত ফোন করেও জানাবে না। এটা কি খুব বেশী চাওয়া হয়ে গেল। প্রায় একবছর হতে যাচ্ছে- আকাশকে সে আজো ভালোমত বুঝতে পারলো না। এই ছেলেটার মধ্যে কি ইমোশন বলতে কিছু নেই।
বাসের হর্ণের শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো আকাশের। আশপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারলো মনে হয় কুমিল্লার কাছাকাছি কোথাও হবে, সামনেই হয়তোবা বাস থামবে বিরতিতে। ঘুম আর আসছে না-একবার বাসে ঘুম ভাঙ্গলে সহজে তা আর আসে না।কানে হেডফোন দিয়ে গান শুনতে শুনতে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে আকাশ।কালকে দুপুর থেকেই মুন্নীর সাথে কোনো যোগাযোগ নেই-অবশ্য ইচ্ছে করেই আকাশ কাজটা করেছে, যাতে বুঝতে না পারে ও আজ চিটাগং আসছে। অনেকদিন পর ওরা এতক্ষন কথা না বলে ছিল। বিশেষ করে মোবাইল অপারেটরগুলো ওই অফারটা দেওয়ার পর থেকে মনে হয় ঘুমানো আর দু’জনের ক্লাসের সময় টা বাদে সারাক্ষনই কথা হতো। কি আজব অফার অকবার শুধু সংযোগ পেলেই নির্দিষ্ট টাকা, তারপর যতক্ষন কথা বলো কোনো বিল নেই,লাইন না কেটে যাওয়া পর্যন্ত। মাঝে মাঝে ওর মনে হয় তাহলে মোবাইল অপারেটর গুলো চলে কিভাবে; কয়েকদিন পর না জানি শুনতে হয় সকল মোবাইল অপারেটরেরা আস্তে আস্তে এদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে-কারন যে কোনো সময় তাদের দেউলিয়া হওয়ার সমুহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।অবশ্য এই মুহূর্তে আকাশের এগুলো নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করছে না, ওর টেনশন হচ্ছে পৌঁছতে পৌঁছতে দেরী হলে মুন্নী ক্লাসে চলে যাবে। ফোন করলে অবশ্য হয়, কিন্তু ও তা চাচ্ছে না।
গাড়ির সুপারভাইজারের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙ্গলো। ও বললো, স্যার জি.ই.সি.র মোড় এসে গেছে। আকাশ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে প্রায় নয়টা বাজে। আর দেরী না করে ব্যাগটা নিয়ে নেমে পড়ল বাস থেকে। রিকশা নিয়ে দুই নম্বর গেইট গিয়ে একটা হোটেলে ঢুকল। ফ্রেশ হয়ে আবার সাথে সাথে বের হয়ে রাস্তার উলটো দিকের ফুলের দোকানটায় উঁকি দিল। না খুলেছে, তবে দোকানির মনে হয় এখনো ঘুম ভাঙ্গেনি, তাই ওকে ডেকে বলল, ভাই পাচঁটা লাল গোলাপ দেন তো আজকের। দোকানদার চোখ লাল করে বলল, আমরা বাসি ফুল রাখি না, আমরা দুই নম্বর ব্যবসা করি না। আকাশের খুব বলতে ইচ্ছে করছিল, ভাই লাল গোলাপ চাইলাম লাল চোখতো দেখতে চাইনি- চোখ লাল করছেন কেন। ও দেখতে পেল, ভালো ফুলের সাথে কিছু বাসি ফুলও আছে দোকানে। কিন্তু কথা না বাড়িয়ে ফুল গুলো নিয়ে রিকশায় উঠলো।
প্রায় আধঘন্টা ধরে গোলাপিরঙের বাড়িটার তিন তলার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘাড় ব্যথা হয়ে গেলো আকাশের। কিন্তু এখনো পর্যন্ত মুন্নীর কোনো দেখা নেই। যত্টুকু ধারণা কালকে অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমিয়েছে মুন্নী-উঠতে হয়তো সময় লাগতে পারে।
বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে অবশেষে উঠল মুন্নী। ঘড়িতে তখন পৌনে দশটা-আজকে আর কলেজ এ যেতে ইচ্ছে করছে না তার।মনটা খারাপ হয়ে আছে, এই অবস্থায় স্যারদের ভ্যাজর ভ্যাজর শুনতে ইচ্ছে করছে না। বিছানা থেকে ওঠে ড্রইংরুমে গেল ও। যেতে যেতে ছোটখাট একটা হুকুম ওদিয়ে দিল কুলসুমকে, একা কাপ চা দিয়ে যা। এটা তার পুরোনো অভ্যাস-কারন নিজের রুমের জানালা দিয়ে রোদ আসে না, আবার সকাল বেলা রোদ না দেখলে তার ঘুমঘুম ভাব ও কাটে না। এরপ্র সোফায় বসে চা খেতে খেতে পেপার পড়াটাও তার অভ্যাস।ড্রইং রুমের জানালাটা খুলে দিল। জানালা খুলে বাইরে তাকাতেই দেখলো বাড়ীর সামনে বলদ মার্কা একছেলে হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চশমা না থাকায় ভালোমত দেখতে পেলো না, তবে তেমন একটা পাত্তাও দিল না। কিন্তু হঠাৎ দেখলো বলদ মার্কা ছেলেটা হাতও নাড়ছে। এমনি মেজাজ খারাপ-সাত সকালে এরকম একটা ব্যাপারে তার মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল। চশমাটা পরে দারোয়ান মামাকে ডাকবে এসময় সে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল-আকাশ দাঁড়িয়ে আছে, হাতে কয়েকটা লাল গোলাপ। হঠাৎ যেনো তার মনটা পাখি হয়ে উড়াল দিলো। আর ভাবতে লাগলো এই পাগলটাকে সে অসম্ভব ভালোবাসে তা মনে হয় সেও জানে না। সে ইশারায় আকাশকে উপরে আসতে বলল। ও দরজা খুলে দিয়ে চলে আসলো- কারণ আকাশের পুরোনো অভ্যাস দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থাকবে কিংবা মিসকল দিবে, কিন্তু কলিংবেলে হাত দিবে না।
সোফায় বসে আছে মুন্নী, ওর মুখটা শক্ত হয়ে আছে। আকাশ ফুল গুলো দিয়ে বলল, শুভ জন্মদিন। মুন্নী বলল, সাথে ওইগুলি কি? আমি কি বাচচা নাকি যে ডেইরি মিল্ক এনেছ।আকাশ হাসলো, কিছু বললো না।ওর রাগ করা মুখটা দেখতে আকাশের ভালো লাগে। মাঝে মাঝে মনে হয় সারাক্ষন যদি মুন্নী রাগি রাগি মুখ করে বসে থাকতো, তাহলে মনে হয় তাকে ছেড়ে এক মুহূর্তও থাকা সম্ভব ছিলো না। হাসলেও তাকে প্রচন্ড সুন্দর লাগে। আসলে মেয়েটাই অনেক সুন্দর, এটা চিন্তা করে মনে মনে হাসলো আকাশ। বিশেষ করে তার ঠোঁট আর নাকটা আকাশের অনেক পছন্দের। মিকি মাউসের নাক বলে সে প্রায়ই মুন্নীকে ক্ষ্যাপায়। তাকে বসতে বলে মুন্নী ভিতরে চলে গেল।
আজকে মুন্নী ঠিক করল শাড়ি পড়বে-খুব একটা পড়া হয় না, কিন্তু আজকের দিনটাতে তার খুব ইচ্ছে করছে। নীল শাড়ির সাথে মিলিয়ে কানে ছোট্ট দুল, কপালে টিপ আর হাতে চুড়ীঁ। এখন ওর মনের ভেতরে কি হচ্ছে তা আর কেউই যানে না। আকাশ ওকে দেখামাত্র বলে উঠল, তোমাকে আজ পরী পরী লাগছে। মুন্নী কথার কোনো জবাব দিলো না। দুজনে বেড়িয়ে পড়ল। রিকশা নিতে নিতে আকাশ বলল, তুমি একটা কাজ করো এটা নিয়ে চলে যাও, আমি অন্য রিকশায় তোমার পিছন পিছন আসছি। মুন্নী বলল, কেন? এই মুহূর্তেই আকাশ আরেকটা জিনিস আবিষ্কার করল, ওর বড় বড় চোখগুলোর প্রেমে আকাশ অনেক আগেই পড়েছে। আকাশ আমতা আমতা করে বলল, না মানে আজ তোমার পাশে বসলে কেমন জানি নিজেকে ফকির টাইপের লোক মনে হবে। মুন্নী তার সেই চোখ গুলো বড় বড় করে বলল, ওঠ রিকশায়, নাটক করবে না।
ষোলশহরের সেই ফুলের দোকানটা থেকেই লাল গোলাপ কিনছে আকাশ, কিনতে কিনতে ওর আর মুন্নীর আগের কথাগুলো এতক্ষন ধরে ভাবছিল সে। প্রতিবছর একিই দিনে এই দোকান থেকেই ফুল কেনে ও। ফুল কিনে সে রিকসায় কিছুক্ষন ঘোরাঘুরি করে। তারপর ফুলগুলো দিয়ে দেয় রাস্তার কোনো শিশুকে। অনেকদিন কেটে গেছে-আকাশের বয়স এখন পঞ্চাশ, মুন্নীও মারা গেছে বেশ ক’বছর হলো। মুন্নী আর আকাশের বিয়েও হয়নি।
কিন্তু এই দিনটিতে আকাশ প্রতিবছরই ফুল কিনে- মুন্নীর জন্মদিন।প্রতিবছর তাদের ভালোবাসাকে একটা দিন এর জন্য বাচিঁয়ে রাখে।

১০ thoughts on “আনন্দ বেদনার কাব্য

  1. গল্পটা সত্যি নাকি মিথ্যা
    গল্পটা সত্যি নাকি মিথ্যা যাচাই করবো না কিন্তু আমিও ঠিক এমন একটা কাজ করি এবং যার জন্য করি সেই জানেনা হয়তো কোনদিন জানবেওনা আর না জানলেই খুশি কারন কিছু কিছু কাজের মাঝে অদৃশ্য সুখ থাকে এই কাজগুলো সেইরকমের ………ভালো লাগল

  2. প্লেটোনিক ভালোবাসার অনুভূতি
    প্লেটোনিক ভালোবাসার অনুভূতি বেঁচে থাকুক মহা প্রলয়ের আগ পর্যন্ত।

    1. ভা্লবাসার স্বরূপ কখনো বদলায়
      ভা্লবাসার স্বরূপ কখনো বদলায় না,তা পৃথিবীর জন্ম থেকে মৃত্য পর্যন্ত একই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *