৩-জন মানুষ ও এক মায়ের মৃত্যুর গল্প

আমার প্রতিবেশি লিটন তালুকদার মালয়শিয়া থেকে ফিরেই বিয়ে করার ১-মাসের মাথায় আবার চলে গেল মালয়শিয়া সোনার খনির সন্ধানে। এবার দুই বছরেও ফিরলো না সে। বিয়ে করে বউ রেখে গেলো মাকে দেখাশোনা করতে। পরিবারে মা ছাড়া ছিল তার কলেজ পড়ুয়া একমাত্র ভাই। গত বছর মালয়শিয়া গেলে তার ফোননম্বর নিয়ে গেলাম সাথে করে আমার পরিচিত স্বজন হিসেবে। আমার ৩-দিনের প্যাকেজে হোটেল ভাড়াও পরিশোধ করি আমি এয়ার টিকেটের সাথেই। তারপরো লিটন আমায় তার নিজের বাসাতে নিয়ে যায় পরম মমতায় তার গাঁয়ের প্রতিবেশিকে ওদেশে পেয়ে। আমাকে খাটে ঘুমাতে দিয়ে সে ফ্লোরে ঘুমোয় এ ৩-দিন সে। নিজের কাজ ফেলে আমার সাথে সারাক্ষণ থাকে, ঘুরিয়ে দেখায় মালয়শিয়ার অনেক অদর্শনীয় স্থান। খা্ওয়ায় রামবুটান, ম্যাঙ্গোস্টিন, ড্রাগনফ্রুট আরো কত কি ফল! সাধ্যমত ভাল হোটেলে খাওয়াতে চায় আমায় কিন্তু আমি খুব অল্প সবজি ভোজি। বলতে গেলে থাকা-খাওয়া বাবদ কোন পয়সাই খরচ করতে দেয়না সে আমায়। কষ্টকর ইলেকট্রপ্লেটিং কারখানায় কাজ করে টাকা উপার্জন করে লিটন। তা আমার জন্যে খরচ করাতে মনটা খারাপ হয় আমার। যখন তার ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখি টগবগে ‘এসিড’ আর ‘গলিত ফুটন্ত দস্তার’ হাউজে ডুবাতে হয় বড় বড় ইলেকট্রিক পোল, স্রোতের মত ঘাম ঝরে প্রচন্ড এসিডের গরমে, তখন এতো কষ্টকর কাজ দেখে সত্যিই মন খারাপ হয় আমার। ঢাকা ফেরার দিন মা, স্ত্রী আর ছোটভাইর জন্যে নানাবিধ জিনিসপত্র কিনে দেয় আমার কাছে পরম মমতায়। লিটনের পরিবারের প্রতি এ দায়বোধ আর ভালবাসায় মনটা ভরে যায় আমার।
:
কদিন পর গাঁ থেকে ছোট বোন বেড়াতে এলো আমার ঢাকার ফ্লাটে। কথা প্রসঙ্গে মালয়শিয়ায় ভ্রমণে লিটনের আতিথেয়তা ও তার পাঠোনো জিনিসপত্র বের করি বোনের কাছে দিতে, যাতে গাঁয়ে লিটনের বাড়ি পৌঁছাতে পারে সে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বোন বলে, “লিটন ওখানে কষ্ট করে টাকা কামাচ্ছে, আর বাড়িতে তার বউ আর ছোটভাই নাকি ‘ইটিশ পিটিশ’ করছে মায়ের চোখের সামনেই। এ নিয়ে গ্রামে নানা রটনা, এমনকি মাকে একদিন ‘মেরেছে’ও লিটনের ছোটভাই ছোটন। কারণ মা নাকি এ ব্যাপারে কি বলেছিল লিটনের বউকে। বোনের মুখে এসব ‘অসুখের’ কথা শুনে মন খারাপ হয় আমার। আরো সবিস্তারে নানা কথা শুনে এবার ম্যাসেজ দেই লিটনকে মালয়শিয়া। কল-ব্যাক করে লিটন অল্পক্ষণ পরেই।
:
তাকে সরাসরি না বলে ‘বৌ’ রেখে এতোদিন বিদেশ থাকার কুফলের কথা বলি। এবং এমন ক্ষেত্রে পরকিয়ার ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে, এ কথাও বলতে ভুলিনা তাকে। পরক্ষণেই বরং লিটন আমায় বলতে থাকে, গত ৪-৫ দিন আগে গাঁয়ের অন্য একজনের ফোনে সে জেনেছে যে, তার স্ত্রী ও ছোটভাইর মাঝে নাকি কি সব ঘটেছে। আমি যেন এটার সত্যতা যাচাই করে তাকে বলি। ইতোমধ্যেই ঘটনা লিটন জেনেছে ভেবে মনটা হু-হু করে আমার। কি বলবো বুঝতে পারিনা তাকে। মন খারাপ করে বরং ফোনটা আমার ছোটবোনের হাতে দিয়ে বলি, “তুমি আমার ছোটবোন স্বর্ণপ্রভার থেকে বিস্তারিত জেনে নাও। সে নাকি সবই শুনে এসেছে তোমার মায়ের কাছে”।
:
স্বর্ণপ্রভা প্রায় ঘন্টা ধরে বলে যায় লিটনের কাছে তার বৌ, ছোটভাই আর মায়ের কথা আর ঘটনা বৃত্তান্ত। যা শুনতে ভাল লাগেনা আমার একদম। লিটনের দুখে পিসি’র মাউস ঘোরাতে থাকি আমি এ ব্লগ থেকে সে ব্লগে, এ নেট থেকে সে নেটে। এক সময় লিটন আবার কথা বলতে চায় আমার সাথে। বলি, “চলে আসো দেশে লম্বা ছুটি নিয়ে। নিজের ঘরের ব্যাপার, তাই তুমি এলে হয়তো সব ঠিক হবে মনে করি”। এবং পনের দিনের মাথায় লিটন এসে সরাসরি আমার ঢাকার বাসায় নক করে আমার কাছে। আমাকে নিয়ে গাঁয়ে যেতে চায় সে কিন্তু এমনসব ঘটনায় কি মিমাংসা করবো আমি বুঝতে পারিনা। বলি, “আগে নিজের বউর কাছে জানতে চাও সব, দেখো সে কি বলে? তারপর অন্য ব্যবস্থা। প্রয়োজনে বৌকে কর্মস্থল মালয়শিয়া নিয়ে যাবে। তবে এমন কিছুৃ করোনা, যাতে দেশে সম্মান যায় তোমার আর তোমার পরিবারের”।
:
বিকেলের লঞ্চে গাঁয়ে ফিরে লিটন। স্বামীর ফেরার খবর শুনে ঐদিন রাতেই পাশের বাবার বাড়ি যায় স্ত্রী আয়েশা। লোক পাঠিয়ে লিটনের ঘরে ফেরার সংবাদেও আর ফেরেনা আয়েশা। বিকেলে শ্বশুর বাড়ি তথা আয়েশার বাড়িতে যায় লিটন। সেখানে আয়েশা লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে বলে, “আমি প্রেগনেন্ট! কিভাবে? সেটা তোমার ছোট ভাইকে জিজ্ঞেস করো। আমি যাবোনা এখন তোমার সাথে! আগে তোমার ভাইর সাথে ফয়সালা করো”।
:
মালয়শিয়া প্রায় ৫-বছর রক্ত পানি করা পয়সা দিয়ে লালন করা স্ত্রী আর ভাইর এ আচরণে কি করবে বুঝতে পারেনা লিটন। বিকেলে মায়ের সামনে ছোট ভাইর সাথে এ নিয়ে ন্যাক্কারজনক ঝগড়া হয় লিটনের। রাগে দুখে ক্ষোভে সন্ধ্যার দিকে ঘর ত্যাগ করে লিটন। দুদিন আর বাড়ি ফেরেনা সে, বর্ষার ভরা বাদলের জল ঢেউয়ের কান্নায় কাঁদতে থেকে সে পথে পথে।। তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় সরাসরি শ্বশুর বাড়ি হাজির হয় স্ত্রীর সামনে। এবং কিছু না বলে গোপনে জোগার করা পিস্তল দিয়ে সরাসরি গুলি করে স্ত্রীর মাথায়। কালবিলম্ব না করে দৌড়েঁ আসে বাড়ির দিকে এবং ছোট ভাইকে বাড়িতে ঢোকার রাস্তার পাশেই পায়। এবং তাকও পরপর ৩-টা গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে অন্ধকারে বাড়ি থেকে পালায় লিটন অজানার পথে।
:
১০-মিনিটের মাথায় ছোট বোনের ফোনে সব শুনে লিটনের পথভ্রষ্ট রাগ অনুরাগের দ্বিমুখী সংঘাতময় জীবন দ্রোহে দলিত হই আমি। এরপর লিটনের আর কোন খোঁজ পাইনি আমি অনেকদিন। কেবল বুনো বাতাসের বৃষ্টি ভেজা অরণ্যে এক হন্তারক লিটন তার মৃত স্ত্রী আর ভাই ছোটনের ট্রাজিক গান শুনি অজান্তে। কদিন আগে আকস্মিক লিটনের ফোন পেয়ে শিহরিত হই আমি। ধরা গলায় লিটন বলে, “ভাইজান আপনার একাউন্টে কিছু টাকা পাঠিয়েছি। টাকাটা তুলে মাকে দেবেন। দেশে আর আসবো না। নিয়মিত টাকা পাঠাবো আপনার একাউন্টে। কেবল তা মাকে দেবেন, আর তার দিকে খেয়াল রাখবেন ভাইজান”!
:
প্রবল ঔৎসুক্যে জানতে চাই, “লিটন কই তুমি এখন”? ক্রুদ্ধকণ্ঠে সে বলে যায়, “ঐ রাতেই স্ত্রী ও ছোটনকে খুন করে সরাসরি চলে যাই বেনাপোল বর্ডারে এবং সকাল ৮টার দিকে বর্ডার পার হয়ে ভারতে ঢুকি। কোলকাতা থেকে মালয়শিয়ার টিকেটে কেটে ঐ রাতেই ফিরে আসি কুয়ালালামপুর”। লিটনের এসব কথা শুনে বিরহ কান্নারা হাঁটতে থাকি আমি জীবনের সমান্তরাল কাঁচা সড়কে। আমার চারদিকের পরিচিত মানুষের এসব পঞ্চমুখি সংঘর্ষে, জীবন কষ্টের আরতি গেয়ে চলে আমার বোধের ক্ষীয়মান দু:খেরা একসাথে। গর্ভবতী দু:খমেঘের শিলা বৃষ্টি প্রসব বেদনার মত অন্ধকার আকাশে আমি আকাশে চাঁদ নক্ষত্রের ধূসর খেলা দেখতে থাকি ক্রমাগত। এর কোন কুলই করতে পারিনা আমি কে তার প্রপঞ্চে সঠিক কিংবা অঠিক। কেবল হৃদয়ের বিস্ফোরিত গ্যাস সিলিন্ডারে হত মানবিক বোধেরা ধিক্কার জানাতে থাকে আমায় সারাক্ষণ লিটন আর তার নিহত দুই স্বজনের জন্যে।

২ thoughts on “৩-জন মানুষ ও এক মায়ের মৃত্যুর গল্প

  1. ভারতের ভিসা ছাড়া কলকাতা গিয়ে
    ভারতের ভিসা ছাড়া কলকাতা গিয়ে বিমানের টিকেট কেটে কিভাবে কলকাতা থেকে মালয়েশিয়া যাবে? এটা কি আদৌ সম্ভব? এ ব্যাপারে আপনার কি কোন ধারণা আছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *