কে কি করলো সেদিকে খেয়াল না রেখে নিজের ইচ্ছে আর স্বপ্নটাকে প্রাধান্য দিতে হবে তবেই সফলতা আসবে

এদেশে প্রতিদিন কতটা ছেলে কিংবা মেয়ে আত্মহত্যা করে এই হিসেব করার সময় কি আমাদের আছে? যে মানুষটা সারাদিন কোন কাজ না করে বাসায় বসে থাকে তারও এই সময়টা নেই। পত্রিকার পাতায় কিংবা রাতের সংবাদে যখন শুনা যায় ২০-২৫ বছরের একটা মানুষ আত্মহত্যা করেছে তখন অবশ্যই আমরা ভেবে নেই এর প্রধান কারণ প্রেমে ব্যর্থতা। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে সেটা না ও হতে পারে।

জন্মের পর থেকেই আমাদেরকে একটা নিয়ম মাফিক জীবন বেঁধে দেয়া হয়। এই নিয়মের বাইরে কিছুই করা যাবে না। কিছু করতে গেলেই কঠোর শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু এই নিয়ম মাফিক জীবনের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করে এক একটা স্বপ্ন। যখন থেকে আমরা একটু একটু করে বুঝতে শিখি তখন থেকেই আমাদের স্বপ্নের সংখ্যাগুলো বাড়তে থাকে। একটাই চিন্তা তখন যে করেই হোক হাজারটা স্বপ্নের মধ্যে থেকে একটা হলেও বাস্তবে পরিণত করতে হবে। কিন্তু আসলেই কি সম্ভব হয়ে উঠে শেষ পর্যন্ত?

স্কুল লাইফ থেকেই আমাদেরকে প্রতিযোগীতার মধ্যে দিয়ে বড় হতে হয়। পাশের বাসার ভাবির বড় ছেলে সমাপনী পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছে তাই আমাকেও পেতে হবে। এর বিকল্প কিছু চিন্তা করাও সম্ভব না। তুমি বাঁচো বা মরো সেটা পরের কথা, আগে রেজাল্ট এ প্লাস চাই।
প্রাইমারি স্কুল থেকে হাই স্কুল। একই টার্গেট, একই প্রতিযোগিতা। এর কোন বিকল্প নেই। বাধ্য সন্তান হয়ে বাবা-মায়ের চাহিদা অনুযায়ী রেজাল্ট নিয়ে তোমাকে যেতে হলো কলেজ লাইফে। কি ভেবেছিলে? কলেজ জীবনে একটু শান্তি পাবে? আরে না ভাই। এখানে যে আরোও বেশি প্রতিযোগিতা। এস এস সি’তে তুমি এ প্লাস পেয়েছো এখন কলেজে এসে রেজাল্ট একটু খারাপ হলে মান – সম্মান থাকবে না। এখানেও এ প্লাস পেলে। তারপর তোমাকে বলা হবে তোমার জীবনের গতিপথ নির্বাচিত হবে এখন। যে করেই হোক বুয়েট, মেডিকেল কিংবা পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পেতে হবে। না হলে এত বছরের কষ্টের কোন মূল্য নেই। এর আগের সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও এই পরীক্ষায় দুর্ভাগ্যবশত তুমি ব্যর্থ হলে। চারপাশ থেকে একজন একজন করে এগিয়ে এসে তোমাকে অনেক কথা শুনাবে। নিজের বাবা-মায়ের চোখে তুমি হবে পৃথিবীর সবচেয়ে অকেজো একটা মানুষ। তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না, অযথা টাকা নষ্ট করেছো এই টাইপের কথা হজম করতে হবে প্রতিনিয়ত। কারো কারো পরিবার টাকার হিসেবও রেখে দেয় তুমি ব্যর্থ হলে কথা শুনানোর জন্য।

এটাই একটা ছাত্র জীবনের উপসংহার। কিন্তু যখন তুমি এই পৃথিবীতে এসেছিলো তোমার পরিবার তোমাকে দেখে কত খুশি হয়েছিলো। তখন কি তারা এটা ভেবেই খুশি হয়েছিলো আমার সন্তান বড় হয়ে পাশের বাসার ভাবীর সন্তানের সাথে প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করবে?

আচ্ছা একজন ব্যর্থ ছাত্র হিসেবে পরিচয় পাওয়া তোমার দেখা এক একটা স্বপ্নের কথা কেউ কি ভুল করেও কোনদিন জানতে চেয়েছিলো? রক কনসার্টে গিয়ে লাফানো তুমিটাকে কি একবার কেউ জিজ্ঞেস করেছিলো তোমার স্বপ্নটা কি? না, তা হবে কেন। আমাদেরকে তো ছোটবেলায়ই মুখস্থ করানো হয়েছে কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতে হবে আমি বড় হয়ে পাইলট, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডাক্তার হতে চাই। এই তুমিটাই চোখের সামনে এক একটা স্বপ্নের মৃত্যুবরণ সহ্য করতে না পারে যখন চিরতরে বিদায় জানাবে তখনো তোমাকে কথা শুনতে হবে। সবার চোখে তুমি হবে খারাপ। মৃত্যুর কারণ হিসেবে জোর গলায় বলা হবে প্রেমের ব্যর্থতা। দোষটা আসলে কার? আমাদের পরিবারের? না এই যুগে পৃথিবীতে আসাটাই সবচেয়ে বড় ভুল?

আসলে দোষটা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। এইদেশে এমন বাবা-মা খুব কমই আছে যারা পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইবে তোমার ইচ্ছে আর স্বপ্নের কথা। বুকে টেনে নিয়ে বলবে তোমার স্বপ্ন সত্যি করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করবো আমরা। একটা কথা এখন চিন্তা করলে হাসি পায়। আগে সবাই পড়াশোনা করতো শিক্ষিত হওয়ার জন্য। আর এখন মানুষ পড়াশোনা করে টাকা রোজগারের জন্য। যত ভালো রেজাল্ট ততো বেশি টাকা বেতনের চাকরি।

এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় বের করা প্রয়োজন। এভাবে বোঝা কাঁধে নিয়ে দৌড়ানোর চেয়ে ভাঙা পায়ে ঘরে বসে থাকা ভালো। আসলে আমরা কি চাই, কোন দিকটায় আমাদের আগ্রহ, আমাদের স্বপ্নগুলো কিসের উপর ভিত্তি করে নির্মিত এগুলো আগে পরিবারকে বুঝাতে হবে। তবে আগেই বলা উচিত এটা কোন সহজ কাজ হবে না। কারণ আমরা এমন একটা দেশে বাস করি যেখানে সবাই ব্যস্ত কপি করাতে। কেউ চায় না নিজে থেকে ভিন্ন কিছু করতে। সব কাজেই বাঁধা আসবে তবে সেই বাঁধা অতিক্রম করতে হবে। আমাদের দেশে এসব কারণেই স্টিভ জবের মত কারো জন্ম হয় না। এই নিয়মমাফিক জীবন থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের আগ্রহকে প্রাধান্য দিতে হবে। তবে এটা মনে করবে না যে পড়ালেখার কোন প্রয়োজন নেই। অবশ্যই পড়ালেখার অনেক প্রয়োজন আছে। আর প্রয়োজনটা হলো শিক্ষিত হওয়ার। টাকা রোজগারের না। আর জীবনটা তোমার। আজ যারা তোমাকে প্রতিযোগিতায় ঠেলে গিয়ে ইচ্ছে আর স্বপ্নগুলোকে মেরে ফেলছে একদিন তারাই থাকবে না। তখন জীবনের হিসেব মেলাতে গিয়ে তোমাকে ডিপ্রেশনের মত ভয়াবহ মানসিক রোগে ভোগতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *